বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
প্রকৃতির আপন দেশ কেরালা’-২৮
মাজহারুল মোর্শেদ
সমুদ্রের ধারে টি-স্টলে চা খেতে বসে উর্মী দেখে আমি নেই। হাজারো মানুষের ভিড়ে হয়তো আমি হারিয়ে গেছি। আমি যখন সে বিশাল ঢেউটাকে বিদায় জানিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম ঠিক তখনই আমার দু’কাঁধে একটু ভাড় অনুভব করলাম, ফিরে দেখি উর্মী আর বন্ধু অর্ণব দু’জনে আমার দু’কাঁধে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সোডিয়ামের নিয়ন আলোয় উর্মীর চোখের কোণে জমানো অশ্রুবিন্দু জ্বলজ্বল করে জ্বলছে। আমার আর বুঝতে বাকি রইলোনা যে, সমুদ্রের সাদা ঢেউয়ের মতো জল ভরা ঐ চলছল চোখে বাওড়ের স্থির স্রোতের মতো ঠিক যেন একটা ভাসমান আবেগী উচ্ছ্বাস, একটা মায়াময় তরঙ্গায়িত নদী, একটা কোমলমতি সমবেদনাশীল হৃদয় আজ পৃথিবীকে অন্যকিছু বোঝাতে চায়, অন্যকিছুর অবতারণা করতে চায়। আমার নীরবতার সঙ্গী হয়ে তারাও কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে।
তারপর উর্মী বলে, আচ্ছা কাক্কু তুমি কেমন মানুষ বলোতো? তোমাকে নিয়ে তো পথচলা ভাড়ি মুশকিল। আমরা সবাই চলে গেলাম আর তুমি এ অন্ধকারে একা একা বসে থাকতে পারলে? যদি একটা বড় ঢেউ এসে তোমাকে ভাসিয়ে নিয়ে যেতো?
আহা! তাহলে কি মজাই না হতো? সারাক্ষণ ঢেউয়ের উপর এলেদুলে ভেসে ভেসে এ কূল থেকে ওকূলে ঘুরে বেড়াতে পারতাম।
ঘুরে বেড়া- না ছাই, জলে ডুবে মরতে হতো সেটা কি একবার ভেবে দেখেছো?
তাহলে তো বেশ হতো, পৃথিবীতে আমার মতো একটা অপদার্থের জায়গায় হয়তো কোন মহামানবের আবির্ভাব ঘটতো।
থাক! আর বেশি আদিখ্যেতা দেখাতে হবে না, পৃথিবীতে কে আসবে আর কে যাবে সেটা দেখার দায়িত্ব তোমাকে কে দিয়েছে, বলো শুনি? এবার চলো সবাই তোমার অপেক্ষায় বসে আছে।
আমি বুঝতে পেলাম উর্মী প্রচণ্ড আবেগ প্রবণ হয়ে আমাকে কথাগুলো শোনাচ্ছে। তার কথার মাঝেও জড়তা এসে তাকে আড়ষ্ট করে ফেলছে। হয়তো আর একটু সময় নিলে সে কেঁদেই ফেলতো। অবশ্য সত্যি এটা তার আবেগেরই বয়ষ, আবেগ প্রকাশের সময়। এটাই সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টির রহস্য, তার সৃষ্টিজগতের প্রতিটি প্রাণি একটা নিদিষ্ট বয়সে এসে নিদিষ্ট সময়ে এরকম আবেগী হয়ে ওঠে। আবেগের বন্যায় ভেসে যায় পৃথিবীর সকল রহস্যের আবরণ, অবশেষে জয় হয় আবেগের, জয় হয় ভালোবাসার, সৃষ্টি হয় নতুন কিছু, পূর্ণতায় ভরে ওঠে পৃথিবী। উর্মী আমার হাতটা শক্ত করে ধরে অন্ধের মতো টেনে নিয়ে যাচ্ছে। আমিও বোবার মতো বাকরুদ্ধ হয়ে কেবলি তার সাথে সমান তালে হাঁটছি। অর্ণবও আমার সাথে সাথে হাঁটছে।
