বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
যারা ভাল পাঠক তারাই গল্পটি পড়বেন
লেখক.তুহিন
.
.
অাধ ঘন্টা ধরে বসে অাছি হাসপাতালের এই অপেক্ষা কক্ষে, পাশে বসে অাছে অামার বর্তমানের সব চেয়ে কাছের বন্ধু তিনি অামার মা। যদিও মাকে বন্ধু ভাবা যায়না, তবে না ভেবেও পারিনা। কারন অামার এই বর্তমান জীবনে কোনো বন্ধু নেই, কোনো এক মহান ব্যক্তি বলেছিলেন "বন্ধু ছাড়া লাইফ ইম্পসিবল" তাই নিজের মাকেই এখন কাছের বন্ধু ভাবি।
বাবা মারা যাওয়ার পর থেকে মাকেই অামি অামার একমাত্র কাছের বন্ধু মনে করি। বাবা সব সময়ই অামার বেস্ট ফ্রেন্ডের মত ছিলেন, সব সময় বন্ধুর মত অাচরণ করতেন অামার সাথে।
অামার সাথে ঘটে যাওয়া সব কিছু অামি নির্ধিদায় বাবার সাথে শেয়ার করতাম।
কিন্তু অামি সেদিন খুবই কষ্ট পেয়েছিলাম, যেদিন বাবা এত বড় একটি বিষয় অামার থেকে লুকিয়েছিলেন।
যার কারনে তিনি চলে গেলেন না ফেরার দেশে।
.
বাবার ভয়ানক একটা অসুখ হয়েছিলো, কিন্তু তিনি বিষয়টা অামার থেকে লুকিয়েছিলো।
কেন লুকিয়েছিলো সেটা বাবা চলে যাওয়ার সময় অামাকে কেঁদে কেঁদে বলেছিলো। বাবার অার্তনাদ সেদিন অামায় নিস্তব্ধ করে দিয়েছিলো।
অামাদের গ্রামে বড় কোনো ডাক্তার কিংবা ভালো কোনো হাসপাতাল নেই, বাবার যে অসুখ হয়েছিলো, সে অসুখের চিকিৎসার জন্য তাকে শহরে নেয়ার প্রয়োজন ছিলো।
কিন্তু বাবা অর্থের হিসেব করে এই অসুখটা তিনি অামাদের থেকে লুকিয়েছিলো যার কারনে সেদিন চলে গেলেন তিনি। কেননা অামার লেখাপড়া সাথে ছোট বোনের বিয়ে এইসব চিন্তা করেই তিনি ব্যাংকে জমানো সামান্য টাকাটা খরচ করার চিন্তা মাথায় নেননি।
বাবা মৃত্যুর অাগে বলেছিলো তার একটি স্বপ্নের কথা যেটা অামায় পূরণ করতে হবে।
বাবার ইচ্ছে অামাকে অনেক বড় একজন ডাক্তার হতে হবে, এই গ্রামের মানুষদের অামি বিনামুল্যে চিকিৎসা করবো। সব সময় অামি তাদের পাশে থাকবো, গ্রামের কোনো মানুষ যেন ভালো চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত না হয়।
.
একজন নার্স অামাদের দিকে অাড় চোখে তাকিয়ে অাছে, অামি লক্ষ করলাম তার মুখে এক টুকরো বিরক্তের ছাঁয়া তার পুরো মুখকে অন্ধকার করে তুলেছে।
অবশ্য এই বিরক্তের ছাঁয়ার কারনও অাছে, সেদিন অামার ব্লাড রিপোর্ট নিয়ে প্রথম এই হাসপাতালে এসেছিলাম বড় ডাক্তারের সাথে কথা বলতে, অামার মা এই নার্সকে জিজ্ঞেস করেছিলেন বড় ডাক্তার কোথায় বসেন। নার্স অাম্মুর থেকে সেদিন একশো টাকা চেয়েছিলেন যাকে ঘুষ বলা হয় অারকি।
অামার অাম্মু অনেক রাগি মানুষ, কিন্তু বাবা মারা যাওয়ার পর থেকে সেই রাগ মায়ের জীবন থেকে হারিয়ে গিয়েছিলো।
তবুও সেদিন অাম্মু নার্সের এমন কথায় যথেষ্ঠ রাগ হয়ে তীক্ষ্ণস্বরে বলেছিলো।
.
-কিসের একশো টাকা?
.
-বড় ডাক্তার বাবুর সাথে দেখা করতে চান না?
.
-হ্যাঁ
.
-তাহলে একশো টাকা দিন অামি অাপনাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাচ্ছি।
.
এই কথার সাথে সাথে মা তীব্র ভাবে রেগে গিয়ে দুটি চড় সেই নার্সের দু গালে বসিয়ে দেন।
সেই চড়ের শব্দে থমকে যায় পুরো হাসপাতাল, সবাই বিস্মিত চোখে তাকিয়ে থাকে অামার মায়ের দিকে। অাসলে নার্স উপলদ্ধি করতে পারেনি তার এমন কথায় একটি মানুষ এত ভয়ানক ভাবে রেগে যাবেন।
মায়ের এমন রাগে অামি কিঞ্চিত পরিমানও অবাক হয়নি, কারন বর্তমানে মায়ের কাছে এক টাকা লাখ টাকার সমান। অার সেখানে একশো টাকার মুল্য কত হতে পারে ভাবা যায়?
.
