বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
রিটার্ন অব ড্রাকুলা
কাহিনী : ফ্রেডা ওয়ারিংটন
অনুবাদক : ইসমাইল আরমান
-------------------------------------
পর্ব ৩৪ (খ)
জোনাথনের ডায়েরী
" কুইন্সি আর মীনাকে ট্রানসিলভ্যানিয়া নিয়ে গেছে ড্রাকুলা? "
হাহাকার করে উঠলাম আমি কোভাক্সের কথায়, "
স্কলোম্যান্সে? "
" কখন রওনা হয়েছে ওরা?" গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করলেন
প্রফেসর হেলসিং।
" গতকাল রাতে। ইলিনা এসে বিদায় নিয়ে গিয়েছিল আমার কাছ
থেকে। তারপরেই এল কাউন্ট। ইচ্ছেমত অত্যাচার চালাল আমার
ওপর। আধমরা করে ফেলে রাখল কফিনে। এত দুর্বল হয়ে
পড়েছিলাম যে ওদের পিছু নিতে পারিনি। সেটাই চেয়েছে ও।
চেয়েছে তোমরা এসে খতম করে দাও আমাকে। যাতে ওর
পথে আমি আর বাধা হয়ে না দাঁড়াতে পারি"।
" গতকাল রাতে রওনা হয়েছে?" চিন্তিত গলায় বললেন ভ্যান
হেলসিং, " তা হলে চেষ্টা করলে এখনো হয়তো ধরা যেতে
পারে ওদেরকে।"
" কিন্তু ওর সঙ্গে মিসেস হারকার আর কুইন্সি'ও আছে", বললেন
ডাঃ সিউয়ার্ড, " আমরা কিছু করতে গেলে ওঁদের বিপদ হবে"।
" এতটা হতাশ হবার কিছু নেই", বললেন প্রফেসর হেলসিং, " একটানা
চলতে পারবে না ড্রাকুলা। দিনের বেলা ওকে কোথাও না
কোথাও বিশ্রাম নিতেই হবে। ওই সময়েই আক্রমণ চালাব আমরা"।
" যদি ওকে খুঁজে বের করতে পারি আর কি", তিক্ত গলায় বললেন
ডাঃ সিউয়ার্ড, " কিভাবে যাচ্ছে, কোথায় যাচ্ছে.... কিছুই তো জানি
না"। " সেজন্যেই আমাকে তোমাদের দরকার", বললেন
প্রফেসর কোভাক্স, " স্কলোম্যান্স পর্যন্ত একমাত্র আমিই
তোমাদের নিয়ে যেতে পারব"।
" কেন আপনি সাহায্য করবেন আমাদের?" জিজ্ঞেস করলাম, "
কাউন্ট ড্রাকুলা আর আপনার মধ্যে কি কোনও পার্থক্য আছে?
কেন বিশ্বাস করব আপনাকে?" " কারণ বেহেরিটের সঙ্গে
আমায় একটিবার দেখা করতেই হবে", বললেন কোভাক্স, " ও
যদি আমায় ধ্বংসও করে দেয়, ওখানকার লাইব্রেরীটাকে
শেষবার দেখতে চাই আমি"। তীক্ষ্ণ চোখে কোভাক্সের
মুখের ভাব যাচাই করলাম কিন্তু তাতে কোনও শঠতা দেখতে
পেলাম না। ঘাড় ফেরালাম ভ্যান হেলসিংয়ের দিকে। জিজ্ঞেস
করলাম, " আপনিই বলুন প্রফেসর, কি করব?" বড় করে শ্বাস
নিলেন ভ্যান হেলসিং। বললেন, " ছেড়ে দাও ওকে"।
" আপনি শিয়োর?"
