বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
রিটার্ন অব ড্রাকুলা
কাহিনী : ফ্রেডা ওয়ারিংটন
অনুবাদক : ইসমাইল আরমান
-------------------------------------
পর্ব ৩২ঃ
" চাচা!" কোভাক্সকে দেখে সবিস্ময়ে চেঁচিয়ে উঠল
ইলিনা।
এক ঝটকায় কোভাক্সকে গায়ের ওপর থেকে ছিটকে
ফেলল কাউন্ট। তারপর ধাক্কা দিয়ে মীনা আর কুইন্সিকে
একটা সমাধির ভেতর ঢুকিয়ে দিল, টান মেরে বন্ধ করে
দিল ভারী ডালাটা। তারপর ঘুরে মুখোমুখি হলো শত্রুর।
বন্ধ সমাধির ভেতর থেকে কুইন্সির চাপা কান্না শুনতে
পেলাম। ছুটতে গেলাম ওদিকে কিন্তু ভ্যান হেলসিং
আমার হাত ধরে টান মেরে থামিয়ে দিলেন। " লাভ নেই,
জোনাথন", চাপা গলায় বললেন তিনি, " চলে এসো।
সমাধির ডালাটা নিরেট পাথরের তৈরি। আমাদের পক্ষে
সরানো সম্ভব নয়"।
আমি বলতে গেলাম, " কিন্তু মীনা আর কুইন্সি......" " পরে
আরও সুযোগ আসবে", বললেন ভ্যান হেলসিং, " কিন্তু এখন
নয়। চলে এসো। খামোখা তুমি জীবন দিলে কোনও লাভ
হবে না"।
ওদিকে, ততক্ষণে কোভাক্সকে চ্যাপেলের দেয়ালের
ওপর ঠেসে ধরেছে কাউন্ট। চিৎকার করে বলল, "
বিশ্বাসঘাতকতা! আমার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা! খতম
করে দাও ওদেরকে!"
শেষ কথাটা যে নেকড়েগুলোকে উদ্দেশ্য করে, তা
আমাদের বুঝতে বাকি রইল না। বলা বাহুল্য....ভ্যান
হেলসিং, ডাঃ সিউয়ার্ড আর আমি ছুটতে শুরু করেছি।
দুদ্দাড় করে সিঁড়ি বেয়ে উঠে এসেছি চ্যাপেল থেকে।
প্রবেশপথের দরজা টেনে বাইরে থেকে ছিটকিনি
লাগিয়ে দিলাম। পরমূহুর্তে ওপাশ থেকে দরজার ওপর
ঝাঁপিয়ে পড়ল নেকড়েগুলো। মড়মড় করে উঠল পুরনো
পাল্লা। বোঝা গেল, বিশালদেহী দানবগুলোকে
বেশীক্ষণ ঠেকিয়ে রাখতে পারবে না, পুরনো ওই কাঠের
পাল্লা। তবে তার জন্য অপেক্ষা করছি না আমরা,
উর্ধ্বশ্বাসে দৌড়ে দেয়ালের কাছে পৌঁছলাম। দড়ি
বেয়ে উঠে গেলাম ওপরে। তারপর অন্যপাশে নামতে শুরু
করলাম।
তাড়াহুড়োয় হাত ফসকাল আমার। ধপাস করে পড়লাম
মাটিতে। চিড় ধরল আমার পাঁজরের হাড়ে। ধরাধরি করে
আমায় সিউয়ার্ডের বাড়িতে নিয়ে এলেন প্রফেসর
হেলসিং আর ডাঃ সিউয়ার্ড। আহত অবস্থায় পড়ে আছি
আমি, পরাজয়ের তিক্ত স্বাদ আর চরম হতাশার মাঝে।
মীনার কথা ভুলতে পারছি না। এখনও কি সমাধির ভেতর
আটকা পড়ে আছে ও? কথাটা ভাবতেই মাথা খারাপের
মতো লাগছে আমার। কি করব ভেবে পাচ্ছি না। ভ্যান
হেলসিং সাহস যোগাচ্ছেন আমায়। বলছেন, এটা সাময়িক
ব্যর্থতা ; পরাজয় নয়। প্রস্তুতি নিয়ে আবার কারফ্যাক্স
অ্যাবিতে হানা দেব আমরা। সঙ্গে বন্দুক থাকবে
নেকড়েগুলোকে ঠেকাবার জন্য। দরকার হলে দলে ভারী
হয়ে হামলা চালাব বাড়িটাতে। কিন্তু তাতে কি আদৌ
লাভ হবে, যদি বাড়িটায় ঢুকে মীনা আর কুইন্সিকে মৃত
অবস্থায় আবিষ্কার করি? তারচেয়ে পরাজয় মেনে
নেওয়াই কি ভাল নয়? মেনে নেয়াই কি ভাল নয়, ড্রাকুলা-
ই জিতেছে?
