বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
রিটার্ন অব ড্রাকুলা
কাহিনী : ফ্রেডা ওয়ারিংটন
অনুবাদক : ইসমাইল আরমান
-------------------------------------
পর্ব ২১ঃ
ইলিনা কোভাক্সের ডায়েরী
৭ নভেম্বর।।
মাদাম হারকার আমায় নম্র ও শান্ত মেয়ে হিসেবে জানেন। কিন্তু
হায়, সত্যিটা যদি তিনি জানতেন! আমার মতো মেজাজি মেয়ে খুব
কমই আছে এই দুনিয়ায়। হাজার রকমের আবেগ সর্বক্ষণ খেলা
করে আমার মধ্যে - ভয়, আনন্দ, উত্তেজনা, ঘৃণা। এই তো
একাকী কামরায় বসে ডায়েরী লিখছি আমি, তবু উত্তেজনায়
কাঁপছে দুই হাত। এই উত্তেজনা অনুভব করি আমি সাফল্যের
আনন্দে। যে - কেউই স্বীকার করবে, মাদাম মীনা'র রক্ত
সংগ্রহ করার কাজে অসাধারণ নৈপুণ্য দেখিয়েছি আমি। কারও মনে
সন্দেহ না জাগিয়ে ওটা সংগ্রহ করা ছিল এককথায় অসম্ভব। অথচ
সেটাই করেছি আমি। দুঃখ একটাই - আনন্দটা ভাগাভাগি করার জন্য আমার
সঙ্গী এখন আমার ভেতরে নেই। ওর অভাব আমি অনুভব করি
প্রতিটা মূহুর্তে। মাঝেমাঝে ওর দেখা পাই বটে, কিন্তু সে প্রায়
না দেখারই মতো । এ বাড়ির মানুষগুলোর ওপর সওয়ার হয়ে
বেড়াচ্ছে আমার সঙ্গী, আমার দিকে ওর মনোযোগ নেই।
ব্যাপারটা বেশ অদ্ভুতই লাগে - ইংরেজরা কি বোকা, নাকি
বেপরোয়া স্বভাবের? আমার সঙ্গীর উপস্থিতি টের পাচ্ছে
ওরা....ওদের চেহারা দেখেই বুঝতে পারি সেটা....অথচ ওরা
চেষ্টা করছে তাকে অস্বীকার করার! হাঙ্গেরিতে এ ধরনের
ঘটনা ঘটলে তো এতক্ষণে পুরো বাড়ি ভরে যেত রসুন আর
পবিত্র ক্রুশে, কিন্তু এরা যেন গায়ে হাওয়া লাগিয়ে বেড়াচ্ছে।
মাদাম হারকারের প্রতি ঈর্ষা অনুভব করি আমি। কেন আমার সঙ্গীর
চোখে সে এত গুরুত্বপূর্ণ? জানতে চেয়েছিলাম....কিন্তু
সঙ্গীটি কোনও জবাব দেয়নি। শুধু বলেছে, মীনার রক্ত চাই
তার। কিভাবে জোগাড় করব সেই রক্ত, বলে দেয়নি। অসম্ভব
কাজের ভারটা স্রেফ চাপিয়ে দিয়েছে আমার ওপর। দু'রাত ঘুম
হয়নি আমার। জেগে জেগে ভেবেছি, কিভাবে কি করা যায়।
দুর্ঘটনার ছলে হয়তো হাত টাত কেটে দিতে পারি মাদাম
হারকারের, কিন্তু তাতে যথেষ্ট পরিমাণ রক্ত ঝরবে না, তার
আগেই ক্ষতটার পরিচর্যা করা হবে। বার বার দুর্ঘটনা ঘটানো যাবে
না, তাতে সন্দেহ জাগবে সবার। ভাবতে ভাবতে হঠাৎ মনে পড়ে
গেল, ছোটবেলায় একবার ঠোঁট কেটে গিয়েছিল আমার,
কলকল করে ঝরেছিল রক্ত। সেই রক্ত থামাতে রীতিমতো
বেগ পেতে হয়েছিল ডাক্তারকে। ঘটনাটা মনে পড়তেই সমাধান
পেয়ে গেলাম আমার সমস্যার। এরপর কুইন্সি'কে বশ করে
