বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

শীতল পরশ

"রোম্যান্টিক" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান Sayemus Suhan (০ পয়েন্ট)

X "হোহ" মৃদু একটা ধমক। চমকে উঠলাম। কে ধমকায়! ঘুম পুরোপুরি ছুটে গেল। কিছুক্ষণ বুঝলাম না কোথায় আমি। মাথার উপরে জিরো পাওয়ারের একটা বাল্ব জ্বলছে। ড্রিম লাইট। মৃদু আলো। পিটপিট করে ওটার দিকে তাকালাম। আবারও, "হোহ" করে একটা ধমক। ওমা, উনি দেখি ঘুম থেকে জেগে উঠেছেন। আমার পাশে শুয়ে তিনি ধমকাচ্ছেন। আর আমি কে না কে ভেবে ভয় পেয়েছি! উনি গায়ের উপর থেকে ছোট কাঁথাটা ফেলে দিয়েছেন। সেটা তার পায়ের নিচে গড়াগড়ি খাচ্ছে। কাঁথা থেকে বের হয়ে ছোট ছোট হাত পা ছুড়ে খেলা করছেন আর মাঝে মাঝে পাশে তাকিয়ে ঘুমন্ত লোকটাকে চোখ বড় করে চেয়ে ধমকাচ্ছেন! আমাকে তাকাতে দেখে দাঁত বের করে, দুঃখিত, মাড়ি বের করে হাসি দিলেন। পরক্ষণেই হাত পা ছুড়াছুঁড়িতে মত্ত হয়ে পড়লেন। "উনি" আমার মেয়ে। চার মাস বয়স। নাম শীতল। এই নাম আমি রেখেছি। ওর মা নাম রেখেছিল সিদরাতুল মুনতাহা। ওটা ভাল নাম। ডাক নাম শীতল। নিষ্পাপ মুখটার দিকে তাকালে মনে প্রাণে কেমন একটা শান্তির শীতল পরশ বয়ে যায়। তাই এই নাম রেখেছি। শীতল নামের মধ্যে শান্তশিষ্ট একটা ভাব থাকলেও ও প্রচন্ড ছটফটে একটা মেয়ে। ঠিক ওর মায়ের মত। ওর মাকে আমি ডাকতাম প্রজাপতি! প্রজাপতির মত একবার এখানে তো একটু পর ওখানে। শান্ত হয়ে থাকতেই পারতো না। বাসাটা সরগরম হয়ে থাকতো সব সময়। মেয়েটা তার মায়ের এই গুণটা পেয়েছে। এই যেমন রাতে নিজেও ঘুমাবে না, আমাকেও ঘুমাতে দিবে না! আমাকে ঘুমাতে দেখে ওর হিংসা হয়েছে। তাই ধমক ধামক দিয়ে আমারও ঘুমটা ভেঙে দিল! . বিছানা ছেড়ে উঠলাম। প্যাম্পার্সটা পাল্টাতে হবে। আর্দ্রতার কারণে ওর ঘুম ভেঙেছে। প্যাম্পার্স পাল্টানোও বেশ ঝামেলার কাজ। ওটা খুলে আবার নতুন একটা পড়াতে হবে। কিন্তু শীতলের অদৃশ্য বাইসাইকেল চালানোর কারনে বেশ ঝামেলা পোহাতে হয়। প্যাম্পার্স পড়িয়ে ওর দিকে তাকালাম। কেমন নিষ্পাপ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। হঠাৎ মাড়ি বের করে শব্দ করে হেসে উঠলো! মা বলেছিলেন ছোট বাচ্চাদের সাথে নাকি ফেরেশতা খেলা করেন, কথা বলেন। ফেরেশতা হাসির কোন কথা বললে বাচ্চারা হাসে। শীতলের সাথেও হয়তো কোন ফেরেশতা কথা বলছে। কি বলতে পারে? জানো, এই লোকটা তোমার