বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
প্রকৃতির আপন দেশ কেরালা’-২০
মাজহারুল মোর্শেদ
ভেম্বনাদ লেক (Vembanad Lake)
ভেম্বনাদ লেক দক্ষিণে সর্বাধিক ১৯৬ কিলোমিটার এবং প্রস্থে সর্বাধিক ২৯ কিলোমিটার দৈর্ঘে বিস্তৃত। এরই মাঝে ছোট ছোট দ্বীপের মতো গ্রামগুলির প্রতিটিই জলপরিবহনের মাধ্যমে একে অপরের সাথে যুক্ত। আমরা গতরাতে অনলাইনে দু’কামরা বিশিষ্ট মেডিয়াম আকারের একটা হাউসবোট ভাড়া করে নিয়েছিলাম দশ হাজার রুপিতে। এখন আমাদের হাউজবোট ডক বা কায়িপুরাম (Kayippuram) জেটি যেতে হবে। সেখানে সব ধরনের বোট থাকে।
হাউসবোটে থাকা খাওয়া ঘুরে বেড়ানো সব দায়-দ্বায়িত্ব তাদের। হাউসবোটে দু’জন লোক আছে একজন চালক ও একজন রান্নাসহ যাবতীয় দেখা শোনার কাজে নিয়োজিত। হাউসবোটে রুমে বেশ সৈখিন একটা ভাব আছে, ঝকঝকে-তকতকে রুমের ভেতর ঢুকতে হলে জুতো খুলে যেতে হয়। প্রতিটি রুমে ড্রেসিং টেবিল রয়েছে আর ওয়াসরুমে বেশিন ও শাওয়ার রয়েছে। আর কি চাই হ্যাঁ বাইরে বসার জায়গায় টিভি আছে দু’দিকে দুখানা সোফাও রয়েছে। বেশ বড়সড় একটা ডাইনিং টেবিল ও চালকের আসনের পাশে একটা ডেক সেটও দেখা যাচ্ছে। তিনি বোধয় মন ভালো করার জন্য মাঝে মাঝে গানও শোনেন। আমার বোটের ভেতর ঢুকেই বেশ একটা অন্যরকম অনুভূতি, অন্যরকম আবেশ তৈরি হলো।
যে হাউসবোট যতো ভালো সার্ভিস দিতে পারে সেটা তাদের সুনাম। কারণ একজন পর্যটক থেকে সুনাম বিক্রি করে তারা পরবর্তী পর্যটকদের আকর্ষণ করে থাকে। এখানে কোন হাউসবোর্ড ফাঁকা নেই। আর যতোটুকু জানতে পারলাম হাউসবোটের ভাড়াটা সিজনের সঙ্গে ওঠানামা করে। আমরা বর্ষার শুরুতেই এখানে এসেছি আর এটাই আমি উপযুক্ত সময় মনে করছি। আবার অন্যরা বর্ষাও শেষে এসেও উপযুক্ত সময় মনে করে। আসলে জানি না কোনটা কেরালা ভ্রমণের উপযুক্ত সময়। তবে যাকে যেভাবে প্রকৃতি আকর্ষণ করে আমার মনে হয় তার জন্য সেটাই উপযুক্ত সময়।
সুতরাং পর্যটকদের ভিড় যখন বেশি হয় ভাড়াও তেমনিই একটু বেশি হয়। আজকের দিনটা খুব সুন্দর লাগছে হালকা বাতাস আর সেই সঙ্গে সূর্যের রোদেরও তেমন জোর নেই বেশ অন্যরকম একটা অনুভুতি মনের মাঝে দোলা দিচ্ছে। হাউসবোটে একজন মানুষের দৈনন্দিন জীবনে যা যা প্রয়োজন হয় তার সবটুকু রয়েছে। অধিকাংশ পর্যটক রাত্রে এখানে থাকে, পানিতে ভেসে ভেসে জোছনা বিলাস করে, আর সে জন্যই এতো কিছু ব্যবস্থা করা। রাত্রি যাপনের কথা মনে করে হয়তো এমন বিলাশ বহুল ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। একজন পর্যটকের জন্য আধুনিক সকল সুযোগ-সুবিধা ও সময় উপযোগি ব্যবহার্য হাউসবোটগুলো রাতের আঁধারে সবার মন কেড়ে নেয়।
