বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
লেখকের নাম--মাজহারুল মোর্শেদ।
গল্পের নাম- নিরুদ্দেশ নয় নিজেকে খোঁজা
রাত যে খানিকটা গভীর হয়েছে সেটা চারিদিকের নীরবতা দেখেই অনুভব করা যায়। আমি ইনটারনেটে ডুবে আছি “করতোয়া” নদী সম্পর্কে কিছু তথ্য জানার জন্য। হঠ্ৎ ফোনটা বেজে উঠলে, আমার নীরবতা ভেঙে যায়। ফোনের দিকে না তাকিয়ে সেটা রিসিভ করে কানে ধরি। ওপাশ থেকে ভেসে আসে “ছুটিছাটা ভ্রমণ টিম” এর মজনুর রহমান ভাইয়ের কণ্ঠস্বর। সালাম বিনিময়ের পরই উনি বলেন- সকাল সাড়ে ছ’টায় টাউনহলে (রংপুর টাউন হল) সবাইকে উপস্থিত হতে হবে।
যেই কথা, সেই কাজ। মোবাই ফোনে এ্যালার্ম দিয়ে রাখলাম, যদি কোন কারণে ঘুম না ভাঙে তাহলে ভীষণ মসিবতে পড়তে হবে। না, সৌভাগ্যক্রমে তেমনটি কিছুই হলো না। ভোরের আজান কানে পড়তেই ঘুম ভেঙে গেলো। নামাজ আদায় করে ভ্রমন টিমের আর এক সদস্য আব্দুল জলিল স্যারকে সঙ্গে নিয়ে বেড়িয়ে পড়লাম। অতপরঃ আমরা যথা সময়ে টাউন হলে পৌছে গেলাম।
যাত্রা শুরুর আগে আমাদের সেট-আপ হলো এভাবে বাইক-১ মজনু-সাদ্দাম, বাইক-২ মিলন-শাপলা, বাইক-৩ মুস্তাফিজ-শাহিন, বাইক-৪ জলিল-মোর্শেদ, বাইক-৫ রাব্বি-সোহাগ, বাইক-৬ তপু ও তার শ্যালক, বাইক-৭ জাকির-অপু।
সব ঠিক ঠাক মতোই চলছিলো কিন্তু সমস্যটা বেঁধে বাইক-২ মিলন-শাপলাকে নিয়ে। ঘড়ির কাঁটা আট’টা ছুঁই-ছুঁই করছে কিন্ত তাদের আশার নাম নেই। দেরি হওয়ার কারণ জানাগেলো যে, শাপলা বাইয়ের বোউ অর্থাৎ “ছুটিছাটা ভ্রমণ” টিমের ভাবিজান আজকের সকালের নাস্তা রেডি করছেন ‘গোস্ত-রুটি’। তাই হাতে গড়া রুটি ডলা-ডলি করতে একটু সময় লেগে যাচ্ছে। কি আর করার আছে, ‘কিছু পেতে হলে কিছু হারাতে হয়’। বিরক্তিকর অপেক্ষা প্রহর, কিন্তু গোস্ত-রুটির প্রপ্তিটা কম কিশে? এজন্য সবাই উৎফুল্ল চিত্তে একই সাথে হাত উপরে তুলে ভাবিকে থ্যাংস জানায়, যদিও ভাবিসাহেবা আমাদেও আনন্দের বিষয় তাৎক্ষনিকভাবে জানতে পারলেন না।
যাত্রা শুরুর পূর্বে ঠিক করা হয় দিনজিপুর জেলার ঘোড়াঘাট উপজেলার কোল ঘেঁষে বয়ে গেছে উত্তরবঙ্গের ঐতিহ্যবাহী নদী ‘করতোয়া’। আমরা সে নদীর টলটলে জলে নেমে কিছুক্ষণের জন্য হলেও তার বুকে সাঁতার কেটে, উছলে পড়া ঢেউয়ের ভালোবাসার পরশ নেবো।
