বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

প্রদীপ জ্বলা সন্ধ্যায়!

"রোম্যান্টিক" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান মোঃ ছহিনুর রহমান বিন মনির (০ পয়েন্ট)

X এক.... দিনের আলো মিশে যেতে ইটপাথরের শহর টা বড্ড স্বার্থপর লাগে। তখনি চলে আসি মেসের সামনেকার পার্কে। গ্রামে যখন থাকতাম দুমুঠো ঠিকমতো খেতে না পারলেও খবর নেয়ার মতো লোকের কমতি ছিল না। এদিক থেকে শহর কখনো গ্রামের ধারের কাছেও যেতে পারবেনা। গ্রামের বাতাসেও আপন পনা রয়েছে। শরীর ছুয়ে দিলে পরিতৃপ্তি মিলে। . পার্কে কারো সাথে তেমন কথা নাহলেও জামিল দাদুর সাথে ভালোই আড্ডা জমে। ভদ্রলোক পার্কে এসে নাড়ু বিক্রি করে। দুজন লোক নাড়ু কিনতে আসায় এতক্ষণ উনার কাছে যাইনি। কাস্টমার চলে যেতেই আমি উনার কাছে গেলাম। বললাম, দাদু খবর কি তোমার? জামিল দাদু আমার কথায় অসহায় চোখে তাকালো। বুঝাই যাচ্ছে মনভার। আমি উনার পাশে বসলাম। মুচকি হেসে বললাম, কি বুড়ো!! আমি প্রথম প্রথম যখন গোমড়া মুখ করে পার্কে বসে থাকতাম খুব তো বুঝাতে। জীবনে নাকি কোনকিছু আমাদের হাতে থাকে না। তাই কষ্ট পেয়ে সময় চলে যেতে দিতে নেই। আর এখন নিজে কি না মুখ গোমড়া করে বসে আছো। আমার কথায় জামিল দাদু সত্যি কেঁদে ফেললেন। আমাকে বহুত খারাপ লাগছিল। কিছু চেয়েও বলতে পারছি না। ভাষা নেই। রুমাল বের করে দিলাম। চোখ মুছে নিলো দাদু। বলল, তোমার দাদীমার জ্বর। ঔষধ না কিনে বাড়ি ফিরলে কি জবাব দিবো। একথা বলে দাদু আবার মুখ গোমড়া করলেন। আমি বললাম, কেন আজ বুঝি নাড়ু বিক্রি হয়নি। - হয়েছে তবে রোজকার মতো না। আর আজ তো বেশি বিক্রি করার কথা ছিল। টুকরির গামছা টেনে দেখি বেশ নাড়ু বিক্রি হয়নি। একবার মনে হলো টাকা দিয়ে দাদু কে এখনি বাড়ি ফিরে যেতে বলি। কিন্তু পরে মনে হলো দাদু কখনো আমার কাছে এমন করে টাকা নিবে না। মাথায় আসছে না কি করবো। আবার দাদুর এমন গোমড়া মুখ দেখলেই মন ভেঙ্গে পড়ছে। . পার্কের পাশের বস্তি থেকে কিছু ছেলেপেলে পার্কে আসে। কেউ ল্যাম্পপোস্টের আলোয় খেলা করে। কেউ আবার মাটিতে পড়া গাছের ডালপালা কুড়োয়। তাদের ডাক দিলাম। সবার হাতে যতোটা ধরে নাড়ু উঠে দিলাম। ওদের বাড়ির জন্য প্যাকেটে করে দিতে ভুললাম না। বাচ্চা গুলো চলে গেলো। আমি দাদুর সাথে হিসেব কষতে বসলাম। দাদু শুধু ঘোরলাগা চোখে আমার দিক তাকিয়ে আছে। হয়তো জামিল দাদু কিছু আছ্ করতে পেরেছে। আমি আর দেরি না করে যতো টাকা বিল হয়েছে দাদুর হাতে দিলাম। উঠে গিয়ে আগের জায়গায় বসে পড়লাম। কিছুদূরে খেয়াল করলাম, কালো পরী টা আজো এসেছে। এই মেয়ে কে কালো পরী বলি মেয়েটার গায়ের রং কালো বলে নয়। বরং সে ফর্সা বলা যায়। কিন্তু এই মেয়ে সব জিনিস কালো ব্যবহার করে। কাপড় থেকে