কাজটা সারতে একটুও অসুবিধে হয়নি। সবচেয়ে বড় কথা, যদি
ব্যর্থও হতাম, কেউ আমায় দোষারোপ করতে পারত না।
কুইন্সি'কেই দায়ী ভাবত সবাই। আহ, কিভাবে যে রক্ত ঝরেছে
মাদাম হারকারের। মুখ থেকে কলকল করে বেরিয়ে জমা
হয়েছে আমার হাতে ধরা পেতলের বাটিতে। তারপর আবার
বেহুঁশ হয়ে গেলেন তিনি.....সাহায্য চেয়ে পাঠাবার আগে বাটিটা
লুকিয়ে ফেললাম চোখের আড়ালে। ভাগ্যের সহায়তা
বোধহয় একেই বলে।
সেই রাতেই, বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে যাবার পর বাটিটা নিয়ে বেরিয়ে
পড়েছিলাম আমি। পুরনো গোরস্থানের সমাধি কক্ষে
গিয়েছিলাম, সমাধির ডালা সরিয়ে আমার সঙ্গীর দেহ - ভস্মের
মাঝে ঢেলে দিয়েছিলাম রক্তটা। ওই রক্তের সাহায্য নিয়েই
আবার নিরেট চেহারা ফিরে পাবে আমার সঙ্গী। একটা
আলখাল্লাও চুরি করে নিয়ে গিয়েছিলাম বাড়ি থেকে -
দেহপ্রাপ্তির পর যেন গায়ে চড়াতে পারে আমার সঙ্গী। ওটা
সমাধির মাথায় রেখে একটা মোমবাতি জ্বেলেছিলাম। এরপর শুরু
হয়েছিল অপেক্ষার প্রহর।
পর পর তিন রাত আমি সমাধির পাশে ভোর পর্যন্ত থেকেছি। কিন্তু
কিছুই ঘটেনি। আমার সঙ্গী তার দৈহিক রূপে ফেরার আগে
শেষবারের মতো তাণ্ডব চালিয়েছে মাদাম হারকার আর তাঁর
সঙ্গীদের ওপর। হতাশ হয়ে পড়েছিলাম আমি। ভেবেছিলাম
খামোখাই আমায় খাটিয়েছে ও, মানুষের দুনিয়ায় ফিরে আসার
কোনও ইচ্ছেই নেই ওর।
কিন্তু কাল রাতে.....
বরাবরের মতো সমাধির পাশে বসেছিলাম আমি। মাথা নিচু করে
রেখেছিলাম হতাশায়। সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে কখন যে ঘুমিয়ে
পড়েছি বলতে পারব না। হঠাৎ ভীষণ শীত করে উঠল আমার।
ঘুম ভেঙে গেল। চোখ মেলতেই দেখি, সমাধির ভেতর
থেকে কালো ধোঁয়ার একটা কুণ্ডলী বেরিয়ে আসছে।
সমাধি কক্ষের ভেতরটা আচ্ছন্ন করে ফেলল সেই ধোঁয়া।
অনেকক্ষণ পর যখন সরে গেল সেই ধোঁয়া, কালো
আলখাল্লা পরা দীর্ঘদেহী একটা মূর্তিকে দাঁড়িয়ে থাকতে
দেখলাম আমার সামনে। দম আটকে এল আমার। বুঝতে পারলাম না
জেগে আছি নাকি স্বপ্ন দেখছি। মোমবাতি তখন নিভে গেছে,
সমাধি কক্ষের দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকছে আবছা আভা -
ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে বাইরে। স্বল্প
আলোয় নড়তে দেখলাম মূর্তিটাকে। একটা হাত বাড়াল সে আমার
দিকে। আঙুলগুলো শীর্ণ, অস্বাভাবিক রকম লম্বা, ডগায় ছুঁচালো
নখ।
আমার মুখের কয়েক ইঞ্চি সামনে এসে থামল হাতটা। শুনতে
পেলাম খসখসে একটা গলা। আমার নাম উচ্চারণ করল সে -
" ইলিনা!"
