বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

রিটার্ন অব ড্রাকুলা-৩৭

"উপন্যাস" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রিয়েন সরকার (০ পয়েন্ট)

X রিটার্ন অব ড্রাকুলা কাহিনী : ফ্রেডা ওয়ারিংটন অনুবাদক : ইসমাইল আরমান ------------------------------------- পর্ব ৩৭ঃ (মীনা হারকারের জার্নাল) পরে। একটু আগে কাউন্ট দেখা করে গেছে আমার সঙ্গে। জানলার কাঁচ ভেদ করে ওর মুখ দেখলাম প্রথমে - কুয়াশার ঘন এক মেঘের মাঝখানে। খানিক পর পাক খেয়ে সেই কুয়াশা ঢুকে পড়ল আমার ঘরে। তারই মাঝ থেকে বেরিয়ে এল ও। পরিচিত অবয়ব, তারপরেও তাকে দেখে আমার শরীরটা কেঁপে উঠল। " ভয় পেয়ো না, মীনা!" আমার হাত ধরে বলল সে, " খুব শীঘ্রি এমন একটা সময় আসবে, যখন আর কোনও কিছুতেই ভয় পেতে হবে না তোমাকে"। বোধহয় বোঝাতে চাইল, খুব শীঘ্রি জীবন্মৃতে পরিণত হব আমি - আর সেটা আঁচ করে আচমকা ক্ষুব্ধ হয়ে উঠল আমার হৃদয়। রাগী গলায় বললাম, " কত বড় সর্বনাশ করেছ তুমি আমার, জানো? জোনাথন আর কোনওদিন ফিরিয়ে নেবে না আমাকে। ছেলেকেও হারাব। বেঁচে থাকলেও সেটা হবে একপ্রকার বিতাড়িতের জীবন। " ভ্রুকুটি করল কাউন্ট। জিজ্ঞেস করল, " এ কথা কেন বলছ?" " কারণ কলুষিত হয়ে গিয়েছি আমি। তুমিই কলুষিত করেছ আমায়। কোনও সচেতন খ্রীষ্টান পুরুষ এমন স্ত্রী 'কে জায়গা দেয় না ঘরে"। অবজ্ঞার হাসি হাসল কাউন্ট। বলল, " যে সমাজ তোমার অসুবিধার কথা ভাবেনা, যে স্বামী তোমার অসহায়ত্বের কথা ভাবে না - তার জন্য কপাল চাপড়াচ্ছ? হাহ! আমাকে তুমি পিশাচ বলো, অথচ ওদের চেয়ে হাজার গুন উদারমনা আমি। যা-ই ঘটুক, আমি তোমায় কোনওদিন ফিরিয়ে দেব না। চিরদিন থাকব তোমার পাশে। জোনাথন বা কুইন্সির জন্য হা হুতাশ কোরো না, মীনা। চাইলে তুমি শেষপর্যন্ত ওদেরকেও নিজের করে নিতে পারবে। তিনবার.... স্রেফ তিনবার ওদের রক্তপান করতে হবে তোমায়। মানে....যদি তুমি আমার প্রস্তাবে রাজি হও আর কি"। এর কোনও জবাব দিতে পারলাম না। চুপ করে রইলাম। " কি সিদ্ধান্ত নিলে?" জিজ্ঞেস করল কাউন্ট। " কুইন্সিকে মরতে দেখতে চাও? নাকি চাও, ও অনন্তকাল বেঁচে থাকুক?" " আপাতত আমি শুধু ওকে জীবিত উদ্ধার করতে চাই। আর কিছু না। পরে না হয় সিদ্ধান্ত জানাব"। " বেশ, যা তোমার ইচ্ছা ", বলে চলে গেল ড্রাকুলা। ১ ডিসেম্বর হারমানস্টাডে পৌঁছেছি আমরা। ওয়াগনে চাপিয়ে তির্নাভ নদীর চওড়া উপত্যকা ধরে এখানে আমাদের নিয়ে এসেছে জিপসিরা। পথে কেউ কোনও কথা বলেনি আমার সঙ্গে। ভদ্রতা কাকে বলে জানে না ওরা। আচার