ইলিনা কোভাক্সের ডায়েরী
১৫ নভেম্বর।।
গত রাতে যা ঘটে গেল, তা লিখে রাখা প্রয়োজন মনে
করছি।
ঘুমোতে পারছিলাম না আমি, কারণ কাউন্ট আবার মীনার
কাছে গিয়েছিল। ইদানীং ওর প্রতি বেশী পক্ষপাতিত্ব
আমি আর সহ্য করতে পারছি না। কুইন্সি-কে ঘুম পাড়িয়ে
দেবার পর জানলার পাশে একাকী বসে তাকিয়ে ছিলাম
বাইরে। ভাবছিলাম এই বাড়ি আর এর চারদিকের পরিবেশ
কত পছন্দ ছিল আমার। যদিও সম্ভব নয়, তবু মনে হচ্ছিল
চিরকাল এখানে থেকে যেতে পারলে মন্দ হতো না।
সীমানার ভেতর গজিয়ে ওঠা জঙ্গল আর ঝোপঝাড়ের
মাঝে ঘুরে বেড়াতে খুব ভাল লাগে আমার। ভাল লাগে
এখানকার জলাশয়। সবখানে অন্ধকারের রাজত্ব.....আর
আমার মনটাও তো অন্ধকারেই ভরা। উঁচু পাঁচিলগুলোকে
বড় আপন লাগে আমার। ওই পাঁচিলই তো আমায় বাইরের
দুনিয়া থেকে রক্ষা করছে। পাঁচিলঘেরা এই বাড়িতে
আমি সত্যিই স্বাধীন। উদাস হয়ে নেকড়ের ডাক
শুনছিলাম, হঠাৎ সেই ডাকের মাঝে পরিবর্তন টের
পেলাম। একটু পরেই ঝোপঝাড়ের মাঝ দিয়ে ছুটতে
দেখলাম তিন তিনটে ছায়ামূর্তিকে। অবাক হলাম না,
জানি জোনাথন মীনাকে মুক্ত করতে আসবে। নির্বিকার
ভঙ্গিতে তাই অপেক্ষা করতে লাগলাম কি ঘটে তা
দেখার জন্য। খানিক পরে কাউন্ট হাজির হলো আমার
কামরায় - মীনা আর কুইন্সিকে নিয়ে চ্যাপেলে যেতে
বলল। সেখানে ডাঃ সিউয়ার্ড, ভ্যান হেলসিং আর
হারকারের পাশাপাশি আর একজন যাকে দেখলাম - তা
বিশ্বাস করাও কঠিন। লম্বা একজন মানুষ, মাথাভর্তি
রূপোলী চুল। হাতদুটো বিশাল, শক্তিশালী। সাদামাঠা
চেহারা....কিন্তু যখন কাউন্টকে লক্ষ্য করে ঝাঁপ দিল,
সেই চেহারায় পাশবিক হিংস্রতা দেখা গেল। রক্তলাল
হয়ে উঠল চোখদুটো, হাঁ করা মুখের ভেতর থেকে বেরিয়ে
এল ধারালো দুটো শ্বদন্ত। সন্দেহের কোনও অবকাশ নেই,
সে -ও একজন ভ্যাম্পায়ার। কিন্তু বিস্ময়কর ব্যাপার হলো,
এই ভ্যাম্পায়ারকে আমি চিনি। আমার আন্দ্রে চাচা!
