বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
প্রকৃতির আপন দেশ কেরালা’-১২
মাজহারুল মোর্শেদ
যাকহোক ভেতরে প্রবেশ করে শেষ অবদি যেতে হলে আরও বেশ খানিকটা পথ হাঁটতে হবে। হঠাৎ অর্ণবের বিশ্ময়কর চোখ বোউদির দিকে চলে গেলো। বেচারি সেটা টের পেয়ে শরীরের সমস্ত শক্তিকে একজায়গায় জরো করে হনহন করে সামনের দিকে হাঁটতে শুরু করলো। হায়রে বেচারী! রাস্তা যে ক্রমশঃ উপরের দিকে উঠছে সেটা কিন্তু তার জানা ছিলো না। আমরা সবাই মিলে একসাথেই হাঁটছি কিন্ত বোউদি বরাবরের মতোই মাঝে মাঝে অনেক দূর পিছিয়ে পড়ছে, দাদার সাথে তার গড় দূরত্ব প্রায় ১০-১৫ ফিট। বোউদি এবার দাঁতে দাঁত খিঁচিয়ে বলতে শুরু করলো হ্যাঁগো উর্মীর বাপ, আমি কি তোমাদের মাথায় চড়ে ছিলুম। তোমরাই দু’বাপ বেটি মিলেইতো আমাকে জোর করেই নিয়ে এলে। আমি পাকা ধানে মই জুড়ে দিয়েছিলাম বলো।
আমি বুঝলাম বোউদি বেশ চটে গিয়ে তেলে বেগুনে জ্বলে উঠেছে। তাই উর্মীকে বললাম বোউদির হাত ধরে তাকে উপরে উঠতে সাহায্য করার জন্য। সামনে ছোট্ট একটা সুসজ্জিত কাঠের ব্রিজ দেখতে পেলাম ওটা পেরোলেই নীলগিরি পাহাড়। আর এর বিশাল উপত্যকা জুড়ে রয়েছে ‘নীলকুরিঞ্জি’ ফুলের বাগান। ‘নীলকুরিঞ্জি’ একটি বিরল প্রজাতির ফুল যা বারো বছরে মাত্র একবার ফোটে। এর পাতাগুলো দেখতে অনেকটা ক্যামেলিয়া ফুলগাছের পাতার মতো। তবে এর পাতাগুলো একটু বড় মনে হলো। হয়তো এই ‘নীলকুরিঞ্জি’ ফুলের নীলিমার জন্য এ পাহাড়ের নামকরণ করা হয়েছে নীলগিরি পাহাড়। পাহাড় থেকে নিচের ভিউটা সত্যি এক স্বর্গীয় অনুভুতি জাগিয়ে তোলে।
প্রিয় পাঠক, এখানে একটু বলে রাখা দরকার যে, একজন মানুষ কতো বড় সৌভাগ্যবান হলে সুদীর্ঘ একযুগ পর হঠাৎ উপস্থি হয়ে সেই ফুলের দেখা পায়, যে ফুলগুলো সুদীর্ঘ একযুগ পর মাত্র একবারই পৃথিবীর আলোবাতাসে পাপড়ি মেলে। পাহাড়ের উপত্যকায় বিশাল জায়গাজুড়ে নীলে নীল হয়ে আছে সেই ‘নীল কুরিঞ্জি’ ফুল। গোটা উপত্যাটি যেন সত্যি একটা নীলের স্বর্গ। বন কর্মীরা যত্রতত্র দাঁড়িয়ে আছে যেন কেউ ফুলে হাত না দিতে পারে। নীলগিড়ি পাহাড় ট্রেক করে দক্ষিণ ভারতের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ আনামুদি (Anamudi) যাওয়া যায়। এর জন্য কতৃপক্ষের পারমিশন লাগে আমরা সেটিও নিয়েছিলাম। কিন্তু দাদা-বোউদির জন্য সেটা আর হয়ে উঠলো না। উর্মী কোন ভাবেই এটাকে মেনে নিতে পাচ্ছে না। সে এসে আমার কানে কানে বলছে কাক্কু, মা-বাবা এখানটায় বসে থাক, চলো না, আমরা একটু ঘুরে আসি। কিন্তু না, এখানে দলছুট হওয়া মানে বিপদ ডেকে আনা। কাজেই পাহাড় বেয়ে আকাশে উড়ার স্বপ্নটা শুধু স্বপ্নই থেকে গেলো।
