বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
রিটার্ন অব ড্রাকুলা
কাহিনী : ফ্রেডা ওয়ারিংটন
অনুবাদক : ইসমাইল আরমান
-------------------------------------
পর্ব ২৬ঃ
( জোনাথন হারকারের ডায়েরী) প্রফেসর হেলসিং বলতে
লাগলেন, " ভেবে দ্যাখো.... ট্রানসিলভ্যানিয়ায়
গিয়েছিল ইলিনা....বোরগো গিরিপথ আর ড্রাকুলা
ক্যাসলের খুব কাছাকাছি। সেখানেই ছিল বেশ
কিছুদিন....তারপর হঠাৎ করে ও এসে হাজির হলো এখানে
- রহস্যময় এক পরিস্থিতিতে। ওর বাবা মারা গেছে
দুর্ঘটনায়, চাচা নিরুদ্দেশ... তারপরেও চেহারা সুরত দেখে
বোঝার উপায় নেই। দিব্যি খোশমেজাজে ঘুরে
বেড়াচ্ছে। ট্রানসিলভ্যানিয়ার যে খামারে ছিল ওরা -
সেখানে চিঠি লিখেছিলাম আমি, ক'দিন আগে। ওর
বাবা এমিলের মৃত্যুর ব্যাপারে খোঁজখবর নিতে। সেই
চিঠির জবাবে ওরা কি লিখেছে জানো? আমরা ওখান
থেকে চলে আসার পর ইলিনা নাকি একটা সাদা নেকড়ের
সঙ্গে ঘুরে বেড়াত রাত - বিরেতে, বনে জঙ্গলে। ওটার
সঙ্গে মাঝখানে দু'রাত কোথায় উধাও হয়ে গিয়েছিল,
দু'দিন পর ফিরে আসার পর বলতে পারেনি, কোথায়
কাটিয়েছিল ওই দু'দিন। তারপরেই নেকড়ের হাতে মারা
পড়ল ওর বাবা, আর সে রাতেই নাকি ও কাউকে কিছু না
বলে চলে যায় খামারবাড়ি ছেড়ে। এসব দেখেশুনে
ওখানকার স্থানীয় লোক ওকে ডাইনী মনে করেছে।
ব্যাপারটা হয়তো আপাতদৃষ্টিতে কুসংস্কার মনে হতে
পারে কিন্তু আমরা তো জানি, ট্রানসিলভ্যানিয়ার
কুসংস্কারগুলোর পেছনে কতটা সত্য লুকিয়ে থাকে!"
" না!" প্রতিবাদ করে উঠল মীনা," এ হতে পারে না। আপনি
কোথাও ভুল করছেন প্রফেসর। ইলিনার সঙ্গে আমি
অনেকটা সময় কাটিয়েছি। ওর মতো ভাল মেয়ে আর হয়
না"।
" ওকে আর ক'দিন থেকে চেনো তুমি, মীনা?" শান্তস্বরে
বললেন হেলসিং, " ও আমার বন্ধুর ভাতিজি, সেইসূত্রে ওর
ছোটবেলা থেকে আমি ওকে দেখে আসছি। এবার যখন
দেখলাম, তখন লক্ষ্য করলাম কত বদলে গেছে ও। চাহনিতে
কেমন একটা ধূর্ততা আর সতর্কতা লক্ষ্য করেছি, যেটা
আগে ছিল না। হতে পারে পুরোটাই আমার মনের
ভুল....হয়তো এখুনি কুইন্সিকে নিয়ে হাজির হবে
ও....গ্রহণযোগ্য একটা কৈফিয়ত সহ....কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত
না ও ফিরে আসছে, খারাপ'টার জন্যই আমাদের তৈরি
থাকতে হবে"।
" আপনি কি সত্যিই ভাবছেন যে ও আর ফিরবে না?"
জিজ্ঞেস করল মীনা।
" সম্ভাবনা প্রবল", বললেন প্রফেসর, " সকালে ওকে
খানিকটা জিজ্ঞাসাবাদ করেছিলাম
ট্রানসিলভ্যানিয় ার ঘটনাটার ব্যাপারে। ভড়কে গিয়ে
পালিয়ে গেছে কি না কে জানে!"
