বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
রিটার্ন অব ড্রাকুলা
কাহিনী : ফ্রেডা ওয়ারিংটন
অনুবাদক : ইসমাইল আরমান
-------------------------------------
পর্ব ৩৬:
ঠিক এইসময় দড়াম করে খুলে গেল আমার ঘরের দরজা।
করিডোর থেকে আসা এক চিলতে আলোর মাঝে দাঁড়িয়ে
আছেন মিসেস সিউয়ার্ড - বোধহয় আমার চিৎকার শুনেই
ছুটে এসেছেন তিনি। ছোট্ট একটা আর্তনাদ করে আমাকে
ছেড়ে দিল ইলিনা। কারণটা বুঝতে অসুবিধে হলো না -
ডান হাতে বড়সড় একটা কাঠের ক্রুশ উঁচু করে ধরেছেন
মিসেস সিউয়ার্ড। অন্যহাতে রয়েছে আমার কাছ থেকে
কেড়ে নেওয়া সেই গজালটা। রুদ্রমূর্তি ধারণ করেছেন
তিনি।
" ওর কাছ থেকে সরে যা, ডাইনী! " চেঁচিয়ে উঠলেন
মিসেস সিউয়ার্ড, " ঈশ্বরের নামে আদেশ করছি - চলে
যা!"
ঝটপট বিছানা থেকে নেমে গেল ইলিনা। মিসেস
সিউয়ার্ডের দিকে ফিরে পশুর মতো ক্রুদ্ধ গর্জন করল।
বদলে গেছে ও - মিষ্টি, সুন্দর চেহারা সরে গিয়ে
সেখানে ভর করেছে কুৎসিত, কদাকার একটা মুখ। ওটা
দেখার সঙ্গে সঙ্গে সম্বিৎ ফিরে পেলাম। জ্বলে উঠল
ঘাড়ের কাছটা, হাত দিয়ে চেপে ধরলাম ক্ষতস্থান। বুঝতে
পারলাম, কি করে বসেছি! আমার বিছানায়.....যেখানে
মীনার স্থান....সেখানেই কিনা তুললাম ইলিনার মতো
ভয়ঙ্কর এক রাক্ষসীকে! অনুশোচনায় ভরে গেল আমার মন!
মিসেস সিউয়ার্ড অবশ্য আমার দিকে তাকালেন না। ক্রুশ
উঁচু করে ধীরেধীরে এগোতে শুরু করেছেন তিনি।
মুখে
উচ্চারণ করে চলেছেন বাইবেলের শ্লোক। ফাঁদে পড়া
জানোয়ারের মতো ইলিনাও পিছোতে শুরু করেছে।
দাঁতমুখ খিঁচিয়ে ভয় দেখাতে চাইছে প্রতিপক্ষকে, কিন্তু
মিসেস সিউয়ার্ড নির্বিকার। এগিয়েই চললেন ইলিনার
দিকে।
পিছোতে পিছোতে রুমের কোণায় চলে গেল ইলিনা। ওর
পিঠ ঠেকে গেল দেয়ালে। কোথাও যাবার আর উপায়
নেই। সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুৎ খেলে গেল মিসেস সিউয়ার্ডের
দেহে। ক্রুশটা চকিতে রেখে দিয়ে দু'হাতে বর্শার মতো
ধরলেন গজালটা, ছুটে গেলেন ঝড়ের বেগে। ইলিনা কিছু
বুঝে ওঠার আগেই গজালটা সর্বশক্তি দিয়ে গেঁথে
দিলেন ওর হৃদপিন্ড বরাবর।
ফিনকি দিয়ে ছুটল রক্ত, ভিজে গেল দুজনেরই পোশাক।
আর্তনাদ করে উঠল ইলিনা.....খুব জোরে নয়....শেষ
নিশ্বাসের সঙ্গে বুক চিরে বেরিয়ে আসা অস্ফুট একটা
আওয়াজ। বুকে বিঁধে থাকা গজালটা দু'হাতে ধরে,
কয়েকবার দেহটা মোচড়া মুচড়ি দিয়ে স্থির হয়ে গেল
ইলিনা। দুচোখের দৃষ্টি বিস্ফারিত। ধীরেধীরে ওর
চেহারা থেকে অদৃশ্য হলো পৈশাচিক রূপটা। স্বাভাবিক
হয়ে এল। বন্ধ হয়ে গেল চোখদুটো। হাঁটু মুড়ে লাশটা পড়ে
গেল মেঝেতে।
কাঁপতে কাঁপতে বিছানায় এসে বসলেন মিসেস
সিউয়ার্ড। যা করেছেন, সেটা নিজেও বোধহয় বিশ্বাস
করতে পারছেন না। অনেকক্ষণ চুপ করে রইলাম দুজনে।
শেষে নীরবতা ভেঙে তিনি জানতে চাইলেন, " আপনি
ঠিক আছেন, জোনাথন?"
