বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
সালাহউদ্দিন আয়ুবী: ভয়ংকর ষড়যন্ত্র। প্রথম অংশ ও দ্বিতীয় অংশ
X
প্রথম অংশ:
দীর্ঘদিন থেকে সুলতান মিসরে অনুপস্থিত। বেড়ে গেছে বিরোধীদের তৎপরতা। খ্রিস্টানরা উস্কে দিয়েছে পদচ্যুত ফাতেমী খেলাফতের অংশীদারদের মধ্যে প্রতিশোধের আগুন। খ্রিস্টান গোয়েন্দায় ভরে গেছে সমগ্র কায়রো। অর্থ আর নারী দেহের উষ্ণতায় নিজেদের বিক্রি করে দিয়েছে সুলতানের বিশ্বস্ত কয়েকজন। গোয়েন্দা ট্রেনিংপ্রাপ্ত ইহুদি যুবতীদের কুটজালে ধরা দিয়েছে প্রশাসনের উচ্চভিলাষী কতিপয় কর্মকর্তা। ওদের জাতীয় চেতনাবোধ নিঃশেষ হয়ে গেছে। ক্ষমতার মোহে বিভোর এসব ব্যাক্তিদের হারেমের শোভাবর্ধন করছিল খ্রিস্টানদের রুপসী গোয়েন্দা যুবতীরা।
ঘাতক দলের সদস্যরা ছিল আরও তৎপর। মিসর এখন ভয়ংকর এক ষড়যন্ত্রের লীলাভূমি। অবস্থা এমন যে, কেবলমাত্র কোন অলৌকিক ঘটনাই মিসরকে রক্ষা করতে পারে।
খ্রিস্টানদের সহযোগিতায় সুদানীরা মিসর আক্রমণের জন্য প্রস্তুত। সেনাবাহিনীর এক অংশ বিদ্রোহের জন্য তৈরী। ভারপ্রাপ্ত গভর্নরের চোখে ঘুম নেই। সালাহউদ্দীন আয়ুবী সময়মত না এলে মিশর রক্ষা করা যাবে না। একসঙ্গে ভেতরের এবং বাইরের মোকাবিলা করা ভারপ্রাপ্ত গভর্ণরের পক্ষে সম্ভব নয়।
খিজরুল হায়াত। দ্বীনদার এবং বিশ্বস্ত। মিসরের অর্থ সচিব। সাদামাটা জীবন পছন্দ করেন, অমায়িক। সুলতান নিজেই তাকে অর্থ সচিবের পদে নিয়োগ দিয়েছেন। যোগ্যতা এবং আন্তরিকতার সাথে মিসরের অর্থনীতি পুনঃ বিন্যাস করেছেন তিনি। এক রাতে বাইরে থেকে ফিরেছেন হায়াত। সবেমাত্র বাড়িতে পা রেখেছেন। আঁধার ফুঁড়ে ছুটে এল একটা তীর। বিধঁল খিজরুল হায়াতের পিঠে। এফোঁড় ওফোঁড় হয়ে গেল। উপর হয়ে পড়ে গেলেন তিনি। কন্ঠ থেকে বেরিয়ে এল ব্যথাভরা চিৎকার। চিৎকার শুনে চাকর বাকররা ছুটে এল। ছুটে এল পরিবার পরিজন। ঘটনার আকস্মিকতায় থ’ হয়ে গেছে সবাই। কারও মুখে কথা নেই। মারা গেছেন খিজরুল হায়াত। একজন চাকর লক্ষ্য করল মৃত্যুর পূর্বে তিনি মাটিতে কিছু লেখার চেষ্টা করছিলেন। চাকরটি সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করল। মাটিতে লিখা মুসলেহ। ‘হ’ টা অর্ধেক লিখেছেন হত্যাকারীর পুরো নাম লিখার পূর্বেই মারা গেছেন তিনি। লিখাটা সংরখন করে লাশটা তুলে নেয়া হল। একজনকে পাঠিয়ে দেয়া হল পুলিশ প্রধান গিয়াস বিলকিসের কাছে। গিয়াস ছিলেন সুলতানের বিশ্বস্ত। আলী বিন সুফিয়ানের মত অপরাধ দমনে অভিজ্ঞ।
সংবাদ পেয়েই ছুটে এলেন গিয়াস বিলকিস। গভীর মনযোগ দিয়ে নামটি দেখলেন। ততোক্ষণে উপ-রাষ্ট্রপ্রধান মুসলেহ উদ্দিনও ছুটে এসেছেন। গিয়াস দাঁড়িয়ে স্যালুট দিলেন তাকে। সন্তর্পণে মাটির লেখাটা পা দিয়ে মুছে ফেললেন।
‘যত তারাতাড়ি সম্ভব হত্যাকারীকে খুঁজে বের করুন।’ বললেন উপ-রাষ্ট্রপ্রধান। ‘আগামীকাল ভোরেই আমি অপরাধীকে দেখতে চাই।’
‘আমি অপরাধীকে খুঁজে বের করব স্যার।‘ পুলিশ প্রধানের কন্ঠ।
সবাই ফিরে গেলেন। রাতে গিয়াস খিজরুল হায়াতের সহকারী অফিস স্টাফসহ তার নিকটস্থ লোকদের ডেকে পাঠালেন। ওদের কাছে জানা গেল, আজ হায়াত সচিবদের এক মিটিংয়ে অংশগ্রহন করেছিলেন। সংগে ছিলেন সহকারি। মিটিংয়ে দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলাপকালে সামরিক বাজেটের প্রসংগ আসে। হায়াত বললেন, ‘সুলতান সুবাকে নতুন ফৌজ ভর্তি করেছেন। ওদের বেতনাদি দিতে হলে মিসরে অপ্রয়োজনীয় বাজেট কমাতে হবে।’
এর বিরোধীতা করলেন উপ-রাষ্ট্রপ্রধান। তিনি বললেন, ‘নতুন সৈন্য ভর্তি করার পূর্বে আমাদের সাথে পরামর্শ করার প্রয়োজন ছিল। এমনিতেই সেনাবাহিনী সাদা হাতীতে পরিণত হয়েছে। মিসরের ফৌজ অশান্ত হয়ে আছে। তাদের অভিযোগ, সুবাকে প্রাপ্ত গনিমতের মাল থেকে তাদেরকে কিছুই দেয়া হয়নি।’
‘আপনি কি জানেন না, গনিমতের সম্পদ ভাগ-বাটোযারা করে দেয়ার নিয়ম বন্ধ করে দেয়া হয়েছে?’
হায়াত বললেন, ‘চমৎকার সিদ্ধান্ত। যারা গনিমতের জন্য যুদ্ধ করে তাদের ভেতর জাতীয় চেতনাবোধ বা ধর্মীয় মূল্যবোধ থাকে না।’
এক পর্যায়ে এ আলোচনা বিতর্কে রূপ নিল। উত্তেজিত হয়ে উপ-রাষ্ট্রপ্রধান বললেন, ‘সুলতান মিসরীয় সৈন্যদের সাথে ভাল ব্যবহার করেন না, যেমনটি করেন সিরীয় এবং তুর্কি সৈন্যদের সাথে।’
‘মনে হচ্ছে খ্রিস্টান এবং ফাতেমীরা আপনার মুখ দিয়ে কথা বলছে।’
উত্তপ্ত বাক্য বিনিময়ের এক পর্যায়ে মিটিং সমাপ্ত করে দেয়া হল। অর্থ সচিবের সহকারী জানালেন, মিটিং শেষে উপ-রাষ্ট্রপ্রধান স্যারের অফিসে এলেন। এখানেও উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হল। স্যার উপ-রাষ্ট্রপ্রধানকে বললেন, ‘আমি সুলতানের কাছে এ প্রসংগ তুলব। বলব, আপনি ভর জলসায় সবাইকে বুঝাতে চেয়েছেন যে সেনাবাহিনী অশান্ত। আপনি বলেছেন, সুলতান সবার সাথে সমান ব্যবহার করেন না এবং গনিমতের মাল মিসরের সৈন্যদের না দিয়ে অন্য সৈন্যদের দিচ্ছেন। এছাড়া আপনি আমাকেও আপনার দলে ভেড়ানোর চেষ্টা করেছেন। উপ-রাষ্ট্রপ্রধান কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেলেন। যাবার সময় বললেন, ‘তুমি বেঁচে থাকলে তো সুলতানকে এসব জানাবে।’
উপ-রাষ্ট্রপ্রধানকে গিয়াস কিছুই জিজ্ঞেস করলেন না। কারণ পুলিশ বিভাগ তার অধীন। উপ-রাষ্ট্রপ্রধানের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ তোলার পূর্বে অবশ্যই প্রচুর সাক্ষ্যপ্রমাণ থাকতে হবে। পুলিশ প্রধান বুঝলেন এ হত্যা ব্যাক্তিগত কারণে হয়নি। তিনি গোপনে সাক্ষ্যপ্রমাণ জোগাড়ের চেষ্টা করতে লাগলেন।
পুলিশ প্রধান বিভিন্ন প্রমাণে যা জানলেন, তা হল, হত্যা ঘটনার দু’দিন পর মুসলেহ উদ্দীন রাতে বাসায় ফিরলেন। প্রথম স্ত্রী তাকে ডেকে নিলেন নিজের কক্ষে। তিনি ঢুকতেই স্ত্রী বিশটা আশরাফি তার সামনে রেখে বললেন, ‘খিজরুল হায়াতের হত্যাকারী এ বিশ আশরাফি ফিরিয়ে দিয়ে গেছে।’ স্ত্রী এক টুকরা কাগজ স্বামীর হাতে তুলে দিলেন। তাতে লেখা ছিল- ‘পঞ্চাশ আশরাফি এবং দু’টুকরা স্বর্ণ দেয়ার কথা ছিল। কিন্তু দিয়েছেন বিশ আশরাফি। আপনার স্ত্রীর কাছে দিয়ে গেলাম। আমাদের ধোকা দিয়েছেন। এখন একশ আশরাফি এবং দু’টি স্বর্ণের টুকরা দিতে হবে। তা নয়তো একটা তীর খিজরুল হায়াতের মত আপনার হৃদপিন্ডেও গেঁথে যাবে।’
মুসলেহ উদ্দীনের চেহারা ফ্যাকাসে হয়ে গেল। কিছুটা সংযত হয়ে বললেন, ‘তুমি কি বলছ? ওরা কারা? কাউকে আমি কোন আশরাফি দেয়ার কথা বলিনি। বিশ্বাস কর, হায়াতের হত্যার সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই।’
তুমিই হায়াতকে হত্যা করেছ। কি কারণে জানি না, তবে তুমি যে তার হত্যাকারি এতে কোন সন্দেহ নেই।’
মুসলেহ উদ্দীনের প্রথম স্ত্রী সাবেরা। বয়স ত্রিশের কোঠায়, সুন্দরী। দেহের গাঁথুনি এখনও অটুট। পুরুষকে আকর্ষণ করার মত রূপ এখনও তার রয়েছে। মাস খানেক পূর্বে অপরূপা একজন তরুনীকে বাড়ী নিয়ে এসেছেন মুসলেহ উদ্দীন। এরপর থেকেই প্রথম স্ত্রীর কক্ষে যাওয়া বন্ধ। কয়েক দিনই তাকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন সাবেরা, কিন্তু তিনি যাননি। তখন একাধিক স্ত্রী গ্রহণ করা বেআইনী ছিল না। স্ত্রীরাও এতে কিছু মনে করতেন না। হত্যাকারীদের চিঠি পেয়ে ভড়কে গেলেন সাবেরা। স্বামীর অকল্যাণ কল্পনায় কেঁপে উঠল তার মন। এজন্যই তাকে নিজের কক্ষে ডেকে এনেছিলেন।
‘মুখ বন্ধ রাখবে সাবেরা।’ গম্ভীর কন্ঠে বললেন মুসলেহ উদ্দীন। ‘এ হচ্ছে আমার দুশমনের একটা চাল। তারা তোমার এবং আমার মাঝে শত্রুতা সৃষ্ঠি করতে চাইছে।’
‘আমার বিরুদ্ধে শত্রুতা ছাড়া তোমার মনে কি অন্য কিছু আছে?’
‘তোমায় আমি ভালবাসি সাবেরা। সেই প্রথম দিনের মত। তুমি কি ওদের কাউকে চিনতে পেরেছ?’
‘ওরা মুখোশ পরেছিল। তবে তোমার মুখোশ খুলে গেছে। তোমায় আমি চিনে গেছি।’
স্বামী কিছু বলতে চাইছিলেন। তাকে কিছু বলতে না দিয়ে সাবেরা বলল, ‘সম্ভবতঃ তুমি রাষ্ট্রীয় কোষাগারের অর্থ আত্মসাৎ করেছ। জেনে ফেলেছে সচিব। এ জন্যই গোপন আততায়ীর মাধ্যমে তাকে খুন করেছ।’
‘কেন আমায় মিথ্যা অপবাদ দিচ্ছ। কোষাগারের অর্থ আমি কেন আত্মসাৎ করতে যাব?’
