বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
গল্প: পিশাচ
-সারাহ্ ইকবাল
মিনা বাজার থেকে আগামী দুইদিনের বাজার সারতে এসেছেন মিসেস আইভি রহমান। তার সংসারে স্বামী, তিনি ও তাদের একমাত্র পাঁচবছরের কন্যাসন্তান আলিয়া, তাই সপ্তাহের ছুটিরদিনে একবার আলিয়ার বাবা নাহিয়ান বাজার করে নিয়ে আসলেই তাদের বেশ ভালো ভাবেই পুরো সপ্তাহ চলে যায়, আইভির আর বাজার করতে বের হতে হয়না।।তবে গতকাল তার আপন ছোটভাই আদিব এসেছে, তাই আজ ভাইয়ের জন্য ভালমন্দ কয়েকটা আইটেম না রান্না করলেই নয় বলে হুট করে বাজারে আসতে হয়েছে আইভির।আদিব দিনদুয়েক থাকবে, আইভির তাই শত আয়োজন একমাত্র ছোট ভাইটিকে মনের তৃপ্তি মতন রান্নাবান্না করে খাওয়ানোর। আদিব অন্য শহরে চাকরিসূত্রে একাকী বসবাস করে, এখনো বিয়েশাদি করেনি। পিতা- মাতাহীন দুই ভাইবোনই ওরা একে অপরের একমাত্র আপন স্বজন বলতে গেলে, আর তাইতো আদিবকে নিজের সন্তানের মতনই ভালবাসে আইভি।
- আরে আইভি, তুমি এখানে? পরিচিত কন্ঠের ডাক শুনে শাকসবজি বাছাই বাদ দিয়ে পিছনে ফিরলেন আইভি।
তার পিছনে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছেন পল্লবী দিদি। পল্লবী দিদি তার বিলিন্ডিং এর একদম ছাদের পাশে দুইরুম নিয়ে একা থাকেন, বিয়ের বয়স বেশ আগেই পেরিয়ে গেলেও বিয়েশাদি করেননি।তার একই উক্তি, পুরুষ মানুষ বিশ্বাসের যোগ্য নয়। যদিও এই উক্তির পিছনে আজ অবধি তিনি হাজারো যুক্তি দিয়ে থাকলেও তার এই ধারণার পিছনের আসল গল্প যে কি তা আজও কেউ জানতে পারেনি।পল্লবী দিদি মানুষ হিসেবে দারুণ তা অবশ্য পুরো বিলিন্ডিং এর লোকজন স্বীকার করে বাধ্য। পেশায় একটি মহিলা কলেজের বায়োলজির শিক্ষিকা এই মহিলা সকলের আর্থিক, সামাজিক এমনকি পারিবারিক যে কোন বিপদেই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে কখনওই পিছপা হয়না। আইভি নিজেই কতবার মাসের টাকা মাস শেষ হয়ে যাবার আগেই শেষ হয়ে যাবার ফলে নাহিয়ানকে না বলে পল্লবী দিদি থেকে ধার করে এনেছে। যদিওবা সে কখনওই টাকা ফেরত দিতে দেরী করেনি, আর তাই হয়তো অন্য সব পরিবার থেকে আইভিকে একটু বেশি পছন্দ করেন পল্লবী। এছাড়া বিভিন্ন কাজে বাসার বাইরে গেলেও আলিয়াকে নিশ্চিন্তে পল্লবী দিদির কাছে রেখে যাওয়া যায়। পল্লবী দিদি বিয়ের পক্ষপাতী না হলেও বাচ্চাকাচ্চা তার খুবই পছন্দ। তাই আলিয়ার সাথে তার বেশ ভালো জমে।
বাসায় ভালমন্দ কিছু রান্না হলেই পল্লবী দিদিকে একবাটি না দিলে মনে শান্তি পায়না আইভি।আবার পল্লবী দিদি বাইরে গেলেই চকলেট নিয়ে আসেন আলিয়ার জন্য, এমনকি আইভির জন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় টুকটাক জিনিস প্রায়ই কিনে আনেন।
- আরে দিদি যে! আর বলো না, আদিব আসলো আজ সকালে।তাই একটু বাজার করতে আসা আর কি। আইভিও হাসলো।
- ও তাই বলো, আমি তো বলি আইভি আর বাজারে? সূর্য কি পশ্চিমে উঠলো নাকি রে! বলেই হো হো করে হেসে উঠলেন পল্লবী।