ঘাড়ে লেগে থাকা চাপ চাপ রক্ত স্পর্শ করে মাথা
ঝাঁকালাম কেবল। মুখ দিয়ে কোনও আওয়াজ বেরোল না।
উঠে দাঁড়িয়ে পোশাকের ভাঁজ ঠিক করলেন মিসেস
সিউয়ার্ড। ধীর স্থির, শান্ত রূপটা ফের ফিরে এল তাঁর
মধ্যে। ব্যান্ডেজ এনে আমার ঘাড়ের ক্ষতটা ড্রেসিং
করে দিলেন। তারপর বললেন, লাশের একটা সদগতি করতে
হবে। ডাক্তার বা কেয়ারটেকারকে খবর দেবার প্রশ্নই
আসে না, ইলিনার বুকে গেঁথে থাকা গজালের ব্যাপারটা
ব্যাখ্যা করতে পারব না। উপায় রয়েছে একটাই -
কারফ্যাক্স অ্যাবির চ্যাপেলে রেখে আসতে হবে
লাশটা।
দুজনে ধরাধরি করে নিয়ে গেলাম লাশটা কারফ্যাক্সে।
গেট খোলাই ছিল, নেকড়েগুলোকে দেখা গেল না।
ড্রাকুলা বিদায় নেবার সাথে সাথে ওগুলোও চলে গেছে
বোধহয়। চ্যাপেলের একটা সমাধিতে ইলিনাকে শুইয়ে
দিলাম আমরা। ওর মুখে রসুন গুঁজে মাথা ধড় থেকে
আলাদা করে দেওয়া দরকার, কিন্তু আমার শক্তি বা
সাহসে কুলোচ্ছিল না। অপ্রিয় কাজটা মিসেস
সিউয়ার্ডই করলেন। আশ্চর্য শক্ত মনের মহিলা - না
দেখলে বিশ্বাস করা মুশকিল।
তবে বাড়িতে ফিরে আসার পর ভেঙে পড়লেন তিনি।
ভাঙা গলায় আমাকে বললেন, " আমি দুঃখিত জোনাথন।
আপনাকে সেইসময় বাধা দিয়ে বড্ড ভুল করেছিলাম,
নইলে এমন ঘটনা ঘটত না। ভাগ্যিস আপনার চিৎকারে ঘুম
ভেঙে গিয়েছিল আমার, নইলে আরও ভয়ঙ্কর কিছু ঘটে
যেত। ক্ষমা করুন আমাকে, ক্ষমা করুন!"
২৬ নভেম্বর।।
মুক্তি পেয়েছে ইলিনার আত্মা। এর জন্য পুরো কৃতিত্ব
মিসেস সিউয়ার্ডের প্রাপ্য। কিন্তু সে রাতের কথা
অনেক চেষ্টা করেও ভুলতে পারছি না আমি। চোখ মুদলেই
কানে ভেসে আসে ইলিনার সেই মাদক মেশানো কন্ঠ।
যেন এখনো ডাকছে আমায়। এ কি হয়েছে আমার!
