বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
লেখক: মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
________________________________________
পাড়ার নাম ফুলতলা, কিন্তু সেখানে এখন ফুলের চেয়ে আলো বেশি। কারণ ফুলতলার আকাশে সূর্যের চেয়ে উজ্জ্বল কিছু একটা দেখা যাচ্ছে—রহিম মিয়ার বাড়ি। না, তিনি কোনো সিনেমার তারকা নন, কিংবা টাইলস ব্যবসায়ীও নন। তিনি কেবলই এক গরিব-মধ্যবিত্ত মানুষ, যার একমাত্র স্বপ্ন ছিল—বিল কমানো।
এই স্বপ্নটাই একদিন তাঁকে নিয়ে গেল “বিশ্বের সবচেয়ে সাদা রঙ”-এর পেছনে।
________________________________________
বাবলু, রহিম মিয়ার ভাগনে, সদ্য আমেরিকা থেকে ফিরেছে। পেরডিউ ইউনিভার্সিটির ছাত্র। পড়াশোনায় মাঝারি, কিন্তু কথা বলায় একেবারে মহা-আত্মবিশ্বাসী। দেশে ফিরে চাচার ঘরে ঢুকেই বলল,
“চাচা, আমি এমন একটা রঙ এনেছি যেটা লাগালে রোদে পোড়বে না!”
রহিম মিয়া কৌতূহলভরে চশমা ঠিক করে বললেন,
“মানে, জামায় লাগালে গরম লাগবে না?”
“না চাচা, বাড়ির ছাদে দিলে ঘর ঠান্ডা থাকবে, বিদ্যুৎ খরচ কমে যাবে।”
রহিম মিয়া চায়ের কাপ নামিয়ে গম্ভীর গলায় বললেন,
“তাহলে তো এই রঙ লাগালেই আমি মাসে পাঁচশো টাকা বাঁচাবো! এমনকি আমার স্ত্রী মমতাজ বেগমও খুশি হবে—কারণ গরমে তিনি বলেন, আমি আগুনের মানুষ!”
বাবলু হেসে বলল,
“ঠিক আছে চাচা, আমি রঙটা লাগিয়ে দেই।”
________________________________________
পরদিন সকাল থেকেই রহিম মিয়ার বাড়িতে কর্মযজ্ঞ। পাড়ার সবাই ভেবেছে, হয়তো বিয়ের ঘর বানানো হচ্ছে। কিন্তু দুপুর নাগাদ দেখা গেল—পুরো বাড়িটাই এমনভাবে ঝলমল করছে যে চোখ খুলে রাখা দায়! বাচ্চারা বলল, “দুধবাড়ি!”
রফিক, চির-ঈর্ষান্বিত প্রতিবেশী, চুপ করে থাকতে পারল না। বলল,
“ওই বাড়িতে এত আলো যে রাতে মশারা চশমা পরে আসে!”
সন্ধ্যার পর থেকেই পাড়ার গলি যেন এক সিনেমার সেট—রহিম মিয়ার বাড়ি থেকে প্রতিফলিত আলোয় গাছপালা, দোকান, এমনকি গরুর গায়েও সাদা আভা।
________________________________________
তৃতীয় দিনেই রহিম মিয়ার ঘরে বিপদ। মমতাজ বেগম চিৎকার করে উঠলেন,
“এই ঘরে আলো বন্ধ করলেও ঘুম আসে না! দেয়াল থেকে আলো বের হয়!”
রহিম মিয়া বললেন,
“ওটা আলো না, বিজ্ঞান!”
“তাহলে ওই বিজ্ঞানেরে বলো, আমার ঘুম ফিরিয়ে দিক!”
রহিম মিয়া তখন ছাদে উঠে নিজেই চেক করলেন। দাঁড়ানো মাত্রই চোখে এমন আলো পড়ল যে তিনি নিজেই নিজেকে খুঁজে পেলেন না। নিচে নামতে গিয়ে ভুলে ছাদের ধারে বসে চা খেতে লাগলেন। চা-ও ঠান্ডা হয়ে গেল—প্রতিফলিত আলোতে যেন তাপ পালিয়ে গেল!
________________________________________
পরদিন পাড়ায় এক নতুন আলোচনা শুরু হলো। রফিক সাহেব পাড়ার চায়ের দোকানে বললেন,
“ওই রঙটা নাকি এত সাদা যে আল্লাহর ফেরেশতারাও সানগ্লাস পরে আসে!”
মকবুল যোগ করল,
“আমার মুরগিগুলা রাতে ওর ছাদে উঠে ডিম না দিয়ে আলো দেয়!”
আর এসব শুনে রহিম মিয়া কেবল হাসলেন। তাঁর কাছে এটা ছিল বিজ্ঞানের জয়—বিদ্যুৎ বিল কমে যাচ্ছে, আর ঠান্ডা বাড়ি পেয়ে নিজেকে মনে হচ্ছিল বিদেশি বিজ্ঞানী।
কিন্তু সেই আনন্দ বেশিদিন টিকল না।
________________________________________
এক বিকেলে ফুলতলার স্কুলের সামনে দেখা গেল, বাচ্চারা রহিম মিয়ার বাড়ির দিকে আয়না তাক করে হাসছে। কারণ রঙটা এত আলো ফেরত দেয় যে কেউ তাকালে নিজের মুখও দেখা যায়। এ দৃশ্য দেখে রহিম মিয়া ক্ষিপ্ত হয়ে বললেন,
“এই রঙটা আমি দেশের উন্নতির জন্য এনেছি, তোমরা এটাকে খেলনা বানিয়ে ফেলছ!”
