বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
রিটার্ন অব ড্রাকুলা
কাহিনী : ফ্রেডা ওয়ারিংটন
অনুবাদক : ইসমাইল আরমান
-------------------------------------
পর্ব ৩৮ঃ
মীনা হারকারের জার্নাল : পরের অংশ জ্ঞান ফিরতে নিজেকে
প্রায়ান্ধকার একটা ঘরে, কাউচে শোয়া অবস্থায় আবিষ্কার করলাম।
মাথাটা টনটন করছে কিন্তু তার মধ্যেও মনে পড়ল কুইন্সির কথা।
কষ্টেসৃষ্টে উঠে বসবার চেষ্টা করছি, এইসময়েই নজরে
পড়ল আবছা দুটো ছায়ামূর্তি দাঁড়িয়ে আছে কাউচের পাশে -
তাকিয়ে আছে আমার দিকে। কোত্থেকে এল এরা, দেখতে
পাইনি। বুক কেঁপে উঠল ভয়ে। এবার নজর ফেরালাম কামরার
দিকে। সাদামাঠা, ঘরে তেমন কোনও আসবাবপত্র নেই।
মোজাইক করা দেওয়ালগুলো দেখতে রোমান ভিলার মতো।
যদ্দূর বুঝলাম, জায়গাটা ভূগর্ভস্থ কোনও ঘর। গরাদ লাগানো জানলা
দিয়ে কোনও দিনের আলো আসছে না, পরিবর্তে একটা
কেমন ম্লান আভা দেখা যাচ্ছে। সেই আলোর পটভূমিতে
ছায়ামূর্তি দুটো দাঁড়িয়ে আছে। প্রথমজনকে আমি চিনি -
প্রফেসর কোভাক্স। ফ্যাকাসে সাদা চেহারা, শরীরের এখানে
ওখানে লেগে রয়েছে জমাট বাঁধা বরফ। তাঁকে দেখে মনে
হচ্ছিল যেন তুষার ঝড়ে মারা যাওয়া কোনও মানুষ..... অথচ জ্যান্ত
মানুষের মতো চলেফিরে বেড়াচ্ছেন। গা থেকে কেমন
একটা সোঁদা গন্ধ ভেসে আসছে। দ্বিতীয়জন অচেনা - কিন্তু
তাকে দেখেই বেশী ভয় করছে আমার। না তার চেহারাটা
ভয়ঙ্কর বলা যাবে না, বরং তার ঠিক উলটো। দেখে মনে হচ্ছে
পুরনো আমলের কোনও রাজকীয় পোট্রেট থেকে
বেরিয়ে এসেছে সে। গায়ে সোনালি কারুকাজ আর বহুমূল্য
পাথর বসানো রক্তলাল রঙের একটা আলখাল্লা। মাথায় চমৎকারভাবে
আঁচড়ানো সোনালি চুল। সুদর্শন, আকর্ষণীয় চেহারা।
ঠোঁটের কোণায় ঝুলছে মোহনীয় একটা হাসি। অথচ
অন্তরের অন্তস্থল থেকে অনুভব করলাম, ওই হাসিমাখা সুন্দর
চেহারাটার আড়ালে লুকিয়ে আছে ভয়ঙ্কর একটা স্বত্তা....একটা
ভয়ঙ্কর পিশাচ। কাউচের ওপরেই কুঁকড়ে গেলাম আমি। সম্ভ্রান্ত
ভদ্রলোকের মতো মাথা ঝুঁকিয়ে ' বাউ' করল সে। নম্রস্বরে
বলল, " মাদাম মীনা, স্কলোম্যান্সে তোমায় স্বাগত জানাই। ভয়
পেয়ো না, এখানে তুমি সম্পূর্ণ নিরাপদ। আমি বেহেরিট।
যেহেতু কষ্ট করে এতদূর এসেছ, আমার তরফ থেকে
মেহমানদারির কমতি হবে না। খাওয়া দাওয়া আর সবরকম আরাম
আয়েশের......" তার কথা শেষ হবার আগেই ঝট করে উঠে
দাঁড়ালাম, মাথা ঘোরানো-কে পাত্তা দিলাম না। বেহেরিটকে
থামিয়ে দিয়ে রুক্ষ গলায় জিজ্ঞেস করলাম, " আমার সঙ্গীরা
কোথায়?"
