বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
মোহাম্মদ শাহজামান শুভ।
শহরের নামী একটি কলেজে অধ্যাপক আরমান হক ছিলেন এক বিস্ময়ের নাম। ছাত্ররা বলত, তাঁর মতো জ্ঞানী শিক্ষক খুব কমই আছে। ইতিহাস, দর্শন, সাহিত্য, প্রযুক্তি—কোনো বিষয়ে প্রশ্ন করলেই তিনি অনর্গল বলে যেতে পারতেন। সহকর্মীরাও তাঁকে সম্মান করতেন, কিন্তু সেই সম্মানের ভেতরে একধরনের দূরত্বও ছিল। কারণ আরমান সাহেবের মধ্যে ধীরে ধীরে এমন এক বিশ্বাস জন্মেছিল যে, তিনি আর শেখার পর্যায়ে নেই; বরং তিনিই শেষ কথা। নতুন শিক্ষকরা কোনো নতুন পদ্ধতি, নতুন ধারণা বা আধুনিক শিক্ষাতত্ত্ব নিয়ে কথা বলতে এলে তিনি ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি টেনে বলতেন, “এসব বইয়ের কথা। বাস্তব ক্লাসরুম আমি তোমাদের জন্মের আগ থেকে দেখছি।” কথাটা বলার মধ্যে অভিজ্ঞতার দৃঢ়তা থাকলেও, অদৃশ্যভাবে সেখানে অহংকারের বিষ জমে উঠছিল। তিনি বুঝতেই পারছিলেন না, এই “আমি জানি” ভাবনাটাই তাঁর সবচেয়ে বড় অন্ধকার হয়ে উঠছে।
একদিন কলেজে নতুন যোগ দিলেন তরুণী শিক্ষক নাবিলা রহমান। বয়সে অনেক ছোট, কিন্তু শেখানোর পদ্ধতিতে ভীষণ আধুনিক। তিনি ছাত্রদের শুধু বই পড়াতেন না, প্রশ্ন করতে শেখাতেন। ক্লাসে আলোচনা, বিতর্ক, দলীয় কাজ, এমনকি প্রযুক্তি ব্যবহার করে ইন্টারেক্টিভ সেশন নিতেন। ছাত্ররা দ্রুত তাঁর ক্লাসের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে উঠল। আরমান হক বিষয়টা ভালোভাবে নিলেন না। তাঁর মনে হলো, এই নতুনত্ব আসলে বাহুল্য; প্রকৃত জ্ঞান তো তাঁর কাছেই আছে। একদিন স্টাফরুমে নাবিলা বললেন, “স্যার, আমি ভাবছি ইতিহাসের ক্লাসে ডিজিটাল আর্কাইভ ব্যবহার করব। পুরোনো দলিলগুলো ছাত্ররা নিজেরাই বিশ্লেষণ করবে।” আরমান হেসে বললেন, “ইতিহাস বুঝতে হলে বইয়ের গন্ধ জানতে হয়, স্ক্রিনে ইতিহাস শেখা যায় না।” কথাটা শুনে সবাই চুপ করে গেল। নাবিলা আর কিছু বললেন না, শুধু নরম স্বরে বললেন, “শেখার মাধ্যম বদলায় স্যার, শেখা নয়।” এই ছোট বাক্যটি আরমানের কানে ঢুকলেও মনে ঢুকল না।