‘তোমার না হলেও যে ফিরিংগী মেয়েটাকে বিয়ে ছাড়া সাথে রেখেছ তার প্রয়োজন আছে। তোমার মদ কেনার জন্য টাকার দরকার। যদি মিথ্যে বলে উড়িয়ে দিতে চাও তবে বল ঘোড়াগাড়ী বোঝাই করে কি এনেছ? তোমার হারেমে প্রতিদিন নতুন নর্তকী আসছে বিনে পয়সায়? তোমার মদের আসরে যে টাকা খরচ হয় তা কোত্থেকে আসে?’
‘চুপ কর সাবেরা। ওরা কারা আমাকে একটু খোঁজ নিতে দাও। ইস! কি ভয়ংকর চাল চেলেছে। ক’দিন পরই সত্যি ঘটনা তুমি বুঝতে পারবে।’
‘না, আমি চুপ থাকব না। আমার বুকে তুমি প্রতিশোধের আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছ। মিসরের সব লোককে ডেকে ডেকে একথা বলব। অলি-গলিতে চিৎকার করে বলব তুমি খিজরুল হায়াতের হত্যাকারী। হত্যা করেছ আমার ভালবাসা। এ হত্যার প্রতিশোধ আমি নিব।
স্ত্রীকে অনেক অনুনয় বিনয় করে মুসলেহ উদ্দীন বললেন, ‘আমাকে দু’দিন সময় দাও। দু’দিনের মধ্যেই আমি ওদের খুঁজে বের করে প্রমাণ করব হায়াতকে আমি হত্যা করিনি। পুলিশ প্রধান সন্দেহজনক কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করেছে। আশা করি কয়েকদিনের মধ্যে আসল খুনীকেও পাকড়াও করতে পারবে।’
পেরিয়ে গেল রাত। পর দিনও। মুসলেহ উদ্দিন বাড়ী ফেরেননি। ফিরিংগী মেয়েটাকেও কোথাও দেখা গেল না। সন্ধায় বাড়ী ফিরলেন মুসলেহ উদ্দিন। সোজা চলে গেলেন স্ত্রীর কক্ষে। আদুরে গলায় কথা বললেন। শোনালেন ভালবাসার কথা। সাবেরা তার ধোকার জালে পা দিতে চাইলেন না। কিন্তু জাত খেলুড়ে মুসলেহ উদ্দীনের কপট ভালবাসার ফাঁদে এক সময় ধরা দিলেন স্ত্রী।’
‘আমি দু’দিন পর্যন্ত ওই দু’জন কে খুঁজছি। এখনও পাইনি। আশা করি পেয়ে যাব। আমি যে হত্যাকারী নই তখন তোমায় আশ্বস্ত করতে পারব।’
আরও অনেক কথা বললেন মুসলেহ উদ্দীন। এক সময় ঘুমিয়ে পড়লেন সাবেরা। কক্ষ থেকে বেরিয়ে এলেন তিনি। চাকর-বাকরদের ছুটি দিয়ে দিলেন। সমগ্র বাড়ীতে নেমে এল কবরের নিরবতা। পাহারাদার কুকুরটাকে বাড়ীর এক কোণে বেঁধে রেখে নিজের কক্ষে ফিরে এলেন মুসলেহ উদ্দিন।
মাঝ রাত। বাইরের পার্টিশন ঘেঁষে দাঁড়াল এক মুখোশধারী। তার কাঁধে পিঠে দাঁড়াল দ্বিতীয় জন। তৃতীয় ব্যাক্তি তার কাঁধে উঠে পার্টিশনের ভেতর লাফিয়ে পড়ল। খুলে দিল প্রহরীহীন ফটক। বাড়ীর করিডোরে উঠে এল তিনজনে। এগিয়ে চলল বিড়ালের মত নিঃশব্দে। ঘুটঘুটে অন্ধকার। ওরা সাবেরার কক্ষের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। দরজা খোলাই ছিল। ভেতরে ঢুকল তিনজন। একজন হাত ছোঁয়াল সাবেরার মুখে। স্বামীর হাত ভেবে আকড়ে ধরে সে বলল, ‘কোথায় যাচ্ছ?’
কোন জবাব না দিয়ে ওর মুখ বেঁধে ফেলল একজন। বেঁধে দিল হাত। পাজা কোলা করে একটা বস্তায় ঢুকিয়ে কাঁধে তুলে নিল। চাকর বাকর কেউ নেই। বিনা বাধায় ওরা বেরিয়ে গেল। খানিক দূরে একটা গাছের সাথে তিনটে ঘোড়া বাঁধা ছিল। রশি খুলে ঘোড়ার পিঠে চেপে বসল তিনজন। বস্তা তুলে নিল একজন। মিসর পিছনে ফেলে ইস্কান্দারিয়ার দিকে ছুটে চলল ঘোড়াগুলো।
সকালে চাকর-বাকররা ফিরে এল। মুসলেহ উদ্দীন ওদেরকে সাবেরার কথা জিজ্ঞেস করলেন। তন্ন তন্ন করে সারা বাড়ী খোঁজা হল। সাবেরা কোথাও নেই। এক চাকরাণীকে একান্তে ডেকে নিলেন মুসলেহ উদ্দীন। অনেকক্ষণ কথা বললেন দু’জন। এরপর তাকে নিয়ে গেলেন পুলিশের কাছে। মুসলেহ উদ্দীন বললেন, ‘আমার স্ত্রীকে পাওয়া যাচ্ছে না। আমার বিশ্বাস হায়াতকে ওই হত্যা করিয়েছে। মৃত্যুর পূর্বে তিনি যে মুসলেহ উদ্দীনের স্ত্রী। কিন্তু পারেননি। এই চাকরাণীকে জিজ্ঞেস করে দেখুন।’
পুলিশ প্রধানের প্রশ্নের জবাবে চাকরাণী বলল, ‘পরশু রাতে দু’জন লোক এসেছিল। আমার মুনিব তখন ছিলেন না। দেখলাম মুখোশ পরা দু’ব্যাক্তি, ওরা বেগম সাহেবের সাথে দেখা করতে চাইল। বাড়ীতে কোন পুরুষ না থাকায় আমি বললাম, এখন দেখা হবে না। ওরা বলল, ‘বেগম সাহেবের এই বিশটি আশরাফি ফেরত দিতে এসেছি।’ আমি বেগম সাহেবকে বলতেই তিনি দু’জনকে ভেতরে নিয়ে গেলেন। আমাকে দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতে বললেন। বললেন, ‘কেউ এলে যেন তাকে সতর্ক করে দেই।’
বাইরে থেকে আমি শুনলাম দু’জন কঠোর ভাষায় কথা বলছে আর বেগম সাহেবা অনুনয় বিনয় করছেন। তিনি আরও বললেন, আলি বিন সুফিয়ানের সহকারী হাসানকে হত্যা করতে পারলে পঞ্চাশ আশরাফি এবং দু’টি স্বর্ণের টুকরা দেবেন। এই বিশ আশরাফি বেগম সাহেবা কিভাবে দিয়েছেন আমি জানি না। ওরা পঞ্চাশ আসরাফি দাবী করছিল। বেগম সাহেবা বললেন, ‘তোমরা ভুল লোককে মেরেছ। হাসানকে মারতে পারনি।’
ওরা বলল, ‘তুমি যে সময়ের কথা বলেছ ঠিক সে সময় এ লোকটি বাড়ীতে ঢুকেছিল। লোকটি হাসান না অন্য কেউ আমরা দেখিনি। আমরা তীর ছুঁড়ে পালিয়ে গেছি।’
পঞ্চাশ আশরাফি দেয়ার জন্য ওরা বেগম সাহেবাকে চাপ দিচ্ছিল। বেগম সাহেবা বললেন, ‘আসল লোককে হত্যা করতে পারলে পঞ্চাশ আশরাফি এবং দুটো সোনার টুকরা দেব।’ কিন্তু ওরা বলল, ‘যে কাজ করেছি আগে তার বিনিময় দাও, তারপর অন্য কাজ।’ বেগম সাহেবা অস্বীকার করায় ওরা বলল, ‘টাকা কিভাবে ওসুল করতে হয় আমরা জানি।’ এরপর ওরা দু’জন চলে গেল। বেগম সাহেবা আমায় ডেকে বললেন, ‘খবরদার, এসব কথা কাউকে বলবে না। আমাকে তিনি দুটো আশরাফিও দিয়েছেন। আজ সকালে তার কক্ষে গিয়ে দেখি তিনি নেই। আমার মন বলছে টাকা না দেয়ায় সে দু’জন লোকই তাকে অপহরণ করেছে।’
পুলিশ প্রধান মুসলেহ উদ্দীনকে বসিয়ে রেখে চাকরাণীকে নিয়ে অন্য কক্ষে চলে এলেন।
‘এবার বল এ কথা তোমায় কে শিখিয়েছে, মুসলেহ উদ্দীন, না সাবেরা?’
‘এ জবানবন্দী আমার নিজস্ব।’
‘সত্যি করে বল সাবেরা কোথায়? কার সাথে গিয়েছে?’
চাকরাণী ভয় পেয়ে গেল। পুলিশ প্রধানকে কোন সন্তোষজনক জবাব দিতে পারল না। গিয়াস বললেন, ‘কিভাবে সত্যি কথা বের করতে হয় আমি জানি। তুমি এখন ফিরে যেতে পারবে না। পুলিশের শাস্তি সেলের কথা শুনেছ?’
বিবর্ণ হয়ে গেল চাকরাণীর চাহারা। সে জানত, পুলিশের শাস্তি সেলে সত্য মিথ্যা আলাদা হওয়ার আগে দেহের হাড়গোড় আলাদা হয়ে যায়। সে কাঁদতে লাগল।
‘দেখুন, আমি এক গরীব মেয়ে। সত্যি কথা বললে মুনিব শাস্তি দেবেন। মিথ্যা বললে আপনারা।’
‘তোমার কোন ভয় নেই। তোমার নিরাপত্তার জিম্মা আমি নিচ্ছি।’
চাকরাণী বলল, ‘হত্যার দ্বিতীয় দিন একজন মুখোশধারী এসেছিল। মুনীব বাড়ী ছিলেন না। লোকটা ছিল ফটকের বাইরে। বেগম সাহেবা ভিতরে। কি কথা হয়েছে আমরা কেউ শুনিনি। মুখোশধারী চলে গেলে বেগম সাবেরা ফিরে এলেন। হাতে ছিল একটা প্যাকেট। একরাত পর মুনীব আমাদের সবাইকে একরাতের জন্য ছুটি দিলেন।’
‘ইতিপূর্বেও কি সবাইকে সারা রাতের জন্য ছুটি দিয়েছিলেন?’
‘কখনও না। একজন ছুটিতে গেলে অন্য সবাই থাকত। আরো আশ্চর্য হল, কুকুরটাকে কখনও বেঁধে রাখা হয়না। ভয়ংকর কুকুর। অপরিচিত লোক দেখলেই ঝাপিয়ে পড়ে। সে রাতে মুনিব নিজেই গেলেন কুকুরটাকে বেঁধে রাখতে।’
‘মুসলেহ উদ্দীনের সাথে সাবেরার সম্পর্ক কেমন ছিল?’
