বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
বিংশ শতাব্দীর শেষদিকে এসে বিজ্ঞান অনেক এগিয়ে গেছে। অতীতের অনেক বড় বড় আবিষ্কারই চাপা পড়ে গেছে প্রযুক্তি আর তথ্যের স্তূপের নিচে। সভ্যতার এ অগ্রগতি সত্যিই বিস্ময়কর। কিন্তু বিচিত্র জায়গা এ পৃথিবী। ব্যাখ্যার অতীত অনেক ঘটনা এখনো এখানে ঘটে। এখনো দেশের বহু মানুষ বিশ্বাস করে জ্বীন-পরীতে। খোদ রাজধানী শহরের অফিসপাড়ায় টিউবলাইটের আলোর নিচে তাবিজের গল্প করতে ভালোবাসেন অনেকে। অনেকে আবার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দাঁড় করানোর চেষ্টা করেন অতিপ্রাকৃতিক ঘটনাবলীর। নানা চেষ্টা-চরিত্র চলে চারিদিকে। তারা কেউ কেউ একটি স্বতন্ত্র আধ্যাত্মিক জগতের কথাও বলেন, রসায়ন আর পদার্থবিদ্যার সূত্রসমূহ নির্ধারিত হয় যেখানে। যুক্তিবাদীদের সাথে ভীষণ তর্ক শুরু হয়ে যায় তখন তাঁদের। হ্যাঁ, এটা সত্য যে সভ্যতা মানুষেরই সৃষ্টি, কোন ফেরেশতা এসে তাজমহল বানিয়ে দিয়ে যায়নি। কিন্তু পাশাপাশি এটাওতো সত্য যে এই বিশাল মানবসভ্যতাটা ধ্বংসের জন্য একটা গ্রহাণু বা একটা ধূমকেতুর সাথে পৃথিবী নামক গ্রহটার সামান্য একটা সংঘর্ষ কিংবা মানুষের স্বসৃষ্ট পারমানবিক বোমাগুলোর কয়েকটার বিস্ফোরণই যথেষ্ট। তাজমহল তখন একবস্তা ছাই ছাড়া আর কিছুই না। আসলে বেশিরভাগ মানুষের জীবনে প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত আয়-ব্যয়ের একটা চক্র ছাড়া আর কিছুই নেই। অবিরাম অবধারিত এ চক্র আমাদের কোথাও নিয়ে যায় না, ফলে অনেকে আবার ঝুঁকে পড়ে সেকেলে জরাজীর্ণ আধ্যাত্মবাদের দিকে – ছাই উড়িয়ে পেতে চায় মানিক-রতন। তাদের অনেকেরই আবার বিশ্বাসের জোর যথেষ্ট নয়। এদিকে সত্য কারো বিশ্বাস-অবিশ্বাসের ধার ধারে না, জীবন তার অদ্ভুত রহস্যময়তা নিয়ে বয়ে চলে অবিরাম। ঘষা কাচের মত রহস্যময়তা নিয়ে আসে একেকটা দিন। আমার কম বয়সের এমনি এক রহস্যময় দিনে এক পরীর সাথে দেখা হয়েছিল আমার।
পৃথিবীর ভেতর সবচেয়ে নিকৃষ্ট জায়গা নাকি বাজার। শোনা যায়, বাজারের বিভিন্ন অলি-গলিতে ডিম পেড়ে রাখে মেয়ে শয়তানের দল, সময়মত খোলস ফুঁড়ে বের হয় বাচ্চা শয়তানেরা। আমাদের নিউমার্কেটের এমনি এক গলিতে কিছু লোক ক্রোকারিজের ব্যবসা করে, দোকানও আছে অনেকগুলো। তারই একটাতে দেখলাম একটা মেয়ে দোকানদারের সাথে সমানে তর্ক করছে।
কৌতূহলবশতঃ কাছে এগিয়ে গেলাম, ওদের কথাবার্তা শুনে বুঝলাম – ভীড়ের মধ্যে ধাক্কা লেগে একটা কাচের বাটি পড়ে ভেঙ্গে গেছে এবং দোকানদার একা মেয়েমানুষ পেয়ে পুরো সেটটারই দাম দাবী করছে। রাগে-অপমানে মেয়েটার চোখ-মুখ লাল হয়ে গেছে, কিন্তু বেচারী ভীড়ের মধ্যে কিছুই ঠিকমত বলতে পারছে না। ওকে দেখে আমার মায়াই লাগল, কারণ সে একসময় বাটিটার দাম দিতে রাজী হয়েছিল, কিন্তু দোকানী ছোকড়াটা পুরো সেটটার দাম ছাড়া নিতে রাজীই হচ্ছে না।
হঠাৎ কি মনে করে আমি সামনে এগিয়ে গেলাম এবং ছেলেটাকে থামিয়ে বললাম যে তারও উচিত হয়নি রাস্তার উপর সওদা-পাতি রাখা। সে বোধহয় এর জন্য প্রস্তুত ছিলনা – কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে থাকল, তারপর মনে হল আরো ক্ষেপে গেল, এবং শেষে আমার সাথেও তর্ক শুরু করল। আমি যখন ব্যাপারটা মীমাংসার জন্য বণিক সমিতির অফিসে যাবার কথা বললাম, তখন সে আমাকে অশ্লীল একটা গালি দিয়ে বসল।
