বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

সেই পিছুডাক

"রোম্যান্টিক" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রিয়েন সরকার (০ পয়েন্ট)

X সেই পিছুডাক... -- নওশীন শিকদার অমর একুশে বইমেলায় এসেই বাংলা একাডেমীর তিনতলায় যাই আসিফের সাথে,আমার বন্ধু আসিফ এবারের বইমেলার আয়োজনে জড়িত।তিনতলা থেকে নামার পথে থমকে গেলাম করিডোরে খোলা বারান্দায় বাতাসের তুমুল আলোড়নে,মাঘের বিকেল ফাল্গুনের আগমনী বার্তা জানিয়ে যাচ্ছে এ বাতাস। ঢাকা শহরের কোনো দালানের করিডোরে যে এতো বাতাস উড়োউড়ি করতে পারে সেটা আজকের আগে জানা ছিলনা আমার। রেলিং ঘেঁষে দাড়ালাম আসিফকে সঙ্গে নিয়ে... বেশীক্ষণ দাড়ানো গেলনা। আসিফের আবার খোলা হাওয়ায় একটু বেশীই সিগারেট টানার স্বভাব ,যদিও আসিফকে দেখলে কেউ প্রথমত বুঝতেই পারবেনা যে আসিফের মতন মধ্যবয়সী আর এতো ভোলাভালা চেহারার কোনো পুরুষও এমন পাক্কা সিগারেটখোর হতে পারে! আর আমার সিগারেটের গন্ধ একদম সহ্য হয়না। আসিফ আমাকে এজন্য প্রায়ই খোঁচায় আর হেঁয়ালি করে বলে 'মনির,তুই কেমন পুরুষ রে? সিগারেট সহ্য করতে পারিসনা! আমার তো মনে হয় আমি সিগারেটের তীব্র গন্ধের প্রতি নেশা নিয়ে জন্মেছি মায়ের পেট থেকেই...' আমি আসিফের রসিকতা হালকা ভাবেই নিই,বয়স হচ্ছে আমার। এখন সবকিছুই কেমন হালকা মনে হয়,শুধু হালকা মনে হয়না মুনমুনকে ঘিরে আমার ভালোবাসার অভিপ্রায়। এমন বাতাসে একটা সময় খুব ঘুড়ি ওড়াতাম, চিটাগাং গেলে এবার আমার ঘুড়িগুলো নিয়ে আসব... আদর আর আঁচলকে দিয়ে দিব ওগুলো,প্রতিবারই আনি আনি করে আনা হয়ে ওঠেনা ঘুড়িগুলো। ঘুড়ি ওড়ানোর শখ ছেলেবেলা থেকেই আমার তেমন ছিলনা এজন্যই বাবা আমাকে নিরামিষ বালক বলতেন। মুনমুনের সাথে প্রেম করার সময়কালীন এ অভ্যাসটা গড়ে ওঠে,ঘুড়ি ওড়ানোর নেশা মুনমুনের। সেসময় ঢাকার কোনো মেয়ের যে এমন নেশাও থাকতে পারে তা নিজ চোখে না দেখলে আমার বিশ্বাস হতনা।আগে শুনতাম ভালোবাসলে একজনের নেশা আরেকজনের মধ্যে সংক্রামিত হয়,আমি হেসে উড়িয়ে দিতাম এমন কথা। কিন্তু বাস্তবতার পৃথিবীতে প্রত্যক্ষ করলাম আমার মাঝেও মুনমুনের ঘুড়ি ওড়ানোর নেশার বিস্তার ঘটেছে আমারি অজান্তে! একদা আসিফের মতন সিগারেটের নেশা আমারও ছিল, এই নেশার অভ্যাস অনভ্যাসে পরিনত হবার কাহিনীটা মনে পড়ে যায়।