বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
রিটার্ন অব ড্রাকুলা
কাহিনী : ফ্রেডা ওয়ারিংটন
অনুবাদক : ইসমাইল আরমান
-------------------------------------
পর্ব ৪০ (শেষ)
( ডাঃ জন সিউয়ার্ডের ডায়েরী)
" মীনা! চলে এসো এদিকে!" হাত বাড়িয়ে মিসেস
হারকারকে ডাকলেন ভ্যান হেলসিং।
কিন্তু এলেন না মিসেস হারকার। সীমাহীন ক্রোধে তখন
বিকৃত হয়ে গেছে তাঁর চেহারা। পাগলই হয়ে গেছেন
বোধহয় কাউন্টকে হারিয়ে। আচমকা উঠে ছুটে গেলেন
বেহেরিটের দিকে। সর্বশক্তিতে ধাক্কা দিলেন তার
পিঠে।
বিজয়ের আনন্দে এতই মশগুল ছিল বেহেরিট যে বিপদ
টেরই পায়নি...আশঙ্কাই করেনি বিপদের। ধাক্কা খেয়ে
টালমাটাল হয়ে গেল সে, সেকেন্ডের ভগ্নাংশের জন্য
যুঝল ভারসাম্য ফিরে পেতে, তারপরেই হুড়মুড় করে পড়ে
গেল আগুনে ভরা খাদের ভেতর। তার বুক চিরে বেরিয়ে
এল আর্তচিৎকার। আরেক দফা লকলক করে উঠল আগুন।
ধপ করে মাটিতে বসে পড়লেন মিসেস হারকার। আমি আর
ভ্যান হেলসিং ছুটে গেলাম তাঁর দিকে। কয়েক পা
এগোতেই পেছন থেকে শুনতে পেলাম হাহাকার।
" বেহেরিট! বেহেরিট!" আকুল গলায় ডাকছেন কোভাক্স।
আমরা থেমে দাঁড়াতেই রক্তলাল চোখে তাকালেন
মিসেস হারকারের দিকে। খ্যাপাটে গলায় বললেন, "
ডাইনী কোথাকার! বেহেরিটকে ধ্বংস করলি তুই?
লাইব্রেরীর চাবি আমাকে দেবার আগেই? আমি তোকে
ছাড়ব না!"
চোখের পলকে পৈশাচিক রূপ নিল তাঁর চেহারা। শ্বদন্ত
বের করে মিসেস হারকারের দিকে ছুটে এলেন তিনি।
" না আন্দ্রে!" বলে তাঁর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন ভ্যান
হেলসিং। শুরু হলো ধ্বস্তাধস্তি।
এক ছুটে মিসেস হারকারের কাছে পৌঁছলাম আমি। তাঁকে
টান দিয়ে দাঁড় করালাম। বললাম, " জলদি পালান এখান
থেকে!"
" আর আপনারা?" হাঁফাতে হাঁফাতে জিজ্ঞেস করলেন
মিসেস হারকার।
" আমাদের নিয়ে ভাববেন না", আমি বললাম, " চলে যান
এখান থেকে। ইলিনা আর কুইন্সিকে খুঁজে বের করুন"।
" ওরা এখানে নেই, ডাঃ সিউয়ার্ড", বললেন মিসেস
হারকার, " কুইন্সি ইংলন্ডেই আছে। নিরাপদেই আছে; আর
ইলিনাও আর নেই।"
চমকাবার সুযোগ পেলাম না। তার আগেই শুনলাম ভ্যান
হেলসিংয়ের মরণ আর্তনাদ। রক্তাক্ত শরীর নিয়ে তাঁকে
ছিটকে পড়তে দেখলাম - কোভাক্স তার ধারালো শ্বদন্ত
আর নখের আঁচড়ে প্রফেসরের বুক ছিন্নভিন্ন করে
দিয়েছে। এবার আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল পিশাচটা।
মাটিতে গড়ান দিয়েই পকেট থেকে রূপোর ক্রুশটা বের
করে ফেললাম আমি। হাঁ করে কোভাক্স আমায়
কামড়াতে এলে ক্রুশটা গুঁজে দিলাম তার মুখের ভেতর।
সালফারের গন্ধ ছাপিয়ে নাকে এল মাংস পোড়া উৎকট
গন্ধ। ভয়ঙ্কর একটা চিৎকার করে আমায় ছেড়ে দিল
কোভাক্স। চেষ্টা করল মুখ থেকে ক্রুশটা বের করবার
কিন্তু পারল না। জ্বালা যন্ত্রণায় অস্থির হয়ে ঝাঁপ দিল
জ্বলন্ত সেই খাদের ভেতর। শোনা গেল তার অন্তিম
আর্তনাদ।
তাড়াতাড়ি ভ্যান হেলসিংয়ের কাছে ছুটে গেলাম আমি
আর মিসেস হারকার। ডাক্তার আমি, দেখেই বুঝতে
পারলাম, প্রফেসরকে বাঁচাবার আর কোনও উপায় নেই।
মারা যেতে বসেছেন তিনি।
" চলে যাও, তোমরা!" আমাদের উদ্দেশ্য করে কষ্টেসৃষ্টে
বললেন প্রফেসর, " প্লিজ.....আমার জন্য সময় নষ্ট কোরো
না"।
কথাটা বলার জন্যই যেন বেঁচে ছিলেন তিনি, ঢলে পড়লেন
তারপরেই। মিসেস হারকার হাহাকার করে উঠলেন, "
প্রফেসর! না!"
