বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

শেষ ওভার

"রোমাঞ্চকর গল্প " বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রিয়েন সরকার (০ পয়েন্ট)

X শেষ ওভার - মঞ্জুর চৌধুরী জিততে হলে এক ওভারে মাত্র চার রান প্রয়োজন। ছয় বলে চার রান তোলা এমন কোন কঠিন ব্যপার নয়। ভয়ের কারণ একটাই, শেষ উইকেট জুটি ব্যাটিং করছে। সেটাও সমস্যা হতো না যদি না আয়ান স্ট্রাইকিং এন্ডে থাকতো। আজকের ইনিংসে সে দুর্ধর্ষ ব্যাট করেছে। পনের ওভারের খেলায় আশি রানের টার্গেটে খেলতে নেমে পাঁচ ওভারে মাত্র পঁচিশ রান তুলতেই তাদের বাঘা বাঘা সব ব্যাটসম্যান আউট হয়ে গেছে। একা আয়ান, বাচ্চু, খোকন এবং এখন কাইয়ুমকে সাথী করে জয়ের এত কাছাকাছি চলে এসেছে। ওরা কেউই ঠিক মতন ব্যাটই ধরতে পারেনা, কেবল আয়ানের ইশারায় পিচের এ প্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত পর্যন্ত দৌড়েছে। আয়ানকে আজকে কেউ কাবু করতে পারছে না। সে যেন দাঁতে দাঁত চেপে পণ করেছে, কোন অবস্থাতেই আউট হবেনা! বাচ্চু এবং খোকন দুইজনই রান আউটের শিকার। আয়ানেরই দোষে! অসম্ভব রানের জন্য ছুটতে গিয়ে ওরা সময় মতন পিচে পৌছাতে পারেনি। আয়ানেরও অবশ্য অন্য কোন উপায় ছিলনা, শেষ বলে প্রান্ত বদল না করলে পরের ওভারে শুরু থেকেই ওদের স্ট্রাইক করতে হতো। খেলা তাহলে ওখানেই শেষ হয়ে যেত। রাজীব স্যার, যিনি তাকে বাড়িতে অংক এবং ইংলিশ পড়ান, এবং একই সাথে গত ক'টা বিকেলে তাদের ক্রিকেট কোচিংও করিয়েছেন, তিনি বলেছেন ‘ব্যক্তিস্বার্থের আগে দলের স্বার্থ বেশি জরুরি। এবং দলের স্বার্থ একটাই, জয়! এর জন্য নিজের উইকেটও যদি বিসর্জন দিতে হয়, খুশি মনে তা মেনে নেয়া উচিৎ।’ শেষ ওভারের চরম উত্তেজনাপূর্ণ মুহূর্তে স্ট্রাইকিং এন্ডে কাইয়ুম ব্যাট করছে। বোলিংয়ে দুর্দান্ত হলেও ব্যাটিংয়ে সে "মায়ের দোয়া, আল্লাহ ভরসা" অবস্থা। অন্ধের মতন ব্যাট চালায়, "লাগলে বাড়ি বাউন্ডারী, না লাগলে আউট!" বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তার ব্যাটে 'বাড়ি' লাগেনা, আফ্রিদির মতন বল শুন্যে ভাসিয়ে মাঝ মাঠে ফিল্ডারের হাতে ধরা পড়ে। গত দুই ওভার ধরে সে পিচে আছে, কিন্তু এই প্রথম সে কোন বল মোকাবিলা করবে। আগের ওভারের শেষ বলে আয়ান সিঙ্গেল নিতে পারেনি, বল সরাসরি কভারে দাঁড়ানো ফিল্ডারের হাতে চলে গিয়েছিল। শেষ উইকেট না হলে সে অবশ্যই দৌড় দিত। এখন পুরো খেলাটা ভাগ্যের হাতে ছেড়ে দিয়েছে। মনে মনে সে