আসিফের সাথে পরিচয় বেশীদিন নয় তবে ঘনিষ্ঠতা বেশ,ওকেই শোনাই সেসব কাহিনী... ' আমি চিটাগাংয়ের ছেলে আর মুনমুন ঢাকার মেয়ে।সেবছর ঢাকায় বেড়াতে এসে একুশের বইমেলায় প্রথমবার আসি আমি ,মুনমুনকে সেই প্রথমবার দেখি... ঘনকালো রাতের মতন ঢলঢলে চুল প্রায় হাঁটুসমান, কপালে কালো টিপ,সাদা জমিন আর কালো পেড়ের শাড়িতে অভাবনীয় চাঞ্চল্যময় এক অপরিচিতা কিশোরী, এক গোছা চুল কানের লতির পেছনে সরিয়ে নজরুল মঞ্চের পেছনদিকটায় গল্প করছিল ও এক বান্ধবীর সাথে। আহামরি সুন্দরী না হলেও চেহারায় একটা অবাধ্য মায়ার নৈকট্য। ওর কাঁচের চুড়িতে ভরাট হাত দুটো তখন বেশ ব্যস্ত সদ্য কেনা বইগুলোর ভার সামলাতে।কিন্তু শখের শাড়ির আঁচল সামলাতে গিয়েই বুঝি বই আর সামলানো হয়ে উঠলনা ওর, কিছু বুঝে ওঠার আগেই কাগজের প্যাকেট ছিড়ে বইগুলো "ধপাস!" করে মাটিতে পড়ে। সকালে বৃষ্টি হলেও বিকেলের সময়টাতেও মাটিতে কাদা থকথক করছিল... এখন কাদায় মাখামাখি নতুন বই,আর তা দেখে ওর কাঁদো কাঁদো চেহারা। হঠাৎই 'ভ্যাঁ... ভ্যাঁ...' করে কান্না শুরু করে মুনমুন! আমি অপর পার্শ্বেই বসা,সিগারেট টানছিলাম আয়েশ করে। সদ্য কিশোরী একটা মেয়ে এভাবে মুখ বাঁকিয়ে বাচ্চাদের মতন কাঁদছে... দৃশ্যটা দেখে দুঃখ করার বদলে আমার সে কি হাসি! ওদিকে আমার হাসি দেখে থতমত খেয়ে ওর কান্না হুট করেই থেমে যায়। ওর পাশে থাকা বান্ধবীটা কিছুটা উচ্চ স্বরেই বলে ওঠে... 'বারবার বলছিলাম গাঁধী একটা ব্যাগে এতগুলো করে বই ভরিস না,ছিড়ে যেতে পারে কাগজের ব্যাগ! শোন মুনমুন,দয়া করে এখন "ভ্যাঁ ভ্যাঁ" করে নিজেকে আর আমাকে হাস্যকর না বানিয়ে বইগুলো কাদা থেকে ওঠা! আমি একটুও হেল্প করবনা তোকে,এটা তোর খামখেয়ালিপনার শাস্তি! হুহ! ' এদিকে হাসতে হাসতে আমার এমনই বেহিসাবি অবস্থা যে হাত থেকে সিগারেটটা মাটিতে পড়েই যায়! সাথে সাথেই আমি স্তব্দ,আর মুনমুনের হাসির পর্ব শুরু। ওর বান্ধবী তো ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায়,আশেপাশের লোকজনের চক্ষু চড়কগাছ যারা আমাদের এমন সব পাগলামি লক্ষ্য করছিলেন। রাগ হচ্ছিল হঠাৎ করেই,তাই সেখান থেকে দ্রুত পায়ে প্রস্থান করতে যাচ্ছিলাম কিন্তু মুনমুন চটপটে কন্ঠে আমাকে পেছন থেকে ডেকে ওঠে... 