" নিরাপদেই আছে তারা....তোমারই মতো.... যথাসময় দেখা পাবে
তাদের"।
" আর আমার ছেলে? ও-ও কি এখানে? প্রফেসর কোভাক্সের
ভাতিজি ওকে এখানে নিয়ে আসছিল। এসেছে তারা?"
" হয়তো", হেঁয়ালির সুরে বলল বেহেরিট, " তবে ছেলেকে
ফিরে পেতে চাইলে আমার কথামতো চলতে হবে তোমায়"।
অসহায় বোধ করলাম। এতদিন কাউন্ট ড্রাকুলার হাতের পুতুল ছিলাম,
এবার বুঝি এই পিশাচটার হতে হবে? কাঁপা গলায় জানতে চাইলাম, "
ড্রাকুলা কোথায়? ও...ও তো!" " হ্যাঁ....ও..ও এসেছে ", আমার
প্রশ্নটা শেষ হবার আগেই জানাল বেহেরিট। সপ্রশংস দৃষ্টিতে
তাকাল প্রফেসর কোভাক্সের দিকে। বলল," আন্দ্রে চমৎকার
কাজ দেখিয়েছে "।
" চমৎকার কাজ?" ধাঁধাঁয় পড়ে গেলাম। " উনি তো গিয়েছিলেন
কাউন্টকে স্কলোম্যান্সে আসা ঠেকাতে। তাতে সফল হতে
পারেননি। ব্যর্থতা আবার চমৎকার হয় কিভাবে? "
উঁচু গলায় হেসে উঠল বেহেরিট। বলল, " ওটা ছিল একটা নাটক,
মাদাম মীনা। কাউন্টকে স্কলোম্যান্সে আনার জন্য স্রেফ
একটা টোপ। এমনিতে ও কিছুতেই আসত না, তাই একটু বাঁকা পথ
অবলম্বন করতে হয়েছে। জানতাম, যা কিছু বারণ....যা কিছু নিষিদ্ধ,
সেটাই ও করতে চায়। এমনিতে ডাকলে আসবে না কিন্তু বারণ
করলে ঠিক ছুটে আসবে স্কলোম্যান্সে। নইলে আমি তো
জানি যে আন্দ্রে কাউন্টের সঙ্গে কিছুতেই পেরে উঠবে
না, কিছুতেই ঠেকাতে পারবে না ওকে এখানে আসা থেকে;
কিন্তু তা স্বত্তেও পাঠিয়েছি। স্রেফ কাউন্টের এই স্বভাবটা জানি
বলেই যে যে জিনিসটা করতে ওকে নিষেধ করা হবে, ঠিক
সেটাই ও করবে। তাই তো বারণ করা স্বত্তেও ও ছুটে
এসেছে এখানে। প্ল্যানটা দারুণ ছিল না? কি বলো মীনা?
