বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
রিটার্ন অব ড্রাকুলা
কাহিনী : ফ্রেডা ওয়ারিংটন
অনুবাদক : ইসমাইল আরমান
-------------------------------------
পর্ব ১৪ঃ
প্রফেসর আন্দ্রে কোভাক্সের জার্নাল তারিখ ও সময় অজ্ঞাত
কোনদিক দিয়ে কতটা সময় পেরিয়ে গেছে, বোঝার
কোনও উপায় নেই আমার। হাতের লেখাও এত খারাপ হয়ে
গেছে যে, নিজের পক্ষেই পড়া কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাও
ঠিক করেছি, সব লিখে রেখে যাব। আমার বন্ধু ভ্যান হেলসিং, বা
অন্য কেউ হয়তো সুদূর ভবিষ্যতে উদ্ধার করবে এই
জার্নাল....জানতে পারবে কি ঘটেছে আমার ভাগ্যে।
বেঁচে আছি আমি, কিন্তু জানি না আর কতটা সময় বাঁচব। মরার আগে
এটুকু জেনে যাচ্ছি, স্কলোম্যান্সের অস্তিত্ব আছে।
সফল হয়েছে আমার অভিযান। যদিও বাঁচার সম্ভাবনা নেই, কিন্তু
স্বান্তনা এই যে, জ্ঞানের অন্বেষায় জীবন দিচ্ছি আমি। জ্ঞান -
অভিশপ্ত এক জিনিস - এই জ্ঞানের তৃষ্ণাতেই স্বর্গ থেকে
বিতাড়িত হয়েছিলেন আদম আর ঈভ! সেই জ্ঞান মৃত্যু ডেকে
আনছে আমারও। যাক সে কথা, এখন আসল ঘটনা লিখতে শুরু করি।
মোমবাতি নিভে যাবার পর মূর্তির মতো অনেকক্ষণ বসে ছিলাম
অন্ধকারে। বুঝতে পারছিলাম, মিকোলাসের খুনি.... মানে ওই মমি'র
মতো দেখতে দানবটা অন্ধকারে আমার আশেপাশেই কোথাও
আছে। নড়বার সাহস পাচ্ছিলাম না। কয়েক দফা বিজ্ঞানের যুক্তিতে
বোঝাতে চেষ্টা করলাম নিজেকে - হয়তো ভুল দেখেছি
আমি, হয়তো দূর্ঘটনায় মারা গেছে মিকোলাস....পা হড়কে
হয়তো বা বাড়ি খেয়েছিল পাথরের বেঞ্চির সঙ্গে, রক্ত
বেরিয়ে এসেছিল....কিন্তু হাজার যুক্তিতেও লাভ হলো না।
মৃত্যুভয়ে কুঁকড়ে গেলাম আমি। খুব শীঘ্রি ভয়ানক ক্লান্তি ভর
করল আমার মধ্যে। আধো ঘুম আর আধো জাগরণের মধ্যে
দিয়ে সময় কাটতে লাগল। কিংবা হয়তো জ্ঞান হারালাম কয়েক
দফা....ঠিক বলতে পারব না কি ঘটেছে। হঠাৎ সজাগ হয়ে উঠলাম
চোখ ধাঁধানো আলো দেখে। চোখ পিটপিট করলাম, বুঝতে
পারছিলাম না কোথায় আছি। মাথা টনটন করছিল, সারা শরীরে অনুভব
করছিলাম ভীষণ ব্যথা। খানিক পরে চোখ সয়ে এল আলো,
পরিষ্কার হয়ে এল চারপাশ। লক্ষ্য করলাম, এখনও সেই
চেম্বারেই আছি - বসে আছি মেঝেতে। তবে এ মূহুর্তে
পুরো চেম্বার জুড়ে জ্বলছে অনেকগুলো মোমবাতি।
কাছাকাছি একটা পাথরের বেঞ্চির ওপর পড়ে আছে
মিকোলাসের প্রাণহীন দেহ। দেখতে পেলাম, বুড়ো
মতো একজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে আমার সামনে, হাতে একটা
প্রদীপ। ঠোঁট সামান্য ফাঁক হয়ে আছে বুড়োটার, দেখা
যাচ্ছে তার মুখের ভেতরে পশুর মতো ধারাল দাঁতের সারি। হিংস্র
চেহারা, বাঁকানো নাক, মাথায় মস্ত টাক....শুধু দু'কানের ওপর ঝুলছে
কিছু সাদা চুল। গায়ে লাল রঙের আলখাল্লা, তাতে সুতোয় বোনা
নকশা - ঠিক চেম্বারের অন্যান্য নকশাগুলোর মতো। নাকে
ভেসে এল পচা মাংসের বোটকা গন্ধ। গা গুলিয়ে উঠল আমার।
একটু হাসল বুড়োটা। তারপর প্রাচীন হাঙ্গেরিয়ান ভাষায় বলল, " প্রিয়
বন্ধু....প্রিয় অতিথি! কতকাল থেকে অপেক্ষা করছি তোমার জন্য!