কয়েক মাস পর কলেজে জাতীয় পর্যায়ের একাডেমিক প্রেজেন্টেশন প্রতিযোগিতা আয়োজন করা হলো। আরমান হক নিশ্চিত ছিলেন, তাঁর বিভাগের ছাত্ররাই প্রথম হবে। তিনি পুরোনো নোট, মুখস্থনির্ভর পদ্ধতি আর নিজের দীর্ঘদিনের বক্তৃতা দিয়েই ছাত্রদের প্রস্তুত করালেন। অন্যদিকে নাবিলা তাঁর ছাত্রদের বললেন, “তোমরা শুধু উত্তর মুখস্থ করবে না, প্রশ্ন করবে—কেন, কীভাবে, আর এর নতুন মানে কী?” প্রতিযোগিতার দিন দেখা গেল, বিচারকদের বেশিরভাগ প্রশ্নই ছিল বিশ্লেষণধর্মী এবং সমসাময়িক প্রেক্ষাপটভিত্তিক। আরমানের ছাত্ররা মুখস্থ উত্তরের বাইরে গিয়ে কথা বলতে পারল না। কিন্তু নাবিলার ছাত্ররা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে নতুন তথ্য, সমকালীন উদাহরণ আর নিজেদের ব্যাখ্যা তুলে ধরল। ফলাফল প্রকাশের সময় আরমান প্রথমবারের মতো বুঝলেন, তাঁর ছাত্ররা পিছিয়ে পড়েছে। শুধু ছাত্ররা নয়—তিনি নিজেও পিছিয়ে পড়েছেন। তাঁর বহু বছরের অভিজ্ঞতা ছিল, কিন্তু নতুনকে গ্রহণ করার সাহস ছিল না।
সেই রাতে আরমান হক বাড়ি ফিরে নিজের বইয়ের ঘরে অনেকক্ষণ একা বসে রইলেন। চারপাশে সারি সারি বই, দেয়ালে সম্মাননা, পুরস্কার, সনদ—সবই যেন হঠাৎ নীরব হয়ে তাঁকে প্রশ্ন করতে লাগল। তিনি জানালার বাইরে তাকিয়ে দেখলেন, রাস্তার লাইটের নিচে কয়েকজন কিশোর মোবাইল ফোনে কিছু দেখছে, হাসছে, শিখছে। তাঁর মনে হলো, পৃথিবী থেমে নেই, শুধু তিনিই থেমে গেছেন। হঠাৎ তাঁর বাবার কথা মনে পড়ল। ছোটবেলায় তাঁর বাবা বলতেন, “যেদিন ভাববি তুই সব জেনে গেছিস, সেদিনই তোর জ্ঞান মরে যাবে।” এতদিন পরে সেই কথার গভীরতা যেন হঠাৎ বুকের মধ্যে ধাক্কা দিল। তিনি উপলব্ধি করলেন, জ্ঞান তাঁকে বড় করেনি; জ্ঞানের প্রতি তাঁর বিনয়ই তাঁকে বড় করেছিল। আর সেই বিনয় তিনি কোথাও হারিয়ে ফেলেছেন।
পরদিন কলেজে গিয়ে তিনি প্রথমবারের মতো নাবিলার ক্লাসের পেছনের বেঞ্চে চুপচাপ বসে রইলেন। ছাত্ররা অবাক, নাবিলা কিছুটা অপ্রস্তুত। কিন্তু তিনি ইশারায় বুঝিয়ে দিলেন, ক্লাস চালিয়ে যেতে। পুরো ক্লাসজুড়ে তিনি দেখলেন—ছাত্ররা শুধু শুনছে না, ভাবছে; শুধু তথ্য নিচ্ছে না, তথ্যকে প্রশ্ন করছে। ক্লাস শেষে আরমান ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, “আজ আমি নতুন কিছু শিখলাম।” স্টাফরুমে ফিরে তিনি দীর্ঘদিনের অভ্যাস ভেঙে প্রথমবারের মতো বললেন, “নাবিলা, তোমার কাছ থেকে আমাকে ডিজিটাল আর্কাইভ ব্যবহারের পদ্ধতিটা শিখিয়ে দেবে?” নাবিলা মৃদু হেসে বললেন, “স্যার, শেখার কোনো বয়স নেই।” এই কথাটি এবার তাঁর হৃদয়ের গভীরে গিয়ে লাগল।
