বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
অতিপ্রাকৃতিক উপন্যাস
"অতৃপ্ত আত্মা"
আফজাল হোসেন
--------------------
(পর্ব ৫)
আট
সুমি সাইকিয়াট্রিস্টের সামনে বসা। প্রথম দিনের মত ডা. মিজানুর রহমান প্রথমে শুধু মাত্র জাহিদকে ডেকে ওর কাছ থেকে গত দশ দিনের সুমি সম্পর্কিত তথ্য জেনেছেন। এরপর জাহিদকে বাইরে গিয়ে বসতে বলেন এবং সুমিকে ডেকে পাঠান।
মিজানুৱ রহমান কিছুক্ষণ সুমিকে তীক্ষ্ম চোখে পর্যবেক্ষণ করে বললেন, আপনার হাজবেণ্ডের কাছে জানলাম গত রাতে নাকি আপনি খাটের নীচে একটা অদ্ভুত বাচ্চা দেখতে পেয়েছেন। এবং বাচ্চাটা আপনার গলা পেঁচিয়ে ধরে মেরে ফেলতে চেয়েছিল ৷ এই বাচ্চাটাকে কি আপনি গত রাতেই প্রথম দেখেছেন? নাকি … এর আগেও দেখেছেন?’
সুমি মাথা নত করে বসে ছিল৷ মাথা তুলে বলল, গত রাতেই প্রথম। এর আগে কখনও দেখিনি।"
‘আচ্ছা… আপনি কি এখন প্রেগন্যাণ্ট?"
"না।"
ডা. মিজানুর রহমান কয়েক সেকেণ্ড সময় নিয়ে কিছু ভেবে গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন, একটা আপত্তিকর প্রশ্ন করি , কিছু মনে করবেন না। আপনি কি কখনও প্রেগন্যাণ্ট হয়েছিলেন? প্রেগন্যাণ্ট হবার তিন চার মাসের মাথায় কোনও কারণে গর্ভপাত হয়ে গিয়েছে বা ইচ্ছাকৃতই অ্যাবরশন করিয়েছেন? কারণ কাল আপনি যে বাচ্চাটাকে দেখেছেন সেটা মায়ের পেটের তিন চার মাস বয়সী অপরিণত ভ্রুণ ছিল।
সুমি অবাক ‘ চোখে ডাক্তারের চোখের দিকে তাকিয়ে রইল ৷ মুখে কিছু বলল না। বোধ হয় সে এই ব্যাপারে কিছুই বলতে চাইছে না l
মিজানুৱ রহমান আবার বলতে লাগলেন, আপনি যদি আমার সাথে কোঅপারেট না করেন, তা হলে তো আমি আপনার প্রবলেম সলভ করতে পারব না। সেদিন যখন আপনাকে জিজ্ঞেস করেছি. গাছের গুড়িতে যে মুখাকৃতি ফুটে উঠেছিল সেটা পরিচিত কারও মুখ কিনা, তখন আপনি মিথ্যে … জবাব দিয়েছিলেন। এমন করলে কীভাবে আমি রোগ সারাব। উকিল এবং ডাক্তারের কাছে কখনও সত্যি লুকাতে হয় না। তা হলে সুফল পাওয়া যায় না৷ কথা দিচ্ছি, আপনার গোপন কথা গোপনই থাকবে ৷ এটাই আমাদের প্রফেশানের নিয়ম ৷ দেখছেন না আমি আপনার সঙ্গে যখন কথা বলি আপনার হাজৰেণ্ডকে সামনে রাখি না।