বাবা। তোমার দিকে কেমন ড্যাবড্যাব চোখে তাকিয়ে আছে! . ফ্লাস্কে গরম পানি আছে। ফিডারে অর্ধেক পানি ভরে সেটাতে দুই চামচ গুঁড়ো দুধ দিলাম। হামিদা আপা ল্যাকটোজেন ব্যাবহার করতে বলেছেন। আপাতত অন্য কোন গুঁড়ো দুধ না দিতে বলেছেন। অল্প একটু চিনিও দিতে হবে। নাহলে খেতে চায় না! এই বয়সে চিনি খাওয়ানো খারাপ কিনা জানি না। হামিদা আপার সাথে এটা নিয়ে কথা বলতে হবে। তিনি চিনির ব্যাপারে কিছু বলেননি। হাতের তালুতে দুই ফোঁটা দুধ ঢেলে দেখলাম তাপমাত্রা ঠিক আছে কিনা। বেশি গরম হলে মুখ পুড়ে যাবে। বেশি ঠান্ডা হলে ঠান্ডা লেগে যাবে। কুসুম গরম রাখতে হবে। হামিদা আপা ভাল মত বুঝিয়ে দিয়েছেন কুসুম গরম কিভাবে বুঝব। এছাড়াও মাঝে মাঝে বিভিন্ন পরামর্শ দিয়ে থাকেন। হামিদা আপা ডাক্তার। রিয়ার পুর্ব পরিচিত। রিয়ার ডেলিভারি উনিই করেছেন। অপারেশন কক্ষটার সামনে অস্থির পায়ে পায়চারী করছি। নরমাল ডেলিভারি। সিজার করালে নাকি বাচ্চা বোকাসোকা এবং শারীরিকভাবে দুর্বল হয়। তাই রিয়া সিজার করাতে রাজি হয়নি। মাথার মধ্যে শুধু দুশ্চিন্তা এসে ভর করছে। একটু দুরের একটা কেবিন থেকে বিলাপ ভেসে আসছে। কারও বাবা মারা গিয়েছে। তার ছেলে মেয়েরা চিৎকার করে তাকে ফিরে আসতে বলছে। কান্নার শব্দ মনে আরও বেশি প্রভাব ফেলছে। . মনে হল কয়েক যুগ পর দরজা খুলল। হামিদা আপা বেরিয়ে এলেন। নিরস রোবোটিক গলায় বললেন, তোমার মেয়ে হয়েছে। ডাক্তাররা সম্ভবত এমনই হয়। জন্ম-মৃত্যু দেখতে দেখতে এনাদের সয়ে গেছে। আনন্দ বা দুঃখ কোনটাই অনুভূত হয় না। আমার মেয়ে হয়েছে। আমার সন্তান হয়েছে। এর চেয়ে খুশির খবর আর কি হতে পারে? অথচ হামিদা আপা কেমন করে বললেন! যেন এটা কোন ব্যাপারই না। . হামিদা আপা নিজে আমার হাত ধরে ভেতরে নিয়ে এলেন। হামিদা আপার নিরস রোবোটিক গলার কারণটা তখন বুঝলাম। শীতলকে মায়ের পাশে শুইয়ে রাখা হয়েছে। মেয়েটা চোখ বন্ধ করে কাঁদছে। আর রিয়া ওর কান্না থামানোর চেষ্টা করছে না! মায়ের সামনে বাচ্চা কাঁদছে, আর মা বাচ্চার কান্না না থামিয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে। এমন দৃশ্য বোধকরি হয় না। আমার ছোট্ট শীতল কাঁদছে অথচ রিয়া ওকে আদর করছে না! সকল অনুভূতির উর্ধে উঠে কেমন নিশ্চিন্তে চোখ বন্ধ করে ঘুমিয়ে আছে! . হামিদা আপা বিড়বিড় করে বললেন, আমি দুঃখিত। দুধ বানিয়ে নিয়ে এলাম। পিচ্চিটার হাত পা ছুঁড়ে বাইসাইকেল