শুরু করে, সাথে নিয়ে আসা বিএমডাব্লিউ গাড়ি, সানগ্লাস সবি কালো। মেয়েটাকে প্রথমদিন থেকে দেখে আসছি। কারো সাথে কোন কথা বলে না। চুপ করে আকাশ পানে তাকিয়ে থাকে। এ ধরনের মানুষগুলো আমার বড্ড চেনা। এদের মনের কথা বলার কেউ থাকে না। তাই তো আকাশের দিক তাকিয়ে চিরতরে চলে যাওয়া আপনজন কে খুজে। মনের কথা বলে। আমিও তাই খুজি। আমার মনে হয় সবচে জ্বলজ্বল করা তারাটা আমার বাবা। তার কাছে আমি নালিশ করি। কেনো একা ফেলে গেছে আমায়??? আচ্ছা কালো পরীটা কার সাথে কথা বলে? কি নিয়ে কষ্ট পায়?? . অফিস থেকে নিজাম ভাই মুন্সীপাড়ার সাইটে আমাকে পাঠিয়েছে। সাইটের কাজ কতদূর হয়েছে তার রিপোর্ট বানাতে। অফিস থেকে হেটেই গেলাম। পকেটে বেশি টাকা নেই। শূন্য বললে চলে। মাসের পরের দিনগুলো যেমনতেমন করে খেতে হবে বাইরে। নাহলে নাজিম ভাই তো আছেই। রিক্সায় যাতায়াত করে হিসাবে গড়মিল করতে চাইনা। জামিল দাদুকে টাকা না দিলে এমন হওয়ার কথা ছিল না। তবু আমার খানিক কষ্ট করে যদি কারো ভালো হয় করলাম নাহয়। . অফিসে ফিরতে বড্ড দেরি করে ফেলেছি। নিজাম ভাইয়ের কেবিনে ঢুকে দেখি তার মুখে রাজ্যের চিন্তা। বস নিজাম ভাই কে আমার জন্য কথা শুনালো না তো!!! আমি উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বললাম, নাজিম ভাই! হয়েছে কিছু? নাজিম ভাই মাথা তুলে তাকালো। নাগের ডগায় থাকা চশমা ঠিক করে পড়লো। বলল, তুই নিজেকে নিয়ে কোনদিন ভাববি বলতো আমায়?? নির্দিষ্ট তারিখ বল। আমাকে নিয়ে ভাবে এমন মানুষের সংখ্যা খুবি কম। একি গ্রামের হওয়ায় নাজিম ভাই আমাকে ছোটভাই এর মতো স্নেহ করে। আমি মুচকি হেসে বললাম, আহা নিজেকে নিয়ে ভাবি বলে তোমার সামনে দাঁড়িয়ে। নাহলে কতদিনে নিঃশেষ হয়ে যেতাম। নিজাম ভাই এবার আমার কথায় রীতিমতো রেগে আগুন। তিনি হুঙ্কার দিয়ে বললেন, আমার সাথে একদম ফাজলামি করবি না। অফিস ফিরতে দেরি হলো কেন?? পকেটে টাকা নেই? কি মহামানবের হওয়ার প্রমাণ দিলি আবার হ্যাঁ। - আরে পার্কে হয়েছে এক কাহিনী। পরে সময় করে বলবো। এখন বলো হয়েছেটা কি?? - আজ বসের মেয়ে অফিস জয়েন করেছে। এসেই অফিস মাথায় তুলে রেখেছে। রিপোর্ট দেখবে বলে যে ক্লায়েন্ট গুলা এসেছিল তারা ফিরে গেছে। তোকে সামনে পেলে তো খুন করে ফেলতো মনে হয়। . আমি হাসলাম। আহ্লাদী কণ্ঠে বললাম, কেমন দেখতে বসের মেয়ে হু?? রূপসী হলে দিলাম নাহয় জীবন। নাজিম ভাই হতাশ হয়ে বললেন, তোকে নিয়ে আর পারলাম না। এখনো মজাক করছিস। - নাজিম ভাই হয়েছে টা কি বলো তো?? - নতুন মেমসাহেব তোকে সাজা দিয়েছে। আগামী সাতদিন তোকে এখন মুন্সীপাড়ার সাইটে থেকে সব দেখাশোনা করতে হবে। জানিস ওখানে কতো গরম!! বসার জায়গা পর্যন্ত নেই। নেই কোনো কেবিন। - আরে ওখানকার মেয়ে গুলো দেখতে