বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

প্রাকপুরুষের চশমা-০৫

"ভৌতিক গল্প " বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রিয়েন সরকার (০ পয়েন্ট)

X প্রাকপুরুষের চশমা (পঞ্চম পর্ব) লিখেছেনঃ সানজিদা সুলতানা সুমা । রুকনের এ প্রশ্নে সুজানার মনে ফের সেই অপরাধবোধটা জেগে উঠে। রুকনের বিবাহ বিচ্ছেদের জন্যে নিজেকেই দায়ী মনে হয় ওর। রুকন ওকেই ভালবেসেছিলো। সুজানা সেই ভালবাসাকে তছনছ করে আরিফের ঘরে চলে গেছে। রুকনের মনে সেটা এক গভীর ক্ষত সৃষ্টি করে। সুজানার স্থলে দৃপ্তিকে ও কিছুতেই মেনে নিতে পারে নি। ফলে শুরু হয় দাম্পত্য কলহ যা ডিভোর্সে পুর্ণতা পায়! ছোট্ট একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে সুজানা। নিজের জন্যে তার প্রিয় হাসি খুশি বন্ধুটার জীবনের এমন করুন পরিণতির ব্যাপারটা কিছুতেই মেনে নিতে পারে না ও। গম্ভীর পরিবেশটা হালকা করতে আরিফ সবাইকে বীচে বেড়ানোর প্রস্তাব দেয়। প্রস্তাবটা লুফে নেয় রুকন, সুজানাও নিম রাজি হয়ে মত দেয়। খানিক পরেই তিন বন্ধু সাগরতীরে বেরিয়ে পরে প্রাতঃভ্রমণে। বীচে আরিফ আর রুকন পাশাপাশি হাটতে থাকে তবে বার্ধক্যের প্রভাবে সুজানা একটু পেছনেই পড়ে। দুই বুড়োর সাথে হাটার তাল ঠিক রাখতে পারে না ও। সুজানাকে সাথে নিয়ে চলার জন্যে ওদের একটু পরপর বারবার থামতে হয়। এভাবে থেমে অপেক্ষা করার সময় রুকনের কলেজ জীবনের সেই দুষ্টুমিটা মনে পড়ে যায়। ও আরিফের দিকে চোখ টিপে বলে, "ওই যে দেখ নীল বিকিনি পরা মেয়েটা। হয়াট এন আইটেম! দেখলেই চোখ জুড়িয়ে যায়।" আরিফ এক গাল হেসে বলে, "আমাদের পোলিশ আইটেম গুলো আসলেও সুন্দর। কাল সুজানাকে বাড়িতে ফেলে এসে দুজনে মিলে একটা কে বাগানোর চেষ্টা করব কেমন?" রুকন মাথা নেড়ে সায় দেয় তাতে। ওদিকে সুজানা কাছেই চলে এসেছিলো। ও তাদের কথা শুনতে পেয়েছে। রাগে ভেতরটা ফুঁসছে ওর। ও ভাবছে বুড়ো হলে তবে কি সত্যি সত্যিই পুরুষের ভিমরতি রোগ হয়? তবে ও ব্যাপারটা শুনেও না শুনার ভান করে এড়িয়ে গেল! কাল একদম হাতে নাতে যেয়ে ঘাড়ে ক্যাক করে ধরবে। বীচে কিছুক্ষণ অকাজে ঘুরাঘুরির পর ক্লান্ত হয়ে ওরা সবাই সাদা বালুতেই বসে পড়লো। সকালের কোমল সুর্য আকাশ থেকে উষ্মতা বিলিয়ে দিচ্ছে আর নিচে সাগরের ঢেউগুলি ক্রমাগত তীরে আছড়ে পড়ছে। এমন রোমান্টিক পরিবেশে রুকন গান ধরলো, "নদী এক পাড় ভাঙ্গে, ওপার