বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
অতিপ্রাকৃতিক উপন্যাস
"অতৃপ্ত আত্মা"
আফজাল হোসেন
----------------------
(পর্ব ১)
মাঝ রাতে সুমির ভয়ার্ত গলার স্বরে জাহিদের ঘুম ভেঙে গেল। সুমি বেশ কয়েকবার ডীত গলায় ফিসফিস করে এই ..এই শুনছ... বলে জাহিদকে ডেকেছে আর মৃদৃভাবে ধাক্কা দিয়েছে ৷
জাহিদ ঘুম জড়ানাে গলায় সাড়া দিল…"উহ্ উউহ্ কী হলো?"
অন্ধকার কামরা তাই পাশাপাশি শুয়ে থাকা সত্বেও একে অপরের মুখ দেখতে পাচ্ছে না। সুমি আগের মত ভয়ার্ত ফিসফিসে গলায় ৰলল আমার খুব ভয় লাগছে!
জাহিদের ঘুম জড়নো গলা "কেন?"
‘খাটের নীচে কে যেন বসে আছে ৷"
‘খাটের নীচে কে বসে থাকবে?"
‘জানি না। খুটখাট শব্দ শুনতে পাচ্ছ না? আমি তো জোরে জোরে নিঃশ্বাস ফেলার শব্দও পাচ্ছি।"
জাহিদ বিরক্ত গলায় বলল ‘ইঁদূর টিদুর কিছূ হবে হয়তো।"
জাহিদের বিরক্ত হবার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। বিয়ের পর থেকে দেখে আসছে সুমি প্রায়ই কারণে অকারণে ভয় পায় ৷ বিয়ের পর তিন মাসে অন্তত ত্রিশবার জাহিদের এই অভিজ্ঞতা হয়েছে৷
এই, এই, তুমি কি আবার ঘুমিয়ে পড়লে? বলতে বলতে সুমি জাহিদের আরও ঘনিষ্ঠ হলো।
জাহিদ কোমল গলায় বলল. ‘না।
ঘনিষ্ঠ হবার ফলে সুমির হাত…পায়ের স্পর্শে জাহিদ বুঝতে পারছে ভয়ে ওর হাত পা একেবারে ঠাণ্ডা হয়ে গিয়েছে। এই অবস্থা থেকে ওকে স্বাভাবিক করতে হলে বাতি জ্বেলে কিছুক্ষণ কথাবার্তা বলতে হবে।
জাহিদ শোয় অবস্থা থেকে উঠতে লাগল। জাহিদকে উঠতে দেখে সুমি ওকে চেপে ধরে কাঁপা কাঁপা গলায় বলল "এই, কী করছ তুমি? ভুলেও ৰিছানা থেকে নেমো না।নামলেই খাটের নীচ থেকে ওটা মুখ বের করে তোমার পা কামড়ে ধরবে।"
জাহিদ সুমির কথা উপেক্ষা করে বিছানা থেকে নামতে নামতে বলল, "বাতি জ্বাললেই সব ঠিক হয়ে যাবে। তোমার অহেতুক ভয় কেটে যাবে।"
জাহিদ বাতি জ্বালল। টিউব লাইটের উজ্জ্বল আলোয় সারা ঘর ফক ফক করছে। সুমি ভয়ে গুটিসুটি মেরে কুণ্ডলি পাকিয়ে শুয়ে রয়েছে।
জাহিদ হাই তুলতে তুলতে বলল… "এসো, আমার সঙ্গে এসে দেখ তো… খাটের নীচে কিছু আছে কিনা। "
সুমি সস্ত্রস্ত গলায় বলল, "না… না, আমি দেখব না। আমার খুব ভয় লাগছে।"
জাহিদ নিজেই নুয়ে খাটের নীচে উঁকি দিল ৷ টিউব লাইটের আলোর হালকা আভা খাটের নীচে ৷ হালকা আভায় দেখা যাচ্ছে কিছুই নেই সেখানে ৷ কিছু থাকার কথাও নয় ৷
জাহিদ , খাটের নীচ থেকে মাথা তুলে আশ্বস্ত করার ভঙ্গিতে বলল, ‘কিচ্ছু নেই ওখানে। শুধু শুধু ভয়ে তুমি আধমরা।‘
সুমি আগের মত ভয়ার্ত গলায় বলল. ‘ছিল, আলো জ্বালার পর চলে গেছে ৷
জাহিদ বিছানার পাশে বসে সুমির কপালে হাত বোলাতে বোলাতে বলল, “শুধু শুধু এমন ভয় পাও কেন তুমি?! বিয়ের আগেও কি এভাবে ভয় পেতে? কবে থেকে তোমার এই সমস্যা?