রংপুর-ঢাকা মহাসড়ক ধরে চলছে আমাদের বাইক। এভাবে ঘন্টা খানেক চলার পর কারো কারো পেট নাকি ক্ষুধায় চোঁ-চোঁ করতে শুরু করে। আর করবে নাই বা কেন? ব্যাগের ভেতর যে গোস্ত-রুটির মনকাড়া সুবাস বাতাসে ছড়িয়ে সবার নাকে সুড়সুড়ি দিচ্ছে, সেটা কেউ প্রকাশ্যে বলতে পাচ্ছে না। পীরগঞ্জ পার হয়ে রাস্তার ধারে অনেকটা গ্রাম্য পরিবেশে গড়ে উঠেছে মণ্ডলের চায়ের দোকান। আমরা যাত্রা বিরতি ঘটিয়ে, বসেপড়ি সে দোকানে। তারপর বহু কাঙ্খিত সেই গোস্ত-রুটির ভাগাভাগি। কে ক’টা করে রুটি খেতে পারে শুরু হলো তার প্রতিযোগিতা। বন্ধু শাহিন ও সোহাগের শকুনদৃষ্টি যেয়ে পড়লো গোস্ত রুটির উপর। আর কি রক্ষা আছে? পরিশেষে যা হবার তাই হলো, সব একেবারে সাবার। মণ্ড্যলের চায়ের দোকানের স্বত্বাধিকারী কাশেম মণ্ডল ও তার মধ্যবয়সী স্ত্রী খুব আদর যত্ন করে আমাদের চা খাওয়ালেন। বেশ গোলগাল চেহারা ও সুঠাম দেহের অধিকারী মণ্ডলের মধ্যবয়সী স্ত্রী। নাদুস-নুদুস চেহারায় বয়সের কোন ছাপ পড়েনি এখনও। তার দোকান থেকে পান সিগারেট কিনার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়লো অনেকে।
এরপর আমাদের যাত্রা আবার শুরু হলো দুপুর বারোটা নাগাদ আমরা পেয়ে গেলাম হৃদয় আকুল করা ভালোবাসার সেই কাঙ্খিত নদীর দেখা। উত্তরাঞ্চলের মানুষের প্রিয় এ নদীটি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ি জেলার বৈকণ্ঠপুরের একটি জলাধার থেকে উৎপন্ন হয়ে বাংলাদেশের পঞ্চগড় জেলার তেঁতুলিয়া উপজেলার ভজনপুর গ্রামের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। কি অসম্ভব সুন্দর! সেই করতোয়া নদী। দু’ধারে অসংখ্য ছোট ছোট গাছ-গাছালি আর খাড়া পার। স্বচ্ছ পানিতে তখনও দেখা যাচ্ছে ঝাঁকে ঝাঁকে মাছ গুলো কি মহাআনন্দে খেলা করছে। মানুষের ভয়ে বের হতে না পারা দু’টো খেকশিয়াল মনের সুখে দৌড়াদৌড়ি করে খেলছে। আকাশটা আজ ভীষণ পরিষ্কার, এক ফোটা মেঘের বালাই নেই কোথাও। নদীর ধারে একটু এগিয়ে গিয়ে একটা নাম নাজানা গাছের কাছে এসে দাঁড়াই। গাছটিতে অসংখ্যা ফুল ফুটেছে আর্শ্চযের বিষয় হলো সে এরকম ফুল এর আগে কখনো দেখেনি। ফুলটা অনেকটা পলাশ ফুলের মতো কিন্তু রঙ একেবারে কাঁচা হলুদের মতো। এর গন্ধটা ভীষণ চড়া নাকের ভিতর কেমন সুড়সুড়ি দেয়। গাছটির একটা চিকন ডাল ধরে নদীর দিকে মুখ করে তাকিয়ে দেখি একঝাঁক বালিহাস মনের আনন্দে ভেসে বেড়াচ্ছে। আনন্দ ভাগাভাগি করার জন্য একে অপরের ঠোঁটে ঠোঁট লাগিয়ে মাতামাতি করছে। ওদের নিষ্পাপ দেখে আমার মনে হলো সত্যি ওরা কতো সুখি! ওদেও মাঝে কোন দলাদলি নেই, হিংসা-বিদ্বেষ নেই, এগিয়ে যাওয়ার কোন প্রতিযোগিতাও নেই।
