বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
সাইকেলওয়ালা
- মঞ্জুর চৌধুরী
ময়না মিয়া ইঞ্জিনিয়ার খুবই নিষ্ঠুর গলায় বললেন, "আমি বাকিত কাম করিনা।"
আমি অবশ্য এটাই ভয় পাচ্ছিলাম। আজকাল বাকিতে কেউই কাজ করেনা। মানুষকে টাকা দিয়ে বিশ্বাস করবেই বা কেন? কেই বা টাকা নিলে খুশি মনে ফেরত দেয়?
আমি আর আমার বন্ধু সামির কলেজে যাবার উদ্দেশ্যে সাইকেলে চড়ে বেরিয়েছিলাম। আমার নিজের সাইকেল, সামির আমার সাথে 'ডাবলিং' করে। আজকাল কলেজে উঠার পর কেউ সাধারনত সাইকেল চালায় না। রিক্সা অথবা বাসে চড়ে ক্যাম্পাসে যায়। কিছু বড়লোক পোলাপান আছে, যাদের বাবার অনেক টাকা পয়সা। তারা হয় নিজেদের মোটরসাইকেল চালিয়ে আসে, অথবা গাড়িতে। আমরা দুই বন্ধু এবং আরও কিছু ছেলেপিলে যাতায়াত খরচ বাঁচাতেই সাইকেল টানি।
সামির প্যাডেল চাপছিল, আমি ক্যারিয়ারে বসা। টায়ার থেকে ফট ফট জাতীয় আওয়াজ শুনে আমি সাথে সাথে সামিরকে সাইকেল থামাতে বললাম।
নেমে দেখি সর্বনাশ ঘটে গেছে। চাকায় হাওয়া নেই! আজকে কলেজে যেতে এমনিতেই দেরী হয়ে যাচ্ছিল। সকালে বাড়ির জন্য টুকটাক বাজার করে দিতে হয়েছে। সাধারনত মা বাজার করেন। মাঝে মাঝে তাঁর শরীর খারাপ থাকলে আমাকে যেতে হয়। আজকে তাঁর বহু পুরানো মাইগ্রেনের ব্যথাটা সকাল সকালই কাবু করে দিয়েছিল।
এখন নির্ঘাত শ্যামল স্যারের প্রথম ক্লাসটা (পদার্থ বিজ্ঞান) মিস হবে। এই স্যার প্রথমে এসেই চোখ দিয়ে পুরো ক্লাসরুম স্ক্যান করেন। দেড়শজন ছাত্র ছাত্রীর ভিড়েও তিনি অবলীলায় বুঝে ফেলেন কে কে ক্লাস কামাই করেছে। প্রতিটা ক্লাসের জন্যই ব্যপারটা ধ্রুব। একবারও ভুল হয়না। স্যারের এই ক্ষমতা অবশ্যই অলৌকিকতার কাছাকাছি। টেলিভিশনের কোন এক জনপ্রিয় ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানে তাঁর একদিন যাওয়ার যোগ্যতা আছে।
শ্যামল স্যার কলেজের শিক্ষক হলেও তাঁর পড়ানোর ভঙ্গি অনেকটা স্কুলের মাস্টারদের মতন। ইয়া মস্ত বড় একটা বেত নিয়ে তিনি ক্লাসে আসেন। কোন ছাত্র পড়া না পারলে সপাং সপাং করে বেত দিয়ে মারতে বিন্দুমাত্র কার্পন্য বোধ করেননা। কোন মেয়ে পড়া না পারলে অত্যন্ত বিনীত স্বরে বলেন, "মা জননী! আমি মেয়েদের গায়ে আঘাত করা পছন্দ করিনা। আপনি দয়া করে কানে ধরে বেঞ্চের উপরে দাঁড়িয়ে যান।"
ফার্স্ট ইয়ার কলেজের মেয়েদের তখন চোখ ছল ছল করে উঠে। তাঁরা কেবলই ভাবতে শুরু করেছিল যে তাঁরা বড় হয়ে গেছে! তবু স্যারের মন গলে না।
এমন নিষ্ঠুরতার পরেও স্যারের খ্যাতি শহর বিখ্যাত। কথিত আছে, তিনি যদি সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনে দাঁড়ান, কেবল তাঁর ছাত্র ছাত্রীদের ভোটেই তিনি মেয়র নির্বাচিত হয়ে যাবেন। যেহেতু রাজনীতির ব্যপারে তাঁর কোন আগ্রহ নেই, তাই তত্বটি পরীক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না।
তাঁর এই বিপুল জনপ্রিয়তার কারন একটাই, স্যারের মধ্যে সবাই নিজের বাবার ছায়া দেখতে পায়। পরীক্ষা শেষে যদি দুই একজন পদার্থ বিজ্ঞানে ফেল করে, প্রতিটা ছাত্রছাত্রী তখন অবাক হয়ে দেখে স্যার শিশুদের মতন ছোখের পানি ফেলেন। ফেল করা ছাত্রের কাছে কাতর কন্ঠে জানতে চান, "আমার মাঝে কী কোন ত্রুটি ছিল যে আমি তোকে ঠিক মত পড়াতে পারি নাই? নাহলে তুই ফেল করবি কেন?"