যা। দেখে দেখে চুটকি তে সাতদিন চলে যাবে। নাজিম ভাই এবার ফিক করে হেসে ফেললো। বলল, না তোকে আর মানুষ করতে পারলাম না। নাজিম ভাইয়ের কথায় আমিও হেসে ফেললাম। . দুই.... . ফাইলের উপরে ছোট্ট করে লিখা মায়াস্কা আরবিন। কি উদ্ভট নাম। এই মেয়ের হাতে নিজের জীবনটা দিতে চেয়েছিলাম!! ভাবনার আড়ালে খেয়াল করলাম শ্রমিক গুলো আবার কাজ থামিয়ে বসে পড়েছে। উঠে গিয়ে তাদের দিক গেলাম। পায়ের শব্দ শোনামাত্র সব্বাই কাজ করা শুরু করে দিছে। এই লোক গুলোর এই এক সমস্যা। দাঁড়িয়ে থেকে সবকাজ করিয়ে নিতে হয়। . স্যার! নাজিম ভাই তো এলো না। আসেন আমার সাথে খেতে যাবেন। . ভদ্রলোকের কথা পিছন ফিরে তাকালাম। মুচকি হেসে বললাম, ধন্যবাদ। কিন্তু সত্যি বলতে কি নাজিম ভাই বাইরে খেতে নিষেধ করেছে। না চেয়েও মিথ্যে কথাটা বলে ফেললাম। পকেটে টাকা নেই বললে চলে। জুনিয়র এর সাথে খেতে যাবো নিজে বিল না দিলে হয় নাকি। আসুক না নাজিম ভাই কখন আসে। . বিকেলবেলা হতে চললো। নিজাম ভাইয়ের আসার নাম নেই। ক্ষুধায় মেজাজ চিটচিটে হয়ে গেছে। এমন সময় পিছন থেকে একজন ডাক দিলো। অনিচ্ছা সত্ত্বেও পিছন ফিরে তাকালাম। আমার বিশ্বাস ই হচ্ছে কালো পরীটা আমার সামনে দাঁড়িয়ে। আজো ফরমাল ড্রেসআপ, তাও আবার কালো। দিনের আলোতে মেয়েটাকে প্রথম দেখলাম। কিন্তু মেয়ে এখানে কি করছে!!! . ওইরকম করে দাঁড়িয়ে যে?? আমি থাকতে পাচ্ছি না এখানে। চলেন গাড়ির কাছে যাই। . কালো পরীর কথায় খানিক লজ্জা পেলাম। শ্রমিক দের কাজ যেন থামায় বলে হাটা শুরু করলাম। গাড়ির কাছে বসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। টেবিলের উপর দেখি নিজাম ভাইয়ের টিফিন বক্স। এই মেয়ের কাছে কোথা থেকে আসলো। ভাবতে ভাবতে সামনে বসে পড়লাম। ক্ষুধা পেয়েছে আবার এভাবে মেয়েটার সামনে খেতেও অস্বস্তি লাগছে। কালো পরী নিজে থেকে ভাত বেড়ে দিতো লাগলো। সাথে বলল, কোনকিছু জানতে না চেয়ে আমার এমনকিছু ডিসিশন নেয়া উচিৎ হয়নি। কিসের ডিসিশন?? মনে একটা খেয়াল আসলো। যা ভাবছি তা ঠিক হবে না তো। . খাওয়া শুরু করার পর কোনকিছু খেয়ালে আসলো না। মানুষখেকো ক্ষুধা পেয়েছিল। খাচ্ছি তখনি কালো পরী বলল, সবসময় অন্যের কথা ভাবলে চলে। নিজের কথাও কিছুসময় ভাবতে হয়। ভেবে দেখেন, আপনি অফিস ফিরতে সেদিন লেট না করলে আমি কখনো শাস্তি দেই?? আর এতক্ষণ আপনাকে না খেয়েও থাকতে হতো না। ভাত গলায় আটকে গেলো একথায়। তারমানে কালো পরীটাই আমার নতুন বস। মায়াস্কা আরবিন। আরবিন নিজে থেকে পানি এগিয়ে দিলো। খাওয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত আরবিন কোনোকথা বলল না। শুধু ঘোরলাগা চোখে তাকিয়ে রইলো। . আরবিন সাইটের ওখানে আমাকে থাকতে আর দিলো না। গাড়িতে করে অফিস ফিরছি। তখনি