বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
রিটার্ন অব ড্রাকুলা
কাহিনী : ফ্রেডা ওয়ারিংটন
অনুবাদক : ইসমাইল আরমান
-------------------------------------
পর্ব ৩৯(ক)
( মীনা হারকারের জার্নাল) দ্রুত আলাপ সেরে নিলাম আমরা
নিজেদের মধ্যে। নিজের অভিজ্ঞতা খুলে বললাম আমি। তারপর
ডাঃ সিউয়ার্ড জানালেন, " অন্ধকারে আপনাকে হারিয়ে
ফেলেছিলাম আমরা। শেষ পর্যন্ত যখন লন্ঠনটা জ্বালতে
পারলাম, তখন দেখি আপনিও নেই, কোভাক্স'ও গায়েব হয়ে
গেছেন। বুঝলাম, আমাদের সঙ্গে বেইমানি করেছেন উনি।
আপনাকে তুলে দিয়েছেন এখানকার পিশাচের হাতে। আপনাদের
খোঁজে এগোতে এগোতে দশভুজ আকৃতির চেম্বারটায়
পৌঁছই আমরা। আটকা পড়ি ওখানে। সে এক ভয়াবহ
অভিজ্ঞতা....কোভাক্সের ছাত্র মিকোলাসের পচা গলা মুন্ডুকাটা
লাশটা এখনও পড়ে আছে ওখানে। বীভৎস দৃশ্য! অনেকটা সময়
বন্দি হয়ে ছিলাম আমরা ওখানে। শেষ পর্যন্ত ভ্যান হেলসিং
মেঝের তলায় একটা গোপন লিভার খুঁজে বের করলেন। সেটা
চালু করতেই চেম্বার থেকে বেরোনোর একটা দরজা খুলে
গেল। পর্বতের গভীরে চলে এলাম আমরা। পথে দেখা
হলো কোভাক্সের সঙ্গে। ওঁকে অনেকটা জিম্মি করেই
আমরা আপনার খোঁজে বের হয়েছিলাম"। কৃতজ্ঞতা অনুভব
করলাম দুঃসাহসী মানুষটার জন্য। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আমায়
উদ্ধার করতে এসেছেন। বললাম, " নিশ্চয়ই আপনারা খুব ক্লান্ত।
আমি তো আর কিছু না হোক খাবার আর বিশ্রাম পেয়েছি "। মাছি
তাড়ানোর ভঙ্গিতে হাত নাড়লেন ভ্যান হেলসিং, যেন খাবার বা
বিশ্রাম মোটেই গুরুত্বপূর্ণ নয়। তাঁর ভেতরের বৈজ্ঞানিক স্বত্তা
জেগে উঠেছে, মুগ্ধ চোখে তাকাচ্ছেন চারদিকে।
বললেন, " জায়গা বটে একটা! শয়তান বা যে-ই বানিয়ে থাকুক, তার
ইঞ্জিনীয়ারিং বিদ্যার প্রশংসা না করে পারছি না। পর্বতের গভীরে
এ ধরনের স্থাপনা তৈরি করা চাট্টিখানি কথা নয়। মাথার ওপর যে ছাদ
ধসে পড়ছে না, এটাই তো আশ্চর্য! ইশশ! অন্য কোনও
পরিস্থিতিতে যদি আসা যেত এখানে, বড্ড ভাল হতো। বোঝা
যেত কিভাবে এই অসাধ্য সাধন করা হয়েছে। " এ ধরনের
নির্মাণশৈলীর জ্ঞান শুধু শয়তান দিতে পারেন", অন্ধকার থেকে
ভেসে এল বেহেরিটের গলা, " তুমি সেই জ্ঞান চাইছ?"