গড়ে ,এই তো নদীর খেলা রে ভাই, এই তো নদীর খেলা।" সুজানা নামক সদা বহমান খড়স্রোতা নদীটা রুকনের পাড়ের ঘরবাড়ি, ভিটেমাটি, সংসার সব ভেঙে আরিফের পাড়ে নিয়ে গড়ে দিয়েছে। রুকন কখনো এর কারণ জানতে পারে নি। ও জানতেও চায় না। এটাই তো স্বাভাবিক। এটাই তো নদীর ধর্ম। দেখতে দেখতে চোখটা ভীজে উঠে ওর। ব্যাপারটা সুজানার চোখ এড়ায় না। নিজের ভেতরের অপরাধবোধটা আরো তীব্রতর হয় তার। দুপুরের দিকে ওরা সবাই বাড়িতে ফিরে আসে। ক্লান্ত শ্রান্ত তিন বৃদ্ধ। সুজানা লাঞ্চ বানাতে ব্যাস্ত হয়ে পড়ে। রুকনের প্রিয় খাবারের তালিকাটা এখনো ওর মনে আছে। ভাত, আলুভাজি, সাথে এক বাটি বেগুন ভর্তা। আরিফের বেগুনে আলার্জি তাই ওর জন্যে ডাল। এই সামান্য কিছু দিয়েই ওদের জম্পেশ লাঞ্চ হয়ে যায়। বার্ধক্যে শুকিয়ে যাওয়া পেটগুলি ভরতে আর বেশী কিছুর কি প্রয়োজন। লাঞ্চের পর ওরা সবাই কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেয়। বুড়ো দুটো ড্রয়িংরুমের কাউচে আধশোয়া হয়ে টিভি দেখতে থাকে আর সুজানা বেডরুমে ফিরে বিছানায় গা এলিয়ে দেয়। কিন্তু কারো চোখেই ঘুম আসে না। বার্ধক্যে ঘুম চলে গেলে কি যে অশান্তি লাগে তা একমাত্র বৃদ্ধরাই জানে। বিকালে রোদ পড়ে এলে ওরা সবাই ফের বেরিয়ে পড়ে রুকনকে শহরটা ঘুরিয়ে দেখাতে। আরিফ গাড়ি চালায়, সুজানা তারপাশে বসে। পেছনের সিটে রুকন একাকী বসে গাড়ির দুপাশের জানালা দিয়ে চোখ বুলিয়ে যায়। সাগরতীরে গড়ে উঠা ছোট্ট সুন্দর এক শহর এই বাল্টিস। ট্রাফিকজ্যাম, ভিড় ঝঞ্চাট আর কোলাহল থেকে মুক্ত। আকাশ ঢেকে দাড়ানো সুউচ্চ অট্টালিকার সংখ্যা এখানে নগন্য। তাই দিগন্ত বিস্তৃত নীল আকাশটা যেন পরম যত্নে শহরটাকে মুড়িয়ে রেখেছে বলে মনে হয়। ঘুরতে ঘুরতে পার্কে পৌছায় ওরা। গ্রীষ্মের মৌসুমি ফুলে পার্কটা ভরে উঠেছে। সাগরের নির্মল বাতাস সেই ফুলেল সৌরভটা ছড়িয়ে দিচ্ছে পুরো শহর জুড়ে। পার্কের বেঞ্চিতে বসে খুশগল্প করতে করতে কখন যে সন্ধা ঘনিয়ে আসে সেদিকে ওদের খেয়ালই থাকে না। আধার ঘুটঘুটে হয়ে এলে ওরা পার্ক ছেড়ে উঠে ফের রাস্তায় বেরিয়ে পড়ে। গাড়ি চালাতে চালাতে আরিফ একটা রেস্টুরেন্টের সামনে গাড়ি থামায়। ডিনারটা এখানেই সারতে চায় ও। সুজানা মনোক্ষুন্ন হয়। ও চেয়েছিলো রুকন যে কদিন আছে ওকে নিজের হাতে রান্না করে, তার প্রিয় খাবার গুলি খাওয়াবে। কিন্তু আরিফ সেটা