করতোয়া নদীর উত্তাল ভালোবাসার ঢেউয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লো সবাই। হাটুজল পেরুতেই হঠাৎ আমি তলিয়ে গেলাম অনেকটা গভীরে। যেহেতু তলিয়ে গেলাম এবার তার তলদেশের একটু ছোঁয়া পেতে ইচ্ছে হলো কিন্তু না সেটা এতোটাই গভীর যে আমার নিঃশ্বাস আর কুলোচ্ছে না। তাই কি আর করা, সবাই মিলে সাঁতার কাটতে শুরু করলাম। বেশ খানিকটা সময় নদীতে কেটে গেলো কিন্তু কারও পারে ওঠার নাম নেই। এদিকে দিনটি শুক্রবার হওয়ায় জুমআর নামাজের তাগাদা চলে আসে। অগত্যা, করতোয়া নদীর শীতল ভালোবাসার প্রাপ্তিটা অসম্পূর্ণ রেখেই আমাদের ছুটতে হলো অন্য কোন অজানা গন্তব্যের দিকে।
ঘোড়াঘাটের প্রাচীন নিদর্শন ঘোড়াঘাট দুর্গ-
করতোয়া নদী থেকে শাহী-সুরা মসজিদের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়ে কিছুদূর যেতে না যেতেই দেখা হয়ে যায় কবি আব্দুল হাদীর সঙ্গে, যিনি ‘ঘোড়াঘাট সরকার থেকে ঘোড়াঘাট জেলা’ বইটির লেখক। কবি আব্দুল হাদী আমাদের “বিভাগীয় লেখক পরিষদ” এর সম্মানিত সদস্য। তিনি আমাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যান ঘোড়াঘাটের দৃষ্টি নন্দন প্রত্নতাত্বিক প্রাচীন নিদর্শনগুলো দেখার জন্য। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘ঘোড়াঘাট দুর্গ’। তিনি আমাদের ঘুরে ঘুরে এ দুর্গ দেখান এবং এর প্রাচীন ইতিহাসও বর্ণনা করেন। প্রাচীন এ দুর্গে খননকার্য পরিচালনার সময় বহু ধর্মীয় ও অন্যান্য স্থাপনার সন্ধান পাওয়া যায় তবে এর মধ্যে কয়েকটি মসজিদের ধ্বংসাবশেষ ও ঢিবি ব্যতীত তেমন কিছু অবশিষ্ট নেই এখন।
১৭৫৬ সালে ইংরেজ সেনাপতি মিঃ কট্রিল কর্তৃক ঘোড়াঘাটের শেষ মুসলমান ফৌজদার মীর করম আলী খান পরাজিত ও বিতাড়িত হন এবং মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে ঘোড়াঘাটের প্রশাসনিক দফতর দিনাজপুরে স্থানানারিত। প্রশাসনিক দয়িত্ব দিনাজপুরে চলে গেলে স্থানীয়রাও অনেকেই এ স্থান ত্যাগ করে দিনাজপুরে যেতে শুরু করেন। এভাবে প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যায় ঘোড়াঘাট দুর্গ। বিভিন্ন সময়ে ঘোড়াঘাট দুর্গ বিভিন্ন রাজার অধীনে ছিলো। রাজারা তখন তাদের প্রয়োজন মত যুদ্ধ ব্যবস্থার জিনিস রাখতো এই দুর্গে। ঐতিহাসিক বই সমূহের আলোকে জানা যায় যে, এই দুর্গে সম্রাট আকবরের সময় ৯০০ অশ্বারোহী বাহিনী ছিলো এবং তাদের সাথে আরো ছিলো ৫০টির অধিক হাতি ও ৩২,৬০০ জনের মত পদাতিক বাহিনী।