চমকে উঠে সেদিকে তাকালাম আমরা। পিশাচটা তা হলে যায়নি! ঘাপটি
মেরে আছে অন্ধকারে। ভ্যান হেলসিং তার প্রশ্নের জবাবে
কিছু একটা বলতে গিয়েও থেমে গেলেন। বোধহয় জবাবটা
নিজেরই পছন্দ হচ্ছে না। " আমার দিকটা আশা করি এবার তুমি বুঝতে
পারছ, বন্ধু?" পেছন থেকে বললেন এবার কোভাক্স, " কিসের
লোভে আমি যোগ দিয়েছি বেহেরিটের সঙ্গে? তুমি শুধু
এখানকার স্থাপত্য দেখে অবাক হচ্ছ..... কিন্তু স্কলোম্যান্সের
লাইব্রেরীতে এর চেয়েও হাজার গুণ বিস্ময় লুকিয়ে আছে।
বলছ বেইমানি করেছি আমি....কিন্তু অমন জ্ঞানের ভান্ডারের
জন্য তুমিও কি তা করতে না?"
অন্ধকার থেকে বেরিয়ে এল বেহেরিট। বলল," আমিও একই
প্রশ্ন করতে চাই....কিন্তু করব না। " ডাঃ সিউয়ার্ডকে আবারও ক্রুশ
বাগিয়ে ধরতে দেখে বলল, " দয়া করে ওটা নামাও। আমি
তোমাদের শত্রু নই। তোমরা যা চাও, আমিও তাই চাই....কাউন্ট
ড্রাকুলার বিনাশ। কাজেই নিজেদের মধ্যে হানাহানি না করে সন্ধি
করি না কেন? একে অপরকে সাহায্য করতে পারব
সেক্ষেত্রে। তাছাড়া..... সাহায্যের বিনিময়ে লাইব্রেরীতেও
যত খুশী সময় কাটাতে দেব তোমাদের। না, তবে তার জন্য
জীবন্মৃত হতে হবে না তোমাদের"। চোখাচোখি করলেন
প্রফেসর ভ্যান হেলসিং আর ডাঃ সিউয়ার্ড। তাঁদের মনের কথা
পড়তে অন্তর্যামী হবার দরকার নেই। চেঁচিয়ে বললাম, " না,
প্রফেসর! ওর কথায় কান দেবেন না। মিথ্যে লোভ দেখাচ্ছে
ও। কাউন্ট ড্রাকুলাকে ধ্বংস করার জন্য ওর পক্ষ নিলে স্রেফ
নিজের পায়ে কুড়াল মারবেন। বুঝতে পারছেন না আপনারা,
বেহেরিট কাউন্টের চেয়েও জঘন্যতম এক পিশাচ?"
" কিন্তু মীনা", আমার দিকে ঘাড় ফিরিয়ে বললেন ভ্যান হেলসিং, "
কুইন্সিকে উদ্ধারের জন্য....আর ড্রাকুলাকে ধ্বংস করার জন্য এর
তো কোনও বিকল্প নেই। দু'জন পিশাচের চাইতে একজনের
বিরুদ্ধে লড়াই করাই কি ভাল নয়?"
প্রফেসরের দৃষ্টি থেকেই বুঝলাম, বেহেরিটের
প্রলোভনে আটকা পড়েছেন তিনি - ঠিক কোভাক্সের
মতো। ডাঃ সিউয়ার্ডকেও দেখলাম মাথা নাড়ছেন তাঁর কথায় সায়
দিয়ে। এসব দেখে আমার ধৈর্যের সমস্ত বাঁধ ভেঙে গেল।
আর কাহাতক সহ্য করা যায়। ওঁদের সাথে তর্ক করে আর ওঁদের
মত ফেরানোর মতো মানসিকতা আমার রইল না। বরং ভর করে বসল
একটা পাগলামি - এখুনি, এখুনি বেহেরিট আর সঙ্গীদের থেকে
আমায় দূরে পালিয়ে যেতে হবে। উলটো ঘুরে তাই প্রাণপণ
দৌড়তে শুরু করলাম আমি। পিছন থেকে ডাক শুনলাম ভ্যান
হেলসিংয়ের কিন্তু তাতে আর কান দিলাম না। রেলিঙটাকে ডান দিকে
রেখে আমি ছুটতে লাগলাম অন্ধকারে। কিছুক্ষণ পর টের
পেলাম, অন্ধগলির মতো একটা ফাটলে ঢুকে পড়েছি আমি। যে
পথে এসেছি, সেটা ছাড়া আর কোনও পথ নেই বেরোবার।
কেঁদে ফেললাম হতাশায়, অন্ধকারে দেওয়াল হাতড়াতে শুরু
করলাম- যদি আরেকটা রাস্তা খুঁজে পাওয়া যায়। অবিশ্বাস্য হলেও
তাই-ই ঘটল। হঠাৎ ফাঁকা হয়ে গেল দেওয়ালের একটা অংশ, সেখান
দিয়ে বেরিয়ে এল এক চিলতে আলো, তীব্র সেই
আলোয় চোখ ধাঁধিয়ে গেল আমার। শুনতে পেলাম ফিসফিসানির
মতো একটা ডাক, " মীনা!"