বুঝতে চায় না। অগত্যা ওরা ওই রেস্তোরাঁয় ডিনার সারে। ডিনার টেবিলে এক আশ্চর্য নিরবতা দানা বাধে। সুজানা তো স্বভাবতই নিরব, কিন্তু কোন এক আশ্চর্য কারণে রুকনও একদম নিশ্চুপ। কেবল মাথা নিচু করে একমনে খাবার গিলেই চলেছে। আরিফের কাছে ব্যাপারটা ভাল ঠেকে না। সুজানাও ভেতরে ভেতরে এই আকর্ষিক নিরবতায় বিষ্মিত। তবুও ওরা খাওয়া চালিয়ে যায়। খাবার শেষে ওরা সবাই এক সাথে বাড়ি ফিরে। ফিরতি পথেও খুব একটা কথা হয় না ওদের মাঝে। সবত্র এক গোমট ভাব জমে আছে। এতক্ষণ সুজানা এটা নিয়ে চিন্তিত ছিলো কিন্তু এখন অনেকটা আতঙ্কিত। আগ বাড়িয়ে কথা শুরু করতে চায় ও। কিন্তু সুবিধা করতে পারে না মোটেও। সুজানা: "ক টা বাজে রে রুক্কু? " কিন্তু মাঝপথে আরিফ ওকে থামিয়ে দিয়ে শর্টকাটে জবাব দেয় "৯টা বিশ।" তারপর আর কোন কথা হয় না গাড়িতে।বাড়ি ফিরে সুজানা ওর কাঁধে প্রচন্ড ব্যাথা অনুভব করে। বৃদ্ধ শরীরে এসব ছুটাছুটি আর রান্না বান্না একটুও সহ্য হয় না। নিরবে বেডরুমে যেয়ে শুয়ে পড়ে ও। আরিফও তার পেছন পেছন বেডরুমে ঢুকে, বাথরুমে চলে যায়। পাশের বেডরুমে রুকনের গলা খাকড়ানোর শব্দ শোনা যায়। আজ ওরা সবাই ক্লান্ত। তাই তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়লো সবাই। বেডরুমের বাতিগুলি নিভে যেয়ে আলো আধারীতে এক অদ্ভুতুড়ে পরিবেশের সৃষ্টি করলো। রাত প্রায় দুটোর সময় হঠাৎ করে সুজানার ঘুম ভেঙে গেলো। ঘুম ভেঙে উঠে বসতেই ও ড্রয়িংরুমে বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শুনতে পেলো। এত জোরে হল শব্দটা যে সুজানা ভয়ে আতঁকে উঠলো। সুজানা: আরিফ, এই আরিফ। তাড়াতাড়ি ওঠ। আমাদের ড্রয়িংরুমে সম্ভবত বোমা ফুটেছে।" আরিফ: "আউ আ আ আমম,,,,,,,,,,। কি যেন হয়েছে বললি? " সুজানা: "আমাদের ড্রয়িংরুমে একটা বিষ্ফোরণ হয়েছে! তাড়াতাড়ি কিছু একটা কর! " আরিফ: "কিসের বিস্ফোরণ!" সুজানা: "একটু আগে যে বিকট শব্দে বোমা ফাটলো তুই শুনিস নি?" আরিফ: "কি যা তা বলছিস! ওসব বোমা বিস্ফোরণ কিচ্ছু না। কেবল তোর অধঃবায়ু বেরিয়েছে। ওটা তারই শব্দ। এসব নিয়ে না ভেবে এবার ঘুমিয়ে পড়।" এ কথা বলেই আরিফ পাশ ফিরে শুয়ে পড়লো। সুজানার মাথাটা জ্বালিয়ে দিয়েছে আরিফ। ও কখনোই সুজানাকে সিরিয়াসলি নেয় নি। আজও এই বয়সে এসেও ওকে স্রেফ উপেক্ষা করেই যাচ্ছে। সুজানার আর সহ্য হয় না। কেন জানি মনে হয় আরিফকে বেছে