আন্দ্রে না থাকলে এই প্ল্যানটা সফল হতো?" বলতে বলতে
প্রফেসর কোভাক্সকে জড়িয়ে ধরল বেহেরিট।
প্রেমিকের মতো চুমু খেল ওর ঠোঁটে। বীভৎস দৃশ্য।
চোখ সরিয়ে নিলাম ঘৃণায়। সন্দেহ নেই, জলজ্যান্ত নরকে পা
রেখেছি আমি।
" কাউন্টকে দেখতে চাও?" জিজ্ঞেস করল বেহেরিট।
প্রফেসর কোভাক্সকে তখনো আলিঙ্গনে ধরে
রেখেছে সে।
কি জবাব দেব, ভেবে পেলাম না। হতে পারে প্রশ্নটা আমাকে
ফাঁদে ফেলার আরেকটা কৌশল। তাই বললাম, " আ....আমি জানি না"।
" খুব শীঘ্রি তোমার মনের ইচ্ছে বোঝা যাবে", হালকা গলায়
বলল বেহেরিট।
আমাকে দ্বিতীয়বারের মতো 'বাউ' করল সে। তারপর
প্রফেসর কোভাক্সকে নিয়ে বেরিয়ে গেল কামরা ছেড়ে।
বন্ধ হয়ে গেল দরজা, শোনা গেল বাইরে থেকে তালা
লাগানোর শব্দ। কাছে গিয়ে দেখলাম, এপাশে কোনও হাতল বা
চাবির ফুটো নেই। কাজেই কামরা থেকে বেরোবার আশা ত্যাগ
করতে হল। জানলায় গিয়ে বাইরে উঁকি দিলাম। ছায়ায় ঢাকা একটা বড়
কোর্টইয়ার্ড দেখা যাচ্ছে, চারদিকে নকশাদার খিলান। মাঝখানে
শ্বেতপাথরে বাঁধানো একটা জলাশয়। কোর্টইয়ার্ডের চারদিকে
দেওয়াল দেখে বুঝলাম, পর্বতের গভীরে বিশাল এক গুহার
ভেতরে তৈরি হয়েছে এই স্কলোম্যান্স। ভ্যান হেলসিং আর ডাঃ
সিউয়ার্ডের খোঁজ নেই, জানলা দিয়ে কয়েক দফা ডাকাডাকি
করলাম তাঁদের। ভাবলাম আশেপাশের কোনও কামরায় থাকলে
শুনতে পাবেন আমার ডাক। কিন্তু কোনও জবাব পেলাম না। হতাশ
হয়ে তাই সরে এলাম জানলা থেকে। মন দিলাম আমার বন্দিশালার
ভেতরে। পর্দায় ঢাকা ছোট্ট একটা দরজা আবিষ্কার করলাম, তার
ওপাশে বাথরুম। ভেতরটা মার্বেল পাথরে মোড়া, পরিচ্ছন্ন।
সবচেয়ে বিস্ময়ের ব্যাপার, বাথরুমের কলে ঠাণ্ডা গরম দু'রকম
পানিরই প্রবাহ আছে। পাহাড়ের ভেতর এই প্রাচীন
স্কলোম্যান্সে এমন চমৎকার ব্যবস্থা কিভাবে করা হলো,
ভেবে পেলাম না। নিজের বন্দিদশা মেনে নিয়েছি আমি। হাত মুখ
ধুয়ে ফিরে এসেছি কামরায়। লিখতে শুরু করেছি জার্নাল। পরে।
খানিক আগে প্রফেসর কোভাক্স এসেছিলেন - একা। জার্নাল
লেখা শেষ করে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। হঠাৎ কামরার ভেতর
কারোর উপস্থিতি টের পেয়ে চোখ খুললাম। কানে ভেসে
এল নরম একটা কন্ঠ - " উঠুন, মাদাম হারকার। আমি আপনার খাবার নিয়ে
এসেছি"। প্রথমে ভাবলাম বুঝি ভ্যান হেলসিং কথা বলছেন। কয়েক
মূহুর্ত পরেই ভেঙে গেল ভুলটা। চিনতে পারলাম
কোভাক্সকে। মার্বেলের একটা টেবিলের ওপর খাবারের
ট্রে টা নামিয়ে রাখছেন। জিজ্ঞেস করলাম, " প্রফেসর, কুইন্সি
কি এখানে? আপনি দেখেছেন ওকে? দোহাই আপনার, আমার
প্রশ্নের জবাব দিন"।
" দুঃখিত। আপনার জিজ্ঞাসার কোনও জবাব নেই আমার কাছে"।
" তা হলে বলুন কাউন্ট কোথায়? ও এখনও আমার সঙ্গে দেখা
করতে এল না কেন?"