‘ইদানীং খুব খারাপ। মুনিব একটা সুন্দরী ফিরিংগী মেয়েকে বাড়ী আনার পর থেকে বেগম সাহেবার সাথে কথা বলেন না।’
চাকরাণীকে বসিয়ে রেখে পুলিশ প্রধান উঠে গেলেন। ফিরে এলেন দু’জন সিপাই নিয়ে। সিপাইরা মুসলেহ উদ্দীনের দু’বাহু ধরে নিয়ে যেতে চাইল। প্রতিবাদ করলেন তিনি। পুলিশ প্রধান বললেন, ‘একে জেলে নিয়ে যাও। তার বাড়ী সীল করে পাহারার ব্যবস্থা কর। কাউকে বাইরে যেতে দেবে না।’
কায়রোর উত্তরে এক সবুজ শ্যামল প্রান্তর। দুরত্ব অনেক। চারপাশে উঁচুনিচু পাহাড়। পাহাড় থেকে প্রান্তর ছুয়ে বয়ে গেছে ঝর্ণা ধারা। পূব আকাশ রাংগা হয়ে উঠেছে। অপহরণকারীরা ঘোড়া থামাল। নেমে এল তিনজন। বস্তার মুখ খুলে সাবেরাকে বের করে আনল। মুখের কাপড় সরিয়ে হাত পায়ের বাঁধন খুলে দিল। সাবেরা অচেতন না হলেও অস্বাভাবিক আচরণ শুরু করল। চিৎকার করারও শক্তি নেই। ওরা তাকে পানি পান করাল। খেতে দিল খেজুর আর রুটি। শীতল বাতাসে ওর শক্তি ফিরে এল। আচম্বিত সাবেরা উঠে দাঁড়াল। দৌড়ে টিলার আড়ালে চলে গেল। একজন মুখোশধারী ঘোড়ায় চেপে ছুটল ওর পেছনে। ক্লান্ত হয়ে শুয়ে পড়ল সাবেরা। মুখোশধারী তাকে ঘোড়ায় তুলে সংগীদের কাছে ফিরে এল।
‘পালিয়ে যেতে চাইলে যাও।’ বলল একজন। ‘কোথায় যাবে? এখান থেকে একজন শক্তিশালী পুরুষও এভাবে কায়রো পৌঁছাতে পারবে না।’
সাবেরা কেঁদেকেটে ওদের গালাগালি করতে লাগল।
‘কায়রো ফিরে যেতে চাইলে যাও। কিন্তু ওখানে গেলেও মরবে। তোমার স্বামীই তোমাকে আমাদের হাতে তুলে দিয়েছেন।’
‘মিথ্যে কথা।’
‘মিথ্যে নয়, সত্য। মজুরী হিসেবে তোমায় দিয়েছে। তোমার হাতে আমরাই আশরাফি ফিরিয়ে দিয়েছিলাম। তুমি তাকে বলেছ সে সচিবকে হত্যা করেছে। তুমি আরও বলেছ, এসব কথা পুলিশ প্রধানকে বলে দেবে। আগে থেকেই সে তোমার ওপর বিরক্ত। ফিরিংগী মেয়েটা তার মন দখল করে রেখেছে। মেয়েটা কে, কোথা থেকে এসেছে তোমাকে তা বলা যাবে না। পরদিন তোমার স্বামী আমাদের কাছে এল। আস্ত বেঈমান। বলেছিল কাজটা করলে পঞ্চাশ আশরাফি আর দু’টি সোনার টুকরা দেবে। কিন্তু কাজ শেষে পাঠাল বিশ আশরাফি। আমরা তোমাকে ব্যবহার করলাম। তোমার কাছে টাকা দেয়ার অর্থ যেন তুমিও ব্যাপারটা জানতে পার। বুদ্ধিটা কাজে লেগেছে। পরদিন পঞ্চাশ আশরাফি দিল। স্বর্ণের টুকরা দিল না। আমরা বললাম, ‘এখন পঞ্চাশে চলবে না। আরও বেশী দিতে হবে। না দিলে খবরটা পুলিশ প্রধানের কানে তুলে দেব।’
তার জন্য সমস্যা ছিল ব্যাপারটা তুমি জেনে ফেলেছ। সে বলল, ‘আমার স্ত্রীকে নিয়ে যাও। ওকে বিক্রি করে অনেক টাকা পাবে।’
সাবেরার চোখের পানি শুকিয়ে গেছে। সে হতভম্বের মত তিন অপহরণকারীকে দেখতে লাগল। মুখোশের মাঝখান দিয়ে দুটো করে চোখ দেখা যাচ্ছে। হিংস্র এবং ভয়ংকর। ওদের কণ্ঠে কোন হিংস্রতা ছিল না। ওরা বরং তাকে বুঝানোর চেষ্টা করছে, এখান থেকে পালানো সম্ভব নয়।
‘আমি তোমাকে একবার দেখেছিলাম’, বলল একজন।
‘তোমার স্বামীর প্রস্তাব শুনে ইস্কান্দারিয়ার বাজারে তোমাকে কত বিক্রি করা যাবে মনে মনে হিসাব করলাম। তুমি যুবতী, সুন্দরী। তোমাকে অনেক দামে বিক্রি করা যাবে। আমরা রাজি হলাম।’ তোমার স্বামী বলল, ‘রাতে আমার চাকর-বাকররা থাকবে না। কুকুরটাকেও বেঁধে রাখা হবে। রাতে এসে ওকে তুলে নিও।’ এ পারশ্রমিক না পেলে আমরা তাকে হত্যা করতাম। অপহরণ করতাম ফিরিংগী মেয়েটাকে। আমরা রাতে তোমাকে তুলে নিয়ে এলাম।’
‘তোমাকে এসব কথা বলার কারণ, তুমি স্বামীর ঘরের কথা ভুলে যাও।’ বলল দ্বিতীয় জন। ‘আমরা অসহায় কোন নারীর সম্ভ্রম নষ্ট করিনা। আমরা ব্যবসায়ী। অপহরণ এবং টাকার বিনিময়ে হত্যা করা আমাদের পেশা। তিনজন পুরুষ একজন নারীকে অপহরণ করে ভোগ করার মধ্যে কোন গর্ব নেই।’
‘তোমরা কি আমাকে ইস্কান্দারিয়ার বাজারে বিক্রি করবে?’ কাঁপা কণ্ঠে সাবেরা জিজ্ঞেস করল। ‘শেষ পর্যন্ত এই কি হবে আমার কপালের লিখা?’
‘না, খারাপ কাজের জন্য জংলী এবং বেদুইন মেয়েদের ক্রয় করা হয়। তুমি সম্মানিতা গৃহ বধু। কোন আমীরের ঘরেই তুমি যাবে। আমরাও দামটা বেশী পাব। এখন কান্নাকাটি বন্ধ কর। কাঁদলে চেহারার লাবণ্য নষ্ট হয়ে যাবে। তাহলে বাজারে-মেয়ে হিসাবেই বিক্রি করতে হবে। এবার শুয়ে পড়। কিছুক্ষণ ঘুমিয়ে নাও।’
সাবেরা আশ্চর্য হয়েছে এতক্ষণ সময়ের মধ্যে এদের কেউ তার সাথে অশালীন আচরণ করেনি দেখে। মনে মনে স্বস্তিও পেয়েছে। রাতভর বস্তাবন্দী থেকে সমস্ত শরীর ব্যথা করছে। চোখ বন্ধ করতেই ঘুমিয়ে পড়ল ও। ঘুম ভেংগে গেল হঠাৎ। তার মাথায় চাপে আছে ভয় এবং আতংক। মনের দিক থেকে সে এ পরিণতিকে গ্রহণ করতে পারছে না। আড়চোখে তাকাল তিনজনের দিকে। ঘুমুচ্ছে ওরা। একবার ভাবল খঞ্জর বের করে ওদের হত্যা করে। বাতিল করে দিল চিন্তাটা। একা তিনজনের মোকাবেলা করা সম্ভব নয়। চোখ পড়ল পাশে বাঁধা ঘোড়ার ওপর। পিঠে জিন বাঁধা। ও উঠে পড়ল। আলতো পায়ে এগিয়ে গেল ঘোড়ার দিকে। সূর্য নেমে গেছে টিলার ওপাশে। কায়রো কোন দিকে জানে না ও। তবুও বাঁচতে হলে পালাতে হবে ওকে। প্রয়োজনে বিশাল মরুর বিস্তারে ধুকে ধুকে মরবে, তবুও এদের হাতে সম্ভ্রম নষ্ট হতে দেবে না। আলগোছে ঘোড়ার পিঠে চেপে বসল সাবেরা। ছুটিয়ে দিল ঘোড়া।
ঘোড়ার পদশব্দে তিনজনের ঘুম ভেংগে গেল। দু’জন দুটো ঘোড়ায় চেপে ছুটল তার পেছনে। টিলার বেষ্টনী থেকে বের হবার পথ জানা নেই সাবেরার। সামনে বাঁধা হয়ে দাঁড়াল এক পাহাড়। পেছনে তাকাল ও। ধাওয়াকারীরা কাছে চলে এসেছে। ঘোড়াসহ পাহাড়ে উঠতে লাগল সাবেরা। উপরে উঠে তাকাল বিপরীত দিকে, পথ পেয়ে গেল। নেমে এল নীচে। ধাওয়াকারীরাও তার পেছনে আসছে। কাছে চলে এসেছে ওরা। সামনে সমুদ্র। সমুদ্রের দিক থেকে আসছে চারজন উস্ট্রারোহী। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারল না ও। সাবেরা চিৎকার শুরু করলঃ ‘বাঁচাও, বাঁচাও, ডাকাতের হাত থেকে বাঁচাও।’
ঘোড়া পৌঁছে গেল উস্ত্রারোহীদের কাছে। উস্ট্রারোহীদের দেখে মুখোশধারীরা ঘোড়ার মুখ ঘুরিয়ে দিল। ওদের পিছু নিল উটের আরোহীরা। একজন ধনুকে তীর জুড়ে দু’জনকে লক্ষ্য করে ছুড়ল। বিঁধল এক ঘোড়ার ঘাড়ে। ঘোড়ার লাফালাফিতে পড়ে গেল সওয়ার। চার জন মিলে ওপর অশ্বারোহীকে ঘিরে ফেলল। একজনের পক্ষে চারজন তীরন্দাজের মোকাবেলা করা সম্ভব নয়, সে আত্মসমর্পণ করল। সাবেরা ওদের বলল, ‘এদের একজন ওপাশে রয়েছে।’ ঘোড়া থেকে পড়ে যাওয়া আরোহীসহ তিনজনকেই গ্রেপ্তার করা হল।
এ চারজন উস্ট্রারোহী ছিল সুলতান আয়ুবীর সেনা বাহিনীর সদস্য। সাগর উপকূল এবং সমগ্র মরুভূমিতে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সেনা দল পেট্রোল ডিউটিতে রত ছিল। আচম্বিত শত্রুর আক্রমণ যেন না আসতে পারে এ জন্যই এই ব্যবস্থা। এরা কয়েক বারই বিপজ্জনক খ্রিস্টান গোয়েন্দাদের ধরে সুলতানের সামনে হাজির করেছে। সাবেরা সৈন্যদেরকে অপহরণের পুরো কাহিনী শোনাল। সে বলল, ‘উপ-রাস্ট্রপ্রধান আমার স্বামী। এ তিন ভাড়াটে খুনীদের দিয়েই তিনি অর্থ সচিবকে হত্যা করিয়েছেন। আমাকেও তুলে দিয়েছেন এদের হাতে।’
তিন অপহরণকারীর অস্ত্র ছিনিয়ে নেয়া হল। হাত পিছমোড়া করে বেঁধে দুটো ঘোড়ায় করে ওদেরকে সৈন্যরা কমান্ডারের কাছে নিয়ে গেল। সাবেরা বসল উটের পিঠে। সূর্য ডোবার পূর্বেই এরা চার মাইল পথ অতিক্রম করল। সামনের মরুদ্যানে তাবু টানানো। ডিউটিরত সেনা দলের হেড কোয়ার্টার। ওরা সাবেরাকে নিয়ে গেল কমান্ডারের সামনে। কঠোর প্রহরায় তিন অপহরণকারীকে বসানো হল তাবুর বাইরে। আগামীকাল এদের কায়রো পাঠিয়ে দেয়া হবে।
খ্রিস্টানদের পদতলে পিষ্ট হচ্ছিল প্রিয় ফিলিস্তিন। মুসলমানদের রক্তে ভিজে যাচ্ছিল পবিত্র ভূমির বালুকারাশি। দুর্দশার কালো মেঘ থেকে ঝরে পড়ছিল অত্যাচারের অগ্নি বৃষ্টি। অসহনীয় নির্যাতনের দুঃসহ ব্যথায় কাৎরাচ্ছিল তৌহিদী জনতা। এমনি এক দুঃসময়ে সুলতান সালাহউদ্দীন আয়ুবী পা রাখলেন ফিলিস্তিনের মাটিতে।
সুবাক এখন মুসলমানদের দখলে- দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর এ সংবাদ ফিলিস্তিনের মুসলমানদের হৃদয়ে জ্বেলে দিল আশার প্রদীপ। অনাগত মুক্তির আনন্দে হিল্লোলিত হল প্রাণ। কিন্তু ওদের এ অব্যক্ত আনন্দ দুর্বিসহ বেদনা হয়ে দেখা দিল। খ্রিস্টানরা প্রতিশোধের আগুনে পুড়িয়ে দিল জেরুজালেম এবং আশপাশের জেলাগুলোর মুসলিম বসতি। এভাবেই মুসলমানদের ওপর সুবাক দুর্গ হারানোর শোধ তুলতে লাগল ওরা।
