অসমাপ্ত ভালোবাসা (২য় পর্ব) "উপন্যাস" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রাসেল পারভেজ (০ পয়েন্ট)
X
"অসমাপ্ত ভালোবাসা "(২য় পর্ব)
লিখেছেনঃ রাসেল পারভেজ
আজিকার বিকালটা খুব উপভোগ্য। সূর্যের সোনালী রশ্মি দীগন্ত জুড়িয়া একটা আগমনী বার্তা ছড়াইয়া দিয়াছে। আর সমস্ত পত্র পল্লবের উপরে তাহা লিখিয়া দিয়াছে। চারিদিকে পাখি গাহিছে, নদী চলিতেছে, চাষারা উবু হইয়া ক্ষেত নিড়াইতেছে।
.
আজিকে আসলেই সোহানের জন্য অনেক আনন্দের। মনের ভিতরের চাপা আনন্দ বাহির করিয়া সবাইকে দেখাইতে ইচ্ছে করিতেছে, ইচ্ছে করিতেছে চিৎকার করিয়া কহিতে আমি আসিয়াছি, তোমাদিগের মাঝে আবার ফিরিয়া আসিয়াছি,। অনেক দিন পরে ফিরিয়া আসিয়াছি, সঙ্গে লইয়া আসিয়াছি, কিছু না বলা কথা, কিছু চাপা সুখ দুঃখ।
.
অনেক দিন পর আজিকে সোহান বাড়ি ফিরিল। শরীর স্বাস্থ্য ভঙ্গুর, শীর্নকার হইয়া গিয়াছে। মুখমন্ডল এক রাশ খোচা দাড়ীতে ভর্তি হইয়া গিয়াছে, আর সেই মুখভর্তি দাঁড়ির ভিতর হইতে একটা চাপা হাসি বাহির হইতেছে।
.
গ্রামের লোকজন উহাকে দেখিয়া কেমন যেন বিস্ময়ের চোখে চাহিয়া আছে, বোধহয় তাহারা আজিকেই উহাকে প্রথম দেখিতেছে, আর দেখিবে নাই কেন, চেহারা সুরতের যেরূপ অবস্থা হইয়াছে দেখায় স্বাভাবিক।
নরেন কাকার ছেলে বিকাশ ছুটিয়া আসিয়া একরুপ কাদিয়া কহিল, দাদা এতদিন পরে এলে....??? আর তোমার অবস্থায় বা এমন কেন...???
সোহান তার ব্যাগ বিকাশের নিকট আগাইয়া দিয়া মৃদু হাসিয়া কহিল, আগে ব্যাগ ধর বাড়ি চল,তখন শুনিস সব এখন রাস্তায় এইসব থাক।
কিন্তু বিকাশের যেন আর কিছুতেই সহিতেছে না, যে করেই হোক বলিতে হইবে, না বলিলে বোধহয় উহার পাপ হইবে, তাই শত বাধা অতিক্রম করিয়া কহিয়া উঠিল, কিন্তু দাদা....।
সোহান উহাকে থামাইয়া দিয়া কহিল, তোর মনের যত কথা আছে বলিস, তবে আগে বাড়ি তো চল। কতদিন মাকে দিখিনা, ওই সেই গেলাম আর কোন খোঁজ নিতে পারিনি, আয়েশা কেমন আছে রে...???
বিকাশ আর নিজেকে ধরিয়া রাখিতে পারিতেছে না, আড়ালে চোখ মুছিয়া কহিল, ভাল আছে, আগে বাড়িতে চল।
.
বাড়িতে আসিয়া দেখিল মা রোয়াকের একাধারে শুইয়া আছে, ছোট বোন সায়মা পাশে বসিয়া বাতাস করিতেছে, উহাদিগের আসিতে দেখিয়া চেচাই উঠিয়া কহিল, দেখ মা ভাইয়া এসেচে।
সোহানের মা দুর্বল স্বাস্থ্য লইয়া উঠিয়া বসিয়া কাদিতে ফেলিয়া কহিল, এতদিন পর এলি বাপ...এতদিন মায়ের কথা কি একদিন ও মনে পড়েনি..???
ইহাই বলিয়া আত্মবিলাপ শুরু করিয়া দিল।
সোহানের মায়ের কাছে আসিয়া চোখের জল ছাড়িয়া কহিল, তোমরা কেমন আছ মা...???
সোহানের মা শুধু চক্ষু মুদিয়া কাদিয়ায় গেল ।আর কহিতে লাগিল, এতদিন কোথায় ছিলি আর তোর শরীর এমন কিভাবে হলো...???
সোহান মৃদু হাসিয়া কহিল, সে তুমি পড়ে শুনো, আগে কও আয়েশা কেমন আচে...???
একথা শুনিবার পর সোহানের মায়ের বুকে গিয়া শেল বিধিল, মুখ দিয়া কথা ঝরিল না, শুরু লোনা পানি ঝরিল, নিস্তব্ধ হইয়া রহিল খানিকক্ষণ।
মায়ের নিরবতা দেখিয়া সোহান বুঝিয়া লইলা, হইতোবা কিছু ঘটিয়াছে। মাকে ধরিয়া চিৎকার করিয়া কহিল, কতা কও না কেন...??? আয়েশার কি হয়েছে....???
