বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
প্রকৃতির আপন দেশ কেরালা’-২৫
মাজহারুল মোর্শেদ
কন্যাকুমারী (Kanyakumari)
কন্যাকুমারী ভারতবর্ষের সর্ব দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর, আরব সাগর ও ভারত মহাসাগরের মোহনায় অবস্থিত। এটি জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র ও হিন্দু ধমর্অবলম্বিদের তীর্থস্থান। কোভালাম (Kovalam) থেকে কন্যাকুমারীর (Kanyakumari) দূরত্ব প্রায় ৭৭কিলোমিটার। সড়কপথে গাড়িতে যেতে সময় লাগে দেড় থেকে দু’ঘণ্টা। আমাদের সাথে রবীন আছে তার গাড়ি নিয়ে কাজেই রোড জার্নির বিষয়ে কোন ভাবনা নেই। ভারকালা থেকে সকাল ৮টার দিকে রওনা দিয়ে ছোট ছোট পাহাড় আর সারি সারি নারকোল গাছের অপূর্ব শোভাময় দৃশ্য দেখতে দেখতে যখন কন্যাকুমারী পৌঁছে গেলাম তখন ঘড়ির কাঁটা প্রায় ১০টা ছুঁই ছুঁই করছে। মাইক্রোবাস জার্নিতে কারও কারও মানসিক অশান্তি ও পিড়া থাকে যা তার বমি বমি ভাবটাকে ভেতরে থেকে জাগিয়ে তোলে। অনেক পূর্ণবয়স্ক মানুষও কোন কোন সময় বমি করে ফেলে। বোউদির ক্ষেত্রে এমনটি না হলেও তিনি যে বেশ ক্লান্ত হয়ে পড়েন সেটা তার মুখ দেখলেই টের পাওয়া যায়। তাই মাইক্রোবাস জার্নির ১ম শর্ত হলো গন্তব্যে পৌছানোর পর তাকে ঘন্টা খানেক রেস্ট দিতে হবে। আমরাও তাই করতে বাধ্য। গতরাতে অর্ণব অনলাইনে খুঁজে খুঁজে কন্যাকুমারীর সমুদ্র সৈকতে (কধহুধশঁসধৎর ঝবধ নবধপয) একটি মনের মতো হোটেল খুঁজে পেয়েছে ‘সান ওয়ার্ল্ড সি-বিচ’(Kanyakumari Sea beach). গুগোলের সাহায্যে কন্যাকুমারী সৈকতে হোটেল ‘সান ওয়ার্ল্ড সি-বিচ. (Sun World Sea beach). খুঁজে পেতে সমস্যা হয়নি। আমরা হোটেলে চেকিং করে রুমে প্রবেশ করলাম। পথের ক্লান্তি ভুলে হঠাৎ মনটা নেচে উঠলো এক অপরিসীম আনন্দে। সৌভাগ্যক্রমে ঠিক আমার রুমটায় একটা বড়সড় বেলকনি মিলে গেছে। বেলকোনিতে দাঁড়িয়ে দেখি সমুদ্রের কি অপরূপ সৌন্দর্য ফুটে উঠেছে। সেখানে ব্যাগপত্র রেখে, একটু ফ্রেশ হয়ে দীর্ঘতম ভ্রমণের ধকল কাটিয়ে নিজেকে প্রস্তুত করে নিলাম। কন্যাকুমারী বঙ্গোপসাগর, আরব সাগর আর ভারত মহাসাগরের মহামিলনে তিন রঙের রঙ্গবতী ঢেউয়ের খেলা, এক রুদ্ধশ্বাস রোমাঞ্চ থাকে। তাই রোমাঞ্চিত হওয়ার লোভ পেয়ে বসলো মনের মধ্যে।
মেয়েদের ভেতরে ভেতরে সবসময় একটা কৌতুহল কাজ করে। নতুন কোন জায়গায় গেলে সেই জায়গার প্রতিটি জিনিস তার দৃষ্টিতে আসা চাই। স্বভাব সুলভ আচরণের নিয়মতান্ত্রিক অভ্যাসে ঠিক একমিনিটের মাথায় উর্মী এসে হাজির আমাদের রুমে। বেলকনি থেকে দাঁড়িয়ে সমুদ্র দেখে বিশ্ময়ে চিৎকার দিয়ে উঠলো। হায় ভগবান! কি অপরূপ সুন্দর লাগছে। কাক্কু দেখ দেখ, কতোগুলো গাঙচিল উড়ছে। কাক্কু চলো না সবাই, আগে একটু ঘুরে আসি।
রুমে যেয়ে হাত-মুখ ধুয়ে একটু ফ্রেস হও আগে, তারপর না হয় চিন্তা করে দেখা যাবে কি করা যায়।
আমার ফ্রেস হওয়া লাগবে না, তোমরাই তাড়াতাড়ি ফ্রেস হও। আমরা এক্ষুনি বেড়িয়ে পড়বো।
আচ্ছা কাক্কু, তোমাদের ভাগ্য এতো ভালো হয় কেমন করে? বারবার বেলকোনির রুমগুলো শুধু তোমরাই পাও।
শোন, তোমার ভগবান খুব ভালো করেই জানে এই বুড়ো-থুড়ো মানুষদের জন্য বেলকোনির কোন দরকার নেই। তাই হয়তো ভগবান তোমাদের নামটা বারবার কেটে দেয়।
আমি বুড়ো আর তোমরা কী?