যাহোক শুধু একটা জায়গা নিয়ে পড়ে থাকলেই চলবেনা। এখানে যতোগুলো আকর্ষণীয় স্থান আছে সবগুলো দেখতে হলে দিন চলে যাবে, আরো যদি দাদা-বোউদির মতো সফর সঙ্গী জোটে তাহলে তো আর কথাই নেই। এখানকার মূল আকর্ষণ হলো বিপন্ন প্রজাতির নীলগিরি টাহর (Nilgiri Tahr)| । এরা দেখতে অনেকটা ছাগলের মতো, কিন্তু মাথার উপর পিছনে বাঁকা বড় বড় দু’টি শিং থাকে। এরা মানুষের কাছা কাছি থাকতে ভালোবাসে। পাহাড়ের উপত্যকায় প্রবাহমান ঝরনার ধারে সবুজ চরণ ভূমিতে এরা দলবেঁধে ঘুরে বেড়ায়। বেশ খানিকটা লম্বা ঘন সাদা মেঘে ঢাকা পাহাড়ি উঁচু নিচু পথ। পায়ে হেটে তবে দেখা পেলাম সেই পাহাড়ি ঢলের নদী, যেখানে দলবেঁধে ঘাস খেয়ে বেড়ায়। হয়তো সে কারণেই কতৃপক্ষ নদীর ধারটা কাঠের গুড়ি দিয়ে ঘিরে রেখেছে যেন তাদের ঘাস খেতে কেউ অসুবিধার সৃষ্টি করতে না পারে। কিন্তু না আমরা নদীর ধারে কিছুই দেখতে পেলাম না।
তামিল নাডুতে নতুন কাউকে সম্বোধন করতে আন্না (দাদা) বলা হতো, আর কেরালায় সেটা হয়ে গেলো চ্যাটা, এই চ্যাটা মনেও দাদা। পাশে একজন বনকর্মী বসে বসে ঝিমাচ্ছে। তাকে হিন্দিতে জিজ্ঞাসা করলাম নীলগিরি তাহরের (ঘরষমরৎর ঞধযৎ) কথা, কিন্তু আমার মনে হয় না সে আমার কথা বুঝতে পেরেছে। অর্ণব তাকে বাংলায় ইচ্ছেমত গালি দিয়ে বোবা মানুষের মতো ইশারা করে হাত নেড়ে, মুখ এদিক সেদিক বাঁকা করে আকার ইঙ্গিতে জানতে চাইলো, তখন সে মালায়ালম ভাষায় কি যেন একটা বললো। তবে তার বডি লেঙ্গুয়েজ এবং আকার-ইঙ্গিত দেখে মনে হলো যে, সে আমাদের একটু অপেক্ষা করতে বলছে। উর্মী বললো না, না কাক্কু লোকটা তোমাকে ইচ্ছেমত গালি দিলো। সবাই হাহা করে হেসে উঠলো। এমন সময় পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখি সত্যি সত্যি কয়েকটা নীলগিরি টাহর (Nilgiri Tahr)|এসে ঘাস খেতে শুরু করলো। কাছ থেকে দেখে এদেরকে শতভাগ ছাগলের মতো মনে হচ্ছে, তবে ছাগলের চেয়ে একটু বড়।
উর্মী একটা চিৎকার দিয়ে দৌড় দিলো টাহরের কাছে কিন্তু ওরা তো বেড়ার ওপারে। উর্মী ওদের আয় আয় করে ডাকতে শুরু করলো, হয়তো ওরাও বাংলা ভাষা বুঝলোনা তাই ফিরেও তাকালোনা। আমি বেড়ার ফাঁক দিয়ে হাত ঢুকিয়ে কতোগুলো লম্বা লম্বা ঘাস তুলে নিয়ে উর্মীকে দিয়ে বললাম এগুলো নাড়াচাড়া করে ওদের দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করো। চোখে পড়লেই ওরা তোমার কাছে চলে আসবে। সত্যি তাই হলো ওরা ঘাসের লোভে উর্মীর কাছে চলে আসলো। উর্মী একটা ছোট্ট টাহরের গায়ে হাত বুলিয়ে আদর করছে। হঠাৎ কোথা থেকে একজন বনকর্মী উড়ে এসে উর্মীকে কিছু না বলেই টাহরটাকে তাড়িয়ে দিলো। উর্মী বনকর্মীর এমন উদ্ধত আচরণে বিহব্বল হয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now