দাঁতে দাঁত পিষলাম আমি। মিসেস হারকারকে
কোনওমতে দাঁড় করালাম। মাতম করবার সময় নেই এখন,
ভূমিকম্প বেড়ে গেছে কয়েকগুণ। মাতালের মতো টলছে
মাটি, মনে হলো পুরো পাহাড়টাই ধসে পড়তে চলেছে।
কড়া গলায় মিসেস হারকারকে ডাকলাম, " আর দেরী নয়
মিসেস হারকার, চলুন"।
হাত ধরে টান দিলাম তাঁর। দৌড়তে বাধ্য করলাম।
বজ্রপাতের মতো কড়কড় আওয়াজ কানে আসতে আঁতকে
উঠলাম। চেয়ে দেখি, স্কলোম্যান্সের ছাদ আর দেওয়ালে
বড় বড় ফাটল ধরতে শুরু করেছে। পেছনে আগুনের উত্তাপও
বেড়ে গেল কয়েক গুণ। শিখাগুলো যেন ধাওয়া করছে
আমাদের।
হঠাৎ - কোনও দৈববলেই আমাদের সামনের দিকের
দেওয়ালে বিরাট এক ফাটল সৃষ্টি হলো। ওটা পাহাড়ের
বাইরের দিক - ফাটলের অন্যপাশে উঁকি দিল দিনের
আলো। কাজটা ঈশ্বর করলেন, নাকি শয়তানই আমাদের
খেদানোর জন্য করল, জানি না। তবে মনে মনে ভাগ্যকে
ধন্যবাদ দিলাম। খুব শীঘ্রি বেরিয়ে এলাম তুষারে ছাওয়া
পাহাড়ি ঢালে.....উপত্যকার দিকটায়। ঢাল ধরে দ্রুত নীচে
নামতে লাগলাম দুজনে।
আমাদের চোখের সামনে আরও ফাটল দেখা দিল
পাহাড়ের গায়ে, সেখান দিয়ে বেরিয়ে এল জ্বলন্ত
লাভা। উপত্যকার মাঝখানের হ্রদটাও দেখলাম টগবগ
করে ফুটছে, রাশি রাশি বাষ্প উড়ছে ওটার ওপর।
ভূমিকম্পের ঝাঁকিতে হুড়মুড় করে লুটিয়ে পড়ছে একের পর
এক গাছ, এখানে সেখানে বসে যাচ্ছে মাটি। সোজা
কথায়, প্রলয় ঘটে যাচ্ছে উপত্যকার ওপর দিয়ে।
ছুটতে ছুটতে কখন আমরা ওখান থেকে বেরিয়ে এসেছি,
বলতে পারব না। তবে বেশ কিছুদূর যাওয়ার পর....যখন
চারদিক শান্ত হয়ে এল....থামলাম আমরা। হাঁফাতে
হাঁফাতে পেছন ফিরে তাকালাম। ধুলো আর বাষ্পের
বিশাল এক মেঘ ভাসছে বাতাসে। উপত্যকা বা তার
চারদিক ঘিরে থাকা পাহাড়ের কিছুই আর অবশিষ্ট নেই।
অবসান ঘটেছে দুঃস্বপ্নের। কিন্তু তার মূল্য হিসেবে
হারাতে হয়েছে অনেক কিছু। মিসেস হারকার
হারিয়েছেন ভালবাসা.....আর আমি হারিয়েছি প্রফেসর
ভ্যান হেলসিংয়ের মতো এক মহান বন্ধু ও শিক্ষককে।
তার স্মৃতির প্রতি সন্মান জানিয়ে মাথা নোয়ালাম।
উপসংহার : ডাঃ জন সিউয়ার্ডের জবানীতে
পরের বসন্তে হারমানস্টাডে ফিরে গিয়েছিলাম আমি -
আবহাওয়া ভাল হবার পর। যে পথে, যেভাবে
স্কলোম্যান্সে পৌঁছেছিলাম, তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে
অনুসরণ করেছি। ম্যাপ ছিল আমার সঙ্গে,কম্পাস ছিল,
স্মৃতিতে গাঁথা ছিল স্থানীয় সমস্ত দিকনির্দেশ। কিন্তু
বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, জায়গাটা....বা জায়গাটার
ধ্বংসাবশেষ আমি খুঁজে পাইনি।
যেখানটায় উপত্যকা থাকার কথা, সেখানে সবুজ ঘাসে
ঢাকা সমতল এক প্রান্তর দেখেছি আমি। অথচ কয়েক
মাসের মধ্যে অমন প্রান্তর সৃষ্টি হতে পারে না। মরিয়া
হয়ে আশেপাশের সমস্ত এলাকা চষে ফেলেছি আমি,
যতভাবে সম্ভব চেষ্টা চালিয়ে গেছি। ফলাফল?