ওদিকে নেকড়েদের ধাওয়া খেয়ে পালিয়ে গেল
জোনাথন আর তার বন্ধুরা। মীনাকেও সমাধির ভেতর
আটকে চাচার সঙ্গে লড়তে শুরু করল কাউন্ট। খুব শীঘ্রি
তাঁকে দেয়ালের ওপর চেপে ধরল সে। চেঁচিয়ে তাকে
থামতে বললাম ; কিন্তু আমার কথা কানেই তুলল না
কাউন্ট।
" কে তুমি?" খ্যাপাটে গলায় চাচা'কে জিজ্ঞেস করল
কাউন্ট।
" বলার মতো কেউ নয়", হাঁপাতে হাঁপাতে বলল চাচা, "
আমার নাম আন্দ্রে কোভাক্স। আমি এখানে এসেছি
স্রেফ তোমার সেবা করতে, কাউন্ট!" কথাটা আমারই
বিশ্বাস হলো না। কাউন্টেরও না। চাচার গলা চেপে ধরল
সে। বলল, " সেবা? কেন?" " কারণ তুমি কাউন্ট ড্রাকুলা -
জীবন্মৃতদের রাজা", খাবি খেতে খেতে বলল চাচা, "
আমাকে তুমি তোমার অনুচর করে নাও....জীবনভোর
তোমার গোলাম হয়ে রইব আমি....." " মিথ্যে কথা!" গর্জে
উঠল কাউন্ট, " যদি সেবাই করতে চাও, তাহলে আমায়
আক্রমণ করলে কেন? মনে তো হলো ওই ভ্যান হেলসিং
আর ওর দুই সঙ্গীকে বাঁচাবার চেষ্টা করছ"।
" অস্বীকার করছি না", বলল আন্দ্রে চাচা, " আব্রাহাম
এককালে আমার বন্ধু ছিল, তাই....." শরীর মোচড়াল চাচা।
বলতে লাগল, " আমায় ছেড়ে দাও কাউন্ট, আমি শত্রুতা
চাই না"।
" শত্রু তো তুমি হয়েই গেছ", চাচার গলায় হাতের মুঠোর
চাপ আরও বাড়িয়ে বলল কাউন্ট ড্রাকুলা। সঙ্গে সঙ্গে
অদ্ভুত একটা কান্ড করল চাচা। কয়েকবার ঝাঁকি খেল
তার দেহ। তারপরেই মানুষ থেকে একটা নেকড়েতে পরিণত
হল চাচা। কাউন্টের হাতের মুঠো গলে নেমে গেল
মাটিতে। তারপর ছুট লাগাল সিঁড়ির দিকে। হিংস্র গর্জন
বেরিয়ে এল কাউন্টের মুখ দিয়ে। মূহুর্তে সে-ও পরিণত
হলো একটি নেকড়েতে। চাচা'র চেয়েও একটা অতিকায়
শ্বাপদে পরিণত হলো সে। তারপর ধাওয়া করল তার
শিকারকে।
দু'জনের পিছু পিছু ছুটতে শুরু করলাম আমি। চ্যাপেল থেকে
বেরিয়ে ঢুকে গেলাম জঙ্গলে। সামনে জঙ্গলের মধ্যে
হুটোপুটির আওয়াজ শোনা যাচ্ছিল কিন্তু ওদের নাগাল
পাওয়া অসম্ভব। তবু হাল ছাড়িনি, এগিয়ে চলেছি। যদিও
জানতাম, চাচা'কে কাউন্টের হাত থেকে বাঁচানো
অসম্ভব আমার পক্ষে, তবু তার জন্য কিছু একটা করতে
উন্মুখ হয়ে উঠেছিলাম। কাঁটা আর ডালপালায় ঘষা খেয়ে
ছিঁড়ে গেল আমার পোশাক, ছড়ে গেল চামড়া। দাঁতে দাঁত
পিষে এগোতেই থাকলাম। শেষ পর্যন্ত জলাশয়ের কাছে
গিয়ে আবার দেখা পেলাম ওদের। পানির ধারে চাচা'কে
কোণঠাসা করে চেপে ধরেছে কাউন্ট। দুজনেই আবার তখন
মানুষের রূপ ধরেছে। গলা ধরে চাচা'কে উঁচু করে ধরল
কাউন্ট, ওই অবস্থাতেই তাঁকে নিয়ে ফের চ্যাপেলে
ফিরল। কাঁপতে কাঁপতে শুধু ওদের অনুসরণ করা ছাড়া আর
কিছুই করার রইল না আমার।
" এবার সত্যি কথা বলো!" চাচাকে ফের দেয়ালের ওপর
ঠেসে ধরে বলল ড্রাকুলা, " কে তোমায় ভ্যাম্পায়ার
বানিয়েছে? কে-ই বা তোমাকে পাঠিয়েছে আমার
এখানে?"