চালানো শেষ হয়েছে। এখন মুখের ভেতর আঙুল ঢুকিয়ে "ভোঁ ভোঁ" টাইপের শব্দ করছে। ক্ষুধা লেগেছে মেয়েটার। ক্ষুধা লাগলে নিজের আঙুল মুখে পুরে চুষে ও। অনেকের কাছে শুনেছি বাচ্চারা নাকি ক্ষুধার কারণে অনেক রাতে ঘুম থেকে জেগে উঠে কাঁদে। মায়ের দুধ পেলে শান্ত হয়ে খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। আমার শীতল তেমন হয়নি। ওর ক্ষুধা লাগলে ঘুম থেকে জেগে উঠে চুকচুক করে আঙুল চুষবে। অনেক বেশী ক্ষুধা লাগলে কাঁদবে। কে জানে, হয়তো এখনই ও বুঝতে পেরেছে গভীর রাতে কেঁদে উঠলেও কেউ ওকে আদর করে দুধ খাওয়াবে না। কেউ পরম মমতায় আঁচলের নিচে নিয়ে ঘুমপাড়ানি গান গেয়ে ঘুম পাড়াবে না। . ওর গায়ের উপর ছোট কাঁথাটা টেনে দিলাম। এই কাঁথাগুলো রিয়া যত্ন করে বানিয়েছে। রিয়ার গর্ভে যখন শীতলের ছয় মাস চলে, তখন ও চাকরী ছেড়ে দিয়েছিল। সারাদিন বাসায় বসে পুরনো শাড়ি কেটে কাঁথা বানিয়েছে। নিজের হাতে শীতলের জন্য ছোট ছোট প্যান্ট, শার্ট, গেঞ্জি, জামা বানিয়েছে। একদিন ওকে জিজ্ঞেস করলাম, ব্যাপার কি? তুমি দুইজনের কাপড় বানাচ্ছো কেন? রিয়া অবাক হয়ে বলল, দুইজনের কোথায়?! শার্ট আর মেয়েদের জামা দেখিয়ে বললাম, এইতো। ও মুচকি হেসে বলেছিল, জনাব, উনি ছেলে নাকি মেয়ে সেটা আপনি জানেন? জানলে বলে দাও আমি একজনের কাপড়ই বানাই! রিয়া আল্ট্রাসনোগ্রাম করতে চাইতো না। ছেলে হবে নাকি মেয়ে হবে এটা আগে জানলে লাভ কি? এর চেয়ে ছেলে বা মেয়ে চেয়ে অপেক্ষা করার মজা আলাদা। তবে শর্ত একটাই, আমি যদি মনে মনে ছেলে চাই, তবে মেয়ে হলে মন খারাপ করা যাবে না! . শর্তে রাজি হয়ে ছোট একটা কাগজে লিখলাম আমি কি চাই। রিয়াও লেখল। তারপর দুটো কাগজের ভাজ একসাথে খুলে দেখা গেল, আমরা দুজনেই মেয়ে চেয়েছি। চাওয়া পুর্ণ হয়েছে। মেয়ে পেয়েছি। রিয়ার হাতে বানানো ছোট একটি কাঁথা গায়ে দিয়ে দুধ খাচ্ছে সে। রিয়ার জন্য খারাপ লাগে, ওর চাওয়া পূর্ণ হয়েছে, অথচ সে দেখে যেতে পারল না। শীতলের জন্মের কয়েক দিন পর মা এসেছিলেন আমার বাসায়। থেকেছেন কিছুদিন। রাগ অভিমান ভুলে নিজের নাতনীকে আদর করেছেন। বাবা তার ছেলের মুখ দেখবেন না, এই প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করে আসেননি। মাকে নাকি বলেছেন শীতলের ছবি নিয়ে যেতে। আমি জানি, বাবা তার ছেলের উপর রাগ করে থাকতে পারবেন। কিন্তু তার ছেলের সন্তানের উপর রাগ করে থাকতে পারবেন