বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
প্রশ্ন
"ছোট গল্প" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান Rocky (০ পয়েন্ট)
X
আমি এখন যে রুমটাতে শুয়ে আছি তা বেশ ছোট ।অস্বস্তিকর রকমের ছোট। আমি অনড় শুয়ে আছি একরাশ বিরক্তি নিয়ে। ঘরটা আরেকটু বড় হলে কি এমন ক্ষতি হতো সে কথাই ভাবছিলাম সটান। বিদ্যুৎ নেই এখানে। একটা হারিকেন জ্বালাতে পারলে বেশ হোতো। কিন্তু সেটা তো আর সম্ভব না। বড় ঝামেলায় পড়ে আমার এই জায়গায় আসা। এখানে আসার আগে বলা হয়েছিলো দু’জন লোক আসবে আমার বর্তমান দুর্দশা সমাধান করতে। নিশ্চয়ই ওরাই কুপি-বাতি কিছু একটা নিয়ে আসবে। ওদেরকে তো সব বলেই দেয়া আছে। অন্ধকারে নিশ্চয়ই কথা বলবোনা!নিজেকে প্রবোধ দেই। ধারণা করলাম কথাবার্তা শেষ হবার পর ওরাই ব্যাপারটা সুরাহা করবে। আমি তাই পিচের মতো আঠালো অন্ধকারে ভরা সঙ্কীর্ণতায় গভীর আগ্রহ আর শঙ্কা মেশা কৌতূহল নিয়ে অপেক্ষা করছি।
আমার একটা চমৎকার ছিমছাম বাড়ী থাকতেও এই বিশ্রী অবস্থায় আসার পেছনে একটা ছোট ঘটনা আছে। হেঁয়ালি করে কথা বললে মানুষের মাঝে বিরক্তির উদ্রেক হওয়াটা অস্বাভাবিক না। কিন্তু এখানে আগমনের পেছনের গল্পটা খুব সাধারণ দৈনন্দিন একটা গল্প। তাই শেষের জন্য তুলে রাখা।
এ ঘরের সিলিংটা খুব বেশী ওপরে না। বাঁশ আর ছন দিয়ে বোনা চালা। বুননে কাঁচা হাতের ছাপ স্পষ্ট। বেতের ফাঁক গলে টুপ টাপ চুইয়ে চুইয়ে পানি পড়ছে। আমার মনে হচ্ছে গেদু মিয়াকে জোর গলায় ডেকে একটা ধমক দেই। অথচ আমার এমন ইচ্ছে করাটা খুব বেমানান, নিরীহ ধরণের মানুষ আমি। আমি প্রবল বিরক্তিতে অস্বস্তির আওয়াজ করলাম। একটা হাতপাখা তো অন্তত রাখতে পারতো আমার জন্য! যা গরম পড়েছে! বৃষ্টিতেও গরম কমছেনা। আমি শুনেছিলাম মাটির ঘর ঠাণ্ডা হয়। কিন্তু আমার দাদাবাড়ির এই ঘরটাতে শুয়ে আমার অভিজ্ঞতা সেই প্রচলিত তত্ত্বের মুখে জোর চপেটাঘাত করলো। কাছেই কোথাও হতে একটা তীব্র ঝাঁঝালো ঘ্রাণ আসছে। আমি শোঁকার চেষ্টা করলাম ভালভাবে। নাকটা কেমন বন্ধ হয়ে আছে। অথচ সর্দি-কাশি আমার একেবারেই লাগেনা। এত বয়স হোল তবু আমি এখনো বৃষ্টির শব্দে উতলা হই,ভেজার জন্য একটা বাধ্যবাধকতা বোধ করি, মোহগ্রস্তের মত ছাদের ছোট বাগানটার পাশে অনিচ্ছুক স্ত্রীকে বুকে টেনে ভিজতে থাকি।সব মানুষের কাছে স্বর্গের আলাদা আলাদা একটা সংজ্ঞা থাকে। ওর ঠোঁট থেকে বৃষ্টির পানি পান করাটা আমার স্বর্গ। মৌমী সবসময় বলে আমার আর ব্যাঙের মাঝে পার্থক্য শুধু একটাই, ব্যাঙের লেজ খসে যায় আমারটা জায়গামত রয়ে গেছে। ইঙ্গিতপূর্ণ একটা দুষ্টু হাসিতে ও কথাটার মানে বুঝিয়ে দেয়। আমিও মুচকি হাসি। ও শরীরে কল্লোল তুলে আমার আলিঙ্গন ভেঙে ছুটতে থাকে, যেন শরীরের ভাঁজ দিয়ে আমাকে ডাকে,যেন বলে-‘’আমাকে ধরো,মিশিয়ে ফেলো!’’