নেওয়াটাই জীবনের অনেক বড় ভুল হয়ে গেছে। সুজানা রাগে দুঃখে বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ে। তারপর নিজেই দেখতে চলে ড্রয়িংরুমে ঠিক কি হচ্ছে। ড্রয়িং রুমের কাছাকাছি যেতেই সেখান থেকে ফের গুলাগুলির শব্দ আসতে শুরু করে। ঝাকে ঝাকে গুলি যেন বেডরুমের দেয়ালে বিঁধছে। রুমের ভেতর থেকেও কে যেন থেমে থেমে গুলি ছুড়ছে। তারপর একটা ছোট্ট চিৎকার। "আহহহ! ডাক্তার, আমার পেটে স্পিন্টার লেগেছে। হায় ঈশ্বর, আমার ভুড়ি বেরিয়ে গেছে! আমাকে বাঁচানননন, প্লীজজজজ,,,,,,," আহত লোকটা কি এখনো বেঁচে আছে? মানবিকতার তাগিতেই সুজানা ড্রয়িংরুমের দরজার দিকে এগিয়ে যায়। কিন্তু দরজার হ্যান্ডেলটা ধরতে যেয়েই ও থমকে দাঁড়ায়। ওখানে যদি সত্যিসত্যিই গুলাগুলি হয়ে থাকে তো আরিফ শব্দটা শুনতে পেল না কেন? এই অদ্ভুত শব্দগুলি কেবল সে ই শুনেতে পাচ্ছে, আর কেউ নয়। ও জানেনা দরজা খুলার পর ভেতরে ঠিক কি অপেক্ষা করছে। খুব সম্ভবত নাড়িভুঁড়ি বেরিয়ে থাকা একটা মরা লাশ দেখতে চলেছে ও। হ্যান্ডেলটা মোচড় দিতে যাবে তখনই ওর পেছনে খুট করে একটা শব্দ হল! সাঁ করে পেছন ফিরে ও দেখে রান্নাঘরের দরজা দিয়ে রুকন বেরিয়ে আসছে। হাতে একটা বড় মীট চপার (চাপাতি) বাগিয়ে ধরা। সন্তপর্ণে ধীর স্থির পদক্ষেপে ও তারই দিকে এগিয়ে। এবার সুজানার কাছে রুকনের আকর্ষিক আগমনের রহস্যটা খুলে যায়। ওর পোল্যান্ড ভ্রমণের উদ্দেশ্যটা কেবল অবসরের ছুটি কাটানোই নয়, বরং চরম প্রতিশোধ গ্রহণ। যৌবনে না পাওয়ার প্রতিশোধ। জীবনটাকে তছনছ করে দেওয়ার প্রতিশোধ। আজ সন্ধা থেকে চুপচাপ থেকে নিরবে রুকন সম্ভবত সেই পরিকল্পনাই করছিলো। সুজানা পিছু হটে দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দাড়ায়। ও সাহায্যের জন্যে আরিফের নাম ধরে চিৎকার করার চেষ্টা করে। কিন্তু সুজানার ভয়ার্ত গলা দিয়ে কোন শব্দ বেরুয় না। সে কেবল একটা ঢোক গিলে। ওদিকে রুকনও দেখতে দেখতে ওর কাছে চলে আসে। দুজনের মধ্যে কেবল এক হাতের মতো দুরত্ব বিদ্যমান। ভয়ের আতিশয্যে সুজানা চোখ বন্ধ করে ফেলে। ভয়াল মৃত্যুর দিকে ও বেশীক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারে না। (চলবে)


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১১৮৪ জন


এ জাতীয় গল্প

→ প্রাকপুরুষের চশমা-০৫

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now