পরক্ষণেই আমার হাত চেপে ধরল কে যেন, এক টানে নিয়ে
গেল দেওয়ালের ফাঁকের ভেতর। গুড়গুড় করে একটা শব্দ
শুনলাম। আমি ঢুকে যেতেই আবার বন্ধ হয়ে গেল
দেওয়ালের ফাঁকটা। বুঝলাম ওটা আসলে একটা গোপন দরজা।
চোখ পিটপিট করে উজ্জ্বল আলোর সঙ্গে মানিয়ে নিলাম
দৃষ্টি। দেখলাম, গোপন দরজাটার এপাশে রয়েছে বিশাল একটা
বুকশেলফ। তার সামনে ঋজু ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকা মূর্তিটা আর
কেউ নয় - কাউন্ট ড্রাকুলা! দু-এক থোকা বাদে মাথার চুল ধবধবে
সাদা হয়ে গেছে ওর, মুখের চামড়াতেও পড়েছে বয়সের
ছাপ। তারপরেও অদ্ভুত এক জৌলুস খেলা করছে চেহারায়। দৃষ্টি
আগের মতোই গভীর, শীতল। ঠোঁটের ফাঁকে উঁকি দিচ্ছে
শ্বদন্ত দুটো। এতদিন এই চেহারাকে ভয় পেয়েছি, কিন্তু
আজ....এই প্রথমবারের মতো.... তাকে দেখতে পেয়ে
স্বস্তি অনুভব করলাম।
" কেমন আছো, মীনা?" মৃদু হেসে জানতে চাইল সে। "
ভা....ভাল", বললাম আমি, " কিন্তু তোমার সামনে বড্ড বিপদ, কাউন্ট।
বেহেরিট....."
" ওকে নিয়ে ভেবো না", বলল কাউন্ট, " বেহেরিট এখানে
ঢুকতে পারবে না - সব দরজা বন্ধ করে রেখেছি আমি, আর
সেই দরজা খোলা সম্ভব নয় ওর পক্ষে। ও তোমার কোনও
ক্ষতি করেনি তো?"
" না", আমি বললাম, " শুধু তোমার ব্যাপারে নানারকম প্রশ্ন
করেছে। আমি তার জবাব দিইনি। এসব আমি আর সহ্য করতে পারছি
না, কাউন্ট। আমি আমার ছেলেকে ফেরত চাই....ফিরতে চাই
বাড়িতে"। " সব হবে", আশ্বাস দিল কাউন্ট, " আগে একটু জিরিয়ে
নাও, আমিও তোমাকে দেখি। গত কয়েকদিন তোমায় না
দেখতে পেয়ে আমার একদম ভাল্লাগছিল না"। হলঘরের মতো
বড় একটা কামরায় আমাকে নিয়ে গেল ড্রাকুলা। সেটার চারদিক
বইয়ের আলমারিতে ঠাসা। মেঝেটা সাদা আর কালো রঙের
মার্বেল পাথরে মোড়া। জানলা নেই কোনও, ভেতরটা
আলোকিত করা হয়েছে মোমবাতি আর প্রদীপ জ্বেলে।
বুঝলাম, যে লাইব্রেরীর লোভে বেহেরিটের কাছে
আত্মসমর্পণ করেছিলেন প্রফেসর কোভাক্স....যে
লাইব্রেরীতে চোখ বোলানোর আশঙ্কায় বিভ্রান্ত হয়ে
গেছেন ভ্যান হেলসিং স্বয়ং.... সেখানেই ভাগ্যক্রমে পৌঁছে