স্যারকে না কাঁদাতেই প্রত্যেকে প্রাণ উজার করে পদার্থ বিজ্ঞান পড়ে। এই কলেজের একদম গরু গাধা ছাত্র, যে হয়তো বাদশা আকবর এবং বাবুরের সম্পর্ক নিয়েও গোল বাঁধিয়ে ফেলে, সেও চোখ বন্ধ করে গরগর করে হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তা সূত্র আউড়ে যেতে পারে।
এই শ্যামল স্যারের ক্লাসে কেউ না এলে তিনি পরের দিন দীর্ঘক্ষণ জেরা করেন।
"কেন এলি না?" "ক্লাসে না আসার কী কারন থাকতে পারে?" "ক্লাস ভাল লাগলে আসবি না কেন?" "আমি কী ঠিক মতন পড়াতে পারিনা?"
স্যারকে নিয়ে এটাই সবচেয়ে বড় যন্ত্রণা। যেকোন ইস্যুতে তিনি নিজের দিকে টেনে নিয়ে বলেন, "আমি কী ঠিক মত পড়াতে পারিনা?"
আজকে যদি ক্লাস মিস করি, তাহলে আগামীকালকে স্যার সবার সামনে আমাদের ডেকে নিয়ে করুন কন্ঠে একই প্রশ্ন করবেন।
আমি হতাশ স্বরে বললাম, "গেল আজকে শ্যামল স্যারের ক্লাস!"
সামির বলল, "কোন চিন্তা নাই। পাশেই ময়না ইঞ্জিনিয়ারের গ্যারাজ। ওখানে গিয়েই হাওয়া ভরে নেয়া যাবে।"
"ময়না ইঞ্জিনিয়ার?"
আমার প্রশ্নে সামির যা জানালো তা হচ্ছে ময়না ইঞ্জিনিয়ার কোন বুয়েট, রুয়েট বা চুয়েট পাশ ইঞ্জিনিয়ার নন। তিনি সাইকেল, রিক্সা ও ছোটখাট ‘ইঞ্জিন’ মেরামত করেন বলে লোকে তাকে 'ইঞ্জিনিয়ার' ডাকে। সাইকেল রিক্সা মেরামতির কাজে তিনি নাকি লিভিং লেজেন্ড। রিক্সাওয়ালাদের ভূবনে তিনি বিরাট সেলিব্রেটি।
আমি কখনই ময়না ইঞ্জিনিয়ারের গ্যারাজে সাইকেল মেরামত করাতে আসিনি। কাজেই আমি জানিনা তিনি কেমন লেজেন্ড। তবে সামিরের বাড়িয়ে কথা বলা স্বভাবের সাথে পরিচিত থাকায়, খুব একটা ভরসা পেলাম না।
সাইকেল টেনেই দুই বন্ধু হাঁটতে লাগলাম। সকালে সাইকেলের তালার চাবি পড়ার টেবিলে ফেলে যাওয়ায় বেরিয়ে গিয়েও আবার ফেরত আসায় মা বলেছিলেন, "একটু বসে যা।"
মা একটু কুসংস্কারী। তাছাড়া আমদের পরিবারে এর আগেও একটি দুর্ঘটনা ঘটায় মায়ের কুসংস্কার মনের মধ্যে একদম থাবা গেড়ে বসে গেছে।
আমি তাঁর কথাকে পাত্তা না দিতে বললাম, "আহ! এমনিতেই দেরী হয়ে গেছে, এখন বসা বসি করতে গেলে আরও দেরী হবে।"
"একটু বসে গেলে কী এমন ট্রেন ছুটে যাবে?"
"কোন ট্রেন না ছুটলেও বসবো না। বসলে তোমার কুসংস্কারকে পাত্তা দেয়া হবে।"
"হু! দুই চার লাইন পড়াশোনা করে এখন মুরুব্বিদের জ্ঞানকে কুসংস্কার মনে হয়!"
