বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

শাবকী দেবী-১

"ভৌতিক গল্প " বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রিয়েন সরকার (০ পয়েন্ট)

X অতিপ্রাকৃত গল্প "শাবকী দেবী" অপু তানভীর ---------------- (১ পর্ব) শুরুর আগের কথাঃ "আমি অভিশাপ দিয়ে যাচ্ছি । এই অভিশাপ তুই, তোর লোকজন আর তোর পরের সবাই বহন করবে । যতদিন তুই আর তোদের মানুষ তোর রক্তের কোন মেয়েকে আমার মত করে কষ্ট দিতে থাকবি ততদিন তোর গ্রাম বেঁচে থাকবে" লম্বা চুলের মেয়েটি আরও কিছু বলতে যায় কিন্তু আর পারে না ! পুরিহিত নিজ হাতে লম্বা চুলের মেয়েটির ঠোট সেলাই করে দিল ! তীব্র একটা চিৎকার বেরিয়ে আছে কিন্তু সেটা গলা দিয়ে বের হতে পারলো না ! এক -শরীরের যত ছিদ্র আছে সব সেলাই করে দেওয়া হয় ! বুঝেছো ? কথাটা বলেই জেন অন্য দিকে তাকালো ! ওর চোখ অন্য দিকে হলেও ওর ঠোঁটে একটা দুষ্ট হাসি দেখতে পাচ্ছিলাম ! আমি খানিকটা অবাক হয়ে জেনের দিকে তাকালাম । ওর বুচা নাকে ও একটু হাত দিয়ে ঘসে আবারও আমার দিকে তাকালো ! চোখে ওখনও একটা দুষ্টামী রয়েছে ! আমি ব্যপারাটা ভাবতেই আমার গায়ে একটু কাটা দিয়ে উঠলো ! আর এই মেয়ে নাকি হাসছে ! আমি চিন্তাটা দুর করার চেষ্টা করলাম ! কিন্তু কিছুতেই মন থেকে সেটা দুর করতে পারলাম না ! জেন বলল -এমন করছো কেন ? একবার ভেবে দেখো তুমি ভাবতেই পারছো না আর অন্য দিকে একটা মেয়ের উপর এরকম টা করা হয়েছে ! আমাদের পূর্বপূরুষেরা করেছে ! -এখন করে না তো ? জেন হেসে বলল -না ! এখন করা না ! -যাক ! বাবা ! আচ্ছা আর কোন বিকল্প নেই ! তুমি বলছিলে শাবকী দেবীর অভিশাপ থেকে বাঁচার জন্য আরও একটা উপায় নাকি আছে ! কথা বলতেই জেনের চোখে একটা কিছু উকি দিয়েই আবার নিভে গেল সাথে সাথে ! আমার দিকে তাকিয়ে আবার একটু হাসলো ! তবে অন্য উপায় কিংবা বকল্প উপায়টা আর আমাকে বলল না ! আমি ওর হাসি দেখে খানিকটা সময়ের জন্য কোথায় যেন হারিয়ে গেলাম ! মনে মনে বললাম এই মেয়ে এই মেয়ে এতো সুন্দর করে হাসে কেন ? জেন তারপর বলতে লাগলো -শাবকীর সন্তুষ্টির জন্য আমাদের কে এটা করতে হয় ! -না করলে ? -আমাদের উপরে বিপদ নেমে আসে ! এখন এই ২১ শতকেও এমন কথা শনে আমি মনে মনে একটু কৌতুক অনুভব করি ! কিন্তু সেটা মুখে প্রকাশ করি না ! পাছে জেনের খারাপ লাগে ! -কি রকম বিপদ ! সত্যিই কি তুমি এটা মনে কর যে শাবকী দেবীই এই কাজ টা করে ! জেন চট করেই এই কথাটার জবার দিল না ! তবে একটু যেন ভাবলো ! তারপর বলল -আসলে আমি কি মনে করি সেটাতে কি যায় আসে ! আমাদের