বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

রাহুর গ্রাস

"রোমাঞ্চকর গল্প " বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রিয়েন সরকার (০ পয়েন্ট)

X রাহুর গ্রাস আশিকুর রহমান . "ছয় মাস হইল এই সমস্যায় পরছি স্যার। অবশ্য এইটারে সমস্যা বলা ঠিক হইব কিনা তা জানি না। খিদা,ঘুম,হাটাচলার মত ভয়ও সব মাইনষেই পায়। তয় আমি ওইসব ভয় ডরের ধার ধারতাম না। কিন্তু, এহন আমার অনেক ভয় করে স্যার। রাইতের পর রাইত ঘুমাইতে পারি না। ডাক্তার, ওঝা,কবিরাজ কোন কিছু বাদ রাখিনাই এই ডর ভাগানের লাইগা। কিন্তু কিছুতেই কিছু হয় নাই। শ্যাষে গঞ্জের চা - অলা মতি ভাই আপনের লগে দেহা করনের কথা কইল। সে কইল আপনে অনেক জ্ঞানী আর কামেলদার লোক। তাই তার কথা শুইন্না আমি আর দেরী করি নাই, আইসা পরছি আপনের কাছে।আমারে বাচান স্যার, আমারে বাচান।এমনে চলতে থাকলে আমি পাগল হইয়া যামু।" একনাগাড়ে বলে যাওয়া কথাগুলো শুনতে শুনতে লোকটিকে খুটিয়ে খুটিয়ে দেখছিল তোফায়েল আহমেদ। ঢাকা ইউনিভার্সিটি থেকে মনোবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করার পর একটা থিসিস প্রজেক্টের অংশ হিসেবে তথ্য সংগ্রহের উদ্দেশ্যে এই প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে এসেছে সে। এছাড়াও হাত দেখতেও বেশ পারদর্শী সে যদিও এসব গ্রহ নক্ষত্রের হিসাবে মোটেও বিশ্বাস নেই তার। এই হাত দেখার সূত্র ধরেই হয়তবা চা-অলা মতির সাথে পরিচয় হয়েছে তার যদিও এ মতিটা কে তা এখনও বুঝে উঠতে পারছে না সে। লোকটার কথার রেশ কাটতেই তোফায়েল আহমেদ বলল "কে আপনি? আর আমি কিভাবে আপনার সমস্যার সমাধান করতে পারি?" জবাবে লোকটা বললেন "জ্বে, আমার নাম আব্দুল বাসেত। এই গেরামের মাতব্বর সাবের খাস লোক। বারো বছর যাবৎ উনার খেদমত করতেছি। মতি ভাই কইল আপনি নাকি জ্বিনদের বশ কইরা তাদের দিয়া লোকের ভাগ্য কইয়া দিতে পারেন। তাইলে জ্বিন সাহেবগো দিয়া আমার সমস্যাটা দূর কইরা দেন। আমারে ফিরাইয়া দিয়েন না স্যার। আমার সমস্যাটার সমধান কইরা দিলে চিরকাল আমি আপনের কিনা গোলাম হইয়া থাকুম। যা হুকুম করবেন তাই তামিল করুম। শুধুমাত্র আমারে বাচান স্যার।" লোকটার এই মাত্রাতিরিক্ত অযৌক্তিক বকবকানিতে কিছুটা বিরক্ত হয়েই তোফায়েল বলল "আহ্, এইসব জ্বিন ভূতের ভিত্তিহীন গল্প কোথায় পান আপনারা। আর আপনার সমস্যাটা কি তা তো বলবেন। তারপর নাহয় বোঝা যাবে আপনাকে সাহায্য করা যাবে কি না।" তোফায়েলের বিরক্তি বেশ প্রভাবিত করল আব্দুল বাসেতকে। তাই আর কোন অপ্রাসঙ্গিক কথায় না যেয়ে লোকটা তার সমস্যার কথা বলতে