বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
বনের নাম ছিল চিরসবুজপুর। নামটা এমনই যে, শুনলেই মনে হতো—এখানে পাতারা কখনো অবসর নেয় না, গাছেরা কখনো ক্লান্ত হয় না, আর জীবনের চাকা থামে না এক মুহূর্তের জন্যও। এই বনে সূর্য ওঠে গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে, আর অস্ত যায় শেয়ালের চোখে ধূর্ত হাসি রেখে। চিরসবুজপুর আসলে শুধু বন নয়; এ এক বিশাল সংসার, যেখানে কেউ রান্না করে, কেউ খায়, কেউ দেখে খাওয়া হচ্ছে, আবার কেউ খাওয়া শেষ হলে সব পরিষ্কার করে দেয়।
এই সংসারের কর্তা ছিলেন গাছেরা। তারা খুব একটা কথা বলতেন না, কিন্তু সারাক্ষণ কাজ করতেন। সকাল হলেই সূর্যের দিকে তাকিয়ে পাতার থালা মেলে ধরতেন। আলো, বাতাস আর জল মিশিয়ে বানাতেন এমন এক খাদ্য, যা না থাকলে গোটা বনটাই না খেয়ে মরত। গাছেরা নিজেরা বলতেন, “আমরা নীরব রাঁধুনি। আমাদের রান্নার গন্ধ নেই, ধোঁয়া নেই, কিন্তু খদ্দেরের অভাবও নেই।” সত্যিই তো, কে নেই সেই খদ্দেরের তালিকায়! হরিণ থেকে শুরু করে পিঁপড়া পর্যন্ত—সবাই কোনো না কোনোভাবে গাছের উপর নির্ভরশীল।
হরিণ ছিল বনের সবচেয়ে ভদ্র খাদক। সে পাতার দিকে তাকিয়ে খেত, যেন অনুমতি নিচ্ছে। মাঝে মাঝে একগাল হাসি দিয়ে বলত, “ভাই গাছ, একটু পাতা দিও, আজ সারাদিন দৌড়াদৌড়ি করেছি।” গাছেরা কিছু বলত না, কিন্তু দু-একটা কচি পাতা ঝরিয়ে দিত। খরগোশ আবার একটু বেশি চঞ্চল। সে এক গাছ থেকে আরেক গাছে লাফিয়ে লাফিয়ে খায়, যেন বনের বাজারে ঘুরে ঘুরে ফুচকা খাচ্ছে। কাঠবিড়ালি তো ছিল একেবারে হিসাবি। সে গাছ থেকে বাদাম নিয়ে লুকিয়ে রাখত, আবার ভুলে যেত কোথায় রেখেছে। গাছেরা মুচকি হেসে বলত, “এই ভুলগুলোই একদিন আমাদের নতুন সন্তান হয়ে উঠবে।”
এই প্রথম স্তরের খাদকদের জীবন ছিল তুলনামূলক নিশ্চিন্ত, কিন্তু পুরোপুরি নিরাপদ নয়। কারণ বনে শুধু যারা খায় তারা থাকে না; যারা দেখে খাওয়া হচ্ছে, তারাও থাকে। সাপ ছিল তেমনই একজন। সে নিজেকে বলত, “আমি বন-পর্যবেক্ষক।” হরিণের চলাফেরা, খরগোশের লাফ, পাখির ডানা—সবকিছুর দিকে তার তীক্ষ্ণ নজর। সুযোগ পেলে সে বলত, “খাবার মানেই শুধু খাওয়া নয়, সময় বুঝে খাওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।”
শেয়াল ছিল আরেক ধরণের চরিত্র। সে আধা পণ্ডিত, আধা ধান্দাবাজ। কখনো সে তৃণভোজীদের ধাওয়া করত, আবার কখনো ফলমূল খেয়েই দিব্যি দিন কাটাত। সে বলত, “আমি সর্বভুক; সংসারে চলতে গেলে সব রাস্তাই খোলা রাখতে হয়।” ছোট পাখিরা আবার ছিল গুজবপ্রিয়। কে কাকে খেয়েছে, কে কোথায় লুকিয়েছে—এই সব খবর তারা ডালে ডালে ছড়িয়ে দিত।
এইসব কোলাহলের মাঝেও বনের আসল আতঙ্ক ছিলেন বাঘ। তিনি ছিলেন তৃতীয় স্তরের খাদক, তবে নিজেকে বলতেন ‘বনের শৃঙ্খলা রক্ষক’। বাঘের হাঁটার শব্দ শুনলেই বন কিছুক্ষণ চুপ করে যেত। হরিণের বুক কাঁপত, শেয়ালের হাসি থেমে যেত। বাঘ গম্ভীর গলায় বলতেন, “আমি না থাকলে তোমাদের সংখ্যা এত বেড়ে যেত যে গাছের পাতাও আর বাঁচত না।” গাছেরা মনে মনে স্বীকার করত, কথাটা একেবারে মিথ্যে নয়।
ঈগল ছিলেন আকাশের রাজা। উপর থেকে সব দেখতেন, কিন্তু খুব কমই হস্তক্ষেপ করতেন। তিনি বলতেন, “আমি দূর থেকে দেখি বলেই সব পরিষ্কার বুঝতে পারি।” কখনো কখনো তিনি সাপ তুলে নিতেন, কখনো ছোট প্রাণী। তার দৃষ্টি ছিল বনের ওপর এক ধরনের নজরদারি।
কিন্তু এই বনের সবচেয়ে অবহেলিত, অথচ সবচেয়ে দরকারি সদস্যরা ছিলেন মাটির নিচে। ব্যাকটেরিয়া আর ছত্রাক—নাম শুনলেই অনেকেই নাক সিটকাত। কিন্তু তারা বলত, “তোমরা খাও, দৌড়াও, শিকার করো; শেষে যা পড়ে থাকে, সব আমাদের দায়িত্ব।” যখন কোনো গাছ মরে যেত, বা কোনো প্রাণী শেষ নিঃশ্বাস ফেলত, তখন এই বিয়োজকরা নীরবে কাজ শুরু করত। তারা মৃত দেহকে ভেঙে ভেঙে এমনভাবে মাটিতে মিশিয়ে দিত যে, সেখান থেকেই আবার নতুন গাছের জন্ম হতো।
একদিন বনে বড়সড় বৈঠক বসলো। কারণ হরিণরা অভিযোগ তুলেছে—“বাঘ খুব বেশি খাচ্ছে।” বাঘ গম্ভীরভাবে উত্তর দিলেন, “আমি না খেলে তোমরা এত বেড়ে যাবে যে গাছের পাতাই থাকবে না।” গাছেরা মাথা নেড়ে বলল, “দু’পক্ষই ঠিক বলছ।” শেয়াল মুচকি হেসে যোগ করল, “দেখেছো, সংসারে সবাই নিজের দিকটাই আগে দেখে।” তখন মাটি ফুঁড়ে ছত্রাকের কণ্ঠ ভেসে এলো, “আর শেষে সব আমাদের ঘাড়েই পড়ে।”
এই বৈঠকে সবাই বুঝল, কেউ কারো শত্রু নয়। হরিণ বাঘের খাবার, বাঘ বনের ভারসাম্যের রক্ষক, গাছ সবার আশ্রয়, আর বিয়োজকরা হলো শেষ পরিষ্কারক। সূর্য তখন মাথার উপর দাঁড়িয়ে হাসছিল, যেন বলছে—“আমি আলো দিই, তোমরা নাটক করো।”
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now