বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
রিটার্ন অব ড্রাকুলা
কাহিনী : ফ্রেডা ওয়ারিংটন
অনুবাদক : ইসমাইল আরমান
-------------------------------------
পর্ব ৯ঃ
মিকোলাস গুহামুখের কাছাকাছি পৌঁছতে না পৌঁছতেই
একটা গাছের ডাল ভেঙে পড়ল ওর ওপর। সাবধান করার
কোনও সুযোগই পেলাম না। তার আগেই গাছের ডালটা
ভেঙে পড়ল ওর মাথা আর ঘাড়ের ওপর। মৃদু আর্তনাদ করে
পড়ে গেল আমার ছাত্রটি।
কাছে গিয়ে দেখি, প্রায় অচেতন অবস্থা আমার
ছাত্রটির। ব্যথায় গোঙাচ্ছে। ওকে ধরে ধরে গুহার
ভেতরে নিয়ে গেলাম। ওখানেই আশ্রয় নিলাম।
গুহার ভেতরটা শুকনো। বিচ্ছিরি একটা গন্ধ ভাসছে
বাতাসে। গুহাটা মনে হচ্ছে বাদুড়ের আড্ডা। মেঝেতে
তাদের পড়ে থাকা বিষ্ঠার বহর দেখে বুঝলাম। তাজা
বাতাসের আশায় গুহামুখের যতটা সম্ভব কাছে এসে
বসেছি। মিকোলাসের অবস্থা বুঝতে পারছি না। একবার
জ্ঞান আসছে ওর, একবার চলে যাচ্ছে..... পুরোপুরি
সচেতন হচ্ছে না।বিড়বিড় করে প্রলাপও বকতে শুনছি
ওকে। বলছে, ' ঝড়ের মাঝে ড্রাগনের পিঠে সওয়ার হয়ে
নাকি পৃথিবীতে নেমে এসেছে শয়তান, আমাদেরকেও
নরকে নিয়ে যাবে!..... ' এইসব প্রলাপ আর কি!
কুসংস্কার বলে কিছু নেই আমার মাঝে, কিন্তু
মিকোলাসের প্রলাপ আমার বুকে কে জানে কেন ভয়
জাগিয়ে তুলছে।
বুঝতে পারছি পুরোটাই পরিবেশের প্রভাব। একে এই
অজানা অচেনা পাহাড়ি আদিম অরণ্য, তায় এই ভয়াল ঝড়
আর অন্ধকার। ঘন ঘন বজ্রপাতের শব্দ পিলে চমকে দিচ্ছে
একেবারে। দু'ঘন্টা হলো এই গুহায় বসে আছি, এর মাঝে
একবিন্দু কমেনি ঝড়ের প্রকোপ। বাইরে ক্রমাগত চলছে
আগুন আর পানির প্রলয়নৃত্য! একটা মোমবাতি জ্বেলেছি
আমি, বাতাসে বার বার নিভু নিভু হয়ে যাচ্ছে ওটার
শিখা। স্বল্প আলোতেই খুলে বসেছি জার্নাল,
লেখালেখির মাঝে নিজেকে ব্যস্ত রেখেছি। কাজ
হয়েছে এতে - স্নায়ু শান্ত হয়ে এসেছে অনেকটা। ওই তো
মিকোলাসও নড়ছে....জ্ঞান ফিরছে বোধহয় ওর।
।। ১৬ আগস্ট।।
সকাল হয়েছে। ঈশ্বরকে ধন্যবাদ, ঝড়ের প্রকোপ
অনেকটাই কমেছে কিন্তু এখনো বৃষ্টি পড়ছে ঝমঝম করে।
কখন থামবে কে জানে! বৃষ্টি না থামলে রওনা হতে পারব
না। কি এক রাত গেছে.....এক ফোঁটা ঘুমোতে পারিনি।
উঠে বসেছে মিকোলাস, নাস্তা খাচ্ছে কিন্তু
মাঝেমাঝে মুখ কোঁচকানো দেখে বুঝতে পারছি, মাথার
ব্যথাটা ভোগাচ্ছে ওকে। ডাক্তার দেখানো দরকার,
যদিও মরে গেলেও সেটা সে স্বীকার করবে না। ফেরার
পথে কোনও সমস্যা না হলেই হলো। আমিই এখানে নিয়ে
এসেছি ওকে... ওর কিছু হয়ে গেলে নিজেকে ক্ষমা করতে
পারব না কিছুতেই।
কয়েক ঘন্টা পর।
কি বলব আজকের দিনটাকে- আতঙ্কের না আবিষ্কারের?