হেসে বললাম, "উহু, শুধু কুসংস্কারকেই কুসংস্কার মনে হয়। এখন সরোতো, আমার ক্লাসের দেরী হয়ে যাচ্ছে।"
মা আদেশ দিলেন, "না। একটু বসে তারপর যা।"
আমি যাত্রার ঢংয়ে বললাম, "তুমি আমার মা, আমার জননী, গর্ভধারিনী! তুমি যদি হুকুম করতে নিজের প্রেমিকাকে ছেড়ে দিতে, তবে কসম করে বলছি, আমি হাসিমুখে রাজি হয়ে যেতাম। কিন্তু আজকে তোমার দাবি মেনে নিলে এই কুসংস্কার তোমার মনে শেকড় গেড়ে বসবে। তোমার পুত্র হয়ে আমি তা হতে দিতে পারিনা মাআআ! আমাকে তোমার অবাধ্য হতে বাধ্য করো নাআআ!"
আমার ফাজলামিকে উড়িয়ে দিয়ে মা ভুরু কুঁচকে জানতে চাইলেন, "হঠাৎ প্রেমিকার কথা তুললি যে? তোর কী কোন প্রেমিকা আছে নাকি? খবরদার বলে দিচ্ছি, তোকে কলেজে পাঠিয়েছি লেখাপড়া শেষ করে মানুষ হবার জন্যে। প্রেম করার জন্যে না।"
আমি মায়ের কথায় হেসে বললাম, "যে কলেজে ভর্তি করেছো, হোমওয়ার্ক আর অ্যাসাইনমেন্ট করতে করতেই জীবন তামা তামা...প্রেম করবো কখন? আর তাছাড়া তোমার এই সাইকেলওয়ালা ছেলেকে কোন মেয়ে বয়ফ্রেন্ড হিসেবে নিবে না মা। এখন 'ধুম মাচালে' যুগ! দামী গাড়ি বা মোটর বাইক না হলে কোন মেয়ে পটে না।"
সত্য বচন!
আমি বুঝতে পারি কলেজে ছেলে মেয়েরা আড়ালে আমাদের নিয়ে তাচ্ছিল্যের হাসি হাসে। সাইকেল চালিয়ে আজকাল কেউ কলেজে যায় নাকি? তাও আবার ফিনিক্স (চায়না মেড, অরিজিনাল) সাইকেল! যার হ্যান্ডেলের সাথে রিক্সার হ্যান্ডেলের হুবহু মিল। এই সাইকেল আরোহীকে দেখে জন আব্রাহাম বা আমির খানের কথা মনে হবার প্রশ্নই উঠেনা। তবে হ্যা, মাঝে মাঝে রিক্সাওয়ালা নিশ্চই মনে হতে পারে।
কিছুদিন আগে দেশে বাইসাইকেল হুজুগ উঠেছিল। চ্যাংরা চ্যাংরা পোলাপান (মেয়েরাও) দামী সাইকেলে, শরীরে প্যাড গ্লাভস লাগিয়ে, মাথায় হেলমেট পড়ে শহরময় ভাব দেখিয়ে বেড়াতো। 'মাইরের চেয়ে অ্যাকশন বেশি অবস্থা’ আর কী! সেইরকম লেটেস্ট মডেলের গিয়ারওয়ালা 'ফ্যান্সি বাইক' হলেও দুই এক জন প্রেমিকা পটলেও পটতে পারতো। আমার সাইকেলের যে মডেল, এই একই মডেলের সাইকেল চড়ে আমার দাদাজান দপ্তরে যেতেন। আমার বাবাও একই মডেলের সাইকেল চালিয়ে রিক্সা ভাড়া বাঁচিয়েছেন। বংশধারার তিন পুরুষের বদল ঘটেছে, ভাগ্যের মতই এই পরিবারের সাইকেলের মডেলও বদল হয়নি।
চাকা পাংচার হওয়া সাইকেল টেনে হাঁটতে হাঁটতে মায়ের কুসংস্কারের কথা মনে পড়ে গেল। দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাবলাম, এইভাবে কাকতালিয় ঘটনা ঘটতে থাকলে সমাজ কুসংস্কারমুক্ত হবে কী করে?
সামির বলল, "তৌফিক স্যারের অ্যাসাইনমেন্ট করেছিস?"
তৌফিক স্যার আমাদের কেমেস্ট্রির প্রফেসর। দৈহিক আকৃতির ঘাটতি যিনি রাগ দিয়ে পুষিয়ে দেন। ছোট মরিচের ঝাল বেশি হয় - এটিই নিপাতনে সিদ্ধ।
আমি বললাম, "স্যারের অ্যাসাইনমেন্ট করবে না, এমন সাহস কার বুকে আছে?"