" পরিস্থিতি আমাদের প্রতিকূলে, জোনাথন। আন্দ্রে ছাড়া এখন
আর কেউ সাহায্য করতে পারবে না আমাদের। ঝুঁকিটা না নিয়ে
উপায় কি? কিছু তো করবার নেই আমাদের"।
তাই-ই করলাম আমরা-মুক্তি দিলাম কোভাক্সকে। তিনিও আর হামলা
করলেন না আমাদের ওপর। চলে আসার আগে বাড়ির ভেতর
ভালমতো তল্লাশি চালিয়ে এসেছি আমরা। যে কামরাগুলোয়
মীনা, কুইন্সি আর ইলিনা থেকেছে, সেগুলোর খোঁজ
পেয়েছি। তবে মানুষগুলো অদৃশ্য। আস্তাবলও খালি - ঘোড়া সহ
ক্যারিজটা গায়েব হয়ে গেছে বাইরের দুই নজরদারের চোখ
এড়িয়ে। কিভাবে, কে জানে।
বিফল অভিযান সেরে ডাঃ সিউয়ার্ডের বাড়িতে ফিরে এসেছি
আমরা। সবকিছু শুনে আমাদেরকে স্বান্তনা দিয়েছেন মিসেস
অ্যালিস সিউয়ার্ড। আশ্চর্য দায়িত্বশীল মহিলা মিসেস
সিউয়ার্ড...কোনওকিছুতেই বিচলিত হন না, সাহসও হারান না। দ্রুত
আমাদের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করলেন। টেবিলে বসে ভ্যান
হেলসিং বললেন, " আন্দ্রেকে কেন আমাদের শিকার বানাতে
চাইল কাউন্ট, তা বোধহয় বুঝতে পারছি"।
" ওটা নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছেন কেন?" বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস
করলেন ডাঃ সিউয়ার্ড। " ঘামাব না? ওকে যদি পথের কাঁটাই মনে
করে কাউন্ট, তাহলে নিজে শেষ করে দিল না কেন ওকে?" "
কেন?" আমি আর ডাঃ সিউয়ার্ড - দুজনেই জানতে চাইলাম।
" আমার ধারণা ", প্রফেসর হেলসিং বলতে লাগলেন, "
স্বগোত্রের কাউকে খুন করতে পারে না ভ্যাম্পায়াররা। ওদের
ওপর ঈশ্বর আর প্রকৃতির আরোপ করা হাজারো বিধিনিষেধের
এটাও সম্ভবত একটা। কাউন্ট ড্রাকুলা কেন ট্রানসিলভ্যানিয়ার
স্কলোম্যান্সে'র পথে ছুটেছে, সেটাও আন্দাজ করতে
পারছি এখন। অসীম যে ক্ষমতা লুকিয়ে আছে ওখানে, ওটা
সম্ভবত ভ্যাম্পায়ারদের সমস্ত সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ওঠার ক্ষমতা "।
খুশি খুশি লাগছে প্রফেসরকে। আমি বিরক্ত গলায় বললাম, " আপনি
ব্যাপারটায় এত আনন্দের কি পাচ্ছেন, বুঝতে পারছি না"।
" কিছু মনে কোরো না, জোনাথন", লজ্জিত গলায় বললেন ভ্যান
হেলসিং, " আমাকে তো তুমি চেনো। বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ
থেকে দেখছি ব্যাপারটা, তাই....। তারমানে এই নয় যে মীনা বা
কুইন্সির জন্য আমি দুশ্চিন্তায় ভুগছি না। অল্প বয়সে আমার ছেলে
মারা গিয়েছিল; কিছুদিন আগে মারা গেল আমার স্ত্রী'ও। তাই
তোমার মনের অবস্থাও আমি খুব ভাল করেই বুঝতে পারছি।
বুকে সাহস রাখো। যেভাবেই হোক, মীনা আর কুইন্সিকে
আমরা উদ্ধার করবই। আমি শপথ করছি"। ডাঃ সিউয়ার্ডও কথা দিলেন
যথাসাধ্য চেষ্টা করার। খাওয়াদাওয়া শেষে আশু - অভিযান নিয়ে
আলোচনায় বসলাম আমরা। খুব শীঘ্রি প্রকট হয়ে উঠল, আমার
পক্ষে যাওয়া সম্ভব নয়। একটা হাত প্রায় অচল হয়ে আছে, গতদিন
কারফ্যাক্স অ্যাবির দেয়াল টপকাতে গিয়ে চিড় ধরিয়েছি পাঁজরে।
আজকের অভিযান শেষে জ্বরও এসেছে আমার। এই অবস্থায়