আমার মনে হল এখন কিছু না করাটা একেবারেই খারাপ দেখাবে, যেহেতু আমি একজন সদ্য তারুন্যোত্তীর্ণ যুবক। আমি সামনে গিয়ে তাকে একটা ধাক্কা মারলাম এবং অপ্রত্যাশিতভাবে সেও আমাকে একটা ঘুষি দিয়ে বসল। হয়তো মানুষের ভুলের কারণেই মারামারি হয়, হয়তো শয়তানরা মানুষের মধ্যে ঝগড়া লাগিয়ে পালিয়ে যায় তারপর দূরে গিয়ে দাঁড়িয়ে মজা দেখে। কিন্তু আমি বুঝতে পারলাম, এই নাটকটিতে আমার চরিত্রটি নির্দিষ্ট হয়ে গেছে এবং তাতে আমাকে অভিনয় করে যেতেই হবে।
যেহেতু মঞ্চে একবার ঢুকে গেলে নিজেকে আর প্রত্যাহার করে নেয়া সম্ভব নয়, সুতরাং আমি মারামারিতে জড়িয়েই পড়লাম। কিন্তু অল্পসময়ের ভেতর আশ-পাশ থেকে আরো কিছু দোকানী বের হয়ে আসায় আমরা গুটিকয়েক লোক শেষপর্যন্ত খুব একটা সুবিধা করে উঠতে পারলাম না, বরং মার খেলাম প্রচুর। আমাকেই মারল বেশি। কোনমতে যখন জায়গাটা থেকে বের হয়ে এলাম, তখন আমার অবস্থা প্রায় আধমরা। মেয়েটা কোনমতে আমাকে একটা স্কুটারে টেনে উঠিয়ে একটা ক্লিনিকে নিয়ে গেল। স্কুটারে ওঠার পর আমার মাথা ঘুরছিল। শুধু এইটুক মনে আছে যে আমি তার নামটা জিজ্ঞেস করেছিলাম। যদ্দূর মনে পড়ে, ওর পুরো নাম বলেছিল ইরেন্দিনা হক। অবশ্য এরপর থেকে আমি সবসময় তাকে ইরা নামেই ডেকেছি।
ক্লিনিকে ঘন্টাখানেক রেখে ওরা আমাকে ছেড়ে দিল। বের হয়ে এসে ওকে অপেক্ষা করতে দেখে বললাম – আপনি অনেক কষ্ট করেছেন, ধন্যবাদ।
সে আমার সাথে সাথে আসছিল। বললাম – আমি এখন বাসায় যেতে পারব, ব্যথা কমে গেছে।
সে কিছু বলল না, পাশাপাশি হাটতে লাগল। আমি অল্প খুড়িয়ে হাটছিলাম, সে সেটা খুব খেয়াল করে দেখছিল।
ঘরে ঢুকে ওকে বসতে বললাম।
বাসায় কেউ নেই?
ওরা এখনো ফেরে নি।
ওরা? মানে? – সে জিজ্ঞেস করল।
আমরা কয়েকজন বন্ধু মিলে থাকি এখানে।
আইজ্যাক সিংগার ভালো লাগে? – সে টেবিল থেকে বইটা তুলে দেখতে লাগল।
আমি মাথা নাড়লাম – মাঝে মাঝে সাময়িকীতে বিদেশী ম্যাগাজিন থেকে লেখকদের সাক্ষাৎকার অনুবাদ করি, লিটারেচারে পড়ার কারণে এটা হয়েছে।
তখন দেয়াল ঘড়িটার দিকে চোখ পড়তেই সে বলে উঠল ও মাই গড, অনেক দেরী হয়ে গেছে। আমি তাকে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিলাম।
এরপর সে আরো কয়েকদিন বাসায় এল ব্যথাটার খবর নিতে। সে কথা বলত সোজাসুজি। মেয়েটার চিন্তা-ভাবনা ছিল পরিষ্কার। আমি যখন চুপচাপ শুধু শুনে যেতাম, তখন সে কথা বলে আনন্দ পেত – বলতে বলতে একপর্যায়ে এসে তার বিষন্ন গাম্ভীর্যটাও খসে পড়ত, বেরিয়ে পড়ত মনের একান্ত গোপন ধারণাগুলো। একদিন আমার টেবিলে ডস্টয়েভস্কির বই দেখে বলল – তোমার অনেক কিছুই পিকিওলিয়ার। তুমি র্যাদার ওল্ড ফ্যাশান্ড, খুব সম্ভবতঃ অতীতের ঘটনা আঁকড়ে ধরে রাখার বিশ্রী একটা টেন্ডেন্সিও কাজ করে তোমার মধ্যে। তারপরও তোমার মধ্যে কিছু একটা আছে যেটা রেয়ার – সে হেসে বলল – এবং ভালো – সে শেষ করল।
আমি এসেছি পুরানো ঢাকার রক্ষণশীল একটা পরিবার থেকে, ফলে তাকে পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারতাম না। ছোটবেলা আমরা মক্তবে পড়েছি, যেখানে হুজুর আমাদের বেত দিয়ে পেটাতেন আর বলতেন – বেত খাওয়া ভালো, কারণ ওস্তাদের মারের জায়গা দোযখে পুড়েনা।
অল্প কয়দিনের মধ্যেই আমি বুঝতে পারলাম – সে বেশ অস্থিরভাবে দিন কাটায়, বিশ্বাস করে না স্থায়ী সম্পর্কে। সে সবসময় একঘেয়েমির ভয়ে থাকত – প্রসঙ্গ পুরনো হয়ে যাবার আগেই উঠে চলে যেত গল্পের মাঝখান থেকে। আমি তার সাথে নানা বিষয় নিয়ে গল্প করতাম, তার মধ্যে সাহিত্য আর তুলনামূলক ধর্মই ছিল প্রধান।