" আমরা তা হলে কি করব এখন? "
" ওর কামরায় তল্লাশি চালালে কেমন হয়?" বললাম আমি,
" ডায়েরী লিখতে দেখেছি ওকে। ওটা যদি পাওয়া
যায়.....অনেক প্রশ্নের উত্তর মিলবে"। " উত্তম প্রস্তাব",
বললেন ভ্যান হেলসিং, " তাহলে সেটাই করা হোক"।
দোতলায় ইলিনার কামরায় হাজির হলাম আমরা।
এলোমেলো পড়ে আছে সবকিছু, কিছুই গুছিয়ে রেখে
যায়নি মেয়েটা। বিছানা লণ্ডভণ্ড, কাপড়চোপড়, বইখাতা
সব এলোমেলো ভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে।
মীনার দেওয়া ক্রুশটা পাওয়া গেল, চরম অবহেলায়
গড়াগড়ি খাচ্ছে মেঝেতে। বোঝাই যাচ্ছে বিন্দুমাত্র
গুরুত্ব দেয়নি ইলিনা ওটাকে। ব্যাপারটা দেখেই আঁচ
করলাম আমি, ভ্যান হেলসিংয়ের সন্দেহ মোটেও অমূলক
নয়। অমন একটা ধর্মীয় প্রতীককে ওরকমভাবে হেলায়
মেঝেতে ছুঁড়ে ফেলতে পারে না কোনও স্বাভাবিক ভাল
মানুষ।
শুরু হলো তল্লাশি। ওয়ার্ডরোবে, ইলিনার কাপড়
চোপড়গুলোর তলায় পাওয়া গেল ওর ডায়েরীটা।
হাঙ্গেরিয়ান ভাষায় লেখা হবে ভেবেছিলাম কিন্তু
ইংরেজি দেখে অবাকই হলাম। এলোমেলোভাবে
কয়েকটা পাতা পড়েই চমকে উঠলাম। ভ্যান হেলসিংয়ের
আশঙ্কা বাস্তবে রূপ নিল সঙ্গে সঙ্গে। ভাঁজ করা একটা
শালও পাওয়া গেল দেরাজে। ছাই-মাটি মাখা, তীব্র
দুর্গন্ধে ভরা। ওটায় করে ড্রাকুলার দেহ ভস্ম নিয়ে
এসেছিল মেয়েটা।
আমাকে ঘিরে দাঁড়াল সবাই। জোরে জোরে পড়তে শুরু
করলাম ডায়েরীর এন্ট্রিগুলো। খুব তাড়াতাড়ি জানা হয়ে
গেল, কিভাবে নেকড়ের বেশে এসে ইলিনার সঙ্গে
যোগাযোগ করেছিল পিশাচ কাউন্ট ড্রাকুলা, কিভাবে
ওকে বশ করেছে, শয়তানটার দেহভস্ম সংগ্রহ করেছে ও
নিজে, তারপর নিজের সঙ্গে করে ইংলন্ডে নিয়ে
এসেছে। পুরনো ওই গোরস্থানে খুঁজে দিয়েছে ওর
নিশ্চিন্ত আশ্রয়স্থল, কৌশলে মীনা'র রক্ত সংগ্রহ করে
তার মাধ্যমে ওকে দিয়েছে নবজীবন। পড়তে পড়তে
শিউরে উঠলাম আমি।
" তা হলে আমার ধারণাই ঠিক", বললেন ভ্যান হেলসিং, "
আমার জিজ্ঞাসাবাদে ঘাবড়ে গিয়েই পিঠটান দিয়েছে
ও। জোনাথন, মীনা, আমি দুঃখিত। আরেকটু সতর্ক হওয়া
উচিত ছিল আমার"।
" খামোখাই নিজেকে দোষারোপ করছেন ", বললেন ডাঃ
সিউয়ার্ড, " শুরু থেকেই দেখা যাচ্ছে একটা পরিকল্পনা
মোতাবেক এগিয়েছে মেয়েটা। আপনি আজ সকালে ওকে
কিছু না বললেও তাতে খুব একটা হেরফের হতো না"। "
আ....আমি বিশ্বাস করি না", বিহ্বল গলায় বলল মীনা, " এত
বড় ভুল করেছি আমরা ইলিনার ব্যাপারে!..... তা কি করে
হয়?...নিশ্চয়ই ড্রাকুলা যাদুটোনা করেছে ওকে....নিজের
ইচ্ছেয় ও এসব করেনি!" " দুঃখের সঙ্গে জানাচ্ছি মীনা,
আসলে তা নয়", বললেন ভ্যান হেলসিং, " ডায়েরির
প্রতিটা লাইন চিৎকার করে জানাচ্ছে, প্রত্যেকটা