লাগলেন। "স্যার, আমার সমস্যা হইল গিয়া আমি মরা মানুষ দেখতে পাই। যখনই আমার আশে পাশে কেউ থাকে না বিশেষ কইরা রাইতের বেলায় দেখতে পাই। শুধু যে দেখতে পাই তা কইলে ভুল হইব। প্রথম প্রথম এই মরা মানুষগুলা শুধু দেখা দিত আর এখন নানা প্রকার ইশারা ইঙ্গিত দেওন এমনকি কথাও কইতে চায়। এমনকি টাট্টি ঘরে ছোট বা বড় কাম সারতে গেলেও সেখানে হাজির হয় মরা গুলা। শালার মরাগো লাইগা আমার খাওয়া,হাগামুতা এমনকি ঘুমও বন্ধ হইয়া গেছে আমার। এর একটা বিহিত আপনের করতেই হইব।" লোকটার এমন অবান্তর, অযৌক্তিক আর আজেবাজে কথা শুনে তোফায়েলের মেজাজটা একদম খিচড়ে গেল। কোনমতে নিজের রাগটা চেপে রেখে বলল "দেখুন,আমি একটা জরুরী কাজে বাইরে যাচ্ছি এখন। পরে একদিন আসুন,আপনার সাথে সময় নিয়ে কথা বলা যাবে।" এই কথা বলে লোকটাকে কোন কথা বলার সুযোগ না দিয়ে বেরিয়ে পরল সে। সাত দিন পর... আব্দুল বাসেতের সাথে পরিচিত হবার পর ছয় দিন অতিবাহিত হয়েছে। এড়িয়ে চলার সর্বাত্মক চেষ্টা করা সত্বেও আব্দুল বাসেতের কবল থেকে রক্ষা পায়নি তোফায়েল। প্রতিদিনই কোন না কোন ভাবে তোফায়েলের সাথে দেখা করেছে সে। অবশেষে আজ কিছুটা বিব্রত হয়েই তোফায়েল আব্দুল বাসেতকে ঘরে এনে বসাল। তারপর তার সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ কথা চালিয়ে গেল। অবশ্য আজ কোন অযৌক্তিক কথার সুযোগ দিল না আব্দুল বাসেতকে।নিজেই নানা প্রশ্ন করে তার সমস্যার সম্পর্কে একটা ধারনা নিল। কথাবার্তা থেকে তোফায়েল আহমেদ ধারনা করল যে লোকটা ইনসোমনিয়ায় আক্রান্ত। সেই সাথে কিছুটা অবসেসিভ কমপালসিভ ডিসঅর্ডারে ভুগছে। তাই হয়তোবা নানা রকম হেলুসিনেশন হচ্ছে। যদিও লোকটা কাকে দেখে বা কেন দেখে সে সম্পর্কে জানতে চায় নি তোফায়েল কেননা তা হলেই একগাদা আষাঢ়ে গল্প শুনতে হবে তার। তোফায়েল নানা ভাবে আব্দুল বাসেতকে বোঝাতে চাইল যে তার ভয়গুলো সম্পূর্নই তার মনের সৃষ্টি। একজন অভিজ্ঞ মনোবিদের ঠিকানা দিয়ে তার সাথে দেখা করতে বলল। অবশেষে একটা হালকা ঘুমের ঔষধ দিয়ে বিদায় করল তাকে যাতে তার ভাল ঘুম হয়। এ সময় একটা বিষয় চোখে লাগল তোফায়েলের। এই সাত দিনে বেশ খানিকটা রোগা হয়ে গেছেন আব্দুল বাসেত,চেহারার মাঝেও একটা দিশেহারা ভাব খুব ভালভাবেই ধরা পরেছে। দুই দিন পর.. শেষবার কথা বলার পর থেকে এখন পর্যন্ত আব্দুল বাসেতের সাথে আর দেখা হয় নি তোফায়েলের। অবশ্য মাঝখানে বেশ ব্যস্ত সময় কেটেছে তার। আজও দূরবর্তী এক গ্রামে গিয়েছিল তথ্য সংগ্রহ করতে।