আচরণ আদিম বর্বরের মতো। লোকগুলোকে দেখলেও ভয় করে। একেকজন যেন মূর্তিমান দৈত্য - পুরু গোঁফওয়ালা ভয়ঙ্কর চেহারা ওদের। ওদের দিকে তাকাইনি পর্যন্ত - যাত্রার পুরো সময়টা কাটিয়েছি পথের দু'পাশের দৃশ্য দেখতে দেখতে। বেশ কিছু গ্রাম পেরিয়ে এসেছি আমরা - দেখতে সুন্দর, ছবির মতো। কিন্তু ওগুলো দেখে আনন্দ পাইনি, তার বদলে শুধু মনে পড়ছে বাড়ি থেকে কতদূর চলে এসেছি আমি। যে বাড়িটায় এসে উঠেছি, সেখানে বড়সড় একটা কামরা দেওয়া হয়েচে আমাকে। কামরাটায় বড়সড় একটা ফায়ারপ্লেস থাকার কারণে ঠান্ডার তেমন উৎপাত নেই। জানলা দিয়ে পুরো হারমানস্টাড শহরটাই চোখে পড়ে। রাস্তাগুলো নুড়ি বিছনো, দুপাশে বারোক নির্মাণশৈলী অনুসারে বাড়িঘর। দূরে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে গীর্জার প্যাঁচানো চূড়া আর গম্বুজের সারি। আরও দূরে দেখা যাচ্ছে বরফে ঢাকা পাহাড়সারি - ওখানেই আমাদের গন্তব্য। বেচারা কুইন্সির পক্ষে কি সম্ভব ওই রুক্ষ পরিবেশে বেঁচে থাকা? অস্বীকার করার উপায় নেই, কাউন্টের কাজকর্মে কিছুটা সন্দিহান হয়ে উঠেছি আমি। ইলিনা যদি ওর বশীভূতই হবে তাহলে ইলিনাকে ও স্কলোম্যান্স পর্যন্ত পৌঁছতে দিচ্ছে কেন? ও নিজেই তো বলেছে, ইলিনা এবং ও পরস্পর রক্তপান করার ফলে ওর আত্মার সাথে একটা যোগসূত্র গড়ে উঠেছে ওর। ইলিনার সমস্ত কর্মকাণ্ড ওর গোচরে থাকবে। তাই-ই যদি হবে, তবে ইলিনা এতদূর এসব করতে পারল কি করে? যাই বলুক কাউন্ট, ও ইচ্ছে করলে ইলিনাকে এতদিনে ধরে ফেলত; কিন্তু সেটা করেনি কেন? নিশ্চয়ই কোনও বদ মতলব আছে ওর কিন্তু পরিস্থিতি এখন এমন যে ওর ওপর ভরসা করা ছাড়া আর কোনও বিকল্প নেই আমার সামনে। কি আর করা? মনের সমস্ত দ্বিধাদ্বন্দ্ব পাথরচাপা দিয়ে আশায় বুক বাঁধা ছাড়া আর কি-ই বা করার আছে আমার? ৩ অথবা ৪ ডিসেম্বর। তারিখের ব্যাপারে আমি এখন নিশ্চিত নই। সময়ের হিসেব হারিয়ে ফেলেছি। তাই ঘটনাগুলো শুধু ক্রমান্বয়ে লিখে যাব বলে ঠিক করেছি। দু তারিখে হারমানস্টাড ছেড়েছিলাম আমরা। পর্বতমালার ভেতরে যতদূর যাওয়া সম্ভব, ওয়াগনে করে জিপসিরা আমাদের নিয়ে এসেছিল। পথ দুর্গম হয়ে ওঠায় তারপর পায়ে হেঁটে এগোলাম আমি আর কাউন্ট। জিপসিরা রয়ে গেল পেছনে। বন জঙ্গল আর বুনো প্রান্তর ভেদ করে রাতের অন্ধকারে হাঁটছিলাম আমরা। চাঁদের হালকা আভাই পথ দেখার একমাত্র ভরসা। বাতাসে কেঁপে ওঠা গাছের পাতা আর কদাচিৎ নিঃসঙ্গ পেঁচার ডাক ছাড়া আর কোনও আওয়াজ ছিল না কোথাও। ঘুমিয়ে ছিল বিশ্বচরাচর। বেশ ঠাণ্ডা পড়েছিল, ক্ষণে ক্ষণে শীতে