বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
।। রাতের পাহারাদার ( বিদেশী ছোট গল্প)।।
লেখকঃ S. H. Burton
ভাষান্তরেঃ অনীশ দাস অপু
:
:
মধ্য জুলাইয়ের এক রাত।
বেশ গরম পড়েছে। স্থির হয়ে আছে বাতাস। মেঘমুক্ত পরিষ্কার আকাশে নির্মল চাঁদ। তরুণ পুলিশ কনস্টেবল মিটফোর্ড নির্জন রাস্তায় কেবল নিজের পায়ের আওয়াজ শুনতে পাচ্ছে। পুরো রেনার স্ট্রিট চুপচাপ। কোনও বাড়ির জানলায় আলো জ্বলছে না। বাসিন্দারা সবাই অঘোরে ঘুমোচ্ছে।
তরুণ কনস্টেবলটি তার ঘড়ি দেখল। রাত আড়াইটে। নিজেকে হঠাৎ খুব সুখী-সুখী মনে হলো তার। খুব বেশীদিন হয়নি সে পুলিশের চাকরীতে জয়েন করেছে। আর রাস্তায় টহল দেওয়া এই প্রথম। এর আগে অবশ্য এক বয়স্ক পুলিশম্যান তার সঙ্গে ডিউটি করেছে। এখন পি.সি. মিটফোর্ডকে একাকী টহল দিতে পাঠানো হয়েছে। যাক, অবশেষে সে সত্যিকার পুলিশম্যান হতে পারল।
রাত এখন আড়াইটে। তিনটের সময় তার থানায় গিয়ে রিপোর্ট করার কথা। এরপর মিটফোর্ডের ডিউটি শেষ। সে বাড়ি যেতে পারবে। সত্যিকারের পুলিশম্যানের ভূমিকায় তার কাজ শেষ হতে চলেছে আধঘন্টার মধ্যে।
ধীরেধীরে হাঁটছে মিটফোর্ড, সতর্ক নজর বুলোচ্ছে রাস্তায়। নিজের চোখজোড়া ব্যবহার করার ট্রেনিং দেওয়া হয়েছে তাকে। একজন ভাল পুলিশম্যান সবসময় চোখকান খোলা রাখে। এটাই শেখানো হয়েছে তাকে।
পি.সি. মিটফোর্ড একজন ভাল পুলিশম্যান হতে চায়। আজ রাতে কোনওকিছুই তার সতর্ক নজর এড়িয়ে যাচ্ছে না। ২৬ নং বাড়ির নীচতলায় জানলা দেখা যাচ্ছে খোলা। ২১ নং বাড়ির সদর দরজার বাইরে বাগান করার কিছু যন্ত্রপাতিও পড়ে রয়েছে।
".....যত্তসব কেয়ারলেস মানুষজন! " আপন মনে বলল পি.সি. মিটফোর্ড, "এরা মনে করে নির্জন রাস্তা তাই তারা নিরাপদেই আছে। কিন্তু এরা জানে না, রেনার স্ট্রিটেও চুরি-ডাকাতি হতে পারে"।
একটা মস্ত কালো বিড়াল রাস্তা পার হয়ে ১৩ নং বাড়ির দেওয়ালে উঠে পড়ল লাফ মেরে। তারপর দোরগোড়ায় বসে মিটফোর্ডের দিকে জ্বলজ্বলে চোখে চেয়ে রইল। পি.সি.মিটফোর্ড মৃদু হাসল। বেড়ালটাকে উদ্দেশ্য করে বলল - " তুমি বাড়ি চলে এসেছ, তাই না?.... আমিও শিগগীরই বাড়ি ফিরব"।
মনটা ভারী খুশি লাগছে মিটফোর্ডের। তার রাতের পাহারা শেষ হতে চলেছে।
রাস্তার মোড়ে এসে সে দেখল, ৩ নং বাড়ির বাইরে বিরাট একটা সাদা গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। গাড়ির নম্বর টুকে নিল সে - 44B 777X। গাড়ির দরজা বন্ধ এবং ঠিকঠাক জায়গাতেই পার্ক করা।
"....গুড", মনে মনে হাসল মিটফোর্ড, " অন্তত একজন সাবধানী মানুষ বাস করে এই রেনার স্ট্রিটে"।
দাঁড়িয়ে পড়ল সে। তাকাল ৩ নং বাড়িটার দিকে। বেশ বড় বাড়ি তবে বাগানের যত্ন নেওয়া হয় না বলে আগাছা জন্মেছে এবং দরজায় রঙ লাগানোও দরকার।
"....আশ্চর্য! " ভাবছে মিটফোর্ড, " দেখে তো এটাকে কোনও ধনী লোকের বাড়ি বলেই মনে হচ্ছে। অথচ ঘরদোর -বাগান এমন অবহেলায় ফেলে রেখেছে কেন মালিক?"