ভয় পেয়ো না। ক্ষতি হবে না তোমার। কারণ তোমাকে আমার
প্রয়োজন। স্বাগতম.... স্বাগতম! " কথা বলতে বলতে আমার ওপর
ঝুঁকে এল সে। বুড়োটার গা থেকে আসা সেই তীব্র মাংসপচা
গন্ধে পেট উগরে বমি পেল আমার, ইচ্ছে হলো এক ধাক্কায়
সরিয়ে দিই তাকে। কিন্তু পারলাম না কেন যেন। হঠাৎ হিম হয়ে এল
সারা শরীর। চারপাশ থেকে শুনতে পেলাম অনেকগুলো
ফিসফিসে কন্ঠ। এরপর চোখের সামনে নেমে এল আঁধার।
পরেরবার যখন জেগে উঠলাম, নিজেকে মেঝেতে শুয়ে
থাকা অবস্থায় আবিষ্কার করলাম। মাথার নীচে মিকোলাসের
জ্যাকেটটা ভাঁজ করে কে যেন বালিশের মতো রেখে
দিয়েছে। ঝট করে উঠে বসলাম। চেম্বারটা তখনো আগের
মতোই আলোকিত, কিন্তু বৃদ্ধ মানুষটির বদলে এবার দেখতে
পাচ্ছি অপেক্ষাকৃত তরুণ আরেকজনকে।
ভ্রু কুঁচকে গেল আমার - নতুন এই যুবকটির চেহারা পরিচিত লাগছে।
ভাল করে তাকাতে লক্ষ্য করলাম, এ-ও বুড়োর মতো লাল
আলখাল্লা পরে আছে। ঠিক একইরকম নকশাকরা। একইরকম
আলখাল্লা? হঠাৎ বুঝলাম, লোকটাকে কেন চেনা চেনা লাগছে।
বুড়ো লোকটাই যেন যুবক হয়ে এসেছে।
একটা পাথরের বেঞ্চে বসে আছে সে, আমার ন্যাপস্যাক
থেকে বের করে নিয়েছে সব খাবার, সেগুলো সাজিয়ে
রেখেছে নিজের সামনে। আমাকে ইশারায় ডাকল। খাবার
দেখেই পেটের ভেতর মাথাচাড়া দিয়ে উঠল খিদে। কিন্তু
দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে ভাবলাম, লোকটার দিকে এগোব কি এগোব না
ভেবে।
" এসো ", আমার মনের অবস্থা আঁচ করতে পেরে ডাকল সে,
" বলেছি তো ভয়ের কিছু নেই। বেশ কিছু প্রশ্ন আছে আমার,
তাই বলে অতিথিকে ক্ষুধার্ত রাখতে পারি না। এসো, খেয়ে নাও
আগে। তারপর কথা হবে।" বলতে লজ্জা লাগছে, পেটের
খিদের কাছে পরাস্ত হলাম আমি। ভুলে গেলাম পারিপার্শ্বিক
অবস্থার কথা, ভুলে গেলাম মৃত সঙ্গিটির কথাও।তার বদলে হামাগুড়ি
দিয়ে এগিয়ে গেলাম অদ্ভুত লোকটার দিকে। তার সামনে বসে
গোগ্রাসে খেতে শুরু করলাম। খাবার, পানি আর দু'ঢোক ব্রান্ডি
পেটে পড়ার পর কিছুটা শক্তি ফিরে পেলাম। খাওয়া দাওয়ার পুরো
সময়টাতেই লোকটা আমার দিকে প্রচ্ছন্ন কৌতুকের দৃষ্টিতে
তাকিয়ে ছিল, ঠোঁটের কোণে উঁকি দিচ্ছিল আধো হাসি।