সামির কিছু বলছে না দেখে বুঝে গেলাম।
"তুই করিসনি?"
"নাহ। ভেবে রেখেছি তোর থেকে একটু এডিট করে মেরে দিব।"
"করিসনি কেন?"
এইবার সামির বিরক্ত স্বরে বলে, "আর বলিস না, টিউশ্যনির ছাত্রটার আজকে ছিল পরীক্ষা! আর সে এমনই গাধা যে আমি যতই পড়াই ততই ভুলে। আর এইদিকে তার মা এসে অনুরোধ করেন যত রাতই হোক, পড়া শেষ না করিয়ে যেন আমি না উঠি। মাঝে মাঝে ইচ্ছা করছিল গাধার গালে ঠাস করে দুয়েকটা চড় বসিয়ে দেই। চাকরি হারাবার ভয়েই কিছু করি নাই।"
আমি হেসে বললাম, "আমার মাঝে মাঝে মনে হয়, আমাদের নিয়ে আমাদের স্যারদেরও হয়তো এমন ফিলিংস হয়।"
সামির বলল, "না, হয়না। এমন ফিলিংস হবার আগেই স্যাররা আমাদের চড় থাপ্পড় বসিয়ে দেন। তোর কী মাঝে মাঝে এমন হয়না যে, দাওয়াতে গিয়ে তোর পেট খারাপ করেছে, অথচ ভদ্রতার খাতিরে পাদ দিতে পারছিস না? এইটা সেইরকম সিচ্যুয়েশন।"
সামিরের বলার ভঙ্গিতে হাসতে হাসতে বললাম, “'পেটে ক্ষিধা নিয়ে প্লেট ভর্তি খাবারের সামনে দাঁড়িয়ে থাকার' সাথেও তুই তুলনা করতে পারতি। পেশাব পায়খানা ছাড়া তোর মুখে দেখি কিছুই আসেনা।"
সামির চোখ টিপে বলল, "আরও খারাপ উদাহরণ মনে এসেছিল। অশ্লীল হয়ে যাবে বলেই বলি নাই। হাহাহা।"
তখনই আমাদের পাশে দিয়ে প্রচুর ধুলাবালি উড়িয়ে একটি লেক্সাস হ্যারিয়ার গাড়ি চলে গেল।
সামির চোখমুখ উজ্জ্বল করে বলল, "বুঝেছিস কে গেল?"
"না, কে?"
"ইয়ানা, আমাদের ক্লাসের রাজকুমারী! ওর গাড়ির নম্বর প্লেট আমার মুখস্ত।"
"ও আচ্ছা।"
সামির খুবই বিরক্ত হয়ে বলল, "এমনভাবে ও আচ্ছা বললি, যেন কোন মর্জিনা ফর্জিনাকে নিয়ে কথা হচ্ছে! ইয়ানার মতন সুন্দরী মেয়ে তুই জীবনেও দেখেছিস?"
আমাকে ভাবনার বিন্দুমাত্র সময় না দিয়ে সে পরের কথায় চলে গেল।
"একদিন ইন শা আল্লাহ, এই মেয়ের সাথে আমার বিয়ে হবে!"
আমি বিষ্ফোরিত কন্ঠে বললাম, "বলিস কী! প্রপোজ ট্রপোজ করে ফেলেছিস নাকি? জানালিওতো না!"
সামির বিজ্ঞের হাসি হেসে বলল, "এই মেয়ে প্রপোজালে পটার মেয়ে না। এই মেয়ে প্রতিদিন কমসে কম হাজার খানেক প্রপোজাল পায়। এর জন্য ভিন্ন পথ অবলম্বন করতে হবে।"
"তাই নাকি? কোন পথ?"
সামির ক্লাসে লেকচারের ভঙ্গিতে বলতে শুরু করলো, “Opposites attract - কথাটা শুনিস নাই? এই মেয়ে সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্মেছে। লেক্সাস গাড়িতে চড়ে বেড়ায়। এর আশেপাশের পোলাপানও সব গাড়িওয়ালা পাবলিক। ওর জন্য opposite কী হবে?”
তারপর সাইকেলের সিটে চাপড় দিয়ে নিজেই জবাব দেয়, "ফিনিক্স সাইকেল চড়া ছেলে! তাও আবার বন্ধুর সাইকেল! আরে, বড়লোকের মেয়ে পটাতে গরিব দুঃখী বেকার ছেলের বিকল্প নাই।"
আমি হেসে বললাম, "তুই সিনেমা দেখা আর গল্পের বই পড়া একটু কমা। তোর মাথা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।"
সে মুখ বাঁকিয়ে বলল, "যেদিন তোকে আমার বাড়িতে তোর ইয়ানা ভাবির হাতে চা খাওয়াব, সেদিন আজকের কথা মনে রাখিস!"
