বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

প্রকৃতির আপন দেশ কেরালা-১

"ভ্রমণ কাহিনী" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান মাজহারুল মোর্শেদ (০ পয়েন্ট)

X প্রকৃতির আপন দেশ কেরালা-১ মাজহারুল মোর্শেদ ঐতিহাসিক নিদর্শন আর প্রকৃতির অজানা-অচেনা রূপ-রহস্যে আমার কৌতুহল ও দুর্বলতা বরাবরই একটু বেশি। চারদেয়ালের মধ্যে দম যেন একেবারে বন্ধ হয়ে আসে। সঙ্গত কারণে খোলা আকাশ-মুক্তবাতাশ, পাহাড়-ঝরনা, প্রবহমান নদী, সাগরের বিশালতা আমায় হাতছানি দিয়ে ডাকে, খুব আপন করে কাছে টানে। কর্মব্যস্ততার গণ্ডি পেরিয়ে একটু ফুরসৎ পেলেই মনটাকে আর বেঁধে রাখা যায় না, উড়াল দিতে চায় গন্তব্যহীন দূর অজানার পথে। খোলা চোখে যা দেখি তাই যেন মনের আয়নায় একটা তথ্যভিত্তিক কাহিনীর রূপে আলোকচিত্রের পর্দায় ভাসতে থাকে। তাই আমিও চেষ্টা করি, হাজারো পাঠকের সঙ্গে সেটা ভাগাভাগি করে উপভোগ করতে। পশিচমবঙ্গের একটি স্বনামধন্য আন্তর্জাতিক সাহিত্য পত্রিকার বর্ষপূর্তি অনুষ্ঠানে ‘প্রাবন্ধিক’ হিসেবে আমন্ত্রিত অতিথি হওয়ার সৌভাগ্য আমার হয়েছিলো। পত্রিকার সম্পাদক, কবি-সাহিত্যিক ও নাট্যকার শিল্পি দাস আগেভাগে আমন্ত্রণ পত্রটি পাঠিয়েছিলেন বলে শিক্ষা অধিদপ্তর থেকে শ্রান্তি বিনোদনের ছুটি মঞ্জুর করে নেয়াটা সহজ হয়েছিলো। কাবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শান্তি নিকেতনের প্রকৃতি ভবনে ‘পরিমল সাহিত্য পত্রিকার’ জাকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠান ও ঘোরাঘুরিতে কেটে গেলো দু’দিন। কোলকাতায় ফিরে ‘সোনার বাংলা লজ’ নামের একটি আবাসিক হোটেলে উঠলাম। আমার সফর সঙ্গী হিসেবে পেলাম কোলকাতার বন্ধু অর্ণব ঘোস। কোলকাতার কবি-সাহিত্যিকদের জমজমাট আড্ডায় কখন যে ঘড়ির কাঁটা আমাদেরকে ছেড়ে কয়েকঘর এগিয়ে গেছে সেটা কেউ টেরই পাইনি। প্রিয় পাঠক, এখানে দু’টি কথা না বললেই নয়। গণপ্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা হিসেবে বিদেশ ভ্রমণের ছুটি মিলানোটা সুন্দবনে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের দুধের মতো দুর্লভ। তাই ছুটি যেহেতু একবার পেয়েই গেলাম এর যথার্থ ব্যবহার করতে না পারাটাও হবে চরম ব্যার্থতার। আমরা পূর্বেই ঠিক করে রেখেছিলাম যে, শান্তি নিকেতনের কর্মকাণ্ড শেষ হলেই সোজা চলে যাবো দক্ষিণ-পশ্চিম ভারতের প্রকৃতির স্বর্গ রাজ্যে কেরালায়। কিন্তু কোলকাতা থেকে কেরালায় সপ্তাহে মাত্র দু’-তিনটা ট্রেন চলাচল করে। ‘গুরুদেব সুপারফাস্ট এক্সপ্রেস প্রতি বুধবার রাত ১১টায় ৪৫ মিনিটে কোলকাতার শালিমার স্টেশন থেকে ছেড়ে