ভদ্রতার বশে খাবার সাধলাম একবার, জবাবে সে বলল, " দরকার
নেই, আমি খেয়েছি "। বলেই হাসল অদ্ভুত ভঙ্গিতে। কিছু যেন
বোঝাতে চাইল সেই হাসির মাধ্যমে। তীক্ষ্ণ চোখে তাকে
লক্ষ্য করতে লাগলাম। হাড় জিরজিরে এক মানুষ, কিন্তু দুর্বল বলে
মনে হলো না। ধূসর চুল, বয়স আন্দাজ করা মুশকিল। ত্রিশ হতে
পারে....আবার পঞ্চাশও হতে পারে। প্রথমে দেখা বুড়ো
মানুষটার ছেলে হতে পারে। কিন্তু তারপরেই একটা অবৈজ্ঞানিক
চিন্তা মাথায় এল। কেন কে জানে মনে হলো, প্রথম দেখা
সেই বুড়ো মানুষটা....আর এই যুবক....একই ব্যক্তি। মিকোলাসের
জীবন নিয়েই এই বুড়ো জোয়ান হয়ে উঠেছে!
চেম্বারের মাঝখানে, বেদির গায়ে ঠেস দিয়ে রাখা একটা কুঠার
আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করল। ফলাটা বাঁকানো, হাতলে কাটাকুটি.... তাও
আবার মসৃণ হয়ে এসেছে। মধ্যযুগীয় ডিজাইন, চেহারা বলে
দিচ্ছে ওটা ব্যবহার করা হয়েছে বহুবার। জিনিসটা আগে দেখিনি
বেদির পাশে। এল কোত্থেকে?
খাওয়া শেষ হলে আমায় প্রশ্ন করল লোকটা, " কে তুমি?" নাম
আর পেশা জানালাম তাকে। টের পেলাম, গলা খসখসে, কণ্ঠস্বর
দুর্বল।
" আমাকে তুমি 'বেহেরিট' নামে ডাকতে পারো", বলল লোকটা,
" ওটা আমার আসল নাম নয় যদিও, তবে এ নামেই পরিচিত আমি। যাক-
গে, এখন বলো, এখানে কেন এসেছ? " বেহেরিট নামটা
কেমন পরিচিত ঠেকল আমার কানে। কোথায় যেন
পড়েছিলাম....না শুনেছিলাম। কিন্তু তখন অত ভাবার সময় নেই।
বললাম, " আমি একজন গবেষক "। ইশারা করলাম মিকোলাসের
দিকে, " ও ছিল আমার সহযোগী, ছাত্র। দুজনে একটা
পুরাতাত্ত্বিক অভিযানে এসেছিলাম..... "
" অদ্ভুত শব্দ ব্যবহার করছ তুমি, যার অর্থ আমার জানা নেই", ভ্রু
কোঁচকাল বেহেরিট, " কি খুঁজতে এসেছিলে তোমরা?"
অধৈর্য শোনাল বেহেরিটের কন্ঠ। ভয় পেয়ে গেলাম, এর
ওপরেই এখন আমার বাঁচা - মরা নির্ভর করছে। তাই ভণিতা না করে
জানালাম, " স্কলোম্যান্স নামে এক কল্পকাহিনীর জায়গা খুঁজতে
এসেছি আমরা। প্রমাণ করতে চেয়েছিলাম, সত্যিই অমন একটা
জায়গার অস্তিত্ব ছিল এককালে"।
ঠোঁটের কোণ একটু বেঁকে গেল বেহেরিটের।
জিজ্ঞেস করল, " পেয়েছ?"