'এই যে মিস্টার,হাসি শেষ হলে এবার বইগুলো ওঠাতে হেল্প করতে পারবেন? বিনিময়ে এখান থেকে যেকোন একটা বই নিজের খুশিমতো নিতে পারেন।' ওর পিছুডাক কেন যেন আমি উপেক্ষা করতে চেয়েও পারিনি। পেছনে ফিরে তাকাই,বইগুলোর দুই তিনটাতে কাদা লাগলেও ওপর দিকে ছড়িয়ে থাকা বইগুলোয় কাদা লাগেনি,সেখানে আমার প্রিয় কবি নির্মলেন্দু গুণের কবিতাসমগ্রও আছে। অনেকদিন ধরেই এই কবিতা সমগ্রটা কেনার কথা ভাবছিলাম তাই সুযোগটা হাতছাড়া করলামনা। বোঝাই যাচ্ছে বান্ধবীর কথায় খেপে গিয়ে আমার হেল্প চেয়েছে মুনমুন মেয়েটা। কিন্তু বই সব উঠিয়ে,পরিষ্কার করে... গুছিয়ে ব্যাগে রাখতে হেল্প করার পরও কাঙ্খিত কবিতা সমগ্রটা পেলামনা। মুনমুন বলল এই বইটাই নাকি তার জরুরি দরকার আগামীকাল কলেজের অনুষ্ঠানে আবৃত্তি করার জন্য। আর কথা বাড়ালামনা। পরদিন কাকতালীয়ভাবে আবারো দেখা,কিছু কিছু কথা। আর আমিও প্রতিশ্রুতিমত আমাকে সেই কাব্যসমগ্র কিনে দেবার বায়না ধরি। এভাবেই পরিচয়ের ফুল ফোটার দিনগুলো শুরু হয় অবিশ্বাস্য ভালোলাগার বৃষ্টি নামিয়ে। তারপর টানা দশটাবছর চুটিয়ে প্রেম করি মুনমুনের সাথে,এরপর স্বপ্নপূরণের পথযাত্রায় আমাদের বিয়ে।বিয়ের পর থেকে অনেকটা দূরত্ব এসে যায় আমাদের মাঝে , একসাথে থাকা হত মাসে এক দুইদিন কেননা দুজনের কর্মস্থল দুই অঞ্চলে হয়ে যায়। তখন আমি চিটাগাংয়ে একটা প্রাইভেট ব্যাংকে চাকরি করি আর মুনমুন ঢাকার একটি হাইস্কুলে ইংরেজী শিক্ষিকা পদে চাকরি করে। তারপর আমার ছেলে আদর জন্ম নেয় আর বছরখানেক পর আসে আঁচল। চোখের দূরত্ব মনের দূরত্বও বাড়িয়ে যাচ্ছিল। ওহ্ হ্যাঁ বলতে ভুলে গেছি, প্রেম করাকালীনই আমার সাথে সাথে মুনমুনও সিগারেট খাওয়া শুরু করে,প্রথম প্রথম আমি তেমন আমলে নিইনা ব্যাপারটা। জানতাম,আমার অভ্যাস ছাড়াতেই ও এমন পাগলামি করছে,কিন্তু দিন দিন অসুস্থ হতে থাকে মুনমুন, ইনফেকশন দেখা দেয়... তবুও সিগারেট ছাড়েনা। আমার সাথে সমানতালে চলে ওর এই পাগলামি। চুমু খেতে গেলে ওর মুখে-ঠোঁটে মাতাল মাতাল পবিত্র মিষ্টি গন্ধটার বদলে সিগারেটের কটু গন্ধ... সমস্ত আবেশই নষ্ট করে দিতে শুরু করে। তখন বুঝতে পারি আমার মুখে সিগারেটের গন্ধে মুনমুনের কেমন অস্বস্তি হয়! শেষপর্যন্ত কি আশ্চর্য সিগারেটের গন্ধ আমার দুচোখের বিষ হয়ে দাড়ায়...! খুঁজে ফিরি পূতপবিত্র সৌগন্ধ ছড়ানো আমার চিরন্তন প্রেয়সী মুনমুনকে। এভাবেই আমার সিগারেটের বদঅভ্যাস মরে যায় তিলতিল করে।