বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

প্রকৃতির আপন দেশ কেরালা’-২৩

"ভ্রমণ কাহিনী" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান মাজহারুল মোর্শেদ (০ পয়েন্ট)

X প্রকৃতির আপন দেশ কেরালা’-২৩ মাজহারুল মোর্শেদ কোভালাম সৈকত ভারকালা (Varkala) থেকে কোভালাম সৈকত (Kovalam Beach)-এর দূরত্ব প্রায় ৫৩ কিলোমিটার। সড়কপথে গাড়িতে যেতে সময় লাগে সাধারণত এক থেকে দেড় ঘণ্টা। দূরত্বটা খুব বেশি নয় বলে ঠিমের অনেকে ঘুম থেকে উঠতেই চাচ্ছিলোনা। যদিও কোভালাম আমাদের অচেনা, অজানা একটি জায়গা তথাপি ইন্টারনেটের কল্যাণে সেটা আমাদের অনেক কাছের অনেক জানার মধ্যে চলে আসে। সকালের নাস্তা সেরে আমরা বেরিয়ে পড়লাম কোভালামের উদ্দেশ্যে। রাতে অনলাইনে ‘কোভালাম বিচ হাউস’ বুক করে রেখেছিলাম আর অনেকটা সৌভাগ্যক্রমে আমরা বিচের ধারেই পেয়ে গেছি। কোভালাম নামটা মেনলি মালায়ালাম শব্দ কোভাম থেকে এসছিল। কোভাম শব্দের অর্থ হলো নারকেল গাছ। হয়তো চারিপাশ নারকল গাছ দিয়ে ঘিরে থাকার কারণেই এর নামকরণ হয়েছিলো কোভালাম। এখানে থাকার জন্য পাঁচতারা হোটেল থেকে শুরু করে বাজেট অনুযায়ী হোটেল রয়েছে এবং পছন্দসই খাবার পাবার জন্য রেস্টুরেন্ট এবং কাফেটেরিয়া আছে, যেখানে কন্টিনেন্টাল ভ্যারাইটি থেকে দক্ষিণ ভারতীয় সুস্বাদু খাবার সবই পাওয়া যায়। ‘কোভালাম বিচ হাউস’ সাগরতীরে পাহাড়ের গা ঘেঁসে দাঁড়িয়ে আছে আর এজন্য আমাদেও সকলের খুব পছন্দ হয়েছে। বোউদি হোস্টেলে এসে সোজা চলে গেলেন রুমে। তারপর ধপাস করে একেবারে বিছানায় শুয়ে পড়লেন। তার ভাব ভঙ্গিমা দেখে মনে হলো তিনি মনে হয় আর এ বিছানা ছেড়ে উঠবেন কিনা সন্দেহ আছে। ঠিক তাই হলো আমরা সবাই বেলকনিতে এসে সমুদ্র দেখছি, গল্প করছি কিন্তু তার কোন সাড়া নেই। আমরা একেবারে সমুদ্রের ধারে ‘কোভালাম বিচ হাউসে’র ব্যালকোনিতে দাঁড়িয়ে আছি। এখান থেকে সমুদ্রের গর্জন শুনতে পাচ্ছি সামনের দিকে। বেশ জনস্রোত দেখতে পাচ্ছি, প্রচুর পর্যটক দূর-দূরান্ত থেকে এসেছেন। মনটা আর একদম সায় দিচ্ছে না। তাই আমরাও বেরিয়ে পড়লাম সৈকতের দিকে। উর্মী অনেক টানাটানি করলো তার মাকে কিন্তু তিনি বের হতে রাজি না। তাই দাদাও থেকে গেলো বোউদিও সাথে। কোভালাম সমুদ্রসৈকত পর্যটকদের কাছে সবচেয়ে আকর্ষণীয় কারণ সৈকতের ধার ঘেঁষেই তৈরি করা হয়েছে হোটেল-মোটেল, রকমারি জিনিসের দোকান আর রেস্তোরাঁ ছড়াছড়ি। প্রতিটি রেস্তোরার অ্যাকোরিয়ামে রয়েছে তাজা সামুদ্রিক মাছ, কাঁকড়া, ঝিনুক, অক্টোপাস