বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
রিটার্ন অব ড্রাকুলা
কাহিনী : ফ্রেডা ওয়ারিংটন
অনুবাদক : ইসমাইল আরমান
-------------------------------------
পর্ব ১০
ইলিনা কোভাক্সের ডায়েরী
২৩ আগস্ট।।
খামারবাড়ি ছেড়ে চলে যাচ্ছি আমি, তবে বাবার সঙ্গে
নয়। পালাবার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। কঠিন এক সিদ্ধান্ত। বুক
ধুকপুক করছে কিন্তু কিছুতেই পিছপা হব না। ছোট একটা
ব্যাগে ভরে নিয়েছি নিজের দরকারি সব জিনিসপত্র,
অপেক্ষা করছি সুযোগের।
এমনিতে আগামীকাল রওনা হবার কথা আমাদের, তার
আগে বিসট্রিজে যাবার কোনও ব্যবস্থা করতে পারেননি
বাবা। বাড়তি এই দিনটাতে নানা ধরনের তিক্ত
অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। সকালে যখন কামরা
থেকে বেরোলাম, খামারবাড়ির লোকেরা আমায়
দেখামাত্র হাত দিয়ে অদ্ভুত একটা ইশারা করল.....পরে
জানলাম ওটা নাকি শয়তানকে তাড়াবার সঙ্কেত। ওদের
কাজকর্ম দেখে খেপে গিয়েছিল বাবা, ' কুসংস্কারাচ্ছন্
ন ছোটলোক ' বলে গাল'ও দিয়ে বসেছে। হাতাহাতি বেধে
যেত, যদি না খামারমালিক আর তার বউ ব্যাপারটার
মাঝে নাক না গলাত। বাবাকে শান্ত করেছে তারা,
অনুরোধ করেছে যত দ্রুত সম্ভব আমরা যেন এখান থেকে
চলে যাই।
অবস্থা বেগতিক দেখে নাস্তা না করেই কামরায় ফিরে
এসেছিলাম আমি, তাতেও রেহাই নেই। বাবা এসে
রীতিমতো জেরা শুরু করল... কাউকে কিছু না জানিয়ে
দু'রাত কোথায় ছিলাম আমি। ধমক খেয়ে শুধুই কেঁদেছি
কিন্তু জবাব দিইনি বাবার প্রশ্নের। জেদ চেপে
গিয়েছিল, বাবা যতই চেঁচাক, কিছুতেই মুখ খুলব না
নেকড়েটার ব্যাপারে।
" কোথা থেকে মুখ কালো করে এসেছিস বল?" চিৎকার
করছে বাবা, " কার সাথে কোথায় অভিসারে
গিয়েছিলি? কোনও চাষাভুষো.... না কি কোনও জিপসি
ছোকরার সঙ্গে? আমার মান সন্মান সব ধ্বংস করেছিস
তুই...এখন কে বিয়ে করবে তোকে? হায়, কি করব আমি এখন
তোকে নিয়ে, বল? হায় ঈশ্বর, এ তুমি আমার কোন পাপের
শাস্তি দিচ্ছ?"
বাবার জন্য আমার একটু খারাপ লাগছিল না, তা নয়।
জানি, আমার নিজেরও কিছু খুঁত আছে; কিন্তু পিতা
হিসেবে তো ওঁর বোঝা উচিত যে কোনও কোনও
ব্যাপারে আমার নিজের হাত নেই। ভাল মন্দ মিশিয়েই
মানুষ। অথচ এসব না ভেবেই আমাকে একখানা কষে চড়
মেরে বসল বাবা।
ব্যস, আমার চরম সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য ওইটুকুই যথেষ্ট
ছিল। রাগে রি রি করে উঠেছে আমার গা। মনে মনে ঠিক
করলাম....আর নয়...অনেক সয়েছি অপমান আর গঞ্জনা....