বৃষ্টির তোড় একটুও কমেনি, বরং পাগলা হাওয়ার তান্ডবে
বারবার কেঁপে উঠছে গাছগাছালি, ভেঙে পড়ছে
ডালপালা। গুহার ভেতর আশ্রয় নেয়ায় নিরাপদে আছি
আমরা, কিন্তু এখনও বুঝতে পারছি না, গতকালের
তল্লাশির সময় এই গুহাটা'কে কেন দেখতে পেলাম না
আমরা। যা হোক - এক সময় তন্দ্রায় ঢলে পড়েছিলাম,
জেগে উঠে দেখলাম, মিকোলাস গুহার ভেতরদিকে
হাঁটতে শুরু করেছে।
তাড়াতাড়ি গিয়ে ওকে ফিরিয়ে আনতে চাইলাম, বললাম
বিশ্রাম নিতে; কিন্তু ও রাজি হলো না। আমার হাত
ছাড়িয়ে নিয়ে অদ্ভুত এক কথা বলল - গুহার ভেতরে নাকি
কি যেন আছে! ওর কথার মাথামুণ্ড কিছু বুঝলাম না, মনে
হলো নিশিতে পেয়েছে ওকে। দিনের আলোয় যতটুকু
দেখেছিলাম, এখন দেখছি গুহাটা তার চেয়েও গভীর -
অনেক গভীর.... ফলে কিছুটা কৌতূহলী হয়ে উঠলাম। কাঁধে
ন্যাপস্যাক ঝুলিয়ে নতুন একটা মোমবাতি জ্বালালাম,
তারপর পিছু নিলাম মিকোলাসের।
আগেই লিখেছি, গুহার মেঝে ভরে আছে বাদুড়ের
বিষ্ঠায়। আমাদের মাথার ওপরে উলটো হয়ে ঝুলছিল
প্রাণীগুলো। তলা দিয়ে আমাদের হাঁটতে দেখে নড়েচড়ে
উঠল ওগুলো, মুখে কিসব দুর্বোধ্য আওয়াজ করল। তবে
কিছুদূর যাবার পর মেঝে পরিষ্কার হয়ে গেল। ছাদে'ও আর
বাদুড় ঝুলছে না, মেঝেতে বিষ্ঠাও নেই। গুহাটা ততক্ষণে
ফাটলের আকৃতি পেয়েছে - একেবারে সরু একটা
করিডোরের মতো। সেই করিডোর ধরে পর্বতের
গভীরে
এগিয়ে চললাম আমরা।
অচেনা পথ...সাবধানে পা ফেলা উচিত....কিন্তু
মিকোলাস খুব দ্রুত হাঁটছিল, যেন কোনও অপার আকর্ষণে
ছুটে চলেছে ও। ওকে আস্তে হাঁটতে বললাম, লাভ হলো
না।
করিডোর ধরে পনেরো মিনিট এগোবার পর হঠাৎ খেয়াল
করলাম, আমার পকেটঘড়িটা কাজ করছে না। কম্পাসের
কাঁটাও মাতালের মতো এদিকওদিক ঘুরছে। ভয় ভয় করে
উঠল আমার। কোথায় চলেছি কে জানে। তবু থামতে
পারলাম না। কিছুক্ষণ পরেই করিডোর থেকে বেরিয়ে
এলাম সুন্দর এক প্রাকৃতিক গুহায়...ভেতরে পাথুরে
কলামের অরণ্য।
কলামগুলোর ফাঁকফোকর ধরে অব্যাহত রইল আমাদের
অগ্রযাত্রা। গুহাটা চেপে এল, তারপর হঠাৎ নিজেকে
আবিষ্কার করলাম অদ্ভুত একটা জায়গায়! পর্বতের
গভীরের মাঝামাঝি এক চেম্বার - নিখুঁত জ্যামিতিক
নকশার এক দশভূজ আকারের কক্ষ, প্রাকৃতিক হতে পারে
না। মোমবাতির আলোয় ভাল করে দেখলাম চারিদিক।
মেঝে আর দেয়াল টালি করা....রোমান আমলের
ডিজাইন....আরও পুরনো হতে পারে। সবখানে পুরু হয়ে আছে
ধূলোর স্তর, এখানে ওখানে ঝুলছে মাকড়শারজাল।
চেম্বারটা ত্রিশ ফুট চওড়া, বিশ ফুট উঁচু। ঠিক মাঝখানটায়