সুমি কেমন ঘোরাচ্ছন্ন বসে যাওয়া গলায় বলতে লাগল, “আমাদের বাড়িতে তিরিশ বত্রিশ বছর বয়সী একটা কামলা ছিল। তার নাম ছিল কালু মিয়া। আমি তাকে ডাকভাম কালু চাচা বলে। কালু চাচা ছিল লম্বা, চওড়া, মিসমিসে কালো ষণ্ডা চেহারার এক লোক। কিন্তু তার আচরণ ছিল একেবারে মাটির মত কোমল। আমাকে খুব আদর করত। বলতে গেলে তার কোলে পিঠেই ছোট থেকে বড় হয়েছি আমি। ছোট বেলায় আমার খেলার সঙ্গীও হত সে। সে উবু হয়ে ঘোড়া সাজত আর আমি তার পিঠে চড়তাম ৷ আবার কখনও তার সঙ্গে লুকােচুরি খেলতাম। সে লুকাত, আমি তাকে খুঁজে বের করতাম। আমি লুকাতাম, সে খুঁজে বের করত। এভাবে কবে যে আমি তেরাে চোদ্দ বছরের কিশোরীতে পরিণত হয়েছি তা টেরও পাইনি।
একদিন ৰিকালে যথারীতি কালু চাচার সঙ্গে লুকােচুরি খেলছি বাগানের … ভিতরে।
কালু চাচা লুকিয়েছে, আমি তাকে খুঁজছি। গাছের গুঁড়ির আড়াল থেকে মাঝে মাঝে সে আমার নাম ধরে ডেকে সাড়া দিচ্ছে। কিন্তু আমি গিয়ে তাকে সেখানে পাচ্ছি না৷ এভাবে তাকে খুঁজতে খুঁজতে বাগানের একেবারে ভিতরে চলে যাই ৷ সেদিনই বলেছি বাগানটা অনেক বড়, কয়েক একর জায়গা জুড়ে। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। কিছুটা ভয় ভয় লাগছে। আবার মনে করি, আশপাশে তো কালু চাচা আছেই ৷ হঠাৎ কালু চাচা আমাকে পিছন থেকে এসে জড়িয়ে ধরব ৷ মুখে বলল, “আইজ আর আমারে খুঁইজ্যা বাইর করতে পারলা না। কী মজা ! কী মজা ! আমি জিত্যা গেছি।"
সে আমাকে কিছুতেই ছাড়ছে না৷ তার জড়িয়ে ধরাটাও যেন কেমন কেমন লাগে। এক হাতে আমাকে জড়িয়ে ধরে রেখেছ, অন্য হাতটা আমার শরীরের বিশেষ স্থানগুলিতে বোলাচ্ছে। আমি বিরক্ত হয়ে বলি… “চাচা, আমাকে ছাড়াে তাে। সে না ছেড়ে হাসতে হাসতে বলে, না না আইজ তোমারে ছাড়ুম না৷ আইজ তােমারে নতুন একটা খেলা শিখামু ৷ আমি তার উদ্দেশ্য বুঝতে পারি। রাগী গলায় চেঁচিয়ে উঠি, “ছাড় আমাকে। ছাড় বলছি। সে আমার মুখ চেপে ধরে ৷
এ পর্যন্ত বলেই সুমি ফোঁত ফোঁত করে কাঁদতে লাগল। ডা. মিজানুর রহমান বক্স থেকে একটা টিস্যু পেপার তুলে সুমির দিকে বাড়িয়ে ধরে বলতে লাগলেন, অতীতকে কখনও বেশি গুরুত্ব দিতে হয় না। গুরুত্ব দিতে হয় বর্তমানকে এবং ভবিষ্যতকে। বর্তমানে কীভাবে ভাল থাকা যায়, ভবিষ্যৎকে কীভাবে আরও উজ্জ্বল করা যায়, সেই চেষ্টাই আমাদের সব সময় করা উচিত ৷ অতীতের সুথকর স্মৃতিও যেমন অতীত, তেমন দুঃখের স্মৃতিও। অতীত আঁকড়ে ধরে পড়ে থাকলে চলে না। এরপর কী ঘটল বলুন ৷ দেখি অতীতের ভয়ঙ্কর স্মৃতিকে আপনার মন থেকে মুছে দিতে পারি কিনা।’
সুমি …টিস্যু পেপার নিয়ে চোখ মুছতে মুছতে আবার বলতে লাগল, ‘আমি ভয়ে লজ্জায় ঘৃণায় বাড়ির কাউকে কিছু জানাই না। একা একা কেঁদে কেঁদে বুক ভাসাই। জানাবই বা কাকে?…কারন আমার মা ছিল খুবই অসুস্থ, রােগা ভোগা মানুষ। আর বাবা থাকত সব সময় তার ব্যবসা নিয়ে ব্যস্ত ৷ আমার বাবা তালুকদার