এবার আমি পালাবই....আর পালাব আজ রাতেই। দরজায়
তালা দিয়ে গেছে বাবা; কিন্তু তাতে কি? জানলা তো
খোলা। আমি ওই জানলা দিয়েই পালাব। অপেক্ষা শুধু
রাতের আঁধার নেমে আসার। তা-ও নেমে আসতে শুরু
করেছে। খুব শীঘ্রই বেরিয়ে পড়ব আমি।
ওই তো, এসে পড়েছে আমার বন্ধু! সাঁঝের আঁধার ভেদ
করে
এগিয়ে আসছে ওর বিশাল দেহ, আগুনের মতো জ্বলছে ওর
দু'চোখ। জানলার কাছে এসে পড়েছে, দু'পায়ে ভর দিয়ে
চৌকাঠের ওপর উঠে দাঁড়িয়েছে। কাঁচের ওপাশে দেখতে
পাচ্ছি ওর সেই বিশাল আগ্রহী চেহারা। আমায় যেন
নিঃশব্দে আমন্ত্রণ জানাচ্ছে।
জানলা খুলব এখন আমি। সঙ্গে যাব আমার বন্ধুর। দেখা
যাক আমায় কোথায় নিয়ে যায় ও।
২৬ আগস্ট।।
শেষবার ডায়েরী লেখার পর বহুদূর চলে এসেছি। এর
মাঝে ঘটে গেছে অনেক কিছু। যতদূর সম্ভব গুছিয়ে
লেখার চেষ্টা করছি।
সে রাতে আমার নেকড়ে বন্ধুর আমন্ত্রণ পেয়ে দেরী
করিনি, ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে পড়েছিলাম জানলা দিয়ে।
মাঠ পেরিয়ে আমায় ফলের বাগানের দিকে নিয়ে
চলছিল সে, আর তখুনি পেছন থেকে শুনতে পেলাম বাবা'র
চিৎকার। ঘাড় ফেরাতেই দেখলাম, খামারবাড়ি থেকে
চেঁচাতে চেঁচাতে বেরিয়ে আসছে বাবা। নিশ্চয়ই
গোপনে নজর রাখছিল আমার ওপর।
কাছে এসে তর্জনগর্জন শুরু করল বাবা, আমাকে ঘরে
ফিরে যেতে বলল। সাড়া দিলাম না তার কথায়। হাত ধরে
টানতে গেল বাবা, ঝটকা দিয়ে ছাড়িয়ে নিলাম হাত।
সঙ্গে সঙ্গে খেলাম চড়। চোখের সামনে লাল নীল তারা
জ্বলে উঠল। মুখ থুবড়ে পড়লাম মাটিতে। ব্যথা সয়ে এলে
মাথা তুললাম। দেখলাম, বাবার দিকে চেয়ে চাপা গরগর
শব্দ করছে আমার নেকড়ে বন্ধু। খ্যাপাটে গলায় তার
উদ্দেশ্যে চিৎকার করল বাবা, বুঝি ভয় পাওয়াতে চাইছে।
কয়েক মিনিট এভাবে কাটার পর পাহাড়ের দিকে মুখ
ঘোরাল নেকড়ে, অদ্ভুত এক সুরে ডেকে উঠল। সঙ্গে
সঙ্গে
শুনতে পেলাম হিংস্র গর্জন.... বহুকন্ঠের। একটু পরেই
গাছপালার আড়াল থেকে বেরিয়ে এল ধূসর অনেকগুলো
আকৃতি। ছুটে এল আমাদের দিকে। পাহাড়ি নেকড়ের
পাল! হাঁ করে আছে প্রত্যেকটা নেকড়ে! চাঁদের আলোয়
চকচক করছে তাদের মুখের ভেতরের ধারাল দাঁতের সারি।
চেহারায় বন্যতা।
ভয় ফুটল বাবার চোখে। উল্টো ঘুরে পড়িমরি করে ছুটল
বাড়ির দিকে। কিন্তু অর্ধেক পথ যেতে না যেতেই পেছন
থেকে হামলা চালাল নেকড়ের পাল। হুমড়ি খেয়ে
মাটিতে পড়ে গেল বাবা। আর্তনাদ করে উঠল; কিন্তু
তাতে কোনও লাভ হলো না। তার দেহের এখানে সেখানে
কামড় বসাতে লাগল হিংস্র নেকড়ের দল।
ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলাম আমি। কি ভর করেছিল
আমার ওপর, জানি না। এক বিন্দু করুণা অনুভব করলাম না
