বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

প্রকৃতির হৃদয়ে রেখে যাওয়া কানু ফকির

"গ্রাম্য লোককথা" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান মোহাম্মদ শাহজামান শুভ (০ পয়েন্ট)

X লেখকঃ মোহাম্মদ শাহজামান শুভ তিতাসের ধীরলয় স্রোত, নদীর তীরে দাঁড়িয়ে থাকা শ্যামলাভ সবুজ, আর সন্ধ্যাবেলায় জোনাকির ক্ষীণ আলো—সব মিলিয়ে শাহাবৃদ্ধি গ্রামটি যেন পৃথিবীর কোলাহল থেকে বিচ্ছিন্ন এক অন্তর-আশ্রম। সেই গ্রামের বুকেই শতবর্ষ আগে বাস করতেন এক অদ্ভুত মানুষ—কবিরাজ কানু ফকির। তাঁর জীবন ছিলো প্রার্থনার মতো সরল, নদীর জলের মতো স্বচ্ছ, আর ভেষজের সুরভির মতো নির্মল। কানু ফকিরকে প্রথম দেখলেই মনে হতো তিনি হয়তো এই মাটিরই কোনো অন্তর্গত মহাজাগতিক শক্তি—যিনি মানুষের দুঃখ-ব্যথা নিজের নিঃশ্বাসে টেনে নিয়ে প্রকৃতিকে দিয়ে তা সারিয়ে তোলেন। ক্ষীণ দেহ, ধবধবে সাদা দাড়ি, চোখে গভীর শান্তির ছায়া—কিন্তু সেই শান্তির আড়ালে ছিলো বিরল বোধশক্তি; এই পৃথিবীর যেকোনো দুঃখী মানুষকে দেখে তিনি রোগ নয়, মানুষটিকে বুঝতেন। ভোরবেলায় যখন গ্রামের অন্য মানুষ ঘুমিয়ে থাকে, কানু ফকির তখনই জেগে উঠে ভেষজ বাগানে হাঁটাহাঁটি করেন। তুলসীর পাতায় শিশির জমে থাকলে তিনি দুই হাত জোড় করে বলেন— “তোমরা মানুষকে বাঁচাইবা, আমি শুধু তোমার সেবা করি।” তাঁর বাগানে ছিল শতাবরী, অশ্বগন্ধা, মেথি, পুদিনা, নিম, ব্রাহ্মী, লেমনগ্রাস, আমলকী—যেন একটি জীবন্ত গ্রন্থাগার। প্রতিটি গাছের সঙ্গে তিনি কথা বলতেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, গাছও মানুষের মতো দুঃখ পায়, সুখ পায়, যত্ন পেলে তার গুণ বাড়ে। তাঁর উপরি চিকিৎসা ছিল বিশ্বাস—আর বিশ্বাসের মূলে ছিল মানুষকে ভালোবাসা। একদিন গ্রামের পশ্চিমপাড়ার রামপদ দৌড়ে এসে বলল— —“ফকির দা, আমার বউয়ের শরীরটা খুব খারাপ। সারা শরীর আগুনের মতো জ্বলতেছে।” কানু ফকির মাটির ট্টালাটি হাতে নিয়ে রামপদের সঙ্গে রওনা দিলেন। রোগিণীকে দেখে তিনি কিছুক্ষণ নিঃশব্দে বসে থাকলেন। তারপর জানলার ফাঁক দিয়ে আসা বাতাসে গন্ধ শুঁকলেন। তাঁর এই একটি অভ্যাস ছিল—হাওয়ার গন্ধেই রোগের প্রকৃতি বোঝেন। —“এ জ্বরটা ভেতরের। শরীরের রক্তে আগুন ধইরা আছে। ওরে তুলসী-আমলকীর ক্বাথ দাও। আর রাতটারে ঠান্ডা রাখো।” পরের দিন জ্বর নেমে গেল। রামপদ কৃতজ্ঞতায় কেঁদে ফেলে। কিন্তু কানু ফকির শুধু বলেন, —“আমার কাজ না, এগুলো গাছের কাজ।” এমনই ছিল তাঁর নম্রতা—মানুষ তাঁকে সম্মান করতো, কিন্তু তিনি সম্মানকে কখনও নিজের বলে ভাবতেন না। গ্রামের একধারে বাস করতেন দয়াময়ী নামের এক বিধবা। তাঁর ছোট ছেলে রবি ক্রমে নীরব হয়ে যাচ্ছিল; পড়তে-খেলতে চাইত না। সবাই