" প্লিজ, এত প্রশ্ন করবেন না। সত্যিই আমি জবাব দিতে পারব না।
কারণ আমি কিছুই জানি না। " আমার পাশে এসে বসলেন কোভাক্স।
ফ্যাকাসে, প্রাণহীন চোখদুটোয় পরিষ্কার হতাশা ফুটে
উঠেছে। আমায় উদ্দেশ্য করে তিনি বললেন, " আমায় যদি
বেহেরিটের দোসর ভেবে থাকেন, তা হলে মস্ত ভুল
করবেন। ওর আসল পরিকল্পনার কিছুই জানা ছিল না আমার।
ভেবেছিলাম সত্যি সত্যি ড্রাকুলাকে ঠেকাবার দায়িত্ব দেওয়া
হয়েছে আমাকে। ব্যর্থ হবার পর এখানে ফিরে এসেছিলাম মাথা
পেতে শাস্তি নেবার জন্য। বুঝতেই পারছেন, আমাকে
পুরোপুরি বিশ্বাস করেনি বেহেরিট। এখনও করে না। আমাকে
কোনকিছুই বলছে না সে"।
" কিন্তু আপনি তো স্বাধীন ", বললাম আমি, " আমার মতো তো
বন্দি নন। চাইলেই যেখানে খুশী গিয়ে খোঁজ নিতে পারেন
ড্রাকুলা, ইলিনা আর কুইন্সির ব্যাপারে"। " লাইব্রেরীরুমটা ছাড়া আর
কোথাও যাবার অনুমতি দেয়নি আমায় বেহেরিট", বললেন
প্রফেসর কোভাক্স, " আমি সত্যিই দুঃখিত, মীনা"। মাথা নিচু করে
বললেন কোভাক্স " আপনার জন্য কিছু করতে পারব না আমি। এর
আগে কখনো জীবনটাকে এরকম অর্থহীন মনে হয়নি।
বিশ্বের শ্রেষ্ঠ জ্ঞানের যে ভান্ডার এখানকার ওই লাইব্রেরী
- সেটা এখন আমার হাতের মুঠোয় তবুও কিসের যেন এক
অপূর্ণতা আমায় কুরে কুরে খাচ্ছে। আগের জীবনটার কথা খুব
মনে পড়ে। তখন আমার জীবনে আবেগ ছিল, ভালবাসা
ছিল....কিন্তু এখন স্রেফ আমি একটা ঘৃণিত জীবে পরিণত হয়েছি।
এভাবেই থাকতে হবে অনন্তকাল "।
কোভাক্সের হাতে হাত রাখলাম আমি, স্বান্তনা দিতে চাইলাম তাঁকে।
আচমকা দপ করে জ্বলে উঠল তাঁর দুটো চোখ। এক লহমায়
যেন রাজ্যের হিংস্রতা ভর করল তাঁর দু'চোখে। খপাৎ করে দু
হাতে খাবলে ধরলেন আমার ঘাড়টাকে। তারপর আমার ঘাড়টাকে
কাত করে ধরে মুখ নিয়ে এলেন ঘাড়ের কাছে। চামড়ায় টের
পেলাম তাঁর গরম নিশ্বাস।
চিৎকার করে উঠলাম, " ঈশ্বরের দোহাই, প্রফেসর! প্লিজ থামুন!
থামুন!"
এবার যেন সম্বিৎ ফিরে এল তাঁর। আমাকে ছেড়ে দিয়ে তিনি
ছুটে চলে গেলেন দরজার কাছে। একটু থেমে ফিরলেন
আমার দিকে, লজ্জায় নুয়ে গেছে তাঁর মুখ। ভাঙা গলায় তিনি
বললেন, " ধ্বংস হয়ে যাওয়া উচিত আমার....কিন্তু না, ওই
লাইব্রেরীটার কারণেই এখন ধ্বংস হতে চাই না। ওটা'র চেয়ে
গুরুত্বপূর্ণ আর কিছু নেই আমার কাছে"।
" আমার ছেলেও নয়?" জোর গলায় জিজ্ঞেস করলাম আমি।
জবাব দিলেন না কোভাক্স। চলে গেলেন। দরজাটা আবার বন্ধ
