বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
পিতা যখন সন্তানের মৃত্যুর কারন
"সত্য ঘটনা" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান অনয় (০ পয়েন্ট)
X
লেখাঃ- অনয়........
এই নশ্বর পৃথিবীতে বাবা মার স্থান সবার উপরে।
কারো সাথে তাদের তুলনা হয় না। তাদের পদতলেই সন্তানের বেহেশত। সন্তানের মঙ্গলে তারা সর্বদা সর্বশ্ব বিসর্জন দেন।
পৃথিবীর সৃষ্টিলগ্ন থেকে এই ধারা বিরাজমান। তবে মাঝে মাঝে মহান সৃষ্টিকর্তা এই ধারায় চ্ছেদ ঘটান।
আমাদের পাপের বদৌলতে আমরা শাস্তি পাই। কখনও বাবা মা, কখনও বা সন্তান একে অপরের আত্নহুতির কারন হয়ে দাড়ায়।
সিফাত সাড়ে তের বছরের এক টগবগে বালক। শ্যাম বর্ণের ছেলেটি ভিশন শান্ত আর লাজুক। খুব ধার্মিক। নিয়মিত নামায আদায় করে। দুই ভাই বোনের মধ্যে বড়। জেলা স্কুলে ৮ম শ্রেনীতে অধ্যয়নরত।
আর ছোট বোন অথই প্রাইমারী অতিক্রম করে হাইস্কুলে পা দিয়েছে। গ্রোধ বেশী হওয়ায় বয়সের তুলনায় তাদের বড় মনে হয়।
বাবা গ্রামের যে কয়জন ধনাঢ্য ব্যক্তি আছে তাদের মধ্যে একজন। গন্ডমুর্খ কিন্তু পীরের পাগল অনুসারী আর মা গৃহিনী।
স্বভাবে শান্ত সিফাত সর্বদায় হাস্যজ্জ্বোল ছিল।
খেলাধুলার প্রতি বা অন্য যে কোন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহনে তার ছিল প্রবল অনাগ্রহ। অনাগ্রহ বললে এখানে ভূল বলা হবে।
সাধারনত ও সময় ই পেত না এখানে অংশগ্রহনের। সংসারের প্রায় সকল কাজেই তাকে অংশগ্রহন করতে হত।
গরুর জন্য ঘাস সংগ্রহ করা, বিচলি কেটে দেওয়া, গোয়াল ঘর পরিষ্কার করা থেকে শুরু করে বাবার সাথে মাঠে গিয়ে কাজও করতে হত। একটু ব্যতিক্রম হলে সিফাতের জন্য তার মাকে অনেক বকা শুনতে হত। যদিও সিফাতের এসব কাজ করার কোন প্রয়োজনই ছিল না কেননা সিফাতের বাবার যথেষ্ঠ সামর্থ্য ছিল কাজের লোক রাখার। কিন্তু তিনি তা করেননি।
তিনি এসব কাজ সিফাতকে দিয়েই করাতেন আর সিফাত বাবার ভয়ে করতে বাধ্য হত। খেলাধুলায় অনাগ্রহী হলেও সিফাত লেখাপড়ায় প্রচন্ড মেধাবী ছিল। সে ক্লাশে সবসময় প্রথম হতো।
কখনও দ্বিতীয় হয়নি। গ্রামের প্রাইমারী স্কুল থেকে সিফাতই প্রথম বৃত্তি পেয়েছিল।
কিন্তু সিফাতের বাবা সন্তাদের পড়াশুনার প্রতি আগ্রহী ছিলেন না।
দুই ভাইবোনের প্রবল আগ্রহ আর তাদের মায়ের সহযোগীতায় পড়াশুনা চালিয়ে যেতে সক্ষম হয়।
সিফাত প্রাইমারীর গন্ডী পেরিয়ে যখন হাইস্কুলে ভর্তি হয় তার মাঝে ধীরে ধীরে পরিবর্তন আসতে থাকে। তাদের গ্রামে ঈদ, পহেলা বৈশাখ, বিবাহ, সুন্নাতে খাৎনা প্রভৃতিতে বিশাল আকারে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হত। এখানে নাচ, গান, কৌতুক, নাটিকা সহ নানা ধরনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হত।