এবং কথা শেষ হতে না হতেই আমরা সাইকেল রিক্সা মেরামত ভুবনের জীবন্ত কিংবদন্তি ময়না মিয়া ইঞ্জিনিয়ারের গ্যারাজে পৌছালাম।
এবং প্রথম দর্শনেই তার ভাবেসাবে বুঝতে পারলাম সে জানে যে রিক্সাওয়ালা জগতে সে একজন সুপারস্টার। একারনেই গাল ভর্তি কাঁচা পাকা দাড়ির অধিকারী মধ্যবয়সী মেকানিক আমাদের দুইজনকে একদমই পাত্তা দিল না।
সামির তেলতেলে হাসি হেসে বলল, "ইঞ্জিনিয়ার সাহেব, পাম্পারটা কই?"
ইঞ্জিনিয়ার সাহেব খালি গায়ে ঠোঁটে সিগারেট (বিড়ি না কিন্তু, আসল ফিল্টার্ড সিগারেট, সেলিব্রেটি বলে কথা!) ঝুলিয়ে হাতে রেঞ্জ নিয়ে নিবিষ্ট মনে একটি রিক্সার প্যাডেলে কাজ করছেন। চোখের ইশারায় তিনি দোকান ঘরের একটি কোণ দেখিয়ে দিলেন। আমি গিয়ে পাম্পার নিয়ে আসলাম।
সাইকেল পাম্প করানোর নিয়ম হচ্ছে যদি মেকানিক পাম্প করে, তাহলে চার টাকা। আর নিজে পাম্প দিলে দুই টাকা। আমরা নিজেরাই পাম্প দেই। দুই টাকা বাঁচে। দুই টাকা কিন্তু অনেক টাকা। বাসে করে এই টাকায় অনেক দূর যাওয়া যায়।
আমি পাম্পার চাপতে চাপতে বললাম, "তৌফিক স্যারের হোমওয়ার্ক মারার সময়ে একটু সাবধান থাকিস। স্যার যদি বুঝতে পারেন তুই নকল করেছিস, তাহলে উনি আমাদের দুইজনকেই ধুয়ে ফেলবেন।"
সামির বলল, "ওটা নিয়ে একটুও চিন্তা করতে হবেনা। ইচ্ছা করেই বোকার মতন কিছু ভুল করবো। স্যার বুঝতেই পারবেন না নকল করেছি। নকল করলে কেউ এমন ভুল করেনা।"
"তোর বুদ্ধি আছে।"
সামির হেসে বলল, "আমার সম্পদ বলতে ঐ একটাই আছে, বুদ্ধি!"
আমরা নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবার। সামিরদের অবস্থা আমাদের চেয়েও খারাপ। আমারতো তাও একটা সাইকেল আছে, সামিরদের সেটাও নেই। মুখে না বললেও বুঝতে কোনই সমস্যা হয় না যে তাদের প্রতিটা দিন অত্যন্ত কষ্টে চলে। তার বাবা কিছুদিন পরপর চাকরি হারিয়ে দীর্ঘদিনের জন্য বেকার হয়ে পড়েন। তার মা একজন সাধারন গৃহিনী, যিনি ঘরের কাজ ছাড়া আর কিছুই পারেন না। মাঝে মাঝে এর ওর জামা সেলাই করে কিছু আয় করেন শুনেছি। কিন্তু কখনও সামিরকে জিজ্ঞেস করিনি বলে নিশ্চিত বলতে পারছিনা। ওর একদম ছোট বোন, যে আবার সামিরের দুই বছরের বড়, ক্লাস নাইনে পড়া অবস্থায় স্কুলের এক আধবুড়ো শিক্ষকের সাথে পালিয়ে গিয়েছিল। ছোট বোনের এই কীর্তির জন্য বড় তিনটি বোনেরও বিয়ে হচ্ছে না। অবশ্য এই কীর্তি না করলেও বিয়ে হবার সম্ভাবনা যে থাকতো তা হলফ করে বলা যায়না। বাংলাদেশে এখনও যে মেয়েদের সবচেয়ে বড় যোগ্যতা গায়ের রং! সামিরের বাবা মাই তার বোনেদের “ফর্সা” বলতে পারবেন না।
বেচারা কলেজে পড়ার প্রচন্ড চাপেও দুইটা টিউশ্যনি করে ছয় সদস্যের সংসারের খরচ তুলতে সাহায্য করে। ইংলিশ মিডিয়ামের ছাত্র পড়ায় বলেই বেতনটা একটু বেশি পায়। কিন্তু সেটাও সংসার খরচের তুলনায় অতি সামান্য। হাতে গোনা কয়েকটা জামা পড়ে বছরের পর বছর পার করে দেয়। এই যে এখন যে শার্টটা পড়ে আছে, সেটা সে ক্লাস এইটের রোজার ঈদে কিনেছিল। একটু ঢিলেঢালা ছিল সে সময়। সে বরাবরই এক দুই সাইজ বড় জামা কিনতো যাতে শরীর বাড়লেই ফেলে দিতে না হয়। এখন এই শার্ট গায়ের সাথে টাইট হয়ে জড়িয়ে থাকে, সে ‘ফ্যাশন’ বলে চালিয়ে দেয়। গত কয়েক বছরে আমি তাকে কোন নতুন জামা পড়তে দেখিনি। সব বছর খানেক পুরনো। অথচ ফুটপাথ থেকে একটা গেঞ্জি কিনতে কত টাকাই বা লাগে?