লম্বা জার্নি করা সম্ভব নয় আমার পক্ষে। তারপরেও যদি যাই, ভ্যান
হেলসিং এবং ডাঃ সিউয়ার্ডের কাজে কেবল বাধাই সৃষ্টি করব।
আমাকে নিয়েই ব্যস্ত থাকতে হবে তাঁদেরকে। কাজেই আমার
না যাওয়াই ভাল। কিছুক্ষণ একগুঁয়ের মতো অসম্মতি জানিয়ে গেলাম
কিন্তু শেষপর্যন্ত হার না মেনে উপায় রইল না। আমার যাওয়ার
চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো অভিযানের সাফল্য - সুস্থভাবে মীনা
আর কুইন্সির ফিরে আসা। অগত্যা নিমরাজি হতে হলো বাড়িতে
থেকে যেতে। ডাঃ সিউয়ার্ডের বাড়িতেই থাকব আমি - মিসেস
সিউয়ার্ডের তত্ত্বাবধানে। স্কলোম্যান্সে কাউন্টের
খোঁজে যাবেন ভ্যান হেলসিং, ডাঃ সিউয়ার্ড আর আন্দ্রে
কোভাক্স। বড্ড অসহায় লাগছে নিজেকে। নিজের অক্ষমতার
জন্য অনুভব করছি তীব্র ক্ষোভ। তার চেয়েও বেশি দুশ্চিন্তা
অনুভব করছি আমার বন্ধুদের নিয়ে। যদি বিপদে পড়েন ওঁরা? আমি
তো সাহায্য করতে পারব না। বিশেষ করে ভ্যান হেলসিং - সাত
বছরে অনেকটাই বুড়িয়ে গেছেন। কঠিন এই অভিযান সম্পন্ন
করার মতো শক্তি কি তাঁর আছে?
জোনাথন হারকারের ডায়েরী
১৭ নভেম্বর।।
গত রাতেই আন্দ্রে কোভাক্সের সাথে ট্রানসিলভ্যানিয় ার
উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে গেছেন ভ্যান হেলসিং আর ডাঃ সিউয়ার্ড।
ওঁদের সঙ্গে অভিযানে না গিয়ে যে কি ভাল করেছি, তা টের
পাচ্ছি হাড়ে হাড়ে। আজ সকাল থেকেই তীব্র ব্যথা শুরু
হয়েছে বুকের ভাঙা পাঁজরে। ঠিকমতো শ্বাসই নিতে পারছি না।
সেইসঙ্গে কাঁপুনি দিয়ে জ্বর। এখন বিকেল, জ্বর একটু কমায়
বারান্দায় এসে বসেছি। চাদরমুড়ি দিয়ে বসেছি একটা ইজিচেয়ারে।
কোলের ওপর রেখে লিখছি ডায়েরী। নিজেকে মনে
হচ্ছে বৃদ্ধনিবাসের অসহায় এক বাসিন্দা। অভিযানের অগ্রগতি
সম্পর্কে নিয়মিত খবর পাঠাবেন - এমন কথা দিয়ে গেছেন ভ্যান
হেলসিং; তবে এখনো পর্যন্ত কোনও খবর পাইনি আমি।
কোথায়, কতদূর গেছেন ওঁরা কে জানে। অলসভাবে বসে
বসে মীনার কথা ভাবছি। ওকে মনপ্রাণ দিয়ে ভালবাসি, সে
কারণেই কাউন্টের প্রতি ওর আসক্তির বিন্দুমাত্র আভাস পেলে
মাথা খারাপ হয়ে যায় আমার। হতে পারে অযথা ওকে দোষারোপ
করছি, কিন্তু কি করব। আবেগ অনুভূতি তো যুক্তিতর্ক মেনে
চলে না।
মিসেস সিউয়ার্ড চমৎকার সেবাযত্ন করছেন আমার।
ভদ্রমহিলার মধ্যে মাতৃভাব প্রবল। বেশ শক্ত ধাতের
মানুষও বটে। তাঁর কাছে কোনও কিছু লুকোতে হচ্ছে না
বলে ধন্যবাদ দিচ্ছি নিজের ভাগ্যকে। মনের যা অবস্থা,
তাতে দুঃখকষ্ট ভাগাভাগির একজন মানুষ থাকা দরকার।
মিসেস সিউয়ার্ডও আমার চেয়ে ভাল অবস্থায় নেই-মনের
দিক থেকে আর কি। কাল রাতে ভ্যান হেলসিং আর ডাঃ
সিউয়ার্ড চলে যাবার পর আমাকে এসে বললেন, " জনের
জন্য আমার বড় ভয় হচ্ছে, জোনাথন। ভয়ঙ্কর একটা কাজে
যাচ্ছে...... আর আমি জানি ওটার একটা হেস্তনেস্ত না
করে কিছুতেই ফিরবে না। তাতে যতই বিপদ থাকুক না
কেন"।
" তাহলে রওনা হবার আগে ওকে কিছু বললেন না কেন?"