কেঁপে উঠছিলাম আমি। গাছপালার ঘন অরণ্য থেকে উঁচু ঘাসে ঢাকা খোলা একটা জায়গায় পৌঁছেই দাঁড়িয়ে পড়ল কাউন্ট। দিগন্তের দিকে ফিরে হাত নাড়তে দেখলাম ওকে, সঙ্গে সঙ্গে দেখলাম আকাশ ছেয়ে গেল ঘন কালো মেঘে। বইতে থাকল কনকনে ঠাণ্ডা হাওয়া। শুরু হলো ভারী তুষারপাত। ব্যাপারটা মোটেও স্বাভাবিক নয়। মনে হলো কাউন্টের প্রভাবেই অমন বিরূপ চেহারা নিয়েছিল প্রকৃতি। সামনে এগোন কষ্টকর হয়ে উঠল। কিন্তু কাউন্ট নির্বিকার। আমার হাত ধরে টেনে নিয়ে চলল সে। ধীরেধীরে খাড়া হয়ে এল পাহাড়ি ঢাল। কালচে পাহাড়ি প্রাচীর দেখে দমে গেলাম। শরীর তখন ক্লান্তিতে ভেঙে পড়েছে। হাঁপাতে হাঁপাতে বললাম, " আমার বিশ্রাম দরকার কাউন্ট। আজ রাতে আমার পক্ষে পাহাড় বাওয়া সম্ভব নয়"। " তা হলে বিশ্রামের একটা জায়গা খুঁজে দিচ্ছি তোমায়", নরম গলায় বলল কাউন্ট, " তারপর আমি একাই এগোব"। ঘাসে ঢাকা প্রান্তর পেরিয়ে উঁচু একটা টিলার কাছে পৌঁছলাম আমরা। দু'পাশে ঘন জঙ্গল। টিলার ডগায় মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে একটা কাঠের বিল্ডিং - দেখামাত্র বুঝলাম ওটা একটা আধভাঙা গীর্জা...এ অঞ্চলে দুর্লভ। প্যাঁচানো চূড়া তীরের মতো উঠে গেছে আকাশপানে। গীর্জার চারপাশে রয়েছে ছড়ানো ছিটানো পুরনো কবর। মাটির একটা রাস্তা গেছে প্রবেশপথের দিকে, রাস্তায় ফুটে আছে গরুর গাড়ির চাকার দাগ। পোর্চের নীচে পৌঁছে থেমে গেল ড্রাকুলা। গীর্জার দরজায় পেরেক মারা ক্রুশ বলে দিচ্ছে - ভেতরে ঢুকতে পারবে না সে। তাই আমাকে বলল, " এখানেই থাকো তুমি। আমি স্কলোম্যান্সে যাচ্ছি। কখন ফিরব বলতে পারছি না, ওখানে আমার সময় লাগবে। তবে যখনই ফিরি,তখন তোমার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত যেন তৈরি থাকে। নইলে তোমার ছেলেকে আর কোনদিনই দেখতে পাবে না তুমি"। কথা শেষ করেই উড়ন্ত তুষারের মাঝে হারিয়ে গেল ড্রাকুলা। আমিও ঝটপট ঢুকে পড়লাম গীর্জায়। ভেতরে কেউ নেই, প্রার্থনা বেদির পেছনে দেশলাই আর মোমবাতি পাওয়া গেল.....কয়েকটা জ্বালিয়ে ফেললাম, ব্যবস্থা করলাম আলোর। লকড়ির একটা চুলা খুঁজে বের করলাম এরপর, তাতে কাঠকুটো জড়ো করে আগুন জ্বাললাম, পোহাতে লাগলাম তাপ। সঙ্গে খাবারের পোঁটলা ছিল; সেখান থেকে রুটি, পনির আর সসেজ বের করে ক্ষুধা মেটালাম। বোতল থেকে খেলাম পানি। শরীরও গরম হয়ে উঠেছে ততক্ষণে, পরিষ্কার হয়ে এল চিন্তাভাবনা। টের পেলাম, চরম একটা ঘোষণা দিয়ে গেছে ড্রাকুলা। আর দেরী করতে রাজি নয় সে। যখন ফিরবে, তখন আমাকে জানাতেই হবে - আমি ওর সঙ্গিনী হতে রাজি আছি কি না.....