সে ক্ষোভের সঙ্গে বলল, "সিনেমায় দেখায় কলেজে উঠলে ছেলেমেয়েরা ঝোপে ঝাড়ে গান গেয়ে বেড়ায়। পত্রিকায় খবর আসে আন্দোলন ফান্দোলন করে ক্লাস বর্জন করে। আমাদেরই শালার পোড়া কপাল! স্কুলের বাচ্চাদের মতন হোমওয়ার্ক নিয়ে টেনশন করতে হয়! একটা দুইটা প্রেম করতে পারলাম না, তাহলে কলেজে উঠার ফায়দা কী?"
একটু খোঁচা দিয়ে বললাম, "তোর না ইয়ানার সাথে বিয়ে হবার কথা? তাহলে অধৈর্য্য হচ্ছিস কেন?"
সে কথার জবাব না দিয়ে বলল, "ইশ! মনে হয় বড় সর্বনাশ হয়েছে। চাকা একটুও পাম্প হচ্ছে না।"
আমার বুক কেঁপে উঠলো। টিউব লিক করে নাই তো? তাহলে সারাতে যে অনেক টাকা বেরিয়ে যাবে!
আমি চাকা টিপে টুপে বুঝলাম আসলেই টিউব লিক করেছে।
সামির করুন স্বরে ময়না মিয়াকে বলল, "ইঞ্জিনিয়ার সাহেব! একটু দেখে দিবেন লিক হয়েছে কিনা?"
ইঞ্জিনিয়ার সাহেব আমাদের দিকে তাকালেন। খুব ভাবের সাথেই সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়লেন। তারপর জলদগম্ভীর স্বরে বললেন, "আমি এখন ব্যস্ত আছি। রাইখা যান, পরে দেখতাছি।"
সামির বলল, "আমাদের কলেজে যাবার জন্য দেরী হয়ে যাচ্ছে।"
ইঞ্জিনিয়ার সাহেব খুবই উচ্চমার্গের ফিলোসফারের মতন বললেন, "দুনিয়াতে এমন কোন প্রাণী নাই, যার কোন তাড়া নাই। একটা সামান্য পিপড়ারেও দৌড়ের উপরে থাকতে হয়। রাইখা যান, দুইঘন্টা ঘুইরা আসেন, সাইকেল রেডি পাইবেন।"
আমি বললাম, "লিক সারাতে কত টাকা নিবেন?"