রয়েছে দশভূজ আকারের একটা মার্বেলের বেদি। ধূলোর
প্রলেপ ভেদ করেও দেখা যাচ্ছে ওটার গায়ে খোদাই
করা দুর্বোধ্য নকশা। চারপাশের দশ দেয়াল ঘেঁষে রয়েছে
মার্বেলের দশটা বেঞ্চি। এ ছাড়া কক্ষে আর কোনও
আসবাব নেই।
"দশটা আসন!....দশজন ছাত্র"! উত্তেজিত গলায় বললাম
আমি, " এটাই স্কলোম্যান্স!" আনন্দে প্রায় চিৎকার করে
বললাম। আমারই ভুল....আলাদা বিল্ডিং থাকবে
ভেবেছিলাম। তা হবে কেন, এমন একটা গোপন প্রতিষ্ঠান
যে পাহাড়ের ভেতরে লুকনো থাকবে.... সেটাই তো
স্বাভাবিক! "
খুশি আর আনন্দে যখন পাগল হবার দশা তখনই খেয়াল হলো,
শ্বাসকষ্ট শুরু হয়েছে মিকোলাসের। বাতাসের অভাবে
খাবি খাচ্ছে। এতক্ষণ আনন্দের আতিশয্যে খেয়াল
করিনি, পরে যখন খেয়াল করলাম, তখন তটস্থ হয়ে উঠলাম।
তাড়াতাড়ি একটা জায়গায় বসালাম ওকে, ফ্লাস্ক
থেকে পানি বের করে খেতে দিলাম।
শ্বাসপ্রশ্বাস একটু স্বাভাবিক হয়ে এলে মলিন ভঙ্গিতে
হাসল মিকোলাস। বলল, " মাফ করবেন, স্যার। কি যেন
হয়েছে আমার। এখানে আসার পর থেকে একটার পর একটা
ঝামেলার জন্ম দিচ্ছি। আমার বদলে ইলিনা'কে নিয়ে
এলে বোধহয় ভাল করতেন। আমার চেয়েও অনেক শক্ত
ও।"
" বাজে কথা বোলো না তো!" ধমকে উঠলাম ওকে, "
চুপচাপ একটু বিশ্রাম নিয়ে নাও। এরপর আমরা কাজে
নামব। বুঝতে পারছ না, মিশরীয় সমাধির মতো একটা
গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছি
আমরা?"
বিশ্রামের ফাঁকে খাওয়াদাওয়া সেরে নিলাম আমরা,
তারপর নামলাম চেম্বারের তল্লাশিতে। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে
দেখলাম প্রতিটি ইঞ্চি। ধূলোবালির আস্তর সরিয়ে
উন্মুক্ত করলাম রঙবেরঙের টালি। দেয়ালে দেখতে
পেলাম হাতে আঁকা বিভিন্ন ছবি - যুদ্ধ বিগ্রহ,
সন্ন্যাসীদের ধর্মপ্রচার, নরবলি....এ ধরনের নানা দৃশ্য
ফুটিয়ে তোলা হয়েছে ছবিগুলোতে। আঁকা হয়েছে
উজ্জ্বল রঙে, তাতে লালের আধিক্য চোখে পড়ে। মনে
হয়
যেন রক্তের পটভূমিতে আঁকা হয়েছে প্রতিটা ছবি।
কাজটায় মগ্ন হয়ে পড়েছিলাম দুজনে। হঠাৎ বিস্মিত হয়ে
লক্ষ্য করলাম, যে পথে এই চেম্বারে ঢুকেছি, সেটা আর
খুঁজে পাচ্ছি না। ব্যাপারটা অবিশ্বাস্য, অসম্ভব..... কিন্তু
বাস্তব! চারপাশের দশটা দেয়ালই মনে হলো নিরেট,
ফাঁকফোকর নেই কোনও। ঢুকবার সময়ের পায়ের ছাপ
অনুসরণ করে যে ফিরব, তারও উপায় নেই। চেম্বারের
ভেতর হাঁটাহাঁটি করে পুরনো পায়ের ছাপগুলো নষ্ট করে
ফেলেছি আমরা।
চরম হতাশা নিয়ে এখন একটা পাথরের বেঞ্চিতে বসে