সেইসঙ্গে কুইন্সির জন্য বেছে নিতে হবে মৃত্যু অথবা ভ্যাম্পায়ারের জীবন। দেয়ালে হেলান দিয়ে চোখ মুদলাম। সাহায্য কামনা করলাম ঈশ্বরের কাছে। কিন্তু হায়, তা কি আমি পাব? পিশাচের স্পর্শে অপবিত্র হয়ে গেছি আমি, কেন আমার প্রার্থনা কবুল করবেন ঈশ্বর? আবার যখন চোখ খুললাম, দৃষ্টি চলে গেল গীর্জার দেওয়ালে। সব জায়গা ঢাকা পড়ে গেছে কাঁচা হাতে আঁকা দেয়ালচিত্রে। সেইসব ছবির মাঝ থেকে সন্ন্যাসী আর ধর্মযোদ্ধারা যেন তাকিয়ে আছে আমার দিকে! উপহাস করছে আমার মনের দ্বিধাদ্বন্দ্ব লক্ষ্য করে!এক হিসেবে সেই উপহাস অযৌক্তিক নয়। শুভ আর অশুভের মাঝ থেকে একটাকে বেছে নেওয়া কঠিন হওয়া উচিত নয় কোনও খাঁটি খ্রিস্টানের জন্য। তার ফলাফল যতই ভয়াবহ হোক না কেন। এর অর্থ মৃত্যু বেছে নিতে হবে আমাকে - আপন সন্তানের মৃত্যু! সেটাই পারছি না। অশান্ত হৃদয় নিয়ে বসে রইলাম আমি পুরনো সেই নির্জন গীর্জার ভেতরে। বোধহয় ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, ভোরের দিকে জেগে উঠলাম। আগুন নিভে গিয়ে লকড়িগুলো তখন অঙ্গারে পরিণত হয়েছে। মোমবাতিগুলোও নিভু নিভু প্রায়। বাইরে তুষারঝড়ের প্রকোপ বেড়েছে, পাগলা হাওয়ার অত্যাচারে ককিয়ে উঠছে গীর্জার প্রাচীন কাঠামো। আগুন নিভে যাওয়ায় তাপ নেই, ঠান্ডায় অসাড় হয়ে গেছে আমার শরীর। হঠাৎ দড়াম করে খুলে গেল গীর্জার দরজা। আপাদমস্তক সাদা হয়ে যাওয়া দুটো ছায়ামূর্তি ঢুকল সেখান দিয়ে। স্বস্তির নিশ্বাস ফেললাম তাঁদেরকে চিনতে পেরে। ভ্যান হেলসিং আর ডাঃ সিউয়ার্ড। " মিসেস হারকার!" আমাকে দেখে প্রায় ছুটে এলেন ডাঃ সিউয়ার্ড, " ঈশ্বরকে ধন্যবাদ আপনাকে খুঁজে পেয়েছি। জানলা দিয়ে আলো দেখেই সন্দেহ হয়েছিল। আপনি ঠিক আছেন তো? ড্রাকুলা কোথায়?" " স্কলোম্যান্সে গেছে ও", দাঁতকপাটি ঠেকিয়ে কোনওমতে জবাব দিলাম। তাড়াতাড়ি পাশে বসে আমায় দু ঢোক ব্রান্ডি খাওয়ালেন ভ্যান হেলসিং। শরীরের শিরায় উপশিরায় যেন আগুনের স্রোত বয়ে গেল। চোখের পলকে কেটে গেল আড়ষ্টতা। সোজা হয়ে বসলাম। আমার ঘাড় পরীক্ষা করতে শুরু করলেন ভ্যান হেলসিং। " ওভাবে দেখার কিছু নেই, প্রফেসর ", বললাম তাঁকে, " আমার কিছু হয়নি। স্রেফ ঠান্ডায় জমে গিয়েছি, আর কিছু না"। " তা হলে তাড়াতাড়ি শরীর গরম করে নাও", বললেন প্রফেসর। " অনেকদূর যেতে হবে আমাদের। " ঠান্ডায় প্রফেসরের নাকের ডগা টুকটুকে লাল হয়ে গেছে, তাঁকে দেখাচ্ছে সার্কাসের ভাঁড়ের মতো। ফিক করে হেসে ফেললাম। " হাসছ যে?" জিজ্ঞেস করলেন