বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
রিটার্ন অব ড্রাকুলা
কাহিনী : ফ্রেডা ওয়ারিংটন
অনুবাদক : ইসমাইল আরমান
-------------------------------------
পর্ব ৩৯(খ)
ডাঃ জন সিউয়ার্ডের ডায়েরী
দুঃখজনক এই কাহিনীর শেষাংশ লিখতে হচ্ছে আমাকে,
কারণ
মিসেস হারকার সেটা পারছেন না। ভূমিকা না করে
সরাসরি মূল ঘটনায়
চলে যাই।
পর্বতের গভীরে যখন মিসেস হারকার দৌড়ে পালিয়ে
গেলেন, হতভম্ব হয়ে গেলাম আমি আর প্রফেসর ভ্যান
হেলসিং। পরে বেহেরিট আমাদের বলল, গোপন একটা
দরজা
দিয়ে গলে স্কলোম্যান্সের লাইব্রেরীতে ঢুকে
পড়েছেন তিনি, ঠিক যেখানে কাউন্ট ড্রাকুলা ঘাপটি
মেরে
আছে। দুশ্চিন্তায় পড়ে গেলাম কিন্তু বেহেরিট আমাদের
জানাল,
দুশ্চিন্তার কিছু নেই। কাউন্ট মীনার কোনও ক্ষতি করবে
না, এ
ব্যাপারে সে নিশ্চিত। এ পর্যন্ত অনেকবারই সে মীনাকে
হাতের মুঠোয় পেয়েছে কিন্তু তাকে ভ্যাম্পায়ার
বানায়নি। এবারও
তার ব্যতিক্রম হবে না। বরং ব্যাপারটা একদিক থেকে
ভাল হবে।
মীনাকে নিয়ে ব্যস্ত থাকবে কাউন্ট, সেই সুযোগে ওকে
ঘায়েল করার জন্য ছক সাজানোর সময় পাব আমরা।
তবে....সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, লাইব্রেরীর ভেতর
ঢোকা। সব দরজা আটকে রেখেছে কাউন্ট। দরজাগুলো
বাইরে থেকে খুলতে পারব না আমি।
" কুয়াশা হয়ে দরজার ফাঁকফোকর দিয়ে গলে ঢুকতে
পারবে না
তুমি?" জিজ্ঞেস করলেন ভ্যান হেলসিং।
" না", জবাব দিল বেহেরিট,"স্কলোম্যান্স শয়তানের
উপাসনা স্থল।
এখানে ওসব করতে যাওয়া মানে আমাদের প্রভু শয়তানকে
অসন্মান করা হয়। এখানে আমাদের মরণশীল মানুষের
মতোই
থাকতে হয়। তাছাড়া, এইসব দরজা অত্যন্ত মজবুত আর
টেকসই।
গায়ের জোরেও ভাঙা যায় না"।
" যত শক্ত দরজাই হোক, উপযুক্ত যন্ত্রপাতি থাকলে তা
ভাঙা যাবে
না", এ আমি মানতে নারাজ", বললাম আমি, "আর ওসব
মন্ত্র তন্ত্র
তোমাদের ওপর কাজ করতে পারে বেহেরিট কিন্তু
আমাদের
দু'জনের ওপর করবে না"।
" তর্ক কোরো না", বিরক্ত গলায় বলল বেহেরিট, " না
জেনে
কথা বলছি না আমি। হতে পারে তোমরা ঈশ্বরভক্ত
লোক....শয়তানের অনুসারীর নির্দেশ মানতে চাইবে
না।....কিন্তু
একথা তো সত্যি, স্কলোম্যান্স সম্পর্কে আমার চেয়ে
বেশী আর কেউ জানে না। কাজেই দ্বিধাদ্বন্দ্ব চাপা
দিয়ে
আমার কথামতো কাজ করো। যদি ভালয় ভালয় শেষ
হয়....মানে
সফল হয় ড্রাকুলার বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান, তাহলে
মীনাকে
নিয়ে নির্ভাবনায় চলে যেতে পারবে তোমরা এখান
থেকে।
আমি বাধা দেব না, কথা দিচ্ছি"।
ওই মূহুর্তে মাথাই কাজ করছিল না আমার বা প্রফেসরের,
তাই
পিশাচটার প্রস্তাবে রাজি হয়ে গিয়েছিলাম। মস্ত ভুল