এক বিকেলে সে আমাদের বাসায় এল স্পঞ্জের স্যান্ডেল পরে। সেদিন কোন প্রসংগই তার ভালো লাগছিল না। অনেকক্ষণ চুপচাপ বসে থাকার পর সে বলল – সব মানুষই একঘেঁয়ে, অসহ্য। শুধু বাঁচার জন্য বেঁচে থাকার কোন অর্থ আছে ! যেকোন প্রতিষ্ঠানকেই আমি ঘৃণা করি – কারণ পৃথিবীর সবকিছুই অর্থহীন। দেখ, এখানে কারো জন্য কারো কোন দয়া-মায়া নেই। মানুষে মানুষে সম্পর্ক অভিনয় মাত্র, সবকিছুর পেছনেই আছে ব্যক্তিগত স্বার্থ। আমার বার বারই মনে হয়েছে, পৃথিবীতে মানুষ একেবারে একা। আর তার সমস্ত কাজ-কর্ম অর্থহীন, অ্যাবসার্ড।
একটু থেমে সে বলে – যে অস্তিত্ব একদিন শেষ হয়ে যাবে, তার সব কর্মকান্ড অর্থহীন হতে বাধ্য।
কেন? যদি মৃত্যুর পরও – বাই চান্স – জীবন থাকে। তাহলেই তো আমরা বেঁচে গেলাম, তাই না? – আমি হাসি।
ইরেন্দিনা ঠান্ডা গলায় বলে – ওটা অন্ধবিশ্বাস, প্রমাণ ছাড়া কোনকিছুতে আমি বিশ্বাস করি না।
এটা একটা স্বতঃসিদ্ধ কথা বলেছ, আর স্বতঃসিদ্ধও একটা বিশ্বাস। – আমি তাকে রাগানোর চেষ্টা চালিয়ে যাই।
মানুষ জানতে পারে না, এমন কিছু থাকতে পারে না। – সে মুখ শক্ত করে বলে।
কে বলেছে থাকতে পারে না? – আমি হাসতে হাসতেই বললাম।
সে ভ্রূ কুঁচকে আমার দিকে তাকাল। আমি তখন একটু ইতস্তত করে বললাম – আসলে আমি নিজেই এমন ঘটনা দেখেছি যার ব্যাখ্যা খুঁজে পাইনি।
কিরকম? ভৌতিক কিছু নাকি! – তাকে হঠাৎ কৌতুহলী মনে হয়।
সে সন্ধ্যায় বাইরে খুব বৃষ্টি হচ্ছিল, আর হঠাৎ কারেন্টও চলে গিয়েছিল। ফলে জমে উঠছিল অমন একটি গল্পের সম্ভাবনা। আমি বলতে শুরু করলাম আমার কৈশোরের সেই বিস্ময়কর কাহিনীটি।
আমার তখন চৌদ্দ পনর বছর বয়স। কারো সাথে মিশতে পারতামনা বলে বন্ধু-বান্ধব তেমন ছিলনা। আর আত্মীয়-স্বজনও আমাকে অসামাজিক বলেই জানত। আমি বলতে গেলে একা একাই থাকতাম। প্রায়ই দুপুর রোদে ছাদে চুপচাপ বসে থেকে অনেক দূরের বাসায় শুকাতে দেয়া কাপড়গুলোর বাতাসে ওড়া দেখতাম। সেরকম এক দুপুরেই প্রথম ঘটেছিল সে ঘটনাটা।
ছাদের যে দিক থেকে মেয়েটা হেটে আসছিল, ওদিক দিয়ে ছাদে ওঠার কোন রাস্তা ছিলনা। কিন্তু আমার তখন সে কথা একবারও মনে হয়নি, আমি এতোটা মুগ্ধ হয়ে ওর দিকে তাকিয়ে ছিলাম। এতো সুন্দর কোন মেয়ে আমি কোনদিন কোথাও দেখিনি। সে আমার কাছে এসে দাঁড়িয়ে হাসল, যেন অনেকদিনের পরিচিত। আমিও হাসলাম, যেভাবে খুব কাছের কাউকে দেখে কেউ হাসে। আমার খুব ভালো লাগছিল। আমি ওর হাত ধরলাম, তখন ও আমার পাশে এসে বসল। আমি ওর নামটাও জিজ্ঞেস করতে ভুলে গিয়েছিলাম। আমরা দুজন অনেকক্ষণ চুপচাপ বসে ছিলাম পাশাপাশি – একলা ছাদে।
এরপর থেকে প্রায়ই সে আসত আমার কাছে – নির্জন দুপুরে, গভীর রাতে। হঠাৎ করেই দেখা দিত, যেন আশে পাশেই কোথাও ছিল। ওর সাথে কোনদিন কোন কথা হয়নি, ভাবলে আশ্চর্যই লাগে। সে আমার সাথে খেলত – হাতে হাত রেখে, কিংবা চোখে চোখ – নিঃশব্দ। মাঝে মাঝে যখন ওর মন খুব ভালো থাকত, সুড়সুড়ি দিত পায়ে, আর মিটিমিটি হাসত। প্রায়ই আমাকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে থাকত অন্ধকারে, যেন ভয় পাচ্ছে। তখন ওর জন্য আমার খুব মায়া লাগত। সে প্রায়ই মিষ্টি আর ফুল নিয়ে আসত আমার জন্য। এমন ফুল আমি কখনো কোথাও দেখিনি। অনেককে দেখিয়েছি ফুলগুলো, কেউই বলতে পারেনি ওগুলোর নাম।