যায়। ক্যালেণ্রেডার পাতা দেখে অনেক হিসাব-নিকাশ করে দিন তারিখ মিলিয়ে আমরা এ ট্রেনের টিকিট আগেভাগে কেটে রেখেছিলাম। কোলকাতা থেকে কেরালার এরনাকুলাম জংশন স্টেশনের দুরত্ব প্রয় ২২৯১ কিলোমিটার। আর সময়টাও বেশ লম্বা, প্রায় ৪২-৪৩ ঘন্টা। এতোটা লম্বা সময় ট্রেন জার্নি বাংলাদেশী হিসেবে আমার অভিজ্ঞতা একবারে না থাকলেও রেলওয়ে ভ্রমণ আমার খুব পছন্দের। নিঝুম রাত সবাই ঘুমের ঘোরে আচ্ছন্ন। জানালার বাহিরে জোসনামাখা প্রকৃতি সকল নির্জনতা ভেঙে পুঁ-ঝিক-ঝিক শব্দ করে ট্রেন এগিয়ে চলছে তার আপন গতিতে। আমি অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি জানালার বাইরে এ যেন একটা অন্য রকম অনুভুতি, একটা অন্যরকম ভালোলাগার স্বর্গরাজ্যে মনটা হারিয়ে যায়। ছোট খাটো কিছু বিড়ম্বনা থাকলেও যদি এগুলোকে একটু সহজভাবে দেখা যায় তাহলে রেল ভ্রমণটা হয়ে ওঠে অনেক আনন্দের, অনেক নিরাপদের । আমরা প্লেনে চড়েও উড়ে যেতে পারতাম কিন্তু তাতে তো আর চোখের তৃষ্ণা মিটতোনা, মনের খোরাকও জুটতো না। ‘কিছু পেতে হলে কিছু হারাতে হয়’ আপাতত এটাই আমাদের সান্ত¦না। যাহোক কবি-সাহিত্যিকদের জমজমাট আড্ডার মুলতবী ঘটিয়ে, তাড়াহুড়া করে ব্যাগ গুছিয়ে নিয়ে আমরা বেড়িয়ে পড়লাম শালিমার স্টেশনের দিকে। হাওড়া থেকে শালিমার স্টেশন যাওয়ার জন্য ৪০ রূপিতে একটা অটো ভাড়া করে নিলাম। ট্রেন ছাড়ার ঘন্টাখানেক পূর্বেই আমরা শালিমার স্টেশনে পৌছে গেলাম। সেখানে আই.আর.সি.টি.সি এর বেশ আরামদায়ক এক্সিকিউটিভ লাউন্স রয়েছে যেখানে খুব স্বাচ্ছন্দে কিছুটা সময় পার করা যায়। আমাদের ট্রেনটি ছিলো ‘গুরুদেব সুপারফাস্ট এক্সপ্রেস-১২৬৬০ নম্বর। আমাদের কামরাটি ছিলো বি-ফাইভ, ট্রেনের একদম শেষে জেনারেল কামরার পর আমাদেরটাই একমাত্র রিজার্ভেশন কামরা। ভারতীয় রেলওয়ে ভ্রমণ অনেক নিরাপদ, ভ্রমণকালে আপনার অযাচিত কোন সমস্যা হলে ১৩৯ নম্বরে কল করে কতৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করা যায়। মহিলা ট্রাভেলার চাইলে আর.পি.এফ থেকে (মহিলা পুলিশের) বাড়তি সুযোগ সুবিধাও নিতে পারে। ‘গুরুদেব সুপারফাস্ট এক্সপ্রেস’ পনেরো মিনিট দেরিতে রাত ১২ টায় শালিমার স্টেশনে এসে পৌছে। ট্রেনের জানালা দিয়ে বাহিরের প্রকৃতির সাথে বন্ধুত্ব করতে হলে জানালার ধারের সিট থাকা আবশ্যক। তাই আমি লোয়ার উইণ্ডো সাইড-৬৪ নম্বর সিটটি পছন্দ করে বসে পড়ি। মিনিট পাঁচেক পর ট্রেনটি ছেড়ে দিলো। রাতের অন্ধকারে ঝিক-ঝিক-শোঁ-শোঁ শব্দে তুমুল গতিতে চলছে ট্রেন। দূরপাল্লার ট্রেন বলেই হয়তো এতোটা গতি। সারাদিনের কর্ম-ক্লান্ত দেহ তার ওপর ট্রেনের এলে-দুলে চলার গতি তাতে চোখে ঘুম না এসে যায় কোথায়? কখন যে চোখ বন্ধ হয়ে গেছে সেটা নিজেও টেড় পাইনি। রাতের অন্ধকার ক্রমশঃ কেটে যাচ্ছে পূর্বাকাশে দেখা যাচ্ছে আলোর ঝলকানী, বাহিরে তাকিয়ে দেখি সকাল হয়ে গেছে। আর আমরাও পশ্চিমবঙ্গের সীমানা পেরিয়ে একটা নতুন দিনে দেখা পেলাম পার্শ্ববর্তী ওড়িশা রাজ্যে। হঠাৎ মনে পড়ে গেলো সেই বাঙলা, বিহার, ওড়িশার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার মর্মস্পর্শী ও হৃদয়বিদারক ঘটনার কথা। ১৭৫৭ সালে পলাশীর প্রান্তরে মীর জাফরের চরম বিশ্বাসঘাতকতায় চিরদিনের জন্য অস্তমিত হয়ে যায় বাঙলার স্বাধীনতার সূর্য। মোহাম্মদি বেগের ধারালো তলোয়ারের আঘাতে শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার রক্তে লাল হয়ে যায় এই বাঙলা, বিহার, ওড়িশার মাটি। হয়তো এখনো সেই করুণ ট্রাজেডির রক্তিম আভা ছড়িয়ে পড়ছে প্রত্যুষের আলোয়। আমার বুকের ভেতরটা কেমন তোলপার করে ওঠে। ট্রেন চলছে তার নিজেস্ব গতিতে আর আমার অশ্রæভেজা চোখ কেবলি তাকিয়ে আছে উড়িশার রক্তলাল দিগন্তের দিকে। কখন যে কটক ও ভূবনেশ্বর স্টেশর পার হয়ে আমরা পৌছে গেলাম উড়িশার খুরদা রোড রেইলওয়ে জংশনে সেটা টেড়ই পেলাম না। খুরদা রোড জংশন ওড়িশার একটি গুরুত্বপূর্ণ ও অন্যতম ব্যস্ততম রেলওয়ে স্টেশন, যা পূর্ব উপকূল রেলওয়ে জোনের অধীনে অবস্থিত। এটি যটনী শহরে অবস্থিত এবং হাওড়া-চেন্নাই প্রধান লাইনের একটি প্রধান সংযোগস্থল। এখানে মিনিট দশেক সময় পেলাম নিচে নামার। অর্ণবও নেমে এসেছে আমার সাথে পাশের একটি টি স্টল থেকে গরম চা-বিস্কুট খেয়ে পুরো স্টেশনটাকে ক্যামেরাবন্দি করে আবার গিয়ে সিটে বসে পড়লাম। জানালার বাইরে সূর্যটা তখন বেশ উপরে উঠে গেছে। কিন্তু খুরদা রোড জংশন পার হওয়ার পরে বাইরের প্রাকৃতিক দৃশ্যটা একেবারে পাল্টে গেলো। হঠাৎ লালচে মাটি, হালকা গরম বাতাস আর উদাস করা প্রকৃতি। চারিদিকে ছোট ছোট গাছপালা ও ঝোপঝাড়। দূর থেকে গোটা প্রকৃতিটা অনেকটা মরুভূমির মতো লাগছে। জানালার কাছ থেকে চোখকে কোন ভাবেই সরানো যাচ্ছে না। ওড়িশার গোটা অঞ্চলজুড়ে যতোদূর দেখা যায় শুধুই চোখে পড়ে নদী-পাহাড় আর ছোট ছোট ঝার-জঙ্গল। ইতিহাস থেকে জানা যায় প্রায় চার মিলিয়ন বছর আগের প্রাচীনতম শীলাস্তর এই ওড়িশার এই অঞ্চলে পাওয়া যায়। চলমান ট্রেনের জানালা দিয়ে প্রাচীনতম এই পাথরগুলোকে দেখার যে অনুভূতি সেটা সত্যি অসাধারণ। রুক্ষ-শুস্ক ধুসর লালমাটি, দূরে দূরে ছোট ছোট পাহাড়, জনবসতিহীন ধুধু প্রন্তর, আর সারি সারি তালগাছ যেন চোখ জুড়ে যায়। তবে আর কতোক্ষণ এভাবে জানালার বাইরে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকা যায়? কখন যে দু’চোখ নিজের অজান্তেই শান্ত হয়ে ঝিমিয়ে পড়ে সেটা বুঝতে পারিনাই। হঠাৎ টেনের লম্বা সাইরেনের শব্দে ঝিমানি কাটিয়ে মস্তিষ্ক আবার সজাগ হয়ে ওঠলো। চোখ মেলে তাকিয়ে দেখি স্টেশনের নাম বালুগাঁও তবে এখানে ট্রেন দাঁড়ালো না। কোলকাতার বন্ধু অর্ণব বলেছিলো যে, এই বালুগাঁও স্টেশন পার হয়ে চিলিকা লেক (ঈযরষরশধ খধশব) দেখতে পাওয়ায়। নদী আর পাহাড়ের দুর্বলতা আমার একটি চিনস্থায়ী রোগ বলতে পারেন। আমি অধীর আগ্রহ নিয়ে জানালার বাইরে তাকিয়ে আছি কখন সেই চিলিকা লেক দেখতে পাই। অবশেষে সেই মহেন্দ্রক্ষণ চলে এলো, ট্রেনটি এখন চিলিকা লেকের গা ঘেসে ঝিকঝিক করে এগিয়ে চলছে। আমি মনে মনে ট্রেনের ড্রাইভারকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি এ কারণে যে, চিলিকা লেক অতিক্রম করার সময় ট্রেনের গতি খানিকটা কমিয়ে বেশ হালকা করেছে। দূরত্বটা খুব বেশি নয় বলে লেকের সবকিছুই একেবারে চকচক করে দেখা যাচ্ছে। গুগলের সাহায্যে জানতে পারলাম যে, এই লেকে নৌকায় ভেসে বেড়ানোর সময় দু’চারটা ডলফিন নাকি মাথা চাড়া দিয়ে আপনাকে অভিবাদন জানাতে পারে। আর এটাই এই লেকের প্রধান আকর্ষণ। এই চিলিকা লেক ভারতের পূর্বউপকূলে বঙ্গোপসাগরের পাশে পুরী, খুরদা এবং গঞ্জাম জেলা জুড়েবিস্তৃত একটি বিশাল নোনাজলের উপহ্রদ (খধমড়ড়হ)। এটি এমিয়ার বৃহত্তম এবং বিশ্বেও দ্বিতীয় বৃহত্তম উপকূলীয় লেক। দেখতে দেখতে আমরা চিলকা স্টেশন এসে গেলাম। পাহাড়ের কোলে অবস্থিত প্রায় জনহীন একেবারে শান্ত-শিষ্ট সুদীর্ঘ এ স্টেশনের চারপাশ গাছ-গাছালেিত ভরা। স্টেশনের প্লাটফমটি ছবির মতো একটি নান্দনিক রূপে সাজানো গোছানো। চিলকা স্টেশন পেরিয়ে অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে চোখে পড়লো রেললাইনের দু’ধারে পাহাড় আর তারই মাঝখান দিয়ে একেবাবে দানব গতিতে ছুটে চলেছে আমাদের ট্রেন। হঠাৎ ট্রেনের শব্দটা কেমন বদলে যায় আমি সজাগ হয়ে দেখি নদীর একটি সুদর্শণ ব্রিজের উপর দিয়ে চলছে আমাদের ট্রেন। অর্ণবকে জিজ্ঞাসা করে জানতে পারি এটি ঋষিকুল্যা নদী। ওড়িশা রাজ্যের দক্ষিণাংশের একটি অন্যতম প্রধান নদী। এটি পূর্বঘাট পর্বতমালার দারিংবাড়ি পাহাড়ের প্রায় ১০০০ মিটার উচ্চতা থেকে উৎপন্ন হয়ে কান্ধামাল ও গঞ্জাম জেলার উপন দিয়ে প্রবাহিত হয়ে পুরুনা বান্ধা নামক স্থানে বঙ্গোপসাগরে মিশেছে। দারিংবাড়ি পর্বতমালাকে ওড়িশার কাশ্মীর বলা হয়।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ৩ জন


এ জাতীয় গল্প

→ প্রকৃতির আপন দেশ কেরালা-১

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now