জিজ্ঞেস করলাম।
" বলে কোনও লাভ হতো না। যা কিছু অজানা....যা কিছু
রহস্যময়.... তাতে ঝাঁপ দেয়া ওর অভ্যাস। কি ধারণা
আপনার, চিকিৎসাবিজ্ঞানের এত শাখা থাকতে ও
মনোরোগ বিশেষজ্ঞ হয়েছে কেন? কারণ মানুষের মনের
মতো রহস্যময় আর জটিল আর কিছু নেই। সেই রহস্য ও ভেদ
করতে চায়"।
" তাতে সমস্যা কোথায়?"
" ব্যাপারটা নিছক কৌতূহল বা আগ্রহ হলে সমস্যা ছিল
না। কিন্তু জনের জন্য ব্যাপারটা নেশা আর এই নেশা
মানুষকে ধ্বংস করে। ওর বোঝা উচিত, কিছু কিছু রহস্য
কখনো ভেদ করার চেষ্টা করা উচিত নয়"।
" বলতে চাইছেন, এবার ওর যাওয়া উচিত হয়নি?"
" সে কথা বলছি না", বললেন মিসেস সিউয়ার্ড, " আপনার
স্ত্রী আর ছেলেকে একটা পিশাচের কবল থেকে উদ্ধার
করতে গেছে ও- এতে আমি আপত্তি করব কেন? কিন্তু এ
কাজ যে কতটা বিপজ্জনক আর যতখানি সতর্ক থাকা
উচিত এ কাজে, তা ও পারবে বলে মনে হয় না। আমার
ভয়টা সেখানেই।"
মিসেস সিউয়ার্ড যে ভুল কিছু বলেননি, তা আমি জানি।
একই ভয় আমার ভেতরেও কাজ করছে। ড্রাকুলাকে ধ্বংস
করার নেশায় না জানি কোন ঝুঁকি নেয় আমার বন্ধুরা।
কিন্তু সে কথা বলে মিসেস সিউয়ার্ডকে ঘাবড়ে দেবার
কোনও মানে হয় না। তাই যতটুকু পেরেছি, স্বান্তনা
দিয়েছি তাঁকে। আশ্বস্ত করেছি ভ্যান হেলসিংয়ের
বিচক্ষণতার কথা বলে।
তাতে কতটুকু লাভ হয়েছে বলা মুশকিল। মিসেস
সিউয়ার্ডের চেহারা থেকে বিষাদের ছায়াটা তবু
সরেনি।
১৯ নভেম্বর।।
গত রাতে ড্রয়িংরুমে বসে মিসেস সিউয়ার্ডের সঙ্গে
গল্প করছিলাম, হঠাৎ ধুমধাম করে সদর দরজায় করাঘাত
করল কে যেন। খানিক পরে নার্ভাস ভঙ্গিতে হাজির
হলো এক পরিচারিকা। সে জানাল, বাচ্চাসহ এক তরুণী
নাকি আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছে। তরুণীটিকে খুব
অসুস্থ বলে মনে হয়েছে পরিচারিকার কাছে।
ওদেরকে ড্রয়িংরুমে নিয়ে আসতে বললাম। খানিক পরে
ড্রয়িংরুমের দরজায় যে মেয়েটি উদয় হলো, তাকে
দেখার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না আমি। চমকে
উঠলাম ভীষণভাবে। ইলিনা!