- উফ দিদি! রাখো তো তোমার পচানি। তুমি তো জানোই আমি কতোটা অলস আর আরামপ্রিয়। আইভি কৈফিয়তের সুরে বললো।
- আচ্ছা মা আমার, যা বাদ দিলাম। এবার বলো, আমার আলু কোথায়? ওকে যে দেখছি না, স্কুলে গেছে নাকি? এদিক- ওদিক ঘুরে আলিয়াকে খুঁজলেন একবার পল্লবী।
- কি যে বলো তুমি, দিদি। আজ শুক্রবার।কিসের স্কুল?? আলিয়া বাসায়, আদিবকে দেখে খুশিতে আত্নহারা হয়ে গেছে। এতদিন পর ওর একমাত্র মামা এসেছেন, তাও এত এত উপহার সাথে করে এনেছেন।আমার মেয়ে আজ তো পুরাই আহ্লাদে আটখানা। মামা- ভাগ্নি মিলে সেই আনন্দ করছে দেখে আসলাম। আইভি একশ্বাসে কথাগুলো বলে ফেললো। মিথ্যা অনর্গল বলে ফেলাই ভালো, তাহলে আটকে যাবার সম্ভাবনা কম থাকে।
- কি বলছো? এইটুকুন বাচ্চাকে একা রেখে আসলে এভাবে? এটা কি ঠিক করলে তুমি?? পল্লবীর চোখমুখ বিবর্ণ হয়ে গেলো।
- একা কোথায় দিদি? আদিব আছে না বুঝি! আইভি এবার অল্প বিরক্ত হলো। আগেও খেয়াল করেছে আদিবকে পছন্দ করেন না পল্লবী দিদি।
- কিন্তু বাচ্চামানুষকে একা পুরুষদের কাছে রাখাই ঠিক নয়, তোমার কাজটা করা ঠিক হয়নি।
- দিদি! আদিব আমার আপন ভাই।আমার আরেক সন্তান। তুমি আমাদের অনেক ভালবাসো জানি আমি।কিন্তু, প্লিজ এই ধরণের কথা আর কক্ষনো বলো না। আমি গেলাম। বাই। অনেকটা কড়া কন্ঠে কথাগুলো বলে কেনাকাটা না সেরেই হনহন করে বাসার দিকে পা বাড়ালো আইভি।
আইভি বেরিয়ে যাবার পর নিজের চশমা খুলে চোখ বেয়ে নেমে আসা দু- তিনফোঁটা পানি মুছলেন পল্লবী। আইভি তাকে ভুল বুঝলেও তিনি জানেন তিনি কি বলেছেন।আর এতে তিনি একবিন্দু অনুতাপ করছেন না। আদিবের সাথে তার বেশ কয়েকবার দেখা হয়েছে। ছেলেটা দেখতে শুনতে ভদ্র, আকর্ষণীয় ও মিশুক হলেও কেমন জানি একটা পৈশাচিক চাহনি রয়েছে ওর চোখে।আর এই দৃষ্টি দিয়ে পল্লবী আদিবকে অনেকবার আলিয়ার দিকে তাকাতেও দেখেছেন। হয়তোবা আট- দশটা সাধারণ মানুষ আদিবের এই ভদ্র মানুষের মুখোশের আড়ালে লুকিয়ে থাকা পৈশাচিক চেহারাকে দেখতে পায়না।কিন্তু পল্লবী ঠিকই দেখতে পান। কারণ আজ থেকে অনেক বছর আগে তিনি যখন আলিয়ার বয়সের কাছাকাছি ছিলেন এমন একজোড়া পৈশাচিক চক্ষু তার জীবনকে অন্য মোড়ে ঘুরিয়ে দিয়েছিলো। তখন হয়তো বুঝার কিংবা কাউকে বলার মতন বয়স হয়ে উঠেনি, কিন্তু ক্রমে যত বেড়ে উঠেছেন সবকিছু পানির মতন পরিষ্কার হয়ে উঠেছিলো তার কাছে। কিন্তু ততক্ষণে বড্ড দেরী হয়ে গিয়েছিলো, নিজের মাকে নিজের আপন ছোট চাচার সম্পর্কে এতো জঘন্য কথা বলে তিনি নিজেই দোষী হয়ে উঠেছিলেন। এরপর ধীরেধীরে পরিবারের সাথে তার দূরত্ব বাড়তে থাকে, ক্রমশ বিচ্ছিন্ন হয়ে যান তিনি আপন বাবা- মা, ভাইবোন থেকে।যদিওবা সেই চাচা আজও বহাল তবিয়তে পারিবারিক বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে দিনযাপন করছেন। আর এই কোন এককালের হয়তো সামান্য, হয়তো বিশাল ঘটনাকে বুকের মাঝে লালন করে এসে পল্লবী আর কখনো আপন সংসার সাজানোর সাহস করে উঠেননি। আবার যদি নিজের সন্তানের জন্য এমন চাচার সৃষ্টি করে বসেন তিনি??