মুনমুন সুস্থ হয়,আমাকে সিগারেটের নেশামুক্ত করতে পারার সফলতার পর। ' আসিফ সব শুনে ভ্রু নাচিয়ে হাততালি দেয় আর আমি শুধুই দীর্ঘশ্বাস ফেলি... সেই দীর্ঘশ্বাস আসিফের চোখ এড়িয়ে যায় খুব স্বাভাবিকভাবেই। পুরোনো চাল যেমন ভাতে বাড়ে,পুরোনো স্মৃতিও সময়ের সাথে সাথে বেড়ে চলে গল্পের আঙ্গিকে,শুধু থমকে রয় মনটা। দুই. আমরা তিনতলা থেকে নেমে বইমেলা প্রাঙ্গণে আসি,লেখক আড্ডা'র ছাউনিতে বসে চায়ের কাপ হাতে আসিফ আর আমার কয়েকজন সাংবাদিক বন্ধুর সাথে আড্ডা দিতে দিতে ডান দিকের একটা স্টলে আমার চোখ চলে যায়।সহসাই ঝড়ের আভাস ওঠে আমার বুকের বন্দরে, যেখানে আশাগুলো চাতক পাখি। অর্ধেক চা ভর্তি কাপটা টেবিলে রেখেই আসিফের থেকে বিদেয় নিয়ে এক পলকে ছুটে যাই আমি... বই কিনতে এসেছে আঁচল আর আদর। ওদের পাশে আমার স্ত্রী মুনমুনও আছে।মাঝে মাঝে বাচ্চাদের সাথে ওদের স্কুল শেষে দেখা হয় কেবল। কিন্তু আজ প্রায় দু'বছর পর মুনমুনের মুখোমুখি আমি,কী যে অভিভূত এক অনুভূতি! ততক্ষনাৎ আমার বাচ্চারা আমাকে জড়িয়ে ধরে 'আব্বু,আব্বু ' ডেকে ওঠে। আমি স্নেহের গাঢ় চুম্বন আঁকি ওদের কপালে কিন্তু আমাকে দেখে কিছুটা অপ্রস্তুত মুনমুন।তবুও খুশিখুশি কন্ঠে প্রশ্ন করি... 'কেমন আছ? ' 'ভালো। এখনও বেকার আছো? ' মুখ অন্যদিকে ঘুরিয়ে প্রশ্ন করে মুনমুন। আঁচল আর আদরের সাথে হাঁটতে হাঁটতে আমার মুনমুনের হাতটা ধরে খুব করে বলতে ইচ্ছে হয় ' আমি ভুলিনি তোমাকে,জানিনা তুমি সত্যি কেমন আছো... তিনটা বছর হতে চলল আমার সংসার ছেড়ে চলে গেছ, কিন্তু বিশ্বাস করবে কিনা জানিনা বইমেলায় এই মূহুর্তে তোমাকে দেখে আবারো তোমার প্রেমে পড়তে বাধ্য হলাম,এই বয়সে আবার প্রেম... নিশ্চয়ই হাসি পাচ্ছে তোমার, কিন্তু জানিনা কেন এমন হলো! ' কিন্তু আমি তেমন কিছু বলতে পারিনা,কেন বলতে পারলামনা? বরং বোকা বোকা হাসি হেসে জবাব দিই... 'আমি বেকার বলে আমার সংসার ছেড়ে চলে গেলে! তোমার মানসম্মানে আঘাত লেগেছে স্বামী বেকার বলে, কিন্তু দশটা বছর ধরে প্রেম, তারপর বিয়ে-সংসার তারপর দুটো সন্তান এসবকিছু থেকে লোকদেখানো মানসম্মানটুকুই বড় হয়ে দাড়াল? সত্যিই অদ্ভুত তোমার জীবনদর্শন! যাইহোক আমি খুব ভালো আছি। ' 'শুধু আবেগ দিয়ে জীবন চলেনা। ভেবেছিলাম বয়স বাড়লে মানুষের