একজন নার্স অামাকে এবং অাম্মুকে ডাকলেন, বললেন ডাক্তার সাহেব অামাদের ডেকেছেন।
মায়ের হাতে অামার ব্লাড রিপোর্ট, এই রিপোর্টে কি এসেছে মা অামাকে কখনো বলেনি। এমন কি এই রিপোর্ট টা তিনি অামার থেকে লুকিয়ে রাখে সব সময়, অামি অবশ্য খুঁজার চেষ্টা করিনি কখনো। প্রয়োজন মনে হয়নি অামার তাই খুঁজিনি। তাছাড়া অামার বয়স তো কম হলোনা গুনে গুনে একুশ বছর, কোনো একুশ বছরের ছেলে অবুঝ থাকে? থাকলেও সেই অবুঝদের চসারচর দেখা যায়না।
সেদিন তীব্র রোদের উষ্ণ তাপ গায়ে লাগিয়ে হিমুর মত একটি হলুদ রঙের ময়লাযুক্ত পাঞ্জাবি গায়ে জড়িয়ে হাটছিলাম অানমনে।
অামার পায়ে সেদিন কিছুই ছিলোনা, রোদের তীব্র উত্তাপে পিচ ঢালাইয়ের রাস্তাটা প্রচণ্ড গরম হয়ে অাছে।
.
অামি খালি পায়ে হাটছি তাই চারপাশের মানুষ গুলো বিস্মিত চোখে তাকিয়ে ছিলো, হঠাৎ অামি হিটস্ট্রোক করে মাটিতে লুটে পরি। অামার পুরো দেহ একদম লাল হয়ে যায়, একজন মানুষকে তাজা রক্ত দিয়ে গোসল করালে তার গায়ের রঙ যেমন হবে অামার গায়ের রঙ ঠিক তেমনই হয়েছে।
এমন দৃশ্য দেখে রাস্তার চারপাশে ছুঁটে চলা মানুষ গুলো থমকে গিয়েছিলো, অার অামি জ্ঞান হারিয়ে রাস্তার একটি পাশে পরে অাছি।
কিছু সময় পর এক ব্যক্তি অামাকে সেখান থেকে পাশের একটি ক্লিনিকে নিয়ে যান।
অামার সেলফোন থেকে মা নামে সেভ করা নাম্বারে কল দিয়ে তাকে ক্লিনিকে অাসতে বলেন, অামি ক্লিনিকে অাছি শুনে মা দৌড়ে ছুটে অাসেন ক্লিনিকে।
অামি বাড়ি থেকে প্রায় অনেকদূরে চলে এসেছিলাম, গাড়ি দিয়ে অাসলেও বিশ মিনিটের মত লাগবে। কিন্তু মা দশ মিনিটেই উপস্থিত হয়েছিলো, অামি তখন খুবই অবাক হয়েছিলাম কারন রাস্তায় জ্যামও ছিলো, মা তো অার উড়ে উড়ে অাসেনি
.
মা অামার পাশে বসে অাছে, অামার যখন জ্ঞান ফিরলো তখন এক পলক অামি অামার মায়ের দিকে তাকালাম। মায়ের দিকে তাকিয়ে বুঝলাম তার চোখমুখ রাগে একদম টগবগ করছে। অামি একটু বিচলিত হয়ে উঠে দাড়ালাম। একজন মধ্যবয়সী মহিলা অামার মাকে ডাকলেন, মহিলাকে দেখে বুঝলাম তিনি ডাক্তার। সাধা রঙের শাড়ি সাথে ওড়নাটাও ধবধবে সাধা, দেখতে একদম বিধবা মহিলাদের মত। দেখে মনে হচ্ছে তার স্বামী মারা গেছে। কিন্তু না এটা এই হাসপালাতের ইউনিফর্ম, এটা পরেই তাদের ডিউটি করতে হয়।
মা অামার ব্লাড রিপোর্ট ভালো মত দেখে নিলেন, রিপোর্ট দেখার পর তিনি যেন অাকাশ থেকে পড়লেন। পৃথিবীর সব হতাশ যেন মায়ের মুখে ফুটে উঠেছে, কিন্তু মা সেটা অামায় বুঝতে দেননি।
তবে অামি সেদিন কিছুটা হলেও উপলব্ধি করতে পেরেছিলাম অামার কি হয়েছে।
.
মা অামার ব্লাড রিপোর্ট টি ডাক্তারের হাতে ধরিয়ে দিলেন, হলুদ কালারের একটি চশমা চোখে দিয়ে ডাক্তার রিপোর্টের উপর মাথা ঝুঁকিয়ে ভালো মত দেখছেন রিপোর্টের কালো লেখা গুলো। ডাক্তারটি অনেক বয়স্ক, এই সময়টা তার অবসরে থাকা দরকার ছিলো। কিন্তু তিনি হয়ত অবসর জিনিসটা পছন্দ করেননা, পৃথিবীতে এমন মানুষও অাছে যারা সব সময় নিজেকে ব্যস্ত রাখতে চায়। এই ডাক্তার সাহেব তাদের একজন।
কিছু্ক্ষণ পর ডাক্তার উঠে দাড়ালেন, সাথে সাথে অাম্মু অামার চোখ দুটো চেপে ধরলেন। চোখ দুটো চেপে ধরার সাথে সাথে মনে হলো অামার পুরো পৃথিবী ভয়ানক অন্ধকার হয়ে গেছে।
অামি পিপড়ার একটি কামর অনুভব করলাম, মনে হয় ইনজেকশন দিয়েছে অামার ডান হাতে। অামি ঠিক বুঝতে পারছিনা কিছুদিন পর পর কেন এই পিপড়ার কামরটি অামাকে অনুভব করতে হয়। এই ইনজেকশনটা কি না দিলেই নয়?
.
-বাবা ইবান তুমি একটু এই কক্ষের বাহিরে গিয়ে অপেক্ষা করো অাম্মু অাসছি।
.