মুসলমানদেরকে চিরতরে নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার ঘৃণ্য তৎপরতায় মেতে ওঠা খ্রিস্টানরা সুবাকের পর ক্রাক নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়ল। আয়ুবী যেন ক্রাক আক্রমণ করতে না পারে এ জন্য ক্রাকে চলল নির্বিচারে মুসলিম হত্যা। বুদ্ধির খেলায় হেরে গেছে ওরা। হাতছাড়া হয়েছে সুবাক দুর্গ। ক্রাক হাতছাড়া করা যাবে না। স্তব্ধ করে দিতে হবে আয়ুবীর অগ্রযাত্রা। ক্রাকের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মজবুত করার পাশাপাশি তাই ওরা স্থানীয় মুসলমানদের শিরদাড়া ভেংগে দেয়ার জন্য তৎপর হয়ে উঠল। এখানেও খোলা হল বেগার ক্যাম্প। সামান্য সন্দেহ হলেই মুসলমানদেরকে নিক্ষেপ করতে লাগল সে ক্যাম্পে।
‘ফিলিস্তিন বিজয় আমাদের মহান উদ্দেশ্য। কিন্তু ক্রাক থেকে নির্যাতিত মুসলমানদেরকে বের করে আনা তারচে বড় উদ্দেশ্য হওয়া উচিৎ।’ সুলতান আয়ুবীকে বলল গোয়েন্দা সংস্থার একজন গ্রুপ কমান্ডার, নাম তালাত চেঙ্গিস। তালাত একজন তুর্কী মুসলমান। সুবাক থেকে পালিয়ে যাওয়া খ্রিস্টানদের ছদ্মবেশে ক্রাকে পৌঁছে ছিল সে। ফিরে এসেছে তিন মাস পরে। গোয়েন্দা প্রধানের সামনেই তালাত সুলতানকে ক্রাকের রিপোর্ট দিচ্ছিল। ‘যে সব খ্রিস্টান সৈন্য’ লুকিয়ে ক্রাক পৌঁছেছে ওদের অবস্থা ভাল নয়। সহসা যুদ্ধের জন্য তৈরী হতে পারবে না ওরা। তবে পরাজয়ের প্রতিশোধ নিচ্ছে ওরা স্থানীয় মুসলমানদের ওপর। পুরুষদেরকে এলোপাথাড়ি গ্রেপ্তার করছে। মেয়েরা বাড়ী থেকে বের হতে পারছে না। আমরা সেনাবাহিনীতে ভর্তি হওয়ার জন্য ওখানকার মুসলিম যুবকদেরকে গোপনে সংগঠিত করতে শুরু করেছিলাম। কিছু যুবক পালিয়ে এসে ভর্তিও হয়েছে। কিন্তু চারদিকে খ্রিস্টান সৈন্য থাকায় অধিকাংশই ওদের চোখকে ফাঁকি দিয়ে আসতে পারছে না। তাছাড়া পরিবার-পরিজন ছেড়ে আসতে অনেকের অসুবিধা হচ্ছে।
সবচে বিপদের কথা হল, কারো ওপর সন্দেহ হলেই তাকে বেগার ক্যাম্পে পাঠিয়ে দেয়া হচ্ছে। এখনই ক্রাক আক্রমণ করে মুসলমানদেরকে এ নির্যাতনের হাত থেকে মুক্তি দেয়া আমাদের কর্তব্য।’
এর আগে গোয়েন্দারা বলেছিল সুলতান ক্রাক আক্রমণ করলে রিমান্ড তার বাহিনী নিয়ে পেছন থেকে আক্রমণ করবে। সুলতানও সেনা অফিসারদের কাছে পূর্বেই এমন আশংকা ব্যক্ত করেছিলেন। এ জন্য সেনা সদস্য বৃদ্ধির প্রয়োজন ছিল।
সুলতান আয়ুবী তালাতকে বিদায় দিয়ে আলীকে বললেন, আবেগের দাবী হচ্ছে এ মুহূর্তে ক্রাক আক্রমণ করা। ওখানকার মুসলমানরা কি কষ্টের মধ্যে আছে আমি বুঝি। কিন্তু বাস্তবতা বলছে, শক্তি সঞ্চয় না করে আক্রমণ করো না। নিশ্চিত না হয়ে আক্রমণ করা যুদ্ধনীতির পরিপন্থী। আলী! আমাদের মা-বোনদের সম্ভ্রম লুণ্ঠিত হচ্ছে, হত্যা করা হচ্ছে পুরুষদের। ইসলামের ইতিহাসে ওরা হচ্ছে নামহারা শহীদ। যে কোন জাতিকেই মহৎ উদ্দেশ্য সাধনের জন্য এমন কোরবানী দিয়ে যেতে হয়। ওদের আব্রু, জীবন এবং ওদের দ্বীনের হেফাজতের জন্যই আমি ফিলিস্তিন শত্রুমুক্ত করতে চাই। সাধারণভাবে যুদ্ধের উদ্দেশ্য আক্রমণ ও লুটপাট ছাড়া কিছুই নয়। যারা স্বীয় জাতির সন্তানদের ভুলে যায়, মুখ বুজে সহ্য করে শত্রুর নির্যাতন, তারা হয়ে যায় ডাকাত ও দস্যুদের সহযোগী। শত্রুর ওপর প্রতিশোধ না তুলে পরস্পরের সম্পদ লুণ্ঠন করে ওরা। প্রতারিত করে অন্যকে। ওদের শাসকরা গরীবের সম্পদ লুটে ভোগ বিলাসে মত্ত হয়। শত্রুরা আক্রমণ করলে অমূলক হম্বিতম্বি করে জনগণকে ধোকা দেয়। শত্রুর সংগে গোপন আঁতাত করে। দেশের কোন অংশ ওদেরকে ছেড়ে দিয়ে রক্ষা করে গদী। ভোগ বিলাসের জন্যই ওরা শুষে নেয় জনগণের শেষ রক্তবিন্দু।
অনেক জাতির শাসকগণ কেবল রাজ্য বিস্তারের মোহে যুদ্ধ করেছে। বিলাসিতার সময়টা দীর্ঘস্থায়ী করার জন্য বইয়ে দিয়েছে রক্তের বন্যা। আজ পৃথিবী থেকে ওদের নামও মুছে গেছে। খ্রিস্টানদের মত আমরাও লড়াইকারী। কিন্তু দু’জনের মধ্যে বিরাট পার্থক্য। ওরা অনেক দূর থেকে এসেছে আমাদের ধর্মের অস্তিত্ব মুছে ফেলার জন্য। এসেছে আমাদের নারীদের অধিকার করে ওদের গর্ভ থেকে খ্রিস্টান জন্ম দেয়ার জন্য। আমরা আত্মরক্ষার জন্য এবং আমাদের মা-বোনদের ইজ্জত রক্ষার জন্য লড়াই করছি। খ্রিস্টানদের এ ঝড়কে প্রতিরোধ করতে না পারলে আমরা বিবেকহীন, আত্মমর্যাদা শূন্য বলে পরিচিত হবো। আর যদি আমরা বাড়ীতে বসে ওদের আক্রমণের অপেক্ষা করি তবে নিশ্চয়ই আমরা ভীত ও কাপুরুষ বলে চিহ্নিত হবো। প্রতিরোধর নিয়ম হলো, যখনি দুশমন তোমাকে হত্যা করার জন্য তরবারী কোষমুক্ত করবে, আঘাত করার পূর্বেই তোমার তলোয়ার তার শিরোচ্ছেদ করবে। সে আগামী কাল আক্রমণ করতে আসবে জানলে আজই তার মোকাবেলায় নেমে যাও যাতে সে আর আঘাত করার সুযোগ না পায়।’
‘নূরুদ্দীন জাংগীর কাছে কি সাহায্য চাওয়া যায় না?’ আলী বললেন, ‘সাহায্য পেলে সাথে সাথেই আমরা ক্রাক আক্রমণ করতে পারতাম।’
‘না, তাঁর কাছে সবসময় এমন সৈন্য থাকা দরকার, আমরা পেছন থেকে আক্রান্ত হলে তিনি যেন ওদেরকে পাল্টা আক্রমণ করতে পারেন।’ আয়ুবী বললেন, ‘আমি কারও কাছ থেকে সাহায্য নেয়ার পক্ষপাতি নই, বরং গেরিলাদের পাঠিয়ে আমরা ওদের ঘুম হারাম করে দিতে পারি। আমার বিশ্বাস, আমাদের গুপ্তচর এবং গেরিলারা মিলে শত্রুর মূল উপড়ে ফেলতে পারবে। কিন্তু ওখানকার নিরপরাধ মুসলমানদেরকে এর শাস্তি ভোগ করতে হবে। কারণ, কমান্ডো বাহিনী কাজ শেষে এদিক ওদিক পালিয়ে যাবে। কিন্তু ওখানকার নিষ্পাপ মুসলমান ভাই-বোনগুলো পালাতে পারবে না, তারা শত্রুর হাতে নিঃশেষ হয়ে যাবে। বিকল্প হিসেবে ওদেরকে ওখান থেকে বের করে নিয়ে আসা যায় কিনা দেখ। আক্রমণ করার জন্য আরও কিছু সময় প্রয়োজন। এর মধ্যে আমরা অনেক নতুন রিক্রুটও পেয়ে যাব।’
‘আমার মনে হয় এখানকার মুসলমানদের ব্যাপারে আমাদের পলিসি পরিবর্তন করা প্রয়োজন।’ বলল খ্রিস্টানদের গোয়েন্দা প্রধান হরমুন।
ক্রাকের এক দুর্গে ক’জন খ্রিস্টান সম্রাট, উচ্চপদস্থ সেনা অফিসার এবং প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মিটিং চলছিল। পরাজিত সেনাবাহিনীর দিকে তাকাতেই ওদের ক্রোধ বেড়ে যাচ্ছিল। এ পরাজয়কে ওরা বদলে দিতে চাইছিল বিজয় দিয়ে। এদের মধ্যে কেবল হরমুনই ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করছিলেন। ক্রাকের মুসলমানদের ওপর চলছিল অবর্ণনীয় নির্যাতন। তিনি বললেন, ‘আপনারা এখানকার মুসলমানদের সাথে যেমন ব্যবহার করেছেন আমরাও সুবাকে তেমন করেছিলাম। ফলশ্রুতিতে আমাদেরই এক গুপ্তচর মেয়ে বিপজ্জনক এক বন্দীকে পালাতে সাহায্য করেছিল। সে সুবাক দুর্গের সব কিছু দেখে গেছে। তাছাড়া সালাহউদ্দীন দুর্গপ্রাচীর যেভাবে ভেংগেছে এতে ভেতরের মুসলমানদেরও হাত ছিল। আমাদের ব্যবহারে ওরা এতটা বিরক্ত ছিল যে, জীবন বাজি রেখে ওরা সালাহউদ্দীনের সাহায্য করেছে। এরাই ছিল আয়ুবী সেনাবাহিনীর পথ প্রদর্শক।’
‘এ জন্যই আমরা এখানকার মুসলমানদের সাহস এবং আবেগ নিঃশেষ করার জন্য এরূপ নির্যাতন করছি।’ বলল এক সেনা কমান্ডার।
‘তার পরিবর্তে ওদেরকে আপনাদের বন্ধুতে রূপান্তরিত করুন, ওরা আপনাদের সাহায্য করবে।’ বলল হরমুন। ‘আমায় অনুমতি দিলে ধর্মান্তরিত না করেই ওদেরকে খ্রিস্টানদের বন্ধুতে রূপান্তরিত করব। তখন ওরা মুসলমানদের বিরুদ্ধেই যুদ্ধ করবে।’
‘ভুলে যাচ্ছ হরমুন!’ মুখ খুললেন সম্রাট রিমান্ড। ‘দু’একজন মুসলমানকে নারী দেহ আর টাকার লোভ দেখিয়ে গাদ্দারে পরিণত করা যায় কিন্তু গোটা সেনাবাহিনীকে গাদ্দার বানানো যায় না। হরমুন, ওদের ওপর নির্ভর করো না। ওদের আমরা বন্ধু বানাতে চাইনা, আমরা মুসলমানদেরকে নির্বংশ করতে চাই। কোন অমুসলিম কোন মুসলমানকে ভালবাসলে এর অর্থ হচ্ছে সে ইসলামকেই ভালবাসে। অথচ আমরা ইসলামকে নিশ্চিহ্ন করতে চাই। ক্রাক, জেরুজালেম, ওফা এবং আদলিসা যেখানেই খ্রিস্টানদের শাসন রয়েছে সেখানেই মুসলমানদের ওপর এতটা নির্যাতন কর যেন ওরা মরে যায়। না মরলেও খ্রিস্টানদের সামনে মাথানত করে রাখে।
দ্বিতীয় অংশ