হেলসিং। " আপনার নাক, প্রফেসর! " নিজের নাকের ডগায় হাত রেখে এবার নিজেও হেসে ফেললেন প্রফেসর। বললেন, " যত খুশি ঠাট্টা করো। তোমার মুখে যে হাসি ফুটেছে, এটাই সবচেয়ে বড় কথা"। ইলিনার ব্যাপারে আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন ওঁরা। জানালাম, এখনো পর্যন্ত ইলিনা'র ছায়াও দেখতে পাইনি আমি। ভ্যান হেলসিং বললেন, " যেখানেই গিয়ে থাকুক, আশা করি ভাল কোনও আশ্রয় খুঁজে নিয়েছে। নইলে এই আবহাওয়ায় কুইন্সি নির্ঘাত অসুস্থ হয়ে পড়বে। মীনা, হাঁটতে পারবে তুমি? এখানে আরেক মূহুর্তও সময় নষ্ট করা চলবে না। স্কলোম্যান্সে পৌঁছনোর আগেই বাধা দিতে হবে ড্রাকুলাকে। সেটা আদৌ সম্ভব কিনা জানি না; কিন্তু চেষ্টা তো করা চাই"। " পারব", বলে উঠে দাঁড়ালাম। ভ্যান হেলসিং আর ডাঃ সিউয়ার্ডের সাহায্য নিয়ে বেরিয়ে এলাম গীর্জার বাইরে। এতক্ষণে বুঝলাম, কি তাণ্ডব বয়ে যাচ্ছে চারপাশে! ঝোড়ো বাতাসের শোঁ শোঁ আওয়াজে কান ঝালাপালা। তুষারের পর্দায় ঢাকা পড়ে গেছে চারদিক। দশ ফুট'ও দৃষ্টি চলে না। " এই আবহাওয়া ড্রাকুলাই সৃষ্টি করেছে", বললাম আমি, " কেউ যেন তার পিছু নিতে না পারে। আমিও যেন পালাতে না পারি গীর্জা ছেড়ে"। কথাটা বলতে বলতেই তুষারের মাঝে তৃতীয় একটা মূর্তিকে আকার নিতে দেখলাম। আমাদের দিকে উড়ে এল ওটা। ভয়ে প্রফেসরের হাত খামচে ধরলাম আমি। মড়ার মতো চেহারা আর রক্তলাল ঠোঁট দেখে বুঝতে অসুবিধা হলো না.....এটা একটা ভ্যাম্পায়ার! কারফ্যাক্স অ্যাবিতে দেখা সেই রহস্যময় ভ্যাম্পায়ার, কাউন্টের ঘাড়ে যে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল!' " ভয় পাবেন না, মিসেস হারকার", সামনে এসে বলল সে, " আমি আপনাদের সাহায্য করতে এসেছি। বেঁচে থাকতে যতটা বিশ্বাস করতেন আমাকে, এখনো ততটাই করতে পারেন নির্দ্বিধায়। আমি আপনার ক্ষতি করব না"। এবার চিনতে পারলাম তাঁকে। " প্রফেসর কোভাক্স!" বিস্মিত গলায় বলে উঠলাম আমি। মনে পড়ল, ট্রানসিলভ্যানিয় া বেড়াতে যাওয়ার পথে বুদাপেস্টে এঁরই বাড়িতে আতিথ্য গ্রহণ করেছিলাম আমরা। " হ্যাঁ", সুর মেলালেন ভ্যান হেলসিং, " ও আমাদের সঙ্গেই এসেছে... স্কলোম্যান্সে নিয়ে যাবে আমাদের। ওকে ছাড়া এতদূর আসতে পারতাম না আমরা"। " কিন্তু ড্রাকুলা তো বলেছে, আপনার পরামর্শেই নাকি কুইন্সিকে নিয়ে পালিয়ে এসেছে ইলিনা", কোভাক্সকে উদ্দেশ্য করে আমি বিস্মিত গলায় বললাম, " ইলিনা তো শুনেছি আপনার সঙ্গেই এখানে পালিয়ে এসেছে"। " তা হলে মিথ্যা বলেছে সে", বললেন কোভাক্স, " যাক গে, এ নিয়ে এখন আলোচনা করে লাভ নেই। হাতে সময় কম, আমাদের এখুনি রওনা হওয়া দরকার"। " কিভাবে? " বললাম আমি, " কি ভয়ঙ্কর ঝড় বইছে বাইরে, দেখেছেন? পথ হারিয়ে নির্ঘাত মারা পড়ব আমরা"। " এতটা হতাশ হবেন না", বললেন কোভাক্স। এই বলে উল্টো ঘুরলেন। অদ্ভুত ভঙ্গিমায় হাত নাড়তে থাকলেন তিনি। একটু পরেই তুষারের ভেতর বিশালদেহী কতগুলো আবছা মূর্তি উদয় হলো। আকার আকৃতিতে মনে হলো না ওরা মানুষ। নিচু লয়ের একটা গর্জন ভেসে এল মূর্তিগুলোর দিক থেকে। সভয়ে জিজ্ঞেস করলাম, " প্রফেসর কোভাক্স, ওগুলো কি?.....ভল্লুক? " " হ্যাঁ, মিসেস হারকার", বললেন কোভাক্স, এইসব ক্ষমতা আমি নতুন অর্জন করেছি। প্রাণীর ওপর প্রভাব বিস্তারের ক্ষমতা। আমিই ডেকে এনেছি এদের। এখন এরা আমাদের ঝোড়ো বাতাসের হাত থেকে রক্ষা করে নিয়ে যাবে স্কলোম্যান্সের পথে"। বুঝলাম, কাউন্ট যেভাবে নেকড়ে বা বাদুড়কে দিয়ে কাজ করাতে পারে, সেভাবে কোভাক্সও এই ভালুকগুলোকে দিয়ে কাজ করাচ্ছেন। ভ্যাম্পায়ারদের এই ক্ষমতা সম্পর্কে কমবেশি জানা আছে আমাদের, তাই নির্দ্বিধায় পা বাড়ালাম তাঁর পিছু পিছু। খানিক পরেই প্রহরীর মতো পাঁচটা ভালুক ঘিরে ফেলল আমাদের, এগোতে শুরু করল তাল মিলিয়ে। ওদের বিশাল দেহগুলো ঝোড়ো বাতাসের বিরুদ্ধে প্রাচীরের মতো কাজ করছে, কাজেই সহজেই হাঁটতে পারলাম আমরা। শুরু হলো অবিরাম পথচলা। যাত্রাটা কতখানি দীর্ঘ ছিল, তা ঠিক বলতে পারব না। একদিন হতে পারে....দু'দিন হওয়াও বিচিত্র নয়। সময় নিয়ে ভাববার কোনও অবকাশ ছিল না। শরীরের সমস্ত শক্তি একত্র করে শুধু এগিয়েই চলেছি আমরা। চলতে চলতে প্রফেসর কোভাক্স কিভাবে ভ্যাম্পায়ার হলেন - সেই কাহিনী আমায় শোনালেন ভ্যান হেলসিং। সমবেদনা অনুভব করেছি কোভাক্সের জন্য। সেইসঙ্গে বেহেরিটের কথা শুনে ভয়ে কেঁপে উঠেছি। যদ্দূর বুঝেছি, কাউন্ট ড্রাকুলার চেয়েও ভয়ঙ্কর প্রকৃতির পিশাচ সে। কুইন্সি যদি ওর হাতে পড়ে, তার চেয়ে খারাপ আর কিছু হতে পারে না। বিশ্রাম আর খাওয়াদাওয়ার জন্য নিয়মিত, কিন্তু সংক্ষিপ্ত বিরতি নিলাম আমরা। সময় সুযোগমতো একটু আধটু ঘুমিয়েও নিলাম। তবে সেই ঘুম প্রশান্তির হলো না। চোখ মুদলেই ভয়ঙ্কর সব দুঃস্বপ্ন - নিজেকে নিয়ে, কুইন্সিকে নিয়ে। যা হোক, ধীরেধীরে ক্লান্তি ছেঁকে ধরল আমাদেরকে। কোভাক্স যখন উঁচু একটা পাহাড় টপকে আমাদেরকে নিয়ে জলাশয় আর জঙ্গলে ঘেরা একটা উপত্যকায় পৌঁছলেন, তখন আমাদের সবার আধমরা দশা। উপত্যকায় পা রাখতেই গর্জে উঠল বাতাস। দুরন্ত বেগে এসে ঝাঁপিয়ে পড়ল আমাদের গায়ের ওপর। মনে