কুইন্সি রোজই জানতে চায়, " বাবা! ইলিনা আন্টি
কোথায়?" এটা সেটা বলে বোঝাতে হয় ওকে। বিস্ময়কর
ব্যাপার হলো, মায়ের কথা একবারও জিজ্ঞেস করে না
ও। ইলিনা মনে হচ্ছে শুধু আমার ওপর নয়, কুইন্সিকেও জাদু
করেছিল। তবে একটা জিনিস পরিষ্কার - আগের চেয়ে
অনেক বেশী সুস্থ কুইন্সি। গত ক'দিনে সামান্য দুর্বলতাও
দেখিনি ওর মাঝে। অসুখ হয়নি কোনও। খেলাধুলো করছে
আর দশটা স্বাভাবিক বাচ্চার মতো। এসব কি কারফ্যাক্স
অ্যাবিতে কয়েকদিন কাটানোর ফল? প্রথম কিছুদিন
শঙ্কিত চোখে নজর রেখেছি ওর ওপর। কিন্তু এখন আমি
নিশ্চিত - ওর রক্তপান করেনি কাউন্ট বা ইলিনা। শরীর
থেকে রোগব্যাধি দূর হবার পেছনে সেসবের কোনও
ভূমিকা নেই। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, অলৌকিক কিছু
একটা কান্ডই ঘটে গেছে।
মীনাকে ক্ষমা করে দিয়েছি আমি - সত্যিকার অর্থেই।
ইলিনার সঙ্গে সে রাতের অভিজ্ঞতা আমায় বুঝিয়ে
দিয়েছে রক্তলোলুপ পিশাচদের সামনে আমরা কতটা
অসহায়। যে অপরাধের জন্য মীনাকে দোষারোপ করেছি
এতদিন, এখন সেই অপরাধের ভাগীদার আমি নিজেও।
কাজেই ওর ওপর কোনও ক্ষোভ পুষে রাখার মানে হয় না।
বরং এতদিন যে আচরণ করেছি ওর সঙ্গে, তার জন্য আমি
অনুতপ্ত। দুঃখের বিষয় হলো, এই অনুতাপ আমি ওর সামনে
প্রকাশ করতে পারছি না। সামনাসামনি ক্ষমা চাইতে
পারছি না নিজের ভুলের জন্য।
ড্রয়িংরুমে একাকী বসে আছি আমি। ভাবছি মীনার
কথা। প্রার্থনা করছি ঈশ্বর যেন মীনাকে সুস্থভাবে
ফিরিয়ে আনেন আমাদের মাঝে। ভ্যান হেলসিং এখনও
পর্যন্ত যোগাযোগ করলেন না। ওঁদের অমঙ্গল আশঙ্কায়
ক্রমাগত বুক কাঁপছে আমার।
ঈশ্বর! সাহায্য করো ওঁদের!
জোনাথন হারকারের কাছে ভ্যান হেলসিংয়ের চিঠি
২৮ নভেম্বর, ভিয়েনা।
প্রিয় জোনাথন,
সুসংবাদ। আমাদের গত কিছুদিনের কষ্টকর তদন্তের ফল
মিলেছে। জানতে পেরেছি, কিভাবে এবং কোন পথে
কাউন্ট তার গন্তব্যের উদ্দেশ্যে পাড়ি জমিয়েছে। না,
জাহাজে নয়। এবার আরও দ্রুততর একটা মাধ্যম বেছে
নিয়েছে ও। ভিয়েনা থেকে বুদাপেস্টগামী ট্রেনে
কফিন আকৃতির একটা বাক্স তোলা হয়েছে বলে খবর
পেয়েছি আমরা, বাক্সটা নিয়ে যাচ্ছেন এক সম্ভ্রান্ত
ইংরেজ মহিলা - বর্ণনা থেকে মনে হচ্ছে সেই মহিলা
মীনা ছাড়া আর কেউ নয়। ইলিনা আর কুইন্সি ওদের সঙ্গে
নেই। ওদেরকে সম্ভবত লুকিয়ে রেখেছে ড্রাকুলা। যা
হোক, আপাতত মূল শত্রুর পিছু নেয়াই ভাল বলে মনে
হয়েছে আমার পক্ষে, তাই সেটাই করছি। ইলিনা আর