একটা ঘোর অমানিশা, একটা মায়াময় ইদ্রোজালিক গোলকধাঁধা, যেখানে প্রত্যাশা আর প্রাপ্তির সমীকরণ বরাবরই শূন্য। এ কয়েকদিনে উর্মী আমার এতোটা কাছে ছিলো যে, দৃষ্টির অলক্ষ্যে যেন এক অবারিত বিচরণ। তাহলে সে কি ভাবে? এটাই হৃদয়ের খেলা, এটাই সৃষ্টির রহস্য। আমি তাকে হাসতে দেখেছি, কাঁদতে দেখেছি, খুব কাছে আসতে দেখেছি আবার অভিমানে দূরেও যেতে দেখেছি। তাহলে এটা কি? এটাই হলো এক মায়াময় ঘোর ইদ্রোজালিক গোলকধাঁধা। এই মায়ার নদীর ঢেউ চারিদিকে শুধু কলকল-খলখল করে। রাত পোহালে বিকেল ৫.৫৫ মিনিটে আমাদের ফ্লাইট। আমরা কোলকাতা এয়ারপোর্টে নেমে হোটেল ‘সোনার বাংলা লজ’ এ রাতটা শুধু কাটাবো। তারপর ফিরে যাবো যে যার আপন গন্তব্যের দিকে।
এদিকে প্রচণ্ড ক্ষুধাও পেয়েয়ে ভাত খেতে হবে। আমাদের সামনে হোটেল ‘আমার বাংলা’। তো থাকা খাওয়া দুটোই হয়। একদম বাঙালি স্টাইলে খাওয়া-দাওয়া এখানে পাওয়া যায়। মাছ, মুরগির মাংস, চিংড়ি পাওয়া যায়। এখানে থালি সিস্টেম আছে। কত থালি? ভেজ থালি ১৬০ টাকা। মাছের ডিম থালি ২২০ টাকা। মুরগির মাংস থালি ২৮০ টাকা। এর মধ্যে রয়েছে বাধকপি ভাজা, আলু পোস্ত, ডাল, চাটনি, উচ্ছে ভাজা, ভাত। মজার ব্যাপার এটা যে এখানে যে দাদারা কাজ করে রান্না করে সবাই বাঙালি।
কন্যাকুমারী ঘুরতে আসা প্রতিটি পর্যটকের একটি প্রধান আকর্ষণ হলো সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের দৃশ্য উপভোগ করা। এটা দেখেই যেন দিনের শুরুটা আনন্দময় হয়ে ওঠে এমন প্রত্যাশা সবার থাকে। কত মানুষ অপেক্ষা করছে এই জায়গায়। ঘড়িতে সময় সকাল ৬টা কন্যাকুমারীতে সূর্যোদয়ের সময় রয়েছে ৬টা ১২ মিনিট। কিন্ত উর্মী ছাড়া কারও ঘুম ভাঙেনি। আপাতত সূর্যোদয় দেখার একমাত্র সঙ্গী উর্মী। ঘুমঘুম চোখে সে হাঁটছে আমার হাত ধরে। পূর্বাকাশে সোনালি রঙ যেন গোটা পৃথিবী সোনায় মোড়ানো। একটু পরে আঁধারের বুক চিড়ে জেগে উঠবে সোনালি সূর্য আর আলোয় ভরে দেবে পৃথিবী। আঁধারের গুহা ছেড়ে নতুন আলোয় ডানা মেলে কলোকাকুলিতে ভরে দেবে পাখিরা।
অসাধারণ একটা মুহূর্ত বঙ্গোপসাগরের পেছন দিক থেকে উঠছে সে সোনালি সূর্য। সমুদ্রের সাদা ঢেউ ভোরের সূর্যের সোনালি রঙ মেখে গোটা সমুদ্র যেন মুক্তোর দানার মতো ঝলমল করছে। আহা! কি অপূর্ব, কি মনোমুগ্ধকর দৃশ্য জীবনে যেন অনেকটা পরিপূর্ণতা এনে দিলো।
সূর্যের সোনালি রঙ বদলে গেলে সবাই সৈকত ছেড়ে ফিরে আসছে। কিন্ত উর্মী কিছুতেই ফিরতে চাচ্ছে না। আমি তার হাত ধরে টেনে আনার চেষ্টা করলে সে আমার দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। আমি কোন কিছু না বোঝার ভান করে, তাকে প্রশ্রয় না দিয়ে একরকম জোর করেই নিয়ে এলাম চায়ের স্টলে। চায়ের চুমুকে ঘুম তাড়ানোর চেষ্টা আমাদের। আজকের দিনের মাত্র কয়েকটা মহুর্ত আমাদের হাতে তাই এ অল্প সময়কে কাজে লাগিয়ে যতো দ্রæত সম্ভব কন্যাকুমারীকে বিদায় জানাতে হবে।