গিয়েছি আমি। কামরার মাঝখানে বসানো বড় একটা গোলটেবিলে
গিয়ে বসলাম আমরা। মোটাসোটা একটা বই খোলা অবস্থায় পড়ে
ছিল, পাতাগুলো নানারকম প্রাচীন লিপিতে ভরা। বইটা বন্ধ করে
একপাশে সরিয়ে রাখল কাউন্ট। তারপর কথা বলতে শুরু করলাম
আমরা। কিভাবে স্কলোম্যান্সে পৌঁছলাম, সে অভিজ্ঞতা খুলে
বললাম আমি। এরপর কাউন্ট শোনাল তার কাহিনী।
" এখানে পৌঁছনো মাত্র বেহেরিট হামলা করেছিল আমার ওপর ",
বলতে লাগল কাউন্ট, " অবাক হইনি। ও যে এমন কিছু করবে তা
আগে থেকেই জানতাম। প্রস্তুতও ছিলাম সেজন্যে। ওকে
ফাঁকি দিয়ে এখানে চলে এসেছি আমি। বেহেরিটের ভয়ে
নয়....শান্তিতে পড়াশোনা করার জন্য"।
" তুমি বই পড়বার জন্য এসেছ স্কলোম্যান্সে?" বিস্মিত হলাম, " তা
হলে কুইন্সি আর ইলিনা? ওদের খবর কি? কোথায় ওরা? বেঁচে
আছে তো?" একটু হাসল কাউন্ট। বলল, " দুঃখিত, তোমায় এতদিন
ভুল বুঝিয়েছি আমি। ইলিনা আর কুইন্সি এখানে নেই,আসেওনি।
তবে কুইন্সি সুস্থ আর নিরাপদেই আছে..... আর ইলিনা আর নেই!"
" কুইন্সি এখন কোথায় আছে?" হতভম্ব গলায় জিজ্ঞেস করলাম।
" শেষবার যেখানে দেখেছিলে, সেখানেই। মানে কারফ্যাক্স
অ্যাবিতে। আসলে ওরা কেউ ইংল্যান্ড থেকে বেরই হয়নি।
এখান থেকে ফিরেই দেখা পাবে কুইন্সির"।
রাগ সংবরণ করা মুশকিল হয়ে পড়ল আমার পক্ষে। চেঁচিয়ে বললাম,
" তারমানে আমাকে ধোঁকা দিয়েছ তুমি? মিথ্যে কথা বলে নিয়ে
এসেছ এখানে....কেন?" নির্বিকার রইল ড্রাকুলা। শান্ত গলায় বলল, "
কারণ আমার বিজয়ের মূহুর্তটা ভাগাভাগি করতে চেয়েছিলাম
তোমার সঙ্গে। বেহেরিটের কথা ভুলে যাও, ও
স্কলোম্যান্সের কেয়ারটেকার ছাড়া আর কিছুই নয়। কিন্তু
এখানকার অনন্ত জ্ঞানের অধিকারী হব একমাত্র আমি! আর
তোমাকে বানাতে চেয়েছিলাম আমার সঙ্গী "।
" না!" আমি চেঁচিয়ে উঠে বললাম, " আমাকে তুমি আসলে বর্ম
হিসেবে চেয়েছিলে....শত্রুদের দূরে সরিয়ে রাখার জন্য।
আমি তা রেখেছিও....ভ্যান হেলসিং আর ডাঃ সিউয়ার্ডকে বাধা দিয়েছি
ঘুমন্ত অবস্থায় তোমার বুকে গজাল ঢোকাতে। কুইন্সি
ইংল্যান্ডে নিরাপদেই আছে জানলে আমি কি সেটা করতাম?