এই প্রথম তিনি আমাদের দিকে ফিরে তাকালেন। তারপর থেমে থেমে বললেন, "আমি মাইনষের কাছ থিকা বিশ ট্যাকা নেই। আপনেরা ছাত্র মানুষ, পনের ট্যাকা দিলেই চলবো।"
আমার বুক হুহু করে উঠলো। পনের টাকা! এইজন্য ব্র্যান্ডের বস্তু আমার পছন্দ না। আমাদের পাড়ার আনোয়ার মিস্ত্রী সেই অনাদিকাল থেকেই টায়ারের লিক সারাতে দশ টাকা নেয়। কিন্তু কথায় আছে না "সস্তায় পস্তায়?" আনোয়ার মিস্ত্রির সারানো লিক কিছুদিন পরপর খুলে যায়।
আমি বললাম, "ভাই, একটা অনুরোধ, টাকাটা যদি আমরা পরে দেই, তাহলে চলবে? ধরেন এক মাস পরে? আমরা টাকা মেরে দিব না। শুধু একটু দেরি হবে।"
এবং তখনই ময়না মিয়া ইঞ্জিনিয়ার খুবই নিষ্ঠুর গলায় বললেন, "আমি বাকিত কাম করিনা।"
সামির বলল, "ভয় নাই ইঞ্জিনিয়ার সাহেব, আমরা টাকা মেরে দিব না। শুধু বিপদে পড়েছি বলেই এই মুহূর্তে দিতে পারবো না।"
ময়না মিয়া আবারও ফিলোসফারের মতন বললেন, "পৃথিবীর সব প্রাণীই বিপদে আছে। কেউই বিপদমুক্ত নাই। আপনেরা এখন যাইতে পারেন, আমার অন্যান্য কামও আছে।"
সামির বিরবির করে গালি দিল, "শুয়োরের বাচ্চা! ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ভাব লও! ইঞ্জিনিয়ারগিরি একদিন তোর পিছে দিয়া না ঢুকায়া দিলে আমি আমার বাপের পোলা না!"
ময়না মিয়া কিছু শুনেছে কিনা জানিনা, তবে সে বেশ উদাস স্বরেই বলল, "গাইলান কী যাই করেন, আমি বাকিত কাম করিনা।"
আমি সামিরকে টেনে নিয়ে বের হয়ে আসলাম।
পনের টাকা খরচের সামর্থ্য আমার আছে। আমি নিজেও একটা টিউশ্যনি করি। মাস শেষে দুই হাজার টাকা পকেটে আসে। আমার অবস্থা সামিরের মতন না। আমাকে একা কাঁধে সংসার টানতে হয়না। তবু এইভাবে টিপে টিপে টাকা খরচ করার ভিন্ন একটা কারন আছে। এই মাসের বাইশ তারিখ আমার বাবার জন্মদিন। আমি বাবাকে একটি উপহার দিতে চাই। বাবার উপহারের জন্যই আমি টাকা জমাচ্ছি।
আমার বাবার নাম জুনায়েদ রশিদ। পেশায় ছিলেন একটি বেসরকারী স্কুলের শিক্ষক।
শিক্ষকতা অবশ্যই একটি মহৎ পেশা, বিশেষ করে স্কুলের শিক্ষকতা। কিন্তু আমার বাবা দেশের আর বেশিরভাগ স্কুল শিক্ষকের মতই এই চাকরি করেছেন অন্য কোন ভাল বেতনের চাকরি জুটাতে পারেননি বলেই।
শিক্ষকতায় বাবার কোন প্যাশন ছিল না। তিনি ভালবাসতেন কবিতা লিখতে। দেশের আরও হাজারো কবির সাথে তাঁর পার্থক্য হচ্ছে বাজারে তাঁর বেশ কয়েকটি কাব্যগ্রন্থ আছে। কবি সমাজে তিনি মোটামুটি সুপরিচিত হলেও দেশের সাধারণ মানুষ কবিতা ও কবিদের কদর করে না বলে প্রায় কেউই তাঁকে চেনেনা।
বাবা একদিন স্কুল ছুটির পর বাড়িতে ফেরার সময়ে চলন্ত বাস থেকে নামতে গিয়ে রাস্তায় পড়ে যান, এবং তারপর থেকে আর কখনই উঠে দাঁড়াতে পারেননি। ট্রাজেডি হচ্ছে, সেদিনই তিনি বাড়ি থেকে বেরুবার সময়ে দরজার চৌকাঠে বাঁধা পেয়েছিলেন। মায়ের শতেক অনুরোধ উপেক্ষা করে একটু না বসেই তিনি বেরিয়ে যান। মায়ের মনে এইসব কুসংস্কার এমনি এমনি স্থায়ী হয়নি।
আমি বাবাকে এই বছরের জন্মদিনে একটি হুইল চেয়ার উপহার দিতে চাই।
তিন বছর ধরে তিনি বিছানায় শুয়ে আছেন। গত রোজার ঈদের সকালে নামাজ শেষে তাঁকে সালাম করতে গেলে তিনি আমাকে কাছে ডেকে ফিসফিস করে বলেছিলেন, "আমার খাবারে কেউ বিশ মিশায়ে দিতে পারেনা? এইভাবে ফার্নিচার হয়ে বেঁচে থাকতে একদমই ইচ্ছা করেনা।"
বাবার জন্য বিছানায় পরে থাকার চেয়ে বড় শাস্তি বুঝিবা আর কিছুই হতে পারে না। যখন তিনি সুস্থ্য ছিলেন, তাঁকে বাসায় ধরে রাখা যেত না। রাস্তায় রাস্তায় হেঁটে বেড়াতেন। ছোটবেলায় তাঁর বৈকালিক ভ্রমনের সঙ্গী হতাম আমি।
একবার হাডুডু খেলতে গিয়ে পা ভেঙ্গে যাওয়ায় আমি দীর্ঘদিন বিছানায় শুয়ে ছিলাম। সুস্থ্য হবার পরেও ভয়ে বাইরে খেলতে যেতাম না। বাবা আমাকে এক বিকেলে বলেছিলেন, "চল আজকে পার্কে গিয়ে রেস করি। দেখি তুই আমাকে হারাতে পারিস কিনা! আমার বয়স বেড়ে গেলেও এখনও তোর বয়সী ছেলেদের হারানো আমার কাছে ওয়ান টু!"