আল্লাহকে ডাকছে। এই প্রথম তার বুক দুরু দুরু করে কাঁপছে। এতদূর এসে যদি হেরে যায়, তবে সবকিছুই নষ্ট হয়ে যাবে। আজকের খেলাটিতো আর শুধুই একটি 'ফ্রেন্ডলি ম্যাচ' নয়, এর সাথে তার মান অভিমানও জড়িয়ে আছে। আয়ান ক্লাস ফোরের ছাত্র। পড়াশোনা করছে শহরের সানরাইজ হাই স্কুলে। এই বছরই সে এই স্কুলে ভর্তি হয়েছে। এর আগে সে পড়াশোনা করতো বাংলাদেশ গ্রামার স্কুলে। ইংলিশ মিডিয়াম। সেখানে মাসিক বেতন অনেক বেড়ে যাওয়ায় তার বাবার পক্ষ্যে তাকে সেখানে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। সানরাইজ হাই স্কুল একটি বাংলা মিডিয়াম স্কুল। ইংরেজি মিডিয়াম থেকে বাংলায় এসে খাপ খাওয়াতে আয়ানকে অনেক কষ্ট করতে হচ্ছে। ক্লাসে টিচার কী পড়ান, তার বেশিরভাগই সে বুঝেনা। পড়া না পারলেই চুলের মুঠি ধরে অথবা চড় থাপ্পড় মেরে শাস্তি দেন, এইটাতেও সে অভ্যস্ত নয়। তারউপর নতুন স্কুলের নতুন বন্ধুরাও তাকে সাদরে গ্রহণ করেনি। হ্যাংলা পাতলা গড়নের বলে তাকে অনেক নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। সাদ্দাম নামের এক মোটা শরীরের ছেলে, যার মা কিনা এই স্কুলেরই একজন শিক্ষিকা, নিয়মিত তার টিফিন খেয়ে ফেলে। ক্লাস টিচারকে বিচার দিলে টিচার উল্টো তাকে নিয়েই হাসাহাসি করেন। ফারহান নামের এক দস্যি ছেলে তার পেন্সিল বক্সের ভিতর জীবিত টিকটিকি ঢুকিয়ে দিয়েছিল। বক্স খুলতেই টিকটিকি লাফিয়ে তার হাতে উঠে আসে, এবং সে ভয়ে চিৎকার করে উঠে। তখন ক্লাসে ছিলেন লালন স্যার। যার হুঙ্কার শুনলে বনের বাঘও নাকি মিউ মিউ করে লেজ গুটিয়ে পালায়। তিনি এসে চিৎকারের কারণ জানতে চাইলে আয়ান মিনমিনে গলায় সত্যি কথা বলে। কিন্তু স্যার কোন টিকটিকি না দেখে আয়ান মিথ্যা বলছে ভেবে হাতের মধ্যে গুণে গুণে দশটা বেতের বাড়ি মারেন। অভিমানে আয়ান একটা কথাও বলতে পারেনি। অথচ তাকে মার খেতে দেখে ফারহানদের সে কী হাসি! সবচেয়ে অপমানজনক ছিল মাসিক বেতন দেবার দিনে। সৌমিত্রের ব্যাগ থেকে বেতনের টাকা হারিয়ে যাওয়ায় কোন যুক্তি প্রমাণ ছাড়াই ক্লাসের ছেলেরা আয়ানকে "চোর" হিসেবে অভিযুক্ত করলো! এমনকি ক্লাস টিচারের কথাতেও ছিল একই সুর! অপমানে আয়ান শুধু চোখের পানিই ফেলতে পেরেছে। বিশ মিনিটের টিফিন পিরিয়ডে ক্লাসের সামনের বারান্দায় ছেলেরা ক্রিকেট খেলে। ক্রিকেট আয়ানের অত্যন্ত প্রিয় খেলা এবং সে খেলেও ভাল। কিন্তু ক্লাসের ছেলেরা তাকে নিতেই চায় না। নিবেই বা কিভাবে? মোটে বাইশজন খেলতে পারে, আর