আরবিন বলল, কই আমার জবাব কিন্তু পেলাম না। আমি হাসলাম খানিক। বললাম, আচ্ছা আমাদের মা যদি কখনো সন্তান প্রসব করার কষ্টের কথা ভাবতো, আমরা কি কখনো পৃথিবীর মুখ দেখতে পেতাম বলেন। ঠিক তেমনি আমার যদি শুধু নিজের কথাই ভাবি পৃথিবীটা অতোটা সুন্দর লাগতো না। আর সেইদিন জামিল দাদুর হেল্প করে ক্ষতি হলো কই। আপনার মতো একটা ভালো বন্ধু পেলাম। - বন্ধু?? ভুলে যাবেন না আমি আপনার বস। - হেসে- সেটাতো অফিসে। এখানে নয়। - যাই হোক। কিন্তু আমি আপনার বন্ধু হলাম কবে? - হওয়ার পথে। - ওভার কনফিডেন্স ভালো বুঝলেন। আমি হাসলাম। আরবিনের সাথে আরো অনেক কথা হলো। মেয়েটা অফিসে একবার নাকি দেখেছিল আমায়। কিন্তু ঠিক মনে করতে পারছিল না কোথায় দেখেছে। পরে যখন বুঝতে পারলো পার্কের রোজ ঘুরঘুর করা ছেলেটা আমি তখন ছুটে এসেছে। . এরপর আরবিনের সাথে সম্পর্ক আরো গভীর হলো। সত্যি সত্যি মেয়েটা আমার বন্ধু হয়ে গেছে এতদিনে। আরবিন প্রফেশনাল ও পারসোনাল জীবন দুটো ভালোভাবে ম্যানেজ করছিল। ওর সাথে সময় অতিবাহিত করে বুঝতে পারি মেয়েটা কতোটা একা। আরবিনের বাবা আছে। কিন্তু আরবিনের মুখে উনার কথা কোনদিন শুনিনি। জুম্মার দিন আজ। নামায পড়ে এসেই শুয়েছি মাত্র। তখনি আরবিনের কল। আমাকে এখনি ডেকেছে। আরবিনের সাথে পরিচয় হওয়ার পর থেকে কোনদিন ওদের বাসা যাওয়া হয়নি। ওদের বাসা গিয়ে দেখি এলাহি কাণ্ড। মেয়েটা মনে হয় সকাল থেকে রান্না শুরু করেছে। খেতে বসে খেয়াল করলাম আঙ্কেল নেই। আরবিন একটা প্লেটে ভাত বেড়ে দিচ্ছিল। আমি বললাম, আঙ্কেল কই রে। আমার কথায় আরবিনের মুখ কালো হয়ে গেলো। দীর্ঘ নিশ্বাস নিয়ে বলল, অভ্র তোকে আমার একটা অনুরোধ করবো। উনাকে নিয়ে প্লিজ কোনকিছু জিজ্ঞেস আর করবি না। আমি কিছু বললাম না। তাড়াহুড়ো করে লাভ নেই। খেয়াল করলাম আরবিন একটা প্লেট সাজিয়েছে শুধু। জিজ্ঞেস করলাম, তুই খাবি না? আরবিন দুষ্টুমি স্বরে বলল, খাবো তো। খেয়ে দিবি তুই। আমি হাসলাম। এই মেয়ের শুধু হাইট বেড়েছে। কিন্তু মন থেকে এখনো বাচ্চা রয়ে গেছে। . আরবিন কে খাইয়ে দিচ্ছি। আর মেয়েটা রাজ্যের কথা শোনাচ্ছে আমায়। মাঝখানে কদিনের নিয়ম মতো আমার বিয়ের কথাও তুললো। এই কতদিন কারো সাথে কথা শেয়ার করেনি কে জানি?? ভালোই লাগছিল ওর কথা শুনে। আবার মনে মনে নিজেকে আটকপালে মনে হচ্ছিল। যে মেয়ে তার রোজকার দিনের আপডেট কাউকে দেয়, সে নিশ্চয় আটকপালে। আরবিন রান্নাঘর গেছে। পায়েস রান্না করতে। তখনি আরবিনের বাবা আমার সামনে এলো। এই ভদ্রলোক কে এর আগে গুনে কয়েকবার দেখার সৌভাগ্য হয়েছে। তিনি বসে বললেন, ধন্যবাদ দিলেও তোমায় কম হবে। জিজ্ঞাসু চোখে তাকালাম। কিছু জিজ্ঞেস করার আগে তিনি আবার বললেন, মেয়েটাকে বহুদিন পর হাসতে দেখলাম। নাহলে তো সবসময় কাঁদতে