ঘটনায় ইলিনার পূর্ণ সম্মতি ছিল! উপযুক্ত সহকারীই
বেছেছে কাউন্ট ড্রাকুলা....মেয়েটার হৃদয় ওর'ই মতো
কলুষিত। অন্ধকার এই জীবন চিরকালই চেয়ে এসেছে
ইলিনা....ড্রাকুলা শুধু ওকে ঝাঁপ দেওয়ার পথটা দেখিয়ে
দিয়েছে "।
" কিন্তু আমাদের মাধ্যমেই ওর খোঁজ পেয়েছে শয়তানটা",
বলল মীনা, " ট্রানসিলভ্যানিয়ায় ফের আমাদের
উপস্থিতিই এত বছর পর অশান্ত করে তুলেছিল ওর অশুভ
আত্মাকে, ওকে খেপিয়ে তুলেছিল প্রতিশোধ নেবার
জন্য। ইলিনাও আমাকে অনুকরণ করতে গিয়ে ড্রাকুলার
জালে আটকা পড়েছে। এই ডায়েরী তো আমিই ওকে
উপহার দিয়েছিলাম...... "
" ডায়েরীটা অপকারের চেয়ে উপকারই বেশী করেছে।
আমাদের চোখের সামনে থেকে সব পর্দা সরে গেছে।
রহস্য বলতে আর কিছু নেই। সবচেয়ে বড় কথা - ড্রাকুলার
আশ্রয়ের খোঁজও পেয়ে গিয়েছি আমরা ডায়েরীটা
থেকে। এবার ওকে সহজেই শিকার করা যাবে। আর
ইলিনা.....ওর ব্যাপারে এখনো আশা আছে। এখনো ও
ভ্যাম্পায়ারে পরিণত হয়নি। ড্রাকুলার প্রভাব থেকে
ওকে মুক্ত করা কঠিন হলেও একেবারে অসম্ভব নয়"। পরে
( ডায়েরীর এই অংশ জোনাথনের নিজের হাতে লেখা)
ড্রাকুলার কবরের খোঁজে বেরিয়েছেন ডাঃ সিউয়ার্ড,
আর্থার এবং ভ্যান হেলসিং। আমি এবং মীনা অপেক্ষা
করছি নীচতলায় - তাঁদের প্রত্যাবর্তনের অপেক্ষায় ঘুম
নেই আমাদের চোখে। কুইন্সি উধাও হয়ে যাওয়ায়
আমাদের পরিচারিকা মেরী বেশ হৈ চৈ জুড়েছিল,
কোনওমতে বুঝিয়ে শুনিয়ে শান্ত করেছি ওকে। আসল
রহস্য এখুনি চাকর বাকরদের কাছে ফাঁস করতে চাইছি না।
সবাইকে শুতে পাঠিয়েছি। তারপর দুজনে চুপচাপ বসে
আছি ড্রয়িংরুমে।
অস্বস্তি বোধ করছি আমি। কেন যেন মনে হচ্ছে, বাইরে
থেকে কেউ ঢুকবার চেষ্টা করছে ঘরের ভেতর। জানলার
কাঁচে ঘষাঘষির আওয়াজও যেন শুনতে পাচ্ছি। খানিক
আগে জানলার কাছে গিয়ে পর্দা সরিয়ে দিয়েছিলাম,
কিন্তু জানলার ওপাশের বাগান ছাড়া আর কিছু
দৃষ্টিগোচর হয়নি। মীনা এখন বেড়ালটার খোঁজে গেছে,
হতে পারে ওটাই চেষ্টা করছিল ঘরে ঢোকার। অবশ্য ওটা
অন্য কিছুও তো হতে পারে। অদৃশ্য এক দূরত্ব তৈরি হয়েছে
আমার আর মীনার মাঝে। ওকে যেন চিনিই না আমি।
ওকে দেখলেই সেইসব পুরনো স্মৃতিগুলো মনে পড়ে যায়
আমার। এক বিশাল খাদের সৃষ্টি হয়েছে মীনার প্রতি
আমার ভালবাসায়। ওকে আমি ত্যাগ করতে পারব না
কিন্তু স্বাভাবিকভাবে আর মেনে নিতে পারব না
কিছুতেই।
যাক গে, ফিরতে এত দেরী করছে কেন ও? দেখতে হয়। ১২
নভেম্বর, রাত তিনটে।। উপরের কয়েক লাইনে যেসব কথা
লিখেছি, তার জন্য ভয়ানক অনুতাপে ভুগছি আমি।
কথাগুলো ফিরিয়ে নিতে পারব না....সেটা এখন আর সম্ভব
নয়। ঈশ্বর! কেন লিখতে গেলাম ওসব? সে কারণেই কি এত
বড় শাস্তি পেতে হলো আমাকে?