মিটফোর্ড হাঁটতে লাগল। ৩ নং বাড়ি পার হয়ে কিছুদূর এগিয়েছে সবে, একটা শব্দ শুনতে পেল পেছন থেকে। পাঁই করে ঘুরল সে। দেখল, বাড়িটির সদর দরজা খোলা। একটা লোক বাগানের রাস্তা ধরে রাস্তায় দাঁড় করানো গাড়িটার দিকে ছুটে যাচ্ছে। লোকটা বেশ লম্বা,পরনে কালো স্যুট, হাতে একটা ব্রিফকেসের মতো কিছু। লোকটির চেহারা চকের মতো সাদা। দেখে মনে হচ্ছে অসুস্থ। চোখজোড়া বিস্ফারিত আর কেমন যেন উদভ্রান্ত চাউনি। মুখের তুলনায় চোখদুটো ড্যাবডেবে।
এক মূহুর্তের জন্য সে বড় গাড়িটার পাশে থমকে দাঁড়াল। তারপর ঘুরে রাস্তা ধরে ছুটতে লাগল।
মিটফোর্ড'ও দৌড়ল তার পেছন পেছন।
"....থামুন!" লোকটিকে উদ্দেশ্য করে পেছন থেকে চেঁচিয়ে বলল মিটফোর্ড, " থামুন! কে আপনি? আপনি কি এখানে থাকেন?"
লোকটি কোনও জবাব দিল না। মিটফোর্ড তার ছোটার গতি বাড়িয়ে দিল। জানে লোকটা ওর সঙ্গে দৌড়ে পারবে না।
কিন্তু রেনার স্ট্রিটের মোড়ের মাথায় এসেই হঠাৎ সেই লোকটা কোথায় অদৃশ্য হয়ে গেল। এক মূহুর্ত আগেও সে ওর সামনে ছিল। মিটফোর্ডের সামনে মাত্র কয়েক হাত দূরে। পরের মূহুর্তেই 'নেই' হয়ে গেল! চাঁদের ঝলমলে আলোয় যতদূর দৃষ্টি যায় জনমনিষ্যির চিহ্নমাত্র নেই।
৩ নং বাড়িটার দিকে ফিরে তাকাল মিটফোর্ড। গাড়িটা এখনও ওখানে পার্ক করা। বাগানে গাছ-গাছালির ছায়া - বাড়ির সদর দরজা খোলা।
মিটফোর্ড জানে তার করণীয় কি। বাড়ির ভেতর ঢুকবে সে। ৩ নং বাড়িতে নিশ্চয়ই অদ্ভুত কিছু ঘটেছে। হঠাৎ ওর ভয় করতে লাগল। খোলা দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকতে সায় দিচ্ছে না মন। গভীর দম নিল সে। পা বাড়াল বাগানের পথে। কর্তব্য পালন তাকে করতেই হবে।
সদর দরজার পরেই একটা হলঘর। পুলিসি টর্চের জোরাল আলো ফেলল মিটফোর্ড হলঘরটায়। কয়েকখানা চেয়ার-টেবিল দেখতে পেল। ধুলো পড়া। বিদ্যুৎবাতি জ্বালাবার চেষ্টা করল সে। জ্বলল না। ইলেকট্রিকের লাইন কাটা।
"....কেউ এখানে থাকে না", ভাবল মিটফোর্ড, " অনেক দিন ধরেই কেউ এখানে বাস করে না"।
তখনিই সে একটা শব্দ শুনতে পেল। বাড়ির ভেতরে কোথাও কাঁদছে এক মহিলা। শ্বাস চেপে রেখে কান্নার আওয়াজটা বেশ কিছুক্ষণ ধরে কান পেতে শুনল মিটফোর্ড। কান্নার রোল ওপরে উঠছে আবার নামছে-কিন্ত থামছে না। দোতলার একটা ঘর থেকে আসছে কান্নার শব্দ।