দেখেছি। তার কারণ অবশ্য আমি নিজে। একথা বলে ভদ্রলোক ভেঙ্গে পড়লেন। কিছুসময় পর বললাম, ঠিক কি হয়েছিল বলবেন। কথা দিচ্ছি আগেকার আরবিন আপনাকে ফিরিয়ে দিবো। চট করে ভদ্রলোকের মুখে হাসি ফিরে এলো। তিনি সবকিছু আমায় বললেন। উনার কথায় নির্বাক আমি। তিনি আরো বললেন, বাবা হই ওর। কোনো ছেলের সাথে যদি রিলেশন করে ছেলেটার খোঁজখবর নেয়া, কথা বলা বাবা হিসেবে কি আমার অন্যায় হয়েছে তুমি বলো। না জানি ছেলেটা আরবিন কে কি বুঝিয়েছে। এরপর থেকে মেয়েটা আমার সাথে কথা বলে না। কতদিন ওর মুখে বাবা ডাক শুনিনা। ভদ্রলোক কে বুঝিয়ে উপরে দুতলায় পাঠিয়ে দিলাম। আরবিনের আসার সময় হয়েছে। আসলে আরবিনের আসল নাম সানজানা আহমেদ। ছেলেটার সাথে সম্পর্ক খারাপ হওয়ার পর নাকি সানজানা নিজের নাম মায়াস্কা আরবিন রাখে। বাবার কোন পরিচয় সানজানা রাখতে চায়নি। এমনকি কালো কাপড় পড়ে তার পিছনে কারণ ওই ছেলেটার পছন্দ বলে। . পায়েস মুখে দিয়ে বললাম, সানজু! পায়েস টা জবরদস্ত হয়েছে। সানজানা চোখদুটো সরু করে তাকালো। নিশ্চয় ভাবছে ওর আসল নাম কিভাবে জানলাম। আমি চুপ করে থেকে আবার বললাম, তুই যে কদিন ধরে আমায় বিয়ে করতে বলছিস, কিসের জন্য?? আমার ভালোর জন্য তাইতো। এজন্য নিশ্চয় মেয়েকে যাচাই করবি তাই না। সানজু চট করে বলল, হু একশো বার করবো। তোর জীবনের ব্যাপার বলে কথা। সানজু কে বাকে আনতে পেরেছি। এবার অন্তিম চাল হিসেবে বললাম, এখন যদি আমি বলি তুই আমার জীবনে নাগ গলাস কেন?? আমার হবু বউ যদি ভুলভাল বুঝিয়ে তোর কাছে আমায় দূরে ঢেলে দেয় তখন কি করবি শুনি? সানজু কপট স্বরে, করে দেখ আমার সাথে এতো বড় অন্যায়। একেবারে খুন করে ফেলবো। শান্ত গলায় বললাম, তাহলে আঙ্কেলের সাথে যা করেছিস, করছিস তা কি অন্যায় না। তোর মতো আমিও যদি এমন করি। সানজু এবার তেলেবেগুনে ভেজে আগুন। সাথে সাথে আঙ্কেল কে নিচে ডাক দিলো। ভালোমন্দ অনেক কথা বলল। এক চুপ করে আবার বলল, বাবা তোমায় ভালো করে বলছি; প্লিজ আমার জীবনে নাগ গলাতে আসবে না। এ কথা বলে সানজু নিজের রুমে চলে গেলো। আঙ্কেল কে সরি বললাম। তিনি আরো খুশি হয়ে বলল, আরে বলছ কি!! আজ কতদিন পর মেয়েটা আমায় বাবা ডেকেছে জানো। মেয়ের প্রতি বাবার ভালবাসা দেখে অবাক হলাম। এত কথা শোনার পরেও ভদ্রলোক বাবা ডাক শুনেছে বলে খুশি। আর আমার পিচ্চি বন্ধুটা এমন একটা মানুষ কে কষ্ট দিয়ে গেছে এতদিন। . ফুলেরভাস্ টা একটুর জন্য তার নিশানা মিস করলো। আর আমি গেলাম বেচে। আমাকে দেখে সানজু আরো ভড়কে গেলো। ঘরের সব জিনিসপত্র ভাঙ্গার যেন কাজ পেয়েছে। ভয় করছে, মেয়েটা নিজের যেন কিছু ক্ষতি না আবার করে বসে। পিছন থেকে চুপটি করে সানজু কে জড়িয়ে ধড়লাম। ওহ নিজের মুখ ফিরে বুকে রেখে কাঁদতে লাগলো। মাথা বুলিয়ে