এ উপলক্ষে ছোট বড় প্রায় সবাই নানা ধরনের পোশাক পরিধান করত। কিন্তু সিফাত আর তার ছোট বোনের অধিকাংশ সময়ই এসব অনুষ্ঠানে যাওয়া হত না। কারন বেশীর ভাগ সময় তার বাবা কোন নতুন পোশাক কিনে দিতেন না।
তার বাবা কখনই তাদের পরিমিত চাহিদা পুরন করতেন না। মা যথাসাধ্য চেষ্টা করলেও অনেক সময় পেরে উঠতেন না। এজন্য দুই ভাইবোন মন খারাপ করে বসে থাকতেন।
তবে সিফাতের বাবা কৃপণতার কারনে এমনটা করতেন না। তার দানের হাত ছিল বেশ লম্বা তবে সবটাই ছিল পীরকে গীরে।
উৎপাদিত ফসলের একাংশ, পালের সবচেয়ে বড় ষাঁড়, খাসি, হাস, মুরগি এমন কি জমি বিক্রি করে টাকা পর্যন্ত পীরের দরবারে গিয়ে দিয়ে আসতেন।
তবে মসজিদ, মাদ্রাসার প্রতি ছিল তার বিরুপ দৃষ্টি। গ্রামের মসজিদের জন্য প্রত্যেক শুক্রবার মুষ্টি চাল সংগ্রহ করা হত।
কিন্তু সিফাতের বাবা উপস্থিত থাকলে পাওয়া যেত না। তার মা কিছু বলতে গেলে শুনতে হতো অস্রাব্য ভাষায় গালাগালি।
তাই সমাজের লোকজন একসময় তাদের বাড়ি থেকে মুষ্টিসহ মাসিক চাদা নেওয়াও বন্ধ করে দেয়। এতে সিফাত লজ্জ্বায় কারো সামনে যেত না। মানসিক যন্ত্রনায় ভুগতো।
হঠাৎ সিফাতের মাঝে অস্বাভাবিক পরিবর্তন পরিলক্ষিত। যে ছেলেটি অসুস্থ না হলে কখনই স্কুল মিস দিত না সেই ছেলেই কিনা এখন প্রায়-ই স্কুল মিস দেয়।
বিশেষ করে বৃহস্পতিবারে। এটা সিফাতের মায়ের চোখ এড়ায় না। ওর মা বার জিজ্ঞাসা করলেও উত্তর পায় না।
পরে বাধ্য হয়ে অথইয়ের শরণাপন্ন হয় তার মা। অথই জানায় আমাদের খাবার, পোশাক এগুলো ভাল দেয় না ঠিক আছে কিন্তু বাড়ির পরিবেশ কেন ভাল করে না।
ভাইয়ার ফ্রেন্ডরা আমাদের বাড়িতে আসতে চায় কিন্তু এই পরিবেশের কারনে ভাইয়া নিয়ে আসতে পারে না।
এজন্য প্রত্যেক বৃহস্পতিবারে ভাইয়া স্কুলে যায় না। কারন প্রত্যেক বৃহস্পতিবারেই তারা সবাই মিলে কোন না কোন বন্ধুর বাড়িতে বেড়াতে যায়। আর সিফাত মেধাবী হওয়ায় অল্প দিনেই অনেকের সাথে তার বন্ধুত্ত্ব গড়ে ওঠে। সিফাতের মা তার ছেলের এই সমস্যার কথা স্বামীকে বললেও কোন ফল আসে না। উল্টো অনেক বকাবকি করে।
এক বৃহস্পতিবারে পরীক্ষার কারনে সিফাত স্কুলে যেতে বাধ্য হয়। পরীক্ষা শেষ করে বন্ধুদের সাথে কিছুক্ষন আড্ডা দিয়ে বাড়ি ফিরতে ফিরতে বিকাল পৌনে পাঁচটা বেজে যায়। বাড়িতে এসেই দেখতে পায় অথইয়ের চোখে পানি।
কি হয়েছে জিজ্ঞাসা করতেই অথইয়ের কান্নার পরিমান বেড়ে যায়। সিফাত তার চাচাতো বোন মারফত জানতে পারে তার বাবা অথইয়ের বিয়ে ঠিক করেছে। তিন দিন পরেই নাকি বিয়ে।
