বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
আরমানের মা-বাবার সাথে পরিচয় পর্ব যতটা সম্ভব সংক্ষিপ্ত করে বাড়ির পথ ধরলাম আমি। রিকশায় আমার পাশে বসা সুমিকে দেখে মনে হচ্ছে সারাক্ষণ কিছু একটা বলতে চাইছে। কিন্তু কোন কারনে বলতে দ্বিধা বোধ করছে। আমার অবশ্য শোনার কোন আগ্রহ নেই। অবশেষে মুখ খুলল সে, “রিশাদ, তোমার কি মন খারাপ হয়েছে?”
আমি জোর করে একটু হাসার চেষ্টা করলাম। সেই হাসি অনেকটা কান্নার মত দেখালো। বললাম, “মন খারাপ কেন হবে?”
“এই যে বাজারের মধ্যে... হঠাৎ... আরমানের বাবা মায়ের সাথে দেখা...”
“সেটা তো হতেই পারে তাই না? পৃথিবীটা গোল!” আমি টিটকারির সুরে বললাম।
“তুমি রেগে আছ রিশাদ”। সুমি বললো।
আমার মেজাজ খারাপ হয়ে গেল হুট করে। বললাম, “হ্যা, আমি রেগে আছি। অনেক বেশি রেগে আছি। কি করবে তুমি?”
“রিশাদ!” এক মুহূর্ত থেমে থাকল সুমি। তারপর বলতে শুরু করলো, “তোমাকে তো আমি আরমানের কথা আগেই বলেছি। তুমি জানতে আমাদের সম্পর্কের কথা। সো, এই বিষয়টা উঠে আসায় রাগার কোন কারণ দেখছি না”।
“ওহ রিয়েলি?” আমার কণ্ঠে টিটকারির সুর। “তুমি সব বলেছ আমাকে আরমানের সম্পর্কে?”
“হ্যা”।
আমাদের উত্তেজিত কণ্ঠস্বর শুনে রিকশাওয়ালা একবার পেছন ফিরে তাকালো। কিন্তু আমার গরম চোখ দেখে পরক্ষনেই দৃষ্টি ফিরিয়ে নিলো।
আমি সুমির দিকে ফিরে চোয়াল শক্ত করে বললাম, “তুমি কি আমাকে বলেছিলে যে আরমানের বাবা মায়ের সাথেও তোমার পরিচয় ছিল? তাদের বাড়িতে তোমার নিয়মিত যাতায়াত ছিলো? আরমানের বাবাকে তুমি বাবা বলে ডাক। মাকে তুমি মা বলে ডাক! বলেছিলে এসব?”
“আসলে...” সুমি চোখ নামিয়ে নিলো। “এগুলো কি বলার মত কিছু রিশাদ?”
“কেন মনে হচ্ছে তোমার যে এগুলো বলার মত কিছু নয়?” আমার পক্ষে নিজের রাগ কন্ট্রোল করা সম্ভব হচ্ছে না। প্রায় চিৎকার করে বলতে থাকলাম, “তুমি বলেছ আরমান নামে একটা ছেলেকে তোমার ভাল লাগতো। সে বিদেশে পড়ালেখা করতে গিয়ে অন্য মেয়ের প্রেমে পড়ে তোমাকে ভুলে গেছে। ব্যাস! এতটুকুই। এর থেকে কি বুঝব আমি? তোমার সাথে তার হালকা পাতলা প্রেম ভালোবাসা ছিল। এর বেশি কিছু নয়। তোমার কথা থেকে কি আমি বুঝতে পেরেছিলাম যে তোমাদের দুজনের ভালবাসা এতটা গভীরে চলে গিয়েছিলো? ঐ ছেলের বাবা-মা তোমাকে পুত্রবধূ বানানোর স্বপ্ন দেখছিল, তুমি ছেলেটির বাবা মাকে নিজের বাবা মায়ের মত করে দেখতে - তুমি যদি এসব কথা আমাকে আগে বলতে, তাহলে আজকের ঘটনায় আমি এতটা অপ্রস্তুত অবস্থায় পড়তাম না! পুরো বাজারের মানুষ আজ তোমাদের মা-মেয়ের পুনর্মিলনি দেখেছে। আমার সামনে আমার স্ত্রী নিজের সাবেক প্রেমিকের প্যারেন্টসকে “মা” “বাবা” বলে ডাকছে! একজন পুরুষের জন্য সেটা কতটা অপমানজনক, তা কি তুমি একবারও ভেবে দেখছ?”