দিতে লাগলাম। শান্ত গলায় বললাম, আমার মুখে দূরে যাওয়ার কথা শুনতে এই হাল। ভাবতো আঙ্কেল কতোটা কষ্ট পেয়েছে?? সানজু শুধু হু' বলল। বলে বুকে আরো ভালো করে মাথা রাখলো। কি শান্ত রয়েছে মেয়েটা এখন। কে বলবে এই মেয়েটা একটু আগে তাণ্ডবলীলা করেছে। . তিন.... . রাত তিনটে বেজে আটচল্লিশ মিনিট। হুট করে জেগে উঠলাম। মেসেঞ্জারে তখনো এক্টিব রয়েছি। সানজুর সাথে টেক্সট করতে করতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি খেয়াল করিনি। চেক করে দেখি সানজুর সতেরো টা ম্যাসেজ। আর তখনো ওহ অনলাইনে। টেক্সট দিলাম, কি রে এখনো জেগে কেন?? কয়েক সেকেন্ডের মাঝে রিপ্লাই আসলো, কথা নেই কারো সাথে। বললাম, কি করেছি আমি?? - কেউ আমাকে এখনো শুভরাত্রি বলে নি তাই। সানজুর কথায় কি রিয়াক্ট করবো ভেবে পাচ্ছি না। রাগের ইমোজি দিয়ে বললাম, এমন কেউ করে?? - কেউ না করলে আমি করি। তুই যদি শুভরাত্রি বলতে আসিস আর আমাকে না পেয়ে মন খারাপ করিস। তাই তোর অপেক্ষা করছি। মেয়েটা আমার জন্য এখনো ঘুমোয় নি। ভাবতে খারাপ লাগছে। তাই সরি বললাম। সানজু ভেংচি কাটার ইমোজি দিয়ে বলল, ওসব সরি টরি কিচ্ছু হবে না বাবু। শাস্তি পেতে হবে। হেসে জবাব দিলাম, বলেন শাহজাদি। আমার এক কথায় আমার জান হাজির। সানজু বলল, জনাব জান দিতে হবে না, আপনাকে দেখতে ইচ্ছে করছে। একটা গল্প পড়লাম। আমার মতো এক মেয়ের জীবন হতে ওর প্রিয় মানুষটি হারিয়ে যায়। গল্প টা পড়েই ভয়ে মরে যাচ্ছি। একবার দেখবো তোকে। কিন্তু তা কিরে সম্ভব। তুই এতরাতে কেমনে আসবি। . জোরে জোরে সাইকেলের প্যাটেল মারছি। আর বেশিদূর না সানজু দের বাড়ির। ডাটা অন করায় আছে। সানজু কে যতক্ষণ না শুভরাত্রি' বলছি মেয়েটা ঘুমাবে না আমার জানা আছে। ওর মুখে অমন কথা শুনে নিজের মাঝে কি যে হলো। পাশের মেসের ভাইকে এতরাতে ডেকে তুলে সাইকেল নিলাম। দারোয়ান সাহেব নিজের কাজ না করে অঘোরে ঘুমাচ্ছে। সানজুর রুমের নিচে এসে ফেবুতে টেক্সট করলাম, জানালা খুল। দেখলাম ওর ঘরের লাইট জ্বলে উঠলো। একটু পর জানালা খোলার শব্দ পেলাম। সানজুকে দেখে মনে হলো মেয়েটা যেন কাঁদছে। নীরবে কাঁদছে। একসময় সানজু ফিরে গেলো। আমি নিচে অপেক্ষা করতে থাকলাম। পাশের বাগানে চোখ পড়লো। যদিও রাতে গাছের পাতাও নাড়া বারণ তবু মন মানছিল না। সানজুর মাথায় টকটকে গোলাপ বড্ড মানাবে। সানজু নিচে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরলো। একটু পর খেয়াল করলাম মেয়েটা আমার শার্ট ভেজাতে ব্যস্ত। বললাম, এই বোকা মেয়ে, কাঁদছিস কেন?? সানজু মুখ তুলে তাকালো। বলল, জানিস আমি কতোটা ভয় পেয়েছিলাম। আল্লাহ্ না করে তোর যেন কিছু হয়। আমি ঠাট্টা করেই বললাম, হলেই বা কি!! এতে মেয়ের মুড নিমিষে বদলে গেলো। একসময় পেটের কাছে