করেছিলাম
আসলে....সে কথায় পরে আসছি। যা হোক, সন্ধি হবার পর
কোভাক্সের মাধ্যমে আমাদের স্কলোম্যান্সের ভিলায়
পাঠিয়ে দিল বেহেরিট। সেখানকার একটা কামরায়
বিশ্রাম নিলাম আমরা,
খাওয়াদাওয়া করলাম। এরপর একতাড়া কাগজ নিয়ে
হাজির হলো
বেহেরিট....লাইব্রেরীর নকশা ওগুলো। নকশা নিয়ে
আলোচনায় বসলাম তিনজনে, বোঝার চেষ্টা
করলাম....দরজা ছাড়া
লাইব্রেরীর ওই অংশটায় ঢোকার বিকল্প কোনও পথ আছে
কি
না। খুব শীঘ্রি টের পেলাম, নেই।
লাইব্রেরীর যে অংশে আশ্রয় নিয়েছে কাউন্ট, সেটার
দুটো দরজা - একটা পার্বত্য খাদের দিকটায়....গোপন
দরজা।
অন্যটা লাইব্রেরীর মূল অংশে। এছাড়া ওখানে ঢোকার
আর
কোনও রাস্তা নেই। বাতাস চলাচলের জন্য কামরার
ছাদের কাছে
একটা এয়ার-ভেন্ট আছে, তবে ওটা এত ছোট যে, মানুষ তো
দূরের কথা, একটা কুকুরও ঢুকতে পারবে না। টানেল খুঁড়ে,
মেঝে ফুটো করে ওখানে ঢুকব - তাও সম্ভব নয়। নিরেট
পাথুরে জমিনের ওপর তৈরি করা হয়েছে লাইব্রেরীটা।
ওটার
মেঝেও কংক্রিট আর মার্বেল পাথরে গড়া।
" নাহ, দরজা ভাঙা ছাড়া আর কোনও উপায় দেখছি না,
এক পর্যায়ে
হতাশ গলায় বললেন ভ্যান হেলসিং।
" বললাম তো সেটা সম্ভব নয়", বেহেরিট বলল, " তন্ত্র
মন্ত্রের ভয় যদি না-ও করো, পুরু ঐ দরজা ভাঙার মতো
যন্ত্রপাতি
নেই এখানে"।
" তাহলে সুযোগের প্রতীক্ষায় থাকতে হবে আমাদেরকে",
বললেন ভ্যান হেলসিং, " মীনা এখনও মানুষ.... আর একজন
মানুষের পক্ষে অনন্তকাল একটা বদ্ধ কামরায় বসে থাকা
সম্ভব নয়।
একসময় ওকে ঠিকই বেরিয়ে আসতে হবে ....তাজা
বাতাসের
জন্য, কিংবা প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে। ওই সুযোগটাই
কাজে লাগাব
আমরা"।
হাসি ফুটল বেহেরিটের ঠোঁটে। বলল, " তুমি সত্যিই
বুদ্ধিমান,
প্রফেসর। এখন বুঝতে পারছি, কেন গতবার ড্রাকুলা
তোমাদের
হাতে পরাস্ত হয়েছিল। চমৎকার প্ল্যান এঁটেছ। দরজা
খোলামাত্র
মীনাকে আটকে ফেলব আমরা, নিয়ে আসব বাইরে। ওকে
উদ্ধারের জন্য কাউন্টকেও বের হয়ে আসতে হবে"।
" মীনার যেন কোনও ক্ষতি না হয়", বললেন প্রফেসর।
" কিন্তু কখন উনি বেরোবেন, তার কোনও ঠিক আছে?"
বলে
উঠলাম আমি, " মিসেস হারকারের মতো আমরাও তো
মানুষ।
কতক্ষণ অপেক্ষা করব আমরা?"
" হুমমম...ব্যাপারটা ভেবে দেখার মতো ", স্বীকার করল
বেহেরিট। কি যেন ভাবল। তারপর বলল, " একটা কাজ করা
যেতে
পারে। ভোরের দিকে বিশ্রাম নেবে কাউন্ট, সেসময়
মীনার
ওপর মায়ার জাল বিছোতে পারি আমি....যাতে চোখে
ভুল
দেখে ও, কানে ভুল শোনে। ওকে যদি অস্থির করে তুলতে
পারি, নিশ্চয়ই দরজা খুলে বেরিয়ে আসবে ও"।
" মন্ত্রপূত লাইব্রেরীর ভেতর তোমার মায়ার জাল
পৌঁছবে কি
করে?"