সিফাত বাবা মাকে বুঝাতে না পেরে অবশেষে গ্রামের বড় ভাইদের শরণাপন্ন হয়। যেন তার ছোট বোনের এই বিয়েটা আটকে দেয়। সিফাতের কথায় গ্রামের কয়েক জন সিফাতের বাবার কাছে এসে বুঝানোর চেষ্ঠা করলে আরও বিপত্তি বাদে।
উল্টো তাদের নামেই বিচার দেওয়া হয় তাদের বাবা মার কাছে। তাই সবাই নিজেদের মান সম্মানের ভয়ে এই প্রসঙ্গ এড়িয়ে যায়। অথইয়ের বিয়ে সম্পন্ন হয়।
সিফাত বোনের বিয়েটা নিয়ে বিষন্নতায় ভুগতে থাকে। এভাবেই চলে যায় বিয়ের ষোলতম দিন। সতের তম দিনে সিফাতের মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়ে।
সিফাত জানতে পারে ছেলেটি এর আগেও আরেকটা বিয়ে করেছিল। ছেলের বাবা পীরের অনুসারী আর তার বাবার পূর্ব পরিচিত হওয়াই বিয়ের বিষয় টা জানার পরও অথইকে সেখানেই বিয়ে দেওয়া হয়।
অথইয়ের সাথে সাথে সিফাতও মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়ে। ধীরে ধীরে পেরিয়ে যায় তিন মাস।
রমাজানূল মোবারকের সাতাশতম দিন। সকালে সিফাতের বাবা সিফাতের হাতে দু-হাজার টাকা দিয়ে বলে সে যেন এই টাকাগুলো অথইয়ের স্বামীর হাতে পৌছে দেয় ঈদে কেনাকাটা করবে।
সিফাতকেও এক হাজার টাকা দেয় শার্ট-প্যান্ট কেনার জন্য। যাওয়ার সময় সিফাতের মা আরও সাত হাজার টাকা দেয় সিফাতের হাতে।
দুই হাজার অথইয়ের জন্য, দুই হাজার অথইয়ের স্বামীর জন্য আর বাকি তিন হাজার সিফাতের জন্য। তার মা এটাও বলে দেয় আসার আগে যেন সে শার্ট, প্যান্ট আর জুতা কিনে নিয়ে আসে। মার কথায় সম্মতি জানিয়ে বোনের বাড়ির উদ্দেশ্যে বের হয়।
বোনের বাড়িতে গিয়ে সবার সাথে কৌশল বিনিময় শেষে কিছুক্ষন বিশ্রাম নিয়ে বাড়ি ফেরার জন্য অনুমতি নেয়। ইফতার শেষে খাওয়া দাওয়া করে আসতে বললেও কোচিংয়ের অজুহাতে চলে আসার অনুমতি পায়। আসার আগে বাবা মার দেয়া দশহাজার এবং তার বৃত্তি আর টিফিন থেকে জমানো ছয় হাজার সহ মোট ষোল হাজার টাকা বোনের হাতে দিয়ে বলে এখানে ছয় হাজার টাকা তোর জন্য আর বাকি দশ হাজার তোর স্বামীর জন্য। ঈদে কেনাকাটা করার জন্য মা আর বাবা দিয়েছে। অথই সিফাতকে জিজ্ঞাসা করে তোমাকে দেয়নি। উত্তরে সিফাত তার নিখুত অভিনয়ে অথইয়ের কাছে অনর্গল মিথ্যা বলে বিদায় নিয়ে চলে আসে।
বিকাল চারটা বেজে পঁয়ত্রিশ মিনিট। বাস থেকে নেমে বাড়ির দিকে হাটা দিয়েছে সিফাত। বাজার থেকে বাড়ির দুরত্ব পায়ে হেটে গেলে দশ মিনিটের পথ। হঠাৎ পাশ থেকে পরিচিত কন্ঠের ডাক। ফিরতেই দেখতে পায় তার মা বাবা দাড়িয়ে আছে মাঠে। তার বাবা ইশারা করতেছে তাকে কাছে যাওয়ার জন্য। কাছে যাওয়া মাত্রই টাকা ঠিকভাবে দিয়েছে কি না জিজ্ঞাসা করেই ঘাস ভর্তি খাচা মাথা নিতে বলে। সাথে সাথে তার মা বাধা দিয়ে বলে রোযা রেখেছে আর অনেক ওজন নিতে পারবে না সিফাত আমার মাথায় তুলে দেন আমি নিয়ে