‘মুসলমানদের সাথে এখানে যা করা হচ্ছে সালাহউদ্দীন আয়ুবী নিয়মিত তার খবর পাচ্ছেন।’ হরমুন বলল, ‘আপনারা তাকে ক্রাকে তাড়াতাড়ি আক্রমণ করতে বাধ্য করছেন। আপনারা ভুলে যাচ্ছেন আমাদের সেনাবাহিনী এ মুহূর্তে কোন যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার উপযুক্ত নেই।’
‘তবে কি এখানকার মুসলমানদেরকে মাথায় তুলে নাচব! বুঝতে পারছি না বন্দীদেরকে হত্যা না করে কেন আমরা লালন পালন করছি।’ জবাব দিলেন গে অব লুজিনাম।
‘কারণ মুসলমান বন্দীদের হত্যা করলে আয়ুবী আমাদের বন্দীদের হত্যা করবে। আমাদের কাছে রয়েছে ওদের তিনশ লোক, ওদের কাছে রয়েছে আমাদের তেরশ বন্দী।’
‘একজন মুসলমান সৈন্য হত্যার বিনিময়ে আমরা চারজন খ্রিস্টান সৈন্য হারাতে পারি না’, বললেন শাহ অগাস্টাস।
‘আয়ুবী আমাদের যে সব সৈন্যদের বন্দী করেছে ওরা ভীরু, কাপুরুষ। যুদ্ধ করার পরিবর্তে স্বেচ্ছায় বন্দীত্ব গ্রহণ করেছে। ওদের বেঁচে থাকার কোন অধিকার নেই। আমাদের হাতে মরার চাইতে বরং মুসলমানদের হাতে মরাই ভাল। নিশ্চিন্তে মুসলিম বন্দীদের হত্যা করার পক্ষপাতি আমি।’ একজন সেনা কমান্ডার দাঁড়িয়ে বলল।
‘স্থানীয় মুসলমানদের ওপর অত্যাচার করে, বন্দীদের হত্যা করে আমরা কি আয়ুবীকে পরাজিত করতে পারব? এখন আমাদের সামনে সমস্যা হল আয়ুবী আক্রমণ করলে কিভাবে বাধা দেব, কিভাবে সুবাক দুর্গ পুনরুদ্ধার করব। আপনার কথামত ক্রাকের সব মুসলমানদের মেরে ফেললাম। তারপর কি হবে? শত্রু কি নিশ্চিহ্ন হবে? তারচে আয়ুবীর মত আমরাও আমাদের সৈন্য সংখ্যা বৃদ্ধি করছি না কেন?’ বলল একজন।
‘মিশরে আমাদের গোয়েন্দারা কি কাজ করছে অনুগ্রহ করে হরমুন কি বলবেন?’ বলল আরেক সেনা কমান্ডার।
‘হ্যাঁ, আমাদের গোয়েন্দারা আশানুরূপ কাজ করছে। সালাহউদ্দীন সুবাক কেল্লায়। তার অনুপস্থিতিতে আমরা অনেক দূর এগিয়েছি। কায়রোর উপ-রাষ্ট্রপতি মুসলেহ উদ্দীন ফাতেমীদের সাথে হাত মিলিয়েছে। মুসলেহ উদ্দিন আয়ুবীর বিশ্বস্ত। এখন আমাদের হাতে ফাতেমীরা গোপনে একজনকে খলিফা নির্বাচন করে বিদ্রোহের প্রস্তুতি নিচ্ছে। আমাদের সেনা অফিসাররা সুদানী বাহিনী তৈরী করছে। কায়রোতে আয়ুবীর ফৌজের দু’জন উপ-সেনাপ্রধান আমাদের লোক। সুদানীরা আক্রমণ করলেই ফাতেমীরা বিদ্রোহ করবে।’
‘ভুলে যাচ্ছ কেন, মিসরের সংবাদ পেলে আয়ুবী ক্রাক দুর্গ আক্রমণ মুলতবী রেখে ছুটে যাবে।’ বললেন রিমান্ড, ‘এখানেই রাখতে হবে তাকে। এমনভাবে বিরক্ত করতে হবে যেন তার সৈন্যরা মিসর যাবার পথ না পায়।’
হরমুন বললেন, ‘আমি দৃঢ়তার সাথে বলতে পারি, মিসরে তার যে ক’জন সৈন্য রয়েছে ওরা কিছু করতে পারবে না। ওদের বুঝানো হয়েছে যে, সুলতান তোমাদেরকে গনিমতের সম্পদ থেকে বঞ্চিত করেছেন। হাজার হাজার সুন্দরী যুবতী ধরা পড়েছে, ওদেরকে সৈন্যদের মাঝে ভাগ করে দেয়া হয়েছে। এসব গুজব ছড়ানোর দায়িত্ব পালন করছে প্রশাসনের লোকেরা। আমি দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে বলতে পারি, গোটা সেনাবাহিনী সুদানীদের পক্ষ অবলম্বন করবে। এ বিদ্রোহ দমন করার জন্য আয়ুবীকে এখানকার ফৌজ নিয়ে যেতে হবে। ততোক্ষণে কায়রো হবে ফাতেমী খেলাফতের পদানত। আমরা আয়ুবীকে আক্রমণ করব না। কায়রোতে স্থান না পেয়ে বিশাল মরুতে ঘুরে ঘুরে একদিন …
‘কিন্তু আমাদের ভুলে গেলে চলবেনা যে, খলিফার গদিও কিন্তু টিকে থাকেনি।’
হরমুন বলল, ‘তার কারণ, ইসলামী সাম্রাজ্যকে বিস্তৃত করার পরিবর্তে ব্যক্তি স্বার্থের দিকে নিবদ্ধ হল সকলের দৃষ্টি। ফলে, একে একে ছুটে যেতে থাকল বিজিত এলাকাগুলো। তারই ফলশ্রুতিতে আমরা এখন আরবে অবস্থান করছি।
প্রথম দিককার জেনারেলগণ ইসলামী রাজ্যের সীমানা যদ্দুর বিস্তৃত করেছিল, সালাহউদ্দীন আয়ুবী সে পর্যন্ত যেতে চাইছেন। তার সবচে বড় গুণ হচ্ছে, তিনি খেলাফত বা প্রশাসনের তোয়াক্কা করেন না। তার চলার পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল মিসরের খেলাফত। তিনি তাকে পদচ্যুত করেছেন। সাহস, দূরদর্শিতা এবং সামরিক শক্তি নিজের হাতে থাকার কারণেই তিনি এমনটি করতে পেরেছেন।’
মজলিশে পিন পতন নিরবতা নেমে এল। হরমুনই নিরবতা ভাঙল আবার, ‘বেসমারিক নেতৃত্বের লক্ষ্য ক্ষমতার মসনদ। এ উদ্দেশ্য সাধনের জন্য তারা অর্থ, নারী এবং মদে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। সুলতান তাদের এ দুর্বলতা বুঝতে পেরেছেন। আমরা কেবল উচ্চাভিলাষী সেনা কর্মকর্তাদেরকেই হাত করছি। প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা আমাদের দ্বিতীয় টার্গেট। সেনাবাহিনীকে দুর্বল করতে হলে তাদেরকে জনগণের কাছে হেয় করতে হবে। আমি এ কাজটিই করছি। এ ব্যাপারে আপনারা হয়ত আমার সাথে একমত হবেন না, তবুও আমি বলব, মুসলমানদের হাতেই নিঃশেষ হয়ে যাবে সে।
মুসলমানদের মানসিকতা আপনারা এখনও বুঝেননি, এ জন্যেই আমার কিছু কিছু পদক্ষেপ ও পরামর্শকে আপনারা ভাল চোখে দেখেন না। প্রশিক্ষণের সময় যদি মাথায় ঢুকিয়ে দেয়া যায় যে, তোমরা দেশ ও জাতির অতন্দ্র প্রহরী, সিংহাসন উপহার দিলেও ওরা সৈন্য হয়ে থাকতেই পছন্দ করবে। কিন্তু যদি ওদের ভেতর আত্মপূজা, নারী লিপ্সা এবং মদে অভ্যস্ত করে দেয়া যায় তবে আপন ধর্ম ছেড়ে দিতেও ওরা কণ্ঠিত হবে না। আমাদের পক্ষাবলম্বনকারী প্রশাসনের লোকেরা দ্বিতীয় দায়িত্বটিই পালন করছে।’
‘তবে প্রশাসনের লোকদের মত সেনা ফৌজকে অত সহজে গাদ্দার বানানো যায় না। প্রশাসনের প্রতিটি লোকই রাজা হওয়ার স্বপ্ন দেখে, কিন্তু সৈন্যরা সবাই তেমনটি দেখে না।’ হরমুনের কথার মাঝখানে বললেন অগাস্টাস।
‘আপনি ঠিকই বলেছেন, তবে এটাও ঠিক, তাদের নবীর পরে খেলাফতের জন্য মুসলমানরাই পরস্পর যুদ্ধ করেছিল।’
‘কিন্তু জেনারেলগণ ঈমানদারীর সাথে দায়িত্ব পালন করে, এমনকি অন্য দেশ দখল করে খেলাফতের অন্তর্ভূক্ত করেছে।’
‘হ্যাঁ, মজাটা এখানেই। জেনারেলরা ঈমানদারীর প্রমাণ দিলেও খলিফারা তার কোন মূল্য দেয়নি, এমনকি খলিফারা তাদের সাথে ভাল ব্যবহার পর্যন্ত করেনি। ফলে সেনাবাহিনী ও প্রশাসনের মধ্যে বিস্তর ফারাক সৃষ্টি হয়েছে।’
সালাহউদ্দীন আয়ুবীকে যুদ্ধের ময়দানে হারানো সম্ভব নয়। কারণ, তাঁর প্রতিটি সৈন্য তাঁর মতই জানবাজ। যুদ্ধের উদ্দেশ্য সম্পর্কে তারা এতটাই অবগত যে, মৃত্যু তাদের কোন ভীতির সৃষ্টি করে না।
আরেকটি ব্যাপার হচ্ছে, তিনি শুধু যুদ্ধ পরিচালনা করেন না, নিজেও লড়াই করেন। তাকে কোন খলিফা বা বেসামরিক নেতৃত্ব থেকে নির্দেশ নিতে হয় না। ব্যক্তিগতভাবে তিনি একজন পাকা মুসলমান। তাঁর কথা হচ্ছে, আমি সরাসরি খোদা এবং কোরআনের হুকুম পালন করি। আমাদের বাগদাদের গোয়েন্দারা বলেছে, নুরুদ্দীন জংগী যেসব পরামর্শ পাঠিয়েছেন আয়ুবী তা বাস্তবায়ন শুরু করেছে। প্রথমতঃ একজন বড় মুফতি ফতোয়া দিয়েছেন খেলাফতের কেন্দ্র থাকবে বাগদাদ। বিভিন্ন দেশের ব্যাপারে কোন সিদ্ধান্ত নিতে হলে খলিফা সেনা প্রধানের সাথে পরামর্শ করবেন। দ্বিতীয়তঃ সামরিক সিদ্ধান্তের ব্যাপারে খলিফা কোন হস্তক্ষেপ করবেন না। তৃতীয়তঃ খোৎবায় খলিফার নাম উচ্চারণ করা হবে না। আয়ুবী আরো নির্দেশ দিয়েছে যে, খলিফা বা তার মনোনীত কোন ব্যক্তি বা কোন কেল্লাদার বাইরে বের হলে জনগণ ফুলের তোড়া নিয়ে আর রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকবে না। খলিফার সম্মানে কোন শ্লোগান দেয়া যাবে না।
সালাহউদ্দীন আয়ুবীর বড় সাফল্য হল, তিনি শিয়া-সুন্নীর মতভেদ দূর করে দিয়েছেন। এখন শিয়াদের অনেকেই সেনাবাহিনীর উচ্চ পদে আসীন। শিয়া আলেমদের তিনি বুঝিয়েছেন, ইসলামে নেই এমন কোন কাজ যেন তারা না করেন। এতে আমাদের কিছুটা ক্ষতি হয়েছে। মুসলমানদের মধ্যে বিভিন্ন দল উপদল থাকলে আমাদের সুবিধা। এখন আমরা প্রশাসনের মধ্যে সালাহউদ্দীন এবং সেনাবাহিনীর বিরোধী মনোভাব তৈরী করছি।’