" বায়ু চলাচলের ওই ফোকর দিয়ে", বলল বেহেরিট, " দেখা
যাচ্ছে কাজে লাগছে ওটা"।
দ্রুত পরিকল্পনা সাজিয়ে নেওয়া হলো। সেই মোতাবেক
লাইব্রেরীর মূল অংশের দরজার সামনে অবস্থান নিলাম
আমি আর
কোভাক্স। ভ্যান হেলসিং আর বেহেরিট চলে গেল গোপন
দরজার ওপাশে। শুরু হলো প্রতীক্ষার পালা।
ঘন্টার পর ঘন্টা কেটে গেল, কিন্তু কিছুই ঘটল না।
সময়জ্ঞান
হারিয়ে ফেললাম আমি, এক পর্যায়ে অবসাদে বসে
পড়লাম
মেঝেতে। ঢুলতে শুরু করলাম তন্দ্রায়। হঠাৎ কাঁধে ঝাঁকুনি
খেয়ে সচেতন হয়ে উঠলাম। কোভাক্স জানালেন, ভোর
হয়ে গেছে। তারমানে, মায়ার জাল বিছোতে শুরু করেছে
বেহেরিট। তাতে কতখানি কাজ হয়, তা শীঘ্রি প্রমাণ
হয়ে যাবে।
হঠাৎ মৃদু পায়ের আওয়াজ শুনলাম - দরজার ওপাশ থেকে
আসছে।
কয়েক মূহুর্ত পরেই ফাঁক হতে লাগল পাল্লাটা। বিদ্যুৎ
খেলে
গেল আমার শরীরে। একটা শাবল নিয়ে এসেছিলাম, ছুটে
গিয়ে
সেটার মাথা ঢুকিয়ে দিলাম পাল্লা আর চৌকাঠের
মাঝখানে। এক
পলকের জন্য চোখে পড়ল মিসেস হারকারের ভয়ার্ত
চেহারা।
আমাকে আর কোভাক্সকে দেখেই দরজা আবার বন্ধ করে
দিতে চাইলেন তিনি, শাবলটার জন্য পারলেন না। কয়েক
দফা
ধাক্কাধাক্কি করে হাল ছেড়ে দিলেন, ছুট লাগালেন
উলটো
ঘুরে।
লাথি মেরে দরজাটা হাঁ করে খুলে ফেললাম। " জলদি
চলুন!"
চেঁচিয়ে উঠলাম কোভাক্সকে লক্ষ্য করে।
মিসেস হারকারের পিছু নিলাম দুজনে। দৌড়ে ঢুকলাম
বিশাল একটা
হলঘরে, ওটার চারদিক বইয়ের আলমারিতে ঠাসা। মিসেস
হারকারের
খোঁজে নজর বোলাতেই এক কোণে শুয়ে থাকা ঘুমন্ত
কাউন্টকে দেখতে পেলাম। আমাদের উপস্থিতি টের
পেয়েই বোধহয় নড়তে শুরু করেছে সে। হঠাৎ খুলে
গেল তার রক্তলাল চোখদুটো।
" এদিকে!" ডেকে উঠলেন কোভাক্স।
ছোট আরেকটা দরজা পেরিয়ে দুজনে পৌঁছে গেলাম
ছোট্ট
একটা অ্যান্টিচেম্বারে। দেয়ালের একটা অংশ ফাঁকা
হয়ে আছে -
গোপন দরজা। ওখান দিয়ে বেরিয়ে গেছেন মিসেস
হারকার।
আমরাও বেরোলাম। পেছনে শোনা গেল কাউন্টের
ভয়ঙ্কর
হুঙ্কার। ছোটার গতি বাড়িয়ে দিলেন কোভাক্স, আমি
পড়ে
গেলাম পেছনে। এগিয়ে আসা পায়ের আওয়াজ শুনতে
পেলাম,
তারপরেই আমার ঘাড় চেপে ধরল কে যেন, খড়ের একটা
পুতুলের মতো আমাকে ছুঁড়ে ফেলল একপাশে।
উড়ে গিয়ে পাহাড়ি দেওয়ালে আছড়ে পড়লাম, সেখান
থেকে
তালগোল পাকিয়ে পড়ে গেলাম মাটিতে। ককিয়ে
উঠলাম প্রচণ্ড
ব্যথায়। কোনওমতে সোজা হয়ে বসতেই দেখলাম
কাউন্টের
হিংস্র অবয়ব। দু'হাতে কলার চেপে ধরে আমায় দাঁড় করাল
সে, হাঁ
করে কামড় বসাতে গেল আমার ঘাড়ে। মৃত্যুভয়ে চোখ বন্ধ
করে ফেললাম। আর তখুনি শোনা গেল বেহেরিটের
উদাত্ত
ডাক।
" ড্রাকুলা...আ....আ!"
