বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
শেষ জীবনের গল্প – পর্ব ০৬
✍️✍️ নাফিজ আহমেদ
নিশুতি রাত। আঁকাবাঁকা পথ পেরিয়ে সিএনজি ছুটে চলছে এক চিরচেনা আপন ঠিকানার উদ্দেশে। তালহার হৃদয়ের গভীরে বাবার প্রতি এক অমোচনীয় ভালোবাসা যেন আবারও প্রাণ ফিরে পাচ্ছে। দীর্ঘ আড়াই যুগের অপেক্ষার অবসান হতে চলেছে আজ।
প্রায় আধাঘণ্টা পর সিএনজিটি এসে থামল সেই বহু কাঙ্ক্ষিত বাড়ির সামনে—যেখানে তালহার জনকের প্রতীক্ষায় দিন গুনছিল সময়। সেই বাবা, যাকে জন্মের পর কোনোদিন চোখে দেখেনি সে।
ছোটবেলায় বাবার কথা জানতে চাইলে মা কিছুই বলত না। বলত শুধু, "তোর বাবা কোথায়, আমি নিজেও জানি না।" গ্রামের লোকেরা বলত, “তোর বাবা তোদের রেখে কোথায় যেন হারিয়ে গেছে।” এইসব কথা শুনে মা হাউমাউ করে কাঁদতেন। শেষে দীর্ঘ অপেক্ষার পর তিনি আর ফিরে না আসায় মা বাধ্য হয়ে আরেক জায়গায় বিয়ে করে সংসার পেতেছিলেন।
আহ! বাবা যদি ফিরে আসতেন তখনই—তবে হয়তো তালহার শৈশবটা এতটা একাকীত্বের হতো না।
প্রায়ই দেখা যেত, স্কুল ছুটি হলে সবার বাবারা এসে সন্তানদের নিয়ে যায়, অথচ তালহাকে কেউ নিতে আসত না। একা একা সে হেঁটে ফিরত আপন নীড়ে। আজ সেই বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে, পুরোনো স্মৃতির দরজাগুলো খুলে যাচ্ছে একে একে।
তালহা ভাবনার অতলে ডুবে থাকার সময় হঠাৎ সিএনজিওয়ালা ডাক দিয়ে বলল,
— “ও ভাই, আর কতক্ষণ এখানে দাঁড়িয়ে রাখবেন? ভাড়াটা দেন, আমি যাই।”
তালহা যেন হুঁশ ফিরে পেল।
— “দুঃখিত ভাই, আমি একেবারেই ভুলে গিয়েছিলাম। আসলে প্রায় এক বছর পর এই বাড়ির সামনে এলাম। আর দীর্ঘ ত্রিশ বছর পর আমার বাবার সাথে দেখা হতে যাচ্ছে—এ কারণে একটু আবেগপ্রবণ হয়ে গেছিলাম।”
— “সমস্যা নেই ভাই,” সিএনজিওয়ালা সহানুভূতির স্বরে বলল, “কিন্তু এত বছর পর দেখা হচ্ছে কেন? উনি কোথায় ছিলেন?”
তালহা ভারী কণ্ঠে বলল,
— “আমি নিজেও জানি না ভাই। বাবা ছোটবেলায় আমাদের রেখে কোথায় যেন চলে গিয়েছিলেন। গতকাল হঠাৎ বাবার এক পুরোনো বন্ধু ফোন দিয়ে সবকিছু জানালেন। এখন উনি এই বাড়িতে আছেন। আমাদের আসল বাড়ি পাশের গ্রামে—কিন্তু সেটি দীর্ঘদিন ফাঁকা থাকায় উনি এই বন্ধুর বাড়িতে উঠেছেন।”
— “তাহলে আর দেরি করবেন না ভাই। আপনি যান। হয়তো উনিও অধীর আগ্রহে আপনার অপেক্ষায় আছেন।”
তালহা বলল,
— “ঠিক বলেছেন। তার আগে বলেন, কত ভাড়া দেব?”
— “আপনার যা ইচ্ছা।”
তালহা আর দরাদরি না করে পাঁচশো টাকার একটা নোট বের করে দিল। লোকটি খুশিমনে চলে গেল। তালহা আর এক মুহূর্তও দেরি না করে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলেন নাফিজ কাকার বাড়ির দিকে।
রাত বেশ গভীর। হয়তো সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে তালহা হালকা কণ্ঠে ডাক দিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই নাফিজ কাকা দরজা খুলে দিলেন।
— “কাকা, আপনি এখনো ঘুমাননি?”
— “তুই আসবি বলে জানলে ঘুম কি আসে রে বাবা?”
কাকা ঘরের বাতি জ্বালালেন। তালহা জিজ্ঞেস করল,
— “বাবা কোথায় কাকা?”
— “এইতো, এখানেই ছিল, মনে হয় ওয়াশরুমে গেছে।”
ঠিক তখনই তালহার কণ্ঠ শুনে বাবা দ্রুত বেরিয়ে এলেন। তালহা বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল—এ যেন কোনো স্বপ্ন। ত্রিশ বছর পর নিজের বাবাকে দেখছে সে!
— “বাবা!” বলে চিৎকার করে উঠে গেল তালহা।
বাবা চোখ ভিজিয়ে বুকের গভীরে জড়িয়ে ধরলেন ছেলেকে। তালহাও জড়িয়ে ধরল বাবাকে।
সে যেন এক মা পাখির ডানার নিচে বাচ্চার আশ্রয় নেওয়ার মতো নিরাপদ, কোমল অনুভব। এ এক অনির্বচনীয় সুখ—ত্রিশ বছরের শূন্যতায় জমে থাকা সব কান্না যেন এই বুকে এসে গলে গেল।
তালহা আবেগে কেঁপে উঠল,
— “তুমি কোথায় ছিলে বাবা? আমাদের ফেলে কোথায় চলে গেলে? আমি তোমার মুখ পর্যন্ত মনে করতে পারি না...”
বাবা কিছু বলার আগেই পাশ থেকে নাফিজ কাকা চোখের জল মুছলেন। এ দৃশ্য তাঁর পক্ষেও সহ্য করা কঠিন। সবার চোখেই জল।
পরক্ষণে সবাই একটু শান্ত হয়ে ঘরে বসল। বাবা জিজ্ঞেস করলেন,
— “ইমার সাথে তোর যোগাযোগ হয়?”
— “তেমন না। মাঝে মাঝে কথা হয় কেবল।”
— “তাহলে চলো আগামীকাল ওদের বাড়ি যাই। আমি এসেছি, মেয়েটাকে তো এখনো জানাইনি। ভেবেছিলাম নিজেকে সামলাতে পারবে কি না, তাই কিছু বলিনি।”
— “আচ্ছা, যাব ইনশাআল্লাহ। তবে আগে বলো বাবা, আমাদের ছেড়ে কোথায় গিয়েছিলে?”
এবার বাবা নিজের জীবনের হারিয়ে যাওয়া অধ্যায়ের কথা বলা শুরু করলেন। তেমনি তালহাও শেয়ার করলো তার জীবনের সকল কষ্টের কথা।
রাত গভীর হতে লাগল। তিনজনেই কাঁদল, হেসে উঠল, জড়িয়ে ধরল। অনেকটা সময় পার হলো এভাবে। শেষমেশ একসাথে রাতের খাবার খেল সবাই। তালহা আসবে জানিয়ে রাখায়, এখনো কেউ খায়নি।
চলবে...
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now