কুইন্সির খোঁজ মীনার কাছ থেকে পরেও পাওয়া যাবে। এ
মূহুর্তে ওদের চেয়ে মোটামুটি বারো ঘন্টা পিছিয়ে
আছি আমরা। খুব শীঘ্রি নাগাল পাব আশা করছি।
কোভাক্স আমাদের সঙ্গে যাচ্ছে না। ও এগোচ্ছে
আমাদের সমান্তরালে, আলাদা পথে। আমার ধারণা,
নেকড়ের বেশ ধরে স্থলপথে যাচ্ছে ও। রাত হলে আশ্রয়
নিচ্ছে পুরনো গোরস্থানগুলোয়। বুদাপেস্টে পৌঁছনোর পর
আবার একত্র হব আমরা।
বুকে সাহস রাখো। খুব শীঘ্রি আরও বড় সুসংবাদ দিতে
পারব বলে আশা রাখি। মিসেস সিউয়ার্ডের
তত্ত্বাবধানে নিশ্চয়ই সুস্থ হয়ে উঠছ? আমাদের জন্য
প্রার্থনা কোরো,
ইতি,
আব্রাহাম ভ্যান হেলসিং
মীনা হারকারের জার্নাল
৩০ নভেম্বর।।
বেশ কিছুদিন হলো জার্নাল লিখিনি। তেমন কোনও
সুযোগ বা মনের অবস্থাও ছিল না। তবে এক রাতের জন্য
আজ আমিরা সিগিসোরায় থেমেছি, কাল
হারমানস্টাডের উদ্দেশ্যে রওনা দেব। হাতে কিছুটা সময়
পেয়ে কাগজ কলম নিয়ে বসেছি। ছোট্ট একটা হোটেলে
উঠেছি। কামরাটা জরাজীর্ণ, আইভি লতায় ঢাকা পড়ে
আছে এর জানলাগুলো। আর কাউন্ট..... থাক, সব ধাপে
ধাপেই লিখি।
কারফ্যাক্স থেকে যখন আমরা রওনা দিই, তখন আমার
বিহ্বল দশা। কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছিলাম না,
ইলিনা আমার ছেলেকে নিয়ে পালিয়ে গেছে। এর
পেছনে কোনও যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যাও খুঁজে পাচ্ছিলাম
না। কিন্তু কাউন্ট আমায় নিশ্চয়তা দিয়েছে, ঘটনা
আসলেই তা-ই। ওর ওপর আস্থা না রেখে উপায়ও ছিল না
আমার।
কাউন্ট আমায় বলেছে, ইলিনার ধারণা, কাউন্ট ওর সঙ্গে
বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। তাই ও কাউন্টকে ছেড়ে ওর
আন্দ্রে চাচা'র সঙ্গে চলে গেছে। ভাবছে ওর আন্দ্রে
চাচা ওকে অমরত্ব দেবে। দুজনেই তাই এখন
স্কলোম্যান্সের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছে।
" কিন্তু তুমি এতটা নিশ্চিত হচ্ছ কিভাবে?" জিজ্ঞেস
করেছিলাম ওকে।
" এমন প্রশ্ন করা উচিত হচ্ছে না তোমার", বিরক্তির সুরে
বলেছিল কাউন্ট, " আমরা একে অপরের রক্তপান করার পর
কি হয়েছিল তোমার বেলায়? দিব্যচোখে দেখতে
পাচ্ছিলে কোথায় আমি যাচ্ছি না যাচ্ছি? ওভাবেই তো
পিছু নিয়েছিলে গতবার তুমি আর তোমার সঙ্গীরা!
ইলিনার রক্তও আমি পান করেছি, মীনা। কাজেই ও
কোথায় যাচ্ছে, সেটা আর অজানা নয় আমার কাছে"।
" ওকে ফিরিয়ে আনছ না কেন?" জিজ্ঞেস করেছিলাম
ওকে, " তোমার তো অনেক শক্তি। যদি ডাকো ওকে, ও কি
সেই ডাক অগ্রাহ্য করতে পারবে?"