ঘোড়াঘাট দুর্গটি দিনাজপুরের করোতোয়া নদীর তীরে অবস্থিত। দুর্গের অবশিষ্ট মসজিদটি দুর্গের দক্ষিণ ও পূর্বকোণে অবস্থিত। চারকোণা মসজিদটির তিনকোণেই পূর্বে তিনটি গম্বুজ ছিলো কিন্তু বর্তমানে এগুলো ভগ্নপ্রায়। মসজিদটির চারপাশেই রয়েছে ছড়ানো ছিটানো কয়েকটি ঢিবি। ঢিবিগুলো পূর্বে মসজিদ বা অন্য কোন ধর্মীয় স্থাপনার অংশ ছিলো বলে প্রত্নতাত্বিকবিদগণ ধারণা পোষণ করেন।
বিদায়ের প্রাক কালে কবি তার বাসবভন “নিভৃত শেড” এ আমাদের আমন্ত্রণ যানান এবং ঐতিহ্যবাহী হাড়িভাঙ্গা আম ও বিভিন্ন রকমের দুর্লভ ফল দিয়ে আপ্যায়ন করান।। উপহার হিসেবে তার লেখা ‘ঘোড়াঘাট সরকার থেকে ঘোড়াঘাট জেলা’ বইটি সবার হাতে তুলে দেন।
হোসেন শাহী আমলের ঐতিহ্যবাহী 'শাহী সুরা মসজিদে জুমআর নামাজ আদায়ের উদ্দেশ্যে আমাদের বাইকগুলো চলতে থাকলো হঠাৎ রাস্তার ধারে হাতের ঠিক ডান পাশে চোখে পড়লো ‘শিশু স্বর্গ বিনোদন পার্ক’। সময়ের নির্মমতা সত্যি সত্যি এখানে হার মানতে বাধ্য হলো। বাইকগুলো এমনিতে থেমে গেলো। বড় করে সাইনবোর্ডে লেখা, ‘শিশু স্বর্গ বিনোদন পার্ক ও পিকনিক স্পট’ ওসমানপুর, ঘোড়াঘাট, দিনাজপুর। লেখক কাজী কাদের মঞ্জুর ৫৫ একর জমিতে ব্যক্তি উদ্যোগে গড়েছেন এই শিশু স্বর্গ বিনোদন পাক। সারিসারি পাম গাছের ভিতরে নানান ইতিহাস ঐতিহ্যমণ্ডিত উপকরণ এবং শিশুদের আকর্ষণীয় খেলনা সামগ্রী নিয়ে একটি চমৎকার দৃষ্টি নন্দন ও মনোরম পরিবেশের উপস্থাপন করেছেন কবি।
সারিসারি পাম গাছের চিকন পত্র-পল্লব, মুকুলে মুকুলে শোভিত চাঞ্চল্য চিত্তে দোলা দেয় এক অসম্ভব রকমের অনুভ’তি। প্রকৃতির মাঝে নতুন রূপে নতুন প্রাণ। পাখিদের কিচিরমিচির মিষ্টি মধুর কলকাকুলিতে মুখরিত চারদিক। কোকিল, পাপিয়াসহ আরও বিচিত্র পাখির মধুর কণ্ঠে মুগ্ধ হয় সবাই। সবুজ পাতার ফাঁকে পাখির ওড়াউড়িও মন মাতিয়ে তোলে।
দুপুরের খরতাপে পাম গাছের শীতল ছায়া, শনশন দক্ষিণা হাওয়ায় ক্লান্ত দেহ-মন হঠাৎ এক অদ্ভুত মায়াময় আবহে সব ভুলে হৃদয় চঞ্চল হয়ে ওঠে, প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যে, অশেষ মুগ্ধতার সমারোহে। সারিসারি পাম গাছগুলো উদাস দুপুরে দক্ষিণা হাওয়ার সাথে যেন এক নিবিড় বন্ধন তৈরি করেছে। ভরদুপুরে গাছের ডালে নাম না জানা পাখিদের কলরবে চঞ্চল হয়ে ওঠে মন। সবুজ-শ্যামল নয়ন কাড়া দৃশ্যপট নাড়া দেয় মনের মাঝে। কতটা নিবিড়ভাবে সাজানো প্রকৃতির আয়োজন। একজন প্রকৃতি প্রেমিক খুঁজে পায় তাতে চিন্তার খোরাক। পথহারা পথিক খুজে পায় পথের দিশা। সারি সারি পাম বৃক্ষমালা, ফুলের মায়াবী পাপড়ি মেলা, আকাশে ভাসমান মেঘমালা; আরও কত কী!