কক্ষনো না! তুমি আসলে চালাকি করে কাজে লাগিয়েছ
আমাকে!" নির্লজ্জের মতো মাথা ঝাঁকাল কাউন্ট। বলল, "
অস্বীকার করছি না। তুমি সঙ্গে থাকায় সত্যিই বেশ উপকার
হয়েছে আমার। কিন্তু তোমাকে আমার সহকারী বানিয়েছিলাম
হবু-সহচরী ভেবে"। " সহচরী? আমি?" বাঁকা সুরে বললাম, "
তাহলে ইলিনা তো ছিল....ও থাকতে আমার দিকে কেন হাত
বাড়াতে গেলে? "
এবার ক্রোধ ফুটল কাউন্টের চোখে। থমথমে গলায় বলল, "
আমাকে কৃতঘ্ন ভাবলে ভুল করবে তুমি মীনা। ইলিনা যা করেছে,
তার জন্য ও অবশ্যই আমার পাশে জায়গা পেত। কিন্তু ও তো এখন
আর নেই! তাছাড়া থাকলেও কি এসে যেত আমার? আমি তো আর
তোমাদের মতো সামাজিক নিয়ম শৃঙ্খলে আবদ্ধ নই। দু'জন
সহচরী রাখতেই পারি। কিন্তু ইলিনাকেও তো সরিয়ে দিল
তোমার স্বামী আর তার সঙ্গীরা। ভুলে যাওনি নিশ্চয়ই, আগে
আমার তিন তিনজন সহচরী ছিল - কিন্তু ওই ভ্যান হেলসিং তাদেরকে
হত্যা করেছে!"
হারানো সেই সঙ্গিনীদের শোকে গলা ভারী হয়ে এল
কাউন্টের। সঙ্গে সঙ্গে আমার রাগও পড়ে গেল। সমবেদনায়,
নাকি শয়তানের কারসাজিতে...তা বলতে পারব না। কিছুক্ষণ চুপ করে
থেকে বললাম, " থাক ওসব কথা। যা খুঁজতে এখানে এসেছ, তা কি
পেয়েছ? " " না, এত অল্প সময়ে সেটা সম্ভব নয়", বলল কাউন্ট,
" এই লাইব্রেরী যে কত বড়, তা কল্পনাও করতে পারবে না তুমি।
অফুরন্ত জ্ঞানের ভান্ডার এখানে। আমার হাতেও অফুরন্ত সময়।
বেহেরিট যদি আমার সঙ্গে ঝামেলা করতে আসে, নিজেই
পস্তাবে। ও জানে না, আমাকে এখানে আসার সুযোগ করে
দিয়ে আমার ক্ষমতা আরও বাড়াবার সুযোগ করে দিয়েছে
বোকা'টা"।
" কিভাবে? " জানতে চাইলাম আমি। " এই লাইব্রেরীতে সেই
জ্ঞান লুকিয়ে আছে, যা আমায় অপরাজেয় করে তুলতে পারে।
বেহেরিট আমাকে ফাঁদে ফেলতে গিয়ে সেই সুযোগটাই
করে দিয়েছে, নিজের অজান্তে।"
" তারমানে প্রায়শ্চিত্ত করতে আসোনি তুমি এখানে? এসেছ
নিজের অশুভ ক্ষমতা বাড়ানোর নেশায়?" " প্রায়শ্চিত্ত আমি
কোনদিনই করব না , মীনা", কঠিন গলায় বলল কাউন্ট, " ও আমার
দ্বারা হবে না। শয়তানের উপাসনা করেও আমি শয়তানকে অবজ্ঞা
করার দুঃসাহস দেখিয়েছিলাম। কেন? কারণ আমি আমার জীবদ্দশায়
ছিলাম এক যোদ্ধা - সমরনায়ক। কখনো কারও সামনে মাথা নত করিনি।
শয়তানের সামনেও না। স্কলোম্যান্সের দশ'জন শিক্ষার্থীর
মধ্য থেকে আমাকে ভেট হিসেবে চেয়ে বসেছিল শয়তান।
আমি রাজি হইনি। বরং যারা আমাকে জোর করে শয়তানের পায়ে
নিবেদন করতে চেয়েছিল, তাদেরকে আমার হাতে খুন হতে
হয়েছিল। বেহেরিট আমার জায়গা নেওয়ায় প্রাণে বেঁচে
গিয়েছিল। এখন যদি ও সেই সমঝোতা ভঙ্গ করতে চায়, তার
পরিণাম ভাল হবে না"।
কাউন্টের এই উদ্ধত কথাবার্তা শুনে অবাক না হয়ে
পারলাম না। জিজ্ঞেস করলাম, " তার মানে তুমি
শয়তানের সেবক নও?"