কিন্তু যে রাতে ও আমাকে বাইরে বেড়াতে নিয়ে গেল, এরপর থেকেই বাসার সবাই কেমন যেন আচরণ করতে লাগল আমার সাথে। আমি নাকি টানা এগারদিন নিরুদ্দেশ ছিলাম। কিন্তু আমার মনে হয়েছিল – সন্ধ্যার পর অলিগলি পার হয়ে একটা বাগানের মত জায়গায় গিয়েছিলাম আমরা। সেখানে আমি ওর হাত ধরে অনেকক্ষণ হেটেছি। বাগানে আরো অনেকে ছিল, সবাই দেখতে খুব সুন্দর। আমরা যেন জ্যোৎস্নার আলোয় অনন্তকাল হাটছিলাম। তারপর একসময় কখন যেন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। ঘুম ভেঙ্গে দেখি – ও নেই, আর আমি খোলা ছাদে শুয়ে আছি। বুঝতে পারলাম না, ছাদে কিভাবে এলাম। যখন নেমে এসে ঘরে ঢুকলাম, সবাই ছুটে এল – যেন আমি অ্যাক্সিডেন্ট করেছি।
ওরা পরদিনই এক হুজুরকে ডাকল। উনি আমাকে বললেন, সবার সাথে বন্ধুত্ব করা যায়না। উনি দোয়া পড়লেন, জাফরানের রং দিয়ে সাদা প্লেটে দোয়া লিখে দিলেন ধুয়ে খাবার জন্য, গায়ের ওপর লেবু কাটলেন, জোয়ার ভাটার পানি খেতে দিলেন, আর গোসল করতে বললেন সেই পানি মিশিয়ে। যাবার আগে বিচিত্র সব নিয়মে কালাম পড়ে, পিন মেরে আর পানি ছিটিয়ে ছাদসহ আমাদের পুরো বাড়ি বন্ধ করলেন। আমাকে তাবিজও দিলেন, যদিও সে তাবিজ হারিয়ে ফেলেছি বহুদিন হয়। কিন্তু আসলে আমি যেটাতে আশ্চর্য হয়েছিলাম, সেটা হল – ঐদিনের পর থেকে মেয়েটা কখনো আর আমার কাছে আসেনি। কতদিন ছাদে বসে থেকে ভেবেছি, এই বুঝি মেয়েটা আসবে। অথবা গভীর রাতে ঘুম না এলে মনে মনে ওর কথা ভেবেছি, কিন্তু সে আসেনি।
ইরেন্দিনা সবটা মন দিয়ে শুনল। হেসে বলল – ইন্টারেস্টিং। তবে খুব গ্রহণযোগ্য একটা ব্যাখ্যা তো আছেই এটার।
কি ব্যাখ্যা?
ব্যাখ্যা একটাই, তোমার মস্তিষ্কে সমস্যা আছে।
আমি জোরে হেসে উঠলাম।
না, হেসোনা, সত্যি বলছি। তোমার হ্যালুসিনেশন হয়েছিল, মনে হয় তোমার গোপন সিজোফ্রেনিয়া আছে, একা একা থাকাটাও এ ব্যাখ্যার সাথে মিলে যায়। আসলে তুমি বাস্তবে যা পাও নি, তোমার মন সেটা তোমাকে কল্পনার মধ্য দিয়ে পাওয়ানোর চেষ্টা করেছে।
নিঃসঙ্গ কাউকে যদি সিজোফ্রেনিয়া ধরতে পারে, তাহলে পরী কেন পারবে না!
আরো পরে আমি বুঝতে পেরেছিলাম, ইরেন্দিনা আসলে বিজ্ঞানকে মনে করত বিশ্বাসের একদম বিপরীত কিছু। আমি বলতাম – বিজ্ঞান তো একটা মডেল মাত্র, যা জগৎকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করে। এরকম আরো মডেল থাকতে পারে। আর তুমি তো জানোই – একটা মডেল তখনই সফল, যখন তার একটা অংশ অন্য একটা অংশের সাথে দ্বন্দ্ব তৈরী করে না।
বাস্তব সবকিছুকেই মাপা সম্ভব।
কিন্তু আমাদের মস্তিষ্কের চিন্তা করার শক্তি তো অসীম নয়। তিনটি মাত্রার বেশী কোনকিছুর কথা আমরা কল্পনার চোখ দিয়েও দেখতে পারি না।
এভাবে দিনের পর দিন আমরা তর্কাতর্কি করেছি। কেউ কেউ ধর্মের ব্যাপারে যেরকম অন্ধ, সে ছিল বিশ্বাসের বিরুদ্ধে ঠিক তেমনি অন্ধ। কিন্তু তারপরও তাকে আমার ভালো লাগত শুধু এজন্য যে, সে ছিল একটি শিশুর মতই সরল আর ওর মধ্যে কোন স্বার্থান্বেষী প্যাঁচঘোচ ছিলনা।
মার্চের শেষদিকে ইরেন্দিনা আর তার কয়েকজন বন্ধু মিলে ঠিক করল তারা খুলনা বেড়াতে যাবে, সেখানে ইরেন্দিনার চাচা সরকারী বিরাট বাংলোতে থাকার ব্যবস্থা করে রেখেছেন। সবকিছু চুড়ান্ত হয়ে যাবার পর সে আমাকে ফোন করল, খুলে বলল সব পরিকল্পনা। বলল – ঢাকায় সবকিছুই একঘেঁয়ে। আমি কিছু বললাম না।
তুমি আমাদের সাথে যাবে – সে ওপাশ থেকে বলল। আমি এরকম একটা আশংকাই করছিলাম।
চুপ করে আছো যে!
বললাম – কিভাবে যাবে?