বুদ্ধি বাড়ে,কিন্তু এখন দেখছি তুমি বাস্তবিক হতে পারোনি এতোটা বছর পেরিয়েও! এজন্যই এমন প্রশ্নের করলে। আমি কিন্তু এখনও শুধু তোমাকেই ভালোবাসি কিন্তু তোমার সাথে যোগাযোগ রাখতে ইচ্ছে হয়না এখন আর,সবসময় সবকিছু ভালোলাগবে এমনতো নয়! একা একা বাচ্চাদের নিয়ে বেশ আছি। ' আমি আদর আর আঁচলের আঙুল ধরে হাঁটতে হাঁটতে চমকে যাই,মুনমুনের কথায় আমার বুকের পাড় ভাঙে, হৃদপিণ্ডটা ধ্বক করে ওঠে! বুকের পাড় গত কয়েকবছর যাবত শুধু ভেঙেই চলেছে,এ ভাঙন রোধ করার কাজ মুনমুন ছাড়া আর কেউ পারবেনা। কিন্তু মুনমুন তো আমার থেকে সেই কবেই মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। পাথরের বড়সড় একটা টুকরোয় হোঁচট খাই। ততক্ষণে আমরা হাঁটতে হাঁটতে নজরুল মঞ্চের পেছনে ঠিক সেই জায়গাটায়... যেখানে কিশোরী মুনমুনকে দেখেছিলাম প্রথমবার।আজ মুনমুনকে অন্যরকম লাগছে,চেহারাটা আগের মতই মনকাড়া কিন্তু শরীরে মোটামুটি মেদ জমেছে।এটাকে কী আমি সুখের চিহ্ন হিসেবে গণ্য করব? ওর গায়ে টাঙাইলের সোনালী পাড়ের লালখয়েরি তাঁতের শাড়ি, কপালে টিপ নেই কিন্তু কানে ভারি একজোড়া ঝুমকো। বিদ্যুৎগতিতে চমকে যাই আমি... এ তো আমারই দেয়া ঝুমকো,খুব সম্ভবত প্রথম স্যালারির টাকায় কিনে দিয়েছিলাম ওকে।কিন্তু এখনও ভালোবেসে সামলে রেখেছে এই ঝুমকো? এতই যখন ভালোবাসে আমাকে তবে কেন এতো দূরত্ব... অবাক লাগে আমার! এদিকে আমার পায়ের বুড়ো আঙুলটা জখম হয়েছে বেশ ভালোভাবেই, রক্ত গড়াচ্ছে কিন্তু আমার কোনো অনুভূতি হচ্ছেনা। মুনমুন আমার বাহু ধরে আমাকে টেনে নিয়ে বসায় সিমেন্টের বাঁধানো জায়গাটায়... একটুও বদলায়নি মুনমুন, সেই আগের মতই টান আমার প্রতি! মুগ্ধ হয়ে দেখি আমি,কেমন করে ব্যাগ থেকে তুলো বের করে আমার ক্ষত মুছে স্যাভলন লাগিয়ে দেয় ও।আমি হেসে হেসে বলি... 'আমার পা কাঁটবে আগে থেকেই জানতে নাকি! ' 'নাহ্, আদর আর আঁচলের যদি হঠাৎ হাত পা কাটে... তাই সুরক্ষার জন্য সাথে রাখি। আমি ভবিষ্যৎ চিন্তা করি সবসময়' ঠান্ডা গলায় জবাব দেয় মুনমুন। পেছনের দিনগুলোয় ফিরে যাই... মুনমুনকে ছাড়া খুব অশান্তিতে দিন কাটাচ্ছিলাম চিটাগাং এ। ব্যাংকের জবটা ছেড়েছিলাম তাই পাগলামি করে। তারপর মুনমুনের কাছে ঢাকা চলে আসি, চিটাগাংয়ে আমাদের ভিটেবাড়ী ছেড়ে বাবা মা আমার সাথে ঢাকায় আসতে চাননা তাই একাই আসি। এরপর মুনমুনের বড়ভাই মেহতাবের সাথে ব্যবসা শুরু করি, গাড়ির ব্যবসা। নগদ বিশ লক্ষ টাকা দিয়ে শুরু করা এ ব্যবসা, কিন্তু মাসখানেক পরই মেহতাব ভাই ব্যবসায় লোকসান হবার অজুহাতে আমাকে মাসে মাসে ব্যবসার লভ্যাংশ দেয়া বন্ধ করে দেয়। পথে বসার অবস্থা তখন।