রাইস মিল নামে একটা মিলের মালিকে। ধানের সিজনে বিভিন্ন গ্রাম গঞ্জ থেকে টনকে টন ধান কিনে চাল বানিয়ে ঢাকা সহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় সরবরাহ করে ৷ বাড়ি ভর্তি মহিলা পুরুষ বিভিন্ন কামলা শ্রেণীর লোকজন।
সেই ঘটনার পরও কালু মিয়া ভাল মানুষের রূপ ধরে বাড়ির বিভিন্ন কাজ কম করে বেড়ায়। কে বলবে এই লোক কত বড় বদমাশ ! কত বড় লম্পট। আমি আর তার ধারে কাছেও যাই না। এভাবে তিন চার মাস কাটার পর আমি আমার মায়ের কাছে ধরা খাই। মা আমার শারীরিক পরিবর্তন ধরে ফেলে ৷ কারণ ওই ঘটনায় আমি প্রেগন্যান্ট হয়ে পড়েছিলাম। মা মারধর গালমন্দের সাথে চেপে ধরে ঘটনা জানার জন্য। কাঁদতে কাঁদতে মাকে সব জানাই। সব শুনে মা বলে, আগে যেমন কাউকে কিছু বলিসনি… এখনও কাউকে কিছু বলার দরকার নেই। কী করতে হবে সে…ব্যবস্থা আমি নিচ্ছি। মা জানার দুই তিন দিনের মাথায়ই বাবা আমার এবং মায়ের সদরে যাওয়ার ব্যবস্থা করে ৷ সদরে আমার এর ফুপুর বাড়িতে গিয়ে কিছুদিন আমরা থাকব ৷ মা কি বাবাকে জানিয়েছিল কিনা তা আমি আজও জানি না। তবে আমার ধারণা জানিয়েছিল। বাবা বরাবরই চুপচাপ স্বভাবের ঠান্ডা মাথার লোক। সদরে ফুপুর বাড়িতে যাবার পর ফুপু আর মা মিলে আমাকে একটা ক্লিনিকে নিয়ে গিয়ে অ্যাবরশন করায়। মাসখানেক পরে পুরোপুরি সুস্থ হয়ে বাড়িতে ফিরে আসি। কালু মিয়াকে আর বাড়িতে দেখতে পাই না। এ ছাড়া সব কিছু আগের মত স্বাভাবিক। বছর চারেক পর মা মারা যায় ৷ তার কিছু দিন পর সন্ধ্যার আগ মুহূর্তে ঊঠান সংলগ্ন বাগানের গাছের গুঁড়িতে অদ্ভুত বিকৃত মৃখাকৃতি দেখে আমার ভয় পাওয়া রোগ শুরু হয় ৷ হ্যা, আপনি ঠিকই ধরেছেন। ওই মুখাকৃতি ছিল আমার চেনা মানুষের মুখের ৷ কালু মিয়ার।
সুমির কথা শেষ হলে ডা. মিজানুর রহমান বললেন, ‘কালু মিয়া যেদিন আপনার সর্বনাশ করে, সেদিন কি আপনি শাড়ি পরা ছিলেন?
"হ্যাঁ , শখ করে মায়ের একটা সবুজ রঙের শাড়ি …পরেছিলাম। কালু মিয়া আমাকে শাড়ি পরা অবস্থায় দেখে বলেছিল, “আইজ তোমারে খুব সােন্দর লাগতাছে, একেবারে নতুন বউর লাহান।
‘এই কারণেই শাড়ির প্রতি এক ধরনের তীব্র ঘৃণা থেকে আপনি আপনার হাজবেণ্ডের আনা সবুজ রঙের শাড়িটা ছিড়ে … কুটিকুটি করেছিলেন।
না, ডাক্তার সাহেব, আমি ছিড়িনি! ওটা ওভাবে কে ছিড়ল কে জানে ! ?