তাদের ক্লাসের এক সেকশনেই ছেলে সংখ্যা সত্তুর! একবার সে ব্যাট এবং বল এনেছিল বলে তাকে দলে রেখেছিল, কিন্তু না তাকে কেউ বোলিং করতে দিয়েছে, না ব্যাটিং। একের পর এক ব্যাটসম্যান আউট হয়, সে যখনই ব্যাট করতে চায়, তখনই তাকে বসিয়ে অন্য কাউকে পাঠানো হয়। দলের ক্যাপ্টেন শাহানতো সরাসরি বলেই ফেলেছে, "তুই খেলতে পারিস নাকি যে ব্যাট করার জন্য ঘ্যানঘ্যান করছিস? চুপ করে বসে থাক!" কথাটা তার এতই খারাপ লেগেছিল যে সে তখনই ঠিক করে ফেলে এর জবাব সে দিবেই। ওদেরকে বুঝিয়ে দিবে সে কেমন খেলতে পারে। এর একমাস পরেই সে তার স্কুলের দলের ছেলেদের নিজের পাড়ার দলের সাথে খেলতে চ্যালেঞ্জ করে। ওরা ওর প্রস্তাবে স্বানন্দে রাজি হয়, এবং প্রকাশ্যেই তুচ্ছতাচ্ছিল্য করতে থাকে। আয়ান চোয়াল শক্ত করে মনে মনে বলে, "মাঠেই জবাব পাবে সোনার চাঁদেরা! গত একমাস ধরে আমরা তোমাদের হারাতেই প্র্যাকটিস করেছি। তোমাদের সবলতা, দূর্বলতা সব আমার জানা আছে!" খেলার ভেন্যু স্কুলের মাঠ। আয়ানদের পাড়ার মাঠে গিয়ে খেলতে কেউ খুব একটা আগ্রহী নয়। আয়ান এতেও রাজি। তাদের কেবল "বাইশ ব্যাটের" একটা পিচ হলেই হবে। শেষ ওভারের প্রথম বল করলো মুহিব। ক্লাসের শোয়েব আখতার! এই ম্যাচে তিন ওভার বল করে তিন উইকেট তুলে নিয়েছে। তার বলে রান তোলা খুব কঠিন! কাইয়ুম তার অভ্যাস মতন ব্যাট চালালো। লাগেনি। বল স্টাম্পের কয়েক আঙ্গুল উপর দিয়ে উড়ে গিয়ে উইকেট কিপারের হাতে গিয়ে পৌছালো। পাঁচ বলে চার রান প্রয়োজন, হাতে মাত্র এক উইকেট! মুহিব আঙ্গুল দিয়ে ইশারায় কাইয়ুমকে "চার" দেখালো। মানে হচ্ছে সে তাকে তার চতুর্থ শিকার বানাবে। কাইয়ুম দৃষ্টি তীক্ষ্ণ করে নাক ফুলিয়ে নিশ্বাস নিচ্ছে। সর্বনাশ! সে উত্তেজিত হয়ে পড়ছে। এই সময়ে মাথা ঠান্ডা রাখাটাই সবচেয়ে বেশি জরুরী। আয়ান ছুটে গেল কাইয়ুমের কাছে। "শোন কাইয়ুম, এখন মাথা গরম করিস না। আমরা জিতেই গেছি প্রায়। পাঁচ বলে চার রান কোনই ব্যপার না। তুই খালি আমাকে একটা রান বের করে দে।" কাইয়ুমকে আয়ান তুই তুই করে বললেও কাইয়ুম কিন্তু বয়সে আয়ানের চেয়ে বড়। সে হচ্ছে রাশুদের কাজের ছেলে, স্কুলে গেলে এখন হয়তো ক্লাস সিক্সে পড়তো। মুহিব যদি স্কুলের শোয়েব আখতার হয়ে থাকে, তবে কাইয়ুমও এই পাড়ার ব্রেট লী। দুর্দান্ত বল করে। বড়ভাইদের দলেও প্রায়ই তার ডাক আসে। আজকে যে তাকে দলে পাওয়া গেছে, এইটাই ভাগ্য। আজকে তার খেলারই কথা ছিল না। না, অন্য কোন দলের হয়ে খেলার কথা ছিল