বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
অতিপ্রাকৃতিক উপন্যাস
"অতৃপ্ত আত্মা"
আফজাল হোসেন
--------------------
(পর্ব ২)
তিন
জাহিদ অফিসে যাবার পর কিছুক্ষণ সুমি বিছানায় শুয়ে রইল। সারাক্ষণ ভয়ে ভয়ে থাকল, এই বুঝি ঘাড়ের পিছনে কেউ নিঃশ্বাস ফেলবে। হিসহিসে গলায় নাম ধরে ডাকবে ৷ তেমন কিছুই ঘটল না।
কিছুটা বেলা বাড়তেই সুমি উঠে পড়ল। রান্না বসাতে হবে৷ বাসা থেকে অফিস কাছাকাছি হওয়ায় জাহিদ মাঝে মাঝে, হঠাৎ হঠাৎ দুপুরে বাসায় এসে খেয়ে যায় ৷ অবশ্য যেদিন অফিসের কাজের চাপ কম থাকে। বলা তো যায় না আজও আসতে পারে। রান্না বসাবার আগে সুমি ৰাথরুমে ঢুকল ৷ সকালে গোসল শেষে তাদের দুজনের ভেজা পোশাকগুলো ৰাথরুমেই পড়ে রয়েছে। সেগুলো ধুয়ে ছাদে মেলে দিতে হবে।
ছাদে উঠেই সুমি চমকে কেঁপে উঠল ৷ ছাদের রেলিঙে কে যেন পা ঝুলিয়ে বসে রয়েছে। সবুজ রঙের শাড়ি পরা ৷ লম্বা ঘোমটা টানা। মুখ দেখা যাচ্ছে না। গায়ের সবুজ শাড়িটা সুমি চিনতে পারল ৷ জাহিদ কাল তার জন্য যে শাড়িটা কিনে এনেছিল, সেটা ৷ শাড়িটা সে খুঁজে পাচ্ছিল না।
ছাদের রেলিঙে বসে থাকা সবুজ শাড়ি পরা, লম্বা ঘোমটা টানা আকৃতিটা আচমকা গা দুলিয়ে খনখনে গলায় হেসে উঠল। হাসির শব্দে সুমির শরীরের সমস্ত লোম দাঁড়িয়ে গেল। কারণ মানুষ অমন করে হাসে না৷ কেমন পৈশাচিক হাসি।
সুমি কোনরকমে বুকে সাহস সঞ্চয় করে বসে যাওয়া গলায় বলে উঠল , কে আপনি?’ ওটার ফ্যাসফ্যাসে গলার স্বর শোনা গেল, সুমি-আমার-কাছে- এসো।‘ টেনে টেনে বলল ৷ যেন বুকে কফ জমা অতিবৃদ্ধ কোনও পুরুষ লোক।
তার আগেই ছাদে আসার চিলেকোঠার দরজাটা অদৃশ্য কোনও শক্তির প্রভাবে দড়াম করে বন্ধ হয়ে গেল । সুমি ভয়ে আতঙ্কে কান্না জড়িত গলায় চিৎকার করতে করতে দরজাটা খোলার চেষ্টা করতে লাগল ৷ দরজা অনড় এটে রয়েছে।
ওদিকে সবুজ শাড়ি পরা লম্বা আকৃতিটা রেলিং থেকে ছাদে ঝাপিয়ে পড়ে চার হাত পারে হামাগুড়ি দিয়ে পশুর মত সুমির দিকে এগিয়ে আসছে। এখন ওটার মুখ দেখা যাচ্ছে ৷ লম্বাটে কালো একটা মুখ। যেন আগুনে পুড়ে কোনও মানুষের মুখই অমন লম্বাটে আর কালো রং ধারণ করেছে ৷ টকটকে লাল রক্তপিণ্ডের মত চোখ ৷ ছাই বর্ণের ঘন ভ্রু আর আখি পল্লব ৷ মুখটা হা হয়ে রয়েছে। মুখের ভিতর থেকে গড়িয়ে নামছে থিকথিকে আঠাল জমাট রক্ত ৷ লম্বা লম্বা হাত পা ৷ হাত পাগুলােও আগুনে পোড়া।
বিকেলে অফিস শেষে জাহিদ বাসায় ফিরেছে ৷ বাসার দরজার সামনে দাঁড়িয়ে কলিং বেল টিপছে। ভীতর থেকে সুমি দরজা খুলছে না। অনেকক্ষণ হয়ে গেল কোনও সাড়া-শব্দই নেই। জাহিদের অধৈর্য লাগছে। সে খুবই ক্লান্ত ৷ আজ অফিসে অনেক কাজের চাপ গেছে! বলতে গেলে দম ফেলবারও সময় পায়নি।
সুমি কি ঘুমাচ্ছে নাকি বাথরুমে? দরজা খুলছে না কেন?! জাহিদের এখন অধৈর্যের সাথে দুশ্চিন্তাও হচ্ছে। কী হলো সুমির?!