গোত্রের লোকজন এটা বিশ্বাস করে ! আমি ছোট বেলা থেকেই এটা দেখে আসছি ! আমার কাছে সত্য মিথ্যা থেকে তাদের বিশ্বাসের মূল্যটা বেশি ! কৌতুহল থেকেই জিজ্ঞেস করলাম -কি রকম অভিশাপ নেমে আছে ? -এই মনে কর আমার ফসল নষ্ট হয়ে যায় ! পশুপাখি মারা পড়ে ! আর সব থেকে বড় সমস্যা হয় যে আমাদের পাহাড়ি এলাকার ঝর্ণার পানি গুলো শুকিয়ে যায় ! -সত্যি ! হুম ! এটা আমি নিজে দেখেছি ! -হয়তো শীত কালের কারনে পানি আসে না ! জানোও তো শীত কালে পাহাড়ি ঝর্ণার প্রবল স্রোত কমে আসে ! আমার কথা শুনে জেন কেবল হাসলো ! কিছু বলল না ! আমি আবারও ওর হাসি দেখে খানিকটা সময় অন্য কোথাও হারিয়ে গেলাম ! দুই জেনের পূর্ন নাম আইজনে তুড়ং ! আমি ওকে ডাকি জেন বলে ! আমার ক্লাসমেট ! আর ভাল করে বলতে গেলে মেয়েটাকে আমি অসম্ভব পছন্দ করি ! জেন নিজেও জানে ব্যাপার টা ! কিন্তু ওর আমার কাস্ট আলাদা বলে ও কিছু বলে না ! আমার ভালবাসাটাকে বুঝেও না বোঝার ভান করে থাকে । কিন্তু বলে কি আমার কাছ থেকে দুরে থাকবে ? তা থাকে না ! ক্লাসের বাইরের সব সময় সব থেকে বেশি সময় আমি ওস সাথেই থাকি ! সেই ছোট বেলা থেকেই আমার জাপানিজ নাক বুচা মেয়ে খুব পছন্দ ! কেমন সুইট ওদের চেহারা হয় ! নাকটা একটু বুচা হয় তাতে কি হয়েছে ! আমার তো মনে হয় নাক বুচার কারনে ওদের সৌন্দর্য্য আর কয়েক গুন বেড়ে যায় ! এখন এদেশে তো সহজে জাপানিজ কিংবা চাইনিজ মেয়ে খুজে পাওয়া যাবে না, কিন্তু আমাদের পাহাড়ি এলাকায় বসবাস করা উপজাতিরা সেই অভাব পূরন করে দিয়েছে ! জেন প্রথম যেদিন আমাদের ক্লাসে এল সত্যি বলতে কি ওকে দেখে আমার দম বন্ধ হয়ে এল ! আমি প্রথম বছরটা জেন কে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখতাম ! আরও দুজন উপজাতি ছেলে মেয়ে ছিল আমাদের ক্লাসে ! কিন্তু তাদের মত মোটেই ছিল না ও ! কারো সাথেই বিশেষ করে কথা বলতো না ! এমন কি ঐ উপজাতি ছেলে মেয়েদুটোর সাথেও না ! আমি একটা অবাক হয়ে লক্ষ্য করে দেখতাম যে কেবল আমাদের ক্লাসের কারো সাথেই নয় বরং জেন কারো সাথেই ঠিক মত মেশে না ! প্রয়োজন না হলে কথা বলে না ! আর ওরাও জেন কে একটু এড়িয়ে চলে ! কারন টা কি কে জানে !! ক্যাম্পাসে একদিন কি একটা অনুষ্ঠান হচ্ছিলো আদিবাসী না উপজাতিদের নিয়ে ! আমি কিছুটা সময় এদিক ওদিক তাকিয়ে জেনকে খুজতে লাগলাম কিন্তু কোথাও দেখতে পেলাম না ! দেখার ইচ্ছে ছিল ও কি রকম সাজ দিয়ে এসেছে ! না পেয়ে ভীড় থেকে বেরিয়ে এলাম ! কিছু দুর যেতেই দেখি আইজেন একটা গাছের নিচে চুপ করে বসে আছে । মুখটা একটু যেন