‘এ মনোভাব স্থায়ী করতে হবে।’ মুখ খুললেন ফিলিপ অগাস্টাস। ‘শুধু সালাহউদ্দীনই আমাদের শত্রু নয়, আমাদের যুদ্ধ ইসলামের বিরুদ্ধে। আমাদের চেষ্টা হবে আয়ুবীর মৃত্যু হলে এ জাতি যেন অন্য কোন আয়ুবীর জন্ম দিতে না পারে। ওদের আকিদা বিশ্বাসে কুসংস্কার ঢুকিয়ে দাও। প্রতিটি লোকের চিন্তায় থাকবে রাজা হওয়ার স্বপ্ন। ওদেরকে বিলাসিতার গহীনে ডুবিয়ে দাও। দেখবে একজন অন্য জনের মাথা কাটছে। আমি দৃঢ়তার সাথে বলতে পারি, একদিন এরা ক্রুশের গোলামে পরিণত হবে। ওদের সভ্যতা, সংস্কৃতি, ওদের ধর্ম খ্রিস্টবাদের রঙে রঙ্গীন হবে। ক্ষমতার লোভে একজন আরেকজনকে অন্যজনকে হত্যা করবে। সাহায্য চাইবে আমাদের কাছে। তখন হয়ত আমরা কেউ বেঁচে থাকব না। আমাদের আত্মা ওদের এ পরিণতি দেখে খুশী হবে। ইসলামকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য ইহুদীরা নিজের যুবতী মেয়েদেরকে তোমাদের হাতে তুলে দিচ্ছে। এদেরকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ব্যবহার কর। ইহুদীরা জেরুজালেম এবং ফিলিস্তিনকে নিজের মনে করে, এজন্য ওরা আমাদের দুশমন। কিন্তু সে কথা বলার সময় এটা নয়। ওদের বল, জেরুজালেম তোমাদের। শেষ পর্যন্ত ফিলিস্তিন তোমাদেরকেই দেব। তোমরা এখন আমাদের সহযোগিতা কর। তবে ইহুদীরা অত্যন্ত সতর্ক। আমাদের মানসিকতা বুঝতে পারলেই মুসলমানদের সাথে যোগ দেবে। সতর্কতার সাথে ফিলিস্তিনিদের লোভ দেখিয়ে ওদের সম্পদ এবং যুবতীদের ব্যবহার কর। বিজয় আমাদের হবেই।
J J J J
সুবাক এবং ক্রাক দুর্গ থেকে অনেক দূরে এক বিস্তীর্ণ মরু। চারপাশে উঁচু নীচু এবং পাথুরে পাহাড়। কাকর আর বালুকাময় ভূমিতে মাঝে মাঝে খানাখন্দ। একদিকে খ্রিস্টান শাসকগণ মুসলমানদের নিশ্চিহ্ন করার জন্য বিপজ্জনক পরিকল্পনা তৈরী করছিল, অন্যদিকে দেড় মাইল দীর্ঘ এবং দেড় মাইল প্রশস্ত এ পাহাড় ঘেরা স্থানে চলছিল আয়ুবীর যুদ্ধের মহড়া, নতুন রিক্রুট করা মুসলিম সৈন্যদের প্রশিক্ষণ।
পাহাড়ের ওপর দাঁড়িয়ে সুলতান মহড়া দেখছিলেন। সাথে দু’জন সহকারী। প্রশিক্ষণরত সৈনিকগণ ঘোড়াসহ লাফিয়ে খানাখন্দ পার হচ্ছিল। প্রতিপক্ষের প্রচন্ড আক্রমণ ঠেকিয়ে করছিলো পাল্টা আক্রমণ।
‘আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন সুলতান’, বললেন একজন সহকারী, ‘কিছুদিনের মধ্যেই এরা অভিজ্ঞ সৈনিকে পরিণত হবে। তীর-তরবারী, নেজা-বল্লম, সবকিছুতেই হয়ে উঠবে পারদর্শী।’
নতুন রিক্রুটদের মধ্যে সুবাকের লোক যেমন ছিল, গোয়েন্দাদের সহযোগিতায় ক্রাক থেকেও যুবকরা এসে শামিল হয়েছিল এতে। ক্রাকে এদের ওপর চলছিল অবর্ণনীয় নির্যাতন।
নতুনদের আগ্রহ উদ্দীপনায় সুলতান প্রীত হলেন। সহকারীদের বললেন, ‘সুবাক এবং ক্রাক থেকে আরও নতুন নতুন যুবকদের ভর্তি করে ওদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা কর।’
‘অস্ত্রের ব্যবহার জানলেই অভিজ্ঞ সৈনিক হওয়া যায় না। একজন অভিজ্ঞ সৈনিকের গুণ হচ্ছে বুদ্ধি এবং দূরদর্শিতা। যারা এলোপাথাড়ি দুশমনকে আক্রমণ করে, এমন সৈনিক আমার প্রয়োজন নেই। আমার সৈন্যরা জানবে কে তার শত্রু, যুদ্ধের উদ্দেশ্য সম্পর্কে থাকবে পরিচ্ছন্ন ধারণা। বিশ্বাস থাকবে তারা আল্লাহর সৈনিক, আল্লাহর পথে লড়াই করছে। এদের মধ্যে দেখছি প্রচন্ড আবেগ রয়েছে। কিন্তু যদি উদ্দেশ্য এবং নিজের অবস্থান জানা না থাকে অল্প ক’দিনের মধ্যেই এ আবেগ নিঃশেষ হয়ে যাবে। ওদের বুঝিয়ে বল আমরা কেন ফিলিস্তিন পুনরুদ্ধার করতে চাই। গাদ্দারীর পরিণাম ওদের বল। ওদের বল, কেবল মাত্র রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলের উদ্দেশ্যে নয় বরং দ্বীন এবং ঈমানের জন্য তোমরা যুদ্ধ করছ। সামরিক প্রশিক্ষণ শেষ হলে ওদের জন্য আত্মিক ও মানসিক ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা কর।’
‘মহামান্য সুলতান’, একজন সহকারী বললেন, ‘প্রতি সন্ধ্যায় ওদের জন্য দ্বীনী আলোচনার ব্যবস্থা রয়েছে। আমরা একদল পশু সৈনিক তৈরী করতে চাই না।’
‘আমাদের যে সব মেয়েদেরকে ওরা অপহরণ করছে, যেসব যুবতীদের সম্ভ্রম নষ্ট করেছে তাদের কথা এদের খুলে বল। খ্রিস্টানরা পবিত্র কোরআন পদদলিত করছে, মসজিদ হয়েছে ওদেরই গোশালা। ওদের বল, নারীর সম্ভ্রম, পবিত্র কোরআন এবং মসজিদের সম্মান রক্ষা করা মুসলমানদের ঈমানী দায়িত্ব। যেদিন তোমরা এ দায়িত্ব ভুলে যাবে সেদিন এ পৃথিবী তোমাদের জন্য হবে জাহান্নাম। পরকালের শাস্তি তো মৃত্যুর পরে।
ট্রেনিং চলছিল পর্বতবেষ্টিত বিশাল এলাকা জুড়ে। এরপরও সুলতান পাহারার ব্যবস্থা করেছিলেন। যে কোন সময় খ্রিস্টান ফৌজ আক্রমণ করতে পারে। চার পাঁচজনের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দল পাহারায় নিয়োজিত ছিল। সুলতান যে পাহাড়ে দাঁড়িয়েছিলেন তার বিপরীত দিকের টিলার উঠে এল এদের একটা দল। তাদের দিকে সুলতানের পিঠ।
দলের একজন বলল, ‘মাত্র আড়াইশ গজ দূরে সে দাঁড়িয়ে আছে। তাকে মারার জন্য একটা তীরই যথেষ্ট। কি বল?’
‘হ্যাঁ’, বলল দ্বিতীয়জন, ‘কিন্তু এরপর পালিয়ে যাবো কোথায়?’
‘তাও ঠিক। ওরা আমাদের মেরে ফেললে তো কোন কথা ছিল না, কিন্তু তা করবে না। এমন শাস্তি দেবে, আমরা আমাদের সংগীদের নাম বলতে বাধ্য হব।’
‘এ কাজ তার দেহরক্ষীরাই করবে।’ তৃতীয়জন বলল, ‘সালাহউদ্দিনকে হত্যা করা এত সহজ হলে এতদিন তার বেঁচে থাকার কথা নয়।’
‘এ কাজ এখনই হওয়া উচিৎ। ফাতেমীরা বলছে আমরা শুধু ওদের কাছ থেকে অর্থ নিচ্ছি, কাজের কাজ কিছুই করছি না।’
‘ভেবো না, খুব শীঘ্রই ওর মৃত্যু হবে। শুনেছি ঘাতক দলের সদস্যরা খুব সাহসী। সুলতানের দেহরক্ষীদের মধ্যে ওদের তিনজন সদস্য রয়েছে। সম্ভবত ওরা ভয় পাচ্ছে, নয়তো একটা লোককে মারতে এতদিন লাগবে কেন?’
কথা বলতে বলতে ওরা সামনের দিকে এগিয়ে গেল। এরা ছিল খ্রিস্টানদের নিয়োজিত ভাড়াটে খুনী।
∞ ∞ ∞ ∞ ∞
ক্রাকে খ্রিস্টান সম্রাটদের মিটিং শেষ হয়েছে। সিদ্ধান্ত হয়েছে, আর অপেক্ষা নয়- আয়ুবী আক্রমণ করার পূর্বেই তাকে আক্রমণ করতে হবে। শুরু হল সৈন্য সেটিং-এর পালা। ফ্রান্সের বাহিনী আয়ুবীকে পথেই বাধা দেবে। রিমান্ডের ফৌজ আক্রমণ করবে মুসলিম বাহিনীর পেছন থেকে। ক্রাকের দুর্গ রক্ষা করবে জার্মান বাহিনী। তাদের সাথে থাকবে ইংল্যান্ড এবং ফ্রান্সের কয়েক প্লাটুন সৈন্য।
আয়ুবীর প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে আক্রমণ করে পালিয়ে আসার পরিকল্পনার বিরোধিতা করল গোয়েন্দা বিভাগ। তাদের যুক্তি হল, সুলতান আয়ুবী তার বাহিনী তিন ভাগে ভাগ করেছেন। একভাগ যুদ্ধের জন্য তৈরী হয়ে আছে। তার সৈন্যরা দলে দলে বিভক্ত হয়ে সমগ্র মরুভূমিতে ছড়িয়ে আছে। গাছের একটা পাতা নড়লেও আয়ুবীর কানে সে সংবাদ পৌঁছে যায়।
সুলতানের এ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার কথা শুনে এই পরিকল্পনা বাতিল করে দেয়া হল।
খ্রিস্টানদের সৈন্য সংখ্যা ছিল আয়ুবীর চেয়ে চারগুণ বেশী। এর বেশীরভাগ বর্মধারী এবং অশ্বারোহী। ওদের স্বাভাবিক আক্রমণ ঠেকানো মুসলিম বাহিনীর জন্য ছিল অসম্ভব। কিন্তু সুবাকের যুদ্ধ ওদের মনে ভয় ধরিয়ে দিয়েছিল। আতংক ছড়াচ্ছিল পরাজিত সৈন্যরা। সুবাক ছিল ওদের কাছে লৌহ দুর্গ। সুলতানের বাহিনীকে পথে নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার জন্য ওরা বিশাল এক বাহিনী পাঠিয়েছিল। দুর্গে বসে ছিল নেতৃবৃন্দ। সুলতান মুখোমুখি সংঘর্ষে না গিয়ে ওদেরকে মরুর বালুর সাথে মিশিয়ে দিয়েছিলেন। মুসলিম বাহিনীর নিক্ষিপ্ত গোলার আগুন দেখে আতংকিত হয়েছিল ঘোড়া এবং উঠগুলো। দীর্ঘদিন পর্যন্ত একটু আগুন দেখলেই ওগুলি ভড়কে যেত। সুলতানের প্রচন্ড আক্রমণে লৌহ দুর্গের প্রতিরোধ বুহ্য ভেংগে পড়ল। কাঁপন ধরল খ্রিস্টানদের বুকে।
বিভিন্ন সম্রাটদের নিয়ে গঠিত হয়েছিল সম্মিলিত বাহিনী। নিজেদের ভেতর ছিল চরম বিরোধ। সবাই চাইছিল নিজ নিজ ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করতে। সম্প্রসারিত করতে চাইছিল স্বীয় রাজ্যের সীমানা। শুধু মুসলমানদেরকে নিঃশেষ করার জন্যই ওরা ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল। কিন্তু হৃদয়ে লালিত বিরোধের কারণে সঠিক কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারছিল না ওরা।