। আমার কাছে ধরা পড়াতে ওর স্বর্গ। আমার ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে। চোখ বন্ধ করে আমি ওর রহস্যঘেরা অবয়ব দেখতে পাই। অজস্রবারের উন্মোচনের পরেও যা আমার চোখে এক-ই গৌরব নিয়ে ধরা দেয়। আমার গলায় আর বুকে দলা পাকিয়ে ওঠে। একটু আগের ঝাঁঝালো গন্ধটা ছাপিয়ে ওর প্রতিটা পরতের সুবাস আমার অস্তিত্বে গিয়ে ঢোকে। ওর চুলের বাসি বকুল ঘ্রাণ- যাতে হালকা মিশেছে শ্যাম্পু,কন্ডিশনার আর গন্ধরাজ তেল, বুকের সোঁদা ঘ্রাণ-কতবার এই সুবাস আমি বৃষ্টির ঘ্রাণের সাথে গুলিয়ে ফেলেছি নিজেও মনে করতে পারবোনা। আমার মধ্যবয়স্কা স্ত্রী আমার কল্পনায় উদ্ভিন্নযৌবনা হয়ে ওঠে।
বুকের ভেতরটা হা হা করে ওঠে। কি অদ্ভুত একটা ব্যাথা! গত কিছুদিন ধরেই আরো একটা ব্যাথা বুকের বা-পাশে চিন চিন করে দিয়ে যাচ্ছে। মৌমীকে বললে ও শঙ্কা নিয়ে ডাক্তার দেখাতে বলে। আমি হেসে বলি বিশ বছর তোমার অপ্সরী-সৌন্দর্য দেখেও যখন হৃদযন্ত্র বিকল হয়নি…কোনোকিছুতেই হবেনা। আমার আব্বার হার্টে ব্লক ছিলো। শেষমেশ ওটাই কাল হয়েছিলো। তাই মৌমীর চোখের আশঙ্কা কাটতে চাইতোনা। বদ অভ্যাস নেই আমার মোটেও। না চুরুট ছুঁই, না জর্দা-পান। মদ গাজা জীবনে স্পর্শ করিনি। তেল-চর্বিঅলা খাবার এড়িয়ে চলি। তাই গত কিছুদিন ধরে বুক ব্যাথার নালিশ করতে, মৌমীর হার্ট-এটাক তত্ব আমি হেসে উড়িয়ে দেই। খাওয়াদাওয়ায় মাঝে মাঝেই অনিয়ম হয়। এসিডিটির কারণেও বুক ব্যাথা হতে পারে, আমি ওকে বোঝাই- সাথে নিজেকেও। বৌ বলে, এখন বড় অসুখে পড়া নিষেধ, ছেলেমেয়েগুলোকে পার করতে হবে। আমি নিশ্চুপ ধরণের মানুষ। শুধু সম্মতিতে মাথা নাড়ি।
বড় ভালোবাসে আমাকে মেয়েটা- আমার তিন সন্তানের অতুলনীয়া জন্মদাত্রী। প্রিয়তমা স্ত্রীকে ভেবে আমার খুশি খুশি লাগতে থাকে, একটু আগে যে অস্বস্তিটা লাগছিলো সেটা কেটে যায়।
অন্ধকারে কেমন একটা ঘোর লেগে আছে। বোধ আর অবচেতনতার মাঝে আমি দোল খাচ্ছি। ঝাঁঝালো ঘ্রাণটা আবার পাচ্ছি। উফ! ভারী ঝামেলা তো! একটু পর ঘরে অপরিচত দু’জন আসবে। তারা গন্ধে অস্বস্তি বোধ করতে পারে ভেবে আমি বিচলিত হতে থাকি। বড্ড খোলসবন্দী মানুষ আমি। অল্পতেই বিব্রত হওয়ার স্বভাব। মনে পড়ে গেলো, আমার ছোট ছেলেটার স্কুলে যখন ওর অধ্যক্ষ ডেকে নিয়ে গেলেন- সন্তানের শৃঙ্খলা ভঙ্গের গল্প শুনে আমি লজ্জায় মাথা তুলেই তাকাতে পারিনি, হেট করে শুধু শুনে গেছি। মানুষ থেকে দূরে দূরে থাকতে ভালো লাগে আমার। কারো সাতে পাঁচে নেই আমি। ছাদের ওপর করা নিজ হাতে ছোট বাগানেই কাটিয়ে দেই বেশীরভাগ অব্যাস্ত সময়। ডালিয়া, রক্তজবা, রঙ্গন, পাতাবাহারে সময় বেশ কাটে। দোলনা বসানোটা বড় মেয়ের আইডিয়া ছিলো। মৃদুলা। কি লক্ষ্মীমন্ত হয়েছে মেয়েটা। বিয়ে দিয়ে পর করে দিতে হবে ভেবে আমার বুকটা আবার ফাঁকা হয়ে গেলো। সময় চলে যায়।মনে হয় এই তো, মাত্র কদিন আগেই ওর নবজাত মুখ দেখে প্রথম পিতৃত্বের গর্বে আমি কেঁপে উঠেছিলাম।