ইলিনা কোভাক্সের ডায়েরীর পরের অংশ আমার মুখোমুখি
দাঁড়িয়ে আছে মূর্তিটা। জ্বলজ্বলে চোখে তাকিয়ে আছে
আমার দিকে। কাঁপতে কাঁপতে স্পর্শ করলাম তার হাত। এই প্রথমবার।
সঙ্গে সঙ্গে মুঠো করে আমার বাহু খামচে ধরল সে, চামড়ার
মধ্যে বসে গেল নখ। ব্যথার পাশাপাশি আমার শিরদাঁড়া বেয়ে
নেমে গেল একটা শীতল স্রোত - হাতটা বরফের মতো
ঠাণ্ডা। তালুতে রয়েছে বড় বড় লোম। টান দিয়ে আমাকে দাঁড়
করাল সে।
আলোকস্বল্পতার জন্য ঠিকমতো তার চেহারা দেখতে পেলাম
না আমি। তবে মনে হলো, মূর্তিটা ভীষণ লম্বা, আমার মাথা ওর
কেবল কাঁধ ছুঁয়েছে। দেহের চামড়াগুলোও যেন ভীষণ
শুকনো - বয়সের কারণে যেমনটা হয়। তারপরেও আমার হাতের
ওপর তার মুঠোর চাপ থেকে বুঝলাম, অমিতশক্তি রয়েছে তার
শরীরে। ছায়ার মাঝে গর্বিত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে সে, ঘাড়
বেয়ে নেমে এসেছে রূপোলী চুলের গোছা। শরীর
থেকে মাটির গন্ধ ভেসে আসছে - বুনো গন্ধ। বিস্ময়ে
অভিভূত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম কিছুক্ষণ। সম্মোহিতের
মতো তাকিয়ে রইলাম তার জ্বলন্ত চোখজোড়ার দিকে। একটু
পর সাহস সঞ্চয় করে বললাম, " আমি তোমার দাসী, তোমার
ইচ্ছেই আমার ইচ্ছে। কি চাও বলো, প্রাণ দিয়ে হলেও পালন
করব আমি"।
হালকা এক টুকরো হাসি ফুটল তার ঠোঁটে। নরম সুরে বলল, "
ইলিনা, সবচেয়ে বড় উপহারটা পেয়েছি আমি তোমার কাছে -
নিজের অস্তিত্ব! চাইবার আর একটা জিনিসই আছে শুধু - আমার
জীবন"। দু'হাতে আমায় জড়িয়ে ধরল সে, তার কঠিন আলিঙ্গনে
বাঁধা পড়লাম আমি। শ্বাসপ্রশ্বাস দ্রুততর হলো আমার।
ধীরেধীরে তার মুখ নেমে এল আমার ঘাড়ে.....তারপরেই
পেলাম সুঁচ ফোটানোর মতো তীব্র একটা ব্যথা। দুনিয়া মাতাল
হয়ে উঠল আমার চোখের সামনে। আহ, কি সেই অনুভূতি!
পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মাদকও পারবে না কাউকে অমন সুখ দিতে।
চোখের সামনে যেন হাজারো রঙের খেলা দেখতে
লাগলাম আমি। অদ্ভুত এক ঘোরের মধ্যে চলে গেলাম যেন।
আবছাভাবে টের পেলাম, আমার ঘাড়ে মুখ লাগিয়ে রক্ত চুষছে
সে। বাধা দিতে পারলাম না, বাধা দেবার ইচ্ছেও হলো না।
অবর্ণনীয় এক সুখের আবেশে তখন ঝাঁকি খেয়ে চলেছে
আমার দেহ। এভাবে কতক্ষণ চলল, বলতে পারব না। সম্বিৎ
ফিরতেই নিজেকে সমাধি কক্ষের মেঝেতে আবিষ্কার
করলাম, আমার সঙ্গী অদৃশ্য। সমাধির দিকে তাকিয়ে দেখি, মিহি
একটা কুয়াশা পাক খেতে খেতে ঢুকে যাচ্ছে ডালার ফাঁক দিয়ে।
এত দ্রুত কেন চলে গেল ও? প্রশ্নটা মাথায় আসতেই খেয়াল
করলাম, সূর্য উঠে গেছে। সমাধিকক্ষের দরজা দিয়ে ভেতরে
ঢুকছে দিনের প্রথম আলো। কষ্টেসৃষ্টে উঠে দাঁড়ালাম, বাড়ি