বাসে, আসব স্টীমারে – সে বলল।
তাহলে আমার যাওয়া হচ্ছে না।
কেন?
আমি পানি ভয় পাই। বাসে চড়লে আমার বমি হয়।
শয়তান – সে মন্তব্য করল – এসব বলে তুমি পালাতে পারবে না। দরকার হলে লাইফ ইন্স্যুরেন্স করিয়ে নেব।
আমিই যদি না থাকি, আমার লাইফ ইন্স্যুরেন্স কিভাবে আমার কাজে আসবে? আসল কথা বলি, আমার পকেট এখন খালি।
আমার কাছ থেকে ধার করতে পার।
আমি চুপ করে থাকলাম। সময়ই অনেক ক্ষেত্রে উত্তর দেয়াকে সহজ করে দেয়।
তাহলে আমি টিকেট করে পরে সময়টা তোমাকে জানিয়ে দিব।
সে ফোন রেখে দিল। আমার হাতে সময় আছে, ঢাকার বাইরে কয়টা দিন ঘুরে এলে আসলে মন্দও হয় না। কিন্তু তার বন্ধুদের কথা ভাবতেই কেমন যেন একটা অস্বস্তি আমার মনকে আচ্ছন্ন করে ফেলল। যাদের সাথে আমাকে সামনের একটা সপ্তাহ কাটাতে হবে, তাদের কারো সাথেই আমার তেমন কোন মিল নেই। ওরা ফূর্তিবাজ, বর্তমানকে নিয়েই থাকতে ভালোবাসে। মৃত্যুতেই সব শেষ হয়ে যাবে, পৃথিবীতে প্রতিটি মুহূর্ত তাই মূল্যবান। যৌবন চিরস্থায়ী হয় না, সুতরাং এরও সর্বোচ্চ ব্যবহার দরকার। ভোগেও ক্লান্তি আসে, সুতরাং ভোগের মধ্যেও বৈচিত্র্য আনার চেষ্টা করে যেতে হবে এবং সেটা খুব ধৈর্যের সাথে। সেটা নিয়ে নানারকম পরিকল্পনাও আছে তাদের। ওদের মধ্যে জাতীয় সাংসদের ছেলে থেকে শুরু করে সিমেন্টের কোটিপতি ডিলারের মেয়ে পর্যন্ত অনেকেই আছে। এরা সবাই ইরেন্দিনার বন্ধু। যতদূর জানি এদের মধ্যে ইরেন্দিনার বাবাই সবচেয়ে সাধারণ – একজন মাঝারি মাপের সরকারী কর্মকর্তা, যদিও তার মা যথেষ্ট উচ্চাভিলাষী একজন মহিলা। ইরেন্দিনারা থাকে আজিমপুরের সরকারী কলোনীতে, কিন্তু তার মা প্রতিবেশীদের এড়িয়ে চলেন, মেয়েদের পড়ান ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে – আর মিশতে দেন না বাংলা মিডিয়ামের মেয়েদের সাথে।
আমরা যে সাতজন খুলনা বেড়াতে গেলাম, তার মধ্যে চারজনই মেয়ে। জায়গাটায় বেশিরভাগ সময়ই আমরা ঘুরে বেড়ালাম নদীতে নদীতে, তারমধ্যে তো একবার চলে গেলাম সুন্দরবনের একেবারে মাঝামাঝি এলাকায়। সেখানে একটা রেস্টহাউজ আছে, রাতের বেলা নাকি বাঘের গর্জন শোনা যায় কখনো কখনো। রেস্টহাউজটা সুন্দর, পৌঁছেই ওরা সবাই ছাদে ওঠার জন্য হৈ চৈ করতে লাগল। আমি বসে রইলাম স্পীডবোটের পেছনের অংশটায়। নদীর পাড়ে গোলপাতা গাছগুলো সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে ছিল, অপরিচিত কয়েকটা পাখি মাঝে-মধ্যে উড়ে যাচ্ছিল এদিক-ওদিক। সেখানেই আমি প্রথম ফিঙে দেখলাম।
ইরেন্দিনা কিছুক্ষণ পর আমাকে খুঁজতে খুঁজতে বোটের কাছে চলে এল। বসে থাকতে দেখে সে নিজে বোটে উঠে এল – তুমি গেলে না যে! – সে পাশে এসে বসল।
এ জায়গাটা খুব সুন্দর। – আমি আঙ্গুল তুলে নদীর ঐ পাশটা দেখালাম।
সে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল – তুমি এরকম কেন? কি মনে কর তুমি আমাদের?
আমি ভালো করে তাকে লক্ষ্য করলাম। সে বাচ্চাদের মত করে কথা বলছিল। আমি কথা ঘোরানোর জন্য বললাম – কাল যা হারিয়ে যাবে, আজ তার জন্য অপেক্ষা করে কি লাভ?
সে হঠাৎ হেসে ফেলল। তারপর দাঁড়িয়ে পড়ে বলল – আমরা ছাদে যাচ্ছি। তুমি চলে এসো।
সে চলে গেল। আমি আবার নদীর ওপারে তাকালাম। ইরেন্দিনা জীবন থেকে যে প্রশ্নগুলোর উত্তর আজো খুঁজে পায়নি, ঠিক সেই প্রশ্নগুলোই আমাকেও প্রায়ই ভোগায় – যদিও সে কথা মেয়েটাকে বলা হয়নি কখনো।
বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে আমি বোটটা থেকে নামলাম, সারেংকে জিজ্ঞেস করে হাটতে শুরু করলাম রেস্টহাউজটার দিকে।
ইরেন্দিনা ছাদে বসে ছিল কার্নিশের ওপর তার ছায়াটাকে ফেলে। আমাকে দেখে বলল – তুমি আট মিনিট পরে এসেছ। আমি ঘড়িটা একবার দেখে নিয়ে তারপর দূরে দিগন্তের দিকে তাকাই, ওখানে সবুজ রংটা আস্তে আস্তে ধূসর হতে হতে একসময় নীলচে বর্ণ ধারণ করেছে।
তুমি খুব বেশিরকম সেলফ সেন্টারড – হঠাৎ করে ইরেন্দিনা বলল – বুঝেছো?