আছি আমরা, মাথা খারাপের মতো লাগছে। জার্নাল
খুলে বসেছি, যাতে সমস্যার কথা ভুলে থাকতে পারি।
কিন্তু এভাবে আর কতক্ষণই বা নিজেকে ব্যস্ত রাখা
যাবে? মিকোলাস ইতিমধ্যে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছে, ভয়ার্ত
ভঙ্গিতে মাথা নাড়ছে ক্ষণেক্ষণে। ওর সঙ্গে কথা বলার
চেষ্টা করেছি, লাভ হয়নি। একটা শব্দও বেরোচ্ছে না ওর
মুখ দিয়ে।
বারোটা মোমবাতি আছে আমাদের সঙ্গে। জ্বালিয়ে
নিভিয়ে খরচ করলে হয়তো বা বেশ কিছুটা সময় চালিয়ে
নেয়া যাবে....কিন্তু পরিস্থিতি এমন যে, আলো
নেভানোর সাহস পাচ্ছি না। হঠাৎ হঠাৎ কোত্থেকে বয়ে
আসা বাতাসে মোমবাতির শিখা কেঁপে কেঁপে উঠছে।
চেষ্টা করেও সে বাতাসের উৎস খুঁজে পাইনি। এটুকু
পরিষ্কার, বাতাসের অভাবে দম আটকে মরব না আমরা।
কিন্তু সেটা দুঃসংবাদ। এখানে বন্দি হয়ে পড়ে ক্ষুধা
পিপাসায় দিনের পর দিন তিলে তিলে মরবার চেয়ে দম
আটকে মরা অনেক ভাল। তাতে সময় কম লাগে।
ম্লান আলোয় বারে বারে আমার চোখ চলে যাচ্ছে
চেম্বারের মাঝখানে মাথা তুলে থাকা দশভুজ বেদিটার
দিকে। নকশাকাটা বেদি, তার ওপর ধূলোর আস্তর। মনের
ভুল কিনা জানি না, তবে মাঝেমাঝেই মনে হচ্ছে যেন
নড়ে উঠছে বেদিটা। গোড়ায় স্তুপ হয়ে আছে পুরনো
শ্যাওলা আর ধূলোর তাল। রেশম গুটির আকৃতি নিয়েছে,
তবে অনেক বড়....অনায়াসে একজন মানুষের জায়গা হয়ে
যাবে। স্রেফ ময়লার তাল, নাকি ভেতরে কিছু লুকিয়ে
আছে, বুঝতে পারছি না। মাথা ঘামাবার শক্তিও পাচ্ছি
না।
আরও কয়েক ঘন্টা পর।
হাতে কলম নিয়েই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে
একটা অদ্ভুত স্বপ্ন দেখলাম। স্বপ্নটার অর্থ করলে দাঁড়ায়
- হ্রদের জলে পাথর ছুঁড়ে ড্রাগনকে জাগিয়েছি আমরা,
খুলে ফেলেছি স্কলোম্যান্সের গুপ্ত দরজা। সেইসঙ্গে
সমন করেছি স্বয়ং শয়তানকে! যত্তোসব....মাথাই খারাপ
হয়ে যাচ্ছে আমার।
জেগে উঠে নতুন একটা মোমবাতি ধরালাম। টের পেলাম,
স্বপ্ন'টাকে গুরুত্ব না দিলেও ওটার প্রভাবে এখনো বুক
কাঁপছে আমার। মোম জ্বালার পরেও কমল না সে ভয়।
মিকোলাস আমার পাশে ঘুমোচ্ছে। ওকে আর জাগালাম
না। ক'টা বাজে এখন কে জানে। পকেট ঘড়িটা
একেবারেই অচল হয়ে গেছে। বাইরে এখন সকাল না রাত -
কে জানে!
আরেক দফা খুঁজেছি চেম্বার থেকে বেরোবার পথ।
এবারও ব্যর্থ হতে হলো। কিভাবে উধাও হলো বাইরে
বেরনোর পথটা, তার কোনও ব্যাখ্যা খুঁজে পাচ্ছি না।
অতিপ্রাকৃত ব্যাপার? জানি না। শুধু এটুকু জানি, '
শয়তানের আখড়া'য় বন্দি হয়েছি আমরা!