অাম্মু মুখে একটু হাসি অানার চেষ্টা করে কথাটা বললো, কিন্তু অামার মনে হলো তিনি ব্যর্থ হয়েছেন। কিছু মানুষ অাছে যারা অন্যকে খুশি রাখার জন্য নিজেকে সব সময় হাসিখুশি রাখার চেষ্টা করে। অামার মাও তার ব্যতিক্রমী নন, তবে এবার তিনি ব্যর্থ হলেন। হাসিটা ঠিক মত তার মুখে ফুটলো না।
কক্ষ থেকে বেড়িয়ে একটি বেঞ্চে অামি এক পরাজিত মানবের মত মাথা নিচু করে বসে অাছি।
দরজার ওপাশে তারা দুজন কথা বলছে, কেন জানি অামার খুব ইচ্ছে করছে তাদের কথাপকথন গুলো শুনতে।
অামি দেয়ালে কান লাগিয়ে কর্ণপাত করার চেষ্টা করছি, কিন্তু এই দেয়ালের ইট বালি সিমেন্টের মাঝে বিন্দু পরিমানও ছিদ্র নেই যে ভিতরের কথা গুলো অামার কানে অাসবে।
.
ক্লাস থ্রিতে পড়ার সময় অাজাদ স্যারের থেকে শুনতাম, তিনি বলতেন দেয়ালেরও কান অাছে, সেই কান দিয়ে গোপন কথা গুলো অন্য কোথাও চলে যেতে পারে তাই সাবধান। তবে অাজ বুঝলাম স্যারের এই কথার কোনো মুল্য নেই। একদমই মুল্যহীন কথা। যদি এই কথার মুল্য থাকতো তবে এই দেয়ালের কান নেই কেন? তাছাড়া ভিতরে তো অনেক গোপন এবং খুব গুরুত্বপূর্ণ কথা হচ্ছে।
স্যারের অারো অনেক উক্তি অাছে সেগুলোর সত্যমিথ্যা কখনো জানার চেষ্টা করিনি, তবে যদি জানার চেষ্টা করি তাহলে স্যারের অধিকাংশ উক্তিই অবাস্তব মনে হবে। কারন বর্তমান সমাজ অনেকটাই পরিবর্তন হয়ে গেছে। অার এই ব্যতিক্রমী সমাজে তার উক্তি গুলো মূল্যহীন।
কেন জানি অামার মাঝে বিষণ্ণতা কাজ করছে খুব গভীর ভাবে, অামার মনে হচ্ছে বাবার স্বপ্নটা অামি পূরন করতে পারবো না। অামি সব সময়ই অপধার্থ ছিলাম, এখনো অাছি। হয়ত এই অপধার্থকে দিয়ে কিছুই হবেনা।
.
মা অামার সামনে দাড়িয়ে অাছে, অামি মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝলাম তার মুখে বিষণ্ণতা ফুঁটে অাছে খুবই ভয়ানক ভাবে ফু্টে অাছে।
এই বিষণ্ণতা খুবই খারাপ একটি জিনিস, অধিকাংশ মানুষই এর ভুক্তভোগী। এই ভুক্তভোগীরা সব সময় চেষ্টা করেন এই বিষণ্ণতা থেকে দূরে থাকতে, তবে বেশিরভাগ ভুক্তভোগীরাই ব্যর্থ হয়। অামার মা তো অনেক অাগে থেকেই এর ভুক্তভোগী, তবে অামার মনে হয় তিনি কখনো এই বিষণ্ণতা থেকে দূর থাকতে চাননি। বাবা মারা যাওয়ার পর থেকে এই ডিপ্রেশনই তার একমাত্র সঙ্গি হয়ে অাছে, হয়ত মৃত্যুর অাগ পর্যন্ত সঙ্গি হয়েই থাকবে।
.
হাসপাতাল থেকে বের হয়ে একটা রিক্সা ধরলাম, মা এই রিক্সাওয়ালার সঙ্গে পাঁচ টাকা বেশি চাওয়ার জন্য তর্ক শুরু করে দিয়েছিলো।
রিক্সাওয়ালা বললো ডাক বাংলো মোড় পর্যন্ত পঁচিশ টাকা ভাড়া, অার মা বিশ টাকা বলেই গলা ফাটাচ্ছিল।
যদিও উপযুক্ত ভাড়া বিশ টাকাই, তবে এই কাঠ ফাটা রোদে পাঁচ টাকা ভাড়া বেশি চাওয়া অামার কাছে খুব একটা বেশি মনে হয়নি। অামার তো মনে হচ্ছে ভাড়া ত্রিশ টাকা চাওয়া উচিত ছিলো, কেননা অামাদের গন্তব্যে পৌঁছে দিতে ত্রিশ টাকারও বেশি মূল্যের ঘাম ঝড়বে তার গা থেকে।
সূর্যের উষ্ণ তাপে ক্লান্ত-অবসন্ন শরীরটা যেন তার চলছিলো না, তবুও পেটে ভাত জুটানোর জন্য চলতে হয় তাদের।
তাই মাকে থামিয়ে দিয়ে উঠে চড়ে বসেছিলাম এই মধ্যবয়স্ক রিক্সাচালকের রিক্সায়।
.
বাসায় ফিরে গোসল করে কিছু একটা খেয়ে নিলাম, ইদানিং অামি অামার মাথায় খুব বড় একটা সমস্যা অনুভব করছি, সমস্যাটা হলো অামার মস্তিস্কে।
অামি যা যা করি সব কিছুই ভুলে যাই, যেমন সকালে কি দিয়ে নাস্তা করলাম সেটা দুপুরে কেউ জিজ্ঞাস করলে বলতে পারিনা। অাবার দুপুরে কি দিয়ে লান্চ করলাম সেটা রাতে কিছুতেই মনে করতে পারিনা, এমনকি সারাদিনে যা করেছি সব কিছুই ভুলে যাই অামি, এটা খুবই ভয়নাক একটি সমস্যা। হয়ত অসুখ টার প্রভাব অামার মস্তিস্কে পরছে, ধীরে ধীরে অামার মস্তিস্ক বিকৃত করে দিচ্ছে।
.