কাল রাতে আমি যখন মীনার খোঁজে গেলাম, ড্রয়িংরুম
থেকে বেরোতেই একটা পুরুষকন্ঠ শুনতে পেলাম।
স্টাডিরুমের দিক থেকে আসছিল কন্ঠটা, মনে হলো
মীনার সঙ্গেই কথা বলছে। তাড়াতাড়ি এগোলাম
সেদিকে। দরজা খুলতেই অকস্মাৎ যে দৃশ্য চোখে পড়ল,
তাতে গায়ের সবকটি লোম যেন দাঁড়িয়ে গেল।
ফায়ারপ্লেসের সামনে দেখতে পেলাম মীনাকে। দুহাতে
মুখ ঢেকে একটা চেয়ারে বসে আছে; আর ওর সামনে উদ্ধত
ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে আমাদের প্রাণের শত্রু -কাউন্ট
ড্রাকুলা!
আমার পায়ের আওয়াজ পেয়েই মুখ ফিরিয়ে তাকাল
মীনা। ডেকে উঠল, " জোনাথন?"
জানলাটা খোলা দেখতে পেলাম। প্রফেসর ভ্যান
হেলসিং যে বুনো গোলাপের ডাল ঝুলিয়েছিলেন,
সেগুলো দেখি সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। হতভম্ব হয়ে
জিজ্ঞেস করলাম, " কিভাবে ঢুকল, ও?"
" আমিই ঢুকতে দিয়েছি ", দুর্বল গলায় বলল মীনা, " না
দিয়ে উপায় ছিল না"।
কুৎসিত একটা হাসি ফুটল কাউন্টের ঠোঁটে। মীনার পাশে
গিয়ে একটা হাত রাখল ওর কাঁধে। ঘৃণায় রি রি করে উঠল
আমার সর্বাঙ্গ।
" আমাকে দেখে অবাক হচ্ছ?" বলল সে, " ভাবছ ভ্যান
হেলসিং কোথায়? বোকা বুড়ো, একগুঁয়েও বটে। ভেবেছ
বারবার আমি পরাস্ত হব ওর হাতে? কক্ষনো না"।
হাতের মুঠো শক্ত হয়ে গেল আমার। নিজের অজান্তেই
এগোলাম দু'পা।
" শান্ত হও, হারকার", বলল ড্রাকুলা, " মাথা গরম করলে
তোমার বা কুইন্সির কোনও লাভ হবে না"।
" কোথায় আমার ছেলে?" চেঁচিয়ে উঠলাম।
" আছে.....ভালই আছে", শান্ত স্বরে বলল ড্রাকুলা, "
ইলিনা ওকে নিয়ে এসেছে আমার কাছে। আপাতত ওরা
দুজনেই আমার কব্জায়"।
চিবিয়ে চিবিয়ে বললাম, " কুইন্সির যদি কিছু হয়......"
" সেটা নির্ভর করছে তোমাদের ওপর ", বলল কাউন্ট, "
মাথা গরম কোরো না। কুইন্সির এখনও কিছু হয়নি। ইলিনা
খেয়াল রাখছে ওর"।
" কোথায় ওরা?"