থমকে গেল কাউন্ট। ঘাড় ফিরিয়ে শব্দের উৎসের দিকে
তাকাল।
তারপর আমাকে ছেড়ে দিয়ে এগিয়ে গেল ওদিকে। কয়েক
মূহুর্ত পরে কানের কাছে শুনলাম উদ্বিগ্ন কণ্ঠস্বর, " জন,
তোমার কিছু হয়নি তো?"
চোখ খুলতেই প্রফেসর ভ্যান হেলসিংকে দেখলাম। কপাল
কেটে গেছে তাঁর, ঝুঁকে আছেন আমার ওপর।
" আমি ঠিক আছি, প্রফেসর ", জানালাম তাঁকে।
আমাকে উঠে দাঁড়াতে সাহায্য করলেন হেলসিং।
জিজ্ঞেস
করলাম, " আপনি একা কেন? মিসেস হারকার কোথায়?"
" বেহেরিট বেইমানি করেছে আমাদের সাথে", তিক্ত
গলায়
বললেন ভ্যান হেলসিং, " মীনার কোনও ক্ষতি করবে না
বলেছিল, অথচ আমার কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে গেছে
ওকে। জলদি চলো, ওকে থামাতে হবে"।
খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে কিছুদূর যেতেই খোলা চাতালটায়
বেরিয়ে এলাম।
থমকে গেলাম সঙ্গে সঙ্গে। বেহেরিটের বেইমানির স্বরূপ
দেখতে পাচ্ছি এবার।
খাদের একেবারে কিনারে দাঁড়িয়ে আছে পিশাচটা,
ওখানটায়
রেলিঙ নেই। একটা হাত তুলে থামবার নির্দেশ দিচ্ছে
ড্রাকুলাকে। তার অন্য হাতের ওপর পিঠ বাঁকিয়ে
পক্ষাঘাতগ্রস্ত
রোগীর মতো পড়ে আছেন মিসেস হারকার, খাদের গভীর
থেকে উঠে আসা আগুনের আভায় চকচক করছে তাঁর সারা
দেহ। সম্মোহিত হয়ে আছেন না আতঙ্কে অসাড় হয়ে
আছেন - বোঝা যাচ্ছে না। তবে এ মূহুর্তে তিনি সম্পূর্ণ
অসহায়।
কোভাক্সকে আশেপাশে কোথাও দেখা যাচ্ছে না।
" খবরদার কাউন্ট! " এগোতে থাকা কাউন্টের উদ্দেশ্যে
চেঁচিয়ে বলল বেহেরিট। " আর এক পা-ও এগোলে মীনার
টুঁটি ছিঁড়ে ফেলে দেব। পিছাও....পিছাও বলছি"।
থেমে গেল কাউন্ট। সত্যি সত্যিই পিছিয়ে গেল কয়েক
পা।
বিস্মিত হলাম আমি। কাউন্টকে কখনো কারোর আদেশ
মানার পাত্র
নয় বলেই জানতাম।
চড়া গলায় এবার মন্ত্র পড়তে শুরু করল বেহেরিট -
হাঙ্গেরিয়ান
ভাষায়। সঙ্গে সঙ্গে একইসঙ্গে আতঙ্ক আর উদ্বেগ ফুটল
ড্রাকুলার চেহারায়। চিৎকার করে উঠল, " না! থামো!
থামো বলছি!"