কাজ শেষ করে আসতে আসতে বেশ রাত হয়ে গেছে। বাড়ির সামনে আসতেই দেখল অন্ধকারে কেউ একজন দাড়িয়ে আছে। "কে ওখানে?" প্রশ্ন করল তোফায়েল। "জ্বে স্যার আমি। আব্দুল বাসেত।" "ওহ্ আপনি। দেখুন আজ আমি খুব ক্লান্ত, কথা বলার মত...." "ঘরে চলেন স্যার। কথা আছে।" মাঝপথেই তোফায়েলের কথা থামিয়ে দিলেন আব্দুল বাসেত। আব্দুল বাসেতের কথায় এমন কিছু একটা ছিল যা তোফায়েলকে তার কথা শুনতে বাধ্য করল। আব্দুল বাসেতকে নিয়ে ঘরে ঢুকতেই তোফায়েল খেয়াল করল আব্দুল বাসেত একজন বাতিকগ্রস্ত ব্যাক্তির মত আচারন করছেন। তার কথা বলার ধরন, চাহনি কোন কিছুই স্বাভাবিক মনে হচ্ছে না। লোকটা ঘরে ঢুকেই নিজের শার্ট খুলতে শুরু করলেন। লোকটার এই আকষ্মিক অদ্ভুত আচারনে খানিকক্ষণের জন্য হতভম্ব হয়ে গেল তোফায়েল। কোন প্রকার পতিক্রিয়া জানানোর আগেই লোকটা তোফায়েলকে তার কাধের মাঝামাঝি একটা জায়গা নির্দেশ করে বলল "স্যার দেখেন তো আমার ঘারে এইটা কিসের দাগ?" লোকটার কথা শুনে তাকাতেই তোফায়েলের গা শিউরে উঠল। লোকটার কাধে পাচঁ আঙ্গুলের একটা গভীর ছাপ। আঙ্গুলগুলোর ছাপের আকৃতি দেখে নিসন্দেহে বলা যায় যে কোনভাবেই সেগুলো কোন মানুষের আঙ্গুলের ছাপ না। আরও ভয়াবহ ব্যপার হল যে গভীর কালশিটে দাগগুলো দেখে খুব সহজেই অনুমান করা যায় যে কতটা শক্তিশালী এই আঙ্গুলগুলোর থাবা। বিষ্ময়ে বিমূঢ় তোফায়েল বলল "কি আশ্চর্য! কিভাবে হল এটা কে করল আপনার এই অবস্থা?” জবাবে আব্দুল বাসেত বলল "জ্বে স্যার, এ সবই আমার পাপের ফল। আপনের দেওয়া ঔষুধে প্রথমদিন খুব আসান পাইছিলাম। খুব ভাল ঘুমও হইছিল। কিন্তু গত রাইতে যখন আমার চোখ দুইটা একটু লাইগা আইতাছিল তখনই কে জানি পিছন থেইকা আমার ঘাড় জোরে বালিশের লগে জাইত্তা ধরল। ডরের চোটে আমি যখন আমার হাত দুইডা পিছনে নিয়া ঘাড় থেইকা হাত সরানের চেষ্টা করলাম তখনি আমার হাতে দুইটা পশমঅলা হাত ঠেকল। কিছুক্ষণ ধস্তাধস্তি করার পর যখন পিছনে ফিরা চাইলাম তখন দেখলাম একটা পিচ্চি বাচ্চা আমার খাটের পাশে বইয়া খিক্ খিক্ কইরা হাসতাছে। আমি পিচ্চিডারে ভাল কইরা দেহনের লাইগা আগাইতেই সেইটা বাতাসে মিশ্যা গেল। তারপরই আবার মরাটারে দেখতে পাইলাম। এরপর আর সারা রাইত ঘুমাইতে পারি নাই। সকালে আইসা দেখি আপনে বাইর হইয়া গেছেন। সকাল থিকা সন্ধ্যা পর্যন্ত এইখানেই ছিলাম। আমারে বাচান স্যার।" অন্য যে কোন পরিস্থিতিতে লোকাটার কথাগুলো কোন পাত্তাই পেত না তোফায়েলের কাছে। তবে আজকে লোকটার অবস্থা দেখে তোফায়েল বেশ খানিকটা দুঃখবোধ করল। লোকটার সমস্যার ব্যাপারে বিস্তারিত জানার একট তাগিদ অনুভব করল। মৃত মানুষ দেখার ব্যপারে বিস্তারিত জানার জন্য তোফায়েল লোকটাকে প্রশ্ন করল "আপনি কোন মৃত ব্যাক্তির আত্নাকে দেখতে