যে যেভাবে খেতে চান, সেভাবেই খেতে পারেন। দূর থেকে ভেসে আসছে পর্তুগিজ গান ও নাচের শব্দ। একদিকে সাগরের উত্তাল জলে গা ভেজানো, অন্যদিকে আলো-ঝলমলে রাত। এরই ওপর দিয়ে ভেসে চলেছে ছোট-বড় স্পিটবোট ও হাউসবোট। শান্ত জলরাশি, নিরিবিলি জঙ্গলে ঘেরা তীর, অজস্র হাঁস ও বকের সারি নিঃসন্দেহে বেড়ানোর আনন্দকে করে তুলবে আরও মোহময়। কেরালায় সবচেয়ে অবাক বিষয় হল রাস্তার ধারের হোটেলগুলো। ছোট মাছের মচমচে ভাজি, বিভিন্ন ধরনের ভর্তা ও ঘন ডালের সঙ্গে আছে ভুনা গরম মাংস। ভারতের কোনো এলাকায় প্রকাশ্যে এভাবে গরুর ভুনা বিক্রি হচ্ছে এবং সবাই তা খাচ্ছে এটা অবাক করার মতো। স্থানীয় একজনের ভাষ্যমতে, কেরালার মানুষ কমিউনিস্ট ভাবধারার। এ ছাড়া এটা খ্রিস্টান অধ্যুষিত এলাকা। ভোজন রসিকদের জন্য কেরালা স্বর্গ। নদী-সমুদ্র থাকায় পাওয়া যায় অফুরন্ত মাছ, চিংড়ি, কাঁকড়া, ঝিনুক, ক্যাটেল ফিশ। গরম গরম ভাজা বা মসলা দিয়ে রান্নার যেভাবে খেতে চান সেভাবেই পেয়ে যাবেন। এ ছাড়া পাবেন সিরিয়া, ডাচ, পর্তুগিজ এবং ব্রিটিশ খাবার। খাবারে মসলা ও লাল মরিচের ব্যবহার খুব বেশি। কেরালাকে বলা হয় ‘মসলাপাতি’র আন্তানা। এই জায়গাটা এতোটাই দৃষ্টি নন্দন, এতোটা সুন্দর যে এখান থেকে যেতেই ইচ্ছে করছে না। পাশে একটা সুন্দও ও ঝকঝকে মসজিদ দেখা যাচ্ছে। কি সুন্দর করে রং করা কালারফুল বিচের উল্টো দিকে একটা রাস্তা ঢুকে এসছে তার সামনে একটা মন্দির। মসজিদ আর মন্দির দু’টোই পাশাপাশি, দেখে খুব ভালো লাগলো। এখানে একটা হোটেল রয়েছে ‘লাইবা হাউস’ আমাদের হোটেলের ঠিক অপজিটে। হোটেলটা দেখে উর্মী আমার দিকে তাকাচ্ছিলো, তার মানে এই যে, আমরা একটু সেখানে যেয়ে দেখে আসি। আমি ওর চোখ দেখে বুঝে ফেললাম। তাই আশ্বস্ত করে বললাম, সেটা ফেরার পথে চিন্তা করা যাবে। কি যে অপূর্ব সুন্দর লাগছে এ জায়গাটাকে, আহা! এখান থেকে দৃষ্টি কোন ভাবেই সরছে না। না সত্যি মনে হচ্ছে সময়টা খুব কম হয়েছে, এখানে দু তিন দিন থাকতে পারলে সবকিছুকে দুর্দান্ত উপভোগ করা যেতো। আকাশে এখনো হালকা মেঘ আর প্রচন্ড হাওয়া তাই রোদেও তাপটাও একটু কম। সৈকতে ঢেউয়ের আওয়াজ, ঠান্ডা আবহাওয়া সব মিলিয়ে পরিবেশটা চমৎকার, দারুণ লাগছে। আজ সকাল সকাল এখানে সমুদ্র উত্তাল, সাংঘাতিক উত্তাল। বিশাল আকাওে একএকটা ঢেউ এসে বেসামাল হয়ে আঁচড়ে পড়ছে কূলে। ঢেউয়েে উচ্চতা এতোটাই বেশি যে, অইেশ দূর থেকেও বুকের ভেতরটা কেমন দুরুদুরু করছে। একটু পরপর কোস্ট গার্ডের লোকেরা দাঁড়িয়ে আছে আর কাউকে সমুদ্রের ধারে যেতে দিচ্ছে না। কিন্তু উর্মীও নাছোর বান্দা, সমুদ্রের পারে বেড়াতে এসে পা ভেজাতে পারবো না সেটা কিভাবে মেনে নেয়া যায়? একটা ছোট আকারের ঢেউ আমাদের খুব কাছাকাছি এলে উর্মী এক দৌড় দিয়ে যেয়ে দু’হাতে পানি নিয়ে আবার ফিরে এলো আমার কাছে। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা দু’জন কোষ্টগার্ড অবাক হয়ে তার দিকে চেয়ে আছে। আমি বললাম এটা বয়সের দোষ। সুন্দর একটা এডভেঞ্চার করা যেতে পারে আজ তবে সেটা এখন আর হবে না, ভোরবেলা উঠতে হবে। পাঁচটা সাড়ে পাঁচটায় উঠে যদি চলে আসা যায় এখানে তাহলে মাছ ধরার নৌকাগুলে কে দেখায় যায়। তারা কিভাবে সমুদ্রে মাছ ধরে আর কিভাবে সেগুলো সংরক্ষণ করে। তাদেরকে অনুরোধ করে বললে তারা নাকি দু’একজনকে সঙ্গেও নেয় কিছুক্ষণের জন্য। আহা! আমাকে যদি একটু সঙ্গে নিতো! বেশিক্ষণ নয়, জাস্ট একটু সময় তাদের সাথে মাছ ধরার সঙ্গী হতাম। মাছ নাইবা পেলাম কিন্তু মাছ ধরার যে ইচ্ছে অন্তত সেটাতো পূর্ণতা পেতো! যাহোক বিচের পাশে এখানে ফুচকার দোকান রয়েছে। তার পাশাপাশি অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রও পাওয়া যাচ্ছে। যদি কেউ সমুদ্র স্নানের জামা কাপড় নিয়ে না আসে তো কোন সমস্য নেই, এখান থেকেই কিনে নেওয়া যায়। যতোই বেলা বাড়ছে আস্তে আস্তে পর্যটকদের ভিড়ও অনেক বাড়ছে। আজ ঢেউয়ের সাংঘাতিক তাণ্ডব দেখছি, সমুদ্র বেশ উত্তাল। মাঝে মাঝে এক-একটা বিশাল আকারের ঢেউ এসে আঁচড়ে পড়ছে তীরে। এমনভাবে আঁচড়ে পড়ছে ঠিক যেমন সদ্য বিধাব রমনী প্রিয়জন হারার ব্যথায় ব্যাকুল হয়ে তার সমাধির উপর উঁচড়ে পড়ে। আহা! বিশাল সমুদ্রের বুকে কিশের এতো হাহাকার? কোন সে না পাওয়ার বেদনা তাকে এমনভাবে উতলা করে? জানি না এর উত্তর কোথায়। আমি সমুদ্রের দিকে দু’হাত বাড়িয়ে বিস্তৃত দিগন্তের দিকে তাকিয়ে তার কষ্টটা বোঝার চেষ্টা করছি। নদীর কূল নাই কিনার নাইরে--- আমি কোন কূল হতে কোন কূলে যাবো কাহারে সুধাইরে------- ঢেউয়ের এমন আহাজারি, এখানে সেটা আজকের জন্য কিনা জানিনা কিন্তু ওরা আমাকে আর বেশিক্ষণ এখানে থাকতে দিলো না। আমাকে পাগল ভেবে একজন কোস্টগার্ড পিছন থেকে এসে আমার দু’বাহু ধরে বলে- ‘ভাই চলিয়ে, সায়ার বড়া খাতারনাগ হ্যায়’। ওরা আমাকে ধরে নিয়ে আসছে আর উর্মী মুখ ঢেকে খিলখিল করে হাসছে। আমি কোন কিছু বুঝে ওঠার আগেই উর্মী বললো- কাক্কু, কোস্টগার্ড তোমাকে কি বললো? হ্যাঁ- ওরা আমাকে পাগল ভেবেই ধরে নিয়েছে। প্রচন্ড রকমের