হয়ে গেল। কামরায় আবার একা হয়ে গেলাম আমি। মুছে
ফেললাম চোখের পানি। এভাবে শোকে দুঃখে কাতর হয়ে
থেকে লাভ নেই। তারচেয়ে খাওয়া দাওয়া করে শরীর সুস্থ রাখা
একান্ত জরুরী। যাতে সময় বা সুযোগ এলে তার সদ্ব্যবহার
করতে পারি। খেতে বসলাম। মরিচ দেওয়া মুরগির মাংস, সেদ্ধ আলু
আর মদ দিয়ে গেছেন কোভাক্স। কোত্থেকে এসব খাবার
এসেছে কে জানে। তবে তা নিয়ে মাথা ঘামালাম না। তাড়াতাড়ি খাওয়া
সেরে নিলাম। পেটের খিদে মিটল খুব তাড়াতাড়ি.... কিন্তু মনের
অবস্থা....... আমার চারদিকে এখন শুধু পিশাচদের আনাগোনা -
কাউন্ট, বেহেরিট আর কোভাক্স। এদের হাত থেকে কিভাবে
বাঁচাব কুইন্সিকে, বুঝতে পারছি না। নিজেও রক্ষা পাব বলে মনে
হচ্ছে না। তবে মরি বা বাঁচি, কুইন্সির ভাগ্যই বরণ করতে চাই আমি।
আমার ছেলে যেন কিছুতেই একা না হয়ে যায়। জোনাথনের
কথা মনে পড়ছে খুব। আর কি কখনো ওকে দেখতে পাব? ৫
ডিসেম্বর ( সম্ভবত)
অনেক কিছু ঘটে গেছে গতবার জার্নাল লেখার পর। বদলে
যেতে দেখেছি শত্রু মিত্র সবাইকে। মুক্তি পেয়েও বন্দিদশা
চলছে আমার। হাতে কিছুটা সময় পেয়ে এখন কাগজ কলম নিয়ে
বসেছি।
কাল যখন জার্নাল লিখছিলাম, হঠাৎ হাজির হলো বেহেরিট। আমাকে
অবাক করে দিয়ে দরজা খুলে ধরল। ইশারা করল বেরোতে।
বলল, " এসো। তোমার সঙ্গে কথা আছে আমার"।
কোর্টইয়ার্ডে আমাকে নিয়ে গেল সে। জলাশয়ের কিনারা
ধরে হাঁটতে হাঁটতে বলল, " আমাকে ভয় পেয়ো না। তোমার
সঙ্গে আমার কোনও শত্রুতা নেই। কামরায় আটকে রেখেছি
তোমারই নিরাপত্তার জন্য। স্কলোম্যান্সের আনাচেকানাচে
হাজারো বিপদ লুকিয়ে আছে। সেই বিপদ থেকেই বাঁচাতে চাইছি
তোমায়।" " তারমানে আমি বন্দি নই? চাইলে চলে যেতে পারি?"
বাঁকা সুরে জিজ্ঞেস করলাম। " অবশ্যই। কিন্তু তোমার ছেলে
আর বন্ধুদের ফেলে বাইরের এই তুষারঝড়ের মাঝখানে
যেতে পারবে?" " তুষারঝড়ের পরোয়া করি না", আমি বললাম, "
কিন্তু ওদের কথা বলে আমার পায়ে শেকল পরিয়ে দিচ্ছ তুমি।
এমন ছলচাতুরীর কোনও মানে হয়?" মৃদু হেসে কাঁধ ঝাঁকাল
বেহেরিট। " কোথায় ওরা?" জানতে চাইলাম। জবাব দিল না সে।
মাথায় রক্ত চড়ে গেল আমার। খ্যাপাটে গলায় বললাম, "
তোমাকে আমি ভদ্র ভেবেছিলাম, বেহেরিট"। " তা তো আমি
বটেই"।
" তা হলে সেইমতো আচরণ করছ না কেন? কেন বলছ না,
আমার সাথীরা কোথায়? লুকোচুরির কিছু তো দেখছি না। আমি
এখানে সম্পূর্ণ অসহায়। ওদের খবর বললে উল্টোপাল্টা কিছু
ঘটিয়ে ফেলব, তেমন কোনও সম্ভাবনা নেই। তা হলে সমস্যাটা