পান? আর কেনই বা দেখতে পান? তার সাথে আপনার যোগসূত্রটাই বা কি?" জবাবে লোকটা বেশ কিছুটা ইতস্তত বোধ করলেন। বেশ কিছুক্ষণ ভেবে নিয়ে কথা বলা শুরু করলেন " স্যার আগেই তো আপনেরে কইছি সবই আমার পাপের ফল। আমি এক মরা মেয়েছেলের আত্নারে দেখতে পাই। সেই মেয়েছেলের নাম হইল গিয়া কাজলরেখা। এই গেরামেরই মাইয়া ছিল কাজলরেখা। ছোটবেলায় বাপ মইরা যাওনের পর মায়ের কাছেই মানুষ হইতাছিল সে। বছরখানেক আগে যহন কাজলরেখার মা মইরা গেল তহন আপন কইতে কাজলরেখার আর কেউ রইল না। মাতবর সাব আবার খুব দিল দরিয়া মানুষ। কাজলরেখার এই অসহায় অবস্থা দেইখা তার বাসায় কাজলরেখার কাজকাম আর খাওন দাওনের ব্যবস্থা কইরা দিলেন। গরীব হইলে কি হইব স্যার,কাজলরেখা ছিল বড়ই সৌন্দর্য। সেই লগে ছলাবলাও কম জানত না। মাইয়া মানুষ হইয়াও সারাদিন বেটাছেলেগো লগে দৌড়াদৌড়ি,লাফালাফি,ঝাপাঝাপি করত। যতসব নষ্ট মেয়েছেলেদের কাজ। কাজলরেখার ছলাবলায় কবে যে ছোট হুজুর মানে আমাগো মাতব্বর সাবের একমাত্র পুত্র মইজ্যা গেল আমরা কেউই টের পাইলাম না। এরপর একদিন অঘটন ঘইটা গেল। ছোটহুজুর একদিন কাজলরেখা একলা পাইয়া অঘটনটা ঘটায় দিল। বুঝেনই তো নাবালক বাচ্চার নাদান কাজ। ঘটনাটা নিয়া গেরামে বেশ কানাঘুষা শুরু হইল। মাতব্বর সাব তো পরলেন মহা ফাপরে। জগতের ভালো মানুষগোই যেন সকল মুসিবতে পরতে হয়। যাই হোক আগেই তো কইছি আমাগো মাতবর সাব খুবুই দিলদরিয়া মানুষ। তিনি অনেক ট্যাকাপয়সা দিয়া কাজলরেখারে বিদায় কইরা দিলেন। মাতবর সাব যত ট্যাকা কাজলরেখারে দিছিলেন তত টেকা কাজলরেখার চৌদ্দপুরুষের কেউ একলগে দেখে নাই। তাছাড়া গেরামের ময় মুরুব্বীগোরেও ট্যাকা দিয়া খুশি কইরা দিলেন। তাই বিষয়টা লইয়া কেউ কোন কথা তুলল না। সব আগের মত চলতে লাগল।" এতটুকু বলেই আব্দুল বাসেত চুপ হয়ে গেলেন। তোফায়েল কিছুটা অধীর হয়েই জানতে চাইল "কি হল, থামলেন কেন? তারপর কি হল বলুন।" জবাবে আব্দুল বাসেত বলল " স্যার আইজ সারাদিনে কিছু খাই নাই। আমারে কিছু খাইতে দিবেন? খাওনের পর বাকি ঘটনা জানাই।" লোকটার জবাবে তোফায়েলও সম্বিত ফিরে পেল। খিধে তারও পেয়েছে। তাই বাংলোর কাজের লোককে খাবার দেয়ার কথা বলে হাত মুখ ধুতে গেল। এক ঘন্টা পর.... খাওয়া দাওয়া সেরে আব্দুল বাসেতকে নিয়ে বাংলোর বারান্দায় এসে বসল তোফায়েল। "তারপর কি হল বলুন।" বলল তোফায়েল। তোফায়েলের কথা শুনে আবার কথা আরম্ভ করল তোফায়েল "ওই ঘটনার পর আমরা তো ভাবলাম সব ঝামেলা মিট হইয়া গেছে। মাতবর সাব ছোট হুজুরের বিবাহের জন্য পাত্রী দেখা শুরু করলেন এরইমধ্যে। কিন্তু, কইলাম না যে যত্তসব নষ্ট