বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
মোহাম্মদ শাহজামান শুভ।
সেদিন সকালটা ছিল অন্য সব দিনের মতোই সাধারণ— অন্তত কাগজে-কলমে। কিন্তু বাস্তবে তা ছিল ইতিহাসের সবচেয়ে রঙিন বিপ্লবের দিন। রাফি ঘুম থেকে উঠে বুঝল, পৃথিবী শুধু শব্দ শুনছে না, শব্দ দেখছেও। তবে এবার ঘটনাটা শুধু মজার ছিল না; ছিল গভীর রূপক, যেন সমাজের অদৃশ্য সত্যগুলো হঠাৎ দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে।
মায়ের ডাক যখন গোলাপি ঢেউ হয়ে দরজা ভেদ করে এলো, রাফি প্রথমে ভেবেছিল এটা নিশ্চয়ই কোনো নতুন মোবাইল অ্যাপের কাজ। কিন্তু মোবাইল তখনো আপডেট নেয়নি। বরং আপডেট নিয়েছে বাস্তবতা। মা যখন একটু রেগে উঠলেন, লাল তীক্ষ্ণ ত্রিভুজ ছুটে এসে দেয়ালে আঘাত করল। রাফি তখনই বুঝল— মানুষের আবেগ এখন আর লুকানো থাকবে না। শব্দের সঙ্গে রঙও প্রকাশ পাবে।
বাইরে বেরোতেই সে দেখল, শহর যেন এক বিশাল চিত্রকর্ম। রিকশার ঘণ্টি সোনালি বৃত্ত হয়ে ঘুরছে— ছোট মানুষের ছোট স্বপ্নের মতো। বাসের হর্ন বিশাল কমলা ঢেউ তুলে ছুটে যাচ্ছে— বড় ক্ষমতার বড় আওয়াজের মতো। দোকানির হাঁকডাক লাল রেখা হয়ে আকাশ দখল করছে— প্রতিযোগিতার বাজারে টিকে থাকার আর্তনাদের মতো। রাফি হেসে ভাবল, এতদিন মানুষ শুধু শব্দে শক্তি দেখাত, আজ সেই শক্তির রঙও প্রকাশ পাচ্ছে।
স্কুলে গিয়ে সে আবিষ্কার করল আরেক কাণ্ড। গণিত স্যারের কণ্ঠ গাঢ় নীল দণ্ডের মতো— নিয়ম, শৃঙ্খলা আর সূত্রের প্রতীক। বাংলা ম্যাডামের কণ্ঠ বেগুনি মেঘ— কল্পনা আর কোমলতার প্রতীক। কিন্তু পেছনের বেঞ্চে বসা সোহেলের ফিসফাস? সবুজ সরু সাপের মতো এগিয়ে গিয়ে সবার চোখে ধরা পড়ছে। সোহেল তখন বুঝল— গোপন কথা আর গোপন নেই। শব্দের গণতন্ত্রে সবকিছু সমানভাবে দৃশ্যমান।
টিফিনে মাঠে যা হলো, তা যেন সামাজিক মিডিয়ার লাইভ সংস্করণ। সবাই একসঙ্গে হাসতেই গোলাপি আতশবাজি। কেউ কারও নামে খোঁচা দিলে কালো রেখা কেটে গেল আকাশে। বন্ধুত্বের আলাপ ছিল হালকা নীল ঢেউ, আর ঈর্ষার কথা ছিল কাঁটাযুক্ত লাল রেখা। রাফি ভাবল, এতদিন মানুষ কথা বলে মন লুকাত, আজ মন নিজেই রঙ হয়ে বেরিয়ে আসছে।
শহরের বড় বড় নেতারা টিভিতে ভাষণ দিলেন। আগে যাদের ভাষণ ছিল মধুর শব্দে মোড়ানো, আজ দেখা গেল ভেতরের রঙ। একজন নেতার শান্ত কণ্ঠের আড়ালে হঠাৎ কালচে ধোঁয়া উঠতে লাগল। দর্শকরা অবাক। আরেকজনের কণ্ঠ যদিও কর্কশ, কিন্তু তার ভেতর থেকে নীল স্বচ্ছ ঢেউ বেরোল। মানুষ বুঝতে শুরু করল— শব্দের রঙ চরিত্রের আয়না।
বাজারে শব্দের প্রতিযোগিতা তুঙ্গে। যে দোকানদারের হাঁকডাক বেশি উজ্জ্বল, তার দোকানে ভিড়ও বেশি। ফলে কেউ কেউ কৃত্রিম রঙ বাড়ানোর চেষ্টা করল। বিশেষ “ভয়েস পলিশ” স্প্রে বের হলো— কথা বললেই রঙ উজ্জ্বল হবে! কিন্তু তাতে উল্টো ফল হলো; কৃত্রিমতা ধরা পড়ে গেল আরও স্পষ্টভাবে। মানুষ বুঝল— রঙের সততা লুকানো যায় না।
এদিকে বিজ্ঞানীরা “Sound Vision Glasses” বানালেও দেখা গেল, সমস্যা শুধু প্রযুক্তিতে নয়, আচরণে। শব্দ যখন দৃশ্যমান, তখন মিথ্যা বলাও কঠিন। এক ছাত্র পরীক্ষায় বলল, “আমি পড়েছি।” কিন্তু তার কণ্ঠের সঙ্গে সঙ্গে ফিকে ধূসর রেখা উঠল। শিক্ষক হেসে বললেন, “রঙ কিন্তু অন্য কথা বলছে!”