এবার হার স্বীকার করে নিল আন্দ্রে চাচা। দুর্বল গলায়
বলল, " স্কলোম্যান্সে গিয়েছিলাম। ওখানে বেহেরিট
নামে একটা ভ্যাম্পায়ার মেরে ফেলে আমার সঙ্গীকে।
তারপর আমায় ভ্যাম্পায়ার বানিয়ে পাঠিয়েছে তোমার
কাছে"।
কে খুন হয়েছে, বুঝতে অসুবিধে হলো না আমার।
মিকোলাস - চাচা'র ছাত্র, আমার পাণিপ্রার্থী। ওকে
ভালবাসতাম না, তবু দুঃখ পেলাম, কারণ মানুষটা বড় ভাল
ছিল।
" বেহেরিট?" বিস্ময় ফুটল এবার কাউন্টের গলায়।
জিজ্ঞেস করল, " কেন?"
" তোমার সেবা করতে। তোমার কাছ থেকে আরও শিক্ষা
নিতে!"
" আবার মিথ্যে কথা!" গর্জে উঠে চাচা'র মাথা দেয়ালে
ঠুকে দিল কাউন্ট। ব্যথায় কাতরে উঠলেন তিনি। কাউন্ট
গর্জন করে উঠে বলল, " ভাল চাও তো সত্যি করে বলো,
কেন বেহেরিট তোমায় পাঠিয়েছে আমার কাছে?"
গোঙানির মতো আওয়াজ করল চাচা। বলল, " ও বলেছে, যে
কোনও মূল্যে স্কলোম্যান্সে তোমার ফের আগমন
ঠেকাতে হবে। ওখানে কিছু একটা আছে.... এমন একটা
কিছু যা তোমার শক্তি বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে। বেহেরিট
সেটা তোমায় দিতে চায় না"।
" কি সেই জিনিস? " জিজ্ঞেস করল কাউন্ট। " আমি জানি
না। বেহেরিট শুধু বলেছে, ওটা নাকি 'নরকের শক্তি'...ওটা
তোমার আত্মা"। এইটুকু বলে একটু দম নিল আন্দ্রে চাচা।
তারপর বলল, " ও তোমার ক্ষতি চায় না কাউন্ট, শুধু চায়
তুমি যেন স্কলোম্যান্স থেকে দূরে থাকো। আর এসো না
সেখানে"।
" আর সেটা নিশ্চিত করার জন্য পাঠিয়েছে তোমায়?"
উপহাসের হাসি হাসল কাউন্ট, " বোকা, দুর্বল বেহেরিট!
আঁধারের জগতে যার আয়ু দু'মাসও হয়নি, তাকে
পাঠিয়েছে আমায় ঠেকাতে? হাহ! চারশো বছর পেরিয়ে
গেছে কিন্তু এখনও দেখছি ওর বুদ্ধিশুদ্ধির কোনও উন্নতি
হয়নি"।
দলা পাকানো কাগজ যেমন করে ছুঁড়ে ফেলা হয়, সেভাবে
আন্দ্রে চাচাকে ছুঁড়ে ফেলল সে। উড়ে গিয়ে চ্যাপেলের
আরেক দিকের দেয়ালে আছড়ে পড়ল চাচা, তারপর
তালগোল পাকিয়ে পড়ে রইল মাটিতে। তার দিকে আর
ভ্রুক্ষেপ করল না কাউন্ট, সমাধির ডালা সরিয়ে বের
করে আনল মীনা আর কুইন্সিকে, তারপর ওদের নিয়ে চলে
গেল বাড়ির ভেতরে।
এবার চাচা'র কাছে ছুটে গেলাম আমি। তীব্র ব্যথায়
অনবরত গোঙাচ্ছে চাচা। কারণটাও দেখলাম - দেয়ালে
গাঁথা ছিল একটা পুরনো ক্রুশ...চ্যাপেলের অভ্যন্তরীণ
সজ্জার অংশ। ভেঙেচুরে আছড়ে পড়েছে চাচা'র হাতে।
ক্রুশের সংস্পর্শে চাচার হাতের চামড়া পুড়ে গিয়ে
দগদগে ঘা হয়ে গেছে জায়গাটায়।
ইলিনা কোভাক্সের ডায়েরীর পরের অংশ।। আন্দ্রে
চাচা'র পাশে গিয়ে বসলাম আমি। পরম মমতায় তুলে
নিলাম তাঁর পুড়ে যাওয়া হাত। " ইলিনা!" ফিসফিসিয়ে
বলল চাচা, " কি করছিস তুই? চলে যা এখান থেকে। আমার
পাশে থাকা নিরাপদ নয় তোর জন্যে"।
" না!" প্রতিবাদ করলাম আমি, " তোমায় একা রেখে
কোথাও যাব না আমি"।
" কিন্তু তুই যদি না যাস, তাহলে হয়তো আমি..." এইটুকু
বলেই থেমে গেল চাচা।
জড়িয়ে ধরলাম তাকে। বললাম, " জানি কি করতে পারো?