কোথায়?" হাঁটতে হাঁটতে তখন একটা টানেলের ভেতর ঢুকে
পড়েছি আমরা। বাতাস বাষ্প ভরা, গরম। দুপাশের দেওয়ালে আঁকা
আছে বীভৎস সব ছবি। সেগুলোর দিকে তাকিয়ে বেহেরিট
বলল, " আমার দিকটা তোমায় বুঝতে হবে, মীনা। আমি কাউন্টের
হঠকারীতার শিকার। জীবদ্দশায় সে কালা যাদু শিক্ষাগ্রহণের পর
শয়তানের পাওনা মিটিয়ে দেয়নি, পালিয়েছে কাপুরুষের মতো।
তার এই ভন্ডামির জন্য চারশো বছরেরও বেশী সময় ধরে
এখানকার অন্ধকুঠুরিতে বন্দি থাকতে হয়েছে আমাকে।
কাউন্টকে এর মূল্য চোকাতে হবে"।
ভ্রু কোঁচকালাম। বললাম, " তুমি কি বলতে চাইছ, ওকে শয়তানের
হাতে তুলে দিতে পারলে তুমি মুক্তি পেয়ে যাবে? ফিরতে
পারবে বাইরের দুনিয়ায়"। " ঠিক তাই-ই, মাদাম মীনা", বলল
বেহেরিট। এইসময় টানেলের সামনের দিকে হঠাৎ অদ্ভুত এক
আভা দেখতে পেলাম। লালচে একটা আভা.... সেটার দিকে
তাকিয়ে বেড়ে গেল আমার হৃদস্পন্দন। গরম বাতাসের একটা
ঝাপটা বয়ে গেল গায়ের ওপর দিয়ে, নাকে পেলাম সালফারের
বিশ্রী গন্ধ। পরপর কয়েকটা অ্যান্টিচেম্বার পেরোলাম আমরা,
শেষে পৌঁঁছলাম বিশাল এক প্রকোষ্ঠে। দেওয়াল জুড়ে
বীভৎস সব ছবি, দেখামাত্র গা রি রি করে উঠল। প্রকোষ্ঠের
এক প্রান্তে রয়েছে বিশাল বিশাল ড্রাগনের মূর্তি। প্রফেসর
কোভাক্সের জার্নালে এই প্রকোষ্ঠের বিবরণ আছে বলে
শুনেছি ভ্যান হেলসিংয়ের মুখে।
মূর্তির পায়ের কাছে আমাকে নিয়ে গেল বেহেরিট।
কোভাক্স যে দরজার কথা বলেছেন সেটা দেখতে পেলাম।
দরজা খুলে আমায় নিয়ে এগিয়ে চলল বেহেরিট। পাথুরে একটা
চাতালে পৌঁছলাম খানিক পরে। চাতালের তলায় গভীর এক খাদ,
তাকালেই মাথা ঘুরে যায়। কিন্তু তার তোয়াক্কা না করে আমাকে
চাতালের একদম কিনারে নিয়ে গেল বেহেরিট। নাক
জ্বালাপোড়া করে উঠল নীচ থেকে উঠে আসা ঝাঁঝালো
গন্ধে। চারপাশে নজর বোলালাম। অতিকায় এক গুহায় এসে
পড়েছি - ছাদ বা দেওয়াল, কিছুই চোখে পড়ছে না। খাদটাও কুয়াশায়
ঢাকা। সেই কুয়াশা ভেদ করে উঠে আসছে লালচে এক আভা -
আলোকিত করে তুলছে আঁধারের মাঝে জিভের মতো
বের হয়ে থাকা চাতালটাকে। কিনারায় পুরনো আমলের একটা
রেলিঙ লাগানো আছে - ডানে বামে গিয়ে মিশেছে
অন্ধকারে। রেলিঙে ভর দিয়ে নীচে তাকালাম। কুয়াশার
ফাঁকফোকর দিয়ে চোখে পড়ল ভূগর্ভস্থ একটা হ্রদ - টগবগ
করে ফুটছে পানি। আলোর উৎসটাও চোখে পড়ল; রক্তলাল
একটা চোখের মতো কি যেন জ্বলছে পানির তলায়। " কি ওটা?"