এরপর শুরু হলো আরমান হকের জীবনের নতুন অধ্যায়। তিনি নিজেকে আবার শিক্ষার্থী হিসেবে গড়ে তুলতে লাগলেন। নতুন বই পড়লেন, অনলাইন কোর্স করলেন, প্রযুক্তি শিখলেন, ছাত্রদের মতামত শুনলেন। সবচেয়ে বড় কথা, তিনি প্রশ্ন করতে শুরু করলেন। আগে যিনি শুধু উত্তর দিতেন, এখন তিনি প্রশ্নের আনন্দ আবিষ্কার করলেন। একদিন এক ছাত্র তাঁকে বলল, “স্যার, এখন আপনার ক্লাসে এসে মনে হয় আমরা শুধু ইতিহাস না, ভাবতেও শিখছি।” কথাটা শুনে তাঁর চোখ ভিজে উঠল। তিনি বুঝলেন, এতদিন তিনি জ্ঞান দিতেন, এখন তিনি শেখার দরজা খুলে দিচ্ছেন।
বছরখানেক পর আবার সেই জাতীয় প্রতিযোগিতা এলো। এবার আরমান ও নাবিলা একসঙ্গে ছাত্রদের প্রস্তুত করালেন। পুরোনো অভিজ্ঞতা আর নতুন পদ্ধতির মেলবন্ধনে ছাত্ররা অসাধারণ করল। ফলাফল ঘোষণার দিন তাঁদের কলেজ প্রথম হলো। সবাই উল্লাসে ফেটে পড়ল। কিন্তু মঞ্চে দাঁড়িয়ে পুরস্কার হাতে আরমানের মনে হচ্ছিল, আসল জয় এই ট্রফি নয়; আসল জয় তাঁর নিজের ভেতরের দেয়াল ভাঙা। তিনি জিতেছেন নিজের অহংকারের বিরুদ্ধে, নিজের স্থির হয়ে যাওয়া চিন্তার বিরুদ্ধে।
সমাপনী অনুষ্ঠানে তাঁকে বক্তব্য দিতে বলা হলো। মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি বললেন, “আমি দীর্ঘদিন ভেবেছিলাম, অভিজ্ঞতা মানেই সব জানা। কিন্তু আজ বুঝেছি, অভিজ্ঞতা তখনই মূল্যবান, যখন তা নতুন শেখার জন্য দরজা খোলা রাখে। যে মানুষ শেখা বন্ধ করে দেয়, সে বয়সে নয়, চিন্তায় বৃদ্ধ হয়ে যায়। আর যে নিজেকে শিক্ষার্থী রাখতে পারে, সে সবসময় তরুণ।” হলভর্তি করতালির মধ্যে তাঁর চোখ গিয়ে পড়ল ছাত্রদের দিকে। সেখানে তিনি নিজের অতীতও দেখলেন, ভবিষ্যৎও দেখলেন।
সেদিন রাতে বাড়ি ফিরে তিনি নিজের ডায়েরিতে লিখলেন—“মানুষের জীবনে শেষ পাঠ বলে কিছু নেই। শেষ নিশ্বাসের আগ পর্যন্ত শেখা চলতে থাকে। যে দিন মনে হয় সব শিখে ফেলেছি, সেদিনই সত্যিকারের অন্ধকার শুরু হয়। আর যে দিন স্বীকার করি, এখনো অনেক কিছু জানি না—সেদিনই নতুন আলোর জন্ম হয়।” ডায়েরির পাতা বন্ধ করে তিনি দীর্ঘদিন পর এক অদ্ভুত প্রশান্তি অনুভব করলেন। কারণ তিনি আবার জীবন্ত হয়েছেন—একজন শিক্ষক হিসেবে নয়, একজন আজীবন শিক্ষার্থী হিসেবে।
এইভাবেই আরমান হক বুঝলেন, জীবনে এগিয়ে থাকার গোপন শক্তি জ্ঞানের পরিমাণে নয়, শেখার ক্ষুধায়। মানুষ যতদিন শেখে, ততদিন সে এগোয়; আর যেদিন সে থেমে যায়, সেদিন সময় তাকে পেছনে ফেলে চলে যায়। তাই তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হয়ে রইল—নিজের ভিতরের শিক্ষার্থীকে কখনো মরতে দেওয়া যাবে না।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now