আমি ইরেন্দিনার দিকে তাকাই, তারপর একটা অনিচ্ছাকৃত হাই তুলে বনের ডানপাশটার দিকে চোখ ফেরাই। ডানপাশটা আরো সুন্দর। ওপাশের দিগন্তে ঘন গাছের একটা রেখা এসে মিশে গেছে। আমি অনেকক্ষণ সেদিকেই তাকিয়ে থাকি।
অথবা তোমার মনের মধ্যে লুকানো কোন হিসেব আছে।
আমি তার দিকে ভালো করে তাকাই – সে কালো রং দিয়ে চোখের পাপড়িগুলো স্পষ্ট করেছে, আর গাঢ় লিপস্টিক দিয়ে ঠোঁট দুটোকে।
আমি হিসেব করে চলি না – আমি গলায় যতটুক সম্ভব রহস্য ঢেলে দিয়ে বলি – আমাকে চালিত করে আমার বিশ্বাস, এবং আমার অবিশ্বাস।
কিন্তু সে ওগুলো শুনেছে বলে মনে হয় না, কারণ সে কথা বলে না, স্বপ্নিল চোখে তাকিয়ে থাকে দিগন্তের দিকে। ইরেন্দিনা রেলিঙে বসে পা দোলাতে থাকে, তখন ওকে দেখায় ছোট্ট একটা মেয়ের মত। ইরেন্দিনার ঠোঁট লালচে, মুখটা গোলাপী। মনে হয়, আকাশ ভেঙ্গে গোলাপী রোদ নেমে এসেছে পৃথিবীতে। অন্ধ হয়ে যাবার আগেই আমি আমি চোখ নামিয়ে নিলাম, ছাদ থেকে নেমে এলাম সন্ধ্যা হবার আগেই।
রাতে ওরা ক্যাম্পফায়ারের আয়োজন করল। ইরেন্দিনার চাচী কিছূক্ষণ ভূতের গল্প বললেন, আমাদের সাথের ছেলে দুটা উশখুশ করতে লাগল। ভদ্রমহিলা গল্প শেষ করে উঠে দাঁড়ালেন, তখন তারা বলল যে গল্পটা তাদের কাছে ভালোই লাগছিল। তিনি ঘুমাতে চলে যাবার সাথে সাথে সচিবের ছেলে সবাইকে একটা নাচের প্রস্তাব দিল।
ঘর থেকে সেট আনা হল, ব্যাগ থেকে বের করা হল রেডিমেড ক্যাসেট। ওরা একটা গান বাজাল, বলল ওটাকে বলে ড্যান্স ট্র্যাক। ওরা ড্যান্স ট্র্যাক শুনতে থাকল, সাথে সাথে বাড়তে লাগল নাচের উচ্ছলতা। একটা প্রেমিক জুটি ছিল, ওরা হাত ধরাধরি করে মাঝে এসে দাঁড়াল। সচিবের ছেলে বলল, সে বিয়েতে বিশ্বাস করে না। ইরেন্দিনা হেসে হাততালি দিল, অন্য সবাইও খুব করে হাসল। সচিবের ছেলে ব্রিগেডিয়ারের ফর্সা মেয়েটার সাথে গায়ে গা লাগিয়ে অনেকক্ষণ নাচল, তারপর নাচ থেমে গেলে সবার মাঝখানে বসে প্রাপ্তবয়স্কদের কৌতুক বলতে লাগল। মেয়েগুলো হেসে গড়িয়ে পড়ল, ছেলেগুলো দিল স্বতঃস্ফুর্ত হাততালি। আমার তখন খুব ঘুম পেতে লাগল – নেশার মত অনেকটা।
সকালবেলা ঘুম থেকে জেগে বারান্দায় এসে দাঁড়ালাম। ইরেন্দিনা সামনের বাগানটায় দাঁড়িয়ে ছিল, দেখেই আমাকে ডাকল। আমি হাত-মুখ ধোয়ার অজুহাতে বাথরুমে ঢুকে গেলাম। মেয়েরা চাচীর সাথে শুয়েছিল দক্ষিণের ঘরটায়, ওরা নাস্তার টেবিলে এল একটু দেরীতে। সকাল সাড়ে ন’টার দিকে আমরা বোটে উঠে বসলাম সাগরসঙ্গমটা দেখতে যাব বলে। আমি শুনেছিলাম, ঐসব জায়গায় নদীর পাড় দেখা যায়না বলে উঁচু উঁচু ঢেউগুলো নতুনদের মধ্যে খুব ত্রাসের সঞ্চার করে।
খুলনা থেকে ঢাকায় রওনা দিলাম আমরা বুধবার সন্ধ্যার পর। আকাশে চাঁদ ছিল, স্টিমারের ডেকটা ছিল ফাঁকা। ইরেন্দিনার বন্ধুরা সন্ধ্যার পরের সময়টা ডেকের ওপর এলোমেলো হাটাহাটি করে কাটাল। ন’টার পর ওরা কেবিনে ঢুকল তাস খেলবে বলে। আমি ঐ সময়টা বাইরে বেরিয়ে এলাম। বেরিয়েই দেখি, ইরেন্দিনা রেলিঙে ঝুঁকে দাঁড়িয়ে নদীর অন্ধকার পাড়ের দিকে তাকিয়ে আছে। আমি তার পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম, সে একবার আমার দিকে তাকিয়ে হাসল।
আমরা অনেকক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিলাম। কিছুক্ষণ পর সে বলল – তুমি তো আধ্যাত্নিক জগতে বিশ্বাস কর। তাই না!