না তার। তার বাম হাতের তিনটা আঙ্গুল ভেঙ্গেছে এক সপ্তাহ হলো, এখনও জোড়া লাগেনি, তবে ফোলা কমেছে বলেই রক্ষা। রাশুর বাবা, যিনি খুবই বড় একজন সরকারী কর্মকর্তা, মেরে আঙ্গুল ভেঙ্গে দিয়েছেন। সকালে উঠে তাঁর জুতা পলিশ করে চকচকে করে রাখার কথা ছিল কাইয়ুমের, আগের রাতে জ্বর থাকায় সে কাজটা করতে পারেনি। রাশুর বাবা রাগের মাথায় কাইয়ুমকে মারতে গিয়ে তার আঙ্গুল ভেঙ্গে দিয়েছেন। এই কারনেই এই ম্যাচের আগে কাইয়ুম একদম প্র্যাকটিস করতে পারেনি। আজকেও বোলিংয়ে তেমন অসুবিধা না হলেও (চার ওভার বল করে পাঁচ উইকেট সে একাই নিয়েছে। ওর কারণেই একটা পর্যায়ে বিপক্ষ দলের স্কোর দাঁড়িয়েছিল পাঁচ উইকেটে উনিশ। ওরা যে এতদূর যেতে পেরেছে সেটা কেবল জায়েদের ছেচল্লিশ রানের ইনিংসের কারণে) ব্যাটিংয়ের সময়ে সে ঠিক মতন ব্যাটই ধরতে পারছে না। আয়ানের উপদেশে মাথা নেড়ে সম্মতি দিলেও সে যে উপদেশ গ্রহণ করেনি সেটা পরের বলেই বুঝা গেল। মুহিবের ছোরা ওভারের দ্বিতীয় বলটিতেও কাইয়ুম জোরে ব্যাট চালালো। এইবারও ব্যাটে বলে কিছু হলোনা, এইবারও বল সরাসরি উইকেট কিপার শাহানের হাতে গিয়ে পৌছালো। শাহানের আফসোস দেখেই বুঝা যায় বলটা স্টাম্পের কতটা কাছ ঘেঁষে গিয়েছে! মুহিব টিটকারি করতেই হাতে তালি বাজিয়ে নকল বাহ বাহ জানালো। কাইয়ুম ফুসছে। টগবগ করে ফুটছে। শাহান আগুনে ঘি ঢেলে দিল। "ব্যপার না, ভাগ্য ভাল বলে বেঁচে গেছে। পরের বলেই আউট হবে! শাবাস মুহিব! নিয়ে নে!" শাহান হচ্ছে স্কুলের তারকা ব্যাটসম্যান। এবং প্রচন্ড অহংকারীও। আজকের ইনিংস শুরুর আগেই সে ব্যাট উঁচিয়ে দর্শকদের অভিনন্দের জবাব দিচ্ছিল। তারপর আয়ানকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলছিল, "ফিফটি যে করবোই, এইটাতো নিশ্চিত! তাই আগেভাগে ব্যাট উঁচিয়ে দিলাম আর কি।" সাত রান করে আরাফাতের বলে আউট হবার পর আয়ান তার কাছে এসে জবাব দিল। "মাত্র তেতাল্লিশ রানের জন্য হলো না, আফসোস!" তখন থেকেই সে রাগে ফুসছে। আয়ান যখনই স্ট্রাইক করছে, তখনই পেছন থেকে এমনসব কথা বলছে যেন সে রেগে যায়। "ব্যাট চালালেই ব্যাটসম্যান সবাই হয়না! তেলাপোকা উড়লেই তারে কেউ পাখি কয় না!" "কিছু কিছু পোলাপাইন ব্যাট বল নাড়াচাড়া করতে করতে নিজেদের টেন্ডুলকার ভাবতে শুরু করে। তাদের শিখায় দেয়া উচিৎ ব্যাটিং-বোলিং কারে বলে!" শ্লেজিংয়ে কাজ হয়েছেও। তাদের বেশিরভাগ ব্যাটসম্যানই অযথা মারতে গিয়ে আউট হয়েছে। সে বহুকষ্টে নিজের মাথা ঠান্ডা