আমাদের টার্গেট হলো ভেম্বানাদ লেগের ‘পাথিরামাল দ্বীপ’ থেকে সূর্যাস্ত দেখা। পাথিরামাল দ্বীপ হলো ভেম্বানাদ হ্রদের মাঝে অবস্থিত ১০ একরের একটি ছোট ও সুন্দর দ্বীপ। এটি বিরল প্রজাতির পাখি ও প্রকৃতির জন্য বিখ্যাত। দ্বীপটির (পাথিরমানাল দ্বীপ) নাম অর্থ "রাতের বালুচর"। দ্বীপের পরিচিতি ও আকর্ষণএটি স্থানীয় ও পরিযায়ী মিলিয়ে প্রায় ১৪০টির বেশি পাখির আবাসস্থল। পাখি প্রেমী ও প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য এটি একটি দারুণ জায়গা। আলেপ্পি থেকে মোটরবোটে ১.৫ ঘণ্টা।
আজকের পুরো গল্পটাই হচ্ছে কেরালার ভেম্বনাদ লেককে ঘিরে। এখন বাজে বেলা সাড়ে তিনটার মতো। আমরা ভেম্বানাথ লেকে ‘পাথিরামাল দ্বীপে’ সূর্যাস্ত দেখার উদ্দেশ্যে চলছি। বোট কতৃপক্ষ খাওয়ার টেবিলে আমাদের নাস্তা দিয়ে দিলো। কারণ আমাদের ক্ষুধার্ত মুখের দিকে তাকিয়ে এই মনস্তাত্মিক ব্যবস্থা। মনে মনে তাদের ধন্যবাদ জানালাম এ কারণে যে, আমাদের খাওয়াটা ভালো হয়নি। নাস্তার প্লেটে লুচি ছোলার ডাল সেই সঙ্গে ডিম সেদ্ধ কাজু বরফি চা কফি তো রয়েছে। যারা লুচি খাবে না তাদের জন্য রয়েছে রুটি ওমলেট আর ব্রেড জ্যাম।
বোট ভেসে চলছে ভেম্বনাদ লেকের হালকা ¯্রােতে। অজস্র খাল, শান্ত জলরাশি, নিরিবিলি জঙ্গলে ঘেরা লেকের দু’ধার, অজস্র হাঁস ও বকের সারি নিঃসন্দেহে বেড়ানোর আনন্দকে করে তুলে আরও মোহময়। এরই ওপর দিয়ে ভেসে চলেছে ছোট-বড় হাউসবোটগুলো। এই ভেম্বানাদ লেক শুধু ছবির মতোই নয়, ছবির চেয়েও সুন্দর। অদেখা প্রকৃতির রঙ-রূপ, লেকের সাদা ঢেউয়ে যেন গোটা প্রকৃতি শুভ্রতায় মাখা। আমার জীবন খাতার প্রতিটি পাতায় এমন সুন্দরতম মুহূর্ত স্মৃতিপটে আঁকা থাকবে আজীবন।
হাউসবোটের ভেতরে রান্না করা তাজা খাবারের গন্ধ এবং এখানকার চমৎকার পরিবেশ, স্থানীয়দের আয়োজনে ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতার রোমাঞ্চকর দৃশ্য সব মিলিয়ে প্রকৃতি যেন কেরালাকে নিজ হাতে সাজিয়ে দিয়েছে। আবার এখানকার মানুষও প্রকৃতির রঙ রূপকে বুকে আগলে রেখে তা অনন্য উপায়ে তুলে ধরেছে বিশ্ব দরবারে। যে কারণে কেরালায় পা রাখলে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মায়াবী ছাতছানি এড়িয়ে যাওয়া যায় না কিছুতেই। আর সেই অদৃশ্য চুম্বকীয় টানেই কেরালার মসৃণ রাজপথ আর শহর-বন্দর মাড়িয়ে আমরাও পৌছে যাই ভেম্বনাদ লেকে।