ভয় পাই না আমি তাতে"।
" ন্ন...না! কিছুতেই না!" আঁতকে উঠল চাচা, " তোর এ
অবস্থা হলো কি করে ইলিনা?"
" তোমারই বা এমন অবস্থা হলো কি করে, চাচা?" পালটা
প্রশ্ন করলাম আমি। পরস্পরকে নিজের কাহিনী
শোনালাম আমরা। স্কলোম্যান্সে চাচা'র ভয়াল
অভিজ্ঞতা আমায় ভীষণ একটা ধাক্কা দিল। যেন ঘুম
থেকে জেগে উঠলাম আমি। হঠাৎ অনুভব করলাম, গত
কয়েকদিনে কিসব কান্ড ঘটিয়েছি আমি। আমার অন্তরের
মনুষ্যত্ব যেন জেগে উঠল এইবার। চাচা'কে বাবার মৃত্যুর
ঘটনা বলতে গিয়ে কেঁদেই ফেললাম। সেইসময় আমার মনে
হলো, এই জীবন আর রেখে লাভ নেই। সবদিক দিয়েই আমি
ব্যর্থ। আপনজনদের হারিয়েছি, কাউন্টের কাছ থেকে
অনন্ত জীবন লাভের যে আশা ছিল, তা -ও এখন নষ্ট হতে
বসেছে। আমার একূল ওকূল দুই-ই গেল।
" মন খারাপ করিস না", আমার অবস্থা দেখে বলল চাচা,
"এখনও সব শেষ হয়ে যায়নি। এখান থেকে চলে যা, নতুন
করে জীবন শুরু কর"।
" তোমাকেও তো এখান থেকে যেতে হবে চাচা", বললাম
আমি, " এখানে পড়ে থাকলে কাউন্ট তোমায় শেষ-ই করে
দেবে। পায়ে পড়ি তোমার, চলে যাও এখান থেকে"। "
আমার তো আর যাবার কোনও জায়গা নেই রে", হতাশ হয়ে
বলল আন্দ্রে চাচা, " বেহেরিটের কাছেও ফিরতে পারব
না। ব্যর্থতা সহ্য করবে না ও। কাউন্ট'কেও স্কলোম্যান্স
থেকে দূরে রাখতে পারব না। আমার কপালে যা আছে
তাই ঘটুক; কিন্তু তুই চলে যা এখান থেকে। মিকোলাসকে
হারিয়েছি, এমিলকে হারিয়েছি; এখন আর তোকে'ও
হারাতে চাই না।" " তা হলে আমার রক্ত পান করে
আমাকেও টেনে নাও তোমাদের ওই জীবন্মৃতদের দলে",
বললাম আমি, " আর কোনওদিন তাহলে আমায় হারাবার
ভয় করতে হবে না"। এই বলে চুল সরিয়ে ঘাড় উন্মুক্ত
করলাম। বললাম, " নাও, আমার রক্ত নাও। জীবন্মৃতদের
জগতে গিয়ে অনন্ত জীবন পাবো আমি"।
" না-আ!" চেঁচিয়ে উঠল আন্দ্রে চাচা, " আমি জেনেশুনে
এই অন্ধকার জগতে নিয়ে আসতে পারব না আমার লক্ষ্মী
ভাতিজি'কে"।
" আমি কোনওদিনও লক্ষ্মী ছিলাম না, চাচা! যা কিছু
এতদিন দেখেছ, সব আমার মুখোশ! " " না, এসব আমি শুনতে
চাই না, ইলিনা! তুই সরে যা, সরে যা, আমার সামনে
থেকে বলছি!" চরম অপমানে মুখ লাল হয়ে গেল আমার।