অাগে খুব গল্প লিখতাম, ফেসবুকের জনপ্রিয় পেজ গুলোতে প্রায় প্রতিদিন লিখতাম। সাথে বইও পড়তাম, অামি বই পোকা ছিলাম, সারাদিন নিজেকে বইএ মগ্ন রাখতাম। কিন্তু এইসব লেখালিখি সাথে বই পড়া সব মন থেকে উঠে গেছে।
কেননা একটি বই খুব মনোযোগ সহকারে পড়তাম, কিন্তু বই পড়ার কিছু্ক্ষণ পরই বইয়ের গল্পটা অামার মস্তিস্ক থেকে ডিলেট হয়ে যায়। সাথে গল্প নিয়ে ভাবতেও পারিনা যে নতুন কোনো গল্প লিখবো।
তাছাড়া অামার একটা ডায়েরী অাছে, ছোট বেলা থেকেই সেটা লিখছি। অনেক উক্তি এবং ছোট কবিতা দিয়ে ডায়েরীর বুক ঝালাফালা করে দিয়েছি, ডায়েরীটা অামার কোনো এক কাছের বন্ধুকে উপহার হিসেবে দিব। যদিও অামার কোনো বন্ধু নেই, তবে সাময়িক সময়ের জন্য বন্ধু বানিয়ে দিয়ে দিব।
.
ঘরের সব গুলো জালানা খোলা, এই খোলা জানালা দিয়ে প্রকৃতির বাতাস গুলো ঘরে ঢুুকছে। বাতাস গুলো ঘরে ঢুকার সাথে সাথেই ঘরের চার দেয়ালে এসে ধাক্কা খেয়ে থমকে যায়, অাচ্ছা বাতাস কি কখনো কোনো কিছুর সাথে ধাক্কা খেয়ে থমকে যেতে পারে? তবে অামার বিকৃত মস্তিস্ক বলছে বাতাসও ধাক্কা খেয়ে থমকে যেতে পারে, অামার মস্তিস্ক সব সময় ভুল-বাল কথাই বলে এই কথাটাও সেই ভুলবালের মাঝে পরে যায়। অামার খুব ভালে লাগে ভুলবাল কথা বলতে, কিন্তু সেটা সব সময় নয়। সময় বুঝে ভুলবাল বলতে হয়, নয়ত সবাই অামাকে পাগল ভাববে তো।
.
প্রায় সন্ধ্যা হয়ে গেছে, বাতাসও ক্রমাগত কমে যাচ্ছে। সন্ধ্যা হলেই অামাদের এখানে বাতাস কমে যায়, এটা একটি প্রকৃতির নিয়ম, অার এই নিয়ম অামাদের না মেনে উপায় নেই।
হঠাৎ মৃধু বাতাসের সাথে কান্নার শব্দ অামি অামার রুম থেকে শুনতে পাচ্ছি, এই থমথমে সন্ধ্যায় কে কান্না করতে পারে?
বাসায় তো অামি অার অাম্মু ছাড়া তৃতীয় কেউ নেই।
অার ছোট বোনটিও ফুপুর বাসায় চলে গেছে কিছুদিনের জন্য, কারন সামনে তার এইচ-এস-সি পরিক্ষা। ফুপুর বাসার সাথেই তিথীর কলেজ, সেখান থেকেই পরিক্ষা দিতে তার সুবিধা হবে তাই ফুপুর বাড়িতে থাকছে সে।
অামি বুঝতে পারলাম পাশের রুমে অামার মা কাঁদছে, অার কেন কাঁদছে সেটাও অামি জানি। মা প্রায় সময়ই অামাকে নিয়ে কাঁদে, অার অামি বিস্মিত হয়ে শ্রোতার মত দরজার অাড়ালে দাঁড়িয়ে মায়ের কান্নার শব্দ শুনে যাই।
কখনো জানার চেষ্টা করিনি মায়ের কাঁদার কারন, অামি তো ভালো করেই জানি মা কেন কাঁদে।
.
রুম থেকে বেড়িয়ে অামি মায়ের রুমের দরজার সামনে দাঁড়ালাম, রুমের ভিতরে চোখ যেতেই দেখলাম মা বাবার পুরোনো একটি ছবির সামনে দাড়িয়ে কাঁদছেন অার কান্না জড়িত কন্ঠে বাবার সাথে কথা বলছে।
বাবার এই ছবিটি অনেক পুরোনো, বাবার বয়স যখন অাটাশ বছর ছিলো তখনকার তোলা ছবি। ছবিটি একটি নীল ফ্রেমে বাধানো, ফ্রেমের গায়ে লাল রঙের গোলাপের ছোট ছোট ছবি অাঁকা অাছে। বাবার ঠোটে একটি তিল অাছে সেটা এই ছবিটিতে স্পষ্ঠ দেখা যাচ্ছে।
অাজাদ স্যার বলেছিলেন যাদের ঠোটে তিল থাকে তারা প্রেমিক পুরুষ হয়, এবং তাদের বিয়ে হয় প্রেম করে। অামার বাবা প্রেমিক পুরুষই ছিলেন, একদম খাটি প্রেমিক পুরুষ বলা যায়। বাবার থেকে শুনেছি বাবা মাকে প্রেম করেই বিয়ে করেছে, সেই স্কুল জীবন থেকে শুরু করে দ্বীর্ঘ সাত বছর তাদের সম্পর্ক। অতঃপর সেই দ্বীর্ঘ প্রেমের গল্পের সমাপ্তি ঘটে বিয়ের মাধ্যমে, শুনেছি বিয়ের পর নাকি অাসল প্রেমের সমাপ্তি ঘটে যায়। তবে বিয়ের পরও প্রেম হয় কিন্তু সেটা বিয়ের অাগের প্রেমের চেয়ে একদমই অালাদা।
.