আপনিই ছিড়েছেন, ঘোরের মধ্যে ছিড়েছেন বলে মনে নেই।’
সুমি গলায় জোর দিয়ে বলল, বিশ্বাস করুন, আমি ছিড়িনি ৷’
ডা. মিজানূর রহমান কিছুক্ষণ গালে হাত দিয়ে কী জানি ভেবে তাঁর রিভলভিং চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে বলতে লাগলেন… কম বয়সের ওই দুর্ঘটনাই আপনার মনে ভয় সৃষ্টি করেছে। আপনার মা মারা যাবার পর রোগটা ধরা দেয় এই জন্যে যে, মাকে হারানাের পর আপনি একেবারে নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েন। আমার ধারণা, ওই দুর্ঘটনার পর আপনি আপনার মায়ের সঙ্গে অনেক ঘনিষ্ঠ হয়ে গেছিলেন। মায়ের সাথে ঘুমাতেন, মায়ের সঙ্গে গল্প করতেন, মায়ের সাথে খাবার খেতেন, অর্থাৎ সব সময় মায়ের সঙ্গেই কাটাতেন।
কারণ মাই ছিল আপনার একমাত্র উদ্ধারকারিণী। মাকে হারিয়ে নিজেকে আবার প্রচণ্ড অসহায় ভাবতে থাকেন ৷ এ ছাড়া আমার আর একটা ধারণা… ফুপুর বাড়ি থেকে বাড়িতে ফিরে কালু মিয়াকে না দেখতে পেয়ে আপনার মনের অতলে ভাবনা জেগেছে, কালু মিয়াকে কি মেরে ফেলা হয়েছে? এবং এখনও সেটা আপনি ভাবেন।
আপনার বাবা একটা রাইস মিলের মালিক। গ্রাম অঞ্চলের অতি ধনী একজন লোক ৷ ধনী মানে প্রভাবশালীও। তাঁর পক্ষে কালু মিয়ার মত একটা কামলাকে মেরে ফেলে লাশ গুম করা কিছুই নয়। এই ডাবনার কারণেই আপনি কালু মিয়ার ভৌতিক প্ৰতিকৃতি দেখতে পান। আপনাকে একটা পরামর্শ দিই, আপনার বাবাকে সরাসরি জিজ্ঞেস করবেন, কালু মিয়াকে তিনি কী করেছেন? তাতে আপনার মনের সন্দেহের বীজটা দূর হবে৷ সেই সঙ্গে ভয়টাও।
আমার ধারণা, আপনার বাবা কালু মিয়াকে মেরে ফেলেননি৷ বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছেন ৷ আপনিই বলেছেন আপনার বাবা চুপচাপ স্বভ্যাবের ঠাণ্ডা মাথার লোক। ঠাণ্ডা মাথার বুদ্ধিমান একজন মানুষ কখনওই খুন খারাবির দিকে যাবেন না। খুন খারাবি করে… তারা, যাদের মাথা গরম।"
ডা. মিজানুর রহমান থামতেই সুমি বলল, ‘গতকাল আমাদের বাসার কাজের মেয়ে পারুলও তাে ওই খাটের নীচে ভৌতিকতার মুখোমুখি হয়েছে ।"
মিজানুব রহমান বললেন," আপনার হাজবেণ্ডের কাছে এটা আমি আগেই জেনেছি। একটা ব্যাপার কি জানেন, অনেক সময় মানসিক রােগও ছোঁয়াচে রোগের মত একজন থেকে আরেক জনে সংক্রমিত হয়। আপনার কাজের মেয়ে যেহেতু সব সময় আপনার সঙ্গে থাকে, তাই আপনার একটা প্রভাব তার মনের উপর পড়েছে ৷ ধীরে ধীরে আপনার হাজবেন্ডের উপরও এই প্রভাব… পড়তে পারে৷ তিনিও ভৌতিক কিছু দেখা শুরু করতে পারেন। এতে অস্বাভাবিকতার কিছুই নেই।
(ক্রমশ)
--------------
।। একাকী কন্যা ।।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now