বিকাশ এইবার নিজেকে আর চাপাইয়া রাখিতে পারিল না মুখের বাধ ভাঙ্গিয়া কহিল, দাদা তুমি এত পর এলে, তোমাকে আমরা অনেক খুজেছি, সোহেল দা তোমাকে খুজতে শহরে পর্যন্ত গিয়েছিল কিন্তু পাইনাই তারপর আয়েশা দি...।
এইটুকু বলিয়া বিকাশ থামিয়া গেল উহার চক্ষু হইতেও জল ঝড়িতে আরম্ভ করিয়া দিল। সোহান উন্মাদ হইয়া ছুটিয়া আসিয়া সোহানের কাধ ঝাকাইয়া কহিল, তারপর হলো কস না কেন...???
বিকাশ নিজেকে সামলাইয়া লইয়া কাদোকাদো কন্ঠে কহিল, এই দুগ্গো পূজোর পরে যে আয়েশা দিদির বিবাহ হয়ে, গেল , তোমাকে এই কদিন পাগলের মত খুঁজেছে, সারাদিন নাইতো না, খাইতো না, শুধু গাঙ্গের বসে বসে কাদতেঁ। এই বলিয়া বিকাশের কন্ঠ ধরিয়া আসিল।
কথাটা সোহানের ষড়ঠ ভেদ করিয়া সহসারে গিয়া উপনীত হইল। গুলি খাওয়া বাঘের মত হৃদপিণ্ড লাফাইতে থাকিলো, নিজেকে আর ধরিয়া রাখিতে পারিতেছে না, এক সময় সুতা ছেড়া ঘুড়ির মত মাটিতে লুটাইয়া পড়িয়া মূর্ছা গেল।
•
কাজল ডাক্তারের শরনাপন্ন হইলে কিছু বড়ি লিখিয়া দিয়া কহিল, দুর্বলতার সহিত অত্যাধিক চিন্তার কারণে মুর্ছা গিয়াছে, নিয়মিত ঔষুধ সেবনে আরগ্য লাভ হইতে পারে।
এদিকে এরুপ পরিস্থিতির কারণে কান্না কাটির রোল পড়িয়া গিয়াছে।
বেশ কয়েকদিন মাঝেমাঝে মুর্ছা যায়তে থাকিলো।
আপনাদিগের কাছে পিছনের কাহিনি খানা বলাই হইলো না।
সোহান শহরে গিয়া শহরের পরিবেশের সহিত নিজেকে খাপ খাওয়াইতে পারিল না, কিছুদিনের মধ্যেই জন্ডিস আর ডায়রিয়া উহাকে জাকিয়া ধরিল। তবুও ইহাকে উপেক্ষা করিয়া চাকরি খুজিতে লাগিল।
সারাদিন না খাইয়া, না জিরাইয়া দেহ একদম ভাঙ্গিয়া পরিল., একদিন রোগের কাছে আত্মসমর্পণ করিয়া রাস্তায় লুটিয়া পড়িল। তারপরের কাহিনী উহার অজানা। চেতনা আসিলে নিজেকে হাসপাতালে আবিষ্কার করিল। পরের কাহিনী সিনেমার মত ঘটিয়া চলিল।
•
সোহান কিছুদিন হইলো ঔষুধ পথ্য ছাড়িয়াছে, কিন্তু নতুন জিনিসে আসক্ত হইয়া পড়িয়াছে। ইদানিং সিদ্ধিতে আসক্ত হইয়া পড়িয়াছে। সারাদিন দরজা আটিয়া শুইয়া শুইয়া বালিশ ভিজাইতে থাকে, আর বিকাল হইলে গড়াই তীরে সেই নিদিষ্ট জায়গায় গিয়া বসিয়ে নিজে নিজেই গল্প করে, অথবা সিদ্ধি খাইয়া কদম তলায় বসিয়া থাকে। সন্ধ্যা হইলে বিকাশ আসিয়া ডাকিয়া লইয়া যায়।
আজিকে সিদ্ধির মাত্রাটা বাড়িয়া গিয়াছে, নিজেকে টাল সামলাইতে পারিতেছে না, সমস্ত শিরা ধমনীতে গিয়া ভুমিকম্পের ন্যায় কম্পন সৃষ্টি করিতেছে, মাথার ভিতরে পাক খাইতেছে, তবুও গুনগুন করিয়া গান গাহিয়া চলিতেছে, বোধহয় বেশিক্ষণ দাড়াইয়া থাকিতে পারিবে না, মাঝে মাঝে মাটি হইতে পা ফসকাইয়া যায়তেছে, হৃদপিণ্ডের রক্ত চাপও বাড়িয়া চলিতেছে, বলিলে কহিতেই দেহখানি অসারতা মত হইয়া মাটিতে লুটাইয়া পড়িল।
চলবে....
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now