ইলিনার হাত ধরে যে বাচ্চাটা দাঁড়িয়ে আছে, সে-ও আর
কেউ নয়.....আমার আদরের কুইন্সি। এক লাফে চেয়ার
ছেড়ে উঠে দাঁড়ালাম আমি।
" বাবা!" ডেকে উঠল কুইন্সি। ছুটে এল আমার কাছে। হাঁটু
গেড়ে বসে ওকে টেনে নিলাম বুকের মধ্যে।
বিড়বিড় করে ঈশ্বরকে ধন্যবাদ জানিয়ে ইলিনার দিকে
চোখ ফেরালাম আমি। টলে উঠতে দেখলাম ওকে। আমরা
কিছু করবার আগেই ধপাস করে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল সে।
তাড়াতাড়ি ওকে ধরাধরি করে ওপরতলায় নিয়ে যাওয়া
হলো। বিছানায় শুইয়ে স্মেলিং সল্ট শোঁকানো হলো,
দেয়া হলো পানি আর ব্রান্ডি। কিছুটা সুস্থ হয়ে উঠল
ইলিনা। কুইন্সি'র দায়িত্ব নিয়ে নিলেন মিসেস
সিউয়ার্ড। ওকে খাইয়ে দাইয়ে শোয়ানোর জন্য নিয়ে
গেলেন। ইলিনার পাশে রয়ে গেলাম শুধু আমি।
কি অবস্থা হয়েছে মেয়েটার! শুকিয়ে কাঠ, হাড়ের ওপর
টান টান হয়ে আছে চামড়া। গর্তে বসে গেছে চোখ।
ঘাড়ে একাধিক ফুটো - ড্রাকুলার কামড়ের দাগ.....শুকনো
রক্তে ঢাকা ফুটো'গুলোর মুখ। ওখান দিয়ে রক্ত হারিয়ে
শরীর হলদে বর্ণ ধারণ করেছে তার। জীবন মৃত্যুর
সন্ধিক্ষণে কোনওমতে ঝুলছে সে।
কথা বলার মতো সামান্য শক্তি ফিরে পেয়ে কোনওরকমে
সে আমায় জিজ্ঞেস করল, " আপনি এখানে কেন, মিঃ
হারকার? আপনার বন্ধুরা তো ড্রাকুলার পেছনে গেছে।
আপনি যাননি?"
" আমি আহত, তাই যেতে পারিনি", বললাম ওকে। " কিন্তু
তোমার ব্যাপারটা কি বলো তো? এখানে এলে
কোত্থেকে? মীনা কোথায়? আমরা তো শুনেছি ড্রাকুলা
তোমাদের সবাইকে স্কলোম্যান্সে নিয়ে গেছে"।
" ভুল শুনেছেন ", ঘড়ঘড়ে গলায় বলল ইলিনা, " কাউন্ট শুধু
মীনাকেই নিয়ে গেছে, আর কাউকে নয়। এমন একটা নাটক
সাজিয়েছে শয়তানটা যাতে মনে হয়, আমিই কুইন্সিকে
চুরি করে নিয়ে পালিয়েছি..... ওকে উদ্ধারের জন্য
কাউন্টের সঙ্গে না গিয়ে উপায় নেই মীনার। শয়তানটা
মিথ্যে কথা বলে মীনাকে ভুলিয়ে নিয়ে গেছে। মিথ্যে
বলেছে আমার আন্দ্রে চাচাকেও"।
" কিন্তু কেন?"
" দোষটা চাচারই.....এখানে এসে কাউন্টকে বেহেরিট বা
স্কলোম্যান্সের কথা বলাই উচিত হয়নি তাঁর। এখন ওখানে
গিয়ে সেই ' শক্তি' হাসিল করার জন্য পাগল হয়ে উঠেছে
কাউন্ট, যে শক্তি পেলে দুনিয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী,
সবচেয়ে অপ্রতিরোধ্য পিশাচে পরিণত হবে সে। মীনাকে
ভুল বুঝিয়ে সে নিয়ে গেছে জিম্মি হিসেবে যাতে
আপনারা ওর চলার পথে কোনও বাধা সৃষ্টি না করতে
পারেন। আমায় বলে গেছে, কুইন্সিকে নিয়ে
কারফ্যাক্সে লুকিয়ে থাকতে....যতদিন না ও ফিরে
আসছে "।
বিস্মিত হলাম ইলিনার কথায়। বললাম, " কিন্তু আমরা তো
গোটা বাড়িতে তল্লাশি চালিয়েছি, তোমাদের দেখতে
পাইনি কেন?"
ম্লান হাসল ইলিনা। দেখা গেল ওর ওপরের মাড়ির দুপাশে
দুটো লম্বাটে দাঁত। বলল, " আপনাদের তল্লাশিতে খুঁত
ছিল, মিঃ হারকার। ওই বাড়িতে অনেক গোপন কামরা
আছে - সেগুলোর হদিশ আপনারা জানেন না"।
" তা হলে এখন এলে কেন?"