থামল না বেহেরিট। পড়ে চলল মন্ত্র। গালিগালাজ করে
তাঁকে
দমাবার চেষ্টা করল কাউন্ট, কিন্তু লাভ হলো না।
গালিগালাজ ছাপিয়ে
আরও চড়া হলো বেহেরিটের কন্ঠ। গমগম করতে থাকল
পুরো গুহা। কথাগুলোর অর্থ বুঝতে পারছিলাম না কিন্তু
বেহেরিটের সাপ খেলানোর সুরে অশুভ গলায় মন্ত্রপাঠ
আমাদের গায়ের সমস্ত লোম খাড়া করে দিল।
হঠাৎ নীচের পানিতে আলোড়ন লক্ষ্য করে সেদিকে
তাকালাম আমরা।অবিশ্বাস্য ব্যাপার - পুরো হ্রদের
পানির বুকে
আগুনের শিখা নাচছে। পানির তলায় হঠাৎ একটা কালো
রঙের
গোলক উদয় হলো - ধীরেধীরে বড় হতে লাগল ওটা,
ধাঁধিয়ে দিল চোখ। এবার টগবগ করে ফুটতে লাগল পানি।
উন্মত্ত
পানির মাঝ দিয়ে উঠে আসা আলোর আভা নাচতে লাগল
গুহার
ছাদে, সৃষ্টি করল মোহনীয় এক রঙের খেলা। তবে খানিক
পরেই বীভৎস লাগল সেই রঙ। ততক্ষণে গুহার বাতাস ভরে
গেছে সালফারের বিশ্রী দুর্গন্ধে। হ্রদটা পরিণত হয়েছে
আগুনের এক সমুদ্রে!
কি ঘটছে বুঝতে অসুবিধা হল না....হ্রদের পানির তলায়
ঘুমিয়ে থাকা
ড্রাগনের কাহিনীটা তাহলে গুজব নয়! ওটাকেই মন্ত্র পড়ে
জাগিয়ে তুলেছে বেহেরিট, নরকের দরজা খুলে দিচ্ছে!
দুনিয়া
কাঁপছে সেই ড্রাগনের নড়াচড়ায়, ভূমিকম্প হচ্ছে
আমাদের
পায়ের তলায়। ছাদ থেকেও আলগা কয়েকটা পাথর খসে
পড়ল।
কাউন্টের চেহারাতেও অসহায়ত্ব প্রকট হয়ে উঠল। কিচ্ছু
করার
নেই তার....বেহেরিটের হাতে আটকা পড়েছেন মিসেস
হারকার! তাঁর ক্ষতি না করে প্রতিপক্ষকে ঠেকাতে
পারবে না সে।
এই প্রথমবার বুঝলাম, বেহেরিট কাউন্ট ড্রাকুলার চেয়েও
নিকৃষ্টতম এক পিশাচ! মীনা'র কথায় কান না দিয়ে ভুল
করেছি আমরা।
আমাদের কাছ থেকে পালিয়ে যাওয়ার জন্য মিসেস
হারকারকে
আর দোষ দিতে পারছি না।
মন্ত্র পড়া শেষ হলো বেহেরিটের। বিজয়ীর ভঙ্গিতে
হেসে সে বলল, " শুভক্ষণ সমাগত! "
পরক্ষণে খাদের গভীর থেকে উঠে এল একটা লকলকে
আগুনের শিখা। চাতাল ছাড়িয়ে ছাদ স্পর্শ করল সেই
শিখা।
শরীরের উন্মুক্ত অংশে পুড়ে যাবার মতো জ্বলুনি অনুভব
করলাম আমি আর প্রফেসর। দুজনে পিছিয়ে গেলাম কয়েক
পা।
তার আগেই দেখতে পেলাম, খাদটা জ্বলন্ত অঙ্গারে ভরা
একটা
গর্তের রূপ নিয়েছে।
গুহার ভেতরে এখন আর অন্ধকারের অস্তিত্ব নেই।
কোভাক্সকে দেখতে পেলাম - পাহাড়ি প্রাচীরের ভেতর
একটা খোপের ভেতর দাঁড়িয়ে আছেন তিনি, দু'হাতে ধরে
রেখেছেন বিশাল একটা লোহার চাকার হাতল। বুঝলাম,
ওটা
ঘুরিয়েই নরকের দ্বার উন্মুক্ত করা হয়েছে। আমাদের
দিকে
তাকিয়ে পৈশাচিক একটা হাসি হাসলেন তিনি।
আগুনের শিখার পটভূমিতে নরকের দূতের মতো দাঁড়িয়ে
আছে বেহেরিট, হাতের ভাঁজে মিসেস হারকারের প্রায় -
অচেতন দেহ। পাগলের মতো হেসে উঠে বলল
বেহেরিট, " দেখো সবাই, এ হলো নরকের দরজা! ওখানেই
বাস করেন আমাদের প্রভু....স্বয়ং শয়তান! কাউন্ট, তুমি কি
জানো,
একবার যদি এই দরজা খোলা হয়, প্রভুকে নৈবেদ্য উৎসর্গ
না করা
পর্যন্ত তা বন্ধ করা যায় না? আর নৈবেদ্য বলতে কি
বোঝাচ্ছি, তা
নিশ্চয়ই বুঝতে পারছ"?