চিনচিন ব্যথা অনুভব করছিলাম। তাকিয়ে দেখি সানজু আমায় চিমটি কাটছে। সত্যি ওর নগ বড় থাকায় লাগছিল বহুত। বললাম, আহা লাগছে তো। - লাগছে লাগুক। আপনার অমন কথা বলার সাহস হলো কেমনে?? - আমি আবার কি করলাম?? - সাধু সাজা হচ্ছে তাই না!! কসম করে বল আমার আর অমন বলবি না। - তুই এতো সিরিয়াস হচ্ছিস কেন?? না কসম করতে পারবো না। মুখ ফসকে যদি আবার বলে ফেলি। আর তোর যদি কিছু হয়। সানজু চুপ করে ওর কাজ করে যাচ্ছে। চিমটি কাটার মাত্রা আরো বাড়িয়ে দিলো। বললাম, আমি ব্যথা পাচ্ছি তোর খারাপ লাগছে না। - তোর থেকেও বেশি। মনে হচ্ছে কলিজায় ছুরি দিয়ে কেউ আঘাত করেছে। কিন্তু আমি তোর মুখে একথা শুনেই দম নিবো। একটু সময়ের কষ্ট যদি অনাবিল হাসির কারণ হয় তাহলে ক্ষতি কি। . সানজুর জেদের কাছে হার মানতে হলো। কসম করলাম। ওহ আবার জড়িয়ে ধরে বলল, কেমনে আসলি? - সাইকেলে করে। সাইকেলের কথা শোনামাত্র সানজুর মুখে একশো পাওয়ারের বাল্ব জ্বলে উঠলো যেন। বাহানা করলো আমার সাথে সাইকেলে ঘুরবে। এই প্রথম সানজু আমার কাছে কোনকিছু আবদার করেছে। না করতেও পারছি না। আবার ভয়ও লাগছে। এতরাতে কি করে ওকে নিয়ে বাইরে ঘুরতে বেড়াই?? সানজুদের বাগানে কম আলো নেই। সানজু কে সামনে বসিয়ে ঘুরতে শুরু করলাম। গোলাপ ফুলটাও চুলে লাগিয়ে দিয়েছি। মানিয়েছে অনেক। বললাম, শুনছিস গোলাপের কাটা থাকা তার কপালে লেখা। এজন্য আমরা যদি তাকে ঘৃণা করি এ ভয়ে গোলাপ তার কাটা নিঃশেষ করে দেয়, তা কি উচিৎ হবে? সানজু বলল, মোটে না। গোলাপ যদি আমাদের জন্য নিজের অস্তিত্বর সাথে জড়িত কাটা নিঃশেষ করার মনোভাব রাখে তাহলে আমরা কেনো গোলাপ কে কাটা সহ ভালবাসার মনোভাব রাখতে পারি না। তা নাহলে ভালবাসা কি কখনো সত্য হয়। যা শুনতে চেয়েছিলাম পেয়েছি। বললাম, তাহলে তুই কেন অন্যের জন্য নিজেকে বদলাবি। নিজের মতো চলতে পারিস না। আর দুজনের মতো বাচতে পারিস না। সানজু চুপ করে থাকলো। আমিও আর কিছু বললাম না। নিশ্চয় সানজু বুঝতে পেরেছে আমি কালো জিনিস ব্যবহার করার কথা বলছি। অনেকক্ষণ চুপ করে থাকার পর সানজু বলল, একটা বাছাই করতো। কে আগে, সানজু না অভ্র? আমি নিঃসংকোচে বললাম, সানজু। . দরজার ধপধপ শব্দে ঘুম ভাঙ্গলো। কে এতো সকালে?? দরজা খুলে দেখি সানজু দাঁড়িয়ে। বাইরে দেখে তো দুপুরবেলা হয়েছে মনে হচ্ছে।আজকে ওর সাথে বাইরে যাওয়ার কথা। ওর খুশি ফিরিয়ে দিবো আজ। কিন্তু সানজু কে অন্যরকম লাগছে। ওহ মিষ্টি কালারের শাড়ি পড়েছে। কপালে বাকা টিপ। এই প্রথম সানজু কে সাজে দেখছি। . কি হলো?? তাকিয়ে থাকবে শুধু ঢুকতে দিবে তো। . সানজুর কথা লজ্জা পেলাম। সরে যেতেই ওহ রুমে ঢুকলো। বললাম, তুই শাড়ি পড়ছিস যে?? সানজু বলল, কাল তোর কথায় ভুল ছিল। ভেবে দেখ গোলাপের কাটা থাকলেও কিন্তু