রেখেছে। রাজীব স্যার বলেছেন, "শত্রুর উপর রাগ পুষে রাখলে মাথা ঠান্ডা থাকেনা। বরং শত্রুকে কিভাবে হারানো যায় সেটা নিয়েই ভাবতে হয়।" সবকিছুর জবাব দেয়ার একটাই উপায়, জয়। যা এখন চার বলে চার রান দূরে। তৃতীয় বলটা ছুরতেই আয়ানের বুক কেঁপে উঠলো। নিশ্চিত স্টাম্পে যাচ্ছে! কাইয়ুম তার স্বভাবমতই ব্যাট চালালো। ব্যাটে বলে লাগলোও, তবে কাইয়ুমের বাঁ হাতের আঙ্গুল ভাঙ্গা থাকায় ব্যাট ঘুরে গেল। ভাগ্য খুব বেশিই সহায়, ব্যাটের কানায় লেগে বল শাহানের মাথার উপর দিয়ে গিয়ে পেছনের দেয়ালে গিয়ে লাগলো। পেছন দিকে জায়গা কম হওয়ায় পেছনের দেয়ালে সরাসরি বল লাগলে দুই রান যোগ হয় স্কোর কার্ডে। জয়ের ব্যবধান এখন কমে দাঁড়ালো মাত্র দুই রানে! হাতে এখনও তিনটা বল বাকি! ব্যাটিং দলের সবাই হই হই করে উঠলো। শাহানের মুখ পাংশু হয়ে গেছে। মুহিব খুনে দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে কাইয়ুমের দিকে। কাইয়ুম বুক উঁচিয়ে বলল, "দেখা দেখি কী দেখাতে চাস!" আয়ান ছুটে এসে কাইয়ুমকে বুঝালো। এখনও দল জিতে যায়নি। এখনও যদি সে আউট হয়, তবে খেলা শেষ। সে যেন একটি রান বের করে দেয়। কাইয়ুম যথারীতি মাথা নেড়ে সম্মত হলো। আয়ান বুঝতে পারছে, সে আসলে কিছুই বুঝেনি। উল্টাপাল্টা ব্যাট চালাবেই। সে মনে মনে বলল, "আল্লাহ! আরেকবার তার ব্যাটের কানায় লেগে দুই রান পাওয়ায় দাও! প্লিজ!" ফিল্ডিং দলও টিম মিটিং করলো। ওদের পরিকল্পনায় কী আছে বুঝা গেল না। ফিল্ডিংয়ে একটু এদিক সেদিক পরিবর্তন হলো। আয়ানের হাসি পেল। কাইয়ুমের ক্ষেত্রে ফিল্ডিং সাজিয়ে কোনই লাভ নেই। ওর ব্যাটে লাগলে বল মাঠে থাকবে না। আর নাহলে এমন উঁচুতে বল তুলবে যে, যেকোন ফিল্ডার যেকোন প্রান্ত থেকে দৌড়ে এসে আরামসে সেই ক্যাচ ধরতে পারবে। মুহিব তৃতীয় বল ছুড়লো। আয়ান এইটাই অনুমান করেছিল, একটা স্লোয়ার বল হতে চলেছে। তবে তাকে অবাক করে দিয়ে কাইয়ুম বলটিকে আলতোভাবে ঠেলে দিয়েই দৌড় দিল। আয়ানও তীরের বেগে প্রান্ত বদলে ফেলল। এক রান! কাইয়ুম সিঙ্গেল নিয়ে ফেলেছে! জীবনে এই প্রথম সে বুদ্ধিমানের মতন ব্যাট করেছে! তারচেয়ে বড় কথা, এখন তাদের হারানো সম্ভব নয়! খুব বেশি হলে ম্যাচ 'টাই' হবে! "প্যাভিলিয়ন" থেকে উল্লাস ধ্বনি শোনা যাচ্ছে। কাইয়ুমের নামে জয়জয়কার! টিপু স্লোগান ধরলো, "আমার ভাই তোমার ভাই!" বাকি সবাই কন্ঠ মেলালো, "কাইয়ুম ভাই! কাইয়ুম ভাই!" ফিল্ডিং দল আরেকটা টিম মিটিং করে ফেলল। এবং এরপরই সবকটা