না পেয়েছি হ্রদ, না পেয়েছি উপত্যকা, না পেয়েছি
পাহাড়ি গুহা। যেন জাদুমন্ত্রবলে অদৃশ্য হয়ে গেছে
স্কলোম্যান্স। হতে পারে শয়তান নিজেই গায়েব করে
দিয়েছে ওটা- যে উদ্দেশ্যে সে ওই স্কলোম্যান্স'টা
তৈরি করেছিল, তা শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হয়েছে। অমন
ব্যর্থ একটা প্রতিষ্ঠান চালু রাখার কোনও মানে হয় না।
পৃথিবীর পক্ষে মঙ্গলই হয়েছে তাতে। প্রার্থনা করি, আর
কোনওদিন যেন ওটা চালু না হয়।
ভ্যান হেলসিংয়ের আত্মার শান্তির জন্য যতটুকু সম্ভব
করেছি আমি। উপত্যকা খুঁজে পাইনি তো কি হয়েছে,
ঘাসে ঢাকা প্রান্তরের মাঝখানে ফুলের গোছা রেখে
প্রার্থনা করেছি তাঁর জন্য। যেখানেই থাকুন তিনি, আশা
করি, পরকালে সুখে আছেন। জীবনভর যে সংগ্রাম তিনি
করেছেন, তা সফল হয়েছে। পৃথিবী মুক্তি পেয়েছে
ড্রাকুলার বিভীষিকা থেকে, হারকার দম্পতির জীবনেও
ফিরে এসেছে সুখ, কুইন্সি আর দশটা বাচ্চার মতোই
সুস্থভাবে বেড়ে উঠছে। আর কোনও দুর্বলতা বা অসুখ
বিসুখ নেই তার।
স্কলোম্যান্সের ঘটনার বেশ কিছুদিন পর আমাকে
একতাড়া কাগজ পড়তে দিয়েছিলেন মিসেস হারকার -
কাউন্টের হাতে বন্দি থাকা অবস্থায় তাঁর লেখা
জার্নাল। দায়িত্ব দিয়েছিলেন কাগজগুলো ড্রাকুলা
সংক্রান্ত নথিতে ঢুকিয়ে রাখতে এবং সেই সঙ্গে ঘটনার
শেষাংশ লিখে রাখতে, কারণ তাঁর পক্ষে নাকি আর
ভয়াল বা দুঃখজনক ঘটনার স্মৃতিচারণ সম্ভব নয়। তাঁর কথা
আমি রেখেছি, লিখেছি ঘটনার শেষাংশ। এখন ফাইলের
উপসংহারও লিখছি।
বলতে দ্বিধা নেই, মিসেস হারকারের জার্নাল পড়ে বেশ
অবাক হয়েছি আমি। কাউন্টের প্রতি যে আবেগ অনুভূতি
তাঁর ফুটে উঠেছিল, সেটা জোনাথন মেনে নিলেন
কিভাবে? এরকম একটা ঘটনার পর ওঁরা সংসারই বা করছেন
কিভাবে? আমার এই প্রশ্ন শুনে হেসেছেন মিসেস
হারকার। বলেছেন, " আমরা কেউই নির্দোষ নই,ডাঃ
সিউয়ার্ড। আমরা দুজনেই তো একই অবস্থার শিকার
হয়েছিলাম। ভুল আমার তরফ থেকেও যেমন হয়েছে, তেমনি
জোনাথনের তরফ থেকেও হয়েছে। কিন্তু ছেলের মুখের
দিকে তাকিয়ে আমরা একে অপরকে ক্ষমা করে দিয়েছি।
পরিবারের চেয়ে বড় তো আর কিছু নেই, তাই না? সবচেয়ে
বড় কথা, কাউন্টের জন্যই তো আজ সম্পূর্ণ সুস্থ হয়েছে
কুইন্সি। এরপরে কি আর কেউ কারোর ওপর রাগ করে
থাকতে পারে?"
" তা অবশ্য ঠিক। কিন্তু তারমানে কি ড্রাকুলাকে ভুলে
গেছেন আপনারা? ওর স্মৃতি কি আপনাদের সুখের মাঝে
কখনো অন্তরায় হয়ে দাঁড়াবে না?"
" না", বললেন মীনা হারকার, " কারণ শেষপর্যন্ত ত্যাগের
মহান আদর্শ স্থাপন করে গেছে সে। নিজে ধ্বংস হয়ে
গিয়ে রক্ষা করেছে আমায় আর কুইন্সিকে। এমন একজনকে
নিয়ে শুধু গর্বই করা যায়, আর কিছু না"।
অনিচ্ছাস্বত্তেও...তাঁর সঙ্গে একমত না হয়ে পারলাম না।
( সমাপ্ত)
●মিজানুর
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now