জাহিদের কাছে দরজার লক তালা খোলার একটা চাবি রয়েছে। দরজা যদি ভিতর থেকে শুধু লক করা থাকে তা হলে সে চাৰি দিয়ে দরজা খুলতে পারবে। এটা মনে পড়তে জাহিদ মানিব্যাগ থেকে চাবিটা বের করল ৷
ভাগ্য ভাল ! কাজ হয়েছে! দরজা খুলেছে। ছিটকিনি আটকানাে ছিল না।
জাহিদ ভিতরে ঢুকে একে একে সব কামরায় খুঁজে দেখে কোথাও সুমি নেই। কোথায় গেল সুমি? রান্না ঘরে বালতিতে ফ্রিজ থেকে নামানাে একটা মাছের প্যাকেট ভেজানাে রয়েছে। এর মানে সুমি বাসায়ই আছে ৷ সুমি বোধহয় ছাদে গেছে শুকনো কাপড় আনতে। পড়ন্ত বিকেল রোদ নেই… তাই হয়তো সুমি ছাদে কিছুক্ষণ সময় কাটাচ্ছে।
জাহিদ পোশাক পাল্টে, হাত মুখ ধূয়ে নিজেও ছাদে উঠে গেল। কী সর্বনাশ! সুমি ছাদে অজ্ঞান হয়ে পড়ে রয়েছে। জাহিদ ঝাপিয়ে পড়ে উত্তেজিত গলায় সুমিকে জোরে জোরে ডাকার সাথে সুমির কাধ ধরে ঝাঁকাতে লাগল ৷ কোনও সাড়া নেই। সময় নষ্ট না করে জাহিদ সুমিকে পাজাকোলা করে নীচে ৰেডরুমে নিয়ে এল। বিছানায় শুইয়ে দিয়ে চোখে মুখে পানির ছিটা দিতে লাগল।
চোখে মুখে পানি ছিটানাের এক পর্যায়ে সুমির জ্ঞান ফিরল ৷ জ্ঞান ফিরতেই সুমি ভয়ার্ত গলায় অপ্রকৃতিস্থের মত চিৎকার করতে লাগল ৷ জাহিদ সুমির দু বাহু চেপে ধরে বলল, কী হলো তােমার? কী হলো?! কী দেখে ভয় পেয়েছ? এমন করছ কেন?!