ঢেউ আমরা সমুদ্রের তীর ঘেঁসে হাঁটছি, শুনলাম ওপাশে হাওয়াইবিচ আছে আবার সেখানে নাকি লাইট হাউসও আছে। কেরালার ‘হাওয়াই বিচে’র নাম অনেক শুনেছি আজকে ‘হাওয়াই বিচে’র নামটা শুনে হঠাৎ মনটা কেমন উসখুস করে উঠলো। তাই সবাইকে রাজি করেই ফেললাম। তাহলে চলো এবার যাওয়া যাক ‘হাওয়াই বিচ। এখান থেকে ‘হাওয়াই বিচ’ ১০০০ রুপিতে ভাড়া বোটও মেলে কিন্তু আজকে সমুদ্র উত্তাল আর ঢেউ বেশি বলে বোট চলছে না। আজকে সমুদ্র সাংঘাতিক উত্তাল লাইভগার্ডরা বাসি বাজিয়ে লোককে সতর্ক করছে এবং পানিতে নামতে দিচ্ছে না। সারিসারি করে বাধা স্পিডবোটগুলো রয়েছে কারও সমুদ্রে নামার অনুমতি নেই। তো কি আর করার এবার অটোযোগে যেতে হবে হাওয়াবীচের দিকে। হাওয়াই বিচ এখান থেকে নাকি খুব বেশি দূর নয়, এক দেড় কিলোমিটার এর মতো হবে। আর এ বিচের পাশেই নাকি একটা বিশাল সুদৃশ্য লাইট হাউস আছে। সেটা ওখানে গিয়েই জানা যাবে। আমরা একটু সামনে গিয়ে একটা অটো ভাড়া করে নিলাম ৫০০ রূপিতে। আমরা যে হাইওয়ের উপর দিয়ে যাচ্ছি এটা দিয়ে সোজা গেলে পৌঁছে যাওয়া যায় কন্যাকুমারী। অটোর ড্রাইভারের সাথে কথা বলতে বলতে জানতে পারলাম একটু দূরে নাকি একটা ম্যানগ্রোভ আইল্যান্ড আছে। আর শ’দুয়েক রুপি বাড়িয়ে দিলে অটো সেখানে আমাদের পৌছে দেবে। কিন্তু শৈলেন দা তাতে একবারেই রাজি হচ্ছিলেন না। তার কথা হলো, যেখানে যাওয়ার জন্য বেরিয়েছি সেখানেই যাওয়া উচিত, সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করলে বিপদ বাড়ে। মাঝপথে অন্য চিন্তা করা মানে বিপদের আশঙ্কা থেকে যায়। ম্যানগ্রোভ আইল্যান্ড মানেই সবুজ জলরাশি, ঠান্ডা বাতাস আর গলাডুবা সব গাছগাছালি তার ভেতর দিয়ে নৌকায় ভেসে বেড়ানো। সব মিলিয়ে দারুণ একটা শিহরণজাগা অনুভুতি এতে কোন সন্দেহ নেই। উর্মী হয়তো এতোক্ষণ ধরে সেটাই ভাবছিলো, হঠাৎ অটোরিক্সার ভেতরেই লাফদিয়ে উঠে বলে- শৈলেন কাক্কু তুমি একটা কথা বলবা না। এখানে আমি সবার ছোট, আমি যেটা চাইবো সেটাই তোমাদেরকে শুনতেই হবে। আমরা এখন প্রথমে যাচ্ছি ম্যানগ্রোভ আইল্যান্ডে। সেটা দেখে তারপর হাওয়াইবিচ, হারবার লাইট হাউস এগুলো দেখে ফিরবো। যাহোক উর্মীর কথাই পাস হলো। আমাদের থেকে নেবে অটোওয়ালা ৭০০ টাকা নেবে এবং আমাদেরকে আইল্যান্ডে পৌছে দেবে।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ৮ জন


এ জাতীয় গল্প

→ প্রকৃতির আপন দেশ কেরালা’-২৩

গল্পটির রেটিং দিনঃ-
☆ ☆ ☆ ☆ ☆

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now