তথাকথিত বেকার আমি। বেশকিছুদিন হতাশায় কাটে,অন্যদিকে মুনমুনকে যখন কেউ বলত ওর স্বামী বেকার... মুনমুন সহ্য করতে পারতনা। একদিন মুনমুন আমাকে ছেড়ে চলে যায় ,স্কুলে টিচিং এর জবটা ধরে রেখেছিল ও,ওই জবই বুঝি ওর আশাভরসা... আমার দুই ছেলেমেয়েকে নিয়ে আমার শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে ওঠে মুনমুন। আমি বাঁধা দিতে পারিনা,সবকিছু কার্বনের কালির মতন অন্ধকার মনে হয় আমার। আদরের কথায় আমার ধ্যান ভাঙে,বাস্তবে ফিরে আসি আমি... 'আব্বু জানো, এবার ক্লাস সেভেনে আমি সর্বোচ্চ উপস্থিতি সম্পন্ন স্টুডেন্ট হিসেবে ম্যাডেল পেয়েছি! ' আমি আদরের মাথায় হাত বুলিয়ে আদরকে উৎসাহ দিই।আমি জানি আমি একজন ভালো বাবা নই কিন্তু মুনমুন একজন ভালো মা,ও আমাদের ছেলেমেয়েকে সমস্ত মনযোগ ঢেলে দিয়ে সুস্থ সংস্কৃতিতে বড় করে তুলবে। আঁচল মায়াজড়ানো চোখ নিয়ে আমার দিকে তাকায়,স্বতস্ফুর্ত গলায় বলে... 'ক্লাস ফোর এ বৃত্তি পরীক্ষা নাই কেন আব্বু? ক্লাস ফাইভে সমাপনীতে আমি এ'প্লাস পেলে তুমি না বলেছ আমি যা চাই তা দিবে? সত্যিই দিবে তো' আমি বলি... 'হ্যাঁ দিবতো অবশ্যই মামণি! ' আঁচল বিজ্ঞের মত দৃষ্টি নিয়ে প্রশ্ন করে... 'যদি বলি বাবা তুমি আমাদের সাথে থাকবে,তাহলে কী তুমি আমার কথা মানবে? আমার এটা ছাড়া অন্য কোনো উপহারের প্রয়োজন নেই! ' আমি হতচকিত হয়ে যাই। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। অস্থিরতা গ্রাস করে আমাকে,ছোট্ট আঁচলের কথার জবাব না দিয়ে মুনমুনের দিকে তাকাই... গোধূলির শেষ আলোয় অপূর্ব সুন্দর লাগছে ওর হাতজোড়া কিন্তু ওই হাতে চুড়ি নেই, খুব জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করে 'মুনমুন তুমি আগের মত করে কেন বায়না ধরে বলোনা.. মনির আমাকে দুগাছি চুরি কিনে দাও! ' কিন্তু জিজ্ঞেস করতে পারিনা। শুধু ভাঙা ভাঙা স্বরে মুনমুনের চোখে চোখ নিংড়ে বলি... 