" শয়তান বা ঈশ্বর, কারোরই পরোয়া করি না আমি"।
" কিন্তু..... যে ঈশ্বরের বিরোধিতা করে, সে তো
শয়তানের দলেই পড়ে। তাছাড়া.... তুমি ঈশ্বরকে নিশ্চয়ই
ভয় পাও, নইলে তাঁর পবিত্র প্রতীকের সামনে কুঁকড়ে
যেতে না"?
" এসব যুক্তি ছাড়ো মীনা", বলল কাউন্ট, " যুক্তি সবসময়
বাস্তবতা মেনে চলে না। তবে হ্যাঁ - বেহেরিটের একটা
কথা সত্যি, শয়তানের কাছে আত্মসমর্পণ না করার কারণে
আমার ক্ষমতার কিছু সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে। আর সেই
সীমাবদ্ধতা এখন আমি দূর করব - এই লাইব্রেরী ঘেঁটে
অর্জন করব চূড়ান্ত জ্ঞান। আমি এমন ক্ষমতা অর্জন করব,
যাতে দিনের বেলাতেও চলাফেরা করার ক্ষমতা অর্জন
করতে পারব। কেউ আমায় রসুন, পবিত্র ক্রুশ বা বুনো
গোলাপের মতো নগন্য জিনিস দিয়ে আর ঠেকাতে
পারবে না"।
এক ধরনের মরিয়া সুর ফুটে উঠল কাউন্টের গলায়। আমি
বললাম, " বেহেরিট তোমায় সফল হতে দেবে না কাউন্ট। ও
শুধু তোমায় ঘৃণাই নয়, ঈর্ষাও করে। বাইরের পৃথিবীতে
তোমার জায়গা নিতে চাইছে ও"।
" ওর সঙ্গে যথাসময় বোঝাপড়া হবে", বলল কাউন্ট, "
আপাতত আমি এই লাইব্রেরীতে শান্তিতে পড়াশোনা
করতে পারলেই খুশী। তুমি এখানে থেকে যাও মীনা।
শান্তিতে থাকতে পারবে.... বেহেরিট বিরক্ত করবে না
তোমাকে। তাছাড়া.... এখানকার নিষিদ্ধ জ্ঞানের প্রতি
একটুও কি কৌতূহল নেই তোমার? তুমি জানো, মেয়েরাও
স্কলোম্যান্সে আসত কালা জাদুর শিক্ষা নিতে? লোকে
বলে, মেয়েদের প্রতি শয়তানের নাকি একটু বেশীই
অনুরাগ ছিল....."
" তোমাকে কি শয়তান নিজে কালা জাদুর শিক্ষা
দিয়েছিল?" ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করলাম আমি,"
সে....সে দেখতে কেমন? "
" আমার মতো.... বেহেরিটের মতো.... এখানকার সব
শিক্ষার্থীদের মতো ", হাসল কাউন্ট, " শয়তান আসলে
বহুরূপী, মীনা। স্কলোম্যান্সের প্রত্যেক ছাত্রছাত্রী
তার নিজের চেহারার প্রতিবিম্ব দেখে শয়তানের
চেহারায়। তাই সে কখনো সুদর্শন যুবক, কখনো পক্ককেশ
বৃদ্ধ আবার কখনো বা রূপসী তরুণী। " এবার প্রসঙ্গ পালটে
ফেলল কাউন্ট, " যাক গে, তোমার একটা সিদ্ধান্ত নেবার
কথা ছিল। আশা করি নিয়েছ? কুইন্সি কি আমাদের দলে
যোগ দিচ্ছে?"