বাবার জন্য, তাগিদ পেলাম না তাকে বাঁচানোর। বরং
মনে হলো এটাই বাস্তব প্রাপ্য....এটাই তার শাস্তি।
কিছুক্ষণ দাপাদাপি করার পর স্থির হয়ে গেল বাবার
শরীরটা....চিরদিনের জন্য। ততক্ষণে তার লাশটা চেনার
কোনও উপায় নেই। দলা পাকানো মাংসের তালে পরিণত
হয়েছে। শুধু রক্ত আর মাংসের পিন্ড! আমার নেকড়ে বন্ধু
এগিয়ে গেল সেদিকে। বাকি নেকড়েগুলো সরে দাঁড়াল,
কাছে গিয়ে মাংসপিণ্ডটার ওপর মুখ নামাল নেকড়ে বন্ধু,
জিভ বের করে রক্ত চাটতে শুরু করল।
এতক্ষণে মুখ ঢাকলাম আমি।
একটু পর যখন হাত সরালাম, তখন নেকড়ে বন্ধু ফিরে
এসেছে আমার পাশে। ইশারা করল তার সঙ্গে এগোবার
জন্য। ওর পিছু পিছু হাঁটতে শুরু করলাম। পেছনে পড়ে রইল
আমার বাবার রক্তাক্ত মাংসপিণ্ড দেহটা, নেকড়েরা
তাণ্ডব শুরু করে দিয়েছে সেটার ওপর। দূরে খামারে হৈ
হল্লা শোনা গেল, জ্বলে উঠল অনেক আলো। দল বেঁধে
ওরা বেরিয়ে পড়েছে বোধহয় আমাকে আর বাবা'কে
খুঁজতে।
কোনওদিকে মনোযোগ দিলাম না আমি। নেকড়ে বন্ধুর
অনুসরণ করে প্রান্তর পেরিয়ে ঢুকে পড়লাম গাছপালার
আড়ালে। অদ্ভুত এক নির্বিকারত্ব ভর করেছিল আমার
ওপর। কোনওকিছুতেই পরোয়া নেই আমার।
রুক্ষ, পাহাড়ি পথে সেই প্রাচীন ক্যাসলের দিকে
আমাকে আবারও নিয়ে চলল আমার নেকড়ে বন্ধু। বনজঙ্গল
আর পাহাড়ি ঢাল পেরিয়ে ওকে অনুসরণ করতে লাগলাম
আমি। কি ও? সাধারণ এক নেকড়ে, নাকি নেকড়ের দেহে
ভর করে আছে কোনও অশুভ আত্মা? আধুনিক। মেয়ে আমি,
তারপরেও এই সম্ভাবনা আমার কাছে অবাস্তব ঠেকছে
না।
যাই হোক, পরদিন সকালে ক্যাসলে পৌঁছে গেলাম
আমরা। প্রথম রাতে এখানে এসে যে জায়গায় ছাইমাটির
পুঁটলি টা রেখেছিলাম, সেটা যথাস্থানেই আছে
দেখলাম। পুঁটলিটা কাঁধে ঝুলিয়ে নিয়ে নেকড়ে বন্ধুর
পিছু নিলাম। সঙ্কীর্ণ একটা প্যাসেজ ধরে এগিয়ে
লোহায় মোড়া বিশাল এক দরজার সামনে আমায় নিয়ে
গেল নেকড়েটা। লক্ষ্য করলাম, পাল্লার ওপরে পেরেক
দিয়ে একটা কাঠের ক্রুশ গেঁথে রাখা আছে; চৌকাঠ আর
পাল্লার মাঝখানের ফাঁকফোকরগুলোও সাদাটে এক
ধরনের জিনিস দিয়ে 'সীল' করা। অঙ্গভঙ্গি'র মাধ্যমে
নেকরেটা আমায় যেন বোঝাল, ওগুলো সব সরিয়ে
ফেলতে। তাই-ই করলাম। টান দিয়ে খুলে ফেললাম ক্রুশটা,
আঙুল দিয়ে খুঁচিয়ে উঠিয়ে ফেললাম সাদা 'সীল'টা। কাজ
শেষে টের পেলাম, সাদা জিনিসটা আসলে রসুনের
পেস্ট....হাত গন্ধ হয়ে গেছে ওটা'র স্পর্শে। রসুন আর ক্রুশ -
দুটোই ব্যবহার করা হয় অশুভ আত্মাকে ঠেকানোর জন্য।
কিন্তু এই পুরনো, পরিত্যক্ত ক্যাসলে এসব কে বা কারা
করে গেছে? কেন-ই বা করেছে? দূর্গে অশুভ আত্মার
অনুপ্রবেশ ঠেকাতে চেয়েছে কেউ, নাকি ঠেকাতে
চেয়েছে দূর্গ থেকে আত্মার বেরিয়ে আসা?