ফিল্ডার আয়ানকে ঘিরে ফেলল। স্লিপ, গালি, সিলি পয়েন্ট, শর্ট মিডউইকেট, শর্ট কভার সব জায়গায় ফিল্ডার উপস্থিত। কোনভাবেই যেন একটা রান নিতে না পারে। কাইয়ুমকে আয়ান কেবল একটাই উপদেশ দিল, যেন যত দ্রুত সম্ভব দৌড়াবার জন্য প্রস্তুত থাকে। মুহিব বল হাতে দৌড় শুরু করলো। আয়ানের মস্তিষ্ক বিদ্যুৎবেগে কাজ করছে। মহিব যদি বুদ্ধিমান হয়ে থাকে, তবে অবশ্যই এখন ইয়র্কার বল ছুড়বে। সিঙ্গেল আটকাতে এর বিকল্প এখনও আবিষ্কার হয়নি। তবে, যদি সে আরেকটু বেশি বুদ্ধিমান হয়ে থাকে, তবে এবারের বলটা অবশ্যই গুডলেন্থ থেকে একটু শর্টে ফেলবে। কারণ ব্যাটসম্যান ইয়র্কারের জন্য প্রস্তুতি নিয়ে ফ্রন্ট ফুটে চলে যাবে, এইসময়ে খাটো লেন্থের বল পেলে মুহিবের পেসে ব্যাক ফুটে যাবার মতন যথেষ্ট সময় সে পাবেনা। খুব ভাল টাইমিং না হলে ফল হতে পারে উইকেটের পেছনে ক্যাচ। আবার যদি সে আগে থেকে ব্যাকফুটে চলে যায়, এবং ইয়র্কার বল হয়, তবে নিশ্চিত বোল্ড আউট হয়ে যেতে পারে। আয়ান ঠিক করলো সে ফ্রন্ট ফুটেই খেলবে। শর্ট বল হলে খুব নিশ্চিত না হয়ে খেলবে না। হাতে বলতো আছেই। শেষ বলে দরকার হলে ঝুঁকি নেয়া যাবে। মুহিব নিজের সর্বশক্তি দিয়ে বল ছুড়লো। সে প্রমাণ করলো যে সে বুদ্ধিমান, তবে অতি বুদ্ধিমান নয়; ইয়র্কার বল ছুটে আসছে আয়ানের দিকে। আয়ান ক্রিজ থেকে এক পা সামনে এগিয়ে এলো। অনেকক্ষণ ধরে সে ক্রিজে আছে। ছোট টেনিস বলটিকে সে এখন ফুটবলের মতন স্পষ্ট দেখতে পারছে। ইয়র্কার বলকে ফুলটস বানিয়ে কভারের দিকে ঘুরিয়ে সে সজোরে ব্যাট চালালো। পলক ফেলার আগে কভারে দাঁড়ানো ফিল্ডার সায়েমের পাশ কেঁটে বল ছুটে চলল সীমানার দিকে। এই সায়েম তাদের ক্লাসের ফার্স্ট বয়। যার বাবা আয়ানের বাবার বন্ধু। আয়ানের বাবা সবসময়েই তাকে বকা দিয়ে বলেন, "সায়েমকে দেখো, সব পরীক্ষাতে ফার্স্ট হয়! ওর পা ধুয়ে পানি খাও! তাও যদি ওর মত হতে পারো!" আজকে সায়েম দুই রানে আউট হয়েছে। আর এই বলটা যদি চার হয় তবে আয়ানের আজকের ইনিংসের স্কোর হবে ছাপ্পান্নো! আয়ানের তখনই ইচ্ছে হলো বাবাকে ডেকে বলে, "সায়েম আজকে তোমার ছেলের মতন হতে পারেনি বাবা! পরীক্ষার খাতা ছাড়াও পৃথিবীতে আরও অনেক কিছু আছে যেখানে হয়তো তোমার ছেলে অনেকের চেয়ে এগিয়ে! তুমিই কেবল বুঝলে না।" মাঠে উপস্থিত প্রতিটা ফিল্ডার হতাশ চোখে তাকিয়ে আছে বাউন্ডারির দিকে ছুটে চলা বলটির দিকে। আর কাইয়ুম দুইহাত শুন্যে ভাসিয়ে দৌড়াতে শুরু করেছে। দৌড়াতে শুরু করেছে