প্রকৃতির ছায়া ঘেরা জমিনে পাম গাছের সারি কতো যে সুন্দর হতে পারে, এ অপরূপ সৌন্দর্যকে না দেখলে তা বোঝার উপায় নেই। গাছে গাছে কী সুন্দর ফুল! চোখ জুড়িয়ে যায় বাগানের রক্তিম পলাশ, মহুয়া, অশোক, শিমুল, কৃষ্ণচূড়া, কাঞ্চন, পারিজাত, মাধবী আর গাঁদার ছোট ছোট ফুলের বাহারি রঙে। কৃষ্ণচূঁড়ার আগুন ঝরানো রূপ আর মেঘেদের অবিরাম আনাগোনা প্রকৃতির রূপময় নিসর্গ ছুঁয়েছে এই শিশু স্বর্গ বিনোদন পার্কের অলি-গলিতে। কী অপরূপ, কী মায়াবী বাহারি ফুলের ছড়াছড়ি। কষ্টমিশ্রিত শূন্যতার অনুভব হৃদয়ে খুব বেশি নাড়া দেয়। এসব মনোরম দৃশ্য আমাদের দৃষ্টিকে করে পরিতৃপ্ত। ভাবি, আবার কী কখনো দেখা দেখা পাবো! তবুও সময়ের দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ায় এখানে একমুহুর্ত দাঁড়িয়ে থাকার সুযোগ নেই। ছুটতে হলো শাহী-সূরা মসজিদের দিকে।
শাহী-সূরা মসজিদ-
বাংলাদেশ প্রত্নতাত্বিক অধিদপ্তর এর তালিকাভুক্ত একটি প্রত্নতাত্বিক স্থাপনা এ মসজিদ। হোসেন শাহী আমলের মসজিদ ‘শাহী সুরা মসজিদ’। মসজিদটি প্রায় সাড়ে পাঁচশত বছর আগে তৈরি। মসজিদে গ্রানাইটসহ নানা মূল্যবান পাথরের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। দিনাজপুর জেলার ঘোড়াঘাট উপজেলা থেকে ১০ কিলোমিটার পশ্চিমে ও ঘোড়াঘাট-হিলি পাকা সড়কের প্রাচীন জলাশয়ের পরেই এই মসজিদটি অবস্থিত। মসজিদটি পূর্ব-পশ্চিমে লম্বা। এর বাইরের মাপ ১২.১২ মিটার এবং প্রধান কক্ষের ভিতরের আয়তন ৪.৮৪ মিটার। মসজিদের চারকোণে এবং বারান্দার দুইকোনে বাহিরের দিকে একটি করে মিনার আছে। এগুলো কাল পাথরের তৈরি। বারান্দার পূর্ব দেয়াালে তিনটি করে প্রবেশ দ্বার আছে। প্রধান কক্ষের উপরে একটি গম্বুজ আছে, বারান্দার উপরে তিনটি ছোট গম্বুজ আছে। ভিতরে পশ্চিম দেয়ালে মিহরাবগুলোতে উন্নতমানের কারুকাজ। মসজিদে ইটের সঙ্গে পাথরের ব্যবহার, দেয়ালের মাঝে পাথরের স্তম্ভ, ইটের গাঁথুনি তা চোখে পরার মতো। এছাড়া প্রত্যেক দরজার নিচে চৌকাঠ পাথরের তৈরি। পূর্বে মসজিদে প্রবেশের সিঁড়ি আছে। এখানকার কালো ও বেলে পাথর বাঙলার পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত রাজমহল থেকে আনা হয়েছে বলে মনে করা হয়। ধারণা করা হয় এখানকার এই প্রাচীনকীর্তির ধ্বংসাবশেষ গুপ্তযুগের পরে নয়।