" সেটা শুধু মীনাই জানবে। আর কেউ নয়। তুমিও না।
ছেলেকে যদি ফিরে পেতে চাও, আমার কথামতো চলতে
হবে তোমায়"।
" কি করতে হবে আমাকে? " জিজ্ঞেস করলাম আমি।
" মীনা আমার সঙ্গে যাবে....স্বেচ্ছায়", বলল ড্রাকুলা, "
ওকে আমি কুইন্সির কাছে নিয়ে যাব। তোমাকে কথা
দিতে হবে - তুমি বা তোমার বন্ধুরা পিছু নেবে না
আমাদের। যদি তাতে রাজি না হও....অথবা মীনা যদি
যেতে অসম্মতি প্রকাশ করে, তা হলে আর কোনওদিন
দেখতে পাবে না তোমাদের ছেলেকে"।
" আমাকে যেতে হবে, জোনাথন", কান্নামাখা গলায় বলল
মীনা, " প্লিজ তুমি বাধা দিও না। এ ছাড়া আর কোনও
উপায় নেই"।
" না!" প্রতিবাদ করতে চাইলাম, কিন্তু ভেঙে গেল গলা।
বুঝলাম, পিশাচটার কথায় রাজি না হওয়া মানে কুইন্সি'র
মৃত্যু। হাঁটু গেড়ে বসে পড়লাম আমি।
মীনাকে চেয়ার থেকে দাঁড় করাল ড্রাকুলা। আমার
অসহায় চোখের সামনে, মীনাকে নিয়ে জানলা টপকে
নেমে গেল বাগানে। অদৃশ্য হয়ে গেল রাতের অন্ধকারে।
কয়েক মিনিট পরেই শুনতে পেলাম, ঘোড়ার হ্রেষ্বারব আর
চাবুক চালানোর আওয়াজ। এরপর ভেসে এল চাকার
ঘড়ঘড়ানি। দৌড়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলাম। অপসৃয়মান
একটা ক্যারিজের পিছনটা দেখলাম ক্ষণিকের জন্য,
তারপরেই ওটা মিলিয়ে গেল দূরে।
পরাজিতের মতো ফিরে এলাম বাড়ির ভেতর। মূর্তির
মতো বসে রইলাম অনেকক্ষণ। নিঃশব্দে কাঁদলাম স্ত্রী
সন্তানকে হারানোর বেদনায়। কি করব বুঝতে পারছিলাম
না। হঠাৎ সচকিত হয়ে উঠলাম। আমাদের তিন অতিথির
কথা মনে পড়ে গেল। গীর্জার গোরস্থানে গেছেন ওঁরা -
ড্রাকুলার খোঁজে। ওঁদের কোনও ক্ষতি করল না তো
শয়তানটা?
তাড়াতাড়ি পায়ে জুতো পরলাম, গায়ে পরে নিলাম
ওভারকোট। ছুটলাম গীর্জার দিকে।
জোনাথন হারকারের ডায়েরীর পরের অংশ
আধঘণ্টা লাগল সেই পুরনো গোরস্থানটায় পৌঁছতে। সঙ্গে
একটা লন্ঠন নিয়েছি বলে ভাগ্যকে ধন্যবাদ জানালাম।
চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার, লন্ঠন না থাকলে কিছু দেখতে
পেতাম না। সারি সারি কবরের মাঝ দিয়ে এগিয়ে
চললাম। গলা চড়িয়ে কয়েকবার ডাকলাম - ভ্যান
হেলসিংকে; কিন্তু কোনও জবাব পেলাম না।
একটু পরেই আতঙ্ক ভর করল আমার ওপর। গোরস্থানটা
বিশাল, তার মাঝে পথ হারিয়ে ফেলেছি আমি। একটা
সমাধি কক্ষও চোখে পড়ছে না, খুঁজে পাচ্ছি না
গোরস্থানে ঢোকার বা বেরোবার পথটাও। যেদিকেই
চোখ যায়, শুধু শ্যাওলায় ঢাকা কবরফলক আর ছোট বড়
ক্রুশের সারি। পায়ের তলায় ঘাস আর আগাছার জঙ্গল,
মনে হলো যেন অন্য কোনও জগতে পৌঁছে গেছি। মৃত
আত্মারা যেন ফিসফিস করে ডাকছে আমায়।
লতা পাতা, আগাছায় পা জড়িয়ে গেল আমার। তাল
হারিয়ে হুড়মুড় করে পড়ে গেলাম , বাড়ি খেলাম একটা
কবরফলকের গায়ে। ব্যথায় ককিয়ে উঠলাম। হাত থেকে