হলঘরের চারপাশে আবারও টর্চের আলো বোলাল মিটফোর্ড। হলঘরের শেষপ্রান্তে সিঁড়ি। মন্থর গতিতে ওদিকে এগোল সে। বাইতে লাগল সিঁড়ি। ধাপগুলোয় ধুলো মাখা - ধুলোর পুরু আস্তরণ পড়েছে। ওর জুতোর ছাপ পরিষ্কার পড়তে লাগল ধূলোর গায়ে। পেছন ফিরে একবার হলঘরের দিকে তাকাল মিটফোর্ড। টর্চ মারল মেঝেয়। ওখানেও তার জুতোর ছাপ স্পষ্ট হয়ে ফুটে আছে। ধুলো মাখা মেঝেয় শুধু ওর পায়ের ছাপ।
একটা কথা মনে পড়তেই মিটফোর্ডের কলজেটা তড়াক করে লাফ মারল-
"...ওই লোকটা", ভাবছে সে, " ওই লোকটা কয়েক মিনিট আগে এ বাড়ি থেকে ছুটে বেরিয়েছিল - তার পায়ের ছাপ কেন পড়েনি হলঘরের মেঝেয়? ধুলোর ওপর কেন শুধু আমার পায়ের ছাপ দেখতে পাচ্ছি?"
ফিরে যেতে মনস্থ করল মিটফোর্ড। মনে মনে বলল, " বাইরে থেকেও বাড়ির ওপর নজর রাখতে পারব আমি। রেডিও ব্যবহার করে যোগাযোগ করব থানার সঙ্গে। ডিউটি অফিসারের কাছে সাহায্য চাইব। সাহায্য না আসা পর্যন্ত রাস্তায় দাঁড়িয়ে থেকে বাড়িটার দিকে নজর রাখতে পারব। সার্জেন্ট টমাস বুঝতে পারবেন যে আমার সাহায্যের দরকার। আমি তাঁকে ছুটে পালানো লোকটার ব্যাপারে সব জানাব। বলব ৩ নং বাড়ির দরজা খোলা। বলব, আমার মনে হয়েছে এ বাড়িতে আমি ছাড়াও আরও কেউ রয়েছে। আমি......."
.....তবে মিটফোর্ড চলে যেতে পারল না। মহিলার কান্না হঠাৎই থেমে গেছে। দোতলার বেডরুম থেকে এবার ভয়ঙ্কর একটা চিৎকার ভেসে এল।
".....না! না! প্লিজ না! জোনাথন , প্লিজ ডোন্ট! প্লিজ....প্লিজ!"
ভয়ানক চিৎকারটার জায়গা দখল করল একটা বিকট আর্তনাদ - "আ...আ....আ!"
সাহায্যের জন্য আকুল আবেদন করছে কেউ!
কয়েক লাফে সিঁড়ি টপকাল কনস্টেবল। বেডরুমের দরজা বন্ধ। সে জোরে লাথি কষাল দরজায়। একবার.....দুইবার.... তিনবার।
ধড়াম করে ভেতরদিকে খুলে গেল দরজা।
বেগে ভেতরে ঢুকে পড়ল মিটফোর্ড। কামরার সর্বত্র দ্রুত বোলাল টর্চের আলো। একটা খালি চেয়ার, একটা ড্রেসিংটেবিল, একটা ওলটানো বেডসাইড টেবিল এবং একটি বিছানা চোখে পড়ল। বিছানায় স্তুপ হয়ে আছে বেডক্লথ। মিটফোর্ড ধীরপায়ে হেঁটে গেল ওদিকে। হয়তো কেউ ভারী বেডক্লথের স্তুপের নিচে ঘাপটি মেরে আছে।
ডান হাত থেকে বাম হাতে টর্চ নিল মিটফোর্ড। বিছানার ওপর ফেলে রাখল আলো। তারপর বেডক্লথগুলো টান মেরে সরিয়ে দিল।
এক মহিলার লাশ সোজা তাকিয়ে আছে মিটফোর্ডের দিকে। মহিলার খোলা মুখ দিয়ে বেরিয়ে এসেছে কালো কুচকুচে জিভ। টর্চের আলোয় দেখা যাচ্ছে মহিলার চোখদুটো। তার গায়ের হলুদ রঙের চামড়া থেকে বিশ্রী, গা-গোলানো একটা গন্ধ আসছে।
"....মাই গড!" চেঁচিয়ে উঠল মিটফোর্ড, " আমার প্রথম রাতের ডিউটিতেই এমন হত্যাকান্ড! আর আমি কিনা খুনীকে পাকড়াও করতে ব্যর্থ হলাম!"