খ্রিস্টানরা ছিল ষড়যন্ত্রে পারদর্শী। কোন মুসলিম এলাকা দখল করলে ওখানে চালাত হত্যাযজ্ঞ। লুণ্ঠন করত মুসলিম নারীদের সম্ভ্রম। অপরদিকে মুসলমানরা কোন এলাকা দখল করলে দূরদর্শিতা, বুদ্ধিমত্তা এবং ভালবাসা দিয়ে শত্রুকে আপন করে নিতেন আয়ুবী। মুসলিম সৈন্যদের মধ্যে ছিল আত্মত্যাগের সুষমা। দশজন সৈনিকের কমান্ডো বাহিনী এক হাজার খ্রিস্টান সৈন্যকে পর্যুদস্ত করে দিত। জীবন বিলিয়ে দেয়াকে এরা সাধারণ ব্যাপার মনে করত। সুলতানের নিপুন পরিচালনায় অল্প সংখ্যক সৈন্য বিশাল বাহিনীর বুহ্য ভেংগে দিত। ক্রাকেও তিনি এ বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়েছিলেন। খ্রিস্টান বাহিনীর মনোবল ভেংগে পড়েছিল। সৈন্যদের শারীরিক এবং মানসিক অবস্থা দেখে যুদ্ধের পরিকল্পনা আপাততঃ স্থগিত করা হল। মিসরে অভুত্থান ঘটাতে হবে। মিসর আক্রমণ করার জন্য সুদানীদের উদ্বুদ্ধ করতে হবে। সিদ্ধান্ত হল, যুদ্বাস্ত্রসহ এর সমস্ত ব্যয় খ্রিস্টান শাসকগণ বহন করবেন। মিসরের উপ-রাষ্ট্রপ্রধান খ্রিস্টান শিবিরে নিয়মিত সংবাদ পাঠাচ্ছিলেন। আশাব্যঞ্জক সে সব সংবাদ।
মিসরের অর্থ সচিব নিহত হয়েছেন এবং মুসলিম উদ্দিনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, এ খবর তখনও পৌঁছেনি খ্রিস্টানদের কাছে। ক্রাকে এ সংবাদ দেয়া জরুরী। সংবাদ পৌঁছাতে পনর দিনের প্রয়োজন। চারদিকে সুলতানের ফৌজ ছড়িয়ে আছে বলে অনেকটা পথ ঘুরে ক্রাক যেতে হয় বলে খ্রিস্টান গুপ্তচররা চিন্তিত।
যেদিন সাবেরা অপহৃত হয় সেদিন ক্রাক পৌঁছল খবরবহনকারী। দূত বলল, ‘বিদ্রোহের জন্য সব তৈরী, কিন্তু সুদানীরা এখনও আক্রমণের জন্য প্রস্তুত হয়নি। তাদের ঘোড়ার অভাব রয়েছে, তবে উট আছে অনেক। এ মুহূর্তে শ’পাঁচেক ঘোড়া পাঠানো দরকার।’
‘এখনি পাঁচশ ঘোড়া নিয়ে সাতজন খ্রিস্টান অফিসার রওয়ানা হয়ে যাও।’ নির্দেশ দিলেন ফ্রান্সের সেনা কমান্ডার। ‘সময় সুযোগ বুঝে তোমরা সুদানীদের দিয়ে মিসর আক্রমণ করাবে।’
খ্রিস্টানদের রয়েছে অসংখ্য ঘোড়া। এরপরও তিন দিনের মধ্যেই সাধারণ খ্রিস্টানগণ পাঁচশত ঘোড়া কমান্ডারের কাছে হাজির করল। রওয়ানা হল ঘোড়ার বহর। পথ দেখাচ্ছিল এক গোয়েন্দা। সুদানী এ গোয়েন্দাটি তিন বছর থেকে এ কাজে রয়েছে। সাথে ছিল আটজন খ্রিস্টান সেনা অফিসার। তাদের বলা হয়েছিল আয়ুবীকে এখান থেকে আর মিসরে যেতে দেয়া হবে না।
সুলতান শুনেছেন মিসরের পরিস্থিতি ভাল নয়। মিসর যে এখন জীবন্ত অগ্নিগিরী তা তিনি জানতেন না। আলী তাকে বলেছিলেন, ‘মিসরে আমাদের গোয়েন্দাদের যে নেটওয়ার্ক রয়েছে তাতে যে কোন সংবাদ আমরা পেয়ে যাব। অর্থসচিব এবং উপ-রাষ্ট্রপ্রধানের পরিণতির কথাও তাদের জানা ছিল না। সুলতানের কাছে সংবাদ পাঠানোর জন্য কেউ কেউ পুলিশ প্রধানকে পরামর্শ দিয়েছিল। তিনি বলেছিলেন, ‘আগে সাক্ষী প্রমাণ যোগাড় করে নেই। সুলতানকে জানাব তারপর।’
J J J J J
রাতে সাবেরাকে ভিন্ন একটা তাবুতে রাখা হল। তখনো সূর্য উঠেনি। তিনজন অপহরণকারী এবং সাবেরাকে কায়রো পাঠিয়ে দেয়া হল। সাথে আটজন সশস্ত্র সৈন্য। দলটি যখন কায়রো পৌঁছলো সূর্য ডুবে গেছে। ওরা সরাসরি পুলিশ প্রধানের অফিসে গেল। গিয়াস বিলকিস মামলার তদন্ত নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। সন্ধ্যার পর শাস্তি সেলে ঢুকেছেন। মুসলেহ উদ্দীনের বাড়ীতে তল্লাশী নেয়া হয়েছিলো। ফিরিংগী মেয়েটাকে পাওয়া গেছে। ও নিজের পরিচয় দিল উজবেক মুসলমান হিসেবে। পুলিশ প্রধানকেও বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করল উল্টাপাল্টা কথা বলে। চেষ্টা করল যৌবনের মায়াজালে আটকে দিতে।
গিয়াস বিলকিস যুবতীকে শাস্তি সেলের কয়েকটা কক্ষ দেখালেন। বিবর্ণ হয়ে গেল মেয়েটার মুখ। পুলিশ প্রধানের উদ্দেশ্য সফল হল, সব স্বীকার করল ও। বলল, ‘ আমার নাম মাথা। জাতিতে খ্রিস্টান। এসেছি জেরুজালেম থেকে।’
মেয়েটা পুলিশ প্রধানকে অর্থ এবং যৌবনের লোভ দেখাল। বলল, ‘মানুষ তো সুখের জন্যই এত কষ্ট করে। আপনি আমাকে মুক্তি দিলে সুখ ও সম্পদে আপনাকে ভরে দেব।’
মুসলেহ উদ্দীনের বাড়ী থেকে যেসব সম্পদ আটক করা হয়েছে এতেই তিনি হতবাক হয়ে গেছেন। তিনি অনুমান করতে পেরেছেন উপ-রাষ্ট্রপ্রধান হয়েও মুসলেহ উদ্দীন কেন খ্রিস্টানদের ফাঁদে পা দিয়েছেন। অর্থ ছাড়াও যুবতীর মাতাল করা রূপ আর ভাষার যাদু থেকে বেঁচে থাকার জন্য পাথর হৃদয় মানুষের প্রয়োজন।
পুলিশ প্রধান ভাবনার অতলে ডুবে গেলেন। উপ-রাষ্ট্রপ্রধানের কাছে রূপের জ্বলন্ত আগুন আর সম্পদের পাহাড় নিয়ে মেয়েটা জেরুজালেম থেকে। এসেছে একজন মুসলিমের কাছে খ্রিস্টানের উপঢৌকন হিসাবে। ফলে তিনি বুঝলেন, ষড়যন্ত্রের মূল অনেক গভীরে।
মেয়েটার দিকে তাকালেন পুলিশ প্রধান। ‘বল মেয়ে, এ দেশে কি জন্য এসেছ? কে তোমায় পাঠিয়েছে?’
যুবতীর ঠোঁটে মৃদু হাসির ঝিলিক। বলল, ‘যা বলছি তার বেশী আর কিছু বলার নেই। আর কিছু বললে ক্রুশের সাথে প্রতারণা করা হবে। ক্রুশ হাতে নিয়ে শপথ করেছি দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে প্রয়োজনে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করব, তবুও গোপন তথ্য প্রকাশ করব না। এখন আমাকে যা ইচ্ছে করতে পারেন। একটা কথাও আর বলব না। আর যদি জেরুজালেম বা ক্রাক পৌঁছানোর ব্যবস্থা করেন, এ দেহ ছাড়াও পাবেন অঢেল সম্পদ। মুসলেহ উদ্দীন তো আপনার হাতে বন্দী, ওকে জিজ্ঞেস করুন, সে আপনার স্বজাতি, কিছু বললেও পারে।’
গিয়াস মারথাকে আর কিছু জিজ্ঞেস করলেন না, মুসলেহ উদ্দীনের কক্ষে চলে এলেন। তার শারীরিক অবস্থা ভাল নয়। হাতের কব্জিতে রশি বেঁধে ছাদের আংটার সাথে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। ‘মুসলেহ, বন্ধু! যা জিজ্ঞেস করি জবাব দাও। তোমার স্ত্রী কোথায়? কারা তাকে অপহরণ করেছে? তোমার বান্ধবী মারথা সব গোপন তথ্য ফাঁস করে দিয়েছে। এবার তোমাকেও বলতে হবে। আমি দেখতে চাই দু’জনের এক কথা বলছ কিনা। তুমি কতটুকু মিথ্যে বলতে পার সেটাও বুঝা যাবে তোমার কথা থেকে।’
‘আমার হাত খুলে দে বদমাশ।’ ক্রোধে দাঁত পিষে বলল মুসলেহ উদ্দীন। ‘সুলতান আসুক, তোকেও এভাবে ঝুলাবো।’
প্রহরী এসে পুলিশ প্রধানের কানে কানে কি যেন বলল। বিস্ফারিত চোখে সেন্ট্রির দিকে তাকিয়ে রইলেন তিনি। ছুটে কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেলেন। মুসলেহ উদ্দীনের স্ত্রী এবং তিনজন অপহরণকারী বসে আছে। অপহরণ থেকে শুরু করে এদের গ্রেপ্তার হওয়ার সমস্ত ঘটনা খুলে বলল সাবেরা। পুলিশ প্রধান চারজনকে নিয়ে চললেন আন্ডার গ্রাউন্ড শাস্তি সেলে। মুসলেহ উদ্দীনের কক্ষের তালা খুলে চারজনকে তার সামনে দাঁড় করানো হল। এদের দেখেই চোখ বন্ধ করে ফেলল সে।
‘এই তিন জনের মধ্যে হত্যাকারী কে?’ প্রশ্ন করলেন পুলিশ প্রধান।
মুসলাহ উদ্দীন নিরব। আবার প্রশ্ন করলেন। কিন্তু কথা বলল না উপ-রাষ্ট্রপ্রধান। গিয়াস বিলকিস একজন লোককে চোখের ইশারায় ডাকলেন। লোকটি ভেতরে এসে মুসলেহ উদ্দীনের কোমর জড়িয়ে ধরে ঝুলে পড়ল। ছিড়ে যাচ্ছে মুসলেহ উদ্দীনের হাতের কব্জি। চিৎকার দিয়ে বলল, ‘মাঝেরটা।’
তিনজনকে সরিয়ে নেয়া হল। গিয়াস বিলকিস ওদের বললেন, ‘সমস্ত ঘটনা খুলে বল। তা নয়তো এখান থেকে জীবন নিয়ে ফিরে যেতে পারবে না।’
নিজেদের মধ্যে কি কথা হল ওদের। এরপর বলল, ‘আমরা রাজি।’
ওদেরকে আলাদা আলাদা কক্ষে নিয়ে যাওয়া হল। সাবেরাকে নেয়া হল ওপরে।
পূর্বের বলা কথাই আবার বলল সাবেরা। বলল, ‘আমার মা সুদানী, পিতা মিসরী। থাকতাম সুদানে। বছর তিনেক আগে আব্বার সাথে মিসরে এলাম। এক অনুষ্ঠানে মুসলেহ উদ্দীন আমায় দেখলেন। আব্বার কাছে লোক পাঠালেন। আব্বার সাথে তার কত টাকার চুক্তি হয়েছিল জানি না। আমাকে মুসলেহ উদ্দীনের বাড়ী রেখে আব্বা চলে গেলেন। যাওয়ার সময় হাতে ছিল এক থলি আশরাফি।
পরদিন মুসলেহ উদ্দীন একজন আলেম এবং ক’জন লোক ডেকে আমাকে বিয়ে করল। এখন আমি তার স্ত্রী। ও আমায় ভীষণ ভালবাসত। আব্বার স্নেহ আমি পাইনি বলে আমি ছিলাম ভালবাসার কাঙ্গাল। মনে হল বিক্রি করার জন্যই আব্বা আমায় মিসরে নিয়ে এসেছিলেন। মুসলেহ উদ্দীন এতটা নীচ কখনও ভাবিনি। ও কখনও মদ পান করেনি। বাইরে কি করত আমি জানতাম না, জানার চেষ্টাও করিনি।
সালাহউদ্দীন আয়ুবী সুবাক চলে যাবার পর মুসলেহ উদ্দীন কেমন যেন হয়ে গেল। অনেক রাত করে বাসায় ফিরত। আমার আব্বা মদ্যপ ছিলেন। আমি মদের গন্ধের সাথে পরিচিত। দেখতাম মুসলেহ উদ্দীনের মুখ থেকে মদের গন্ধ আসছে। ভালবাসার খাতিরে আমি চোখ বুজে এ সব সহ্য করতাম। তাকে কিছুই বলতাম না।