আত্মবিশ্বাসী সুরে বললাম, " আমার তো তা-ই মনে হয়। আপনি
এ ব্যাপারে কিছু বলতে পারেন?" পালটা প্রশ্ন করল লোকটা এবার,
" কত সাল চলছে এখন? " বললাম। সঙ্গে সঙ্গে বিস্ফারিত হয়ে
উঠল তার দু'চোখ। মুখ ঢাকল দু-হাতে। গোঙানির মতো বীভৎস
এক আওয়াজ করল, সেটা শুনে রক্ত পানি হয়ে গেল আমার। খানিক
পরে উঠে দাঁড়াল সে। পায়চারি করতে করতে বলল, " অনেক....
অনেক সময় পেরিয়ে গেছে! নিশ্চয়ই অনেক বদলে
গেছে পৃথিবী "। থমকে দাঁড়াল এরপর। আমার দিকে ফেরাল
ঘাড়। বলল, " বলো, কতখানি বদলেছে বাইরের দুনিয়া?" " কবেকার
তুলনায়?" বিভ্রান্ত গলায় প্রশ্ন ছুঁড়লাম। শীর্ণ আঙুল তুলে বেদির
গোড়া দেখাল লোকটা। বলল, " প্রায় চারশো বছর ধরে ওখানে
ঘুমিয়ে ছিলাম আমি। অনেক স্বপ্ন দেখেছি.... কিন্তু তার মধ্যে
কোনটা সত্যি কোনটা মিথ্যে জানি না"। চারশো বছর! আমি হতবাক
হয়ে গেলাম তার কথায়। ভয়ের কথা ভুলে গেলাম, মনের
ভেতর জেগে উঠল কৌতূহল। বললাম, " এই চারশো বছরে
অনেক কিছুই বদলেছে, বেহেরিট। জ্ঞান বিজ্ঞানের
অগ্রগতির দিকটা ধরলে....."
" অগ্রগতি? " আমাকে বাধা দিল সে, বাঁকা সুরে বলল, " আজকের
এই জ্ঞান বিজ্ঞান কোত্থেকে এসেছে বলে মনে হয়
তোমার? নিশ্চয়ই এখান থেকে! এ জায়গা কেন খুঁজছিলে তুমি?
দীক্ষা নেবার জন্য? কিন্তু না, চারশো বছর আগেই বন্ধ হয়ে
গেছে এই স্কলোম্যান্স।" সাগ্রহে উত্তেজিত গলায় বললাম, "
তার মানে আপনি বলতে চাইছেন....এটা সত্যিই এককালে
স্কলোম্যান্স ছিল?"
" হ্যাঁ, এককালে ছিল", উদাস গলায় বলল লোকটা। তার খোলা মুখ
দিয়ে ভেসে এল কাঁচা রক্তের গন্ধ। এরই মাঝে আমি আন্দাজ
করতে শুরু করেছি তার পরিচয়। বেহেরিট বলে চলল, " যার
তারপক্ষে সম্ভব নয়, অথচ এ জায়গা তুমি খুঁজে পেয়েছ। তার
অর্থ....." " কি?" জিজ্ঞেস করলাম আমি। বেহেরিট বলল, " তার
মানে পুনর্জাগরণের ক্ষণ ঘনিয়ে এসেছে। বহুকাল পর আবার
আসতে চলেছে আমাদের সময়"। " আপাতত এখান থেকে
বেরিয়ে যেতে পারলেই খুশি হই আমি", মিকোলাসের দিকে
এক পলক তাকিয়ে, বেহেরিটকে উদ্দেশ্য করে বললাম আমি, "
যদি কিছু মনে না করেন, আপনি কি আমায় এখান থেকে
বেরোতে সাহায্য করতে পারেন...." এটুকু বলেই থমকে
গেলাম আমি। যেটা এতক্ষণ মনে পড়তে পড়তেও মনে
পড়ছিল না, এবার সেটা মনে পড়ল। মনে পড়ে গেছে, কোন
এক প্রাচীন পুঁথিতে পড়েছিলাম, ' বেহেরিট' হচ্ছে এক
প্রাচীন পিশাচের নাম।
ক্রমশ
অশুভ আত্মা
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now