" এখন ও খোদ শয়তানের ডাকে সাড়া দিচ্ছে, মীনা। তার
সামনে আমার শক্তি কিছুই না"।
কুইন্সির জন্য বড়ই ভয় হচ্ছিল আমার। শীতকাল প্রায় শুরু
হয়ে গেছে, ট্রানসিলভ্যানিয়ার আবহাওয়াও ভীষণ
প্রতিকূল। নাজুক শরীরে ওখানকার ঠাণ্ডা কিছুতেই সহ্য
করতে পারবে না ও। যেভাবেই হোক ওকে খুঁজে বের
করতে হবে, তাই রাজি হয়ে গিয়েছিলাম কাউন্টের
প্রস্তাবে।
ক্যারিজে চড়ে ডোভার পর্যন্ত গিয়েছি আমরা। ওখান
থেকে নদীপথে আর ট্রেনে চড়ে পাড়ি জমিয়েছি
ট্রানসিলভ্যানিয়ার উদ্দেশ্যে। দিনের বেলা যেহেতু
ভ্রমণ করতে পারে না ড্রাকুলা, তাই বড় একটা বাক্স
নিতে হয়েছে সঙ্গে। দিনের বেলা ওটাতেই ঘুমোয় আর
বিশ্রাম নেয় সে - আমি থাকি পাহারায়। তদারক করি এক
ট্রেন থেকে অন্য ট্রেনে ওটা'র স্থানান্তর। কাজটায়
ইতিমধ্যে বেশ পারদর্শীও হয়ে উঠেছি। সম্ভ্রান্ত ব্রিটিশ
মহিলার ঠাটবাট দেখিয়ে সহজেই সামাল দিচ্ছি
কৌতূহলী রেলকর্মী ও কর্মকর্তাদের।
কখনো সখনো যে কাউন্টকে ধ্বংস করে দেবার প্রলোভন
যে অনুভব করি না, তা নয়। খুব সহজ কাজ - দিনের বেলা ও
যখন ঘুমিয়ে থাকে, বাক্সের ডালা খুলে ওর বুক বরাবর
একটা কাঠের ধারালো কীলক ঢুকিয়ে দিলেই হয়। কিন্তু
পারি না সেটা। কারণ ওর সাহায্য ছাড়া ইলিনাকে খুঁজে
বের করা সম্ভব নয়। তা ছাড়া.....ধীরেধীরে কাউন্টের
প্রতি অদ্ভুত একটা টানও সৃষ্টি হয়েছে আমার মধ্যে।
হিংস্র, দয়াহীন মুখোশটার নীচে লুকিয়ে থাকা ভদ্র,
অমায়িক রূপটার প্রতি অনুরক্ত হয়ে পড়ছি ধীরেধীরে।
কেন যেন মনে হয়, ও না থাকলে দুনিয়াটা আমার কাছে
অসম্পূর্ণ হয়ে যাবে।
এসব হয়তো মনের দুর্বলতা.... কিন্তু সে দুর্বলতায় খাদ নেই
কোনও। পুত্র হারা এই মায়ের জন্য এখন এই কাউন্টই
সবচেয়ে বড় ভরসা। ওর হাতেই নিজেকে সঁপে দিয়েছি।
শুধু আমার ছেলেটা যেন সুস্থভাবে আমার কাছে ফিরে
আসে।
এই দীর্ঘ যাত্রায় উল্লেখযোগ্য একমাত্র ঘটনাটা ঘটেছে
বুদাপেস্ট থেকে ক্লাউসেনবার্গ যাবার পথে। বরাবরের
মতো মালগাড়ির ভেতর বসে ছিলাম আমি - কাউন্টের
বাক্সের পাশে প্রহরী হয়ে। ভোরের দিকে ট্রেনের
দুলুনিতে তন্দ্রামতো এসেছিল, হঠাৎ জেগে উঠলাম
পায়ের শব্দে। ঘাড় ফেরাতেই মালগাড়ির বাক্সপ্যাঁটরার
মাঝ দিয়ে দু'জন মানুষকে এগিয়ে আসতে দেখলাম।
একেবারে কাছে না আসা পর্যন্ত চিনলাম না ওঁদের।
প্রফেসর ভ্যান হেলসিং এবং ডাঃ সিউয়ার্ড!