বেডক্লথ দিয়ে বীভৎস চেহারার লাশটাকে ঢেকে দিল সে। বেডরুমের দরজা বন্ধ করে সিঁড়ি বেয়ে নেমে এল সে। ৩ নম্বর বাড়ির বাইরে এসে রেডিওতে ডিউটি অফিসারের সাথে যোগাযোগ করল মিটফোর্ড।
".....পি.সি.মিটফোর্ড বলছি, সার্জেন্ট। আমি রেনার স্ট্রিটে ৩ নম্বর বাড়ির সামনে রয়েছি। এখানে একটা মার্ডার হয়েছে। আমি নিশ্চিত যে এটা একটা খুন। আমি খুনীকে দেখেছি তবে ধরতে পারিনি। সে প্রায় ছয় ফুট লম্বা। ষাটের কাছাকাছি বয়স। পরনে কালো স্যুট, হাতে ছোট একটা ব্রিফকেস। যে খুন হয়েছে সে একজন মহিলা। সে......"
সার্জেন্ট টমাস ওকে ওপ্রান্ত থেকে বাধা দিয়ে শান্ত গলায় বললেন, "এখুনি থানায় রিপোর্ট কর মিটফোর্ড। তোমার ডিউটি রাত তিনটেয় শেষ হবার কথা। এখন প্রায় তিনটে বাজে"।
".....কিন্তু সার্জেন্ট, এখানে এক মহিলা খুন হয়ে পডে আছে আর খুনী পালিয়ে গেছে। আমার দরকার..... "
"....কথার ওপর কথা বোলো না মিটফোর্ড ", বললেন সার্জেন্ট টমাস, "যা করতে বললাম, তাই কর। ৩ নম্বর বাড়ির দরজা বন্ধ করো তারপর থানায় এসে রিপোর্ট করো। তোমার মেসেজ আমরা পেলাম এবং গ্রহণ করলাম"।
রেডিওয় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল সার্জেন্ট টমাসের কথা শেষ হতেই। কি আর করে পি.সি. মিটফোর্ড, ৩ নম্বর বাড়ির দরজা বন্ধ করে তালা লাগিয়ে দিল। ভালভাবে তালাটা পরীক্ষা করে নিয়ে তারপর পা বাড়াল থানার দিকে।
"....বসো মিটফোর্ড, চা নাও", টেবিলের ওপর দিয়ে মিটফোর্ডের দিকে চায়ের কাপ এগিয়ে দিয়ে বলল সার্জেন্ট টমাস, " এখন তুমি আমায় বলো, কি ঘটেছে। তাড়াহুড়োর কিছু নেই। আমি তোমায় বাধা দেব না"।
অত:পর তিনি চুপচাপ শুনে গেলেন মিটফোর্ডের অভিজ্ঞতা। তারপর বললেন, " ঠিক আছে। এখন কয়েকটা প্রশ্নের জবাব দাও। সবার আগে বলো, আজ কত তারিখ?"
".....১৩ ই জুলাই, সার্জেন্ট। কিন্তু কেন?"
".....স্রেফ আমার প্রশ্নের জবাব দেবে, মিটফোর্ড। আজ রাতে অনেক কিছুই ঘটেছে যা তুমি বুঝতে পারোনি। অনেক কিছু আমারও বোধগম্যের বাইরে। তবে তোমার চেয়ে কিছু জিনিস আমি বেশীই জানি"।
"......কিন্তু ওই লোকটা, সার্জেন্ট..... যে খুন করে পালাচ্ছিল, তাকে আমি রেনার স্ট্রিট ধরে পালাতে দেখেছি। আমাদের পুলিশ কার নিয়ে গিয়ে ওর খোঁজ করা উচিত"।
"......পুলিশ কোনওদিনই ওর খোঁজ পাবে না, মিটফোর্ড। কেউ ওর সন্ধান কোনওদিনই পাবে না"।
".....কিন্তু সার্জেন্ট....."