ক্রুশ আর শুকিয়ে আসা রসুনের পেস্টের জঞ্জাল ফেলে
দিলাম প্যাসেজের বাইরে। ঠেলা দিলাম পাল্লায়।
তালা নেই, হাঁ হয়ে খুলে গেল দরজা। প্রায় নাচতে
নাচতে চৌকাঠ পেরিয়ে ওপাশের নিচু একটা করিডোরে
ঢুকে পড়ল আমার নেকড়ে বন্ধু। আমিও ঢুকলাম। শরীর তখন
ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত। কিন্তু তারচেয়েও বেশি অনুভব
করলাম এক অজানা ভয়। দূর্গের ভেতর পা দেয়ামাত্র মনে
হলো যেন কোনও অশুভ জগতে ঢুকে পড়েছি। কিন্তু
ফেরার
উপায় নেই। যন্ত্রচালিতের মতো হাঁটতে থাকলাম নেকড়ে
বন্ধুর পেছন পেছন।
ভূ-গর্ভস্থ, ধ্বংসপ্রায় এক চ্যাপেলে আমায় নিয়ে গেল ও।
ছাদের একাংশ ভেঙে পড়েছে, সেখান দিয়ে ঢুকছে
সূর্যের ম্লান আলো। বাতাস সোঁদা সোঁদা, সেইসঙ্গে
ভাসছে বোটকা এক দুর্গন্ধ..... যেন একদল ইঁদুর মরে পচে
আছে ওখানে। সারি সারি কবর আর সমাধি দেখতে
পেলাম ওখানে। ভূগর্ভস্থ গোরস্থানে এসে পড়েছি আমি!
কতকাল যে এখানে কারোর পা পড়েনি কে জানে!
সবখানে পুরু হয়ে জমেছে ধূলো আর মাটি।
আমায় দাঁড় করিয়ে রেখে গোরস্থানে ঢুকে পড়ল
নেকড়েটা। একে একে সবগুলো কবরের পাশে গিয়ে
থামছে, গন্ধ শুঁকছে নাক টেনে। যেন বোঝার চেষ্টা করছে
কিছু। আমি তখন ক্লান্তির শেষ সীমায় পৌঁছেছি, ধপ
করে বসে পড়লাম মাটিতে। শরীরে একবিন্দু শক্তি
পাচ্ছি না। ঘুম পেয়েছে খুব, তাই শুয়ে পড়লাম। সবে চোখ
বুজেছি, এমন সময় ফিরে এল আমার নেকড়ে বন্ধু। জামার
হাতা কামড়ে ধরে টানাটানি শুরু করল। বুঝলাম, কোথায়
যেন নিয়ে যেতে চাইছে। আর শুয়ে থাকা সম্ভব হলো না,
অগত্যা সঙ্গী হলাম ওর।
একটা সমাধির সামনে আমায় নিয়ে এল ও। আকারে -
আয়তনে অন্যগুলোর চেয়ে আলাদা। ওপরে একটাই নাম
লেখা - ' কাউন্ট ড্রাকুলা'।
নামটা পড়েই ভেতরে ভেতরে যে কেমন একটা অনুভূতি
হলো, তা ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না। নামটা
অপরিচিত ; কিন্তু মনে হলো যেন কতকালের পরিচিত।
মুগ্ধতায় ভরে উঠল মন, একইসঙ্গে শিউরে উঠল ভয়ে।
পরিত্যক্ত এই ভূগর্ভস্থ গোরস্থান, প্রাচীন ক্যাসল আর
ক্যাসলের বাইরের শ্বাপদসঙ্কুল জঙ্গল যেন নীরবে
চিৎকার করে কিছু বলল আমায়।
মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে ছিলাম, সম্বিৎ ফিরল আমার
নেকড়ে বন্ধুর আওয়াজে। পাগলের মতো দু'পা দিয়ে মাটি