না। . মা একদিন পরম বন্ধুর মত নিচু স্বরে বললেন, এখন একটা মেয়ে দরকার তোর। যে তোর সংসার দেখবে। শীতলকে বড় করবে। ভাল মেয়ে আছে। কথা বলব? মা হয়তো ভাল বুদ্ধি দিয়েছেন। আমার জন্য দুশ্চিন্তা করছেন, একা সামলাতে পারব কিনা এই ভয় থেকে বলেছেন। কিন্তু আমি চাই না রিয়ার মেয়ে অন্য কারও কাছে বড় হোক। অন্য কাউকে মা বলে জানুক। আমিই ওর মা। আমিই ওর বাবা। . শীতল ঘুমাচ্ছে না। কিছুক্ষণ ওর পেটে আলতো চাপড় দিয়ে ঘুম পাড়ানোর চেষ্টা করলাম। দুষ্টু মেয়েটা না ঘুমিয়ে ছোট ছোট দুই হাত দিয়ে আমার মুখ খাবলে ধরার চেষ্টা করছে। প্রতিদিনই এমন করে। রাতে প্রতি দুই ঘন্টা পরপর ঘুম থেকে জেগে উঠবে, আর আমি এভাবে ওকে ঘুম পাড়াবো। কিন্তু ও না ঘুমিয়ে মুখ দিয়ে অদ্ভুত অদ্ভুত শব্দ করে আমাকে ধরার চেষ্টা করবে। আমার প্রচন্ড ঘুম পাচ্ছে। সকালে অফিসে যেতে হবে। অডিট চলছে এখন। কাজের চাপ অনেক। ওকে জাগ্রত রেখে আমি ঘুমাতে পারব না। ছহেলা খালাকে ডেকে এনে উনার কাছে দিতে পারি। ছহেলা খালাকে মা গ্রাম থেকে পাঠিয়েছেন। রান্নাবান্না করে দিবে আর আমি অফিসে থাকার সময়টা বাবুকে দেখে রাখবে। বুড়ো মানুষটাকে ডাকতে ইচ্ছা করছে না। শীতলকে কোলে তুলে নিলাম। কিছুক্ষণ হাটব ওকে নিয়ে। বারান্দায় এসে দাঁড়ালাম। শরৎকাল এখন। আকাশে অনেক বড় একটা চাঁদ উঠেছে। পরিষ্কার জ্যোৎস্না। অদ্ভুত মায়াবী আলোয় ছেয়ে আছে ধরণী। অল্প বাতাসও বইছে। রিয়ার সাথে কত রাত চাঁদ দেখে কাটিয়েছি। ও আমাকে রবীন্দ্রসঙ্গীত গেয়ে শোনাতো। আমি রিয়ার কাঁধে মাথা রেখে মন্ত্রমুগ্ধের মত শুনতাম। . মাঝে মাঝে তব দেখা পাই, চিরদিন কেন পাই না।। কেন মেঘ আসে হৃদয়আকাশে।। তোমারে দেখিতে দেয় না মোহমেঘে তোমারে দেখিতে দেয় না।। মোহমেঘে তোমারে, অন্ধ করে রাখে তোমারে দেখিতে দেয় না.. . রিয়া বলতো, যার স্ত্রী রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতে পারে সেই লোক পৃথিবীর সব চেয়ে ভাগ্যবান স্বামী। শীতলকেও আমি রবীন্দ্রসঙ্গীত শেখাবো। জ্যোৎস্না রাতে ঠিক মায়ের মত করে রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইবে। শীতলকে আস্তে করে জিজ্ঞেস করলাম, মায়ের মত রবীন্দ্রসঙ্গীত শিখবে না মামনি? শীতল বলল, "হোহ!"


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১০৭৯ জন


এ জাতীয় গল্প

→ শীতল পরশ

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now