শিল্পীরা অবশ্য এই বিপ্লবকে উৎসব বানিয়ে ফেললেন। কনসার্টে এখন গানের সঙ্গে রঙের নৃত্য। এক গায়ক উচ্চস্বর তুলতেই রুপালি বজ্রপাত। দর্শকরা বলছে, “এ যেন সুরের আতশবাজি!” কবিরা কবিতা পড়লে শব্দের ফুল ফুটছে। একজন চিত্রশিল্পী তো ঘোষণা দিলেন— “আমি আর ক্যানভাসে আঁকব না, আমি মাইক্রোফোনে আঁকব।”
কিন্তু কোলাহল যখন বাড়ল, শহর ধীরে ধীরে ক্লান্ত হতে লাগল। আগে শব্দ দূষণ শুধু কানে লাগত, এখন চোখেও লাগে। গাড়ির হর্ন আগুনের মতো ছুটে এসে চোখ ঝলসে দেয়। নির্মাণকাজের শব্দ ধূসর ধুলো হয়ে আকাশ ঢেকে ফেলে। মানুষ সানগ্লাস পরে হাঁটে, কেউ কেউ কান ঢাকে না— চোখ ঢাকে।
একদিন রাফি তার ছোট বোনকে কাঁদতে দেখল। ধূসর মেঘ ঘর ভরিয়ে ফেলছে। সে বুঝল, কষ্ট এতদিন শুধু শোনা যেত, আজ তা দেখা যাচ্ছে। সে বোনকে জড়িয়ে ধরল। সঙ্গে সঙ্গে নরম নীল ঢেউ ছড়িয়ে পড়ল— সান্ত্বনার রঙ।
ধীরে ধীরে শহরে “নীরব অঞ্চল” তৈরি হলো। সেখানে কম শব্দ, কম রঙ। মানুষ সেখানে গিয়ে বিশ্রাম নেয়। কেউ কেউ বলল, “আমরা এতদিন শব্দের ক্ষমতা বুঝিনি। এখন রঙ দেখে বুঝছি, আমাদের কথা কত ভারী।”
একদিন সরকার ঘোষণা দিল— “অতিরিক্ত শব্দ মানেই অতিরিক্ত রঙ দূষণ।” আইন কঠোর হলো। নেতাদের ভাষণ ছোট হলো, কারণ বেশি রঙ মানে বেশি প্রশ্ন। সংসদে তর্ক বাড়লে লাল আর কালো ঝড় উঠত— টিভিতে দর্শকরা শুধু বিতর্ক শুনত না, রঙের লড়াইও দেখত।
রাফি একদিন ছাদে দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখছিল। টাপুর টুপুর শব্দ নীল রেখা হয়ে পড়ছে। বজ্রপাত সাদা চাবুকের মতো আকাশ চিরছে। সে ভাবল, প্রকৃতি কখনো কৃত্রিম নয়— তার রঙ সবসময় সত্য।
কিছুদিন পর বিজ্ঞানীরা বললেন, “এই পরিবর্তন স্থায়ী নয়।” মানুষ মিশ্র প্রতিক্রিয়া দিল। কেউ বলল, “ভালোই হয়েছে, চোখ বাঁচবে।” কেউ বলল, “সত্যের আয়না হারাব।”
শেষ দিনটিতে শহর যেন একটু নীরব ছিল। সবাই বুঝতে পারছিল, রঙের গণতন্ত্র বিদায় নিতে চলেছে। রাফি স্কুলে গিয়ে দেখল, বন্ধুরা হাসছে— গোলাপি ঢেউ। বাংলা ম্যাডাম কবিতা পড়ছেন— বেগুনি মেঘ। সে মনে মনে বলল, “এই দৃশ্য মনে রাখব।”
পরদিন সকালে সব স্বাভাবিক। শব্দ আবার অদৃশ্য। মানুষ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। কিন্তু রাফি জানল, অদৃশ্য মানেই নেই— তা নয়। শব্দ এখনো চরিত্রের রঙ বহন করে, শুধু তা চোখে ধরা পড়ে না।
সে খাতায় লিখল— “যদি শব্দের রঙ দেখা যেত, সমাজে ভান কমে যেত। কিন্তু হয়তো সহনশীলতাও কমে যেত। তাই প্রকৃতি আমাদের ভারসাম্য শিখিয়েছে— কিছু শুনব, কিছু দেখব, কিছু কল্পনায় রাখব।”
তারপর সে আয়নায় নিজের দিকে তাকিয়ে আস্তে বলল, “সত্য।” যদিও কোনো রঙ দেখা গেল না, তবু সে অনুভব করল— ভেতরে কোথাও নীল স্বচ্ছ ঢেউ উঠেছে।
পৃথিবী আবার আগের মতো হলো। কিন্তু যারা একবার শব্দের রঙ দেখেছে, তারা আর আগের মতো রইল না। কারণ তারা জানে— প্রতিটি কথার একটি অদৃশ্য রঙ আছে। আর সেই রঙই সমাজের আসল প্রতিচ্ছবি।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now