খুঁড়ছে ও। খুব শীঘ্র একটা গর্ত করে ফেলল। তারপর
ইশারায় বোঝাল, সঙ্গে আনা ছাইমাটি ওখানে ঢেলে
ফেলতে হবে আমায়.....তারপর বোঁচকায় ভরতে হবে সদ্য
খোঁড়া আলগা মাটি। অদ্ভুত এই নির্দেশের কোনও
আগামাথা কিছু বুঝতে পারলাম না, একবার ভাবলাম বুঝি
ভুলই করছি ইশারার অর্থ বুঝতে। কিন্তু দাঁতমুখ খিঁচিয়ে
আমায় হুমকি দিল নেকড়ে। তাই আর দ্বিধা করলাম না, ওর
ইচ্ছেমত গর্তে ছাইমাটি ঢেলে বোঁচকা ভরে নিলাম নতুন
মাটি দিয়ে।
কাজ শেষে হাঁপাতে শুরু করলাম - ক্লান্তির শেষ সীমায়
পৌঁছে গেছি, জ্ঞান হারাবার দশা। আমার অবস্থা যেন
বুঝতে পারল নেকড়েটা। বোঁচকার মুখ চোয়ালে আটকে
টানতে শুরু করল, আমায় চোখের ভাষায় বলল অনুসরণ
করতে। অপ্রকৃতিস্থের মতো ওকে অনুসরণ করলাম।
গোরস্থান থেকে বেরিয়ে এলাম আমরা। চওড়া এক সিঁড়ি
ধরে নিয়ে গেল ক্যাসলের ওপরতলায়। ওখানকার একটা
কামরায় আমায় পৌঁছে দিয়ে গায়েব হয়ে গেল নেকড়ে
বন্ধু।
ভেতরে কি আছে না আছে, খেয়াল করিনি। আবছাভাবে
একটা কাউচ দেখতে পেয়ে সেটার ওপর ঢলে বসে পড়লাম।
তারপর ঘুমিয়ে পড়েছিলাম না জ্ঞান হারিয়ে
ফেলেছিলাম, বলতে পারব না। কামরাটা এককালে খুব
সুন্দর ছিল, বোঝা যায়। দামি আসবাবপত্র, মেঝেতে
গালিচা, জানলায় রেশমি পর্দা, মাথার ওপর বহুমূল্য
ঝাড়বাতি - সবই ছিল। এখন আর কিছুই অবশিষ্ট নেই।
আসবাবপত্রে ঘুণ ধরেছে, পোকায় খেয়ে ফেলেছে
গালিচা আর পর্দা। ঝাড়বাতির কাঁচ কালো হয়ে গেছে
ময়লা পড়ে। সবখানে ধুলো আর মাকড়শারজাল। পুরনো
একটা গন্ধ ভাসছে বাতাসে।
বাইরে সাঁঝের আঁধার নামতে শুরু করেছে, অনেক খুঁজেও
কামরায় কোনও মোমবাতি পাইনি। রাতের অন্ধকারে এই
ছমছমে পরিবেশে একাকী থাকতে হবে ভাবতেই আতঙ্কে
হিম হয়ে আসছে হাত-পা। কোথায় গেল আমার নেকড়ে
বন্ধু? কেন একাকী ফেলে চলে গেল আমায়? আর কি
ফিরবে ও? নাকি ক্ষুধাতৃষ্ণায় তিলে তিলে মরতে হবে
আমায়?
মাঝে মাঝেই জানলা দিয়ে বাইরে তাকাচ্ছি আমি।
দুগ্ধধবল জোছনায় স্নান করেছে প্রকৃতি। শ্বেতবর্ণ ধারণ
করেছে দূর্গের দেয়াল, উঁচু পাহাড়সারি আর ঘন অরণ্য।
মোহনীয় এক পরিবেশ। নেশার মতো লাগছে আমার।
কে যেন হাত বোলাচ্ছে আমার গায়ে। শুনতে পাচ্ছি
তরুণী কন্ঠে জলতরঙ্গের মতো হাসি....মোলায়েম, সুরেলা
নারীকন্ঠ। মনে হলো, একটা নয়, কয়েকটি মেয়ে'র গলা।
" বোন! " ফিসফিস করে উঠল একটা নারীকন্ঠ, " মিষ্টি
বোন!"