সুমির কাছ থেকে কোনও জবাব এল না। যেভাবে গাঢ় নিঃশ্বাস ফেলছে তাতে মনে হচ্ছে ঘুমিয়ে পড়েছে ৷ জাহিদ আলতােভাবে ধাক্কার সঙ্গে কয়েকবার ‘সুমি সুমি করে ডাকল। কোনও সাড়া শব্দ নেই। সত্যিই সুমি ঘুমিয়ে পড়েছে, জাহিদ বেশ অবাক হলো ৷ কথা বলতে বলতে হঠাৎ করে কি কোনও মানুষ এমন ভাবে ঘুমিয়ে পড়তে পারে?! নাকি ঘুমন্তই ছিল। এতক্ষণ যা করেছে ঘুমের মাঝেই করেছে। দেখা যায় না… কিছু কিছু মানুষের ঘুমের মধ্যে কথা বলা, হাটা চলা করা, গান গাওয়া বা কোনও কিছু করার অভ্যসে থাকে?…’
জাহিদ টয়লেট থেকে ফিরে, এক গ্লাস পানি খেয়ে বাতি নিভিয়ে শুয়ে পড়ল। সুমি একেবারে গভীর ঘুমে মগ্ন ৷ জাহিদের চোখে ঘুম আসছে না। খুব চিন্তা হচ্ছে সুমিকে নিয়ে। তিন মাস আগে বাবা মায়ের পছন্দে সুমিকে ও বিয়ে করেছে। বিয়ের পর নিজের সঙ্গে ঢাকায় নিয়ে এসেছে। সুমি খুবই সুন্দরী এবং ভাল মেয়ে।
একটাই সমস্যা, প্রায়ই কারণে অকারণে ভয় পায়। বাথরুমে গেলে ভয় পায়। একা রান্না ঘরে ঢুকলে ভয় পায়। ছাদে কাপড় শুকাতে গেলে ভয় পায়। একা বারান্দায় দাড়াতে ভয় পায়! সারাক্ষণ শুধু ভয়! একা হলেই কে নাকি ওর ঘাড়ের পিছনে এসে দাড়ায়। ঘাড়ের উপর গরম নিঃশ্বাস ফেলে। হিসহিসে গলায় টেনে টেনে ওর নাম ধরে ডাকে ! চমকে ও পিছনে ফিরে দেখে … কেউ নেই। তবে কারও অস্তিত্ব টের পায়। সে শরীরধারী না, অশরীরী ৷
ভাবতে ভাবতে জাহিদের চোখে ঘুম চলে এসেছে। এখন তার আধো ঘুম আধো জাগরণ অবস্থা ৷ এই অবস্থায় সে শুনতে পাচ্ছে খাটের নীচে কেমন খুটখাট শব্দ হচ্ছে। যেন খাটের নীচে কেউ আছে ৷ এই তো আবার মৃদু কট কট কট শব্দ হচ্ছে।ইঁদুর টিদুর হবে হয়তো। নয়তো বা ঘুণ পোকা। খাটে বোধহয় ঘুণ পোকা ধরেছে। ঘুণ পোকা অনেক সময় এমন কট কট কট শব্দ করে ৷
দুই
সকাল সাড়ে আটটা ৷
জাহিদ অফিসে যাবার জন্য তৈরি হয়ে নাস্তার টেবিলে এসেছে। সুমি নাস্তা রেডি করে বসে আছে ৷ সুমি বোধহয় একটু আগে গোসল করেছে। চেহারায় একধরনের সতেজ স্নিগ্ধতা ৷ এমন সতেজ স্নিগ্ধতা মেয়েদের চেহারায় শুধু মাত্র গোসলের পরই দেখা যায় ৷ সুমির পরনে লাল রঙের সালোয়ার কামিজ ৷ চোখে কাজল। গোসলের পরের ভেজা ভেজা খোলা চুলগুলো পিঠের উপর মেলে রাখা। একেবারে স্বর্গের অপ্সরার মত লাগছে ৷
সুমিকে দেখে জাহিদের মনটা ভরে গেল। এমন পরীর মত বউ কজনার ভাগ্যে জোটে ! সে অনেক ভাগ্যৰান বলেই এমন বউ পেয়েছে !