রাগে ফুঁসতে লাগল কাউন্ট ড্রাকুলা। বলল, " মীনাকে
ছেড়ে
দাও, বেহেরিট! ওদের সবাইকেই ছেড়ে দাও। তোমার
শত্রুতা
তো শুধু আমার সঙ্গে"।
" তা ঠিক", মাথা ঝাঁকিয়ে বলল বেহেরিট, " কিন্তু যতক্ষণ
পর্যন্ত না
তোমার সঙ্গে বোঝাপড়া সম্পূর্ণ হচ্ছে, ওদেরকে ছেড়ে
দিই কি করে? তুমি তো কথা রাখার লোক নও। আমার
দুর্ভাগ্য
জীবনের পেছনে রয়েছে তোমারই বিশ্বাসঘাতকতা।
কাজেই কথা বাড়িয়ো না! শয়তানের পাওনা মিটিয়ে
দাও এক্ষুণি!"
" তুমি আমাকে আদেশ করবার কে?" হিসিয়ে উঠে বলল
কাউন্ট, "
খোদ শয়তান যেখানে আমাকে বশ মানাতে পারেনি, তা
তুমি কি
করে পারবে?"
" অনেক কিছুই", হাসল বেহেরিট, " কারণ মীনা আমার
হাতে
বন্দি....আর ওকে তুমি ভালবাসো!"
" ভুল!" শান্ত গলায় বলল কাউন্ট, " ওর প্রতি আমার কোনও
টান
নেই....কয়েকদিন শুধু ব্যবহার করেছি ওকে....ব্যস, এর বেশী
আর কিছু না!"
" মিথ্যেবাদী! " বাঁকা সুরে বিদ্রুপ করল বেহেরিট, " যদি
ওকে না-
ই ভালবাসো, তা হলে আশা করি এতে তোমার কোনও
আপত্তি
থাকবে না"। কথাটা বলেই সে মীনাকে সেই অগ্নিময়
খাদের
ওপর ঝুলিয়ে ধরল।
এতক্ষণে যেন সচেতন হয়ে উঠলেন মিসেস হারকার।
আগুনের ধোঁয়ায় কাশতে লাগলেন খকখক করে, হাত পা
ছুঁড়তে লাগলেন মুক্তি পাবার জন্য। তারপর নীচের দিকে
তাকাতেই আর্তনাদ করে উঠলেন।
" থামো বেহেরিট!" গর্জে উঠল কাউন্ট।
হিংস্র দৃষ্টিতে তার দিকে তাকাল বেহেরিট। চিৎকার
করে বলল, "
হয় তুমি আগুনে ঝাঁপ দাও কাউন্ট.... আত্মসমর্পণ করো
আমাদের
প্রভুর কাছে....তা না হলে মীনা'কেই আমি পাঠিয়ে দেব
তাঁর কাছে!"