মলিন ! কি মনে হল সাহস করে এগিয়ে গেলাম ! -তুমি অনুষ্ঠানে নেই কেন ? জেন আমার দিকে চোখ তুলে তাকালো ! কিছুটা সময় ভাবলো কি বলবে ! আমি ভাবলাম হয়তো বিরক্ত হয়ে জবাব দিবে না ! কিন্তু জবাব দিল ! বলল -আমি আসলে ওদের গোত্রের নই ! -এখানে সবাইকেই দেখলাম ! মানে এতো উপজাতীদের অনুষ্ঠান ! -আমি ওদের গোত্রের নই ! -ও ! বসবো একটু ? -বস ! -হাই ! আমি ....... -আমি জানি তুমি কে ? আমার ক্লাসে গত দু বছর ধরে আমাকে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখা ছেলেকে আমি চিনবো না ? এই বলে জেনের চোখে একটা হাসি দেখতে পেলাম ! আমি কি বলবো কথা হারিয়ে ফেললাম ! এতোটা অবাক আমি আসলেই এর আগে হয়েছি বলে মনে পড়তো না ! লজ্জা মিশ্রিট হাসি দিয়ে ওর দিকে তাকালাম ! তার থেকেও বড় কথা আমার মনের ভেতরে আনন্দের স্রোত বয়ে যাচ্ছিলো ! আমি যে ওকে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখি এটা জেন ঠিক টের পেয়েছে ! -সরি ! -সরি কেন ? -না মানে তুমি বিব্রত হয়েছো হয়তো ! -তোমাকে কে বলল যে আমি বিব্রত হয়েছি ! এই বলে জেন আবারও হাসলো ! হাসি দেখে আমি খানিকটা বাক্য হারা হয়ে গেলাম ! এই মেয়ে এতো সুন্দর করে হাসে কেন ? এটা তো রীতিমত অন্যায় ! ঐ দিন থেকেই শুরু ! তারপর আমাদের কথা দিন দিন বাড়তে লাগলো ! ওর যে কেবল চেহারা সুন্দর এই জন্যই ওর সাথে মিশি তা নয় ! ওর নিজের গোত্র সম্পর্কে আমার বেশ আগ্রহ জন্মে গেল কদিনের ভেতরই ! বাংলাদেশে যে কয়টা উপজাতি গোষ্ঠী ছিল আইজেন তুড়ং সেই গোষ্ঠীর কেউ ছিল না ! ও আমাকে জানালো যে ওদের গোষ্ঠীর কথা আসলে কেউ স্বীকার করে নিতে চায় না ! বাংলাদেশের সব উপজাতি থেকে ওদের গোষ্ঠীটা আলাদা ! কেবল মাত্র খাগড়াছড়ির একেবারে শেষ প্রান্তে ওদের বসবাস ! ঠিক বাংলাদেশ আর মিজোরাম সীমান্তের কাছে ! পাহাড় আর বন এতো গভীর যে ওদের খোজ নাকি ওনেকেই জানে না ! যদিও এখন সেখানে যাওয়ার পথ অনেকটাই সুগম করে নিয়েছে ওদের নিজেদের প্রয়োজনে ! তবুও বাইরের লোকেদের সাথে ওদের মানুষজন নাকি একদম মেশে না ! এমন কি কেউ তাদের পাড়ায় কিংবা গোত্রের ভেতরে যাক সেটা তারা কিছুতেই পছন্দ করে না ! আর সেটা দেশের একেবারে শেষ সীমান্তে বলে মানুষজন সেখানে যায়ও না ! আইজেনের গোষ্ঠীর নাম তুনতি ! ঐ এক মাত্র মেয়ে নাকি যে খাগড়াছড়ি শহরে এসে পড়া লেখা করেছে । ওর বাবা ওদের গোষ্ঠীর সরদার (রাজা) বলেই হয়তো এটা সম্ভব হয়েছে ! সেই হিসাবে আইজেন একজন প্রিন্সেস ! প্রিন্সেস জেন ! তা ছাড়া ও ওদের কালচার আর নিয়ম সম্পর্কে এমন কিছু