জবাব না দিয়ে মাথা নীচু করে ফেললাম। অধৈর্য
ভঙ্গিতে আমার হাত চেপে ধরল কাউন্ট। জিজ্ঞেস করল, "
জবাব দিচ্ছ না কেন? ও কি আমাদের দলে আসছে না
আসছে না?"
ধীরেধীরে মাথা তুললাম। নিয়ে ফেলেছি সিদ্ধান্ত।
আশ্চর্য এক প্রশান্তি ভর করছে আমার মধ্যে। স্পষ্ট গলায়
বললাম, " না, কাউন্ট। ও যোগ দেবে না। ঈশ্বর যদি
কুইন্সির আয়ু সংক্ষিপ্তই করে থাকেন, সেটা জোর করে
বাড়াবার কোনও ইচ্ছে নেই আমার। ছেলে হারানোর
ব্যথা সইতে পারব আমি কিন্তু তাকে তোমাদের দলে এনে
এক অভিশপ্ত জীবনে নিক্ষেপ করতে পারব না আমি।
আমার বেলাতেও একই কথা খাটে। আমি তোমার সহচরী
হতে রাজি নই। চাই তুমি আমায় আর কুইন্সিকে মেরেই
ফেলো আর যাই কর....."
আগুনের মতো জ্বলে উঠল কাউন্টের চোখজোড়া।
সক্রোধে বলল, "এই-ই কি তোমার শেষ কথা?"
" হ্যাঁ। এখন তুমি যা খুশী তাই কর। আমি পরোয়া করি না।"
ঝট করে উঠে দাঁড়াল কাউন্ট। ক্রুদ্ধ গলায় বলল, " অবাধ্য -
অকৃতজ্ঞ মেয়ে! এত বড় সাহস, আমাকে প্রত্যাখ্যান কর?"
এক হাতে সাঁড়াশির মতো আমার গলা চেপে ধরল সে,
ঝটকা মেরে আমায় তুলে নিল শূন্যে। খাবি খেতে শুরু
করলাম, মোচড়াতে লাগলাম দেহ- শ্বাস নিতে পারছি
না। চোখের সামনে নেমে আসছে একটা কালো পর্দা।
সেই অবস্থায় শুনতে পেলাম কাউন্টের গলা, " এখনও সময়
আছে, রাজি হয়ে যাও। নইলে মরবে"।
ফ্যাসফ্যাসে গলায় জানিয়ে দিলাম, " তা হলে মেরেই
ফ্যালো। কিছুতেই আমি রাজি হবো না"।
গলার ওপর আঙুলের চাপ বাড়তেই থাকল। শ্বাসনালী যখন
ভেঙে যাবে মনে হল, তখনই আচমকা আমায় ছেড়ে দিল
কাউন্ট। হাঁটু গেড়ে বসে পড়লাম মেঝেতে। ঘড়ঘড় করে
আওয়াজ বেরোচ্ছে গলা দিয়ে। মুক্তি পেয়ে একসঙ্গে
দুনিয়ার সব বাতাস টানতে চাইছে ফুসফুস। খানিকটা
স্বাভাবিক হয়ে মুখ তুলতে দেখি, কাউন্টের চেহারায়
বিষাদের ছায়া।
" তুমিই জিতলে", বলল সে, " ইচ্ছের বিরুদ্ধে তোমাকে
দিয়ে কিছুই করাব না আমি। আর কুইন্সির জন্যও চিন্তা
কোরো না। সুস্থ হয়ে যাবে - স্বাভাবিক সুস্থ মানুষের
মতোই অনেকদিন বাঁচবে"।
বোকার মতো তাকিয়ে রইলাম। ড্রাকুলার কথার মর্ম
বুঝতে পারছি না।
ড্রাকুলা বলতে লাগল, " কারফ্যাক্স অ্যাবিতে
থাকাকালীন সময়ে কুইন্সিকে খাবারের সঙ্গে একটা
বিশেষ ভেষজ খাইয়েছি আমি। ' ধন্বন্তরি ' ওষুধ.... এই
স্কলোম্যান্সেই ওটা বানানো শিখেছিলাম। ওতে যা সব
গুণ আছে, তোমাদের আধুনিক বাজারচলতি ওষুধেও তা
নেই। ওই ওষুধে শরীরের যে কোনও রোগ সেরে যায়।
কুইন্সির সমস্ত দুর্বলতা কেটে যাবে মীনা,ধীরেধীরে
সুস্থ হয়ে উঠবে। আমার কথা বুঝতে পারছ?"