সরোষে বললাম, " আমায় তোমার অমরত্ব দেবার ক্ষমতা
থাকা স্বত্তেও তুমি আমায় প্রত্যাখ্যান করলে? বেশ, এর
প্রতিদান তুমি পাবে। তোমায় কাউন্ট, বেহেরিট বা ভ্যান
হেলসিং-রা শেষ করে দিলেও আমি আর কিচ্ছু করব না
তোমার জন্য"। দ্বিতীয়বার তার দিকে না তাকিয়ে
বেরিয়ে এলাম চ্যাপেল থেকে। বাড়ির আনাচেকানাচে
ঘুরে বেড়াতে লাগলাম কাউন্টের খোঁজে। মাথায় রক্ত
উঠে গেছে আমার। বুঝতে পারছি বেশ ভাল করেই,
মানুষের জগতে ফেরার রাস্তা বন্ধ হয়ে গেছে আমার
অনেক আগেই, আর আমি কোনওদিন সাধারণ মানুষের
জীবনে ফিরতে পারব না; কিন্তু এতদিন আমি যেজন্য
সবকিছু করেছি, সেটা-ও কি পাবো না? না, আজ আমায়
একটা হেস্তনেস্ত করতেই হবে। আজ কাউন্টের সঙ্গে
একটা শেষ বোঝাপড়া করতে হবে। হয় ও আমায়
ভ্যাম্পায়ার বানাবে নয়তো একেবারে শেষ করে দিক।
এভাবে মাঝামাঝি অবস্থায় ঝুলে থাকতে পারব না
আমি।
বাড়ির ধূলি ধূসরিত কামরাগুলোয় একে একে হানা দিলাম
আমি, কিন্তু কোথাও দেখা পেলাম না কাউন্টের। হতাশ
হয়ে যখন হাল ছেড়ে দেব ভাবছি, এমন সময় উদয় হলো ও-
দোতলার বারান্দায় আমার পেছনে এসে দাঁড়াল ও। " তুমি
একা কেন?" রুক্ষ গলায় জিজ্ঞেস করল কাউন্ট, "
বাচ্চাটা কোথায়?"
" কুইন্সি ওর মায়ের কাছে", জবাব দিলাম আমি, " তোমার
সঙ্গে আমার কথা আছে কাউন্ট "। " কি কথা?"
" আমার চাচাকে নিয়ে কি করবে বলে ঠিক করেছ?" "
তাতে তোমার কি এসে যায়?"
" অনেক কিছুই", আমি বললাম, " উনি আমার চাচা....রক্তের
আত্মীয়"।
ব্যাঁকা হাসি ফুটল কাউন্টের মুখে। বলল, " বাঃ, খুব যে দরদ
দেখছি। আমার চেয়েও কি বেশী গুরুত্বপূর্ণ ও তোমার
কাছে?"
রাগে গা চিড়বিড় করে উঠল আমার। বললাম, " না। তবে
তুমি আমায় যতখানি ভালবাসো, তার চেয়ে অন্তত বেশী
"।
দৃষ্টি তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল কাউন্টের। বলল, " তোমায় হঠাৎ
আমার প্রতি অসন্তুষ্ট দেখাচ্ছে কেন?" " মীনা-র তুলনায়
যদি কম গুরুত্ব পাই তোমার কাছে, তাহলে অসন্তুষ্ট
হওয়াটাই স্বাভাবিক ", সুযোগ পেয়ে মুখ খুললাম আমি।
" ছেলেমানুষি কোরো না ইলিনা", বিরক্ত গলায় বলল
কাউন্ট," ঈর্ষা তোমায় মানায় না"। " কথা ঘুরিয়ো না!"