কথা আমাকে বলেছিল আমি খানিকটা ভড়কে গিয়েছিলাম ! বিশেষ করে শাবকী দেবীট কথা শুনে তার আরাধনার পদ্ধতি শুনে ! সেই কৌতুহল থেকেই এবারের গ্রীষ্মের ছুটিতে যখন জেন আমাকে বলল ওর সাথে কদিন বেড়িয়ে আসতে আমি কিছুতেই সেটা ফেলতে পারলাম না ! একে তো ওর সাথে আরও কিছুটা সময় থাকা হবে ! আর অন্য একটা কথা যে ওদের কালচারটা আরও কাছ থেকে দেখা হবে ! তবুও মনে একটু সংসয় ছিল ! ওর বাবা একজন রাজা ! আমি গোত্রের বাইরের একজন মানুষ ! আমি গেলে আবার কোন সমস্যা হবে না তো ! আইজেন কে কথাটা বলতেই ও হাসলো ! তারপর বলল -সেই সমস্যা থাকলে আমি কি তোমাকে বলতাম ? বলতাম না ! -সত্যি সমস্যা হবে না তো ? তুমি না বললে বাইরের লোকজন সেখানে এলাউড না ! -বাইরের লোক আর তুমি তো এক নও ! -কি রকম ? আমার এই কথার জবার জেন দিল না ! কেবল হাসলো ! সেই রহস্যময় হাসি ! কিছু একটা বলতে চেয়েও বলল না ! কিছু সময় চুপ থেকে আবার বলল -আর এবার গেলে হয়তো শাবকী দেবীর উৎসবটাও দেখতে পাবে ! -সত্যি নাকি ? -হুম ! আর সপ্তাহ খানেক বাদেই সেটা শুরু হবে ! শাকবী দেবী ওদের গোষ্ঠীর একজন দেবী ! আরও ভাল করে বললে অপদেবী, অত্যাচারের দেবী ! কয়েক বছর পর পরই নাকি এই দেবীর অভিশাপ নেমে আসে ওদের তুনতি গোষ্ঠীর উপর । তখন গোষ্ঠীর রাজার কোন বংশধরকে সেই অভিশাপ কাটানোর জন্য কঠিন পরীক্ষার ভেতরে দিয়ে যেতে হয় ! এই দায়িত্বটা নাকি রাজার মেয়ের উপর বর্তায় ! যখন দেবী অসন্তুষ্ঠ হয় তখন কোন মেয়েকে দেবীর মন্দিরে নিয়ে গিয়ে অমানুষিক শারীরিক নির্যাতান সহ্য করতে হয় ! সেই হিসাবেই নামি মেয়েটার শরীরের সমস্ত ছিদ্র সেলাই করে দেওয়া হয় ! শরীরে ফুটানো হয় এক হাজার একটা সুই ! যাওয়ার পথেই জেন এই সব কথা আমাকে বলতে বলতে যাচ্ছিলো ! আমি কেবল অবাক হয়ে শুনছিলাম ! -এখনও কি এমন টা হয় ? -আরে মাথা খারাপ নাকি ! অনেক আগে হত ! এখন আর হয় না ! তবে আমরা সেই সংস্কৃতটা ধরে রেখেছিল ! কিছু আচার ব্যবস্থা করা হয় ! -সেলাই !! জেন আমার দিকে তাকিয়ে হাসলো ! -কিছু না । কেবল একটা সুই ফুটানো হয় ! আর বাকি গুলো কলা গাছের গায়ে ফুটানো হয় ! -যাক ভাল ! তিন বাসে ভেতরে বসে বসেই কথা চলতে থাকে ! গত রাতে ওর সাথে বাসে উঠেছিলাম সকাল বেলা পৌছে গেলাম ! আমরা স্ট্যান্ডে পৌছানোর আগেই দেখি আমাদের নেওয়ার জন্য একটা জিপ গাড়ি এসে হাজির ! ব্যাগ নিয়ে সামনে যেতেই দুজন এগিয়ে এল ! চেহারা দেখেই মনে হল ওরাও জেনের চেনা চোক ! জেন দেখে মাথা কুর্নিশ করে সালাম করলো ! ঠিক যেমন রাজকুমারীকে দেখে সালাম করে ! আমি হেসে বললাম -দেখা যাচ্ছে তুমি সত্যি রাজকুমারী ! -সাট আপ ! এখন রাজা ফাজা কেউ আছে নাকি ! এটা কিছু না ! জেন কিছু না বললেও লোক দুজনের আচরনে সত্যিই সত্যিই মনে হল ও আসলেই একজন রাজকুমারী ! আর আমি যেহেতু রাজকুমারীর বন্ধু আমার দাম কম নয় ! আমার কাছ থেকে প্রায় জোর করেই ব্যাগ টা কেড়ে নিল ! কিছুতেই আমাকে নিতে দিবে না ! আমাদের গাড়িতে তুলে দিয়ে দেখলাম গাড়ি ছেড়ে দিল ! কিন্তু ঐ দুজন উঠলো না ! আমি বললাম -ওরা যাবে না ? -যাবে । -তাহলে এই গাড়িতে আসলে সমস্যা কি ? জেন হাসলো ! ! তারপর বলল -এটা রাজকুমারী বাহন ! ওরা কিভাবে এখানে চড়বে ? -হুম ! তাহলে আমার কথাই সত্যি দেখা যাচ্ছে ! তারপর আমি সিট থেকে নেমে হাটু ভাজ করে বসে বললাম -সেনোরিটা আমি কি আপনার পাশে বসার অনুমুতি পেতে পারি ? ঠিক তখনও জেন একটা কাজ করলো ! আমার কপালে একটা চুূমু খেল ! চুম খাওয়ার সাথে সাথে ওর দিকে তাকিয়েই দেখি ওর চোখে একটা বিষাদের ছায়া ! কিন্তু পরক্ষনেই সেটা মিলিয়ে গিয়ে সেখানে আবার হাসিটা চলে এল ! আমার মনে যেন একটা সাহস বেড়ে গেল ! এতো দিন আমি ওর ঠোটে চুম খাওয়ার জন্য পাগল হয়ে ছিলাম কিন্তু ও কোন প্রকার প্রস্রয় দেয় নি বলে এগোই নি ! কিন্তু আজকে মনে হল সেটা অনেকটাই পেরিয়ে চলে এসেছি ! আমি ওর পাশে বসতে বসতে এবার ওর ঠোটে চুম খেলাম ! ও বাধা দিল না ! একবার দুবার ! তিনবার ! আরও একবার খাওয়ার ইচ্ছে ছিল কিন্তু গাড়ি থেমে যাওয়ায় থেমে গেলাম ! আপাতত চুমু বিরতি দিলাম ! ভেবেছিলাম সময় গাড়ি চলতে শুরু করলে আবার শুরু করা যাবে ! জেন গাড়ির ড্রাইভার করে কিছু বলল ওদের ভাষায় ! ড্রাইভার গাড়ি রেখে চলে গেল ! আমি তখনও জেনের দিকে তাকিয়ে আছে ! মেয়েটা আজকে হঠাৎ আমার সাথে এমন আচরন করলো কেন ? ঠিক বুঝলাম না ! অবশ্য মেয়েদের বুঝতে পারে এমন মহারথি এই দুনিয়ার কে আছে ! জেন তখনও অন্য দিকে তাকিয়ে আছে ! -জেন ! -হুম ! -থ্যাঙ্কিউ ! এবার ও কিছু বলল না ! কেবল হাসলো । তবে প্রানবন্ত হাসি না ! একটু যেন জোর করে হাসা ! হঠাৎ করেই যেন কিছু নিয়ে চিন্তিত হয়ে উঠেছে ! আমি আরও কিছু বলতে যাবো ঠিক তখনই দেখলাম একটা ১৫/১৬ বছরের ছেলে গাড়ির পেছনে চলে এসেছে ! জেনকে দেখে কিছু বলল ওদের ভাষায় ! প্রতি উত্তরে ও নিজেও কিছু বলল ! আমি কিছু বুঝলাম না আমার দিকে তাকিয়ে ছেলে একটু হাসলো ! তারপর জেন বলল -ও আমার কাজিন ! ওর নাম সাং । এবার ইন্টারে উঠেছে ! আমি হাসলাম ! -উঠে আয় ! সাং গাড়িতে উঠে এল ! বুঝলাম চুমু পর্ব আর শুরু হবে না আপাতত ! কিন্তু একটা ব্যাপার আমি