বাবার মত অামার ঠোটেও তিল অাছে, তবে অামি বাবার মত প্রেমিক পুরুষ ছিলাম কিনা জানিনা কিন্তু একটা মেয়েকে খুব ভালোবাসতাম।
তবে মেয়েটির বিয়ে হয়ে গেছে, সেক্ষেত্রে বলা যায় অামি ব্যর্থ প্রেমিক তাই অামাকে প্রেমিক পুরুষ বলা চলবে না, কারন প্রেমিক পুরুষরা সফল হয়।
যদিও বিয়েটি মেয়ের ইচ্ছের কারণেই হয়েছে।
মেয়েটির বিয়েতে অামি বিন্দু পরিমানও কষ্ট অনুভব করিনি, কারন সে এখন বড্ড সুখে অাছে অার অামি তো সেটাই চেয়েছিলাম। এক্ষেত্রে বলা চলে অামি সফল, এখন অামাকে ব্যর্থ প্রেমিক বলা হবে নাকি সফল প্রেমিক বলা হবে বুঝে উঠতে পারিনি।
.
মায়ের কান্না বেড়েই যাচ্ছে অনবরত, অামি জানি মায়ের কান্না অারো বাড়বে।
অাজাদ স্যারের অারো একটি উক্তির কথা মনে পড়ে গেলো, তিনি বলেছিলেন "যে কাঁদতে যায় তাকে কাঁদতে দাও, প্রাণ খুলে কাঁদতে দাও। কারণ কান্নার সেই অশ্রুজলে তার চোখ দুটো পরিস্কার হয়ে যাবে, সাথে মনও একদম হাল্কা হয়ে যাবে।
তাছাড়া বাংলাদেশের সঙ্গিত শিল্পী বেলাল খানের একটি গান অাছে যেটা অামার খুব প্রিয় একটি গান। সেই গানের প্রিয় একটি লাইন অাছে "অামার ভীষণ কাঁদতে ইচ্ছে করে, কাঁদলে যে বড় হাল্কা লাগে।
এই গানের কথা এবং অাজাদ স্যারের উক্তটি, দুটোই একদম সত্য।
কেননা অামি একটা মেয়েকে ভালোবাসতাম, যখন মন ভারি হয়ে যেত তখন মন-প্রাণ খুলে কাঁদতাম, অার তখনই নিজেকে হাল্কা মনে হত।
তাই অামি মাকে প্রায় সময় কাঁদতে দেখি, কখনো কাঁদতে নিষেদ করিনি অামি। নিজেকে হাল্কা করে নেয়া ভালো।
.
অামি অামার রুমে বসে অাছি, হঠাৎ দরজায় খট-খট শব্দ।
দরজার ওপাশ থেকে ভাঙ্গা কন্ঠে মা অামাকে ডেকেই যাচ্ছে
.
-বাবা ইবান তুই কি ঘুমিয়েছিস? বাবা একটু জরুরি কথা ছিলো তোর সাথে। প্লিজ ইবান যদি না ঘুমিয়ে থাকিস তাহলে দরজাটা খোল।
.
মায়ের কন্ঠে এখনো কান্না জড়িয়ে অাছে, মা তখন অঝড় ধারায় কেঁদেই গিয়েছে। হয়ত সেই কান্নার ছাঁপ এখনো তার কন্ঠ থেকে মুছে যায়নি।
অামি বিছানায় গা এলিয়ে দিয়েছিলাম মায়ের ডাকে বিছানা থেকে উঠে দরজাটা খুলে দিলাম। দরজা খুলতেই মা শাড়ির অাঁচল দিয়ে তার অশ্রুসিক্ত চোখ দুটো মুছে নিলেন।
মায়ের চোখ দিয়ে এখনো অনবরত অশ্রু ঝড়ছে, মায়ের কন্ঠও ভেঙ্গে গেছে।
অামি দরজা খুলে দিয়ে কিছু না বলে বিছানায় শুয়ে পড়লাম অাগের মত, মা অামার পাশেই বসে পরলো।
মায়ের নিরাসক্ত চোখ দুটো অামার দিকে তাকিয়ে অাছে, অামি বুঝতে পারলাম মা কোনো এক গুরুত্বপূর্ণ কথা বলার জন্য অামার রুমে এসেছেন। কিছু্ক্ষণ পর ক্ষীণস্বরে মা বললো
.
-বাবা ইবান অামরা চারদিন পর ভারত যাচ্ছি, নিজেকে রেডি করে নিস।
.
মায়ের কথা শুনে অামি হতবাক দৃষ্টিতে তার তাকিয়ে অাছি। মাও যথেষ্ট অাশ্চর্য হয়েছেন অামার চোখের ভাষা দেখে, কিন্তু অামাকে বুঝতে দিলো না। মা অাবারও স্নিগ্ধ কন্ঠে বললো
.
-তোর চেকঅাপের জন্য ভারত যাওয়ার প্রয়োজন, সেখানে তোর চিকিৎসা হবে। যাওয়ার সব ব্যবস্থা হয়ে গেছে। ব্যাংক থেকে টাকা গুলো তুলে নিয়েছি। এখন তুই মানুষিক ভাবে রেডি থাকিস, অাগামি শুক্রবার ফ্লাইট।
.
মায়ের কথায় অামার কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই, অামি বালিশের নিচে মাথা গুচে দিয়ে ঘুমানোর চেষ্টা করলাম। মা অামার হাত চেপে ধরে একটি দ্বীর্ঘশাস নিলেন, অামি জানিনা এই দ্বীর্ঘশ্বাসের অর্থ। অামার দু্র্বল এই মস্তিষ্ক এইসব নিয়ে ভাবতে পারেনা, এইসব নিয়ে ভাবার জন্য দরকার শক্তিশালী মস্তিস্ক যা অামার মাথায় নেই। মা চলে যাওয়ার পর রুমটা নিস্তব্ধ হয়ে গেছে, খোলা জানালা দিয়ে প্রকৃতির যে বাতাস টা অাসতো সেটাও থমকে গেছে, তাই বিছানা থেকে উঠে ফ্যান ছেড়ে দিয়ে অাবার শুয়ে পড়লাম। অামি ইদানিং বাকশক্তহীন হয়ে গেছি, কারো সাথে কথা বলার চেষ্টা করেও কথা বলতে পারিনা। সব সময় অামার ভিতরে নিরাবতা কাজ করে, হয়ত এই নিরাবতাই অামাকে নির্বাক করে দিয়েছে।
.