এখন আমাদের ফেরার পালা।
কন্যাকুমারীর নিকটবর্তী এয়ারপোর্ট কেরালার রাজধানী শহর থিরুবনন্তপূরম আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের .(Thiruvananthapuram International Airport) যেহেতু আমাদের ফ্লাইট বিকেল ৫.৫৫ মিনিটে তাই আর এক মুহুর্ত দেরি করা যায় না। সড়কপথে দূরত্ব প্রায় ৯০ কিলোমিটার। গাড়িতে এই পথে সাধারণত ২ থেকে ২.৫ ঘণ্টা সময় লাগে। আমরা একটু বেশি সময় হাতে নিয়ে আগেভাগে বেরিয়ে পড়লাম। থিরুবনন্তপূরম বেশ ছিমছাম শহর। দাদা-বোউদির মাথায় এখন একটাই চিন্তা কখন ঘরে ফেরা যায়। যাহোক এয়ারপোর্টের লাগেজ চেকিং সংক্রান্ত ঝুটঝামেলা শেষ করে এয়ার ইণ্ডিগো ফ্লাইটে উঠে বসে পড়লাম। ইণ্ডিয়ান এয়ার লাইনস ফ্লাইটগুলোর মধ্যে এয়ার ইণ্ডিগো ফ্লাইটের সার্ভিস আমার ভালো লাগে। আমি এর আগেও বেশ কয়েকবার উঠেছিলাম তাই এবারও পছন্দের তালিকা থেকে সেটা বাদ পড়লো না। আকাশ পথে দূরত্ব কম হলেও সরাসরি ফ্লাইটের রেট অনেক বেশি। তাই আমরা হায়দ্রাবাদ ভায়া হয়ে কোলকাতা ফ্লাইটের টিকেট নিয়েছিলাম। সময়টা একটু বেশি ৫.৩০ ঘন্টা লাগলেও টিকিটে অনেক সাশ্রয় পেলাম। রাত ১১টা ৩০ মিনিটে আমাদের কোলকাতা সুবাষচন্দ্র বসু এয়ারপোর্টে নামিয়ে দিলো। আমরা একটা ট্যাক্সি ভাড়া করে চলে এলাম ‘সোনার বাংলা লজ’ আবাসিক হোটেলে। আবার আগামীকাল সকালে শিয়ালদহ স্টেশনে যেয়ে ট্রেন ধরতে হবে। কলকাতা থেকে আসামের শিলচরে যাওয়ার জন্য ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা এক্সপ্রেস’ শিয়ালদহ স্টেশন থেকে সকাল ৬:৫০ মিনিটে ছেড়ে যায়। ট্রেনটি নিউ জলপাইগুড়ি জংশনে (NJP) পৌঁছায় সন্ধ্যা ৫:৫৫ মিনিটে।
অর্ণব যদিও কোলকাতায় থাকে সে আমাদেরকে বিদায় না দিয়ে তার বাড়িতে গেলো না। আমরা সবাই হোস্টেলে থেকে গেলাম। যেহেতু সকাল ৬.৩০ মিনিটের মধ্যে আমাদের শিয়ালদহ স্টেশনে পৌছাতে হবে তাই ভোর চারটায় মোবাইলে এলার্ম দিয়ে রাখলাম। যাহোক আমরা ট্রেন আসার আধাঘন্টা পূর্বেই শিয়ালদহ স্টেশনে পৌছে গেলাম। ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা এক্সপ্রেস’ শিয়ালদহ স্টেশনে আসলো প্রায় ৪০ মিনিট লেটে। যেহেতু বেঙ্গালুর থেকে ৪২-৪৩ ঘন্টার একটা লম্বা রাস্তা পারি দিয়ে আসে সেহেতু ৪০ মিনিট লেট কোন ব্যাপার না, হতেই পারে। অর্ণব আমাদের ট্রেনে উঠিয়ে দিয়ে আমার পাশে বসে রইলো অতঃপর ট্রেন ছেড়ে দিলে সুদীর্ঘ একটা বন্ধনের বিচ্ছেদ ঘটিয়ে অশ্রুসজল চোখে হাত নেড়ে বিদায় জানালো।