বলার পর একটু ধাতস্থ হয়ে জাহিদকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদতে লাগল।
বেশ কিছুক্ষণ কান্না কাটির পর সুমি কিছুটা শান্ত হয়ে জাহিদকে শুরু থেকে অজ্ঞান হবার আগ পর্যন্ত যা ঘটেছে সবকিছু জানালো। জাহিদের কিছুই বিশ্বাস হলো না। প্রচণ্ড ভয় থেকে হ্যালূসিনেশন ছাড়া অন্য কিছুই না। ওই জিনিসটাকে সবুজ শাড়ি পরা অবস্থায় দেখেছে, কারণ সবুজ শাড়িটা সে খুঁজে পাচ্ছিল না। তাই মাথার ভিতর সারাক্ষণ সবুজ শাড়ির চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছিল৷ কিন্তু একটা বিষয় জাহিদের কাছে খুব অবাক লাগছে…, বেলা এগারােটা সাড়ে এগারাটায় ছাদে গিয়ে সুমি অজ্ঞান হয়ে সারাদিন রােদের ভিতর পড়ে রইল, এর মধ্যে এক বারও তার হুশ ফিরল না, এটা কেমন কথা! নাকি বিকেলেই একটু আগে ছাদে উঠে অজ্ঞান হয়েছে? এখন ওর কাছে মনে হচ্ছে বেলা এগারোটার দিকে উঠেছিল। ফ্রিজ থেকে নামানাে মাছের প্যাকেটও তো ভেজানাে রয়েছে , রান্না ঘরে। সেটা তো দেখে মনে হয়েছে একটু আগেই …ভেজানাে হয়েছে।
জাহিদ বলল, ‘আচ্ছা, সুমি, রান্না ঘরে দেখলাম বালতিতে মাছের প্যাকেট ভেজানাে, ওটা কখন ফ্রিজ থেকে নামালে?"
"ছাদে কাপড় শুকাতে দিতে যাবার আগে ! ভাবলাম মাছটা ভিজিয়ে রেখে যাই। ততক্ষণে বরফ ছাড়ুক।"
জাহিদ রান্না ঘরে গিয়ে বালতিতে ভেজানাে মাছের প্যাকেট থেকে মাছ বের করে দেখে সুমির কথা ঠিক। মাছ বেলা এগারোটা সাড়ে এগারোটার দিকেই ভেজানাে হয়েছে। কারন মাছে ফ্রিজের ঠাণ্ডার লেশমাত্র নেই। বরং পচন ধরেছে ৷ পচা পচা গন্ধ বেরুচ্ছে ৷
জাহিদ সুমিকে ফ্রিজের ঠাণ্ডা পানি, আমেৱ জুস, কলা… বিস্কিট.….এসব খাইয়ে বেশ খানিকটা সবল করে বাথরুমে গোসল করতে পাঠিয়েছে অনেকক্ষণ ধরে ভালভাবে গোসল করলে ভয়ের ক্লান্তি অনেকটাই কেটে যাবে।
জাহিদ মনে মনে ঠিক করে ফেলেদ্বে দু এক দিনের মধ্যেই সুমিকে একজন ভাল সাইকিয়াট্রিস্টেৱ কাছে নিয়ে যাবে। আর দেরি করা ঠিক হবে না। সুমির যে মানসিক সমস্যা রয়েছে এটা এখন নিশ্চিত।
জাহিদের খেয়াল হলো, আচ্ছা সবুজ শাড়িটা কোথায়? নতুন কেনা শাড়ি, হেলাফেলা করে যেখানে সেখানে ফেলে রাখার তো কথা নয়। শাড়িটা সুমি খুঁজে পাচ্ছে না কেন? জাহিদ শাড়িটা খুঁজতে লাগল। জাহিদ ঘরের সম্ভাব্য সব জায়গায় আঁতিপাতি করে শাড়িটা খুঁজল কিন্তু কোথাও পেল না। এক পর্যায়ে ক্লান্ত হয়ে ৰিছানার উপর বসে ভাবতে লাগল, আর কোথায় খোঁজা যায় ৷ হঠাৎ তার মাথায় এল,খাটের নীচটা তো দেখা হলো না৷ সঙ্গে সঙ্গে বিছানা থেকে নেমে খাটের নীচে উঁকি দিল।
আশ্চর্য! শাড়িটা খাটের নীচেই। তবে ওটাকে এখন আর শাড়ি বলা যাচ্ছে না৷ কুটিকুটি করে ছেঁড়া কতগুলো কাপড়ের টুকরো ছাড়া। খাটের নীচে টুকরোগুলাে ছড়ানাে ৷ জাহিদ হাত বাড়িয়ে কতগুলো ছেঁড়া টুকরো হাতে নিয়ে খাটের নীচ থেকে বাইরে এসে
দেখে, যেন কেউ মুখ দিয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে ছিবড়া ছিবড়া বানিয়ে ছিড়েছে ৷
জাহিদ গভীর চিন্তায় পড়ে পেল ৷ এই কাজ নিশ্চয়ই সুমি করেছে। শাড়ির প্রতি এক ধরনের তীব্র ঘৃণা থেকে। সে শাড়ি যে মোটেই পছন্দ করে না এটা বোঝা যায়৷ কারণ কখনওই সে শাড়ি পরে না ৷ তাই বলে শাড়িটা অমন ভাবে নষ্ট করবে?! ও কী এতটাই মানসিক বিকারগ্রস্ত?!