আরও কিছু সময় কেটে গেল।
হাত কাঁপছে আমার....বুক কাঁপছে.....তবু তুলে নিয়েছি
কলম। সবকিছু লিখে রাখতেই হবে আমায়। আতঙ্কে
দিশেহারা অবস্থা। আপাতত এই কাগজ কলমই শান্ত
রাখতে পারে আমায়।
তখন লেখা বন্ধ করতেই দেখতে পেলাম, বেদির গোড়ার
তালটা নড়তে শুরু করেছে। প্রথমে মনে হলো, ভুল দেখছি
কিন্তু পরক্ষণেই ভেঙে গেল ধারণাটা। নড়াচড়ার ফাঁকে
ফাটল ধরল ওটার গায়ে, কি যেন বেরোতে শুরু করল ওটার
ভেতর থেকে.....ঠিক ডিম ভেঙে পাখির ছানা বেরোবার
মতো করে।
স্থবির হয়ে গেলাম এই দৃশ্য দেখে। একটু পরেই পিলে
চমকে উঠল ময়লার তাল থেকে বেরিয়ে আসা
প্রাণীটাকে চিনতে পেরে। মানুষ.... হ্যাঁ, একটা মানুষ।
কিন্তু স্বাভাবিক মানুষ বলা যাবে না কোনওভাবেই, বরং
বলা যেতে পারে একটা মমি। বীভৎস চেহারা, শরীরে
মাংস বলতে কিচ্ছু নেই, শুকনো চামড়া সেঁটে আছে খুলি
আর হাড়গোড়ের গায়ে। দুলতে দুলতে বেরিয়ে এল ওটা,
তারপর মাকড়শার মতো চার হাত -পায়ে ভর দিয়ে
কিলবিল করে এগিয়ে এল আমার দিকে।
এরপর আর আমার কিছু মনে নেই। জ্ঞান হারিয়ে
ফেলেছিলাম বোধহয়।
যখন হুঁশ ফিরল, প্রথমে মনে পড়ল না কিছু। কিছুক্ষণ পর
সচেতন হয়ে উঠলাম। ঝট করে উঠে বসলাম মেঝেতে।
চারপাশে তাকিয়ে দেখলাম, অনেকগুলো মোমবাতি
জ্বলছে, সেগুলোর আলোয় আলোকিত হয়ে আছে
চেম্বারের অভ্যন্তর। কে জ্বেলেছে এত মোমবাতি,
জানি না। সেই অদ্ভুত প্রাণীটাকে দেখতে পেলাম না
কোথাও।
মিকোলাসের দিকে তাকালাম, মেঝের ওপর
নিস্পন্দভাবে পড়ে আছে ও। ডাকলাম কয়েকবার কিন্তু
কোনও সাড়া পেলাম না। তাড়াতাড়ি ছুটে গেলাম ওর
পাশে, গায়ে হাত দিয়েই চমকে উঠলাম। একেবারে
বরফের মতো ঠাণ্ডা শরীর। কাঁপা কাঁপা হাতে পরীক্ষা
করলাম নাড়ি। পরক্ষণে থমকে গেলাম।
মারা গেছে মিকোলাস....আমার পুত্রসম ছাত্র....আর নেই!
মন ভরে গেল বেদনায়। ওর বদলে আমি মরলাম না কেন? এই
মৃত্যুর কথা আমি কি করে ওর পরিবারকে জানাব? কোন
মুখে দাঁড়াব ওর বাবা-মা'র সামনে? ইলিনাকেই বা কি
বলব? আমিই বা কি করে সইব ওকে হারানোর বেদনা?
জানি না আমি, কিন্তু কঠিন সত্যকে অস্বীকার করার
উপায় নেই। মারা গেছে মিকোলাস....পড়ে আছে আমারই
চোখের সামনে।
কষ্টটা চাপা দিয়ে আবারও তল্লাশি চালালাম
চেম্বারের অভ্যন্তরে। লুকানো লিভার বা গুপ্তদরজা -
কোনও সম্ভাবনাই বাদ দিইনি। তারপরেও পেলাম না
কিছু। একটা নতুন সম্ভাবনাও মাথায় এল আমার....অবাস্তব
সম্ভাবনা যদিও। চেম্বারের গঠনটাই হয়তো বদলে গেছে,
এখন আর ঢোকা - বেরনোর কোনও রাস্তা নেই এতে। আর
শয়তানকে যদি সত্যি সত্যিই জাগিয়ে দিয়ে থাকি আমরা
নিজেদের অজান্তে আর এটাই যদি সেই ' স্কলোম্যান্স'
হয়, তাহলে শয়তানের পক্ষে বস্তুর আকার আকৃতি বদলে
দেয়া কঠিন কিছু নয়। সত্যিই কি তাই?
ভয় করছে আমার। বেদির গোড়া থেকে বেরিয়ে আসা
প্রাণীটা ভেতরেই কোথাও আছে - এখান থেকে বেরিয়ে
যাবার কোনও উপায় নেই ওটার। মিকোলাসকে খুন
করেছে, এবার আসছে আমার পালা।
ভাবতেই পারিনি, সামান্য একটা বৈজ্ঞানিক
অনুসন্ধানের পরিণতি এমন দাঁড়াবে। প্রিয় আব্রাহাম
ভ্যান হেলসিং, যদি দৈবক্রমে এই জার্নাল তোমার
হাতে পড়ে, তা হলে সাবধানে এগিয়ো। যে ভুল আমি
করেছি, তা তুমি করতে যেয়ো না। শয়তানকে অবজ্ঞা
করে নিজের মরণ ডেকে এনেছি আমি।
ক্রমশ
অশুভ আত্মা
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now