অর্ণব উঠে গেলে উর্মী আমার পাশে বসলো। ঝিক-ঝিক-শোঁ-শোঁ শব্দে তুমুল গতিতে চলছে ট্রেন। দূরপাল্লার ট্রেন বলেই হয়তো এতোটা গতি। রাতে ঘুম ঠিকঠাক মতো না হওয়া তার ওপর ট্রেনের এলে-দুলে চলার গতি তাতে চোখে ঘুম না এসে যায় কোথায়? দাদা ও বোউদির চোখ বন্ধ। তারা দু’জনই হারিয়ে গেছে ঘুমের দেশে। আর্মীকে বললাম তুমিও একটু ঘুমিয়ে নাও। ও বললো- ‘আমার চোখে ঘুমের লেস মাত্র নেই’।
কোলকাতা থেকে নিউ জলপাইগুড়ি পর্যন্ত মোট দূরত্ব ৬২৬ কিলোমিটার। আমরা এসে পৌছলাম বোলপুর শান্তিনিকেতন স্টেশনে এক নম্বর প্লাটফর্মে এখানে ট্রেন মাত্র দু’মিনিটের জন্য দাঁড়ায়। ট্রেন প্রায় এক ঘন্টার কাছাকাছি লেট। খুব ক্ষুধা লেগেছে। দেখি টুকটাক যদি কিছু খাবার পাই কি না। দেখতে দেখতে আমরা পার করলাম নিউ ফারাক্কা জংশন এবার আসবে গঙ্গা নদীর উপর ফারাক্কা ব্যারেজ। যততোবার আমি কোলকাতা গিয়েছি ফারাক্কা ব্যারেজ পার হয়েছি রাত্রের বেলা এবার দিনের বেলায় ফারাক্কা ব্যারেজ দেখার সুযোগ হয়েছে। ফারাক্কা ব্যারেজ শুরু হলে উর্মী গোটা জানালা দখল করে বসে আছে। এবার আমাকে নিজে তারপাশে জায়গা দিয়ে ভিডিও করছে। বিশাল নদীতে বাঁধের উজালে পানিতে টইটুম্বুর কি দুর্দান্ত দৃশ্যটা লাগছে, অসাধারণ। কিছু কিছু গেট খোলা আছে, কিছু কিছু বন্ধ। সুন্দর দৃশ্য অসাধারণ লাগলো দিনের বেলায় এই প্রথমবার আমি ফারাক্কা ব্যারেজ পার করলাম। অনেক সময় লাগলো প্রায় ১০মিনিট টাইম লাগলো এই পুরো ব্যারেজটা পার করতে। বাংলাদেশ আর ইন্ডিয়ার যেটা নিয়ে তর্ক-বিতর্ক লেগেই থাকে, ঝামেলা লেগেই থাকে। সেই ফারাক্কা ব্যারেজ। এর অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে আমার ডান কাঁধে মাথা রেখে উর্মী ঘুমিয়ে পড়ে। ঘুম ভেঙে যাবে বলে আমিও ওর মাথাটা আমার কাঁধ থেকে সরালাম না।
রেললাইনের ধারে সারি সারি আম আর লিচুর বাগান আমের বাগান লিচুর বাগান মানেই বুঝতে পারছেন কোথায় এসে গেছি আমরা মালদা ঘুরে গেছি প্রায় দেখুন কত লিচুর বাগান দেখুন অজস্র লিচু গাছ আম গাছ একদম সারি সারি। এসে পৌঁছলাম মালদা স্টেশনে এখানে আমাদের খাবারের অর্ডার দেওয়া আছে। দেখি খাবারটা আসুক। তারপরে লাঞ্চটা করব। প্রচন্ড ক্ষুধা লেগেছে। মালদা স্টেশনে ১০ মিনিটের মতো দাঁড়াবে ট্রেন। দাদা ও বোউদি খাবারের জন্য উদগ্রিব হয়ে বসে আছে। আমাদের খাবারও এসে গেছে। আজকের লাঞ্চ হচ্ছে চিকেন বিরিয়ানি সঙ্গে সালাত প্রতি প্যাকেট ১৬০ রুপি।
ট্রেন চলছে দ্রুত গতিতে আমরাও কিন্তু আমাদের গন্তব্যের খুব কাছাকাছি চলে এসছি। পড়ন্ত বিকেলের হলুদ বরণ রঙ আস্তে আস্তে ছড়িয়ে পড়ছে চারিদিকে। সারা দিনের চঞ্চলতা ক্রমান্বয়ে ঝিমিয়ে পড়ছে।
