বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

রুমি—০২

"রোম্যান্টিক" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রিয়েন সরকার (০ পয়েন্ট)

X *** সরু রাস্তাটা এক ছুটে পেড়িয়ে বাড়িটির পেছনে দেয়ালের কাছে এসে থামে রুমি। ভাঙ্গা দেয়াল টপকে টিনের চালায় বেশ সতর্কতার সাথে উঠে পড়ে ধ্রুত। নিঃশব্দে লতাপাতা মাড়িয়ে কিছুটা এগিয়ে ঘাপটি মেরে বসে থাকল কিছুক্ষণ। এরপর উঠোনের শূন্য এবং ঝুলন্ত তারের দিকে তাকিয়ে হতাশ হল। গতকাল এসেছিল এখানে। ওই তারে বেশ কিছু কাপড় ঝুলছিল। লুঙ্গি, বাচ্চাদের গেঞ্জি সহ একটি হলুদ রঙের শাড়িও ছিল। কিন্তু উঠোনের এক পাশে একটি বাচ্চা ছেলে মার্বেল খেলছিল বিধায় সুযোগটি কাজে লাগাতে পারেনি। আর আজ পুরো উঠোন ফাঁকা, সাথে কাপড় শুকাবার তারও। রুমি সেদিন মন খারাপ করে ফিরে গেলেও, এরপরের দিন আবার ফিরে এল অবশ্য। সন্ধ্যা তখনও নামেনি। বিকেলের মৃদু রোদে, আজ একটি নীল রঙা শাড়ি জ্বলজ্বল করছে। রুমির দুচোখে আনন্দ ঝিলিক দিয়ে উঠল। এইতো মোক্ষম সময়। আশেপাশে কেউ নেই। চালা বেয়ে নিঃশব্দে উঠোনের এক ধারে নামে সে। সতর্ক দৃষ্টিতে সব কিছু পর্যবেক্ষণ করে আগে, এরপর পা টিপে টিপে এগোয় শাড়ি বরাবর। ৩ ভাজে অদ্ভুত ভাবে শাড়িটা ঝুলিয়ে দেয়া হয়েছে। তারাহুরা করতে গিয়ে পেঁচ লাগিয়ে ফেলে রুমি। ছাড়াতে যেয়েও পারছে না! দরদর করে ঘাম হচ্ছে। বুকের ভেতর দপদপ শব্দ শুনে নিজেই অবাক হয়ে যাচ্ছে। চামরা ফুঁরে কলজেটা বেরিয়ে যাবে নাকি?! রুমি লক্ষ্য করল, দু-হাত তিরতির করে কাঁপছে। তবুও সাহস সঞ্চয় করে দ্রুত শাড়ি ছাড়াতে চেষ্টা করে। একসময় শাড়িটি তার ছাড়িয়ে ওর হাতে চলে আসতেই ঝড়ের গতিতে দৌড় দিতে গিয়ে ভূত দেখার মতন চমকে দাঁড়িয়ে পড়ে। ওর ঠিক সামনেই, গতকালের বাচ্চা ছেলেটি বড়বড় চোখ করে তাকিয়ে আছে। এরপর গলা ফাটিয়ে ‘আম্মা......!’ বলে ভীষণ এক হাঁক ছাড়তেই একজন মহিলা বাইরে বেড়িয়ে আসে। সবকিছু এত তাড়াতাড়ি ঘটে গেল যে, রুমি কি করবে ভেবে পেল না। একবার মনে হল, এক ছুটে গেইট ডিঙ্গিয়ে পালায়। এরপর মনে হল, পেছনের দেয়াল টপকালেই ভাল হয়। এতসব ভাবতে ভাবতেই সময় চলে গেল। ততক্ষণে তাকে ঘিরে সেই মহিলা এবং বাচ্চা ছেলেটি। পাংশু মুখে মাটি বরাবর তাকিয়ে রইল রুমি। জীবনের প্রথম চুরিতেই ধরা! পারুল কৌতূহলী চোখে সামনে দাড়িয়ে থাকা ছেলেটিকে দেখছে। টিংটিঙে শরীর। পেটের উপর দুপাশের হাড় স্পষ্ট ভেসে উঠেছে। গুনতে চাইলে গোনা যাবে। পরনের ছিঁড়েফাটা লুঙ্গি অদ্ভুত কায়দায় ছোট প্যান্ট এর মতন করে পরেছে। শ্যাম বর্ণের মুখশ্রী। চোয়াল ভেঙ্গে এসেছে অবশ্য, তবুও ডাগর ডাগর দুটো চোখের জৌতি মায়াময় করে রেখেছে মুখখানা। কোঁকড়ানো, ঝাঁকড়া চুল। অনেক দিন কাঁচির ছোঁয়া লাগেনি তাতে। পারুল দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ছেলেটি তার শাড়ি চুরি করতে এসেছে, এটা জানার পরও কেন যেন মায়া হচ্ছে ওর প্রতি। “এই, তোর নাম কী’রে?” মৃদু কণ্ঠে জানতে চায় পারুল। “রুমি।” প্রায় ফিসফিস করে বলেই আবার মাটি বরাবর তাকায় রুমি। “চুরি করতে এসেছিস! চুরি করা পাপ, জানিস না?” “জানি।” “তাহলে?!” “সাত দিন ধইরা ভাত খাই না। ময়লার বাক্স