হঠাৎ বাথরুম থেকে সুমিব গলা ফাটানো চিৎকারের শব্দ এল। সেই শব্দে জাহিদ গভীর ভাবনা থেকে বেরিয়ে বাথরুমেৱ দিকে ছুটে গেল।
সুমি ৰাথরুমের ভিতরে একটানা চিৎকার করেই যাচ্ছে ৷ জাহিদ বাথরুমের দরজায় দুম দুম করে কিল বসাতে বসাতে চিৎকার করে বসে! গলায় জিজ্ঞেস করল, ‘সুমি, কী হয়েছে? ! কী হয়েছে? … কী হয়েছে তোমার? কী দেখে এত ভয় পাচ্ছ…? দরজাটা খােলো। দরজা খুলে বাইরে এসো. … … "
সুমি বাথরুমের ভিতর থেকে কান্না জড়িত গলায় চিৎকার করে বলছে, "ওটা আমাকে বেরুতে দিচ্ছে না। ওটা আমাকে ছাড়ছে না… ..।"
জাহিদ বলল, "ওটা কিছুই না৷ কিচ্ছু নেই ৰাথরুমে। সবই তোমার মনের ধারনা, ভ্রান্তি ৷ তুমি ছিটকিনি খুলে বাইরে এসো।"
জাহিদের বলায় কাজ হলো। দরজা খুলে গেল ৷ সুমি ছুটে বাইরে বেরিয়ে এল। সুমিব ভেজা শরীরে কিছুই নেই। উলঙ্গ ৷ জাহিদ সুমিকে জড়িয়ে ধরল। সুমি ঝরঝর করে কাঁদতে লাগল ৷
বলাই বাহুল্য … বাথরুমে ঢুকে জাহিদ কিছুই দেখতে পেল না। সব স্বাভাবিক। সুমি যা জানালো তা হলো , সুমি গায়ের সমস্ত পোশাক খুলে শাওয়ার নিচ্ছিল। ঝিরিঝিরি ঠাণ্ডা পানির ধারায় ভিজতে ভিজতে আরামে চোখ বুজে এসেছিল ৷ চোখ বন্ধ অবস্থায় এক সময় কেমন চাপা গোঙানির মত শব্দ পায়। গোঙানির শব্দে চোখ খুলে দেখে তার সামনে বাথরুমের দেয়াল ফুড়ে ছাদে সে পিশাচটাকে দেখে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল সেই পিশাচটার মুখাকৃতি ফুটে উঠেছে ৷ জীবন্ত… নড়ছে। ওটার মুখ দিয়েই গোঙনির শব্দটা বের হচ্ছে। কিছুক্ষনের জন্য সুমি একেবারে স্তম্ভিত হয়ে যায়। গলা বুজে আসে। চিৎকার দেয়ার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। পিশাচটা দেয়াল ফুড়ে বেরিয়ে আসতে থাকে৷ কুচকুচে কালো একটা দেহ ৷ দেহের কোথাও কোথাও দগদগে ঘা। কালো …কালাে লম্বা লম্বা হাত দিয়ে সুমিকে জড়িয়ে ধরতে চায়।
তখন , আতঙ্কের চূড়ায় পৌছে সুমির গলা ফেটে অনবরত চিৎকার ৰেরোতে থাকে ৷ সুমি দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে যেতে চায়। কিন্তু পিছন থেকে পিশাচটা ওর চুলের মুঠি টেনে ধরে রাখে ৷
(চলবে)
------------
।। একাকী কন্যা ।।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now