সুমির চোখের কোনে অশ্রুবিন্দু চিকচিক করছে। সে অস্ফুট কণ্ঠে বলল, “সরি”।
“সরি? সিরিয়াসলি?” আমি গলার আওয়াজ আরও বাড়ালাম, “এত কিছুর পর তুমি ভেবেছ সামান্য একটা সরি বলাতে সব ঠিক হয়ে যাবে?"
রাগে আমার মাথার তালু জ্বলছে! অনেক কষ্টে সামলে রেখেছি।
সুমি আর কথা বাড়ালো না। চুপ চাপ চোখের পানি ফেলছে। তার চোখের পানি দেখে রাগ আরও বাড়ছে আমার। দাঁতে দাঁত চেপে সামাল দিলাম। আমি হয়তো ভদ্রলোক নই, কিন্তু প্রায়ই পরিস্থিতির কারণে ভদ্রলোকের মুখোশটা পরে থাকতে হয় আমাকে।
বাসার কাছাকাছি চলে এসেছি। তখন সুমি মুখ খুললো আবার, "কেন তোমাকে এসব বলিনি জান?"
আমি শান্ত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলাম, "কেন?"
সুমি ধরা গলায় বলল, “আমার আসলে এসব কিছুই মনে ছিলো না। সব ভুলে গিয়েছিলাম। তোমার ভালবাসা আমাকে সব ভুলিয়ে দিয়েছিল রিশাদ! আমি আমার অতীত জীবন ভুলে গিয়েছিলাম। যা ভুলে গেছি, তা বলবো কি করে?”
আমি ঠোঁট বাকিয়ে হাসলাম একটু। “সত্যি সুমি? সব ভুলে গেছ?”
“হ্যা”।
আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললাম, “তাহলে গভীর রাতে আমি যখন ঘুমিয়ে পড়ি, তুমি তখন উঠে বসে একা একা কাঁদ কার জন্য? আমাকে বিছানায় রেখে প্রায়ই উঠে চলে যাও বারান্দায়। আকাশের দিকে তাকিয়ে কি ভাব তখন? ভেবেছ আমি কিছুই টের পাই না?”
সুমি মুখ নামিয়ে নিলো।
“তুমি কিছুই ভুলে যাওনি সুমি। ভুলে যাওয়ার ভান করেছ কেবল। তাই না?”
সুমি উত্তর দিচ্ছে না।
“এক বজ্জাত তোমাকে ফেলে পালিয়ে গেল, তুমি তাকে আজও মনের গভীরে ধরে রেখেছ। আর আমি তোমাকে নিঃস্বার্থভাবে শুধু ভালবেসেই গেলাম। অথচ আজও তোমার মনের ঘরের দরজার সন্ধান পেলাম না!”
কিছুক্ষন নীরবে কাটলো আবার।
রিকশা বাড়ির সামনে চলে এসেছে। নেমে পড়লাম দুজনে। ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে বাজারের ব্যাগ হাতে গেটের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি।
সুমির দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “আমার কি দোষ বলতে পার সুমি?”
সুমি উত্তর দিলো না। জানি এই প্রশ্নের জবাব সুমির কাছে নেই!
***
পরদিন সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে আমি রেডি হয়ে গেলাম বাইরে যাওয়ার জন্য। সুমি ঘুম ভেঙে উঠে আমাকে শার্ট প্যান্ট পড়া অবস্থায় দেখে জিজ্ঞেস করল, “কোথাও যাচ্ছ?”
“হ্যা”। সংক্ষেপে জবাব দিলাম আমি।
“কই যাচ্ছ? আজ তো শনিবার। তোমার অফিস নেই”।
আমি শার্টের হাতা গুটাতে গুটাতে বললাম, “অফিস না থাকলে কি বাইরে যাওয়া যাবে না?”
“না, তা বলছি না”। সুমি না-বোধক মাথা নাড়লো। “কোথায় যাচ্ছ সেটা তো বলে যাও?”