মিনা বাজার থেকে আইভির বাসার দূরত্ব অল্প, ছয় - সাত মিনিট হাঁটলেই যাওয়া যায়। তবুও রিকশা ডাকলো আইভি। তার মাথার ভেতর অজস্র কথা একত্রে ভনভন করছে,চারপাশের কোলাহলের কিছুই সে শুনতে পারছে না। সে শুধুই নিজের মস্তিষ্কের হাজারো আত্মচিৎকার শুনতে পাচ্ছে। রিকশা উঠেই ব্যাগ থেকে পানির বোতল বের করে ঢকঢক করে গিলে পুরো অর্ধেক বোতল পানি শেষ করলো ও।তারপর নিজেকে ঠান্ডা করে নিজের মনের সাথে যুক্তিতর্কে লিপ্ত হলো।
পল্লবী দিদির কথা কি সত্যি??
আলিয়াই বা কেন আজ আসার সময় মাকে জড়িয়ে কান্না করেছিলো সে মায়ের সাথে বাজার করতে আসবে??
আদিব শেষবার যখন কিছুদিন বেড়িয়ে গিয়েছিলো তারপর আলিয়া সপ্তাহখানেক কেনই বা মনমরা হয়ে থাকতো সারাক্ষণ??
আইভি চোখ বন্ধ করে আলিয়ার চেহারা মনে করার চেষ্টা করলো। আজ সকালে আদিব এসেছে বলে আলিয়াকে যখন ঘুম থেকে ডেকে তোলা হয় তখন চোখ খুলে আদিবকে নিজের পাশে বসা দেখে চমকে উঠেছিলো আলিয়া, তবে সেটি খুশির চমকানো ছিলো না। গতকাল রাতেও আলিয়া বেশ প্রাণচাঞ্চল্যকর ছিলো, কিন্তু আজ সকালে নাস্তার টেবিলে কিছুই খায়নি এমনকি আদিবের নিয়ে আসা কয়েক প্যাকেট চকলেটও খুলে দেখেনি।
আইভির মাথা আর কাজ করলো না। ছিঃ ছিঃ কি ভাবছে ও এসব? আদিবের কাছে আলিয়া নিজের মেয়ের মতন, কত ভালবাসে সে আলিয়াকে। সেই ছোটকাল থেকেই মামা- ভাগ্নির সেই মধুর সম্পর্ক। হয়তো আলিয়া মামার উপর অল্প অভিমান করে আছে, বাচ্চামেয়ে বলে কথা।আজই হয়তো ঠিক হয়ে যাবে। নিজের মাথায় হালকা চাপড় দিলো আইভি।
"ধুর যাহ! আমিও পাগল। আমার আদিব কেন আমার আলিয়ার ক্ষতি করতে চাইবে? এই পল্লবী দিদি না একটু বেশি বেশি, বাইরের মানুষকে তাই এত ঘেঁষতে দেওয়া উচিৎ না।"
নিজের বাসার মূল দরজার সামনে এসে কয়েকবার দরজায় বাড়ি দিলো আইভি। দুই- তিনদিন ধরে কলিংবেল নষ্ট, নাহিয়ানকে কতবার বলেছে ঠিক করাতে। আজ আসুক অফিস থেকে, আবারো বলতে হবে। হঠাৎ মনে পরলো আইভির ওর ব্যাগেই চাবি আছে একটা, সবসময়ই সাথে রাখে, কখন কি দরকার পরে তাই আর কি। ব্যাগ থেকে চাবি বের করে তালা খুলে বাসার ভিতর প্রবেশ করলো আইভি। সামনের ঘরের টিভি চলছে কিন্তু আদিব কিংবা আলিয়া কেউ নেই টিভির সামনে। হয়তো ওরা আলিয়ার রুমে খেলা করছে, ভেবে আলিয়ার রুমের দিকে পা বাড়ালো আইভি। কিন্তু কোথায় ওরা? রুম পুরা খালি। হঠাৎ কানের কাছে আলিয়ার " না মামা প্লিজ আর না" বলে আলিয়ার কাঁদোকাঁদো স্বর কানে আসলো আইভির। ওর বুকের ভিতরের হৃদপিন্ডের রক্ত হিমশীতল হয়ে উঠলো, আওয়াজটা আসছে গেস্টরুম থেকে। আইভি মুখ দিয়ে কোন শব্দ না করে দৌড়ে গেস্টরুমে ঢুকলো। গেস্টরুমও ফাঁকা, তবে গেস্টরুম সংলগ্ন বাথরুমের দরজা খোলা ও তার ভিতর থেকেই আলিয়ার কন্ঠ আরো জোরে ভেসে আসলো। আইভি চুপিচুপি অনেকটা নিশব্দে বাথরুমের ভিতর উঁকি দিলো। আলিয়াকে বিবস্ত্র অবস্থায় ওর পুরো শরীরে সাবান ঘষিয়ে দিচ্ছে আদিব, সে নিজেও প্রায় বিবিস্ত্র। আদিবকে এইমুহূর্তে চিনলে পারলেন না আইভি। এটি তার ভাই আদিব নয়, আদিবের বেশধারী কোন এক পিশাচ।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now