লক্ষ্য করলাম যে জেনের মুডটা সেই যে হঠাৎ করেই অফ হয়ে গেছে সেটা আর ফিরে আসে নি ! ও অবশ্য হাসি মুখেই আছে কিন্তু আমার কাছ থেকে ব্যাপার লুকালো না ! অবশ্য আমি জানতে চাইলাম না ! ও নিশ্চয়ই কিছু একটা নিয়ে চিন্তিত ! পরে ভাল করে জেনে নেওয়া যাবে ! কতটা পথ যে পার হলাম সত্যি বলতে পারবো না ! গাড়ি পাহাড়ি পথ বেয়ে চলেছে তো চলছে ! যেন এ আর শেষ হওয়ার নয় ! পাহাড়ি হলেও এই রাস্তাটাতে জিপ চলার উপযোগী করা হয়েছে । ওরা নিজেদের সুবিধার জন্য করে নিয়েছে ! আমার মনের কথা বুঝতে পেরেই সাং বলল -এটা আমরা বানিয়ে নিয়েছি ! এটা কেবল আমাদের চলাচলের জন্য ! অন্য কেউ এটা দিয়ে আসতে পারবে না ! -একে বারে গ্রাম পর্যন্ত ? -হুম! আসলে আমার বেশ কিছু ফসল বাজাকে আসে তো তাই ! পরিবহনের জন্য ! চার জেনদের গ্রাম টা বলতে গেলে সীমান্তের একেবারে কাছেই । চারিদিক থেকে তিন টা পাহাড় গ্রাম টাকে ঘিরে রেখেছে । ঠিক তার মাঝখানে ওদের গ্রামটা । কিছুদুরের পথ একেবারেই দুর্গম ! আমাদের যেমন বাস স্ট্যান্ড থাকে ঠিক তেমন ওদের গ্রাম থেকে একটু দুরে এসে আমাদের জীপটা থেমে গেল ! এখানেও দেখলাম আও কিছু জিপ গাড়ি দাড়িয়ে আছে ! জেন নামতেই ওকে আসে পাশের সবাই কুর্নিশ করে সালাম করলো ! জেন বলল -এবার আমাদের একটু হাটতে হবে ! পারবে তো ? -আরে পারবো না মানে ? তুমি জানো আমি পুরো বান্দরবনের পাহাড়ি এলাকা হেটে পার হয়েছি ! -হয়েছে ! এই গল্প তুমি আমার কাছে হাজার বার করেছো ! মাসে কাছে মাসির গল্প ! -আরে পারবো পারবো ! চলতো ! জেনের এলাকায় পৌছে আসলেই পারত পক্ষে রাজার আভ্যর্থনা পেলাম ! এতোদিন কেবল টিভি মুভিতেই কেবল এমন দৃশ্য দেখেছি এখন দেখছি নিজের সাথেই এমন হচ্ছে ! জেনের আব্বাও একজন অমাইক মানুষ ! গ্রামের অন্যান্য মানুষ বাংলাটা ঠিক মত বলতে না পারলেও রাজা খুব চমৎকার বাংলা বলেন ! জেনের মা দেখলাম খুব ভাল বাংলা বলে না । জানা গেল গ্রামের অধিকাংশ মানুষই কোন দিন এই গ্রামের বাইরে যায় নি ! অল্প কয়েকজন মানুষ বাইরের মানুষের সাথে যোগাযোগ করে । আমি ঘুরে ঘুরে সব কিছু দেখতে লাগলাম ! তবে একটা ব্যাপার আমার কাছে একটু যেন কেমন মনে হল যে সবাই আমার দিকে কেমন চোখে যেন তাকাচ্ছিল । আমি জেনের সাথে সারাটা গ্রামটা যখন ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম তখনও আমার কাছেই ঠিক এই ব্যাপার টাই মনে হচ্ছিলো । হয়তো আমি নতুন কেউ বাইরের কেউ এই জন্যই সবাই আমার দিকে এমন ভাবে তাকাচ্ছিলো ! আমি খুব বেশি আমলে নিলাম না ! জেন বলল -ইগনোর দেন ! -কি ! -বললাম ওদের