বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
শেষ জীবনের গল্প – পর্ব: ০৩
✍️✍️নাফিজ আহমেদ
চায়ের দোকানে বসে ধোঁয়া ওঠা গরম চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছি। ভাবছি—আজকের এই বিকেলটা আমার জীবনের সেরা বিকেলগুলোর একটি। এত ছেলেরা মসজিদে এসেছিল! কিছুক্ষণ বসে থাকার পর হঠাৎ পাশের চেয়ারে কে যেন এসে বসল। দৃষ্টি ফিরিয়ে তাকাতেই দেখি—পাশের গ্রামের ইমন! আমার শৈশবের প্রিয় বন্ধু।
আমরা দুজন ছোটবেলায় কত কিছু না একসাথে করেছি—খেলা, ঝগড়া, আবার মিলেমিশে হাসি আনন্দে দিন কাটানো। ইমন খেলাধুলায় সবসময়ই আমার চেয়ে একটু এগিয়ে ছিল। মার্বেল খেলায় তো প্রায়ই আমাকে হারিয়ে দিত।
ওদের বাড়ি গদাধরপুর, আমাদের মাশিলা। গদাধরপুর আমার নানাবাড়ি হওয়ায় শৈশবের বড় একটি অংশ সেখানেই কেটেছে। ওখান থেকে ইন্ডিয়ার সীমান্ত বেশি দূরে নয়।
আমি হতবাক দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে রইলাম। যেন মুখ দিয়ে কোনো শব্দই বের হতে চাচ্ছে না।
অবশেষে কণ্ঠে বিস্ময়ের ছায়া নিয়ে বললাম,
— "তুই... ইমন না?"
আমার দিকে বিস্ময়ভরা চোখে তাকিয়ে ইমনও বলল,
— "হ্যাঁ, আমি ইমন। এত বছর পর তুই কোথা থেকে এলি দোস্ত! তোকে তো খুঁজেই পেলাম না।"
আমি আনন্দে কেঁপে উঠলাম,
— "আমি নাফিজ! মনে নেই? ছোটবেলায় আমরা দুজন একসাথে থাকতাম সবসময়!"
ইমন এবার আমাকে চিনে ফেলল। চোখে জল, কণ্ঠে কান্না।
— "তুই... তুই নাফিজ! আমার বন্ধু নাফিজ!"
আমি বললাম,
— "হ্যাঁ, রে! আমি-ই তোর হারিয়ে যাওয়া বন্ধু। এত বছর কোথায় ছিলি রে?"
ইমন কণ্ঠ ভারী করে বলল,
— "বন্ধু, তুই জানিস না, ত্রিশ বছর আগে আমি আমাদের সীমান্তের জমিতে ঘাস কাটতে গিয়েছিলাম। হঠাৎ পিছন থেকে দুইজন বিএসএফ আমাকে ধরে নিয়ে যায়। ভাবছিলাম, হয়তো কিছু জিজ্ঞেস করবে। কিন্তু ওরা সরাসরি গ্রেপ্তার করল। কলকাতার এক কারাগারে আমাকে পাঠানো হয়।
কোন অপরাধে? শুধুমাত্র শূন্য পয়েন্টে ছিলাম এই কারণে! বললাম—ওখানে তো আমার জমি, আমার দেশ। কিন্তু কেউ শুনলো না।
ওরা বলল, আমি নাকি ইন্ডিয়ায় ‘ব্ল্যাক’ করতে গিয়ে ধরা পড়েছি। একের পর এক মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে দিল। সব মিলিয়ে আদালত আমাকে ত্রিশ বছরের কারাদণ্ড দেয়। সেদিন কোর্টে দাঁড়িয়ে হাউমাউ করে কেঁদেছিলাম। ভেবেছিলাম—আর কি কোনোদিন সন্তানের মুখ দেখতে পারব? মা-বাবার কোলে ফিরতে পারব? আমার গ্রামের ধুলোবালিও কি আর কখনো ছুঁতে পারব?"
ইমন থামল। আমি স্তব্ধ হয়ে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে আছি। গলার স্বর ভার করে বললাম,
— "তুই হারিয়ে যাওয়ার পরে আমি অনেক কষ্টে ছিলাম বন্ধু। সবসময় মনে হতো—কারো খুব আপনকে হারিয়ে ফেলেছি। তোর খোঁজ করতে করতে তোর মা চোখের জলে ভেসে ইহলোক ত্যাগ করলেন। স্ত্রীও অপেক্ষা করে করে ক্লান্ত হয়ে এক যুগ পর অন্যত্র বিবাহ করেন।
তোর ছেলে তালহা এখন ঢাকায়, সেখানেই স্থায়ী হয়েছে। বছরে একবার গ্রামের বাড়িতে আসে। আর তোর মেয়ে ইমার তিন সন্তান—দুই ছেলে, এক মেয়ে। ইমন, তোকে খোঁজার অনেক চেষ্টা করেছিল সবাই। কিন্তু তো তো ছিলি ভিন্ন দেশে, একেবারে হারিয়ে যাওয়া এক প্রান্তে!"
ইমন চুপচাপ শুনছিল। একসময় বলল,
— "বন্ধু, আজই বিকেলে এসেছি। এখনও কোথাও উঠিনি। বাড়িতে গিয়েছিলাম, সবকিছু যেন ভুতুড়ে, ধ্বংসস্তূপের মতো।"
আমি ওর হাত ধরে বললাম,
— "তুই আর চিন্তা করিস না। আজ থেকেই তুই আমাদের বাড়িতে থাকবি। আবার একসাথে থাকব, একসাথে সময় কাটাব। যেমন ছিলাম শৈশবে, তেমনই থাকব বৃদ্ধ বয়সেও।"
ইমন চোখ মুছে বলল,
— "তোর কথা শুনে মনে শান্তি পেলাম। অনেক কিছু বললাম আমি। এবার তুই বল, তোর খবর কী? পরিবারে কেমন আছিস?"
আমি হেসে বললাম,
— "ঐ তো, কোনোমতে চলছে। এক ছেলে, এক মেয়ে। মেয়ের দুই মেয়ে। আর ছেলে সিয়াম ব্যবসা করে সংসার চালায়। আমি এখন আর কিছু করতে পারি না, তাই মাঝে মাঝে ওর দোকানে বসে থাকি।
সিয়াম খুব ভালো ছেলে। আল্লাহ যেন হাতে ধরে এমন সন্তান দিয়েছেন। আমার যত্ন নেয়, নামাজ আদায় করে তাকবির উলার সাথেই।"
গল্প করতে করতে কখন যে সন্ধ্যা পেরিয়ে গেছে টেরই পাইনি। মসজিদ থেকে মুয়াজ্জিন সাহেব এশার আজান দিচ্ছেন।
আমি বললাম,
— "চল বন্ধু, মসজিদে যাই। নামাজ পড়িস তো?"
ইমন হেসে বলল,
— "এই বয়সে এসে নামাজ না পড়ে উপায় আছে? এক পা কবরের মুখে, আরেক পা এপারে।"
আমি একটু হাসলাম,
— "তুই তো আগে পড়তিস না, তাই বললাম। এখন দেখছি আমাকেই টেক্কা দিস!"
দুজনেই হেসে উঠলাম। তারপর একসাথে উঠে দাঁড়ালাম।
চললাম মসজিদের দিকে—বন্ধুত্বের, স্মৃতির, আর ঈমানের আলোয় পরিপূর্ণ এক যাত্রায়... চলবে...
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now