বিস্মিত হয়ে ঝট করে উঠে দাঁড়ালাম। একটা হাত
বাড়িয়ে প্রফেসর ডাকলেন, " চলে এসো মীনা। আর
কোনও ভয় নেই। এখন তুমি নিরাপদ "।
নড়লাম না। তার বদলে প্রশ্ন ছুঁড়লাম, " আপনারা এখানে
কি করছেন? আমাকে খুঁজে পেলেন কিভাবে? "
আমার প্রতিক্রিয়া দেখে একটু যেন রুষ্ট হলেন ওঁরা।
কোথায় হাঁফ ছেড়ে বাঁচব, ছুটে যাব ওঁদের কাছে, তা
না......নিশ্চয়ই ভাবছেন আমি ড্রাকুলার মায়াজালে
আটকা পড়ে গেছি, দল ত্যাগ করেছি। কিন্তু তাঁদের সে
ধারণা ভাঙার চেষ্টা করলাম না।
" কাজটা কঠিন ছিল না", বললেন প্রফেসর, " একটা কফিন
নিয়ে কোনও সম্ভ্রান্ত ইংরেজ ভদ্রমহিলার পক্ষে সবার
অলক্ষ্যে ইউরোপ পাড়ি দেয়া সম্ভব নয়। একমাত্র সমস্যা
ছিল তোমার আর আমাদের মাঝখানের দূরত্ব। সেটা
ঘুচিয়েছে শর্টকাটে নদী আর স্থলপথ পাড়ি দিয়ে।"
" হায় ঈশ্বর! " বলে উঠলাম আমি, " তা হলে তো অনেক কষ্ট
করেছেন! জোনাথন কোথায়?"
" ওর শরীরের অবস্থা ভাল নয়, তাই সঙ্গে আনিনি। মিসেস
সিউয়ার্ডের কাছে রেখে এসেছি। " কথা বলতে বলতে
বাক্সের দিকে নজর গেল প্রফেসরের। " কাউন্ট কি......"
মাথা ঝাঁকালাম।
দৃষ্টি উজ্জ্বল হয়ে উঠল প্রফেসরের। বললেন, " তা হলে
এই-ই সুযোগ ওকে পরপারে পাঠাবার!" কাঁধে ঝোলানো
ব্যাগের ভেতরে হাত ঢুকিয়ে দিলেন তিনি - হাতুড়ি,
গজাল বের করার জন্য।
" না!" তাড়াতাড়ি বাধা দিলাম ওঁকে। জোর গলায়
বললাম, " ওর কিছু হতে দেব না আমি প্রফেসর। আপনাদের
সঙ্গেও যাব না"।
" কি বলছেন এসব? " হতভম্ব গলায় বললেন ডাঃ সিউয়ার্ড, "
কেন?"
" সরে দাঁড়াও, মীনা!", আমাকে জবাব দেবার সুযোগ না
দিয়ে বললেন ভ্যান হেলসিং, " এমন সুযোগ আর পাওয়া
যাবে না, এবার আর কোনও ভুল করব না আমরা। দাড়ি-কমা
মেনে খতম করব কাউন্টকে, যাতে আর কোনওদিন ও
পৃথিবীর বুকে ফিরে আসতে না পারে। ও না থাকলে
ইলিনারও ঘোর কেটে যাবে, মুক্ত করা যাবে
কুইন্সিকেও"।
" ওখানেই তো সমস্যা ", বললাম আমি, " ইলিনা আর কুইন্সি
আমাদের সঙ্গে নেই। আপনারা জানেন না?"
ভ্রু কোঁচকালেন ভ্যান হেলসিং। বললেন, " কোভাক্স তো
বলল তোমাদের সবাইকে নিয়ে স্কলোম্যান্সের
উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছে কাউন্ট"।
" ভুল করেছেন উনি", আমি বললাম, " কাউন্টের সঙ্গে
মনোমালিন্য হয়েছে ইলিনার। কুইন্সিকে নিয়ে পালিয়ে
গেছে ও। আমরা ওকেই ধাওয়া করছি। পায়ে পড়ি
প্রফেসর, কাউন্টের কোনও ক্ষতি করবেন না। ওর সাহায্য
ছাড়া ইলিনাকে খুঁজে পাব না আমি। কুইন্সিকেও হারাব
চিরদিনের মতো "।
চেহারায় মেঘ জমল ভ্যান হেলসিংয়ের। ডাঃ
সিউয়ার্ডকে দেখে মনে হলো, কেউ তাঁকে এক চামচ
তেতো ওষুধ খাইয়ে দিয়েছে। তিক্ত গলায় তিনি বললেন, "
এ তো দেখছি নতুন সমস্যা, প্রফেসর "!