ফিসফিসিয়ে জানতে চাইলাম। আর তখুনি নড়ে উঠল আলোটা। পানির
মাঝে আলোড়ন উঠল, বিশাল একটা সরীসৃপের মতো কি যেন
পাক খেল পানির তলায়। দম আটকে এল আমার। মনে হলো, এই
বুঝি পানি ভেদ করে বেরিয়ে আসবে কোনও ভয়ঙ্কর দানব।
কিন্তু তেমন কিছু ঘটল না। কিছুক্ষণ আলোড়িত হবার পর শান্ত হয়ে
এল পানি। নিভে গেল আলোটা। তারপরেও স্থির হয়ে সেদিকে
তাকিয়ে রইলাম। " ড্রাগনের আবাস!" গর্বের সুরে বলল
বেহেরিট। " বাইরের উপত্যকায় যে হ্রদটা আছে, সেটারই
আরেকটা শাখা উঠে এসেছে পর্বতের ভিতরে। দ্বৈত হ্রদ এটা
- একপাশে আলো, অন্যপাশে অন্ধকার "।
" এসব আমায় দেখাচ্ছ কেন?"
" মেহমানকে গৃহকর্তা তার ঘরবাড়ী ঘুরিয়ে দেখায় না? এটাকেও
তেমনই মনে করে নিতে পারো। যা হোক, কাউন্টের
প্রসঙ্গে কথা বলছিলাম আমরা...." বিনা নোটিশে আমার ডান হাত
মুখের কাছে তুলে উল্টোপিঠে চুমু খেল বেহেরিট। তারপর
চোখে চোখ রেখে নরম গলায় বলল, " তোমার ছেলের
কথা ভাবো, মাদাম মীনা। যদি ওকে ফিরে পেতে চাও, আমার
প্রশ্নের জবাব দাও। কাউন্ট কি তোমায় ভালবাসে? তোমায় তার
সঙ্গিনী বানাতে চায়?"
" দেব না জবাব", ঝটকা দিয়ে হাত সরিয়ে নিলাম, " বাজে প্রশ্ন করছ
তুমি। তা ছাড়া তোমাকে আমি বিশ্বাসও করি না। এই জায়গা স্রেফ একটা
নরক....আর নরকে সত্যের কোনও স্থান নেই। বেহেরিট,
কুইন্সি যদি সত্যিই এখানে থেকে থাকে, তাহলে এখুনি তার কাছে
নিয়ে চলো আমায়"।
থমকে গেল বেহেরিট। আমাকে এভাবে খেপে উঠতে
দেখবে বলে বোধহয় আশা করেনি। দাঁত মুখ খিঁচিয়ে কিছু একটা
বলতে গেল, থেমে গেল পায়ের আওয়াজ শুনে। মূর্তির
গোড়ার প্যাসেজটার মুখে নতুন একটা আলো দেখা যাচ্ছে।
একটু পরেই লণ্ঠন হাতে উদয় হলো দুজন মানুষ। ভ্যান হেলসিং
আর ডাঃ সিউয়ার্ড! ওঁদের পেছনে ফ্যাকাসে মুখ নিয়ে প্রফেসর
কোভাক্সও আছেন। ক্রুদ্ধ গর্জন করল বেহেরিট তাঁদেরকে
দেখে। ঝট করে একটা ক্রুশ উঁচু করে ধরলেন ডাঃ সিউয়ার্ড।
এগিয়ে গেলেন বেহেরিটকে মোকাবিলা করতে। পবিত্র
ক্রুশের সামনে মিইয়ে গেল পিশাচটা। পিছোতে পিছোতে
হারিয়ে গেল অন্ধকারে। তাকে আর দেখতে পেলাম না। আমার
দিকে এগিয়ে এলেন ভ্যান হেলসিং। পরিশ্রান্ত চেহারা। ক্লান্ত
গলায় জানতে চাইলেন, " তুমি ঠিক আছো তো মীনা?"
" হ্যাঁ, প্রফেসর "।
" ইলিনা আর কুইন্সি'কে দেখেছ? " " ওদের দেখিনি এখনও
পর্যন্ত প্রফেসর "। " আমরাও দেখিনি", ঘাড় ফিরিয়ে বললেন ডাঃ
সিউয়ার্ড। তাঁর হাতে ক্রুশটা তখনো ধরা।
ক্রমশ
অশুভ আত্মা
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now