জাহিদ চেয়ার টেনে বসতে বসতে বলল, ‘কাল তোমার জন্য যে সবুজ টিয়া রংয়ের শাড়িটা আনলাম, সেটা আজ পরতে।‘
সুমি জাহিদের সামনের প্লেটে কলিজা ভুনা আর পরোটা তুলে দিতে দিতে বলল, “সেটাই পরতে চেয়ে ছিলাম, কিন্তু শাড়িটা কোথাও খুঁজে পেলাম না। বুঝলাম না কোথায় রেখেছি !‘
জাহিদ পরােটা ছিড়ে দুআঙুলে চেপে ধরে ভিতরে কলিজা ভুনা তুলে মুখে গুঁজে চিবাতে চিবাতে বলল, ঘরেই কোথাও আছে যাবে আর কোথােয় ! খুঁজে পেলে শাড়িটা পোরাে। অনেক শখ করে কিনেছি। সবুজ রংয়ে তোমাকে খুব মানাবে। নাস্তা নিচ্ছ না কেন?…
সুমি মুখে বিতৃষ্ণার ভাব ফুটিয়ে বলল, কেন জানি আমার কিচ্ছু খেতে ইচ্ছে করছে না।
“খেতে ইচ্ছে না করলেই না খেয়ে থাকবে?! সামান্য কিছু হলেও খাও।’
‘তুমি আগে খেয়ে নাও। তোমার অফিসের দেরি হচ্ছে। তুমি যাবার পর আমি খেয়ে নেব ৷"
জাহিদ অফিসের উদ্দেশে বাসা থেকে ৰেরোচ্ছে। দরজায় দাঁড়িয়ে সুমি মলিন মুখে বিদায় জানাচ্ছে।
জাহিদ বাসা থেকে বেরোবার সময় প্রতিদিনই সুমির মুখ এমন অন্ধকার, বেজার আর মলিন হয়ে যায়। কারণ তাকে এখন একা থাকতে হবে। আর একা থাকলেই সে ভয় পায়।
সুমির মলিন মুখের দিকে তাকিয়ে জাহিদের খুব মায়া লাগছে। কী করবে সে? অফিসে না গিগ তো উপায় নেই। তাদের ৰাসাটা শাহজাহানপুরের এমন এক …এলাকায়, যেখানে আশপাশের বাড়িগুলো খুব ফাঁকা ফাঁকা। মূল রাস্তা থেকে অনেক ভিতরে একতলা বাড়ি। তারাই একমাত্র ভাড়াটে।
বাড়িতে অন্য ভাড়াটিয়া থাকলে না হয় সুমি তাদের সঙ্গে মিশতে পারত।বাড়ির মালিক ৰিশ পঁচিশ বছর আগে সেই যে সপরিবারে বিদেশ গেছেন আর ফেরেননি ৷ মালিকের দূর সম্পর্কের এক ভাগ্নে এখন বাড়ির তত্ত্বাবধানে। জাহিদ মালিকের সেই দূর সম্পর্কের ভাগ্নের কাছ থেকেই বাড়িটা ভাড়া নিয়েছে ৷ ভাড়া খুবই কম। আজকাল এত কম টাকায় ঢাকা শহরে ৰাড়িডাড়া পাওয়া যায় না। এ ছাড়া অফিসের খুব কাছাকাছি হওয়ায় জাহিদ সানন্দে বাড়িটা ভাড়া নিয়েছিল ৷
সুমিকে ঢাকায় নিয়ে আমার আগেই, অর্থাৎ বিয়ে করার আগেই সে একা একা প্রায় মাসখানেক এ বাড়িতে কাটিয়েছে ৷ তার কাছে খুব ভাল লেগেছে। চারদিক নীরব নির্জন, কােলাহলশূন্য। মূল রাস্তা অনেক দূরে হওয়ায় গাড়ির হর্নের শব্দও এসে কানে পৌছয় না। ঢাকা শহরে এমন বসতি ভাবাই যায় না।
জাহিদ সুমিকে জড়িয়ে ধরে আদর করছে। দুহাত দিয়ে সুমির মুখটা দু পাশ থেকে চেপে ধরে তুলে ধরেছে। সুমির রেশমি চুলের মধ্যে আঙ্গুল চালিয়ে দিচ্ছে। এটা অফিসে যাবার আগের আদর।দরজার সামনে দাড়িয়েই ৷ আশপাশ থেকে কেউ এই দৃশ্য দেখছে তেমন আশংকা নেই। আশপাশের ৰাড়িণ্ডলো তাে অনেক দূরে দূরে। আর বাড়ির সামনের গলি ধরে এই মুহূতে কাউকে যেতেও দেখা যাচ্ছে না। এর পরও সুমি জগতের সমস্ত নতুন বউদের মত লজ্জায় লাল হয়ে, আহ, কী করো! আশেপাশের লোকজন দেখছে তাে!’
বলতে বলতে আপত্তি জানাচ্ছে ৷ জাহিদ সুমির আপত্তিকে অগ্রাহ্য করে ঠোটের উপর একটা গাঢ় চুমো বসিয়ে তারপর ছাড়ে। ছাড়ার পর বলল, তােমার বাবার না আমাদের জন্য একটা কাজের মেয়ে নিয়ে আসার কথা? কবে আসবেন উনি? বাসায় একটা কাজের মেয়ে থাকলেও তো তোমাকে এমন একা থাকতে হত না।‘
সুমি তার কাপড়, চোপর ঠিকঠাক করতে করতে বলল, "বাবা দু একদিনের মধ্যেই আসবে ৷ ভাল একটা কাজের মেয়ে পাওয়াই তো মুশকিল৷"
"আসি তা হলে ৷ তুমি একটুও ভয় পাবে না। ঢাকা শহরের কেউ ভূতে ভয় পায় না৷ লোকে শুনলে হাসবে।"
জাহিদ এগিয়ে যেতে লাগল। পিছনে দরজা ধরে বিষন্ন মলিন মুখে সুমি দাঁড়িয়ে রইল।
(ক্রমশ)
-------------
।। একাকী কন্যা ।।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now