দেশের মুসলিম স্থাপত্যের এক অনন্য নিদর্শন এই ‘সুরা মসজিদ’। স্থানীয় অনেকের ধারণা করেন যে, এই মসজিদটি জ্বিনেরা তৈরি করেছেন। এখনো প্রতিদিন বিশেষকরে শুক্রবার শতশত মানুষ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ছুটে আসেন। অনেকে ধর্মীয় বিশ্বাসে মহান আল্লাহর দরবারে মনের মাকসুদ পূরণ করার জন্য বিভিন্ন রকম মান্নত করে থাকে থাকেন। কেউ সিন্নি বিতরণ করেন, কেউ কেউ আবার খিচুরি, বিরিয়ানি রান্না করে এখানকার মুসল্লিসহ উপস্থিত সবাইকে তৃপ্তি ভরে খাওয়ান।
আমার কথা হলো জয়পুর হাটের এক ভদ্র মহিলার সাথে। অত্যন্ত ন¤্র-ভদ্র ও মার্জিত স্বভাবের মহিলা কর্ম জীবনে নিজেও একজন কলেজ শিক্ষক। ক্ষণিকের পরিচয়েও জানতে পারলাম ভদ্র মহিলার নাম কামরুন্নাহার কল্পনা, এম জাহাঙ্গির আলম (সরকারি কর্মকর্তা) একযুগ ধরে জীবন সঙ্গী গহয়ে আছেন তার। কিন্তু যুগ পেরিয়ে গেলেও তার গর্ভে কোন সন্তান আসছেনা। দেশ-বিদেশে বহু নামি-দামি চিকিৎসকের স্মরণাপন্ন হয়েও ব্যর্থ হয়েছেন তারা। তাই মহান আল্লাহ রব্বুলের দরবারে একটু করুণা প্রাপ্তির আশায়, সিন্নি মান্নত করে এখানে এসেছেন।
আলহামদুলিল্লাহ শুক্রবারের জুমআর নামাজ পবিত্র ‘শাহী সুরা’ মসজিদে আদায় করে আমরা বেড়িয়ে পরলাম ‘আশুরার বিল’ দেখার উদ্দেশ্য নিয়ে।
দিনাজপুর জেলার, নবাবগঞ্জ উপজেলা সদরের এক কিলোমিটার উত্তর পশ্চিমে এই বিশাল আকারের শালবন। দু’ধারে বিশাল উঁচু সারিসারি শালগাছ তার মাঝখান দিয়ে যাতায়াতের জন্য চিকন রাস্তা। এতোটাই গহীন জঙ্গল যে, এর ভেতর দিয়ে যাওয়ার সময় বুক ছমছম করে, মনে হয় সুন্দরবনের ভেতর দিয়েই যাচ্ছি আর কখন একটা ভয়ঙ্কর চোখের টাইগার এসে পথের ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে পড়ে।
এই শালবনের উত্তর পাশটায় চোখে পড়লো বিশাল বিলটি। বর্ষার পানিতে গোটা বিল কানায় কানায় ভরে একেবারে টইটম্বুর হয়ে আছে। বিলের আয়তন ২৫১.৭৮ হেক্টর। এই বিলের উপত্তি নিয়ে তৈরি হয়েছে বিচিত্র কাহিনী। বিলের ঘাটে দর্শণার্থীদের ঘুরে দেখার জন্য বেশ কয়েকটা ছোট ছোট নৌকা বাঁধা আছে, আমরা এক মুরুব্বি গোছের মাঝির নৌকায় উঠে পড়লাম, কারণ ছিলো বিল সম্পর্কে কিছু তথ্য জানা। আমাদের নৌকা চলতে চলতে সেই মুরুব্বি গোছের মাঝির সাথে কথা হলো। তার কাছে জানতে পারি যে, এই বিলের আশিটি দার বা নালা চর্তুদিকে ছড়িয়ে গেছে বলে এর নাম করণ হয়েছে আশুরার