" প্লিজ চলে যান আপনারা!" অনুনয় করলাম আমি," আমি
কোনও বিপদের মধ্যে নেই। কিন্তু কাউন্ট যদি টের পায়,
আপনারা আমাদের নাগাল পেয়ে গেছেন, তা হলে সত্যি
সত্যি বিপদ ঘটবে। দোহাই আপনাদের, প্রাণের মায়া
থাকে তো এক্ষুণি চলে যান"।
" তোমাকে ওই পিশাচটার কাছে ফেলে যাব?" রাগী
গলায় বললেন প্রফেসর, " কক্ষনো না"।
" কিন্তু যেতে আপনাদের হবেই। কুইন্সিকে যদি জীবিত
ফিরে পেতে চাই, এছাড়া আর কোনও উপায় নেই"।
ইচ্ছের বিরুদ্ধে আমার কথা মেনে নিতে হলো ভ্যান
হেলসিং আর ডাঃ সিউয়ার্ডকে। প্রফেসর বললেন, " বেশ,
চলে যাচ্ছি আমরা.....তবে একেবারে নয়। কাছেপিঠেই
থাকব, যাতে বিপদ দেখা দিলে তোমায় সাহায্য করতে
পারি। ভয়ের কিছু নেই, কাউন্ট যাতে আমাদের উপস্থিতি
টের না পায়, সে ব্যাপারে সতর্ক থাকব। যথেষ্ট কষ্টভোগ
করেছ তুমি, মীনা কিন্তু এর শেষ হতে এবার আর দেরী
নেই"।
গলায় ঝোলানোর জন্য আমায় একটা সোনার ক্রুশ দিলেন
ভ্যান হেলসিং। তাঁকে জানালাম না যে আজকাল এই
পবিত্র প্রতীক আমার একেবারেই সহ্য হচ্ছে না। হাতে
নিতেই মনে হলো যেন হাতের চামড়া পুড়ে যাচ্ছে
আমার। এর অর্থ বুঝতে কষ্ট হলো না আমার। ভ্যান
হেলসিং আর ডাঃ সিউয়ার্ড চলে যেতেই ছুঁড়ে ফেলে
দিলাম ওটাকে।
যাক, মিসেস সিউয়ার্ডের তত্ত্বাবধানে আছে তাহলে
এখন জোনাথন। একটা অন্তত স্বস্তির খবর।
আজ আমরা সিগিসোরায় এসে পৌঁছেছি। পাহাড়ের
ডগায় উঁচু পাঁচিলে ঘেরা বিচ্ছিন্ন এক শহর এটা। বাড়িঘর
সব পুরনো আমলের, দেখলেই মনে হয় যেন মধ্যযুগে
এসে
পড়েছি। বাতাস ভারী, সবখানে গ্রীষ্মের বিদায়ের ছাপ
প্রকট হয়ে আছে -পাতাশূন্য হয়ে আছে সমস্ত গাছপালা।
ঢালু পথ ধরে এখানে উঠে এসেছি আমি, কাউন্টের
নির্দেশে খুঁজে বের করেছি ছোট এই হোটেলটা। আজ
রাতে এখানে বিশ্রাম নিয়ে আগামীকাল সকালে রওনা
দেব আবার। একদল জিপসিকে ভাড়া করা হয়েছে
আমাদের হারমানস্টাডে পৌঁছে দেবার জন্য। কাউন্টের
কফিনটা এখন তাদেরই জিম্মায়। হোটেলে আমি একা।
জানি না, ভ্যান হেলসিং আর ডাঃ সিউয়ার্ড এখন
কোথায়। ট্রেনে ওই সাক্ষাতের পর আর দেখিনি ওঁদের।
তবে মনে হয় না দূরে কোথাও আছেন। যা একরোখা
স্বভাবের মানুষ, যতই বারণ করি, পিছু ছাড়বেন না আমার।
একদিক থেকে অবশ্য স্বস্তির বিষয় - কাছাকাছি দুজন
দুঃসাহসী বন্ধু আছেন, চাইলেই তাঁদের সাহায্য পাব
আমি। কিন্তু আরেকদিক থেকে আতঙ্ককর, ড্রাকুলা যদি
টের পায় তো ভয়ানক কিছু একটা ঘটে যাবে।
দোটানার মধ্যে সময় কাটছে আমার। নিজের জন্য আর
পরোয়া করি না। আমার সমস্ত চিন্তাভাবনা এখন কুইন্সি
আর আমার বন্ধুদের।
ক্রমশ
অশুভ আত্মা
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now