উত্তরের বাতাস গায়ে মেখে আমরা চায়ের কাপে চুমুক দেই। সংসার জীবনে অপরিসীম সুখ খুঁজে পাই আমি। ঘরছাড়া সিদ্ধার্থকে প্রগলভতার শিকার মনে হয়। চন্দ্রাহত হয়ে যে নবপরিণীতাকে ত্যাগ করেছিলো। চাঁদ মানুষকে অনেক উন্মাদনায় ভাসায়, তাই তো পাগলদের ইংরেজিতে বলে “লুনাটিক”। আমাকে চাঁদের আলো তেমন বিচলিত করেনা। আমি বর্ষাবিলাসী। চাঁদের আলোয় আমার শরীর ভেজেনা।
আমার স্মৃতিশক্তি বরাবরই ভালো। আজ পর্যন্ত কখনো স্ত্রীর জন্মদিন, আমাদের বিবাহবার্ষিকী ভুলে গিয়ে অভিমান করার সুযোগ দেইনি। গণিতে ভালো ছিলাম। মুখে মুখে যোগবিয়োগ,গুণ-ভাগ করে ফেলতে পারি বড় বড় সংখ্যা। ব্যাংকের চাকরীতে হোক কিংবা যৌবনের বিশ্ববিদ্যালয়ে- সহকর্মী সহপাঠীদের তাক লাগিয়েছি বিস্তর।
কিন্তু এখন-এক অসম্ভব প্রয়োজনীয় কালের সন্ধিক্ষণে আমার আজীবনের ভরসাস্থল হওয়া স্মৃতি আমার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করতে চাচ্ছে। কিছুতেই প্রশ্ন দুটো মনে পড়ছেনা এখন। অথচ প্রশ্ন দুটোর উত্তর মনে করা খুব জরুরী। পাশবিক ভয়ে আমার বুকের বা’পাশে তীব্র ব্যাথা করতে থাকলো। ঠিক যেমনটা দু’দিন আগে করেছিলো যখন ব্যাথার দমকে দমকে আমার মহাবিশ্ব কাঁপতে কাঁপতে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলো।আর এখন শিরদাঁড়া বেয়ে চলে গেলো বরফের মতো হিম স্রোত, যেন বুকে ভর দিয়ে মেরুদণ্ডের ভেতর হেঁটে যাচ্ছে শীতল রক্তের সরীসৃপ। সাপ আমি বড্ড ভয় পাই। প্রশ্নের উত্তর মনে করাটা তাই আরো জরুরী!
আমার ঘরের অতিথিরা এসে গেছে। তাদের খচ খচ আওয়াজ পাচ্ছি। হঠাত করেই একটা রহস্যের জট খুলল, মনে পড়লো ঝাঁঝালো ঘ্রাণটা আসছে আমার নাকে চেপে দেয়া তুলোর গায়ে মাখা কর্পূর থেকে। তাই তো বলি। আমার নাক তো সহজে বন্ধ হয়না!
মৃত্যু বুঝি অনেককিছু ভুলিয়ে দেয়!
দাঁতে দাঁত চেপে আমি প্রশ্নোত্তর মনে করার চেষ্টা করতে থাকি,যেন এর উপর আমার জীবন নির্ভর করছে।অথচ জীবন আমাকে ছেড়ে গেছে আষাঢ়ের বর্ষায় গৃহত্যাগী চাঁদের আলোয় এক চিলতে ছাদের ওপরে। প্রাণহীন আমি মুখ থুবড়ে পড়েছিলাম পাতাবাহারের ঝোপে।
পিচঢালা অন্ধকারে অতিথিদের অবয়ব এগুতে থাকে আমার দিকে।
আমার কবরের ওপর তাল মিলিয়ে বৃষ্টির ফোঁটা পড়ে,সেই আগের মাতাল করা রাতগুলোর মতো…যে বৃষ্টি আমাকে সিদ্ধার্থের মতো ঘরছাড়া করতো।
আমার মৃত দেহে তাতে আর কোন সাড়া পড়েনা।
লেখক: আরিফুল হক শোয়েব (২০০২-২০০৮)
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now