প্রথম দর্শনেই মন কেড়ে নেয়। কী এক নয়নাভিরাম দৃশ্য! শান্ত জলের স্নিগ্ধ পরিবেশ, চারিদিকে সবুজের সমারোহ সারিসারি জলযান আর আমরা ভেসে বেড়াচ্ছি দিগন্ত বিস্তৃত জলরাশির উপরে। যেদিকে তাকাই সাদা ঢেউয়ে শুধু রূপালি আলোর ঝলকানি। হাউসবোটের মাস্তুলে যদিও যাওয়ার কোন অনুমতি নেই তবে বোটচালককে অনেকবার অনুরোধ করে অতি স্বল্প সময়ের জন্য একাই যাওয়ার অনুমতি মেলে। বিশাল জলরাশির মাঝে ছোট্ট এ বোটই আমাদের বেঁচে থাকার অবলম্বন আমি তার সামনে দু’হাত প্রসারিত করে পাখির মতো উড়ছি। নিজেকে টাইটানিক সিনেমার নায়ক লিওনার্দো দা ক্যাপ্রিয় এর মতো মনে হচ্ছে। তবে পার্থক্য হলো তার সাথে ছিলো কেডস উনসলেস আর আমি একা। এটা সত্যি যেন একটা স্বর্গীয় অনুভুতি। আকাশের নীল রঙ, গাছে সবুজ পাতার ফাঁকে উঁকি দিচ্ছে নাম নাজানা কতো রকমের রঙ-বেরঙের পাখি। আমাদের নৌকাবিহার, কিংবা হাউসবোটে থাকা, একেবারেই অন্যরকম অনুভুতি।
সত্যিই খুব সুন্দর, মনোরম হাওয়া সুন্দর একটা পরিবেশ। এত সবুজ চারিদিকে প্রকৃতির এতো ভিন্ন ভিন্ন বৈচিত্র, যেভাবে সাজানো মানে কেরালা আমি যে এক্সপেক্টেশন নিযয় এসেছিলাম সেটাকেও ছাপিয়ে গেছে এখনো পর্যন্ত আমার দেখা সেরা জায়গা মুন্নার মানে কেরালা এতো সুন্দর, এতোটাই সুন্দর পাহাড়গুলো আর সারি সারি চা বাগান আহা কিন্তু প্রত্যেকটা জায়গা আমি শুধু মুন্নাকে বললে বাকি জায়গাগুলোকে ছোট করা হবে। চারিদিকের প্রকৃতি এতো সুন্দর হতে পারে সেটা এখানে না আসলে সত্যি বুঝতে পারতাম না। পৃথিবীতে হয়তো আরো অনেক ভালো ভালো জায়গা রয়েছে কিন্তু আমার কাছে আমি এরকমভাবে দেখিনি তাই এটাই অনেক বড় পাওয়া। কেরালা অনেক অনেক কিছু দিলো, দু’হাত ভরিয়ে দিলো। অসাধারণ! এতটা ভালোলাগা ভাবতেও পারিনি।
এখানে আসার পর বোউদিও আর কোন সমস্যা হয়নি। আর হলেও সেগুলো তিনি বোধয় নিজেই ডিল করতে পেরেছেন। কিন্তু উর্মী প্রথম থেকেই আমার খোঁজ রেখেছে আমি কোথায় যাচ্ছি, কি করছি সেটাও। শুধু আমার জন্য না ওটা সবার ক্ষেত্রেই করে চলেছে। তবে বোউদির মনটা একটু খারাপ, কি কারণে মন খারাপ সেটা আমরা জানি না। হঠাৎ আমাদের বোট একটা দ্বীপের মতো জায়গায় এসে দাঁড়ালো। বোট থেকে নেমে দেখি অপরূপ সুন্দর একটি জায়গা সারি সারি নারকেল গাছ আর তার সাথে ছোট খাট ঝোপ-ঝাড়ও আছে। সেখানে লোক বসতিও আছে যাদের একমাত্র যানবাহন হলো নৌকা। একটা ছোট্ট নৌকা থেকে কয়েকটা ছেলে মেয়ে বই খাতা হাতে নিয়ে নেমে যাচ্ছে। আর মাঝির জায়গায় যাকে দেখলাম সেও স্কুল পড়–য়া ছেলে বলেই মনে হলো। আমার আর বুঝতে বাকি রইলো না যে, এরা এভাবেই নৌকায় চড়ে স্কুলে যাতায়াত করে। তাছাড়া চারিদিকে থই থই পানি যাতায়াতের জন্য নৌকা ছাড়া কোন বিকল্প নেই। আমাদের সিলেটের হাওর অঞ্চলের মানুষেরা যেমন নৌকায় চড়ে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যায়। এটাই তাদের যাতায়াতের প্রধান বাহন। আমি মনে মনে ধরেই নিয়েছিলাম যে, এটাই হয়তো সেই ‘পাথিরামাল দ্বীপ’ যেখান থেকে সূর্যাস্ত দেখার জন্য আমরা অধীর হয়ে অপেক্ষা করছি। কিন্ত না এটা সেই দ্বীপ নয়,