বিল। বিশাল এই বিলের গভীরতা ও কাদার তলানী এবং এর চারপাশ বেষ্টিত বিশাল আকারের শালবন। বিলের মাঝে কতিপয় স্থান- পাতিলদহ, বুড়িদহ, পীরদহ, মুনির আইল, কাজলাদহ, পালাদহ, মুনির থান ইত্যাদি নামে পরিচিত। এ বিলে প্রচুর মাছ পাওয়া যায়। বর্ষা মৌসুমে লাল, সাদা শাপলা ফুল বিলের সৌন্দর্যকে আরো বাড়িয়ে দেয়। বিভিন্ন স্থান থেকে ভ্রমন পিপাষু মানুষ আশুরার বিলের সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ হয়। আমাদের সবার দৃষ্টি এখন লাল-সাদা শাপলা ফুলের দিকে কিন্তু বর্ষার মৌসুম কেবলি সমাগত। এতো জলদি কোন শাপলা ফোটে না, বোধকরি সেটা সবাই ভুলে গেছে। এবার আমাদের ফেরার পালা। দু’ধারে বিশাল উঁচু সারিসারি শালগাছ তার মাঝখানে চিকন রাস্তা দিয়ে চলছে আমাদের বাইকগুলো। উদ্দেশ্য ছিলো সীতাকোট বদ্ধবিহার যাওয়া।
অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে আমরা পৌছে গেলাম ‘সীতাকোট বৌদ্ধ বিহার’। এটিও নবাবগঞ্জ উপজেলায় অবস্থিত একটি প্রাচীন প্রত্নতাত্বিক নিদর্শণ। বিহারের সন্নিকটে একটি গাছের নিচে বসে ছিলো অশীতিপর এক বৃদ্ধ মানুষ। অতি ক্ষীণস্বরে ভাঙা ভাঙা কণ্ঠে তিনি জানান, বিহারটি খ্রিষ্টীয় পঞ্চম-ষষ্ঠ শতকের তৈরি। বিহারটিতে ৪১টি কক্ষ ছিলো। বিহারের কক্ষগুলি অভ্যন্তরীণ টানা বারান্দার সঙ্গে সংযুক্ত ছিলো। সেখানে পূজার মূর্তি রাখা হতো। খুব সম্ভবত দক্ষিণ দিকে কেন্দ্রীয় কক্ষটি ছিলো প্রধান মন্দির। ব্রোঞ্জনির্মিত একটি বোধিসত্ব পদ্মাপাণি এবং বোধিসত্ব মঞ্জুশ্রী মূর্তি সীতাকোট বিহার থেকে প্রাপ্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রতœনিদর্শন। মূর্তি দুটির গঠনশৈলী থেকে অনুমান করা যায়, এগুলি ৭ম-৮ম শতাব্দীতে তৈরি। এই বিহারের অধিকাংশ প্রত্নসামগ্রী সংরক্ষিত আছে দিনাজপুর মিউজিয়ামে।
দিনের শেষে ক্লান্ত পাখিরা যেমন ডানা ছেড়ে দিয়ে বাতাসে ভর করে নীড়ে ফেরে, ঠিক আমাদেরর অবস্থাটাও অনেকটা তাই হলো। পাগুলো আর এগুচ্ছেনা। অগত্যা কি আর করার, সেখানকার নামি-দামি হোটল ‘রহমানীয়া হোটেলে’ যে যার মতো করে একটা কিছু খেয়ে চা খেলাম। এবার শরীর থেকে ক্লান্তিটা একটু একটু করে সরে যেতে লাগলো। বেশ ফুরফুরে মেজাজে সারাদিনের আনন্দঘণ মুহুর্তগুলোকে স্মৃতি করে আমরাও ঘরে ফিরে এলাম।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now