উর্মী এবার স্বজ্ঞানে, স্বইচ্ছায় আমার কাঁধে মাথা রেখে বলতে শুরু করলো- আমি জানি আজ থেকে সব উন্মুক্ত বাতাসের প্রবাহ বন্ধ হয়ে যাবে। এবার আমাদের বাড়ি ফেরার পালা। আমরাও ফিরে যাবো আপন ঠিকানায়। তারপর জীবনের বৈরী বাতাস আবদ্ধ করে রাখবে চার দেয়ালের ভেতরে। মুক্ত বিহঙ্গের মতো খোলা আকাশের বুকে উড়ে বেড়ানোর এ কয়েকটা দিনের কিছু মোহণীয় স্মৃতি সারা জীবন শুধু তাড়িয়ে আমাকে। এখন শুধু একটি ভাবনাই আমাকে বিষিয়ে তুলছে যে, কেন বেড়াতে এলাম কেরালায়? আর কেনইবা দেখা হলো তোমাদের সাথে? হয়তো অন্য জায়গায়, অন্য কোথাও গেলে স্মৃতিটাও অন্যরকম হতো। কথাগুলো বলতে বলতে উর্মীর দু’চোখ দিয়ে অঝোরে পানি ঝরছে, সে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে।
হঠাৎ আমার বুকের ভিতরটা কেমন ফাঁকা হয়ে গেল, একটা অজানা আতঙ্কে বুকটা কেঁপে উঠল, মেয়েটা সত্যি ভেঙে পড়েছে। উর্মী? কি হলো তোমার? কি এসব আবোল-তাবোল বকছো, বলোতো? তুমি পাগল হয়ে গেলে নাকি? এইতো সামনে একটা লম্বা ছুটি, এবারে পূঁজোয় না হয় সোজা চলে আসবো তোমাদের শীলচরে। এ নিয়ে এতো মন খারাপ করার কি আছে বাবা, বুঝি না।
আজ অনেক দূর পথের যাত্রী সে, নিঃশব্দে জীবনের ইতিহাস শুনছে মনে মনে। গল্পের শুরুটা কোথায় তাও তার জানা নেই। অদৃশ্য এক শক্তির কঠোর নিষ্পেষণ তছনছ করছে দেহ মন। মাকড়সার জালে আটকে পড়া, মাছির মতো কেবলই ছটফট করছে। অমাবস্যার অন্ধকার যেমন শুকতারাকে কতো প্রশ্ন করছেÑ কিন্তু উত্তর তার জানা নেই। ভোরের নিষ্পাপ শিশিরবিন্দু বৃক্ষরাজির কোমল কচি পাতাগুলো একই প্রশ্ন করে। উত্তর কারও জানা নেই।
সামনেই হচ্ছে এনজিবি স্টেশন। সমস্ত যাত্রী লাগেজপত্র নিয়ে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে আর আমার লাগেজ এখনও পড়ে আছে। সবাই সিট ছেড়ে উঠে পড়েছে কিন্তু উর্মী কোনভাবেই আমার হাত ছাড়ছে না। তার দু’চোখে ফারাক্কার সমস্ত জল এসে প্লান হয়ে ভেসে যাচ্ছে। বোউদিও দাড়িয়ে আমার হাত ধরে চোখের জল মুছতে মুছতে বলে ভাই অনেক জ্বালিয়েছি তোমাদের, পারলে ক্ষমা করো। আমি সত্যি পাথর হয়ে গেছি, না উর্মী, না বোউদি কাউকেও কিছু বলতে পারলাম না। ট্রেন ছেড়ে দিচ্ছে বলে নিজের হাতটাকে উর্মীর হাত থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে দ্রæত ট্রেন থেকে নেমে পড়লাম। গোধুলির আবছা আলো অন্ধকারে দৃষ্টির সীমানা যতোদূর আমি তাকিয়ে আছি উর্মীর হাতটা শুধু অবিরাম নড়ছে বিদায় কাক্কু, বিদায়।
কিছু কিছু বিদায় মুখে বলা যায় না, চোখের ভাষাতেই যেন সব শেষ হয়ে যায়। কেউ কাছে থেকেও যেন বহু দূরে চলে যায় স্মৃতি কেবলি নীরবে স্বাক্ষী রয়। না-বলা অনেক কথা কখনো হয়না বলা অভিমানে জমে থাকে বুকের কোণে।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now