"......একটু চুপ করে এবার আমার কথা শুনবে? ", প্রায় রেগে উঠলেন সার্জেন্ট, " আগে আমার কথাগুলো শোনো, তারপর তোমার যা বলার, বোলো"।
"....সরি, সার্জেন্ট "।
".....এখন ভাল করে চিন্তা করে দেখো মহিলার চিৎকার যখন শুনলে, লোকটা তখন কোথায় ছিল?"
".....সে....সে.....রাস্তায় কোথাও ছিল। ওখানেই তাকে আমি দেখি। সে বাড়িতে ছিল না"।
"......আর যে মহিলাকে তুমি ভেবেছ খুন হয়েছে....সে?"
"....'ভেবেছি' বলছেন কেন সার্জেন্ট? আমি যে স্বচক্ষে দেখলাম উনি খুন হয়ে পড়ে আছেন!"
".....ঠিক আছে, মিটফোর্ড। উত্তেজিত হয়ো না। তুমি মহিলাকে মৃত অবস্থায় দেখেছিলে , তাই তো?"
".....হ্যাঁ", শান্ত গলায় বলল মিটফোর্ড, " তাকে দেখাচ্ছিল....দেখাচ্ছিল, আমি তাকে দেখে ভয় পেয়ে যাই, সার্জেন্ট। মহিলার....জিভটা মুখের বাইরে বের হয়ে ছিল....কুচকুচে কালো....আর....আর কি বিকট গন্ধ!"
"......সে কতক্ষণ আগে মারা গেছে বলে তোমার ধারণা?"
এবার মিটফোর্ড কোনও জবাব দিল না। সে দুই হাত দিয়ে মুখ ঢাকল।
".....বলো, মিটফোর্ড। তোমার নিশ্চয়ই কোনও ধারণা আছে। তুমি যখন তাকে দেখলে সে কি ওই সময়েই মারা গিয়েছিল? রাস্তায় যে লোকটাকে তুমি পালাতে দেখলে সে কি ঠিক ওই সময়েই মহিলাকে হত্যা করেছিল?"
".....না, সার্জেন্ট ", মিটফোর্ড আবার শিরদাঁড়া সোজা করল চেয়ারে, "না মহিলা তখন মারা যায় নি। আর আমি মহিলার লাশ দেখার আগেও লোকটা তাকে হত্যা করেনি"।
".....কি করে জানলে?"
".....কারণ.... কারণ লোকটা আমার সামনে দিয়ে পালিয়ে যাবার পর আমি যখন ওই বাড়িতে ঢুকি, তখনও আমি মহিলার কান্না শুনছিলাম। আর....আর....ওহ গড, মহিলার গা দিয়ে পচা গন্ধ পাচ্ছিলাম.....তার মানে তো ওই মহিলা অনেকদিন আগে মারা গেছে। কিন্তু.... কিন্তু.... তবু আমি ওর কান্না শুনলাম কি করে!!!...."
".....ঠিক আছে, মিটফোর্ড, ঠিক আছে", বললেন সার্জেন্ট, " আজ রাতটা তোমার খুব খারাপ কেটেছে। তবু বাকি ঘটনা তোমার জানা উচিত। রেনার স্ট্রিটে তুমি যে লোকটাকে পালাতে দেখেছিলে, সে-ও বহু বছর আগে মারা গেছে।.......... না, প্রশ্ন কোরো না। আমি সব কিছুর ব্যাখ্যা দিতে পারব না। আমি শুধু তোমাকে যা যা ঘটেছে, তাই-ই বলতে পারব। তুমিই প্রথম পুলিশম্যান নও, যে এ ঘটনা দেখেছ। আজকের এই তারিখে এর আগেও এমনটা অনেক পুলিশম্যানই দেখেছিল।...... কি? কিছু বোধগম্য হলো?"