“আমার যখন খুব মন খারাপ থাকে, তখন আমি কোথায় যাই?” পাল্টা প্রশ্ন করলাম আমি।
“তোমার বাবার কবরের কাছে”।
“হুম, ঠিক। অনেক দিন বাবাকে দেখি না। ভাবছি আজকের দিনটা বাবার কাছেই কাটাব”।
সুমিকে আর কথা বাড়ানোর সুযোগ না দিয়ে বাসা থেকে বের হয়ে এলাম আমি। আমার বাসা থেকে আজিমপুর গোরস্থান খুব বেশি দূরে না। একটা রিকশায় চেপে চলে এলাম। দুই নং গেট দিয়ে ঢুকে তিন নম্বর সারির চার নম্বর কবরটা আমার বাবার। বাবার কবরের সামনে এসে দাঁড়ালাম। এই খানে এলে কেন যেন আমার মনটা শান্ত হয়ে যায়। জাগতিক সব দুশ্চিন্তা এক নিমেষে গায়েব হয়ে যায়।
অনেকটা সময় দাঁড়িয়ে থাকলাম এখানে। তারপর বাবার কবর ছাড়িয়ে সামনের দিকে হাটতে থাকালাম। উদ্দেশ্যহীনভাবে হাঁটছি আমি। আসলে ব্যর্থ মানুষের কোন কাজেরই কোন উদ্দেশ্য থাকে না।
আমি আপাদমস্তক একজন ব্যর্থ মানুষ! সুমি সম্পর্কে আমার কাজিন হয়। তাকে আমি ভালবাসি সেই টিনএজ বয়স থেকে। এমনকি আরমান দৃশ্যপটে আসার আগ থেকে। কিন্তু সুমি আমার দিকে কোনদিন ভালভাবে তাকায়নি পর্যন্ত! অথচ সে কি না আরমান নামের ঐ ফালতু ছেলেটার প্রেমে পড়ল? এতদিন হয়ে গেল আরমান তাকে ছেড়ে গেছে। তারপরও সুমি তাকে ভুলতে পারল না? কিন্তু কেন?
হাঁটতে হাঁটতে আমি গোরস্থানের পশ্চিমদিকের কর্নারে চলে এসেছি। এই দিকে সাধারণত অজ্ঞাতনামা বেওয়ারিশ লাশগুলোকে দাফন করা হয়। আঞ্জুমানে মুফিদুল ইসলামের লোকেরা সম্ভবত আরমানকে এই দিকেই কোন একটা কবরে দাফন করেছে।
হা হা হা!!!
আরমান আমেরিকা যাওয়ার স্কলারশিপ পেয়েছিল ঠিকই, কিন্তু তার আর আমেরিকায় যাওয়া হয়নি। সেদিন এয়ারপোর্ট যাওয়ার পথে তাকে লোক দিয়ে কিডন্যাপ করিয়েছিলাম। তারপর নিজ হাতে তার ভবলীলা সাঙ্গ করেছি। মুখটা এমনভাবে থেতলে দিয়েছিলাম যে লাশের পরিচয় সনাক্ত করা সম্ভব হয়নি!
তবে সবকিছু ধামাচাপা দেয়া এতটা সহজ হয়নি। আমেরিকায় আরমানের নামে চিঠি পাঠিয়ে জানাতে হয়েছে যে সে যেতে পারছে না। এদিকে আমি নিজে মাস্টার্স পড়ার জন্য চলে গেলাম আমেরিকায়। সেখান থেকে আরমানের বাবা মা আর সুমির কাছে আরমানের নাম দিয়ে চিঠি পাঠাতাম। প্রথম দিকে ঘন ঘন চিঠি দিতে হয়েছে, কলার আইডি লুকিয়ে ফোন দিতে হয়েছে। তারপর আস্তে আস্তে কমিয়েছি। একদিন ধুম করে চিঠি লিখে জানিয়েছি আরমান এক বিদেশি মেয়ের প্রেমে পড়ে বিয়ে করে ফেলেছে। ব্যাস! তার বাবা-মা তাকে ত্যাজ্য ঘোষণা করল। সব যোগাযোগ বন্ধ করে দিলো।
তারপর আমি দেশে ফিরে এলাম। সুমির বাবা মাকে পটিয়ে ওকে বিয়ে করতে আর খুব বেশি বেগ পেতে হয়নি আমার।
সব কিছু একদম প্ল্যানমাফিক হয়েছে। শুধু একটা বিষয় ছাড়া- সুমির ভালোবাসা পাওয়া হয়নি আমার!
মরে গিয়েও জিতে গেছে আরমান।
আর পরাজিত মানুষের জীবন নিয়ে ধুকে ধুকে বেঁচে আছি আমি...
...............সমাপ্ত...............
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now