ছুটে পড়ে গেছে লন্ঠনটা, তবে নেভেনি। ওটা ধরার জন্য
হাত বাড়ালাম, আর তখুনি চোখের কোণে নড়ে উঠল কি
যেন। ঝট করে ঘাড় ফেরালাম সেদিকে।
একজন মানুষের অবয়ব চোখে পড়ল, আমার ওপর ঝুঁকতে শুরু
করেছে। অন্ধকারে তার চেহারার কিছুই দেখা যায় না,
শুধু তার মাথার শ্বেতশুভ্র চুল প্রকট হয়ে উঠেছে। লন্ঠনটা
ততক্ষণে হাতের নাগালে পেয়ে গিয়েছি, তাড়াতাড়ি
ওটা উঁচু করে ধরলাম। স্থির হয়ে গেল অবয়বটা, ক্ষণিকের
জন্য উদ্ভাসিত হয়ে উঠল একটা মুখ। চেহারাটা চেনা
চেনা ঠেকল, কিন্তু কোথায় দেখেছি মনে করতে পারলাম
না। সে সুযোগও অবশ্য পেলাম না। লন্ঠনের আলোয় চকচক
করে উঠল তার ফ্যাকাসে চামড়া.....হাঁ করা মুখের ভেতর
থেকে ঝিলিক দিয়ে উঠল দুটো শ্বদন্ত। সঙ্গে সঙ্গে
বুঝলাম, আমার ওপর ঝুঁকে থাকা মূর্তিটা মানুষ নয়.....একটা
ভ্যাম্পায়ার! ( এই ভ্যাম্পায়ারটা হচ্ছে সেই আন্দ্রে
কোভাক্স, যে স্কলোম্যান্সে পুরাতাত্ত্বিক অভিযান
চালাতে গিয়ে বেহেরিটের হাতে মারা পড়ছিল। আন্দ্রে
কোভাক্স-ই ভ্যাম্পায়ার হয়ে এসেছে। জোনাথন তাকে
চিনতে পারেনি)
চেঁচিয়ে উঠলাম ভয়ে। সেই চিৎকার আর লন্ঠনের আগুন
দেখে বোধহয় একটু ঘাবড়ে গেল পিশাচটা। আস্তে আস্তে
পিছিয়ে গেল; তারপর হারিয়ে গেল অন্ধকারে। দৃশ্যটা
যে চোখের ভুল নয়, সে ব্যাপারে আমি একশোভাগ
নিশ্চিত। আতঙ্কে অস্থির হয়ে হামাগুড়ি দিতে শুরু
করলাম। নতুন তিনটে কণ্ঠস্বর ভেসে এল খুব কাছ থেকে।
একটু পরেই আরেকটা ছায়াকে অগ্রসর হতে দেখলাম
আমার দিকে।
" না!" চেঁচালাম আমি, " চলে যাও, চলে যাও বলছি এখান
থেকে!"
" জোনাথন!" বিস্মিত গলায় ডাকল অবয়বটা, " শান্ত হোন,
আমি জন সিউয়ার্ড। আমায় চিনতে পারছেন না?"
পরিচিত গলা শুনে চোখ পিটপিট করলাম। চিনতে পারলাম
ডাঃ সিউয়ার্ডকে। হামাগুড়ি থামিয়ে ফ্যালফ্যাল করে
চেয়ে রইলাম তাঁর দিকে। আমাকে উঠে দাঁড়াতে সাহায্য
করলেন ডাক্তার। কয়েক মিনিটের মধ্যে আরও দুটো
ছায়ামূর্তি এসে যোগ দিল আমাদের সাথে - আর্থার
গোড্যালমিং আর প্রফেসর ভ্যান হেলসিং। অক্ষত বলা
চলে না, কারণ প্রফেসর হেলসিংয়ের কপালে জমাট
বাঁধা রক্ত দেখতে পেলাম।
" প্রফেসর, আপনি আহত!" প্রায় চেঁচিয়ে উঠলাম আমি।
" ও কিছু না, সামান্য আঘাত", মাছি তাড়ানোর ভঙ্গিতে
হাত নাড়িয়ে বললেন প্রফেসর হেলসিং, " কিন্তু তুমি
এখানে কি করছ? মীনা কোথায়?"
জবাব দিতে গিয়ে বুক ভেঙে গেল আমার। বললাম, " মীনা
নেই, প্রফেসর। কাউন্ট ড্রাকুলা নিয়ে গেছে ওকে।
ইলিনা আর কুইন্সি'ও ওর কব্জায়। " সংক্ষেপে পুরো
ঘটনাটা জানালাম ওঁদের।
গোঙানির মতো শব্দ করলেন প্রফেসর। তিক্ত হয়ে উঠল
তাঁর চেহারা। বললেন, " ঈশ্বর! কি বোকা আমি! অন্ধ! এমন
একটা সম্ভাবনার কথা আগে কেন মাথায় এল না আমার?"