মাঠের বাইরে অপেক্ষারত ব্যাটিং দলের অন্যান্য সদস্যরাও। রাশু এসে কাইয়ুমকে জড়িয়ে ধরলো। মনিব-ভৃত্যের ব্যবধান এই এক খেলাতেই গায়েব হয়ে গেছে। এই কাইয়ুমের পক্ষ্য নিয়েই আজ বিকেলে রাশু তার বাবার সাথে লড়াই করে ফেলেছে। বাবা যখন কাইয়ুমকে খেলতে আসার জন্য আরেক দফা মারতে যাচ্ছিলেন, রাশু তখন বাঁধা দিয়ে শান্ত স্বরে বলে, "কালকে যদি স্কুলে পড়া না পারার জন্য টিচার আমাকে মেরে হাতের আঙ্গুল ভেঙ্গে দেন, তখন তোমার কেমন লাগবে? কাইয়ুমও কারও ছেলে, আমাদের বাসায় কাজ করে খায়, এবং সেও একজন মানুষ!" রাশুর উচ্চশিক্ষিত, উচ্চপদস্থ সরকারী কর্মকর্তা পিতা তাঁর ক্লাস থ্রীতে পড়া পুত্রের কাছে জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান শিক্ষা পেলেন। মনুষ্যত্বের শিক্ষা! ব্যাট হাতে মূর্তির মতন দাঁড়িয়ে থাকা আয়ানকে সবার আগে এসে জড়িয়ে ধরলো মজিদ। অসাধারণ উইকেট কিপার মজিদের সাথে গত ছয়মাস ধরে পাড়ার কেউ মিশতে চায়না। কারণ তার বাবা জেল খাটা কয়েদী। আয়ানরাও মিশতো না। রাজীব স্যার বুঝিয়েছেন, "কারও বাবা খারাপ হলেই যে সেও খারাপ হবে এমন কোন শর্ত নেই। তবে তাকে খারাপের দিকে ঠেলে দিলে অবশ্যই সে খারাপ হতে বাধ্য। তোমরা যদি তার সাথে স্বাভাবিকভাবে মেলামেশা করো, ভাল খারাপের পার্থক্য বোঝাও, তাহলে হয়তো সমাজ একটা খারাপ ছেলে কম পাবে।" ওকে দলে রাখায় প্রথম প্রথম যে কী আপত্তি! রিয়াদ, টিপু, সালমানদের মতন “ভদ্র ছেলেরা” না খেলার হুমকি পর্যন্ত দিয়েছিল! একটা স্টাম্পিং এবং দুইটা অসাধারণ ক্যাচ ধরে মজিদ আয়ানের আস্থার মান রেখেছে! মজিদের সাথে সাথে পুরো দল এসে জড়িয়ে ধরলো আয়ানকে। শাহান-মুহিবদের কাঁধ ঝুলে পড়েছে, মাথা নিচু করে তারা দাঁড়িয়ে আছে। তাদের অহংকারের জবাব তারা পেয়ে গেছে। এইসবের কিছুই আয়ান দেখছে না। তার দৃষ্টি তখনও বাউন্ডারির বাইরে মুখ থুবড়ে পড়ে থাকা বলটির উপর স্থির। সব ক্লেশ, হীনমন্যতা, অভিমান, বৈষম্য - সবকিছুকেই যেন সীমানার ওপারে নিক্ষেপ করে দিয়েছে সে। ওসব ওখানেই পড়ে থাক। ওখানেই তাদের মানায়। মাঠের ভিতরটা কেবল ভাতৃত্বের জন্যই তোলা থাকুক। এখানে স্লোগান চলতে থাকুক, "আমার ভাই, তোমার ভাই!" "আয়ান ভাই! কাইয়ুম ভাই!" "আরও জোরে! আমার ভাই, তোমার ভাই!" "আয়ান ভাই! কাইয়ুম ভাই!"


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১০৮৩ জন


এ জাতীয় গল্প

→ শেষ ওভার

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now