'ভিসা হয়ে গেছে,কাল বাদে পরশুই জাপান চলে যাব। ভালো থেকো তোমরা,এখন আসি। অনেক দেরী হয়ে গেছে...' তিন. পেছনে ফিরে তাকাইনা আমি,একটাবারও মুনমুনকে বলিনা 'মুনমুন তুমি পাশে থাকলে আমি আমার দেশেই ভালোকিছু করে জীবনধারন করতে পারতাম আমাদের বাচ্চাদের বুকে জড়িয়ে কিন্তু তুমি নেই বলেই আমি চলে যাচ্ছি তোমার থেকে বহুদূর... আমি জাপান গেলে নিশ্চয়ই আর আমার বেকারত্ব তোমার মানসম্মান পোড়াবেনা!বেকারত্বের অভিশাপ মোচনের পথপ্রদর্শক হয়েও তো আমার পাশে থাকতে পারতে? হাতটা ছেড়ে দিলে... আমাকে করলে একলা পথের যাযাবর! ' মুনমুন আমাকে পিছু ডাকেনা,আমার বাচ্চারা আমাকে পিছু ডাকে,মুনমুনের কন্ঠ শুনি... বাচ্চাদের বাঁধা দিচ্ছে মুনমুন। রাস্তার পাশ থেকে আসা ধোঁয়াওঠা পিঠার ঘ্রাণে আমার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে।আমারওতো কতো স্মৃতি এ বুকের ভাঙা পথঘাট জুড়ে, মুনমুনের সাথে পিঠা খাওয়ার শীতগুলো ঘিরে। আজ থেকে বছর দশেক আগে এক শীতের সন্ধ্যায় মুনমুনআমাকে ওর লেখা একটা কবিতা শুনিয়েছিল,যেখানে আমাদের একসাথে পিঠা খাবার কথাও ছিল। এখনও আমার স্পষ্ট মনে পড়ে সেই কবিতাটার প্রতিটি লাইন... "কোন এক শীতের দুপুরের সমাপ্তি লগনে হিম হিম কুয়াশায় ডোবানো বেগুনী শাড়ি গায়ে... নম্র পায়ে হেঁটেছি তোমার পাশাপাশি। গল্প - কথার পাশাপাশি তোমার চোখের ভাষা পাঠে ব্যস্ত বিকেল কাটিয়েছি ছোট ছোট নিশ্বাসের নদীতে ভালোবাসার বৈঠা বেয়ে বেয়ে! তোমার নীল জ্যাকেটে বন্দী হৃদয়টাও স্বাগতম জানিয়েছে এই আমায়! আমার সুকোমল হাত ধরা দিয়েছে তোমার চিরচেনা হাতের ইশারায়! দুটি শীতল হাতের মুঠোবন্দী আলিঙ্গনে জমে উঠেছিল আমাদের উষ্ণ প্রেম-বিলাস! অতঃপর গতানুগতিক ব্যস্ততাকে ছুটি দিয়ে আমাদের এক করে রেখেছিল শীতের গোধূলী-অবকাশ। বৈকালী হাওয়ার হৃদকম্পন কান পেতে শুনছিল তোমার আমার মন প্রিয় - শান্ত নদীর পাড়ে আমাদের পদ - ছাপ রেখে এসেছি। রিনিঝিনি হাসি বেঁজেছে গোধূলীর নরম আলোর সেতারে! চার - পাঁচটি লাল - হলুদ গোলাপ - কলি উপহার রূপে তুলে দিয়েছ আমার ডান হাতে। সাদা ক্যাপে ঢাকা তোমার শিশিরভেজা চুলে দুষ্টুমি হাত বুলিয়ে বলেছি "ভালোবাসি"! সন্ধ্যা বেলায় ধোঁয়া ওঠা পিঠার ভাপে... আরও বেশী উষ্ণ হয়েছে আমাদের প্রেম! আর,আমার হৃদয়ের পুরোনো চিলেকোঠায় নয়াদিগন্তের আদর হয়ে উপচে পড়েছে তোমার শুকনো ঠোঁট নিঙড়ানো হাসি! যেই