দিকে বেশি মনযোগ দিও না ! গত প্রায় বছর দশেকের মধ্যে তুমিই এক মাত্র বিদেশী ! ওদের একটু কৌতুহল তো হবেই ! তাই না ! -তাই নাকি ! যাক সমস্যা নেই ! পুরো গ্রামের ভাব দেখলেই বুঝো যাচ্ছিলো যে তারা কোন উৎসবের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে ! আমি একটা অন্য রকম অনুষ্ঠানের জন্য তৈরি হতে লাগলাম ! কেমন হবে কে জানে ! এরকম উপজাতির উৎসব আচার অনুষ্ঠান বলতে গেলে এই প্রথমবার কাছ থেকে দেখতে পাবো ! তবে একটা ব্যাপার আমার কাছে একটু যেন কেমন লাগলো ! গতবার যখন আমি পুরো বান্দরবান ঘুরে এলাম সেখানে জায়গায় কেবল ঝর্ণা দেখতেছি । কেবল বড় বড় ঝর্ণা সেটা নয় ! ছোট বড় অসংখ্য ঝিরি পথ ! আর এখন সময় টা গরমের শেষ সময় ! ঢাকায় থাকতেও বেশ কয়েকবার বৃষ্টি হয়েছে । তাহলে আমার চোখ এখনও একটা ঝর্ণা পড়লো না কেন ? একটা ছোট ঝিরি পথও নেই ! কেবল ওদের গ্রামে পাশ দিয়ে একটা ছোট্ট নদী দেখতে পেলাম তবুও সেটা প্রায় শুকিয়ে যাচ্ছে অথচ এখন তো ওটার পানি বাড়ার কথা ! কি জানি সমস্যা ! পাহাড়ি এলাকায় আসলাম অথচ ঝর্ণা দেখলাম না ! এটা কেমন হয় ! পাঁচ পরদিন জেন আমাকে শাবকী দেবীর মন্দিরেও গেল ! খোলা জায়গার চারিপাশে গাছ গাছালির সারি ! ঠিক তার মাঝে খোলা একটা জায়গা ! তার মাঝে চারটা কাঠের চার টা থামের উপর গোলাকার ছাদ দাড়িয়ে আছে । সেইটা হচ্ছে মন্দির ! চার পাশে দেওয়াল নেই কোন ! মন্দিরের শাবকী দেবীর মুর্তিটা এক পাশে রাখা ! কালো কষ্টি পাথরের সম্ভবত ! ছিপছিপে দেহ ! কিন্তু একটা ব্যাপার দেখে আমার নিজের কাছেই কেমন লাগলো ! অন্যান্য মন্দির মত মূর্তি গুলো বসে কিংবা দাড়িয়ে নেই । মুর্তিটাকে যেন দুইহাত এক সাথে করে বেঁধে রাখা হয়েছে । দুই পা দুটো দুই দিকে এমন পজিশনে রাখা হয়েছে যেন হাত এবং দুই পায়ে রমধ্যকার সৃষ্ট কোণ সমান হয় !আরেকটা জিনিস আমার গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠলো ! কারন স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে দেবী নাক মুখ কান এগুলো কেমন সেলাই করে জুড়ে দেওয়া ! আমি কিছুটা সময় তাকিয়ে থেকেই চোখ সরিয়ে নিলাম ! এই দৃশ্যের দিকে খুব বেশিটা সময় তাকিয়ে থাকা উপায় নেই । মুর্তিটা একটা বেদির উপর রাখা আছে । মন্দিরের মুর্তিটার ঠিক মিটার দুয়েক দুরে একই রকম আরেকটা বেদি রাখা আছে । কিন্তু সেখানে কোন মুর্তি নেই ! আমি জেনকে বললাম কথাটা ! -এখানে কি আরেকটা মুর্তি থাকে ! আমার কথা শুনে জেন হাসলো ! তারপর বলল -ঠিক মুর্তি না ! এখানে সেই মেয়েটাকে রাখা হয় ! -তাই