হিসিয়ে উঠলাম আমি, " আমি জানতে চাই, মীনাকে তুমি
অন্ধকার জগতের সহচরী বানিয়ে অনন্ত জীবন দেবে কি
না"।
" হয়তো", গম্ভীর মুখে বলল কাউন্ট, " সবটাই নির্ভর করছে
আমার মেজাজ মর্জির ওপর "।
" কিন্তু আমার আগে না", জোর গলায় বললাম আমি, " ওর
আগে সবচেয়ে আগে অধিকার আমার। কারণ, এতদিন আমি
যা কিছু করেছি তোমার নির্দেশে, তোমার কাছ থেকে
এই পুরস্কার পাবো বলেই করেছি। " এবার অনুনয় ঝরে পড়ল
আমার গলায়, " এভাবে আর কষ্ট দিয়ো না আমায়। মানুষ
আর জীবন্মৃত - এই দুইয়ের মাঝামাঝি থাকতে থাকতে
হাঁফিয়ে উঠেছি আমি। প্লিজ, একটা কিছু করো। আমি
চাই তোমার সাথে......অন্ধকারে বিচরণ করব আমি।
তোমার সঙ্গিনী হিসেবে....তোমার হুকুমের দাসী
হিসেবে নয়!"
" হুকুমের দাসী?" খপ করে এবার সে আমার দুই বাহু আঁকড়ে
ধরল। শক্ত মুঠোর ভেতর পিষ্ট হলো কবজি। ককিয়ে
উঠলাম। হিসহিস করে সে বলতে লাগল, " আজ পর্যন্ত যা
কিছু করেছ, সেগুলো কি স্বেচ্ছায় করোনি? ভেবে দেখো,
তোমার প্রত্যেকটা কাজ, প্রত্যেক পদক্ষেপ ছিল নিজের
স্বার্থে, নিজের মর্জিতে। আমি তোমায় নির্দেশ
দিয়েছি কিন্তু তাই বলে বাধ্য করিনি করতে; করেছ তুমি
নিজের ইচ্ছায়।"
" তারমানে কি বলতে চাও, এতকিছু করার পরেও কিছু
পাওনা থাকতে পারে না আমার? কোনও দাবি থাকতে
পারে না আমার, তোমার কাছে?"
" আমাকে তুমি হুকুম দিতে পারো না ইলিনা", বলল কাউন্ট,
" পারো না আবদার জুড়তে। এই সত্যিটা যদি তুমি
এতদিনেও বুঝতে না পারো, তাহলে সেটা তোমার
নিজের ব্যর্থতা "।
আমার হাত ছেড়ে দিল সে। পাশ কাটিয়ে চলে যাবার
চেষ্টা করল। পেছন থেকে জাপটে ধরলাম তাকে।
চেঁচিয়ে বললাম, " না, তোমায় আমি যেতে দেব না। আজ
আমার ইচ্ছা পূরণ করতেই হবে তোমায়"। ঝটকা মেরে
নিজেকে ছাড়িয়ে নিল কাউন্ট। চোখদুটো জ্বলে উঠল
রাগে। এক হাতে আমার গলা চেপে ধরল, তুলে ফেলল
শূন্যে। দুনিয়া আঁধার হয়ে এল আমার চোখের সামনে,
বাতাসের অভাবে খাবি খেতে শুরু করলাম। মনে হলো
মরে যাচ্ছি। তাই-ই যেতাম হয়তো, কিন্তু এইসময় আচমকা
কি মনে হতে আমার গলা ছেড়ে দিল সে। ওর চোখ থেকে
মিলিয়ে গেল ক্রোধ। আমাকে পাঁজাকোলা করে
বিছানায় শুইয়ে দিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে শান্ত
গলায় বলল, " ধৈর্য ধরো, ইলিনা। অকারণে দেরী করাচ্ছি
না তোমাকে। মানুষ হিসেবে আরও কয়েকটা দিন বাঁচা
দরকার তোমার কারণ কুইন্সির দেখাশুনোর জন্য আর কেউ
নেই এখানে। এখন সেই কাজটা সুষ্ঠুভাবে পালন করো,
তারপর তোমার সব ইচ্ছে পূরণ করব"। ভাঙা হৃদয় নিয়ে
সম্মতি দিলাম ওর কথায়। আর কি-ই বা করার আছে
আমার? সন্তুষ্ট হয়ে চলে গেল ও। আর আমি ভেঙে পড়লাম
কান্নায়।
ক্রমশ
অশুভ আত্মা
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now