আরে বাবা, তুমি কেন তা হতে যাবে। তবে তুমি যেহেতু বুড়ো মা-বাবার সাথে এ্যাড হয়ে গেছো তাই ভগবানও তোমাকে সে দলেই রেখে দিয়েছে।
না আমি সেটা মানি না। আমি এখন থেকে এই বেডে থাকবো। অর্ণব কাক্কু যাবে বাবার সাথে। বুড়োয় বুড়োয় সারারাত গল্প-গুজবে ডুবে থাকবে।
এবার অর্ণব একলাফ দিয়ে বিছানা ছেড়ে উঠে বলে-এই মে, তুমি আমাকে বুড়ো বললে? জানো আমার বয়স কতো?
হুম-জানিতো, গতজনমে তুমি যে আমারই ছেলে ছিলে, সেটা ভুলে গেছো?
হা হা হা-তুমি যাই বলো বন্ধু, এই বুড়ির সাথে কথায় পেরে ওঠা অসম্ভব।
আমি বললাম- এই উর্মী রুমে যাও, তাড়াতাড়ি ফ্রেস হয়ে বেড়িয়ে আসো। আমরা বাইরে যাবো।
বাইরে বেশ গরম পড়েছে। কন্যাকুমারী ভ্রমনের উপযুক্ত সময় নভেম্বর থেকে ফেব্রু য়ারি। এ সময় তবুও এখানে খুব গরম আর রোদেও তাপটাও প্রচণ্ড। তাই আমরা হালকা সূতি পোশাক, টুপি, সানগ্লাস সাথে নিলাম। এবার আমাদের পুরোটিম বেরিয়েছে অর্থাৎ দাদা-বোউদি আমাদের টিমের সিনিয়ার সদস্য। আমরা হালকা চা-নাস্তা সেরে বেরিয়ে পড়লাম কন্যাকুমারী সমুদ্র সৈকতে। উপেন দা ও বোউদির খুব ইচ্ছে আমরা প্রথমে ‘স্বামী বিবেকানন্দ রক’ দেখতে যাই। তাই হলো আমরা যেহেতু দেখার জন্যই কন্যাকুমারী এসেছি তো কোনটা আগে কোনটা পরে সেটা কোন ব্যাপার নয়।
ভ্রমণ ডায়রির পাতায় যখন কন্যাকুমারীর গল্প লিখতে শুরু করেছি তখন মনের মধ্যে বারবার ভেসে উঠছে বীর সন্ন্যাসীর স্বামী বিবেকানন্দ আর প্রাচীন তামিল মহাকবি থিরুভালুভার (Thiruvalluvar) এর কথা।
‘স্বামী বিবেকানন্দ রক মেমোরিয়াল’ যদিও যদিও এই দূরত্বটা মাত্র ৫০০মিটার কিন্ত সাগরের মাঝে উথাল পাথাল ঢেউ লঞ্চ বা ফেরি ছাড়া যাওয়ার কোন উপায় নেই। তাই যে জায়গা থেকে ফেরি সার্ভিস চলাচল করে জেটি বা ফেরি ঘাট সেখান পযর্šÍ হেঁটে যেতে হচ্ছে আমাদের। কিন্ত একি! গাননে শতশত দোকান রকমারী পণ্যের পশরা সাজিয়ে বসে আসে। নারকেলের ছোবলা দিয়ে বাবুঁই পাখির বাসা বানিয়েছে তারা কি অপূর্ব কারুকার্য! খাবার থেকে শুরু করে প্রসাধনি পর্যন্ত এমন কোন জিনিস নেই যা এখানে পাওয়া যায় না। আরও একটু সামনে যেতেই দেখি টানেলের মতো সরু পথ এর পুরোটাই কেরালার বিভিন্ন ঐতিহাসিক নিদর্শণের তৈল চিত্র দিয়ে সাজানো হয়েছে। এসব দেখতে দেখতে আমরা চলে এলাম জেটি বা ফেরি ঘাটে। কিন্তু এ কি দেখছি আমি! এখানে তো লোকে কোকারণ্য অনেকক্ষণ দাঁড়াতে হবে লাইনে সাধারণ একটা টিকিট ১০০ রুপি এতে বিশাল লম্বা লাইন, আজকে শনিবার বলে আরো বেশি ভিড়। পম্পুহার শিপিং কর্পোরেশন লিমিটেড এর এ গেট লাইনে চরম বিশৃঙ্খলা রয়েছে লাইন কেউ মেইনটেইন করছে না ডাবল লাইন তো হয়েই আছে। স্পেশাল টিকিট ৩০০ রুপি এখানে আবার লাইনটা দেখতে ছোট তাই আমরা ৩০০ রুপি দিয়ে টিকিট করে স্পেশাল লাইনে দাঁড়িয়ে গেলাম। যেহেতু আমাদের হাতে সময় খুব কম। অনলাইনে টিকিট করে নিলে সরাসরি একদম ভেতরে চলে যেতে পারতাম। কিন্তু এই তথ্যটা আমাদের কাছে ছিলো না এখানে এসে সেটা জানতে পারলাম।