অাজ শুক্রবার, বাংলাদেশের ডাক্তার যে হাসপাতালের ঠিকানা টা দিয়েছিলো অামরা সেই হাসপাতালেই উপস্থিত হলাম।
এখানে অাসতে অাসতে প্রায় সন্ধা হয়ে গেছে, অামরা যে ডাক্তারের কাছে এসেছি তিনি ভারতের সময়ে সন্ধ্যা সাতটা থেকে রাত দশটা পর্যন্ত বসেন, সাতটা বাজতে এখনো চল্লিশ মিনিট বাকি। মা ছেলে দুজনেই ক্ষুদার্থ তাই অামরা অাশেপাশের কোনো এক চায়ের দোকানে বসলাম কিছু খেয়ে পেটের ক্ষুদাটা মোটানোর জন্য।
এখানের চায়ের দোকান গুলো অামাদের দেশের দোকান গুলো থেকে একদমই ব্যতিক্রমী। এইসব দোকানে মেয়ে ছেলে পুরুশ মহিলা সবাই সমানে দাড়িয়ে একসাথে চা খায়, অামি অাশ্চর্য হলাম ভারতের এমন পরিবেশ দেখে।
ভারতের অনেক সিরিয়াল দেখেছি, নাটক দেখেছি, দেখেছি ভারতিয় অনেক মুভি। কিন্তু সেইসবে এমন দৃশ্য তুলে ধরেনি, তবে অাজ দেখলাম সরাসারি ছেলের হাত দুটো মেয়েটির বুকে চলে যাচ্ছে অার মেয়েটি লজ্জায় মৃধু হাসি দিচ্ছে। শ্যামলা বর্ণের মেয়েটিকে দেখে বুঝা যাচ্ছে ছেলেটির সেই লুলামি স্বভাবটা মেয়েকে চরম অানন্দ দিচ্ছে, অার মেয়েটি সেই অানন্দ উপভোগ করছে। অামার মনে হচ্ছে এখানে মহিলা পুরুষ সবাই সমান, দুজনেরই সমান অধিকার রয়েছে। ইস বাংলাদেশের বর্তমান যুব সমাজের ছেলেদের জন্ম যদি ভারতে হত তাহলে কতই না ভালো হত।
.
দ্বীর্ঘ সময় ধরে হাসপাতালের অপেক্ষা কক্ষে বসে অাছি, এই রুমে যারা রিপোর্ট হাতে নিয়ে বসে অাছে সবার মুখেই চিন্তার ছাঁপ স্পষ্ট ফুটে উঠেছে। সবাই অপেক্ষার প্রহর গুনছে কখন তার সিরিয়াল অাসবে এবং রিপোর্টে কি এসেছে সেটা জানতে পারবে। কিছুক্ষণ পর একজন একজন করে উঠে চলে যাচ্ছে ডাক্তারের রুমে।
অতঃপর অামাদের অপেক্ষার প্রহর শেষ হলো, একজন নার্স ৩২৬ বলে ডাক দিতেই অামরা উঠে গেলাম। এই নার্সটা মনে হয় খুব ভালো, একদমই তরুণী একটা মেয়ে। বয়স বেশি হবেনা, অাঠারোর কাছাকাছি হবে। তার চোখমুখে মায়াবী একটা ছাঁপ অাছে, মেয়েটা নিশ্চই হিন্দু ধর্মের। কারন তার কপালে ইয়া বড় একটি লাল টিপ দিয়েছে। এমন একটি মেয়েটে ইসলাম ধর্ম গ্রহন করিয়ে বিয়ে করা ভাগ্যের ব্যাপার। অামি অাসলেই পাগল হয়ে গেছি, অল্প বয়সী একটা সুন্দরি নার্সকে দেখে কি সব ভাবা শুরু করে দিয়েছি হা হা হা।
.
অামার রক্ত অাবারও চেকঅাপ করা হলো, সাথে বাংলাদেশ থেকে নিয়ে অাসা অামার ব্লাড রিপোর্ট। অামার শরীরের এবং রক্তের সব সমস্যা গুলো সেই রিপোর্টে লিখা অাছে। ডাক্তার দুটি রিপোর্টই খুব মনযোগ সহকারে দেখছেন, ডাক্তারের এই রুমটা যথেষ্ট বড়। রুমে তিন-চার টা বেঞ্চ অাছে, প্রতিটি বেঞ্চের উপরে একটি করে ফ্যান ক্রমাগত ঘুরছে। খুব ভি-অাই-পি হাসপাতাল মনে হচ্ছে।
মা অামাকে একটি বেঞ্চে বসিয়ে দিয়ে ডাক্তারের সাথে কথা বলছেন, অামি যে বেঞ্চে বসে অাছি সে বেঞ্চ থেকে ডাক্তারের টেবিলের দুরত্ব অনেক তাই কি কথা হচ্ছে অামি শুনতে পাচ্ছিনা তবে অামার চোখ দুটো তাদের ঠোটের দিয়ে চেয়ে অাছে। ঠোটের নড়াচড়া দেখে কিছুটা হলেও বুঝা যায় সে কি বলেছে।
.