ঠাণ্ডা লাগছে আমার....ভীষণ ঠাণ্ডা....
২৭ আগস্ট, সকাল।।
তাড়াতাড়ি যা লেখার লিখে ফেলতে হবে আমায়। হাত
কাঁপছে আমার, চোখ ভরে আছে পানিতে...দৃষ্টি খোলা।
গলার কাছে দলা পাকিয়ে আছে কি যেন! বুক ফেটে
যাচ্ছে কষ্টে। তারপরেও লিখতে হবে আমায়।
গত সন্ধ্যায় ডায়েরী লেখা শেষ করতে পারিনি, আচমকা
প্রচণ্ড ঠান্ডায় ঠকঠক করে কাঁপতে শুরু করেছিলাম।
হাড্ডিমজ্জা জমে যাচ্ছিল সেই ঠান্ডায়। মনে হচ্ছিল
কোমল হাতগুলোর স্পর্শেই এমন দশা হয়েছে আমার।
হাতের মালিকদের দেখবার ডাইনে বামে
তাকিয়েছিলাম, কিন্তু বিস্মিত হয়ে দেখেছি কামরায়
আমি ছাড়া আর কেউ নেই। তা হলে কারা এতক্ষণ হাত
বোলাচ্ছিল আমার গায়ে? ধূলিমলিন মেঝেতে ফুটফুটে
চাঁদের আলোতেও দেখেছি, আমার পায়ের ছাপ ছাড়া
আর কারোর পায়ের ছাপ নেই। তাহলে আমি এতক্ষণ
আমার কানে কানে কাদের অস্পষ্ট গুঞ্জন শুনছিলাম?
আমি যে একটি নয়, বেশ কয়েকটি মেয়ের গুঞ্জন শুনেছি
আমার কামরায়।
গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল আমার।
এ সময় ফিরে এল আমার নেকড়ে বন্ধু। দৃপ্ত ভঙ্গিতে ঢুকল
দরজা দিয়ে, এক লাফে আমার কাউচের ওপর উঠে বসল।
অস্তগামী সূর্যের মতো জ্বলছিল ওর চোখদুটো। জিভ
দিয়ে যখন আমার হাত চেটে দিল, উত্তাপ অনুভব করলাম।
অথচ এতদিন যখন আমার হাত চেটে দিত, মরা লাশের
শীতলতা অনুভব করতাম। এতকিছু ভাবার আর ক্ষমতা নেই
আমার, আপনা থেকেই মুদে এল চোখদুটো, কাউচে শুয়ে
পড়লাম আমি। টের পেলাম, আমার দেহের ওপর উঠে
বসেছে নেকড়েটা, যেন গরম রাখতে চাইছে আমায়। গলায়
ওর জিভ আর দাঁতের স্পর্শ অনুভব করলাম, শিহরিত হলাম
অজানা এক আনন্দে।
বোধহয় তারপর স্বপ্নই দেখতে শুরু করলাম। আমার বন্ধুটির
দিকে তাকাতেই ওকে আর নেকড়ে বলে মনে হলো না।
মনে হলো দীর্ঘদেহী এক মানুষ, যার হাতের আঙুলগুলো
অস্বাভাবিক লম্বা। কেমন বিবর্ণ আর পাণ্ডুর মুখটা।
চোখদুটো দিয়ে যেন লাল দ্যুতি বেরোচ্ছে। তবে
লোকটা
নিরেট নয়। আমাকে ছুঁতে গিয়েও পারছে না। আমিও
পারছি না তাকে ছুঁতে। লোকটার মনের গভীরে লুকিয়ে
থাকা হতাশা আর যন্ত্রণা অনুভব করতে পারছিলাম। মনে
হচ্ছিল, লোকটা অন্য একটা জগতে রয়েছে এখন। সে
জড়জগতে ফিরে আসতে যেন মরিয়া। চোখের সামনে
একটা দৃশ্যও যেন ভেসে উঠল - পাহাড় বনানীর মাঝ দিয়ে
ছুটে আসছে একটা ক্যারিজ...কারা যেন ক্যারিজটাকে
থামাল, তারপর কফিনের মতো একটা বাক্স নামিয়ে