থাইকা এইটা সেইটা তুইলা খাই। আর পারি না। ভাত খাইতে মন চায়।” পারুল অবাক হল না। অবাক হওয়ার কিছু নাই। চারপাশের বাস্তব দৃশ্যপট এটা। দুর্ভিক্ষ তার ধারালো তলোয়ার দিয়ে ঝাঁজরা করে দিচ্ছে অসহায় মানুষগুলোকে। আকাশ চুম্বী দ্রব্য-মূল্য, হতাশা হয়ে চেপে বসেছে এদের উপর। নিশ্বাস নিতেও কষ্ট হয় প্রতিটি মানুষের। অথবা, মানুষের চামরা সেঁটে দেয়া কংকালগুলোর। তবুও, শরীরে সর্বস্ব শক্তি দিয়ে, বেঁচে থাকার তাগিদে, কেউ কেউ হয়ত এই ছেলেটির মতন বেছে নিয়েছে অন্ধকার পথ। “আচ্ছা, কাউকে তো বলেও দেখতে পারতি?” অনুযোগের মতন করে বলে পারুল। “কারে কমু? সবাই খেদাই দেয়। কারও কাছে অন্যেরে দেওনের মতন ভাত নাই।” পারুলের মন ভীষণ খারাপ হয়ে গেল। আচ্ছা, ছেলেটাকে এক থালা ভাত খাওয়ালে কেমন হয়? “আচ্ছা, এই শাড়িটা দিয়ে কী করতি?” “বেইচা দিতাম। এরপর ঐ পয়সা দিয়া ভাত খাইতাম।” আহারে ছেলেটা। কেন যেন মায়ায় মনটা ভরে গেল পারুলের। মলিন হেসে ও বলল, “আয়, আমার সাথে আয়।” রুমি ঠায় দাঁড়িয়ে রইল। ঠিক ভরসা পাচ্ছে না যেন। “কী হল, আয়?” “কই যামু? মারতে হইলে এনে মারেন। মাইর খাইয়া আমার অভ্যাস আছে।” মুখ শুকনো করে বলল রুমি। “কি আশ্চর্য! তোকে কে বলল মারব? ভাত খাবি বললি না? ভাত খেতে আয়।” রুমি অবিশ্বাস্য দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে আছে। ডাগর চোখ গোলাকার হয়ে ডিম্ব রূপ ধারণ করেছে। কিছুক্ষণ পরই খোলা বারান্দার এক কোণে মাদুর বিছিয়ে রুমিকে ভাত খেতে দেয়া হল। ধোঁয়া উঠা গরম ভাত, সাথে দুই ফালি কাঁকরোল ভাজি, অর্ধেকটা পেঁয়াজ আর ভাজা শুকনা মরিচ। ভাতের থালা দেখেই হামলে পড়ল রুমি। এক মুহূর্ত দেরী না করে গাপুস গুপুস খেতে শুরু করল। গরমের আঁচে জিভ পুরে যাচ্ছে, তবুও থামছে না। রয়ে, সয়ে চিবিয়ে যাচ্ছে। মাঝে একবার চোখ তুলে পারুলের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল, এরপর আবার খেতে থাকল। পারুলের ইচ্ছে হল বলে, ‘এখন থেকে রোজ আসবি, এসে ভাত খেয়ে যাবি।’ “কাঁকরোল ভাজি অনেক স্বাদ হইছে।” আঙ্গুলের ভাত নিছেপুছে খেতে খেতে বলল রুমি। “আরেকটু খাবি?” “নাহ। পেট ভরছে।” পারুল মমতা নিয়ে তাকিয়ে রইল। ওর একটা ছোট ভাই ছিল, বহুবছর আগে কি কারনে বাবা, মায়ের সাথে রাগ করে বাড়ি থেকে পালিয়েছিল। সেই যে গেল, আর এল না হতভাগাটা। ভাইটা থাকলে নিশ্চয়ই এই রুমির মতনই হত। কে জানে কোথায় আছে ছেলেটা। বেঁচে আছে, নাকি...... “আপনে অনেক ভালা মানুষ।” ভাবনার তোঁর ছিঁড়তেই ফিরে তাকায় পারুল। এরপর মিষ্টি করে হাসল। “এত জলদি বুঝে গেলি?” রুমি দাঁত বের করে হেসে বলল, “জ্বে।” “আচ্ছা, থাকিস কোথায় তুই?” “যেনে রাইত, অনেই কাইত। আজকা যাইগা?” “যাবি? আচ্ছা যা। আবার আসবি?” “আইচ্ছা।” ফুরফুরে, প্রাঞ্জল মেজাজে ছুটে বেরিয়ে গেল রুমি। পারুল দূর থেকে অপলক তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। একবেলা পেট ভরে খেতে পেরে কি সুখী এই ছেলেটা। সত্যি, মানুষ চাইলেই অতি অল্পতেও নিজেকে সন্তুষ্ট, সুখী রাখতে পারে।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১১৫৪ জন


এ জাতীয় গল্প

→ রুমি—০২

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now