হঠাৎ ডাক্তারের চোখ মুখে তীক্ষ্ণতা ফুঁটে উঠেছে, তিনি মনে হয় অামার মায়ের কথায় বিরক্ত হচ্ছেন। অামি দূর থেকে বুঝতে পারছি মা অনুরোধ স্বরে কিছু একটা নিয়ে ডাক্তারকে অনুরোধ করে যাচ্ছে। কিন্তু ডাক্তার মায়ের অনুরোধে বিরক্তিবোদ করলেন।
কিছুক্ষণ পর ডাক্তার ফাইল গুলো মেঝেতে ছুড়ে মারলেন, সাথে রাগান্বিত স্বরে ডাক্তার বললেন "Get Lost"
অামি ডাক্তারের এমন অাচরন দেখে হতবুদ্ধি হয়ে গেলাম, কেন এমন ব্যবহার অামার মায়ের সাথে ডাক্তার করলেন সেটার কারণ খোঁজার চেষ্টা করলাম।
কিন্তু অামার দুর্বল এবং বিকৃত মস্তিস্ক কারণটা খুঁজে পেলো না।
মা উঠে দাঁড়ালেন, অামি একটু এগিয়ে গিয়ে থমকে গেলাম। মায়ের পুরো শরীর কাঁপছে, কাঁপা কাঁপা হাতে মেঝেতে পরে থাকা ফাইল গুলো হাতে নিলেন। মায়ের হাত তীব্রভাবে কেঁপে যাচ্ছে, মনে হয় মায়ের শিরা উপশিরায় তীব্রভাবে ভূমিকম্প বয়ে যাচ্ছে।
অামার মনে হলো মেঝেতে পরে থাকা ফাইল গুলো হাতে নিতে মায়ের খুব কষ্ট হয়েছে, কেননা বার বার হাত থেকে ফাইন গুলো মেঝেতে পরে যাচ্ছিলো।
মায়ের দুচোখে অশ্রুকণা জমা হয়ে অাছে, ঠিক যেন অাকাশে কালো মেঘ জমে থাকার মত। কিন্তু মেঘের মত গর্জন হচ্ছেনা।
.
পরদিন শনিবারই অামরা দেশে ফিরে অাসি, দেশে অাসার পর মা কেমন যেন পরিবর্তন হয়ে গেছেন। ঠিক মত খাওয়া দাওয়া করেনা, ঠিক মত ঘুমায় না। কথাও কম বলে অাগের থেকে, একদমই নিরব হয়ে গেছে অামার মা।
এক গভীর রাত, পুরো শহর গভীর ঘুমে মগ্ন। এই সময়ে শহরও ঘুমিয়ে থাকে, শহরের সব গাছপালা, সব ব্যস্ত মানুষ এবং নানা রকমের প্রাণীরাও ঘুমে মগ্ন থাকে। সেই হিসেবে বলা যায় শহরটিও গভীর ঘুমে অচেতন হয়ে থাকে।
কান্নার শব্দে অামার ঘুম ভেঙ্গে গেলো, দেয়াল ফেঁটে কান্নার শব্দ গুলো ক্রমাগত অামার রুমে চলে অাসছে। কান্নার শব্দে পুরো রুম নিস্তব্ধ হয়ে গেছে।
হঠাৎ অামার মনে পড়লো অাজাদ স্যারের সেই উক্তিটার কথা, যে উক্তিটাকে অামি অবাস্তব বলেছিলাম।
অাসলেই দেয়ালেরও কান অাছে, যদি না থাকতো তবে অামি এই বন্ধ ঘরে শুয়ে থেকে কান্নার শব্দ পেতাম না।
.
বিছানা থেকে উঠে পাশের রুমে চলে গেলাম, দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বুঝতে পারলাম মা বাবার ছবির সামনে দাঁড়িয়ে কাঁদছে। অাজ অামি সরাসরি রুমে প্রবেশ করলাম, অামাকে দেখে মায়ের কান্না থেমে গেলো। অামি কিছু বলার অাগেই মা কান্না জরিত কন্ঠে বলে উঠলো
.
-অামি পারলাম নারে বাবা ইবান অামি পারলাম না
.
-কি হয়েছে মা?
.
-তুই অামাকে ক্ষমা করে দিস বাবা ইবান, অামি পারলাম না।
.
মা অাবারও কাঁদা শুরু করলেন, অামি রুম থেকে বেড়িয়ে নিজের রুমে ফিরে গেলাম। রাতের বাকি সময়টা অামার নির্ঘুমে কেটে গেলো, পুরো রাতে নিজেকে নিকোটিনের বিষাক্ত ধোঁয়ায় মগ্ন রেখেছি। রাত থেকেই মাথায় হাজারো চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছিলো, সিগারেটে মগ্ন থাকলে চিন্তা কিছুটা হলেও দূর হয়। তাই দ্বীর্ঘদিন পর অাবারও সেই সুখটান, এই সুখটানে কেটে গেলো রাতের সব অাধার নিশি।
জানালার কার্নিস ধরে অপেক্ষার প্রহর গুনছি কখন সকাল দশটা বাজবে।
.
ঘুম ভাঙ্গা রোদে অানমনে হাটছি, গন্তব্য সেই ডাক্তারের চেম্বার যার কথা ধরে অামার মা অামাকে নিয়ে ভারত গিয়েছিলেন। কিছু কথা জানার অাছে তার কাছ থেকে। এক ঘন্টা ধরে অপেক্ষা করার পর একটি ব্লাক রঙের গাড়ি হাসপাতালের গেটের সামনে এসে থমকে যায়।
অামি অধিক অাগ্রহ নিয়ে এগিয়ে গেলাম গাড়ির দিকে, ডাক্তার অামাকে দেখেই চিনে নিয়েছেন। অামি লক্ষ করলাম অামাকে দেখার সাথে সাথেই তার মুখের স্নিগ্ধ হাসি টুকু নিমিষেই হারিয়ে গেলো, সাথে গভীর ভাবে বিষণ্ণতা ফুটে উঠলো। অামি তার চোখের দিকে তাকিয়ে বুঝলাম তার চোখের চাহনিতে দিশেহারা ভাব। তার হঠাৎ এমন পরিবর্তনে অামি কিছুটা হলেও বিস্মিত হলাম সেটা তিনি বুঝতে পারলেন।
.