নিয়ে এল ক্যারিজটা থেকে....তারপর কফিনের ডালা
খুলে ভেতরে শুয়ে থাকা একটা মানুষের শরীরে বুকে
গেঁথে দিল একটা গোঁজ....তারপর যেন সবকিছু আঁধার
সমুদ্রে নিমজ্জিত হয়ে গেল।
এসব দেখতে দেখতে হঠাৎ ঝাঁকি খেলাম আমি, তীব্র
ব্যথায় কুঁকড়ে গেল দেহ। মনে হলো পাঁজর বিদীর্ণ করে
কিছু একটা ঢুকে পড়েছে শরীরে। যন্ত্রণায় ককিয়ে
উঠলাম, গোঙানি বেরোতে লাগল মুখ দিয়ে....তবে
বেশীক্ষণ স্থায়িত্ব হলো না সে ব্যথা। একটু পর কি এক
প্রশান্তি ভর করল আমার মাঝে। স্বপ্নহীন, নিরুদ্বেগের
ঘুমে তলিয়ে গেলাম।
আধঘণ্টা আগে যখন ঘুম ভাঙল, দেখলাম সকাল হয়ে গেছে।
চোখে পড়ল আরেকটা ব্যাপার....আমার এতদিনের
বন্ধু....আমার একান্ত সঙ্গী নেকড়েটা মরে পড়ে আছে
আমার পাশে। বুকটা যে কেমন করে উঠল, বোঝাতে পারব
না। ওকে জড়িয়ে ধরলাম আমি, কাঁদতে শুরু করলাম
হাউমাউ করে। তারপর একটা কণ্ঠস্বর কানে আসতেই
থেমে গেলাম....না, বাইরে থেকে নয়....আমার মাথার
ভেতর থেকেই একটা পুরুষকন্ঠ যেন বলছে.....
" নেকড়ের ভেতর আমিই এতদিন আশ্রয় নিয়ে
ছিলাম....এবার আমি এই নেকড়ের দেহ ছেড়ে বেরিয়ে
এসেছি..... আপাতত ঠাঁই নিয়েছি তোমারই মধ্যে। ওটা'র
জন্য শোক করার প্রয়োজন নেই, কারণ নেকড়ে নয়, তুমি
এতদিন আমার ইচ্ছানুসারে কাজ করেছ। স্বপ্নে দেখা
সেই দীর্ঘদেহী মানুষটিই এখন কথা বলছে তোমার ভেতর
থেকে....আমিই তোমার মালিক....খুব শিগগীরই আমায়
দেখতে পাবে।"
একটু থেমে সেই কণ্ঠস্বর আবার বলল, " তোমায় আমার খুব
দরকার। একমাত্র তুমিই আমায় ফের জাগিয়ে তুলতে
পারো....সাহায্য করতে পারো ফের রক্তমাংসের শরীর
ধারণে সহায়তা করতে....আমার আগের দেহটাকে ধ্বংস
করে দিয়েছিল ওরা....কিন্তু আমার আত্মা এখনো
আছে....সেই আত্মা আর দেহের সমস্ত দায়ভার এখন
তোমার....এ কাজে তোমার ব্যর্থ হলে চলবে না।"
পাগল হয়ে যাচ্ছি কিনা কে জানে....এ সব কি আমি ভুল
শুনছি! কিন্তু কি জানি কেন এই দায়িত্বটা পেয়ে আমি
যেন আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়ছি। আমার বাবা,
মিকোলাস বা আন্দ্রে চাচা....কেউই আর গুরুত্বপূর্ণ নয়
আমার জীবনে। মনে মনে ছিন্ন করেছি ওদের সঙ্গে
সমস্ত
সম্পর্ক। আমার সারা অস্তিত্ব জুড়ে এখন শুধু একজনেরই
প্রাধান্য....
আমার ওই অদৃশ্য সঙ্গী। তাকে আমি আমার আত্মা সমর্পণ
করেছি। তার পথ-ই আমার পথ এখন থেকে।
ক্রমশ...
অশুভ আত্মা
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now