বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
প্রকৃতির আপন দেশ কেরালা’-২
মাজহারুল মোর্শেদ
এভাবে দেখতে দেখতে আর চলতে চলতে ওড়িশা পেরিয়ে এবার আমারা পৌছে গেলাম অন্ধ্রপ্রদেশের প্রথম স্টেশন পলাশায়। এখন বাজে এগারোটা। নিচে নামার কোন সুযোগ নেই। শুষ্ক নদীর উপর জড়াজীর্ণ ব্রিজ, পাহাড়ি উপত্যকা, অগোছালো কিছু ঝোপঝাড়, নিঃসঙ্গ একাকী বনস্পতি আর তারই মাঝে অজানা, অচেনা সুদীর্ঘ যাত্রা পথে দিবা রাত্রির লুকোচুরি খেলা। বিরতিহীনভাবে ছুটে চলছে আমাদের ট্রেন-
স্টেশন আসে, স্টেশন যায়-দৃষ্টি হারায় সীমানায়।
ক্লান্ত পথিক উদাস মনে অপলক চেয়ে থাকে
ওই দূর আকাশের নীলিমায়।
শুধ্ইু রয়ে যায় ঝাপসা-ময়লা আনন্দ বেদনার দৃশ্যমান কিছু স্মৃতি। এভাবে চলমান সময়ের হাত ধরে আলো আঁধারের লুকোচুরিতে কেটে যায় দিন-রাত।
আমার পাশের সিটে ঠিক ডানদিকে বসে ঝিমাচ্ছেন এক ভদ্রলোক, সাথে তার মধ্যবয়সী অর্ধাঙ্গিনী ও একটি সম্বাবনাময় যৌবনবতী কিশোরী। গতরাত থেকে আমি বেশ কৌতুহলভরে লক্ষ্য করেছি, রেলগাড়ির এলিয়ে দুলিয়ে চলার গতির সাথে তার ঘুমের কি গভীর প্রেম। শুধু খাওয়ার সময়টুকু বাদে কখনো তার চোখ দু’টোকে খোলা দেখিনি। রাতের নীরবতায় যখন সমস্ত প্রকৃতি ঘুমের নেশায় মগ্ন তখন তার নাকের ঘটঘটে ডাক যেন রেলগাড়ির ইঞ্জিনকেও হার মানায়। আমি শুধু আমার কথাই বলছি না, অর্ণবকেও দেখছি দু’হাতে কান চেপে ধরে সিপিং সিটে এপাশ-ওপাশ করতে।
আজকের দিনটা বেশ মনোরম আবহাওয়া, নয় গরম- নয় ঠাণ্ডা ঠিক দু’টোর মাঝামাঝি। তবুও ভদ্রলোকের মাথায় তার মধ্যবয়সী অর্ধাঙ্গিনী একটি মোটা রকমের পেপারসিট দিয়ে হৃদয়ের উজার করা ভালোবাসা মিশ্রিত আবেগে, দরদি হাতে বাতাস করছে। এর আগে নিতান্ত অনিচ্ছা সত্তে যে- দু’একবার চোখ যায়নি সেটা বললে নিজের বিবেককে ফাঁকি দেওয়া হবে। তবে শেষ বারের মতো চোখে চোখে পড়তেই নেহাত পরিচয়ের সূত্র ধরে দু’চারটা কথাও হয় ভদ্র মহিলার সাথে। পরিচয়ে জানতে পারলাম, তারা এসেছেন আসামের শীলচর থেকে। তার হাজবেণ্ড নাকি খাঁটি বাঙালি, চাকুরির সুবাদে গিয়েছিলেন শীলচরে এবং সেখানেই ঘর-বাড়ি বানিয়ে বিয়ে-সাদি করে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করছেন। ভদ্রলোক শিলিগুড়ি আকাশবানীর (রেডিও) তালিকাভুক্ত একজন শিল্পীও বটে। তবে তিনি যে সংস্কৃতি মনা মানুষ সেটা তার স্বভাব সুলভ আচরণে কিছুটা ছিটেফোঁটা চিহ্নও পাওয়া যায়। হয়তো সে কারণে বোউ-বাচ্চা নিয়ে এ লম্বা ভ্রমণে বের হয়েছেন। যাহোক হালকা শীতের মাঝেও অহেতুক পেপারসিট দিয়ে উঁপচে পড়া ভালোবাসায়, দরদি হাতের আদরমাখা বাতাস করার সেই প্রেমময় দৃশ্যটা আমাকে এতোটাই মুগ্ধ করেছিলো যে, আমি ঠোঁট কামড়ে ধরেও অট্ট হাসিটাকে চেঁপে রাখতে পারিনি। পাছে কিনা ভদ্র মহিলা ধরেই নেয় যে, আমি তার এহেন মধুময় আচরণে নির্লজ্যের মতো প্রতি হিংসাপরায়ণ হয়ে উঠছি। তাই অনেকটা নিরুপায় হয়েই অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়ে অহেতুক আমার জানালাটা খোলার চেষ্টা করছিলাম। কথায় বলেনা? ‘বিপদ যখন আসে তখন কুনো ব্যাঙেও হাসে’। আমার দশা তাই হলো-আমার অহেতুক জানালা খোলার ব্যর্থ চেষ্টাটি ট্রেন সুপারভাইজারের নজরকে ফাঁকি দিতে পারেনি, তাই সম্ভবত তিনি খুব দ্রæততার সঙ্গে আমার কাছে এসে জানালাটি অর্ধেক পরিমান খুলে দিয়ে চলে গেলেন। সঙ্গে সঙ্গে বাহিরের প্রচণ্ড বাতাসের ধাক্কায় আমার খাতাপত্র সব উড়ে গিয়ে গোটা কামড়ায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়লো। অর্ণব অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমার এ দু’দিনের নীরিহ যাত্রা পথে অসামান্য শ্রম ও সাধনা দ্বারা যে কষ্টের হস্তলিপি তৈরি হয়েছিলো তা মুহুর্তের মধ্যেই বাতাসে ছিন্ন-ভিন্ন হয়ে গেলো। অবশ্য এতে আমার ভীষণ কষ্ট হওয়ার কথা কিন্তু না, আমার কিছুই মনে হলো না। শুধু একটি ভাবনাই মাথার মধ্যে প্রচণ্ড ভাবে ঘুরপাক খাচ্ছে, আমি চাইলাম কি আর হলোটা কি? নিজেকে সামলাতে না পেরে হো হো করে হেসে উঠলাম। নিশ্চয়ই ভদ্র মহিলা আমাকে পাগল ভেবে ধরে নিয়েছে। আপাতত তিনি যাই ভাবে ভাবুন না কেন এ নিয়ে আমার কোন মাথা ব্যথা নেই। তবে চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা হস্তলিপির ছিন্ন-ভিন্ন কাগজগুলো না কুড়াতে পারলে সেটা আরোও কষ্টদায়ক হবে। আমি খুব মনযোগি হয়ে কাগজ কুড়াতে লেগে গেলাম। সম্ভবত আমার অসহায়ত্বের কথা ভেবে ভদ্র মহিলার সেই সম্বাবনাময়ী যৌবনবতী কিশোরী মেয়েটিও আমাকে সাহায্য করার নিমিত্তে কাগজ কুড়ানোর কাজে লেগে গেলো। প্রচণ্ড অনিচ্ছার সত্তে¡ও আমাকে বলতে হলো- আহা! থাকনা, এ কাজটা করা খুব কঠিন কিছু না, আমি নিজেই করতে পারবো।
নাছড়-বান্দা যুবতী ট্রেনের কামরায় দৌড়ো-দৌড়ি করে চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কাগজগুলো কুড়িয়ে এনে আমার হাতে দিলো। নিজের অজান্তেই আমার স্বভাবসুলভ আচরণের বহিঃপ্রকাশে বললাম-সাহায্য করার জন্য তোমাকে অশেষ ধন্যবাদ ।
প্রথম সংলাপে হঠাৎ কাউকে তুমি সম্বোধন করাটা নেহাত বোকামি, তবে মেয়েটি বয়সে অনেক ছোট বলে হয়তো আমার মুখ ফসকে তুমি শব্দটা বেরিয়ে গেছে।
কিন্তু এটাও সত্য যে, ভারতবর্ষে বাঙালিদের মাঝে সেটা মোটেও অস্বাভাবিক কিংবা অসম্মানের কিছু নয়। খুব আপনজন বলে- বোঝাতে তারা ছোট বড়ো সবার ক্ষেত্রেই ‘তুমি’ শব্দটা খুব স্বাভাবিকভাবে ব্যবহার করে থাকে।
সেই সম্বাবনাময় যৌবনবতী কিশোরী মেয়েটি তার ডাগর চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বললো- তোমাকেও ধন্যবাদ, তবে আর জানালা খোলো না কিন্তু।
আমি তার কথায় মনে মনে খুব লজ্জা পেলাম, তাই সুবোধ বালকের মতো নিজের অজান্তেই মাথা নেড়ে ইঙ্গিত করলাম ঠিক আছে, আর কখনো এমনটি হবে না। তবে যা কিছু ঘটে গেলো সেটার জন্য যে আমি একাই দায়ী নই, সেটা তোমাকে বোঝাই কিভাবে।