বলত—ছেলেটা ভূতের ছায়া পেয়েছে। দয়াময়ীর চোখ জলে ভরে যেত প্রতিদিন। একদিন সে কানু ফকিরের কাছে এল। —“ফকির দা, আমার রবি কিছু খায় না, হাসে না, কথা বলে না। আমি কী করব?” কানু ফকির রবিকে কোলে বসিয়ে তার মাথায় হাত রাখলেন। কিছুক্ষণ পর বললেন— —“ছেলেটার মন ক্লান্ত। শরীর না, মনকেই সারাইতে হবে।” তিনি ব্রাহ্মী আর অশ্বগন্ধার গুঁড়া মিশিয়ে দুধ তৈরি করলেন। বললেন— —“রাতের শেষে এ দুধ দोगো। আর তাকে নিয়ে নদীর ধারে হাঁটো। নদীর হাওয়া মনকে নতুন করে বানায়।” দুই সপ্তাহের ভেতর রবির চোখে আলো ফিরে এল, সে আবার খেলতে শুরু করল। দয়াময়ী কাঁদতে কাঁদতে বলল— —“আপনি যেন ভগবান।” কানু ফকির হেসে বললেন— —“আমি ভগবান না মা, আমি তো তোমাদের মতোই এক মানুষ। তবে প্রকৃতির কাছে মাথা নুইজ্জা শিখছি—মানুষকে সারাতে হলে আগে তাকে ভালোবাসতে হয়।” কিন্তু শুধু রোগ সারানো নয়, মানুষের সংকটে কানু ফকির ছিলেন আশ্রয়। একবার মহামারি নামল চারদিকে। শিশুরা কাশিতে, বড়রা জ্বরে কাহিল। গ্রামের মসজিদের আজানও যেন দুর্বল হয়ে গিয়েছিল। সবাই কানু ফকিরের কাছে ছুটে এল। তিনি সেদিন নিজের বাগান থেকে সব ভেষজ তুলে নিলেন—তুলসী, হলুদ, লেমনগ্রাস, আমলকী, মেথি। পাড়াপাড়ি করে ঘরে ঘরে ক্বাথ পৌঁছে দিলেন। পরের তিন দিনে মানুষ সুস্থ হয়ে উঠল। সবাই বলল— “কানু দা ছাড়া এ গ্রাম বাঁচত না।” তবু যখন তাঁকে সম্মানের আসনে বসাতে চাইত কেউ, তিনি বলতেন, —“যে গাছ আমার চেয়ে বড়, তাকে আমি পূজা করি। আমি শুধু ওদের সেবা করি।” শাহাবৃদ্ধি গ্রামের প্রতিটি শিশুর, প্রতিটি নারীর, প্রতিটি কৃষকের বিশ্বাস ছিল—যতদিন কানু ফকির আছেন, প্রকৃতি তাঁদের রক্ষা করবে। শেষ বয়সে তাঁর হাঁটা ধীর হয়ে যায়, কিন্তু ভেষজ বাগানের প্রতি ভালোবাসা কমে না। ভোরবেলা তিনি গাছের পাশে বসে থাকতেন, পাতায় হাত বুলিয়ে বলতেন— —“তোমরা মানুষকে বাঁচাইবা, আমার জীবন শেষ হয়ে গেলেও।” শেষ রাতে তিনি খুব শান্ত ছিলেন। তাঁর শিষ্য লালমোহন দেখে জিজ্ঞেস করলেন— —“গুরুজি, কিছু বলবেন?” কানু ফকির বললেন— —“প্রকৃতি যে ওষুধ দিয়েছে, তা কখনো ত্যাগ কইরো না। মানুষ যত দূরেই যাক, ফিরে আসবে গাছের কাছেই।” সেদিন ভোরে তিনি পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেন। তাঁর বাগান আজো আছে, গাছগুলো আজো হাওয়ায় দোলে—মনে হয় যেন কানু ফকিরের হাত এখনো সেগুলোতে ছুঁয়ে আছে। গ্রামের মাটিতে কানু ফকির নেই, কিন্তু তাঁর শিক্ষাটা রয়ে গেছে— মানুষ মাটির, আর মানুষের ওষুধও মাটির।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১১৫২ জন


এ জাতীয় গল্প

→ প্রকৃতির হৃদয়ে রেখে যাওয়া কানু ফকির

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now