ক্রুদ্ধ ভঙ্গিতে তার দিকে এগোল কাউন্ট। " সাবধান! "
বলল বেহেরিট, " আমাকে ধাক্কা দিলে মীনাও পড়ে
যাবে। বোকামি কোরো না। অযথা সময় নষ্ট করেও লাভ
নেই
কোনও। আর কোনও বিকল্প নেই তোমার কাছে। বেঁচে
থেকেই বা কি করেছ? মীনাকে তো পাচ্ছ না! অলৌকিক
কোনও উপায়ে ও যদি বেঁচেও যায়, কোনওদিন তোমায় বরণ
করে নেবে না। কাজেই এই পৃথিবী তোমার জন্য অর্থহীন।
প্রভুর চরণে বিলিয়ে দাও নিজেকে, তাতেই মঙ্গল হবে
সবার"।
নিষ্ফল আক্রোশে হাত মুঠো করল কাউন্ট। বলল, " আমি
আগুনে ঝাঁপ দিলেই যে তুমি মীনাকে ছেড়ে দেবে, তার
কি
নিশ্চয়তা? "
" আমার প্রতিশ্রুতি.... ব্যস। এই তো, ওর বন্ধুরা এখানেই
আছে।
ওদের হাতেই তুলে দেব মীনাকে, খামোখা ওকে খুন করে
তো কোনও লাভ নেই আমার! কথাটা তোমায় বিশ্বাস
করতে
হবে! কারণ বিশ্বাস না করলে ও মরবে"। মিসেস
হারকারের দিকে তাকাল কাউন্ট। দৃষ্টিতে বাসা বাঁধল
বিষাদ।
মিসেস হারকার সভয়ে মাথা নেড়ে বললেন, " না, কাউন্ট,
না! আমায়
বাঁচাবার জন্য তুমি এমন কাজ করতে যেয়ো না!" "
তোমাকে করতেই হবে, কাউন্ট! " গলা চড়িয়ে বললেন
ভ্যান
হেলসিং, " পাপের প্রায়শ্চিত্ত করবার এই একটাই সুযোগ
এখন
তোমার সামনে"।
ঝট করে তাঁর দিকে তাকাল কাউন্ট। আঙুল তুলে বলল, "
তোমারই
জন্য আমি আজ ধ্বংস হচ্ছি, ভ্যান হেলসিং! কিন্তু জেনে
রাখো,
তুমিও পার পাবে না। ধ্বংস হয়ে যাবে তুমি"। খাদের ওপর
মিসেস হারকারকে ঝাঁকি দিল বেহেরিট। বলল, " আর
দেরী নয়, কাউন্ট। হয় তোমার জীবন...নয়তো মীনার!"
দীর্ঘশ্বাস ফেলল কাউন্ট। আমাদের দিকে তাকিয়ে
বলল," ভ্যান
হেলসিং, ডাঃ সিউয়ার্ড....তোমাদের ওপর মীনার ভার
দিয়ে যাচ্ছি।
প্রাণ দিয়েও রক্ষা করবে ওকে। বেহেরিট যেন ওর কথার
খেলাপ না করতে পারে। যদি তাতে ব্যর্থ হও.....শয়তানের
কসম.....নরকও আমায় আটকে রাখতে পারবে না, প্রতিশোধ
নেবার জন্য আবার ফিরে আসব আমি"। কথা শেষ করে
মীনার দিকে তাকাল সে। আর্দ্র চোখে তাকাল। বলল, "
মীনা, সত্যিকার অর্থেই আমি তোমায় ভালবেসেছিলাম।
কিন্তু সেই তুমি আমায় প্রত্যাখ্যান করেছ। আজ
আমি প্রমাণ করে দেব, কতখানি নিখাদ ছিল আমার
ভালবাসা। ভাল
থেকো, মীনা, সুখে থেকো। বিদায়"। বলেই এক ছুটে
চাতালের ধারে চলে গেল কাউন্ট, লাফ দিল
খাদের মাঝে। লেলিহান শিখার মাঝে হারিয়ে গেল
দেহটা।
" না...আ!" চিৎকার করে উঠলেন মিসেস হারকার। তাঁর
চিৎকারের সঙ্গে তাল মিলিয়েই লক লক করে উঠল
আগুনের শিখা। মনে হলো, কাউন্টকে বরণ করে নিচ্ছে
নরক।
উন্মাদের মতো হয়ে উঠল বেহেরিট। মিসেস হারকারকে
চাতালের ওপর ছুঁড়ে ফেলে আগুনের দিকে ফিরল, দু'হাত
তুলল
আকাশের দিকে।
" মুক্ত....আমি মুক্ত!" উন্মাদের মতো হাসতে হাসতে বলল
সে।
ক্রমশ
অশুভ আত্মা
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now