" কারণ আমি এখন মারা যেতে বসেছি, মিঃ হারকার",
হাঁপাতে হাঁপাতে বলল ইলিনা। কথা বলতে কষ্ট হচ্ছে ওর।
বলল, " আমি মারা গেলে ওই খালি বাড়িতে কুইন্সি'কে
কেউ দেখবার থাকত না । ও তো না খেতে পেয়েই মরে
যেত। সেজন্যই......"
" থাক আর কিছু বলতে হবে না", বললাম আমি, " ধন্যবাদ
ইলিনা....কুইন্সিকে ফিরিয়ে নিয়ে এসেছ বলে। বিশ্রাম
নাও। আমি দেখছি তোমার জন্য কি করতে পারি"।
মিসেস সিউয়ার্ডের কাছে গেলাম। তিনি তখন গ্লাসে
করে দুধ এনে কুইন্সিকে খাওয়াচ্ছেন। বেশ সুস্থ দেখাচ্ছে
তখন কুইন্সিকে। একপাশে ডেকে নিলাম মিসেস
সিউয়ার্ডকে। জিজ্ঞেস করলাম, ' ব্লাড ট্রান্সফিউশনের
ব্যাপারে তাঁর কোনও অভিজ্ঞতা আছে কিনা।
" নিশ্চয়ই," জানালেন তিনি, " আমার স্বামীকে বেশ
কয়েকবার সাহায্য করেছি। কিন্তু কেন?"
" ইলিনাকে আমার রক্ত দেব ঠিক করেছি ", বললাম আমি,
" অবস্থা খুব খারাপ ওর। এখুনি ওকে রক্ত না দিলে যে
কোনও মূহুর্তে অঘটন ঘটে যাবে"।
দৃষ্টি বিস্ফারিত হলো মিসেস সিউয়ার্ডের। বললেন, "
মাথা খারাপ হয়েছে আপনার? শরীরের এই অবস্থায়
আপনি অন্যকে রক্ত দেবেন?"
" পারব আমি। কোনও অসুবিধা হবে না"।
" কে বলেছে হবে না? জ্বর আছে এখন আপনার গায়ে। এ
অবস্থায় রক্ত দিলে ইলিনার শরীরেও জ্বরের জীবাণু
ঢুকে যাবে। তাতে অবস্থা আরও খারাপ হবে। তারচেয়ে
আমিই রক্ত দিই। সুস্থ আছি আমি, আপনার মতো ধকলও
যায়নি আমার ওপর দিয়ে"।
তাই-ই করা হলো। ডাঃ সিউয়ার্ডের যন্ত্রপাতি নিয়ে
এসে ইলিনাকে রক্ত দিলেন মিসেস সিউয়ার্ড। জ্ঞান
হারিয়ে ফেলেছিল ইলিনা, মিসেস সিউয়ার্ডের রক্ত
পেয়ে আবার গোলাপি আভা দেখা দিল তার গালে।
মেয়েটার দিকে তাকিয়ে সমস্ত অভিযোগ ভুলে গেলাম।
করুণার সৃষ্টি হলো মনে। ড্রাকুলার মায়াজালে আটকা
পড়েছিল বেচারি, আর তো কিছু নয়। ড্রাকুলার প্রভাবে
এসেই সে ষড়যন্ত্র করেছিল আমার আর মীনার বিরুদ্ধে।
চুরি করে নিয়ে গিয়েছিল কুইন্সিকে। কিন্তু শেষপর্যন্ত
ওর মনুষ্যত্ব জেগে উঠেছে, ফিরিয়ে দিয়েছে কুইন্সিকে।
আশা করছি এবার ও ড্রাকুলার কবল থেকে সম্পূর্ণ
বেরিয়ে আসতে পারবে।
এই মূহুর্তে ঘুমন্ত ইলিনার পাশে একটা চেয়ারে বসে
ডায়েরী লিখছি আমি। ভাবছি ভ্যান হেলসিং আর ডাঃ
সিউয়ার্ডের কথা। কতদূর গেছেন তাঁরা? এখনও কি
ইংল্যান্ডে? নাকি চলে গেছেন দেশের সীমানা
পেরিয়ে? মীনার খোঁজ কি পাবেন ওঁরা?
ক্রমশ
পরবর্তী পর্ব কিছু সময় পর। লাইক কমেন্ট করে শেয়ার করুন।
অশুভ আত্না
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now