আমি ঠিক করে রেখেছি, বাবার জন্মদিনের উপহার যখন তাঁকে দিব, তখন বলবো, “চল বাইরে গিয়ে রেস করি। দেখি তুমি আমাকে হারাতে পার কিনা।”
আহ! বাবা যে কতদিন পর বাইরে বেরুতে পারবেন! তিন বছর যে অনেক সময়!
তিনবছর আগে যেখানে মুস্তাফিজের দোকান ছিল, সেটাকে মাড়িয়ে এখন ‘সানাউল্লাহ টাওয়ার’ দাঁড়িয়ে আছে। সামনে যে ছোট মাঠটা ছিল, যেখানে শীতের রাতে ছেলেরা চুরি করা ইলেক্ট্রিকের আলোয় ব্যাডমিন্টন খেলতো, সেখানে কয়েকটা দোকান বানিয়ে 'নিউ মদিনা মার্কেট' নামের সাইনবোর্ড টানিয়ে দেয়া হয়েছে। বাবা কী এসব দেখে অবাক হবেন না? তিনি টেরই পাননি তাঁর আশেপাশের পৃথিবী কতখানি বদলে গেছে। তাঁর কেমন অনুভূতি হবে?
হুইল চেয়ার কিনতে এখনও আমি দুইশ টাকা পিছিয়ে আছি। এখন পনের টাকা বেরিয়ে গেলে আরও পিছিয়ে যাব। খরচ করবো, দুই হাত খুলেই আমি খরচ করবো। তবে আগে বাবার জন্য হুইল চেয়ারটা কিনে নেই।
সামির বলল, "এইবার কী করবি?"
আমি বললাম, "কোন এক মসজিদের ভিতর তালা লাগিয়ে ক্লাসে চলে যাব। ফেরার সময়ে টেনে টেনে বাসা পর্যন্ত যাওয়া যাবে।"
সামির কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, "আমার পরের মাসের টিউশ্যনির বেতন পেলে আমি তোর টায়ার ঠিক করিয়ে দেব। খবরদার না করতে পারবি না। যদি করিস, তাহলে থাপ্পর খাবি হারামজাদা!"
সামিরের কথা শুনে আমি হেসে দিলাম। তাঁর প্রস্তাবে রাজি হতেই হলো।
এবং ঠিক তখনই পেছন থেকে একটা বিরক্তি ঝরা কন্ঠ শুনতে পেলাম।
"এই যে....ও ছোট ভাই! ঐ সাইকেলওয়ালা ছোট ভাই!"
আমরা পেছনে তাকিয়ে দেখি ময়না মিয়া ইঞ্জিনিয়ার আমাদের হাত উঁচিয়ে ডাকছেন।
সামির বলল, "কুত্তাটা আবার কী চায়?"
আমরা তার কাছে এগিয়ে যেতেই সে বলল, "দেহি, চাক্কাডি দেহি।"
সামির গলা নরম করে বলল, "আমাদের কাছে কিন্তু পয়সা নাই।"
ইঞ্জিনিয়ার সাহেব আমাদের দিকে না তাকিয়েই বললেন, "পয়সা অন্যদিন দিলেও চলবো। আগে ঠিক কইরা দেই। হাইটা ইস্কুলে গেলে মন দিয়া কিলাস করবেন কেমনে?"
এবং তখনই, জানিনা কেন, সাইকেল রিক্সা মেরামতি শিল্পের জীবন্ত কিংবদন্তি, রিক্সাওয়ালাদের কাছে সেলিব্রেটি মেকানিক, চরম ভাব নেয়া অতি বিরক্তিকর ময়না মিয়া ইঞ্জিনিয়ারকে আমার জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে হলো। বুঝলাম মানুষ এমনি এমনি সুপারস্টার হয়না।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now