অনেকে আমরা গোলাপ কে বুকে টেনে নেই। তখনি গোলাপ নিজের অস্তিত্ব বিলীন করতে দুবার ভাববে না যদি তার ভালবাসা সত্যি হয়। ঠিক কাটার ছোবলা খাওয়ার ভয় থাকা সত্ত্বেও গোলাপকে আগলে নেয়া ভালবাসার মতো। আমাদের জন্যও তাই প্রযোজ্য। শুধু চোখে আবেগের পট্টি হটিয়ে ভালবাসার নজরে দেখতে হয়। তাহলে হলো। পেয়েছি আমি সেই ভালবাসা। হুট করে সানজু মনোবিজ্ঞানী হলো কেমন করে বুঝলাম না। ওকে বসিয়ে রেখে রেডি হতে গেলাম। . রেস্টুরেন্টে অনেকক্ষণ বসে আছি। যার আসার কথা সেই নেই। টেক্সট করে বলেছিলাম আমরা বেড়াচ্ছি। সানজু যাতে বিরক্ত না হয় তাই বললাম, সকালবেলা কখন এসেছিলি তুই?? সানজু মুচকি হেসে বলল, তুই দরজা খোলার দুঘণ্টা আগে সম্ভাবত। কাল তুই যাওয়ার পর ঘুমাতে পারিনি। অনেক ভেবেছি। ভেবেছি গোলাপের কাটার ছোবল খাওয়ার ভয় না থাকা মানুষটাকে আপন করে নিবো। আমি বিস্মিত হয়ে বললাম, পাগল নাকি তুই। এতক্ষণ দাড়ায় ছিলি!! চলে গেলে কি হতো। আর এসব কি বলছিস। - অনেক ক্ষতি হয়ে যেতো যে। আমি চেয়েছিলাম আজ থেকে তোর প্রতিটা দিন যেন আমায় দেখে শুরু হয়। সানজুর কথা কিছু বুঝলাম না। বলবো কিছু তখনি নাঈম এসে হাজির। নাঈম ই সেই ছেলে যাকে সানজু ভালবাসে। . ঠিক করলাম দুজন কে এখানে রেখে যাই। কিন্তু তখনি খারাপ লাগা শুরু হলো। সানজুকে হারানোর ভয় বিরাজ করছিল মনে। হুট করে নাঈম বলল, সানজানা বড়ই রঙ্গে আছো দেখছি। এই বদ ছেলে বলে কি। আমার অবাক হওয়া তখনো শেষ হয়নি। নাঈম সানজু আর আমাকে নিয়ে এবার খারাপ কথা বলা শুরু করলো। সানজু চট করে আমায় থাপ্পড় মারলো। চড় তো নাঈমের খাওয়ার কথা। আমাকে মারলো কেন?? সানজু কপট স্বরে বলল, তোকে না সকালবেলা বুঝালাম। গোলাপ সত্যিকার ভালোবাসা পেলে তার অস্তিত্ব বিলিয়ে দিতেও দুবার ভাববে না। এই ছেলের জন্য আমি সেটা করবো ভাবছিস। আমি চুপ করে থাকলাম। সানজু আসলে বলতে কি চাচ্ছে। সানজু আবার বলল, তুই আমাকে বোকা বলিস। তুই একটা আস্ত গাধা। আচ্ছা গোলাপ যদি আমি হই তাহলে গোলাপের ভালবাসা তুই। গতরাতে যখন নিজের আগে আমাকে চুজ করলি তখনি বুঝে গেছি। আমার বুঝতে বাকি রইলো না সানজু আমায় প্রপোজ করছে। নাঈম বেটাকে একবার চোখ রাঙ্গানো দেখাতে চলে গেলো। সানজু এবার সাহসী কাজ করে বসলো। গতরাতে যে ফুলটা ওর মাথায় পড়িয়েছিলাম সেটা হাতে নিয়ে বলল, বিয়ে করবি আমায়?? মূর্তিমান হয়ে গেছি। সানজু কে দাড় করালাম। ওকে দেখছি। সন্ধ্যার আধারে দেখা হয়েছিল যে মেয়েটার সে আজ আমার জীবনের আলোয় রুপ নিয়েছে। ভালবাসা অনেকে জীবনে আলো ছড়ায় এমনে করেই বুঝি।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১১৯৫ জন


এ জাতীয় গল্প

→ প্রদীপ জ্বলা সন্ধ্যায়!

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now