যায়। তার বাবা বাধা দিয়ে বলে ভাল ভাল খেতে পারে তাহলে নিতে পারবে না কেন, বলেই ঘাস ভর্তি খাচা সিফাতের মাথায় তুলে দেয়। ওই অবস্থায় সিফাত বাধ্য হয়ে কষ্ট হলে ঘাস নিয়ে বাড়ি চলে আসে। তার চোখের নদী বাধ ভেঙ্গে বন্যা হয়ে ঝরছে। থামতেই চাইছে না। তবুও আসরের আযান দেয়ায় গোসল করে এসে নামাযে দাড়ায় সিফাত। নামাজ শেষে কুরআন শরীফ পড়তে বসে যায়। চাচাতো বোন অথই আসবে কি না এ কথা জিজ্ঞাসা করতে এসেও সিফাতকে কুরআন শরীফ পড়তে দেখে না বলেই চলে যায়। সিফাত কুরআন শরীফ পড়া শেষ করে ঘরের দরজা লাগিয়ে দেয়।
ইফতারের সময় হয়েছে। সিফাতের মা বাড়ি এসে দেখে ভিতর থেকে ঘরের দরজা বন্ধ। তাই আস্তে করে দরজায় নক করে আর সিফাত কে ডাকতে থাকে। হয়তো ঘুমিয়ে গেছে তাই খুলছে না দেখে একটু জোরে জোরে দরজায় কড়া নাড়তে থাকে। তবুও খুলছে না দেখে সিফাতের চাচাতো বোন টিনের বেড়ার ছোট্ট ছিদ্র দিয়ে ভিতরে দেখার চেষ্টা করে। হঠাৎ ই সে চিৎকার দিয়ে ওঠে। সিফাত রসিতে ঝুলে আছে। ঘরের দরের দরজা ভেঙ্গে ভিতরে গিয়ে নামানো হয় সিফাতকে কিন্তু তখন অনেকটাই দেরি হয়ে গেছে। সিফাত পাড়ি জমিয়েছে না ফেরার দেশে। চারদিক কান্নার রোল ওঠেছে। সিফাতের মায়ের বুকফাটা আর্তনাদে পরিবেশ বারী হয়ে উঠেছে। অথইকে স্যালাইন লাগিয়ে রাখা হয়েছে। জ্ঞান ফিরতেই তার করুন আহাজারিতে দেখতে আসা সবার চোখেই ঝর্নার ধারা প্রবাহিত হচ্ছে। পাশেই সিফাতের বাবা পাথরের মত দাড়িয়ে আছে। পুলিশি ঝামেলা শেষ করে চিরতরে বিদায় জানানো হয় সিফাতকে। ঈদের কোন আনন্দই স্পর্শ করে না তাদের। ঈদের দিন কোন রান্না হয়নি। অথইয়ের চাচি অনেক চেষ্টা করেও কিছুই খাওয়াতে পারেনি তাদের। অবস্থার বেগতিক দেখে চারদিন পর সিফাতের মামা এসে তার মাকে নিয়ে যায়। অথইকেও পাঠিয়ে দেয়া হয় স্বামীর সাথে। সিফাতের বাবা একাকী অসহায় এর মতো সময় অতিবাহিত করতে থাকে।
প্রায় নয় মাস পর সিফাতের মা ফিরে আসে। কিন্তু সিফাত ফিরে নি। আর কোনদিন ফিরবেও না। বন্ধুদের খাওয়াতে হবে বলে টাকার জন্য আর বায়না ধরবে না। তার জন্য আর কখনই মাকে বাবার কাছ থেকে বকা শুনতে হবে না। যে ভাই নিজে কিছু না কিনে অথইয়ের জন্য নিয়ে আসতো তার পুনরাবৃত্তি আর হবে না। আর কখনই ভাইয়ের সাথে অথই খুনসুটিতে মাততে পারবে না।
এখনও সিফাতের মা সিফাতের সমবয়সী কাউকে দেখলে জড়িয়ে ধরে কাঁদে। সিফাতের বাবা এখন পাগল প্রায়। কারো সাথে কোন কথা বলে না। সিফাতের মাকেও কোন বকা দেয় না। বেশীর ভাগ সময় পীরের বাড়িতেই পড়ে থাকে। অথইয়ের একটা ছেলে হয়েছে। সারাক্ষন ছেলের সাথেই খুনসুটিতে মেতে থাকে।
♦♦♦♦♦♣♦♦♦♦♦
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now