আমি হাসলাম, বললাম – আমি নিশ্চিত নই।
কিন্তু বিশ্বাসী মাত্রই বোকা। ভালোবাসা তাদের অন্ধ করে।
বিশ্বাসীর পুরষ্কার স্বপ্ন – আমি বললাম।
আর স্বপ্ন মাত্রই অলীক – সে উত্তর দিল।
যখন তুমি স্বপ্ন দেখছ, তখন আবার বাস্তব জীবনটাই তোমার কাছে অলীক। আসলে পুরো ব্যাপারটাই আপেক্ষিক।
ইরেন্দিনা আমার দিকে ঘুরে তাকায় – তোমার সাথে তর্ক করা অর্থহীন।
আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলি। আকাশে তখন কয়েকটা নতুন তারা দেখা যায়। আমরা চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিলাম, কতক্ষণ মনে নেই। সেই শেষপর্যন্ত নীরবতা ভাংগে, হঠাৎ করে বলে – আচ্ছা, একটা প্রশ্নের উত্তর দেবে?
নিশ্চয়ই।
তুমি কি পছন্দ কর কাউকে? নাকি তুমি অন্য সব সস্তা মিডল ক্লাস ছেলের মতই মনে মনে চরম প্রতিক্রিয়াশীল?
নিজের আইডেন্টিটি রাখার জন্য একটু রক্ষণশীল হলে দোষ কি ! – আমি বলি।
হঠাৎ করেই সে বলে – সত্যি করে বলতো, তুমি তোমার সেই পরীটাকে আসলেও আর কখনো দেখনি!
আমি ওর চোখের দিকে তাকিয়ে আবার দৃষ্টি ফিরিয়ে নিলাম।
তার মানে আরো দেখা হয়েছে তোমাদের?
দেখা হলেই বা কি? ওটা আরেকটা হ্যালুসিনেশন ছাড়া তো আর কিছু না।
এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করবেনা। আমি চিন্তিত তোমার অসুস্থতা নিয়েই।
আমি হেসে ফেললাম, বললাম – আমার কি মনে হয় জানো? বললে তুমি বিশ্বাস করবে না, কিন্তু সত্যি সত্যিই আমার মাঝে মাঝে মনে হয় – তুমিই সেই মেয়ে, এখন ইরেন্দিনা নাম নিয়ে এসেছো।
তোমার সিজোফ্রেনিক চিন্তার জগতে এটা অবশ্যই সম্ভব। – সে বাকা করে হাসল।
অনেকক্ষণ পর সে হঠাৎ বলে – তোমার কোন জিনিসই আমার তেমন ভালো লাগে না। কিন্তু তারপরও আমি মাঝে মাঝে তোমার সাথে যোগাযোগ করি। কেন জানো? তোমার মধ্যে একটা চাইল্ডলাইক ইনোসেন্স আছে, আমি যেটা খুব কম মানুষের মধ্যেই দেখেছি।
সে অদ্�ভুত একটা স্বরে কথাগুলো বলে যায়। সে রেলিঙের ওপর একটা হাত রেখে আমার চোখের দিকে তাকায়। আমি তখন দুর্বলভাবে হাসার চেষ্টা করি। রাতের নদীর বুক চিড়ে স্টীমারটা তরতর করে এগিয়ে চলে। আশেপাশের গ্রামগুলো তখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে গেছে।
তোমার কি তোমার জীবন নিয়ে সত্যিই কোন প্ল্যান নেই? – সে অন্ধকার দেখতে দেখতে বলে।
তোমাকে একটা কথা বলি – আমার সবসময়ই কেন যেন মনে হয়, এই পৃথিবীটার কোথায় যেন একটা সমস্যা আছে। আচ্ছা সত্যি করে বল তো, তোমার কি কখনোই এমন মনে হয়নি যে আমরা একটি বৃহত্তর স্বত্তা থেকে বিচ্ছিন্ন! হয়তো যেখান থেকে শুরু সেখানেই সমাপ্তি, আর বিচ্ছিন্নতার অবসান, আর এই বিচ্ছিন্নতার অবসানের নামই স্বর্গ!
তুমি আবার কবে কিসের থেকে বিচ্ছিন্ন হলে?
