বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
শেষ জীবনের গল্প – (পর্ব-০৫)
–লেখকঃ নাফিজ আহমেদ
বাসের জানালার ধারে বসে দূরের নীল আকাশ আপন মনে নিরীক্ষণ করছিল তালহা। কতই না অপূর্ব আল্লাহর এই সৃষ্টি! চোখে মুখে তার এক অপার্থিব আনন্দের ছায়া। কারণ, বহু বছর পর নিজের পিতাকে স্বচক্ষে দেখবে সে। সেই আনন্দে হৃদয়ের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বয়ে যাচ্ছে শিহরণ।
বিকেল তখন চারটা। গাড়ি পাঁচটায় আব্দুল্লাহপুর থেকে ছাড়বে। সময় যেন চলতে চাইছে না। বহু প্রতীক্ষার এই মিলনের ক্ষণ যেন দিগন্তে অপেক্ষা করে আছে তাকে বরণ করে নেওয়ার জন্য। এজন্য তালহা আর সময় নষ্ট করেনি, আগেভাগেই চলে এসেছে বাসস্ট্যান্ডে। ভাবছে, বাস যত দ্রুত ছাড়বে, তত দ্রুত সে পৌঁছাতে পারবে বাবা নামের সেই অমূল্য মানুষের কাছে।
আকাশে রঙ লেগেছে গোধূলির। হঠাৎ ড্রাইভার এসে বসলো তার আসনে। বোঝা গেল, এবার বাস ছেড়ে দেবে। তালহার চোখের কোনে চিকচিক করে উঠলো কিছু অশ্রুকণা—আনন্দে ভেজা মুক্তোর মতো ঝিকমিক করে উঠছে। যেন আবেগে ভেসে যেতে চায় সেই অশ্রুসমুদ্রে।
বাস ধীরে ধীরে গতি নিতে শুরু করলো। কিন্তু আজ আব্দুল্লাহপুরে প্রচণ্ড যানজট। গাড়ি একবার চলে তো আবার থেমে যায়। এইভাবে ধীরে ধীরে যাত্রাবাড়ী এসে পৌঁছায়। বাস কিছুক্ষণের বিরতিতে থামলো। এখানেই তাদের কোম্পানির কাউন্টার।
বাসের হেল্পার যাত্রীদের উদ্দেশ্যে বললো,
— "যাদের প্রয়োজন, দ্রুত সেরে ফেলুন। বাস দশ মিনিটের মতো থামবে।"
তালহাও দীর্ঘক্ষণ বসে থাকার পর একটু বাইরে বের হলো। প্রয়োজন সেরে ফিরে এল নিজের সিটে। মোবাইলটা বের করে সময় দেখলো—সন্ধ্যা সাতটা। ভাবছে, মাত্র এইটুকু পথেই দুই ঘণ্টা লেগে গেল! রাস্তায় আজ কী ভীষণ জ্যাম!
.
এদিকে, আমি আর ইমন বসে আছি বাদশা মিয়ার চায়ের দোকানে। মাগরিবের নামাজ পড়ে এসেছি সদ্য। আজ হুজুর নামাজে সূরা ফজরের শেষ কয়েকটি আয়াত তেলাওয়াত করছিলেন। আয়াতগুলো এতটাই হৃদয়স্পর্শী ছিল যে, যারা অর্থ বুঝতে পারছিল, তারা কান্না ধরে রাখতে পারেনি। এমনকি ইমাম সাহেবও কেঁদে ফেললেন।
আমি বাদশা মিয়াকে বললাম,
— "দুই কাপ রঙ চা দাও তো।"
চায়ের দোকানটা অনেক দিনের পুরনো। এখনো মনে পড়ে, জীবনের একেবারে শুরুতে—বয়স তখন ত্রিশ হবে হয়তো—আমি আর ইমন এই দোকানেই বসে চা খেতাম। তখন নতুন অভ্যাস ছিল, এখন অভ্যাসটাই পুরনো হয়ে গেছে। চা খেতে খেতে জিহ্বা যেন পুড়ে গেছে!
ইমন বলল,
— "বন্ধু, তালহাকে তো বলেছিলি... সে কবে আসবে রে?"
আমি হেসে বললাম,
— "তুই জানিস না? তালহা তো আজই ঢাকা থেকে বাসে উঠে গেছে। এতক্ষণে মনে হয় পথের অর্ধেকও পার হয়ে এসেছে।"
ইমন খুশিতে চোখ বড় বড় করে বলে উঠলো,
— "সত্যি? তাহলে আমার ছেলেটা আজ আমার বুকে ফিরে আসবে?"
— "আসবেই রে বন্ধু। আর চিন্তা করিস না। এখন তো যশোর আসতে ঢাকায় থেকে মাত্র তিন ঘণ্টার মতো সময় লাগে। আমাদের সময়ে তো এক-দুই দিন লেগে যেত।"
.
এদিকে, গাড়ি তখন নড়াইল ছাড়িয়ে যশোরের কাছাকাছি চলে এসেছে। তালহা ঘড়িতে তাকিয়ে দেখে, রাত দশটা বাজে। মনে হচ্ছে, আজকের পথ যেন শেষই হতে চায় না।
হঠাৎ ফোন এলো নাফিজ কাকার। জানতে চাইলেন,
— "কোথায় পৌঁছেছিস, বাবা?"
তালহা বললো,
— "এই তো কাকা, প্রায় যশোর পৌঁছে গেছি।"
— "সাবধানে এসো, বাবা।"
— "চিন্তা কোরো না কাকা।"
— "তোর আব্বু এখন আমার পাশেই বসে আছে। আমরা দুজন এশার নামাজ পড়ে এসে গল্প করছি। কথা বলবি তোর আব্বুর সঙ্গে?"
— "না কাকা, এখন না। একেবারে সামনে গিয়ে কথা বলব।"
— "ঠিক আছে বাবা। আর শোন, সোজা আমার বাসায় চলে আয়, বুঝলি?"
— "ঠিক আছে কাকা।"
.
হৃদয়ের গহীনে তখন ঢেউ খেলছে নানা অনুভব—আব্বুর সামনে গিয়ে প্রথমে কী বলবে? কেমন করে সামলাবে নিজেকে? আবেগে ভেসে যাবে না তো? নানা প্রশ্নে মন সজল।
এই ভাবনার মাঝেই বাস যশোর পৌঁছে গেল। তালহা মনিহার মোড়ে নেমে এলো। দীর্ঘ এক বছর পর যশোরে পা রাখল সে। এখন তো আর তেমন করে গ্রামের বাড়ি আসা হয় না। যখন বাড়িতে কেউ থাকে না, তখন আসার মতোন কেউ থাকে না বললেই চলে।
বাস থেকে নেমে অনেক খোঁজাখুঁজি করে একটা রিকশা জুটলো। গভীর রাতে রিকশা পাওয়া যে কত কঠিন! রিকশায় উঠে পালবাড়ির দিকে রওনা হলো। সেখান থেকে সিএনজি করে যাবে নাফিজ কাকার বাড়ি। আজ এত রাত, সম্ভবত কাকা তাকে বাড়ি যেতে দিবে না। আগে দেখা হোক বাবার সঙ্গে, তারপর না হয় দেখা যাবে বাকিটা...
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now