আমাদের টিকিট কাটার দায়িত্বটা বরাবরই রবীন পালন করে থাকে। এখানে এতোটা লম্বা লাইন পড়ে গেছে যে বিবেকানন্দ রগ যাওয়ার আগেই মনটা ভেঙে গেলো। প্রথম ফেরি ছাড়া হয় সকাল ৮টায় তারপর সরাদিন চলতেই থাকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত। যেহেতু অঢেল সময় আমাদের হাতে নেই তাই আমরা স্পেশাল লাইনে জনপ্রতি ৩০০ রুপি দিয়ে দ্রুত টিকিট কেটে দাঁড়িয়ে গেলাম লাইনে। এখানে মিনিট পাঁচেকের মধ্যে আমরা পৌছে গেলাম ফেরিতে। তবে ফেরিতে ওঠার আগে আমাদে কে লাইফ জ্যাকেট পরিয়ে দিলো। ফেরিটি এখনই ছাড়া হবে। সিটিং অ্যারেঞ্জমেন্ট একদিকে ছয় অন্যদিকে ছয়। যে যেখানে পারবে সেখানে বসতে পারবে কোন সিট নম্বর নেই। জোয়ার ভাটার কারণে আগে পেছনে সময় হতে পারে। আমি বসে পড়েছি জানালার কাছে। এই একটা কারণে বাইরের ভিউটাকে সুন্দরভাবে দেখতে পরি। এই ঘাট থেকে বিবেকানন্দ রক মেমোরিয়ালের দূরত্ব খুবই কম। খুবই বেশি সময় লাগে না, মাত্র মিনিট দশেকের মধ্যেই গন্তব্যে পৌছানো যায়। অবশেষে এসে পৌঁছে গেলাম বিবেকানন্দ রক মেমোরিয়ালে। আমরা ফেরি থেকে নিচে নেমে দেখলাম এখানে প্রচন্ড হাওয়া, রোদের তাপও কম নয়। বাতাস আছে বলে গরমের প্রভাব তেমন নেই।
কিন্ত টিকিট কাটার পর্ব এখনো শেষ হয়ে যায়নি ভেতরে প্রবেশের জন্য আবারও জনপ্রতি ৩০ রুপি দিয়ে টিকিট করতে হবে। ওই স্পেশাল টিকিটের কিন্তু আর কোন মূল্য নেই এখানে সেটা কাজ করবে না এখানে আপনাকে আলাদা করে টিকিট করতেই হবে। পাশে যাত্রিদের বসার জন্য সুন্দর একটা হলরুম রয়েছে। জায়গাটা খুবই সুন্দর এক কথায় অসাধারণ।
চারিপাশে সমুদ্র মাঝখানে একটা পাথর এটাকে ‘বিবেকানন্দ রগ’ বলা হয়। এখানে জুতো রাখার সুন্দর ব্যবস্থা রয়েছে তাই জুতো রেখে ওপরে যেতে হবে। জনশ্রুতি আছে যে, স্বামী-বিবেকানন্দ এখানে এসে, এই পাথরের উপরে বসে ধ্যান করেছিল তিনদিন। আর অবাক করার মতো ব্যাপার হলো এটাই যে, উনি যখন এখানে এসেছিলেন তখনতো কোন ফেরির ব্যবস্থা ছিলো না। তাহলে কি তিনি সাঁতার দিয়ে এখানে এসেছিলেন? হয়তো তাই হবে। এখন যেমন চারিদিকে সব জাকজমক অবস্থা তখন এগুলো কিছুই ছিলো না। শুধু এই পাথরটাই ছিলো পরে এসব বানানো হয়েছে। বিশাল লম্বা লাইন এখানেও, সবাই দাঁড়িয়ে আছে। কাউন্টারে জুতো রাখে আমরাও দাঁড়িয়ে গেলাম। বিবেকানন্দ মন্ডপম ভেতরে অপূর্ব সুন্দর বিবেকানন্দর মূর্তি রয়েছে খুব সুন্দর পাথরের কাজ তবে ভেতরে ছবি তোলা নিষিদ্ধ। রক মেমোরিয়ালে’র ভেতরটা এতোটাই সুন্দর, অনেক সুন্দও আর এতোটাই মনোমুগ্ধকর যে বাইরে বের হওয়ার কথা ভুলেই গিয়েছি। দূর থেকে দেখে মনে হয় জায়গাটা খুব ছোট। কিন্তু কাছে না আসলে বিশ্বাসই হবে না যে, জায়গাটা আসলে কতো বড়।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now