কিন্ত আমি সব পরিস্থিতি যেনেও কেন সেই জানালাটা খুলতে গেলাম, সেটাতো কাউকেও বলে বোঝাতে পারছি না। শুধু নিজেই নিজের বোকামি আর অসহায়ত্বেও কষ্টটা বুকে চাঁপা দিয়ে চোখ বন্ধ করে কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইলাম।
আমার ঠিক ডান পাশে চলন্ত গাড়িতে সিটের উপর প্রান্তে ঢেস দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে মেয়েটি। অনেক লম্বা জার্নি কতোক্ষণ আর একই সিটে বসে থাকা যায়। রেলগাড়ির স্বভাই হলো এলে-দুলে চলা, তাই মাঝে মাঝে ঝুকে পড়ে সে আমার সিটে হাত দিয়ে নিজেকে সামলে নিচ্ছে। কিন্তু এবার সত্যি সত্যি সে নিজেকে সামলাতে না পেরে অনেকটা হুমড়ি খেয়ে পড়ে আমার কাঁধে ভর করে আবার সোজা হয়ে দাঁড়ায়। আমিও চোখ বন্ধ করে হয়তো একটু ঝিমিয়ে পড়েছিলাম। আকস্মাৎ একটা ধাক্কায় চমকে উঠলাম। আমি কোন কিছু বুঝে ওঠার আগেই সে বললো-
সরি আংকেল।
নেহাত ভদ্রতাবসত আমাকে বলতে হলো- আচ্ছা ঠিক আছে। দাড়িয়ে কেন? তুমি বস।
সে বললো, হুম-আর কতো, বসেই তো যাচ্ছে দিন-রাত।
সেটাও ঠিক বলেছ, ট্রেনের গতিটা অনেক বেশি দাঁড়িয়ে থাকাটাও বেশ কষ্টকর। আচ্ছা তোমরা যাচ্ছ কোথায়?
সে বললো- কেলালা, আমরা কেরালায় বেড়াতে যাচ্ছি। তোমরা?
তোমরা যেখানে, আমরাও ঐ একই পথের যাত্রি।
ও আচ্ছা, তার মানে কেরালায়?
জি। আচ্ছা- তোমার নামটিই তো এখনো জানা হলো না?
উর্মী শর্মা। সবাই উর্মী বলে ডাকে।
ও আচ্ছা, আমি অনেকটা কৌতুক করেই বললাম- তোমাদের শীলচরের সেই বরাক নদীর ঢেউ?
উর্মী- হুম, হয়তো সেটা মা-বাবার খুশির ঢেউ।
মেয়েটির তাৎক্ষনিক এই চমৎকার ও রোমান্টিক উত্তরে আমি খানিকটা বিশ্মিত হয়ে গেলাম। যেন আমার প্রশ্নের উত্তর তার আগে থেকেই জানা ছিলো।
তোমার বাবার নাম যেন কী?
উর্মী- উপেন শর্মা।
আচ্ছা উর্মী, তোমাকে উকিলের মতো অনবরত শুধু প্রশ্নই করে যাচ্ছি বিরক্ত হচ্ছো নাতো?
উর্মী- না, মানে বিরক্ত হওয়ার কি আছে, এমনিতেই এতোটা লম্বা জার্নি সময় তো কাটতেই চায়না। তোমার সাথে গল্প কওে সময়টা বেশ চলে যাচ্ছে।
তাই না কি? আচ্ছা উর্মী- তোমরা ক’ভাই-বোন?
উর্মী- আমি একাই। আমার কোন ভাই-বোন নেই।
বেশতো মা-বাবার দখল সত্ব শুধুই তোমার, ভাগ বসানোর কেউ নেই, ঠিক কি না বলো?
উর্মী- হুম, অনেকটা ঠিক, তবে অনেক কিছু থেকে নিজেকে বঞ্চিত মনে হয়।
সে তোমার একান্ত নিজেস্বতা, ভালো-মন্দ, সুবিধা-অসুবিা এগুলোতো একই মায়ের সন্তান। এমনটা মনে হতেই পারে। আচ্ছা, তুমি কোন ক্লাসে পড়ো?
মাধ্যমিক দিয়েছি এবার, পরীক্ষা শেষ তাই অবসর সময়টা কাজে লাগানোর জন্য ঘুরতে যাচ্ছি।
অর্ণব অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে কারণ এমন দ্রæতগামী ট্রেনের জানালা খোলার মতো নিরেট গাধা যে আমি নই সেটা অন্তত বন্ধু হিসেবে সে ভালো করেই জানে। তবে হঠাৎ কি এমন প্রয়োজন পড়লো যে, চলন্ত ট্রেনে জানালা খোলার মতো বোকামি তাকে করতে হলো।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now