মাথা ঝাঁকাল মিটফোর্ড। বলল, " অন্তত বুঝতে পারলাম আমি পাগল হয়ে যাইনি, সার্জেন্ট। অন্যান্য পুলিশরাও একই ঘটনা দেখেছে যখন...... "
".....এবার আসল ঘটনা কি ঘটেছিল, শোনো। জনৈক ডাক্তার....ডাঃ জোনাথন টেনিসন এবং তাঁর স্ত্রী রেনার স্ট্রিটের ওই ৩ নম্বর বাড়িটায় বাস করতেন। ডাক্তার হিসেবে সুখ্যাতি ছিল তাঁর। সবাই তাঁকে পছন্দ করত। তবে তাঁর স্ত্রী ছিল খুবই ঝগড়াটে টাইপের। আর প্রচুর মদ খেত। মাতাল হয়ে প্রায়ই স্বামীর গায়ে হাত তুলত। একবার সে বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেবারও চেষ্টা করে। এক রাতে....এক গভীর রাতে ডাক্তার এক অসুস্থ লোককে দেখে বাড়ি ফিরছিলেন। মহিলা মদ খেয়ে মাতাল হয়ে ছিল তখন। সে কান্নাকাটি করছিল, চিৎকার চেঁচামেচি করছিল। ডাক্তার ছিলেন বেজায় ক্লান্ত এবং রোগীর ব্যাপারে উদ্বিগ্ন। স্ত্রী'র মাতলামি তাঁকে ক্রুদ্ধ এবং হিংস্র করে তুলল; অথচ তিনি মোটেও হিংস্র স্বভাবের ছিলেন না। কিন্তু সেই রাতে তিনি খুবই ' ভায়োলেন্ট' হয়ে ওঠেন। মহিলা বিছানায় শুয়ে অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করছিল। সহ্য করতে না পেরে ডাক্তার তার গলা টিপে ধরেন। শ্বাসরোধ হয়ে মারা যান মহিলা। স্ত্রী'কে মেরে ফেলেছেন বুঝতে পেরে উদভ্রান্তের মতো বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যান ডাক্তার"।
দুজনেই কিছুক্ষণ নীরব রইল।
"....ডাক্তারের কি হলো, সার্জেন্ট? " অবশেষে নীরবতা ভঙ্গ হলো মিটফোর্ডের প্রশ্নে।
".....তিনি পাগলের মতো ছুটছিলেন। দৌড়োতে দৌড়োতে লন্ডন রোডে চলে আসেন। রাস্তা পার হওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু পড়ে যান গাড়ি-ঘোড়ার মাঝখানে। একটা ভারী লরি তাঁকে চাপা দেয়"।
আবার নিশ্চুপ হয়ে গেল মিটফোর্ড।
"......এসব কবে ঘটেছে, সার্জেন্ট? " জিজ্ঞেস করল সে একসময়।
".....দশ বছর আগে। জুলাইয়ের তেরো তারিখ, রাত আড়াইটের দিকে"।
".....আর একটা যে সাদা গাড়ি দেখলাম? গল্পের সাথে ওটার কি সম্পর্ক?"
".....কোনও সম্পর্ক নেই। ওটা ২২ নম্বর বাড়ির মালিকের গাড়ি। সে গাড়িটাকে ৩ নম্বর বাড়ির সামনে দাঁড় করিয়ে রেখেছিল। রাস্তাটা ওখানে চওড়া তাই। ডাক্তার এবং তাঁর স্ত্রী মারা যাবার পর ওই বাড়িতে আর কেউ বাস করে না"।
চুপ করে গেলেন সার্জেন্ট টমাস। তারপর একসময় নীরবতা ভঙ্গ করে বললেন, " তুমি ডিউটি বুকে তোমার রিপোর্ট লিখে রেখে যাও,মিটফোর্ড। তারপর বাড়ি যাও। তোমাকে খুব ক্লান্ত দেখাচ্ছে "।
একটা কলম নিল মিটফোর্ড। জিজ্ঞেস করল, " ৩ নম্বর বাড়িতে যা দেখেছি তা নিয়ে কি রিপোর্ট লিখব, সার্জেন্ট? "
"....না", বললেন সার্জেন্ট টমাস, " ও নিয়ে তোমায় কিছু লিখতে হবে না"।
( সমাপ্ত)
।। ডার্ক নাইট ।।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now