হলো বুঝি তাড়াতে চাইছে আমাদেরকে, উড়িয়ে দিতে চাইছে খড়কুটোর মতো। ডাঃ সিউয়ার্ড চেঁচিয়ে উঠলেন, ভ্যান হেলসিং শক্ত করে চেপে ধরলেন আমার হাত। ভালুকগুলো পাগলের মতো ছোটাছুটি করে এদিকওদিক পালিয়ে গেল। আমাদেরকে ওঁর পিছু নিতে বলে ছুট লাগালেন কোভাক্স, আমরাও তাই করলাম। খুব শীঘ্রি পৌঁছে গেলাম বিশাল এক গুহামুখের সামনে। ঢুকে পড়লাম ওখানে। আর তখুনি পাহাড়ি ঢাল থেকে নামল তুষারধস। বন্ধ হয়ে গেল গুহামুখ। বেরোবার পথ গেল বন্ধ হয়ে। জ্যান্ত কবর হলো আমাদের। ডাঃ সিউয়ার্ডের হাতে ধরা লন্ঠনের মিটমিটে আলোয় স্থানু হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম আমরা কিছুক্ষণ। ধাতস্থ হয়ে নেবার চেষ্টা করছি। দেখার মতো চেহারা হয়েছে সবার। ক্লিষ্ট, পরিশ্রান্ত। সবচেয়ে খারাপ অবস্থা ভ্যান হেলসিংয়ের। বয়স্ক মানুষ, শারীরিক ধকলে সহ্যের শেষ সীমায় পৌঁছে গেছেন তিনি, তীব্র ঠান্ডায় নীল হয়ে গেছে চামড়া। শ্বাস ফেলছেন ধীরেধীরে। চারপাশে নজর বোলালাম। গুহাটা বেশ বড়, বাতির আলো সবখানে ঠিকমতো পৌঁছচ্ছে না। মাথার ওপর থেকে ভেসে আসছে সড় সড় আওয়াজ। বাদুড় বোধহয়। বাতাসে তাদের বিষ্ঠা আর সোঁদা গন্ধ। " আটকা পড়ে গেছি আমরা", বললাম আমি, " এখান থেকে বেরোতে হলে বরফ খুঁড়তে হবে"। " তার কোনও দরকার নেই", বললেন কোভাক্স, " জায়গামতোই এসেছি আমরা। এটাই স্কলোম্যান্সের প্রবেশপথ "। বুক ঢিবঢিব করে উঠল কথাটা শুনে। " আমরা কি যাব ওখানে?" " অবশ্যই। নইলে এসেছি কেন?" গুহার ভেতরদিকে এগোতে শুরু করলেন কোভাক্স। আমরা পিছু নিলাম তাঁর। খানিক পরে অন্ধকারের মাঝে ফুটে উঠল আলোর রেখা - দূর থেকে আসছে। যেন আমাদের স্বাগত জানাবার জন্যেই জ্বালানো হয়েছে আলো। যত এগোলাম, ততই উজ্জ্বল হতে থাকল আলোটা। হঠাৎ সেই আলোর মাঝে দেখা গেল একটা ছায়ামূর্তি। আমাদের দিকে এগিয়ে আসছে। আলোটা তীব্র হয়ে উঠল, ঝলসে গেল চোখ। বোঁ করে ঘুরে উঠল মাথা। অস্ফুট একটা আর্তনাদ করলাম আমি। তারপর..... হঠাৎ....দপ করে নিভে গেল সব আলো - গুহার ভেতরেরটা, এমনকি ডাঃ সিউয়ার্ডের হাতের লন্ঠনটাও গেল নিভে। নিকষ অন্ধকার গ্রাস করল আমাদের। চিৎকার করে উঠলেন ভ্যান হেলসিং। কাঁধে একজোড়া রোমশ হাতের স্পর্শ অনুভব করলাম। দুনিয়া দুলে উঠল, হুড়মুড় করে পড়ে গেলাম মেঝেতে। তারপর আর কিছু মনে নেই। ক্রমশ অশুভ আত্মা


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১০৮২ জন


এ জাতীয় গল্প

→ রিটার্ন অব ড্রাকুলা-৩৭

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now