হাসির চির-মাদকতাময় মায়ায় কয়েক জনমের লাগি হতে পারা যায় পরবাসী।" স্মৃতির কারেন্ট জালে আটকানো এই অবস্থায় পায়ের আঙুলে ব্যাথাটা বেশ ভালোমতোই অনুভব হতে শুরু করে, তবুও আমি হাঁটি বইমেলার প্রশস্ত ফটক পার হয়ে। প্রথম দেখার দিনে যেই মুনমুন পিছুডেকে আমায় মায়ার বাঁধনে জড়ানোর পথ উন্মুক্ত করে দিয়েছিল আমি সেই মুনমুনের পিছুডাকের অপেক্ষা করি... কিন্তু সেই ডাক আর আসেনা।তারপর অনেকদূর চলে এসেছি,পেছন থেকে আর আমার বাচ্চাদের ডাক শুনতে পাইনা। রাস্তার পাশের দোকান থেকে দুটো সিগারেট কিনি, মুনমুন আমাকে এখনও আগের মতই ভালোবাসে এটা আমি জানি কিন্তু ও এখনও প্রচন্ড জেদী,আমিওবা কম কিসে! তবে জানিনা এতোবছর পর হঠাৎ কি হলো আমার, দেশ ছেড়ে যাব বলেই হয়তো আজ আমার এতোটা ভেঙে পড়া! নাকি অন্য কিছু? এই দুটো সিগারেট খাবনা তবে পোড়াতে পারব ভালোই, অবশ্য সিগারেটের মতন ছাইপাশ খাবার বদঅভ্যাস যদি আমার আবারো গড়ে ওঠে তবে এবার আর কেউ ছাড়াতে পারবেনা এ অভ্যাস,আসিফ বরং বাহবা দেবে ,বলবে 'এতোদিনে পুরুষ হতে পারলি রে মনির! আমার স্ত্রীর মতই ড্যাম কেয়ার হয়ে গেছে ভাবী তোর প্রতি ? ভাবী তোকে আগের মতন বাঁধা দেয়না নাকি? '। কিন্তু আমার কল্পনাতেও এখন হাসিঠাট্টা আসতে চাচ্ছেনা, নাহ্,আগের মতন কিছুই নাই... এখন তো আর মুনমুন আপন স্পর্শের ঘ্রাণ দিয়ে আমার সিগারেট টানার অভ্যাসকে অনভ্যাসে পরিণত করার জন্য ছুটে আসবেনা,আর মাত্র একটা দিন,তারপরই আমি হব পরদেশী! দোয়েল চত্বরে পার হয়ে যেতে যেতে লক্ষ্য করলাম আমার চোখ থেকে রক্তের ফোঁটার মতন অশ্রু খোঁচা খোঁচা দাড়িভর্তি গাল বেয়ে টপটপ করে ঝড়ছে কালোরঙা জ্যাকেটে। আমি মধ্যবয়স্ক একটা লোক হয়ে এভাবে কাঁদছি, লোকে কি বলবে... মাফলারের খুট দিয়ে চোখ মুছে নিই।সোডিয়াম বাতি জ্বলছে, কুয়াশা নামতে শুরু করেছে। আজকাল কুয়াশার শীতলতা আমার ভেতরটা ছোঁয় না। ধোঁয়াশা প্রকৃতির রহস্যময় কুয়াশাগুলো শুধু গিলে খায় মৃদুমন্দা উষ্ণ উষ্ণ স্বপ্নগুলোকে। হয়তোবা হৃদয়পোড়া আগ্নেয়গিরির লাভাকে ছাইচাপা দেবার ক্ষমতা নেই এসব কুয়াশার। তবুও প্রতীক্ষা করি সেই পিছুডাকের...


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১০৮২ জন


এ জাতীয় গল্প

→ সেই পিছুডাক

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now