-স্যার কিছু কথা ছিলো, অাপনার সাথে কি পারশোনালি কথা বলা যাবে?
.
-হ্যা চলো অামরা ওই নির্জন যায়গায় গিয়ে বসি
.
তিনি অামাকে নিয়ে হাসপাতালের পূর্ব পাশে একটি বেঞ্চে বসলেন।
.
-অামি জানি তুমি কি বলতে চাও
.
-সত্যিই জানেন?
.
-হ্যা সত্যিই জানি, তুমি তোমার অসুস্থতার কথা জানতে এসেছো তাইতো?
.
-জ্বি, খুলে বলুন সব কিছু
.
-তোমার রক্তে একটি ভাইরাস খুঁজে পাওয়া গেছে যার নাম "HBD2"
.
অামি বিস্ময়ের সঙ্গে বললাম "HBD2?"
.
-হ্যা HBD2, এটা খুবই ভয়ানক একটি ভাইরাস, যার চিকিৎসা বাংলাদেশে নেই। এই ভাইরাসটি তোমার রক্তে দুই বছর অাগে প্রবেশ করেছে, কিন্তু তোমরা সেটা এক মাস অাগে টের পেয়েছো
.
-এক মাস অাগে?
.
-হ্যা এক মাস অাগে, এখন তুমি একদমই শেষ সময়ে পৌঁছে গেছো। এখন এটা থেকে বাঁচা প্রায় দুস্কর।
.
-দুস্কর হলে মাকে কেন ভারত যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন?
.
-তোমার মা কিছুতেই এটা বিশ্বাস করেননি যে তুমি শেষ সময়ে এসে গেছো।
অামি বলেছিলাম এর চিকিৎসা বাংলাদেশে নেই একমাত্র ভারত ছাড়া, ভারতে অামার এক বন্ধু থাকে সে অনেক বড় ডাক্তার। দুজনেই মুম্বাই কলেজে লেখাপড়া করেছিলাম, তোমার মাকে তার কথা বলতেই তিনি তোমাকে নিয়ে ভারত যাওয়ার জন্য পাগল হয়ে গেলেন। অামি তার ঠিকানা এবং হাসপাতালের ঠিকানা দিয়েছিলাম
.
-তাহলে অাপনার বন্ধু ডাক্তার অামার চিকিৎসা না করে মায়ের সাথে এমন অাচরন কেন করলেন?
.
ডাক্তার এবার একটি দ্বীর্ঘশ্বাস নিয়ে নিজেকে হাল্কা করে বললেন
.
-ডাক্তার বলেছিলো তোমার সময় প্রায় শেষ, এই ভাইরাসের রুগি একশো থেকে বেঁচে যায় মাত্র পাঁচজন। অামি ডাক্তারের সাথে কথা বলে জানতে পেরেছিলাম তিনি তোমার মাকে কি বলেছিলো
.
-কি বলেছিলো?
.
-ডাক্তার বলেছিলো, তোমার এক বছর সেই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় থাকতে হবে। তোমার সাথে থাকতে হবে অারো দুজন, এই এক বছরের চিকিৎসার খরচ এক সাথে দিতে হবে মোট বারো লক্ষ টাকা। সাথে খাওয়া দাওয়ার খরচ অালাদা, সর্বমোট প্রায় পনেরো লক্ষ টাকার প্রয়োজন। ডাক্তার বলেছিলো এখনই রিসেপশনে বারো লক্ষ টাকা জমা দিলে তোমাকে ভর্তি করানো হবে। কিন্তু......
.
থমকে গেলেন তিনি, অামি অাগ্রহের সঙ্গে জিজ্ঞাস করলাম কিন্তু কি?
.
-এক বছর চিকিৎসার পর যে তুমি বাঁচবে তার গ্যারান্টি ডাক্তাররা দিতে পারবে না। এক বছর পর বুঝা যাবে তুমি বাঁচবে নাকি মারা যাবে।
.
-এত টাকা খরচ হবে তবুও তারা নিশ্চিত হতে পারছেনা? অার পনেরো তো দূর দশ লাখ টাকাও মায়ের কাছে নেই তাহলে তিনি কেন অামাকে নিয়ে ভারত গিয়েছিলেন
.
-সেটা তো অামি জানিনা, তোমার মায়ের কাছে কত ছিলো সেটা তিনি অামায় বলেননি কখনো
.
ডাক্তার উঠে দাড়িয়ে বললেন, "অামি যাচ্ছি অামার সময় হয়ে গেছে।
.
-অাচ্ছা তাহলে অামি অার কতদিন বাঁচবো?
.
-সর্বোচ্চ এক বছর
.
অামিও উঠে বাড়ির পথে হাটা দিলাম, স্থির করলাম হেটে হেটেই অাজ বাড়ি যাব।
অামি অার এক বছর বাঁচবো এটা নিয়ে অামার কোনো দুঃখ নেই, যত দ্রুত মরবো তত কম গুনাহ্ নিয়ে মরবো।
দুঃখ শুধু অামি এই অপদার্থ ছেলেটা বাবার স্বপ্নটা পূরণ করতে পারলম না।
মৃত্যুর পর হয়ত বাবার সাথে অামার দেখা হবে, তখন তিনি রাগের স্বরে হয়ত জিজ্ঞাস করবেন "কিরে অপদার্থ অামার মত তোর মাকে তুইও ধোকা দিয়ে চলে এলি? পারলিনা অামার স্বপ্নটাকে বাস্তবায়ন করতে"
তখন হয়ত অামার কিছুই বলার থাকবে না, তবে একটি উত্তরই অামি দেয়ার চেষ্টা করবো "বাবা অামি কাউকে ধোকা দেইনি, অামি হেরে গেছি বাবা। অামি জীবনের কাছে পরাজিত বাবা, অামি এক পরাজিত সৌনিক।
.
সমাপ্ত
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now