" তুমি ওর চিকিৎসা করেছ?" বিস্মিত গলায় বললাম আমি,
" আমার তরফ থেকে কোনও আশ্বাস বা অনুরোধ ছাড়াই?
কেন?"
" কারণ আমি তোমায় ভালবাসি ", পরিষ্কার গলায় বলল
কাউন্ট, " আমি চাইনি অসুস্থ ছেলের জন্য তোমার বাকি
জীবনটুকুতে কোনওরকম দুশ্চিন্তা থাকুক।"
" তারমানে, তুমি কি জানতে, আমি তোমার প্রস্তাবে
কোনওদিন রাজি হবো না?"
" অনুমান করেছিলাম", তিক্ত গলায় বলল কাউন্ট, " তুমি বড়
শক্ত ধাতের মেয়ে, মীনা। এ জন্যেই তোমায় আমি পছন্দ
করি। তাই আর জবরদস্তি করব না তোমার সাথে। তুমি আজ
থেকে মুক্ত। আর কোনওদিন তোমায় বা কুইন্সিকে বিরক্ত
করব না আমি। কারণ এখন আমি বুঝতে পারছি, জোর করে
ভালবাসা বা আনুগত্য পাওয়া যায় না"।
বিহ্বল হয়ে পড়লাম ওর কথায়। কাউন্টের মতো একটা
পিশাচও যে ত্যাগের মহিমা দেখাতে পারে, তা কে
জানত! এক লহমায় খসে পড়ল কাউন্টের প্রতি এতদিনের
যাবতীয় বিদ্বেষ। মনে হলো, এতদিনের ঘৃণা, বিদ্বেষ ....
সবকিছু ছিল বাইরের আবরণমাত্র কিন্তু কাউন্ট না
থাকলে আমার জীবনটাই বোধহয় অপূর্ণ থেকে যেত। যাঁরা
আমার এই লেখা পড়ছেন তাঁরা আমায় কি ভাবছেন জানি
না.....কিন্তু হৃদয় কবে কার কথা শুনেছে।
টেবিলের ওপর রাখা বালি ঘড়ির দিকে তাকাল কাউন্ট।
বলল," সকাল হয়ে আসছে। এবার আমায় বিশ্রামে যেতে
হবে, অনেকক্ষণ পড়াশোনা করেছি। মীনা, তুমি আজ
থেকে মুক্ত.....চাইলে এখান থেকে চলেও যেতে
পারো.....কিন্তু অনুরোধ করব এখানেই থাকতে। যতক্ষণ না
ওই বেহেরিটের একটা গতি করছি আমি, স্কলোম্যান্স
থেকে বেরোতে পারবে বলে মনে হয় না। কারণ
বেহেরিট
তোমাদের কিছুতেই জীবিত রাখবে না।"
শান্ত গলায় বললাম, " বেশ, আমি থাকব"।
" ধন্যবাদ ", একটু হাসল কাউন্ট। তারপর কামরার এক
কোণার ছায়ায় গিয়ে শুয়ে পড়ল।
তারপর থেকে টেবিলে বসে জার্নাল লিখছি আমি।
কতটা সময় পেরিয়ে গেছে জানি না। লিখতে লিখতে
হাত ব্যথা করছে, মাথা ধরেছে। ক্লান্তির কারণেই কিনা
জানি না.....লাইব্রেরীর অভ্যন্তরে ছায়ার বিস্তার
বেড়ে গেছে মনে হচ্ছে। আরে.....বেহেরিটের গলা
শুনছি
মনে হচ্ছে! ও কিভাবে আসবে এখানে!
ভয়ে বুক ধড়ফড় করছে আমার। বেরিয়ে যেতে হবে....এখান
থেকে বেরিয়ে যেতে হবে।
ক্রমশ
অশুভ আত্মা
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now