নাকি ! -হুম ! ঠিক যেভাবে দেবী আছে ঠিক সেই ভাবে ! কথা মনে হতেই মনে হল আরে জেন তো রাজার মেয়ে । সেই হিসাবে জেন কেও কি এইভাবে রাখা হবে ? আমার চেহারার ভাব দেখেই জেন বুঝে ফেলল আমি মনে মনে কি ভাবছি ! হাসলো একটু ! আমি অবিশ্বাসের ভাব নিয়ে তাকালাম জেনে দিকে ! জেন বলল -হ্যা ! আমিও এখানে দাড়াবো ! -এভাবে ? মুর্তিটাকে দেখিয়ে বললাম ! -হুম ! -ও মাই গড ! নো ! দিস ইজ ইনসেইনস ! জেন কেবল হাসলো ! জেন ঠিক একই ভাবে শাবকী দেবীর মত করে বেঁধে রেখে কিছু পুরোহিত তার চারিপাশে পুজা করছে এটা ভাবতেই আমার মাথা টা চক্কর দিয়ে উঠলো ! এদের মাথায় আসলেই বড় রকমের সমস্যা আছে ! মন্দিরটা বেশ বড় ! ঘুরতে ঘুরতে দেখলাম মন্দরীরের এক স্থানে খুব যত্ন করে অনেক লেবু সাজিয়ে রাখা হচ্ছে ! আমি জেনের কাছে জানতে চাইলাম এগুলো এখানে কেন ? শাবকী দেবীর পুজার জন্য কি লেবু দরকার ? জেন বলল -ঠিক পুজার জন্য না ! আসলে শাবকীর অনিষ্ঠ থেকে সাময়িক ভাবে এই লেবু গুলো আমাদের রক্ষা করবে ! শাবকী সব কিছু সহ্য করলে পারলেও এই লেবুর গন্ধ সহ্য করতে পারে না ! তাই কথিত আছে যে যখন পুরোহিতেরা শাবকীর জন্য পুজা করে তখন নিজেদের নিরাপত্তার জন্যই নাকি এই লেবু নিয়ে থাকে ! মন্দির থেকে বের হয়ে আমি তাকিয়ে রইলাম কিছুটা সময় ! জেন কে বললাম -এটা কবে তৈরি হয়েছে ! খুব বেশি পুরানো মনে হচ্ছে না ! -হুম ! এটা বছর ১০ আগে বানানো হয়েছে ! আরেকটা মন্দীর আছে ! সেটা আরও ভেতরে ! ঐ যে ঐখানে ! জেন আমাকে হাত দিয়ে দুরের একটা পাহাড় নির্দেশ করলো ! -অনেক দুরে ওটা ! আর পথ টা খুব বেশি দুর্গম ! ওখানে আমরা এখন আর যেতে পারি না ! যাওয়া সম্ভবও নয় ! মিজোরামের ভেতরে চলে গেছে সেটা ! ওখানে যাওয়া সম্ভবও না ! ঐ দিন রাতে খুব ভাল খাওয়া দাওয়া হল ! আর একদিন পরেই শাবকী দেবীর পুজা হবে ! প্রায় সব প্রস্তুতি নেওয়া হয়ে গেছে ! আমি আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছি কিন্তু সবার সেই চোখের দৃষ্টিটা আমার কছে মোটেই ভাল লাগছে না ! এদিকে জেনও যেন কেমন মন মরা হয়ে গেছে আরও । আমি কথা বলতে গেলে জোর করে হাসি ফুটিয়ে কথা বলছে কিন্তু ওর চেহারা দেখে মনে হচ্ছে ও নিজেকে খুব বেশি অপরাধী মনে করছে । যেন খুব একটা অপরাধ করে ফেলেছে এমন কিছু ! (পরবর্তী পর্ব কিছু সময় পর) -------------------------- ।। একাকী কন্যা ।।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১০৮০ জন


এ জাতীয় গল্প

→ শাবকী দেবী-১

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now