জন্মগ্রহণের মাধ্যমেই বিচ্ছিন্নতার শুরু – আমি কণ্ঠে দার্শনিক একটা ভাব এনে বলি।
তাহলে তো এর থেকে বাঁচার জন্য তোমার মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করা ছাড়া আর কোন গতি নেই।
আমি হেসে ফেললাম। কিন্তু আধো-অন্ধকারেও আমি বুঝতে পারলাম, সে হতাশ চোখে নদীর পানির দিকে তাকিয়ে আছে। আমি আন্দাজ করতে পারছিলাম, সে কি ভাবছে। নিশ্চিত হলাম, যখন সে ঘুরে বলল – আমি ভেতরে যাচ্ছি।
সে কেবিনের দরজাটা খুলে ভেতরে চলে যাবার সময় কয়েক মুহূর্তের জন্য ভেতর থেকে হুল্লোড়ের একটা ঝাপটা দমকা বাতাসের মত বেরিয়ে আসে, তারপর হঠাৎই আবার সেটা বন্ধ হয়ে যায়। আমি আকাশের দিকে তাকাই। দূর আকাশে তখন অসংখ্য তারা মিট মিট করে আলো ছড়াচ্ছে। ডেকের অন্ধকারের ভেতর দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে একসময় আমার মনের মধ্যে কোন দূর অতীত থেকে পরিচিত মুখগুলো ভেসে আসতে থাকে। তাদের একেকজন একেক পথ ধরে এগিয়ে গেছে, কেউ কেউ হারিয়েও গেছে। কিন্তু আমি অতীতের দিকে ফিরে তাকাইনি, আমি সবসময় একটা পথই আঁকড়ে ধরে থাকার চেষ্টা করেছি আর দিনের পর দিন আমার প্রশ্ন ও প্রার্থণার উত্তর খুঁজেছি। সব প্রশ্নের উত্তর পাইনি, কিন্তু সময় হয়তো এখনো শেষ হয়ে যায় নি।
আমরা ঢাকা এসে পৌঁছলাম সকাল এগারোটায়। সকালবেলা সদরঘাটে ওকে বিদায় জানিয়ে বাসায় চলে এলাম। ইরেন্দিনার সাথে সেটাই আমার শেষ দেখা।
অ্যাপার্টমেন্টে ফেরার পর সবাই অবাক হয়ে আমার দিকে তাকাল। আমার তখন মনে পড়ল – যাবার সময় কাউকে বলে যাওয়া হয়নি। আশ্চর্য ! পুরো ঘটনাটা ঘটেছে – যেন একটা ঘোরের মধ্যে ছিলাম আমি।
ইরেন্দিনা আর আমার সাথে কোন যোগাযোগ করেনি। একদিন ওদের আজিমপুরের বাসায় গিয়েছিলাম, দেখি ওরা ভাড়াবাড়িতে চলে গেছে। ঠিকানা-টিকানা যোগাড় করে একদিন সেই এলাকাতেও গেলাম, দেখি ওখানে ঐ নামে কেউ থাকে না।
আমি সেদিন দুপুরে অনেকক্ষণ রোদে হেটে বাসায় ফিরলাম। ভাবতে চেষ্টা করলাম, যেটা হঠাৎ শুরু হয় সেটা হঠাৎ শেষও হয়ে যায়।
বন্ধুদের যখন ঘটনাটা বললাম, ওরা খুব করে হাসল। হাবীব বলল – তোমারে আবার পরীরা ধরে নিয়ে গিয়েছিল আর কি। হায়, আমাদের এই সৌভাগ্য হয় না।
আমি চুপ করে থাকলাম। রফিক অবশ্য আমাকে সমর্থন দেয়, বলে – যা হয়েছে ভালোই হয়েছে, ভালোয় ভালোয় ফিরে তো এসেছ।
সে নানা ধরনের কিতাবে নাকি এসব সম্পর্কে পড়েছে – কালো যাদুতে তুমি বিশ্বাস করবে না জানি। কিন্তু কোরানেই আছে, হারুত-মারুত ফেরেশতার মাধ্যমে কিছু ভিন্ন ধাঁচের জ্ঞান মানুষকে বিতরণ করা হয়েছিল। মানুষ কি এরপর থেকে এর অপব্যবহার করেনি! অথচ এসবই ছিল খোদার পরীক্ষা, আর এখন এগুলো কালের বিবর্তনে হয়েছে কালো যাদু। আরে ভাই, তোমরা তো জানো না! ডাইনীরা হাজার বছর ধরে নিঃসংগ ধর্মভীরু ছেলেদের বিশ্বাসকে নিয়ে খেলা করে, শহরগুলির অলিতে-গলিতে ছড়িয়ে রাখে জাল, স্ট্রীটলাইটের আলোর আড়ালে চলে ষড়যন্ত্র আর কালোযাদুর খেলা। তাবিজ দিয়ে বশ করে রাখে তারা মানুষের বুদ্ধিকে, বুদ্ধি তখন চলে আবেগের নির্দেশে। তুমি যদি এসব থেকে বাঁচতে চাও, মাথার বাইরে এসে চিন্তা কর – পারলে তোমার আবেগকে শ্বাসরোধ করে হত্যা কর, তাহলে হয়তো পাবে সঠিক মানুষটির দেখা। ঐ নতুন সঙ্গিনীর সামনে গিয়ে যখন তুমি দাঁড়াবে, তোমার আর কোন আবেগ অবশিষ্ট নেই – তবু তো তুমি ডাইনীদের হাত থেকে বাঁচতে পারলে। ডাইনীরা আবার যুক্তিকে দারুন ভয় পায়।
পৃথিবীটা বিচিত্র জায়গা। ব্যাখ্যাযোগ্য এবং ব্যাখ্যার অতীত অনেক ঘটনাই এখানে ঘটে। আর তাছাড়া কেউ যখন অন্য কারো জীবন থেকে হারিয়ে যায়, তখন সে পরী ছিল না যাদুকরী শক্তিধর ডাইনী ছিল তাতে কিছুই আসে যায় না। অতীত অতীতই, যা গেছে তা আর ফিরে আসবে না। বরং একদিন আমাদের চারদিকে সবকিছু বদলে যাবে, সেদিন আমরা হয়তো আমাদের অতীত অনুভূতিগুলোকে অন্যভাবে দেখতে শিখব। আর বুঝতে পারব, কতগুলো সত্যকে তলিয়ে না দেখাই ভালো।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now