হড়বড় করে আরও কিছু বলতে চাইলাম আমি, কিন্তু
আমাকে থামিয়ে দিলেন সিউয়ার্ড। বললেন, " এখন না,
জোনাথন। বাড়ি গিয়ে ঠাণ্ডা মাথায় শুনব সব। চলুন ফিরি।
ড্রাকুলা চলে গেছে। এখানে আমাদের আর করার কিছু
নেই"।
ধীরগতিতে বাড়ির পথে এগোলাম আমরা। আর্থারের
গায়ে ভর দিয়ে হাঁটলাম আমি, ভ্যান হেলসিং হাঁটলেন
ডাঃ সিউয়ার্ডের গায়ে ভর দিয়ে। বুক দুরু দুরু করতে থাকল
আমার, মনে হলো ছায়ায় ছায়ায় আমাদেরকে অনুসরণ
করছে কেউ। বকের মতো গলা বাড়িয়ে এদিকওদিক
তাকাতে লাগলাম সারাক্ষণ। এক পর্যায়ে বিরক্ত হয়ে
আর্থার বললেন, " মিঃ হারকার, সামনে তাকান তো!
কাউন্ট চলে গেছে, এখন আর ওর ভয়ে পেছনে তাকাবার
দরকার নেই"।
" কাউন্ট নয়", বললাম আমি, " আরেকটা ভ্যাম্পায়ারকে
দেখেছি আমি...এই গোরস্থানে"।
" আরেকটা ভ্যাম্পায়ার?" ভ্রু কুঁচকে বললেন ভ্যান
হেলসিং, " নিশ্চয়ই ভুল দেখেছ, শান্ত হও"।
মাথা ঝাঁকিয়ে ডাঃ সিউয়ার্ডও সায় দিলেন তাঁর কথায়।
বাড়িতে পৌঁঁছতেই বুকটা খাঁ খাঁ করে উঠল আমার। মীনা
আর কুইন্সিকে ছাড়া মরুভূমির মতো লাগছে জায়গাটাকে।
ড্রয়িংরুমে গেলাম সবাই। সোফায় আধশোয়া হয়ে বসে
পড়লাম আমি আর ভ্যান হেলসিং। গম্ভীর মুখে একটা
আর্মচেয়ারে বসলেন আর্থার। সিউয়ার্ড অস্থিরভাবে
পায়চারী শুরু করলেন।
এক পর্যায়ে রাগী গলায় সিউয়ার্ড বললেন, " এর কোনও
মানে হয়? কেন এই অভিশাপের মধ্য দিয়ে আবার যেতে
হচ্ছে আমাদের? ড্রাকুলা একটা শয়তান, পিশাচ, ও যে
মিসেস হারকারকে কুইন্সির কাছে নিয়ে গেছে, তার কি
নিশ্চয়তা?"
" প্লিজ, ওভাবে বলবেন না", অনুনয় করলাম, " মীনা আর
কুইন্সি এখন একসাথে আছে- এই ভেবে নিজেকে প্রবোধ
দিয়ে রেখেছি আমি। নইলে পাগল হয়ে যাব....এখনও যদি
না হয়ে থাকি আর কি!"
রাতের খাবার নিয়ে এল পরিচারিকা মেরী। আমাদেরই
মতো কুইন্সির ব্যাপারে উদ্বিগ্ন কিন্তু মীনা বা কুইন্সি'র
ব্যাপারে কোনও প্রশ্ন করা থেকে বিরত থাকল। ওকে
কথা দিয়েছি আমরা - পরে ওকে সবকিছুই খুলে বলা হবে।
জানি না ও কতখানি বুঝবে। খিদে নেই আমাদের
কারোর, তাই খাবার টেবিলে আর বসা হলো না। তার
বদলে গোরস্থানের ঘটনা খুলে বললেন ডাঃ সিউয়ার্ড।
বলে রাখা ভাল, তাঁর কাহিনী শোনার সময় অশুভ একটা
অনুভূতি হয়েছে আমার। মনে হয়েছে, কেউ ঘুরে বেড়াচ্ছে
বাড়ির চারদিকে। উঁকি দিচ্ছে জানলার কাঁচ ভেদ করে,
চেষ্টা করছে ভেতরে ঢোকার। অবশ্য বাস্তবে তেমন
কোনও আলামত দেখা গেল না।
ক্রমশ
পরবর্তি পর্ব ২ ঘন্টা পর। লাইক কমেন্ট করে শেয়ার করুন।
অশুভ আত্মা
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now