ক’দিন পর বাসায় অপরিচিত লোকের আনাগোনা শুরু হল। এক রাতে আমাকে দুই থলি আশরাফি এবং দুটি স্বর্ণের টুকরা দেখাল। অন্য এক রাতে মদে মাতাল হয়ে বাড়ী ফিরল। আমার কাছে এসে বলল, ‘তুমি কি মিসরের উত্তরে রোম উপসাগরের এলাকা, নাকি সুদান সীমান্তের এলাকা পছন্দ করবে? তুমি যে এলাকা চাইবে, সেখানকার রাণী হবে তুমি, আমি হব সম্রাট।’
আমি অতশত বুঝি না, চুপ করে রইলাম। ভাবলাম অত্যধিক মদ পান করে আমার স্বামীর মাথা বিগড়ে গেছে।
একরাতে তিনি একজন সুন্দরী ফিরিংগী যুবতীকে বাড়ী নিয়ে এলেন। সাথে আরো অপরিচিত দু’জন লোক ছিল। মেয়েটাকে থাকতে দেয়া হল তার শোবার ঘরে। আনুষ্ঠানিক বিয়ে হয়নি ওদের। মেয়েটা আমার সাথে বন্ধুত্ব করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু ওকে আমি ঘৃণা করতাম। এ মেয়েটা আমার স্বামীকে ছিনিয়ে নিয়ে গেছে আমার কাছ থেকে। এ হল খিজরুল হায়াতের হত্যার আগের ঘটনা। ৪৭/৪৯
@ @ @ @ @
অপহরণকারীরা পুলিশ প্রধানকে প্রথমে ভুল তথ্য দিচ্ছিল, কিন্তু সত্য বলতে ওদের বাধ্য করা হল। ওদের বর্ণনা অনুযায়ী ওরা তিনজনই ঘাতক দলের সদস্য। খ্রিস্টানরা মুসলেহ উদ্দীনের সাথে এদের পরিচয় করে দিয়েছিল। তাদেরকে দিয়েছিল প্রচুর অর্থ এবং সুন্দরী তরুণী। ওরা কথা দিয়েছে, আয়ুবী কে পরাজিত করতে পারলে মিসর সীমান্তে তাকে একটা এলাকার স্বাধীন সম্রাট করে দেয়া হবে।
মুসলেহ উদ্দীন প্রশাসনের উচ্চ পর্যায়ের লোকদের হাত করতে লাগলেন। খিজরুল হায়াত তার ফাঁদে পা দেননি। অর্থ বিভাগ কব্জা করতে হলে হয় তাকে বশ করতে হবে, নয়তো সরিয়ে দিতে হবে, অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মচারীরা ছিল সুলতানের প্রতি অনুগত। তাদের ট্রান্সফার করে নিজের লোক বসাতে হলেও খিজরুল হায়াতকে সরিয়ে দেয়া প্রয়োজন। মুসলেহ উদ্দীন তাকে হত্যার সিদ্ধান্ত নিলেন। দায়িত্ব দিলেন ঘাতক দলের সদস্যদের। খ্রিস্টানদের কাছ থেকে ওরা নিয়মিত বখরা পেত। কাজ শেষ হওয়ার পর দেননি বলে ওরা ক্ষ্যাপে গেল। গোপন তথ্য জানিয়ে দিল তার স্ত্রীকে।
মুসলেহ উদ্দীন এখনও ঝুলে আছে। জবানবন্দী নেয়ার জন্য হাত খুলে দেয়া হল তার। ততোক্ষণে জ্ঞান হারিয়েছে মুসলেহ উদ্দীন। জ্ঞান ফিরল অনেক পরে। কিন্তু প্রমাদ বকতে লাগল। চোখ বড় বড় করে তাকাতে লাগল সবার দিকে। মেয়েটার কক্ষে গিয়ে দেখা গেল মুখ থুবরে পড়ে আছে। ডাক্তার এসে নাড়ী পরীক্ষা করে বললেন, ‘বিষ খেয়ে মারা গেছে, তবে বেশীক্ষণ হয়নি। লাশের পাশে একটা প্যাকেটে বিষের চিহ্ন পাওয়া গেল।
রাতে বিলকিসের কাছে এলেন জয়নুদ্দীন আলী বিন নাজা আল ওয়ারেজ। তিনি মিসরের একজন সম্মানিত ব্যক্তি। ধর্ম, রাজনীতি, অর্থনীতিসহ সর্ব বিষয়ে তার হিল অগাধ পান্ডিত্য। পীর না হলেও প্রশাসনের পদস্ত কর্মকর্তারা তাকে শ্রদ্ধার চোখে দেখতেন। পুলিশ প্রধানকে বললেন, ‘শুনেছি দেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারীদের দু’একজন ধরা পড়েছে। আপনাকে আরও কিছু তথ্য দিতে চাই। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের ক’জন লোক আমায় বলেছে সুলতানের অনুপস্থিতিতে শত্রুরা ফায়দা লুটছে। অত্যন্ত সতর্কতার সাথে কাজ করছে যেন ধরা না পড়ে। গোয়েন্দা উপ-প্রধান হামাসকে কিছু না বলেই আমি গোপনে তথ্য সংগ্রহ শুরু করেছিলাম। আমার জলসায় ফৌজ অফিসার, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এবং প্রশাসনের কর্মকর্তারা ছাড়াও বিভিন্ন পেশার লোকজন এসে থাকেন। আমার নিজস্ব এবং বিশ্বস্ত লোকদেরকেও তথ্য সংগহের কাজে লাগিয়াছি। যদ্দুর বুঝতে পেরেছি, মিসরের বিরুদ্ধে বিরাট এক ষড়যন্ত্র চলছে। আপনি ক’জনকে গ্রেপ্তার করার পর গা ঢাকা দিয়েছে বাকীরা।’
জয়নুদ্দীন পুলিশ প্রধানের কাছে সমস্ত গোপন তথ্য প্রমাণাদি পেশ করলেন। গিয়াস বিলকিস ডেকে পাঠালেন হামাস বিন আবদুল্লাকে। এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকে আলোচনার পর সিদ্ধান্ত হল এখনি সুলতানকে সংবাদ দেয়া উচিৎ। দূত হিসেবে জয়নুদ্দীনকে নির্বাচন করা হল। পরের দিন বারজন রক্ষী সেনা নিয়ে সুবাকের পথ ধরলেন জয়নুদ্দীন।
{ { { { { { { { { { { { { { { { {
তৃতীয় সন্ধ্যায় জয়নুদ্দীন সুবাক পৌঁছেলেন। সুলতান হতবাক হয়ে গেলেন তাঁকে দেখে। খুশীও হলেন। জড়িয়ে ধরলেন পরস্পরকে। জয়নুদ্দীন বললেন, ‘আমি কোন ভাল সংবাদ আনিনি। অর্থ সচিব নিহত। হত্যাকারী ভারপ্রাপ্ত উপ-রাষ্ট্রপ্রধান মুসলেহ উদ্দীন এখন জেলে। মাথা খারাপ হয়ে গেছে তার।’
বিবর্ণ হয়ে গেল সুলতানের চেহারা। জয়নুদ্দীন তাঁকে সব ঘটনা খুলে বললেন। বললেন, ‘মিসরের সেনাবাহিনীতে গুজব ছড়ানো হচ্ছে। বলা হচ্ছে, সুবাকের মুসলিম ফৌজকে স্বর্ণ, রৌপ্য এবং প্রচুর গনিমতের মাল দেয়া হচ্ছে। আপনি খ্রিস্টান ও ইহুদী যুবতীদেরকে ফৌজের মধ্যে ভাগ করে দিয়েছেন। ওদেরকে আতংকিত করার জন্য বলা হচ্ছে, বিশাল এক সুদানী বাহিনী খুব শীঘ্রই মিসর আক্রমণ করবে। মিসরের স্বল্প সংখ্যক সৈন্য ওদের বাধা দিতে পারবে না। নিহত হবে প্রতিটি সৈন্য। সুলতান আয়ুবীও তাই চাইছেন। আরো বলা হয়েছে, সুলতান গুরুতর আহত হয়ে পড়ে আছেন। বাঁচার কোন আশা নেই। সুবাকের সেনা অফিসাররা ইচ্ছে মত উপভোগ করছে। আপনি গুরুতর আহত একথা এখন সবাই বিশ্বাস করছে। এ জন্যই মুসলেহ উদ্দীন দ্বিগুণ উৎসাহ নিয়ে খ্রিস্টানদের সহযোগিতা করে যাচ্ছিল।’
সাথে সাথে নুরুদ্দীন জংগীকে সব জানিয়ে চিঠি লিখলেন সুলতান। তার কাছে সামরিক সাহায্য চাইলেন। লিখলেন, ‘এখানে থাকলে মিসর হাতছাড়া হয়ে যায়। চলে গেলে পরাজয়ে বদলে যায় সুবাকের বিজয়। কোন কিছুর বিনিময়ে এ এলাকা ফিরিয়ে দিতে চাই না। সিদ্ধান্ত নিতে পারছি না এখানে থাকব না মিসর ফিরে যাব।’
একজন দ্রুতগামী ঘোড়সওয়ারকে ডেকে বললেন, ‘রাতদিন ঘোড়া ছুটাবে। থামাবে না কোথাও। ঘোড়া ক্লান্ত হয়ে পড়লে সামনে যাকে পাবে তার অশ্ব বদলে নেবে। দিতে না চাইলে হত্যা করবে। শত্রুর হাতে পড়লে পালানোর চেষ্টা করবে, না পারলে চিঠি মুখে পুরে গিলে ফেলবে। কোন অবস্থাতেই যেন চিঠি দুশমনের হাতে না পারে।’
দূত রওয়ানা হয়ে গেল। দ্বিতীয় চিঠি লিখলেন ভাই তকিউদ্দীনের কাছে। ‘তোমার কাছে যা আছে এবং যে ক’জন যুদ্ধ করতে পারে তাদের নিয়ে চিঠি পাওয়ার সাথে সাথে ঘোড়া ছুটাও। জরুরী প্রয়োজন ছাড়া কোথাও থেমো না। তোমার সাথে কোথায় দেখা হবে অথবা আদৌ দেখা হবে কিনা জানিনা। যদি তোমার আমার সাক্ষাৎ না হয়, যদি আমি মারা যাই তুমি অনতিবিলম্বে মিসরের দায়িত্বভার গ্রহণ করো। মিসর বাগদাদ খেলাফতের অধীন। যাত্রার পূর্বে আব্বাজানকে কদমবুসি করে বলবে, তোমার পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে। এরপর আম্মাজানের কবরে গিয়ে ফাতেহা পড়ো। আল্লাহ্ তোমার সঙ্গী। আমি যেখানে থাকব সেখানে ইসলামের পতাকা নত হতে দেবো না। তুমিও মিসরে ইসলামের পতাকাকে উড্ডীন রেখো।’ আরেক জন দূত ডেকে তাকেও পূর্বের মত নির্দেশ দিলেন। রওয়ানা হয়ে গেল ২য় দূতও।
নুরুদ্দীন জাংগীর পায়ের কাছে গিয়ে আছড়ে পড়ল দূত। তার বা হাত তরবারীর আঘাতে ছিন্নভিন্ন। পিঠে বিঁধে আছে একটা তীর। ‘পথে দুশমনের হাতে পরেছিলাম। কিন্তু চিঠি নিয়ে পালিয়ে আসতে পেরেছি।’ যন্ত্রণাকাতর কণ্ঠে বলল দূত। আরো কিছু বলতে চাচ্ছিল, কিন্তু কিছুই আর বলতে পারল না, তার কন্ঠ স্তব্ধ হয়ে গেল চির দিনের জন্য।
চিঠি তুলে নিলেন জাংগী। চিঠি পড়ে অনতিবিলম্বে সুবাকের কাছে পৌঁছল নুরুদ্দীন জাংগীর বিশাল বাহিনী। সুবাকবাসীরা দেখল এক ধুলিঝড় এগিয়ে আসছে। সকলের মনে শংকিত প্রশ্ন, ‘কারা এরা?’
খ্রিস্টানদের আক্রমণ ভেবে তৈরি হয়ে গেল মুসলিম ফৌজ। হঠাৎ ধূলিঝড়ের আড়াল থেকে উঁকি দিল কালিমা খচিত পতাকা। ভেসে এল সৈনিকদের তাকবীর ধ্বনি। তাই শুনে তাকবীর ধ্বনি দিয়ে তাদেরকে স্বাগত জানাল সুবাকের সৈন্যরা। মুসলিম ফৌজকে অভ্যর্থনা জানাতে দুর্গ থেকে বেরিয়ে এলেন সেনা কর্মকর্তাবৃন্দ।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now