যাহোক রবীন আমাদের একটু সামনে নিয়ে গেলো। যেখানে অনেকগুলো ছোট নৌকা (kayak) সারিবদ্ধভাবে সাজানো আছে কায়াকিং (kayaking) এর জন্য। উপেন দা এবং বোউদির জন্য একটি মোটা মোটি বড় নৌকা ঠিক করা হলো। আর আমাদের নৌকাগুলো সব ছোট ও একটু বেশি লম্বা। প্রতিটি নৌকা ৫০০ রূপি তবে দু’জন থেকে তিন জনও ওঠা যায়। আমরা যখন নৌকায় ওঠার জন্য লাইফ জ্যাকেট পরছি তাই দেখে বোউদি হনহন করে হাউস বোটের দিকে হাঁটতে শুরু করলো। বেচারা উপেন দাও এবার তার পিছনে পিছনে ছুটছে আর বলছে-এই শোন? তুমি নৌকায় চড়ে শুধু আমার পিছনে বসে থাকবে আর বৈঠাতো চালাব আমি। তোমার তাতে অসুবিধা কোথায়, বলো?
না তোমার বয়সতো নতুন করে গজিয়েছে, আঠারো ছুঁই ছুঁই করছে। তুমি যাও, আমাকে এসবের মধ্যে টানা-টানি করো না।
তো? কি আর করার আছে, আমরা নৌকায় উঠে পড়লাম। উর্মীকে দেখলাম হাতে একটা বৈঠা নিয়ে আমার পিছনে বসে পড়লো। ভাবখানা তার এমন যে, সে দেবী চৌধুরানী একাই এক’শ। বাওরের স্রোতের মতো শান্ত-স্থির ঢেউ, স্রোতের তেমন তাড়া নেই। তবে নৌকা যতোই সামনের দিকে এগুচ্ছে পানির প্রবাহ একটু একটু করে বাড়ছে। দিগন্ত বিস্তৃত জলরাশি তার উপর আমাদের ছোট্ট একটা নৌকা। আমরা ভেসে বেড়াচ্ছি ঠিক যেন হংস যুগলের মতো। মাথার ওপর নীল আকাশ আর বাহারী মেঘের আনাগোনা, দৃষ্টির সামনে খেলা করছে জোড়ায় জোড়ায় চিল। আকাশের মত বিস্তৃত করে আমরাও এগিয়ে যাচ্ছি সামনের দিকে। বৈঠা বাইতে বাইতে উর্মী এবার ক্লান্ত হয়ে বলে- আমরা কি আরও অনেক দূরে যাবো?
কেন নয়।
কিন্ত আমি যে আর পারছি না, বড় ক্লান্ত লাগছে নিজেকে।
এইতো আর একটু-ঐযে দূরে রূপোলি আলোর ঝলকানী, অন্তত সেখানে যাই। তারপর না হয় ফেরার উপায় খুঁজে বেড়াবো।
ওখানে নয়, অন্যদিকে যাই অপেক্ষমান কোন স্রোতের আহব্বানে, আমি অনেকদিন ধরে অপেক্ষা করছি যার জন্য। আমার স্বপ্ন পূরণের মিলন মেলায় আর কোন বাকি রাখতে চাই না। কিন্তু অতোদূর কি আমরা যেতে পারব?
কেন পারব না, এইতো দেখতে দেখতে এসে গেলো সেই মোহনীয় ক্ষণ।
বাহ! কি সুন্দর, কাক্কু ঐ দেখ কতোগুলো বালিহাস উড়ছে? তারা শুধু আপন মনে উড়ছে আর মাঝে মাঝে একে অপরের সাথে আনন্দ ভাগাভাগি করছে।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now