ফিরতে হবে। কিন্তু বেরোবার আগে সমাধির ভেতর একবার
উঁকি দেবার লোভ সামলাতে পারলাম না। পরিষ্কার আলোয়
প্রথমবারের মতো দেখতে পেলাম ওকে। সমাধির ভেতর
শান্ত সমাহিত ভঙ্গিতে শুয়ে আছে ঈগলের মতো তীক্ষ্ণ
চেহারার একজন মানুষ - একজন সম্ভ্রান্ত ভদ্রলোক। চওড়া কপাল,
ঘন ভ্রু, ঠোঁটের ওপরে পেল্লায় গোঁফ আর দীঘল কেশ
মিলে রীতিমতো সুপুরুষ বলা চলে। মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে
থাকলাম তার দিকে। হঠাৎ সে চোখ খুলল।
বলল, " ইলিনা, চমৎকার সেবা করেছ তুমি আমার, যখন অন্যেরা
আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে চলেছে। এর পুরস্কার অবশ্যই
পাবে। কিন্তু এখন নয়। এখান আমার বিশ্রাম প্রয়োজন। এখন বাড়ি
যাও, আর সাবধানে থেকো। কাল রাতে আবার এসো। "
কথা শেষ করে আবার চোখ মুদল সে। আমি তখন খুশিতে
ডগমগ। শেষবারের মতো ওর দিকে তাকিয়ে বন্ধ করে দিলাম
সমাধির ডালা। তারপর বেরিয়ে এলাম ওখান থেকে।
দুর্বল পায়ে গোরস্থান থেকে বাড়িতে ফিরলাম আমি। নিজের
কামরায় ঢুকেই আচ্ছন্নের মতো শুয়ে পড়লাম বিছানায়। রাত
আসতে আর কত দেরী? আমার যে আর তর সইছে না।
৮ নভেম্বর।।
দিনটা মোটামুটি সহজভাবে কেটে গেছে। মাদাম হারকার একবার
বললেন, আমায় নাকি ফ্যাকাসে দেখাচ্ছে। তাড়াতাড়ি ওঁকে
আশ্বস্ত করলাম, কিচ্ছু হয়নি আমার। উনি চলে গেলে দু'হাতে গাল
ঘষে লাল করে তুললাম, যাতে সন্দিহান হয়ে না ওঠে কেউ। বাড়ির
তিন অতিথি... মানে ভ্যান হেলসিং, লর্ড আর্থার গোড্যালমিং আর ডাঃ
সিউয়ার্ড এখনও আছে। ওদেরকে সহ্য করতে পারছি না
কিছুতেই.....আমার গোপন সঙ্গীর জন্মশত্রু এরা, সারাক্ষণ ওর
বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে চলেছে। রাগ হয় ওদের ওপর, আবার
মনে মনে হাসি। কারণ জানি, ওরা কিছুতেই সফল হতে পারবে না।
বোকার দল, খামোখাই কানাকানি আর ফিসফাস করে বেড়াচ্ছে।
খাবার টেবিলে যখন দেখা হয়, থমথম করে সবার চেহারা,
নিজেদের গোমর লুকিয়ে রাখতে চায় আমার কাছ থেকে। ওরা
তো জানে না, ওদের চেয়েও বড় গোমর লুকোচ্ছি আমি।
সারাদিন ছটফট করেছি, রাত যেন আসেই না। শেষপর্যন্ত যখন
অন্ধকার নামল, কুইন্সিকে শুইয়ে দিলাম; তারপর শরীর খারাপের
ছুতো করে নিজেও চলে এলাম কামরায়। অপেক্ষায় থাকলাম
সবার ঘুমিয়ে পড়ার। চাই না আমায় কেউ বেরোতে দেখুক।
কয়েক ঘন্টা পর যখন গোরস্থানে এসে পৌঁছলাম, তখন আর
উত্তেজনা অনুভব করছি না। তার বদলে ভয়ে ঢিবঢিব করছে বুক।
ভাবছি কেন এসব করছি? কেন এত বড় ঝুঁকি নিচ্ছি? ভাবতে ভাবতে
কবরফলকের সারির মাঝ দিয়ে ধীর পায়ে এগিয়ে চললাম সমাধি
কক্ষের দিকে।
ক্রমশ
অশুভ আত্মা
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now