মেয়েছেলের কাজ। এর কয়দিন পর জানতে পারলাম কাজলরেখা পেট বাধাইছে। চিন্তা করন যায় কত্ত খারাপ মেয়েছেলে। ছোট হুজুররে হাত করতে না পাইরা মাতবর সাবের সম্মান লইয়া টান দিছে সে। ওদিকে মাতবর সাব পাশের গেরামের মাতবরের কন্যার সাথে ছোট হুজুরের বিয়া ঠিক করছেন। এহন এই খবর শুইনা সে তো খাওয়া দাওয়া ছাইরা বিছনা পাটি লইয়া ফালাইলেন। এমন দিল দরিয়া মানুষের এত কষ্ট দুই চোখে সওন যায়। তহনি বুদ্ধিটা আমার আমার মাথায় আইলো। মাতবর সাবরে কইতেই তিনি রাজি হইয়া গেলেন। এমনকি কইলেন কাজটা করতে পারলে আমারে নগদ ১০০০ ট্যাকা দিবেন। ভাবন যায় কত বড় ওনার মন। আপনের কাছে মিথ্যা কমু না কামটা করতে আমারও ডর করতাছিল। যাই হউক, এক আমাবস্যার রাইতে আমি ঘাপটি মাইরা বইয়া রইলাম কাজলরেখার বাড়ির সামনে। মাঝরাইতের দিকে কাজলরেখা বাইর হইল ছোটঘরে যাওনের লিগা। আমি আস্তে আস্তে পিছে পিছে গেলাম কাজলরেখার। পেছন থেইকা আস্তে কইরা চাইপা ধরলাম কাজলরেখার মুখ। কিছু বুঝনের আগেই আস্তে কইরা একটা পোচ দিলাম ওর গলায়। রক্তের একটা স্রোত নামতে লাগলো ওর গলার থেইকা। রক্তগুলা এত গরম আছিল হাতে ছ্যাকা দিতাছিল রীতিমত। বেশ কিছুক্ষন ধস্তাধস্তি করল। তারপরে আস্তে কইরা নিরব হইয়া গেল সব। কাচা কাম করনের মানুষ আমি না। তাই কাম ফাইনাল করনের লিগা হাত পায়ের রগগুলাও ছাড়ায় দইলাম। তারপর বাড়ি ফিরা আইলাম। পরদিন গেরামে বেশ হইচই হইল,থানা থেইকা পুলিশ আইলো। তারা লাশ লইয়া গেল পোস্টমর্টেম না কি জানি করার লাইগা। গেরামে আর কাজলরেখার লাশ ফিরা আইল না। আইবোই বা কেমনে, কে আছে কাজলরেখার এই গেরামে। কোন দুআ-দাওয়ারও আয়োজন হইল না ওর জন্য। মানুষ বড়ই নিষ্ঠুর। সপ্তাহখানেক পর কাজলরেখার নাম মনেও থাকলো না কারো। এদিকে ধুমধাম কইরা আগায়া আইল ছোট হুজুরের বিয়া গেরামের সব মানুষই আবার সেই বিয়ার মেজবান। দেখতে দেখতে বিয়াও হইয়া গেল ছোট হুজুরের। পরীর মতন একখান বউ আইল মাতবর সাবের ঘরে। কিন্তু, ভাইগ্যের কি কঠিন লীলা। বিয়ার পরদিনই নাই হইয়া গেল ছোট হুজুর। টানা দুই দিন তন্ন তন্ন কইরা বিচরাইয়া পাওয়া গেল না ছোট হুজুররে। তিন দিনের দিন সকালবেলা ছোট হুজুররে পাওয়া গেল কাজলরেখার বাড়ির কাছেই এক বাশঁবাগানে। সেইটা কি যে নির্মম দৃশ্য তা আমি কইয়া বুঝাইতে পারুম না। ছোট হুজুরের গলাডা দুইভাগ করা। হাত পায়ের রগগুলাও কাটা ঠিক কাজলরেখার মতন। গেরামের লোকেরা কইতে লাগল যে এইটা কাজলরেখার কাম। সে ভূত হইয়া ছোটহুজুররে মাইরা ফালাইছে। সেদিন থিকাই আমার মনে ডর ঢুকছে। সেই রাইতেই আমি প্রথম কাজলরেখারে দেখতে পাই। আর এহন তো তার