তখন পাশের দোকানদার সালাম মিয়া মৃদু হেসে বলল,
“চাচা, উন্নতি ঠিক আছে, কিন্তু আমার দোকানের বরফ গলে গেছে রে ভাই!”
সত্যিই, সূর্যের আলো প্রতিফলিত হয়ে পাশের দোকানে গিয়ে এমন গরম করছে যে ফ্রিজের সেন্সর বিভ্রান্ত হয়ে গেছে।
________________________________________
এরপর একদিন স্থানীয় সংবাদপত্রে বড় করে ছাপা হলো—
“ফুলতলায় সূর্য হার মানল সাদার কাছে”
সাথে রহিম মিয়ার ছবি, চোখে সানগ্লাস, মুখে হাসি।
পরদিনই টিভি রিপোর্টাররা হাজির।
“আপনি এই রঙ কোথা থেকে এনেছেন?”
“আমার ভাগনা আমেরিকা থেকে এনেছে। ওখানে পেরডিউ বলে একটা ইউনিভার্সিটি আছে, তারা বানায়ছে।”
“এই রঙের বিশেষত্ব কী?”
“এটা সূর্যের আলো ফেরত দেয়, বিদ্যুৎ বাঁচায়, ঠান্ডা রাখে। মানে, আমার মতো গরিব মানুষকেও কুলার বানায়!”
মমতাজ বেগম পিছন থেকে ফিসফিস করে বললেন,
“আর আমাকে বানায়ছে গরমে পাগল!”
________________________________________
একদিন রাতে রহিম মিয়া বাথরুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করতে ভুলে গেলেন। বাইরে থেকে আলো এত বেশি প্রতিফলিত হচ্ছিল যে পুরো পাড়া জেনে গেল, তিনি টুথব্রাশ করছেন। পরদিন থেকেই পাড়ায় নতুন প্রবাদ চালু হলো—
“রহিম মিয়ার বাড়িতে অন্ধকার মানে ভ্রান্ত ধারণা!”
________________________________________
বাবলু তখন আবার দেশে এল। সব দেখে অবাক হয়ে বলল,
“চাচা, আপনি পুরো বাড়ি রাঙিয়ে ফেলেছেন? আমি তো বলেছিলাম শুধু ছাদে লাগাতে!”
রহিম মিয়া গর্বভরে বললেন,
“আমি ভাবলাম যতটা সাদা, ততটাই ঠান্ডা!”
বাবলু মাথায় হাত দিয়ে বলল,
“চাচা, এই রঙ ইনফ্রারেড রশ্মি প্রতিফলিত করে, তাই সূর্যের তাপ ফেরত দেয়। কিন্তু আপনি তো ভেতরের দেয়ালেও মেখে ফেলেছেন! এখন আলো ঘরে আটকে ঘুমকেও প্রতিফলিত করছে!”
রহিম মিয়া কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,
“মানে, আমি বিজ্ঞানকে অতিরিক্ত ভালোবেসে ফেলেছি!”
________________________________________
শেষ পর্যন্ত পাড়ার লোকজন মিলে সিদ্ধান্ত নিল, রহিম মিয়ার বাড়ির সামনে এক বিশাল ছাতা বসানো হবে—নাম দেওয়া হলো “ছায়া কমিটি”। রহিম মিয়া প্রথমে রেগে গেলেন, পরে হাসলেন।
“আচ্ছা, বুঝেছি। সব কিছুই ভারসাম্যের দরকার। বেশি সাদা হলে চোখ ঝলসে যায়, আবার বেশি কালো হলে কিছুই দেখা যায় না। মাঝামাঝি থাকাই ভালো।”
বাবলু বলল,
“ঠিক বলেছেন চাচা। মানুষও যেন এমন হয়—সব আলো ফেরত না দেয়, কিছু আলো নিজের ভেতর রাখে।”
________________________________________
আজ ফুলতলায় রহিম মিয়ার বাড়ি এক দর্শনীয় স্থান। কেউ বলে “বাংলাদেশের ছোট তুষারভূমি”, কেউ বলে “রোদ-বিরোধী মিউজিয়াম।” রফিক এখনো ঈর্ষা করে, কিন্তু রাতে তার বাচ্চারা ওই আলোয় বই পড়ে।
রহিম মিয়া এখন গর্বভরে নিজের নাম লেখেন—
“রহিম মিয়া, সাদায়ও হাসির ছোঁয়া।”
তিনি জানেন, সব সাদা আলোও একটু ছায়া চায়,
যেন চোখে না লাগে, মনে পড়ে থাকে।
আর ফুলতলার মানুষরা এখনো হাসে, যখনই সূর্য ওঠে—
কারণ সূর্যের সঙ্গে প্রতিদিন নতুন লড়াইয়ে নামে রহিম মিয়ার দুধবাড়ি।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now