লগে ছোট হুজুর আর একটা বাচ্চাও যোগ দিছে তার লগে। একেকজন একেক সময় আহে। কি জানি কইতে চায়। আর কাল রাইতে তো মাইরাই ফালাইতে চাইছিল। মাতবর সাবেরে এই কতা জানানের পর তিনি কইছেন এই ব্যাপারে একদম চুপ থাকতে। কিছু বললে আমারে খুনি আর পাগল বানাইয়া থানায় পাডাইয়া দিব কইছেন। আমি বড় বিপদে আছি, আমারে বাচান স্যার। আপনার জ্বিনেগো দিয়া আমারে একটা তাবিজ আইনা দেন যাতে আমি ভূতেগো থিকা বাচতে পারি।" আব্দুল বাসেতের কথা শেষ হবার পর দীর্ঘক্ষণ চুপ করে থাকল তোফায়েল। ঘৃণা আর রাগে ভেতরটা ফেটে পরতে চাইছে তার। বেশ কিছুক্ষণ পর নিজেকে সামলে নিল সে। মনে মনে একবার বিশ্লেষণ করল বাসেত সাহেবের কথাগুলো। মৃত মানুষ দেখার ব্যাপারটা এখনো বিশ্বাস করল না সে। পুরো ব্যাপারটাই লোকটার অবচেতন মনের সৃষ্টি। গভীর অপরাধবোধ থেকেই এসব কিছুর মুখোমুখি হচ্ছে সে। তবে আব্দুল বাসেতের এই দুর্বলতার সুজগটাই নিতে চাইল তোফায়েল। সে বলল " বাসেত সাহেব আপনে যদি এই অভিশাপ থেকে মুক্তি পেতে চান তবে কালই থানায় গিয়ে পুরো ঘটনার সত্য স্বীকরক্তি দিবেন। তারপর স্বেচ্ছায় আত্সমর্পন করবেন। তবেই আপনার মুক্তি মিলবে।" "জ্বে স্যার আমি অবশ্যই থানায় যামু। কাল সকালে উইঠাই যামু। জ্বিন সাহেবরা যেহেতু কইছেন তাতে অবশ্যই আমার মুক্তি মিলব। তাদের কইবেন আমার জন্য দোয়া করতে।" বললেন আব্দুল বাসেত। এই কথা শোনার পর আর কোন কথা বলল না তোফায়েল। মনে মনে ভাবল যে যাক দেরীতে হলেও সুবিচার পাবে মেয়েটা। এরপর সে আস্তে করে উঠে দরজা লাগিয়ে দিল ঘরের। তারপর সোজা চলে গেল বিছানায় যদিও ঘুম এল না তার। গভীর রাতে নামল ঝুম বৃষ্টি। ভাসিয়ে নিয়ে গেল পুরো চরাচর। ভোর রাতে বৃষ্টির শব্দ শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পরল সে। পরদিন সকালে চা খেয়েই খবরের কাগজ পড়ার উদ্দেশ্যে হাটা দিল বাজারের দিকে। বাজারে যেতেই দেখতে পেল বাজারে সবার মাঝেই যেন একটা চাপা উত্তেজনা। কি একটা ঘটনা নিয়ে বলাবলি করছিল সবাই। একজনকে জিজ্ঞেস করতেই জানাল যে গতরাত থেকে আব্দুল বাসেতকে পাওয়া যাচ্ছে না।লোকটা আরও কিছু বলে যেতে লাগল তবে কিছুই শুনতে পাচ্ছিল না তোফায়েল। মাথাটা তার কেমন ঝিমঝিম করছে, হঠাৎ করেই তার মনে হল যে অনেকগুলো পার্থিব বিশ্বাসের স্তম্ভ নড়ে গেছে। তার মনে হল, সে যেন প্রহর গুনছে অশুভ কিছুর। (সমাপ্ত)


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১০৯৫ জন


এ জাতীয় গল্প

→ রাহুর গ্রাস ১মম পর্ব
→ রাহুর গ্রাস ২য় ও শেষ পর্ব
→ রাহুর গ্রাস

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now